শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

“হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর (নবম পর্ব)

৭. হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর
রাগিণী/ (Tune) ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর
যে বান্ধিল এমন সুন্দর ঘর।
বসতবাড়ি নাই ভুবনে
ভেসে রয় সে মহাশূন্যে
সাধু-গুরুর চরণ ভিন্নে
মিলে না তার খবর।
বাহান্ন কুঠরি ঘরে
নয়দুয়ার তল ওপরে
দয়াল কাঁইজি বিরাজ করে
খুপরি ঘরের ভিতর।
হস্ত পদ নাইরে মাথা
ইঙ্গিতে সে বলে কথা
বলন কয় মূলবারতা
সূক্ষ্মভাবে ধর অধর।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, প্রখ্যাত আত্মতত্ত্ব গবেষক, উপ-মহাদেশের বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক লেখক, শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের উত্তরণের সার্থক রূপকার, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসংগ্রামী এবং প্রখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে কাঁইজি বৈকুণ্ঠের অবস্থানের প্রতি আলোকপাত করেছেন।
কাঁইজি বলেছেন বৈকুণ্ঠধাম এত সুন্দর ও মনোরোম করে কাঁই নির্মাণ করেছেন যে যুগের শেষদিন পর্যন্ত বর্ণনা করলেও কারো পক্ষেই তা শেষ করা সম্ভব হবে না। অবাক হওয়ার বিষয় হলো- যিনি এত সুন্দর করে স্বর্গধাম নির্মাণ করেছেন জগতের কোথাও তাঁর বসতভিটা নেই। তিনি চিরকালই মহাশূন্যে ভেসে থাকেন। এ বিষয়টি এতই গোপন যে সাধারণ মানুষ কিছুতেই কাঁইয়ের সন্ধান জানতে পারেন না কিন্তু কাঁইজি বলেছেন সাধক-গুরুর নিকট শিষ্যত্বগ্রহণ করলে অনায়াসে যে কোন সাধকই তাঁর সন্ধান জানতে পারেন।
যেমন পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে- “ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَانُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ إِنَّهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا(৬১)” উচ্চারণঃ “জান্নাতি আদনি আল্লাতি ওয়াদার রাহমানু ইবাদাহু বিলগাইবি, ইন্নাহু কানা ওয়াদাহু মা’তিয়্যা” অর্থ- “নিত্যস্বর্গ! যা তাঁর দাসকে গোপনে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। নিশ্চয় তার অঙ্গীকার পূরণযোগ্য।” (কুরান, মরিয়ম- ৬১)। সুন্দর ঘরটির ৫২টি কুঠরি রয়েছে। রূপক সাহিত্যে যাকে ‘বাহান্নহাট’ বলা হয়। ঘরটির ৯টি দুয়ার আছে- রূপক সাহিত্যে যাকে ‘নয়দ্বার’ বলা হয়। তারপরও দয়াল কাঁইজি একটি খুপরি ঘরের ভিতর বাস করেন। কাঁইজি আরো বলেছেন সমস্ত জীবজগৎ যিনি সৃষ্টি করেছেন- সে কাঁইয়ের হাত, পা, মুখ ও মাথা কিছুই নেই। তিনি কেবল ইঙ্গিত দ্বারাই তাঁর আগমন ও প্রত্যাগমন বার্তা প্রেরণ করে থাকেন। পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন একজন পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাঁইসাধন করা বা কাঁইদর্শন করা সবারই একান্ত উচিৎ।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)
/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
ইঙ্গিত, খুপরি, গুরু, ঘর, চরণ, ভুবন, মহাশূন্য (গর্ভাশয়), মূলবারতা, সাধু। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. এ কাব্যটির বক্তা কে? (Who is the speaker of the poem?
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এ কাব্যটি এমন একজন দিব্যজ্ঞানী সাধকের নিশ্চিত সত্যবাণী যিনি স্বয়ং সাঁই ও কাঁইয়ের দর্শনলাভ করেছেন। সাঁই ও কাঁইয়ের নিশ্চিত দর্শনলাভকারী ভিন্ন এরূপ নিশ্চিত কথা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। এখানে কাঁইজি একজন সাধকের উদ্ধৃতি দিয়েই এরূপ নিশ্চিতবাণী উচ্চারণ করেছেন।
২. শূন্যের ওপর নির্মিত সুন্দর ঘরটি কী?
(What is the beautiful house built on vesoljska?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে দেহ ও বৈকুণ্ঠকে শূন্যের ওপর নির্মিত ঘর বলা হয়। তবে এখানে কেবল বৈকুণ্ঠকেই কাঁইজি শূন্যের ওপর নির্মিত ঘর বলে উল্লেখ করেছেন। এ ঘরটি প্রায় সব দ্বিপস্থ জীবের স্ত্রীরাই বহন করে থাকে। মাটি হতে শূন্যের ওপর বৈকণ্ঠরূপ ঘরটি অবস্থিত বলেই বৈকুণ্ঠকে শূন্যের ওপর বাঁধা ঘর বলা হয়।
৩. মহাশূন্যে ভাসে কে? (Who is float on the vesoljska?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে মহাশূন্য বলা হয়। সাঁই ও কাঁই সব সময়ই এ মহাশূন্যেই ভাসতে থাকেন। এ জন্য সাঁই ও কাঁইকে সর্বদা মহাশূন্যে ভাসমান বলা হয়।
৪. বাহান্ন কুঠরি কী? (What is fifty-two compartment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্য বাহান্ন-পণ্যারকে ৫২ কুঠরি বলা হয়। ৫২ পণ্যার হলো- ১.একনিরীক্ষ ২.দুইফল ৩.তিনতার ৪.চারচন্দ্র ৫.পঞ্চবাণ ৬.ছয়রিপু ৭.সাতকর্ম ৮.অষ্টাঙ্গ ৯.নয়দ্বার ১০.দশইন্দ্রিয় ১১.এগাররুদ্র ১২.বারোনেতা ১৩.তেরনদী ১৪.চৌদ্দপোয়া ১৫.পনেরচল ১৬.ষোলকলা ১৭.আঠারোধাম, ১৮.ঊনিশরক্ষী ১৯.বিশাঙুল ২০.একুশদিন ২১.তেইশজোড়া ২২.চব্বিশপক্ষ ২৩.পঁচিশগুণ ২৪.সাতাশনক্ষত্র ২৫.ত্রিশবছর ২৬.বত্রিশদাঁত ২৭.ছত্রিশরবি ২৮.বাহান্নহাট ২৯.চুয়ান্নমাথা ৩০.বাহাত্তরকম্প ৩১.আশিকর ৩২.চুরাশিফের ৩৩.দুইশতছয়হাড় ৩৪.৩১০ গর্ভবাস ৩৫.৩৬০মূর্তি ৩৬.৫০০শ্বাস ৩৭.৬৬৬ সূপারি ৩৮.হাজার মাস ৩৯.৬৬৬৬ সূপারিচ ও ৪০.কোটিঊর্ণ।
এছাড়াও রূপক সাহিত্যের বিশ্ববরেণ্য মনীষীগণ নিচের ১২টি রূপকসংখ্যাকেও প্রায় মূলকের মতো সমমান বলেই গণ্য করে থাকেন। ১.তেত্রিশপ্রতীতি (স্থাপক) ২.চল্লিশতলা (যোজক) ৩.তিপ্পান্নগলি (যোজক) ৪.পঞ্চান্নধারা (যোজক) ৫.ষাটহাত (শূন্যক) ৬.তিষট্টিবাই (স্থাপক) ৭.ছিষট্টিতল (স্থাপক) ৮.সত্তরজন (শূন্যক) ৯.সাতাত্তরপালা (স্থাপক) ১০.নব্বইভাগ (শূন্যক) ১১.নিরানব্বইনাম (স্থাপক) ও ১২.শতদল (শূন্যক)। (৪০ + ১২ = ৫২)। এ ৫২ সংখ্যামূলককেই ৫২ কুঠরি বলা হয়। অথবা দেহের ২০ আঙুল ও ৩২ দাঁতের সমষ্টি ৫২ কে একত্রে রূপক সাহিত্যে ৫২ পণ্যার বলা হয়।
৫. নয়দুয়ার কী কী? (What is nine doors?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে মানবদেহের বাহ্য ৯টি দ্বারকে একত্রে নয়দুয়ার বলা হয়। ৯টি দ্বার হলো- দুই চোখ, দুই কর্ণ, নাসিকার দুই ছিদ্র, মুখ, জলদ্বার ও পায়ু।
৬. কোন্ খুপরি ঘরে কাঁই বাস করেন? (What shack room Lord live in?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠরূপ ছোট স্বর্গীয়ঘরকে খুপরি ঘর এবং জীবের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ খুপরি ঘরেই কাঁই বসবাস করেন।
৭. ইঙ্গিত কী? (What is Indication?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যে কোন সংকেতকেই ইঙ্গিত বলা হয়। স্বর্গীয়বাণীগুলো হলো- ১.চিত্র, ২.চিন্তা, ৩.কম্পন ও ৪.স্পন্দন, ৫.তাপ, ৬.চাপ ও ৭.চুম্বক ইত্যাদি।
৮. অধরা ধরা যায় কিভাবে? (How to catch the elusive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে সাঁই ও কাঁইকে অধর বলা হয়। একজন পাকা সাধকগুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করে ঊর্ধ্বরেতা সাধন শিক্ষা করলেই কেবল অধর ধরা যায়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

‘দেহ’ (পৃথিবী দ্বিতীয় পর্ব)

৩৪/১. পৃথিবী
World (ওয়ার্ল্ড)/ ‘عالم’ (আলম)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপক পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘দেহ’, উপমান পরিভাষা ‘অশ্ব, কানন, গাড়ি, ঘোড়া, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘বপু ও ভুবন’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয়’
পৃথিবী (রূপ)বি ধরণী, ধরিত্রী, অবনী, ক্ষিতি, মহী, জগৎ, মেদিনী, বসুমতী, বসুন্ধরা, ভূমণ্ডল world, ‘عالم’ (আলম) (আবি) দেহ, খাঁচা, ধড়, পিঞ্জর, body, horse, জাসাদ (.ﺠﺴﺪ), বদন (.ﺒﺪﻦ), ‘ﻔﺮﺱ’ (ফারাস) (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবারের ‘রূপক পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সূর্যের তৃতীয় নিকটতম গ্রহকে পৃথিবী বলা হয় ২.রূপক সাহিত্যে মানব দেহকে রূপকার্থে পৃথিবী বলা হয় (ছনা) দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয় (চাপ) বপু ও ভুবন (উপ) অশ্ব, কানন, গাড়ি, ঘোড়া, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি (রূ) পৃথিবী (দেত) দেহ।
পৃথিবীর ১টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (A highly important quotations of world)
“ত্রিশহরফে কুরান লেখা, কে তা বুঝেছে, হরফের মানে বুঝলে, পৃথিবীর ভেদ পাবে” (পবিত্র লালন- ৬৯০/২)।
পৃথিবীর সংজ্ঞা (Definition of world)
সূর্যের তৃতীয় নিকটতম গ্রহকে পৃথিবী বলে।
পৃথিবীর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of world)
রূপক সাহিত্যে মানব দেহকে রূপকার্থে পৃথিবী বলে।
পৃথিবীর প্রকারভেদ (Classification of world)
পৃথিবী দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান পৃথিবী ও ২.উপমিত পৃথিবী।
১. উপমান পৃথিবী (Analogical world)
সূর্যের তৃতীয় নিকটতম গ্রহকে উপমান পৃথিবী বলে।
২. উপমিত পৃথিবী (Compared world)
রূপক সাহিত্যে মানব দেহকে উপমিত পৃথিবী বলে।
পৃথিবীর পরিচয় (Identity of world)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবারের অধীন একটি ‘রূপক পরিভাষা’ বিশেষ। বিশ্বের এমন কোন শাস্ত্রীয় দর্শন নেই যে ‘পৃথিবী’ নামক এ পরিভাষাটির ব্যবহার নেই। বলতে গেলে এ রূপক পরিভাষাটির ব্যবহারই সর্বাধিক। রূপক সাহিত্যে সর্বদা উপমান পরিভাষা ব্যবহার করে উপমিতপদের আলোচনা করা হয়। সে জন্য পাঠক শ্রোতাদের ‘উপমিতি’ জানা প্রয়োজন। এ ছাড়াও ‘নরত্বারোপ’ বিদ্যা জানাও অধিক প্রয়োজন। শক্ত করেই বলা যায় সারা বিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় দর্শনের গল্প-কাহিনী ও পারম্পরিক সাধক-সাধিকাদের অলৌকিককার্যাদি জানা ও বুঝার জন্য অবশ্যই ‘উপমিতি’, ‘নরত্বারোপ’ ও ‘বৈক্তিকসদস্য সারণী’ জানা ও বুঝা অতীব প্রয়োজন। ওপরোক্ত উপমিতিবিদ্যা দ্বারাই দেহকে পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করে, পৃথিবীকে দেহের উপমানপদ নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে পৃথিবী উপমান এবং দেহ উপমিত পদ। তবে রূপক সাহিত্যে কোথাও কোথাও পৃথিবী সৌরজগতের জ্যোতিষ্করূপেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন- “পৃথিবী গোলাকার জানি, দিবানিশি ঘুরে আপনি, তাই তো হয় দিনরজনী, জ্ঞানীগুণী তা মানে” (পবিত্র লালন- ৪৩৭/২)
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

দেহ (প্রথম পর্ব)

৩৪. দেহ
Body (বডি)/ ‘جسم’ (জেসিমা)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলক-পরিবারের অন্যতম একটি ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘দেহপরিবার’ প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘পৃথিবী’, উপমান পরিভাষা ‘অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘বপু ও ভুবন’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয়’। এটি একটি ‘উপমান-প্রধান’ মূলক।
দেহ বি খাঁচা, ধড়, পিঞ্জর, body, corpus, physique, substance, trunk, organism, ‘جسم’ (জেসিমা), বদন (.ﺒﺪﻦ) (আল) কংকাল, কলেবর (আবি) ১.উষ্ট্র, ঘোড়া, নদীয়া, নবদ্বীপ, পাহাড়, ব্রহ্মা্ণ্ড, হাতি ২.কল্পতরু, কল্পদ্রুম, কল্পবৃক্ষ (ইপ) world (আপ) আলম (.ﻋﺎﻠﻡ), ক্ববর (.ﻘﺑﺮ), জাহান (ফা.ﺠﻬﺎﻦ), ফিল (.ﻔﻴﻞ), মিসর (.ﻤﺻﺮ), মুলুক (.ﻤﻟﻚ), শাজারা (.ﺸﺠﺮﺓ) (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবার প্রধান ও রূপক সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) জীবের স্থূল আকারকে দেহ বা রূপকার্থে রথ বলা হয় (ছনা) দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয় (চাপ) ‘বপু ও ভুবন’ (উপ) অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি (রূ) পৃথিবী (দেত) দেহ
দেহের সংজ্ঞা (Definition of body)
জীবের স্থূল আকারকে দেহ বলে।
দেহের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of body)
আত্মা, জ্ঞান ও মন বহনকারী জীবন্ত কাঠামোকে দেহ বলে।
দেহের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন (Short Reports of the ‘Body’Wink
মূলক = দেহ
রূপক = পৃথিবী
উপমান = অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি
চারিত্রিক = বপু ও ভুবন
ছদ্মনাম = দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয়
দেহের আভিধানিক, রূপক, উপমান, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষা তুলে ধরা হলো-
মূলক সদস্যঃ দেহ।
আভিধানিক প্রতিশব্দঃ অঙ্গ, অবয়, অবয়ব, আকার, আকৃতি, কঙ্কাল, কলেবর, কায়, কায়া, গা, গাত্র, ঠাট, তনু, ধড়, রূপ, শরীর ও স্থূলদেহ।
রূপক পরিভাষাঃ পৃথিবী।
উপমান পরিভাষাঃ অগ্নিগিরি, অদ্রি, অশ্ব, উষ্ট্র, উষ্ট্রী, ঐরাবত, কানন, খাঁচা, গজ, গাছ, গাড়ি, গিরি, গাঁ, গৃহ, গেরাম, গ্রাম, ঘড়ি, ঘর, ঘোড়া, জাহাজ, ঝি, টিলা, ডোঙ্গা, তরণী, তরান্ধু, তরিত্র, তরী, তরু, দেশ, ধরণী, ধরা, ধাম, নাও, পর্বত, পাঠমন্দির, পাঠশালা, পাহাড়, পিঞ্জর, পুস্তক, বন, বাটী, বাড়ি, বিদ্যাপীঠ, বিদ্যালয়, বৃক্ষ, ভবন, ভিটা, ভূমি, ভেলা, মঠ, মাটি, মেঘ, যান, রাজ্য, রাষ্ট্র, শকট ও হাতি।
চারিত্রিক পরিভাষাঃ অত্রি, ইরা, গান্ধার, গিরিরাজ, জীমূত, জম্বু, তক্ষ, দশবল, দশরথ, দ্রুম, নগেন্দ্র, নিখিল, পল্লব, পৃথ্বী, বদর, বপু, বলাহক, বসুমতী, বিপিন, বিমান, ভুবন, মান্দাস, মেঘলা, মেদিনী, মেদেনী, শমি ও শৈলেন।
ছদ্মনাম পরিভাষাঃ অংশকলা, অবনি, অভ্র, অম্ভোজ, অম্ভোদ, অরণ্য, অর্ণবতরী, অর্ণবপোত, অর্ণবযান, অর্ধনারীশ্বর, অশ্বযান, আখড়া, আদল, আদিপুরাণ, আপণ, আবাস, আয়ুর্বেদ, আসন, উইঢিবি, উট, উটজ, উড়্ণ্তপা, উড়োজাহাজ, উপনিষদ, উপপুরাণ, উপবেদ, ঋক্ষ, ঋগবেদ, কঠোপনিষদ, কদম, কল্পগিরি, কল্পতরু, কল্পদ্রুম, কল্পবৃক্ষ, কল্পলতা, কাননিকা, কারাগার, কারাগৃহ, কাষ্ঠপুত্তল, কাষ্ঠপুত্তলিকা, কাষ্ঠফলক, কাষ্ঠমঞ্চ, কাষ্ঠাসন, কুটির, কুটজ, কুলায়, কুলায়িকা, কুশপুত্তলিকা, কুসুমকানন, কোশল, ক্রন্দ, ক্রৌঞ্চদ্বীপ, ক্ষিতি, ক্ষিতিধর, ক্ষিতিভৃৎ, ক্ষোণী, খাঞ্চা, গিরিবর, গৈরেয়, ঘন, চতুর্দশভুবন, চরা, চরাচর, চাঁদোয়া, চিত্রকূট, চৌদ্দহাতী, ছত্র, ছত্রশালা, ছায়াতরু, জগ, জগৎ, জগৎসংসার, জগন্মণ্ড, জগমণ্ডল, জঙ্গল, জনপদ, জনপাদ, জম্বুদ্বীপ, জলদ, জলধর, জলমুখ, জীবলোক, জীবালয়, ঝর্ঝরিক, টাপু, তনুয়া, তপোবন, তরুবর, তরুরাজ, তৃণকুটির, তোয়দ, তোয়ধর, ত্রিদশালয়, ত্রিদিব, দশকুশী, দশকোষী, দশচক্র, দশমূল, দশাক্ষর, দশার্ণদেশ, দে, দেবপুরী, দেবলোক, দেবালয়, দেয়া, দেহপিঞ্জর, দেহভাণ্ডার, দ্রবিড়, ধরতি, ধরাতল, ধরাধর, ধরাধাম, ধরিত্রী, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মপুস্তক, ধর্মশাস্ত্র, নগ, নগপতি, নগরাজ, নগাধিপ, নগাধিপতি, নগাধিরাজ, নদে, নয়দুয়ারী, নরযান, নরলোক, না (নৌকা), নিত্যগোলক, নিত্যপুরী, নিদর্শনপাহাড়, নিরুক্ত, নৃলোক।
পঞ্চগড়, পঞ্চবটী, পয়োমুখ, পর্ণ, পর্ণকুটির, পর্ণশয্যা, পর্ণশালা, পর্ণী, পর্বতকন্দর, পর্বতপতি, পল্লবী, পল্লি, পশার, পশুশালা, পাঞ্চাল, পাড়া, পাদপ, পান্থপাদপ, পাপতরণী, পার্গু, পীঠস্থান, পুথি, পুরাণ, পুস্তকাগার, পুস্তকালয়, পুস্তিকা, প্রতীক, প্রবালদ্বীপ, প্রাণীজগৎ, প্রাসাদ, প্রেমঘড়ি, প্রেমডালি, প্রেমতরণী, প্রেমনৌকা, বঙ্গ, বদরি, বদরিকা, বনানী, বসতবাটি, বসতবাড়ি, বসতভিটা, বসুধা, বসুন্ধরা, বস্তি, বস্ত্রকুটির, বস্ত্রগৃহ, বস্ত্রাবাস, বাজি, বাঞ্ছাকল্পতরু, বাটিকা, বারদুয়ারি, বারিতস্কর, বারিরথ, বালুচর, বাসা, বাস্তু, বিটপী, বিদ্যামন্দির, বিশ্ব, বিশ্বকোষ, বিশ্বচরাচর, বিশ্বজগৎ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভুবন, বিশ্বসংসার, বিশ্বসাহিত্য, বিষবৃক্ষ, বৃহৎবৃন্দাবন, বেদ, বেদান্ত, বেশ্ম, বৈদ্যশাস্ত্র, বোধিদ্রুম, বোধিবৃক্ষ, ব্যোমযান, ব্রজ৩, ব্রহ্মাণ্ড, ভব, ভবতরী, ভবধাম, ভবলোক, ভারতবর্ষ, ভিটে, ভুঁই, ভূ, ভূতময়, ভূতাবাস, ভূধর, ভূভৃৎ, ভূবলয়, ভূমণ্ডল, ভূলোক, ভূমিরুহ, ভূমীরুহ, ভূর্লোক, ভেদবিদ্যালয়, ভোগায়তন, মণিকুট্টিম, মনুষ্যলোক, মনুসংহিতা, মন্দির, মরুজাহাজ, মরুসাগর, মর্ত্য, মর্ত্যধাম, মর্ত্যভূমি, মর্ত্যলোক, মলয়পর্বত, মলয়াচল, মলয়াপর্বত, মহাকাব্য, মহাকাশবিমান, মহাচ্ছায়, মহাদেশ, মহাপুরাণ, মহাবন, মহাভারত, মহামৃগ, মহাযান, মহারণ্য, মহারথ, মহারাষ্ট্র, মহাশূন্যযান, মহি, মহী, মহীতল, মহীধর, মহীরুহ, মাচা, মাচান, মাচিয়া, মাতঙ্গ, মতামহ, মাতুলালয়, মুরৎ, মূরতি, মূর্তিমন্ত, মূর্তিমান, মৃৎপাত্র, মৃৎভাণ্ডার, যজুর্বেদ, যাববাহন, যোগবাশিষ্ট, রজতগিরি, রথ, রাসমণ্ডল, রূপরেখা, লালদালান, লোক, শক্রবাহ, শরণদ্বীপ, শাখী, শাস্ত্র, শিখরী, শিবির, শৈল, সংসার, সংহিতা, সদ্ম, সমাধি, সমাধিক্ষেত্র, সমাধিস্থল, সমাধিস্থান, সাম্রাজ্য, স্থান, স্বর্গালয়, স্বগৃহ, স্বগ্রাম, স্বর্ণপিঞ্জর, স্বর্ণপ্রতিমা, হরাদ্রি, হরিণবাড়ি, হস্তিনাপুর, হস্তী ও হিরণ্যদা।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি।
৩৪. দেহ, Body (বডি) ‘جسم’ (জেসিমা)
৩৪/১. পৃথিবী , World (ওয়ার্ল্ড) ‘عالم’ (আলম)
৩৪/২. অশ্ব , Horse (হর্স) ‘ﻔﺮﺱ’ (ফারাস)
৩৪/৩. কানন, Garden (গার্ডেন) ‘ﺒﺴﺘﺎﻦ’ (বুস্তান)
৩৪/৪. গাড়ি, Carriage (ক্যারিজ) ‘عَرَبَة’ (আরাবা)
৩৪/৫. জাহাজ, Ship (শিপ) ‘سفينة’ (সফিনা)
৩৪/৬. তরী, Yawl (ইওল) ‘قارب’ (ক্বারিবা)
৩৪/৭. পাহাড়, Mountain (মাউনটেন) ‘ﺠﺒﻞ’ (জাবালা)
৩৪/৮. বৃক্ষ , Plant (প্ল্যান্ট) ‘نبات’ (নুবাত)
৩৪/৯. হাতি, Elephant (এলিফেন্ট) ‘ﻔﻴﻝ’ (ফিল)
৩৪/১০. বপু , Bulk (বাল্ক) ‘السائبة’ (আসসাবিয়া)
৩৪/১১. ভুবন, Globe (গ্লোব) ‘كون’ (কাওয়ান)
৩৪/১২. দেবালয়, Sanctum (সেঙ্কটাম) ‘معتكفه’ (মু’তাকিফাহ)
৩৪/১৩. বিশ্ব, Microcosm (মাইক্রোজিম) ‘مصغرا’ (মুসাগারাং)
৩৪/১৪. ব্রজ , Flesh (ফ্ল্যাস) ‘الجسد’ (আজজেসেম)
৩৪/১৫. মন্দির , Temple (টেম্পল) ‘معب د’ (মুয়াব্বাদ)
৩৪/১৬. রথ, Chariot (ক্যারিয়ট) ‘مركبة’ (মুরাক্কাবা)
৩৪/১৭. শাস্ত্র , Scripture (স্ক্রিপচার) ‘شريعة’ (শরিয়া)
৩৪/১৮. স্বর্গালয়, Eden (ইডেন) ‘عدن’ (আদন)
দেহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of body)
১. “আত্মা নামিবে ভুবনে হইলে মিলন সুদিন সুজনে, দেহ ভাঙ্গিয়া গড়িবে যেদিন, সে দিনটি রেখ স্মরণে (বলন তত্ত্বাবলী- ১১)
২. “আরবিতে যাকাতের মানি, এ দেহের নির্যাস মণি, অটলে পায় স্বরূপখনি, যার যার দিব্যজ্ঞানে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৭৬)
৩. “চৌদ্দপোয়া দেহের গড়ন, ধরতে যদি পারো লালন, তবে স্বদেশী চলন, জানবি দিব্যজ্ঞান অনুসারে” (পবিত্র লালন- ৭৯৭/৪)
৪. “দেহের খবর বলি শোনরে মন, দেহের উত্তর দিকে আছে বেশি দক্ষিণেতে কম” (পবিত্র লালন- ৫৫০/১)
৫. “পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন, তাতেই পিতার পুনর্জনম, সুধা শুক্রে দেহের গঠন, আলেকরূপে ফিরে সদায়” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/২)
৬. “সাঁই মিলে গুরু ভজনে, চৌদ্দতলা দেহভুবনে, বিনয় করে বলন ভনে, যারা মরার আগে মরে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪১)
দেহের প্রকারভেদ (Classification of body)
দেহ দুই প্রকার। যথা- ১.নরদেহ ও ২.নারীদেহ।
১. নরদেহ (Male body)
শিশ্নচিহ্নধারী দেহকে নরদেহ বলে।
এ বিষয়টি নিয়ে নরদেহ মাত্রিকায় সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।
২. নারীদেহ (Female body)
ভগচিহ্নধারী দেহকে নারীদেহ বলে।
এ বিষয়টি নিয়ে নারীদেহ মাত্রিকায় সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।
দেহের উপকার (Benefits of body)
১. দেহের দ্বারা মন ও জ্ঞানের বিকাশসাধন হয়।
২. এটি জীব প্রজাতির পরিচয় বহন করে।
৩. এটি জীবের আহার্যরূপে ব্যবহার হয়।
৪. এর চর্ম ও হাড় ব্যবহারিক দ্রব্যাদি প্রস্তুতে ব্যবহার করা যায়।
দেহ গঠনের উপাদান (Body building components)
অধিকাংশ আত্মতাত্ত্বিক সুমহান মনীষীদের মতে মানবদেহ মোট আঠারটি বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত। এ আঠারটি সদস্যকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।
যেমন- পিতার চারসদস্য, মাতার চারসদস্য এবং প্রকৃতির দশসদস্য।
পিতার চারসদস্য (Four members of father)
১.হাড় ২.হৃদরা ৩.শুক্র ও ৪.ঘিলু।
মাতার চারসদস্য (Four members of mother)
১.চুল ২.চামড়া ৩.মাংস ও ৪.চর্বি।
প্রকৃতির দশসদস্য (Ten members of nature)
১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহবা ৫.ত্বক ৬.বাক্ ৭.পাণি ৮.পাদ ৯.পায়ু ও ১০.উপস্থ।
হুর 3
দেহের পরিচয় (Identity of body)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবারের ‘মূলকসদস্য’ বিশেষ। জীবের আত্মা, মন ও জ্ঞানধারণকারী আধারকে দেহ বলা হয়। প্রতিটি জীবের মাথা হতে লেজ বা পায়ের নখ পর্যন্ত পুরো অংশকে একত্রে দেহ বলা হয়। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিষয়বস্তু, অবস্থা ও শক্তিগুলোকে রূপকসাহিত্যে প্রতীতি, দৈবিকা, জ্যোতিকা, দেবতা ও সুর বলা হয়। অর্থাৎ আরবি ভাষায় ‘ﻤﻟﻚ’ (মালাকা), ফার্সিভাষায় ‘ﻔﺮﺸﺗﻪ’ (ফেরেস্তা) এবং ইংরেজি ভাষায় angel বলা হয়। আত্মদর্শনের রিপু, রুদ্র ও দশার সদস্যদের অসুর এবং অন্যান্য সব সদস্যদের সুর বলে রূপকসাহিত্যে বিবেচনা করা হয়। দেহের সব সদস্যকে একত্রে সুরাসুর বলে। রূপক সাহিত্যের অসংখ্য প্রতীতি ও দৈবিকার আবাস্থল এ মানবদেহ। এ জন্য মানবদেহকে দেবপুরী বা দেবধাম বা দেবালয় বা স্বর্গপুরী ইত্যাদি বলা হয়। ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হরি, নিতাই, রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, শিব, কালী ও মহাদেবসহ রূপক সাহিত্যের সর্ব প্রকার কল্পিত প্রতীতি বা দৈবিকা ও উপাস্যগণ এ মানবদেহেই বাস করেন। তদ্রূপ আরব-বিশ্বের আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ), রাসুল (ﺭﺴﻮﻝ), আদম (ﺁﺪﻢ), জিন (ﺠﻥ) ও জান্নাতসহ (ﺠﻨﺔ) রূপক সাহিত্যের সর্ব প্রকার রূপকচরিত্র ও উপাস্যগণ এ মানবদেহেই বাস করেন। দেহকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। ১.আকাশ ২.ভূমি ও ৩.পাতাল। আকাশ- নাভি হতে ঊর্ধ্বাঙ্গকে আকাশ ধরা হয়। ভূমি- নাভি হতে নিম্নাঙ্গকে ভূমি ধরা হয়। পাতাল- জঠর বা গর্ভাশয়কে পাতাল ধরা হয়। গর্ভাশয়রূপ এ পাতালেই বাংভারতীয় রূপক সাহিত্যের ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এবং আরবীয় রূপক সাহিত্যের আল্লাহ ও রাসুল অবতরণ করেন। একজন সুবিজ্ঞ সাধকগুরুর সহচার্য গ্রহণ করে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু বা আল্লাহ ও রাসুলের সন্ধান করতে হয়।
দেহ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের রচিত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ (১ম খণ্ড) গ্রন্থটি পাঠ করতে পারেন। কারণ উক্ত গ্রন্থটির মধ্যে কেবল মানবদেহ, দেহ সৃষ্টি ও দেহের ক্রমবিকাশ নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের আলোচ্য এ দেহই হলো রূপক সাহিত্যের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেহ নামক এ বিশ্ববিদ্যালয় যিনি একবার উত্তরণ করেন তিনিই বিশ্ববিখ্যাত মহামানবরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। আমাদের এ আত্মদর্শনেই রূপক সাহিত্যের সব উপাদন অবস্থিত। এ আত্মদর্শনের মূলক, রূপক, ব্যাপক, উপমান ও সংখ্যাসূত্রাদির সাহায্যে বিশ্বের সব শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও পারম্পরিক গ্রন্থ গ্রন্থিকা নির্মিত হয়েছে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে, কুবৃক্ষে সুফল পেয়েছে, আমার মনের ঘোর গেল না” (পবিত্র লালন- ৮২৮/৩)। অর্থাৎ যে কোন লোক একবার আত্মতত্ত্ব ভালোভাবে জেনে নিলেই তিনি দিব্যজ্ঞানী হয়ে যান। অর্থাৎ বিশ্বের সব শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিকজ্ঞান কেবল ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ অর্জন করার দ্বারা অর্জন করা যায়।
সাধারণত সারা সৃষ্টি জগৎকে বিশ্ব বলা হয়। তবে রূপক সাহিত্যে কেবল মানবদেহকে বিশ্ব বলা হয়। আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা বলে থাকেন- “বিশ্ব একটি বৃহত্তম মানুষ এবং মানুষ একটি ক্ষুদ্রতম বিশ্ব।” অর্থাৎ মানুষ বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রূপ এবং বিশ্ব মানুষের বৃহত্তম রূপ। আর এ সূত্র ধরেই আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মুখে শুনতে পাওয়া যায়- “যা আছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে মানবভাণ্ডে।” এরূপ কথা পবিত্র কুরানেও স্পটতই উল্লেখ আছে। যথা- “ وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ(২০) وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ(২১)”- উচ্চারণঃ “ওয়া ফিল আরদি আয়াতুল্লিল মুক্বিনিনা (২০) ওয়া ফি আনফুসিকুম, আফালা তুবসিরুন (২১)।” অর্থঃ “বিশ্বাসিদের জন্য পৃথিবীর যত নিদর্শন, তোমাদের মধ্যেই রয়েছে- তোমরা কর না দর্শন।” আধ্যাত্মিক প্রবাদটি হলো- “যা আছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে মানবভাণ্ডে।”
আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু তথ্যঃ (Some information of Modern science)
১. একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তের পরিমাণ তার মোট ভরের ১৩ ভাগের ১ ভাগ।
২. দেহে অম্লজান বহনকারী লোহিত রক্ত কণিকা ২৫০০ কোটি। এরা চার মাস বাঁচে।
৩. দেহে রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্ত কণিকা ২৫০ কোটি এবং এরা অর্ধদিন বাঁচে।
৪. একস্থান হতে আরম্ভ করে ঐ স্থানে ফিরে আসতে একটি রক্ত কণিকার ১ লক্ষ কি.মি পথ অতিক্রম করতে হয়। তা পৃথিবী ৭ বার অতিক্রম করার সমান।
৫. দেহের শিরাকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর ভূমির প্রয়োজন হবে।
৬. দেহের স্নায়ুতন্ত্র এত লম্বা যে তা দ্বারা পৃথিবী ৭ বার পেচানো সম্ভব।
৭. অনুভূতি স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে পরিবাহিত হয়।
৮. মনে অনুভূতির উদয় হলে তা মস্তিষ্কে পৌঁছতে ০.১ সেকেন্ড সময় লাগে।
৯. মানব সন্তান জন্মের সময় তার দেহে হাড় থাকে ৩৫০টি।
১০. ৭০ বছর বয়সী একজন মানুষ সারা জীবনে ৪০ হাজার লিটার মূত্র ত্যাগ করে।
১১. প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দেহের চামড়ার পরিমাণ ২০ বর্গফুল।
১২. মানুষের দেহের চামড়ার ওপরে লোম থাকে প্রায় ১ কোটি।
১৩. একজন মানুষের শরীরে যে পরিমাণ চর্বি থাকে তা দ্বারা ৭টি বড় কেক প্রস্তত করা যাবে।
১৪. মানবদেহে ৬৫০টি পেশি আছে। কেবল মুখেই ৩০টি পেশি আছে। হাসার সময় ১৫টিরও অধিক পেশি সক্রিয় হয়। কোন কোন কাজের সময় ২০০টিরও অধিক পেশি সক্রিয় হয়।
১৫. মস্তিষ্ক ১০ হাজার ঘ্রাণ চিনতে ও মনে রাখতে পারে।
আলোচ্য মূলকের রূপক ও ব্যাপক পরিভাষাদি নিচে আলোচনা করা হলো।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কাঁই কাঁইরে (মজার) (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী) (ষষ্ঠ পর্ব)

৪. কাঁই কাঁইরে (মজার)
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
——————————————————–
“কাঁই কাঁইরে (মজার)
খাল কেটেছে ভারি কৌশলে
একবিন্দু জল নাইরে খালে
কাপড় ভিজে ঝাঁপ দিলে।
আকাশে হয় ভাটা জোয়ার
কূল ভাঙ্গে পাতালে তার
ঢাকানগরের অবাক ব্যাপার
টার্মিনাল মহাখালে।
সাড়েনয় ক্রোশ গভীর খালে
আট আঙ্গুলি বৈঠা ফেলে
সুরসিক সব যায়রে কূলে
অরসিক ডুবে জলে।
দেখে খালের তর্জনগর্জন
কত সাধক হয় অচেতন
ভাবিয়া কয় কাঁইজি বলন
দৌড় মারে সকল ফেলে।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, উপমহাদেশের বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক লেখক, শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের সার্থক উত্তরণকারী, বিশিষ্ট সংস্কারক এবং বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এখানে স্বর্গধামের উল্লঙ্ঘনীয় বৈতরণীর অত্যন্ত চমৎকার রূপক বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। কাঁইজি বলেছেন কাঁই অত্যন্ত চমৎকারভাবে স্বর্গীয়খাল বৈতরণী নির্মাণ করেছেন। এ নদীটি সাধারণত জলশূন্য থাকে। এ জন্য সাবধানে গাহন করলে জল স্পর্শও করে না এবং কাপড়ও ভিজে না কিন্তু তড়িঘড়ি বা তাড়াতাড়ি নামতে গেলে সবারই সলিলসমাধি সুনিশ্চিত। তাই কাঁইজি যথার্থই বলেছেন “সুরসিক সব যায়রে কুলে, অরসিক ডুবে জলে।” স্বর্গীয়ন দীটির রূপক বর্ণনা তুলে ধরতে গিয়ে কাঁইজি বলেছেন এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী নদী কারণ এর একপাড়ে জোয়ার হলে অপরপাড় প্লাবিত হয়ে থাকে। আরো স্মরণীয় যে সব নদীর পাড়ে থাম্বার থাকে কিন্তু এ নদীর মাঝখানে থাম্বার অবস্থিত।অতঃপর কাঁইজি বলেছেন এ নদীটির দৈর্ঘ্য সাড়ে নয়ক্রোশ এবং এর মানবযানের বৈঠা মাত্র আট আঙুলি। এর তর্জনগর্জন দেখে অনেক জ্ঞানীই অত্যন্ত ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। অনেকে আবার সংসার, সমাজ ও সম্পদাদি পরিত্যাগ করে বৈরাগীব্রতও গ্রহণ করে থাকেন। তবে কাঁইজি বলেছেন কেবল সুরসিকরাই এ নদীতে প্রাণভরে সন্তরণ করতে পারেন কিন্তু অরসিকরা সবাই ডুবে মরেন।
আত্মদর্শন (Theosophy) বা আত্মতত্ত্ব (Theology)
অত্রকাব্যে কাঁইজি বৈতরণীকে কাঁইয়ের সুকৌশলে কাটা অদ্ভূতখাল বলে অভিহিত করেছেন। এর দৈর্ঘ্য সাড়ে নয়ক্রোশ দ্বারা মানবদেহের সাড়ে নয়দ্বার বুঝানো হয়েছে। যেমন মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “নিচে ওপর সারি সারি, সাড়েনয় দরজা তারি, লালন কয় যেতে পারি, কোন্ দরজা খুলে ঘরে” (পবিত্র লালন- ৫৫৭/৪)। আট আঙুলি বৈঠা দ্বারা বিম্বলের দৈর্ঘ্যকে বুঝানো হয়েছে। এর তর্জন-গর্জন দ্বারা চন্দ্রচেতনার প্রবল উচ্ছ্বাস বুঝানো হয়েছে। কেবল ঊর্ধ্বরেতা সাধকরাই এ নদীর অপর তীরে উত্তীর্ণ হতে পারেন অপরদিকে টলরা নদীর ধারেই ডুবে মরেন। একজন পাকা সাধকের শরণাপন্ন হলে যে কেউই অনায়াসে নদী পার হতে পারেন। অন্যথায় বৈতরণী পার হওয়া বা অলোকধামে যাওয়ার কোন পথ নেই। তবে আশার আলো হচ্ছে একজন পাকা গোঁসাই-গুরুর শরণ গ্রহণ করলে এটি কিছুটা সহজ হয়।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
অচেতন, অরসিক, আকাশ, কাঁই, খাল, জোয়ার, টার্মিনাল, ঢাকা, ঢাকা-নগর, পাতাল, বৈঠা, ভাটা, মহাখাল, সুরসিক। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions and Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. কাঁইয়ের সুকৌশলে কাটা খাল কোনটি?
(Which is the artistically excavated canal of the Lord?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
ভূপৃষ্ঠের ওপর অবস্থিত খালাদি প্রকৃতিরূপ স্রষ্টার নির্মিত বা খননকৃত হলেও মানবদেহে অবস্থিত মহাখালটি কাঁইয়ের দ্বারা নির্মিত বা খননকৃত বলে রূপক সাহিত্যে প্রচলিত রয়েছে। ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট কামনদীকে কাঁইয়ের সুকৌশলে নির্মিত খাল বলা হয়।
২. জলহীন খালে নামলে কাপড় ভিজে কিভাবে?
(How clothes wet dismounted waterless canal?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈতরণীকে জলহীন খাল এবং শুক্রপাত করা অথবা কামরস নিঃসৃত হওয়াকে কাপড় ভিজা বলা হয়। বড় অবাক হওয়ার ব্যাপার এ যে, এ স্বর্গীয়খালে কখনই কোন প্রকার জল থাকে না অথচ যমযজ্ঞে রতো হওয়ার পর বিভিন্ন প্রকার রসের প্রবল প্রবাহ আরম্ভ হয়ে থাকে। এ হতেই রূপক সাহিত্যে জলহীন খালে নামলে কাপড় ভিজার কথা বলা হয়।
৩. আকাশে সংঘটিত জোয়ার-ভাটা কী? (What tides occur in the sky?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে আকাশ, বসিধার আগমনকে জোয়ার এবং বসিধার নিগমনকে ভাটা বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ আকাশে বসিধের আগমন ও নিগমন সংঘটিত হয় বলে রূপক সাহিত্যে আকাশে জোয়ার ভাটা সংঘটিত হওয়া বলা হয়।
4. পাতালে পাড় ভাঙ্গে কিভাবে?
(How to break the shore in the Hades?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে রজ প্রবাহকে জোয়ার, বৈকুণ্ঠকে আকাশ বা সাগর এবং বৈতরণীকে পাতাল বা ডাঙ্গা বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী আকাশের জোয়ার পাতালে প্রবাহিত হয়ে থাকে। পাড়ভাঙ্গা রূপক সাহিত্যের অলংকার মাত্র। জোয়ারের জলস্রোত কখনো উভয় পাড় প্লাবিত করে আবার কখনো একুল ভাঙ্গে ওকুল গড়ে আবার কখনো ওকুল ভাঙ্গে এ কুল গড়ে কিন্তু রূপক সাহিত্যে এরূপ বর্ণনা প্রায় বিরল।
৫. ঢাকার মহাখালির টার্মিনাল কোনটি?
(What is the terminal at Mohakhali of Dhaka?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ঢাকা এবং বৈতরণীকে মহাখাল বা রূপকার্থে টার্মিনাল বলা হয়। বর্তমান বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার মহাখালিতে বাস টার্মিনাল গড়ে উঠেছে বলে রূপক সাহিত্যে বৈতরণীকে ঢাকার টার্মিনালের সাথে উপমা নির্মাণ করা হয়ে থাকে। এছাড়াও বৈতরণী বা স্বর্গীয় গুপ্তখাল বা মহাখালটি চিরঢাকা বলে একে ঢাকার মহাখাল বলা হয়।
৬. সাড়ে নয় ক্রোশ গভীর খাল কোনটি?
(What is the nine and half krosa deep channels?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মানবদেহের মধ্যে অবস্থিত সাড়েনয় দুয়ারবিশিষ্ট স্বর্গীয়নদী বৈতরণীকে রূপক সাহিত্যে সাড়েনয় ক্রোশ দীর্ঘখাল বলা হয়। কিন্তু বৈতরণী প্রকৃতপক্ষে সাড়েনয় ক্রোশ নয় বরং এটি অষ্টক্রোশ বলেই বিশ্বের বিভিন্ন রূপকসাহিত্যে বর্ণিত রয়েছে। তবে এখানে আলংকারিক অর্থে বৈতরণীকে সাড়েনয় ক্রোশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
৭. আট আঙুলী লম্বা বৈঠা কী? (What is the eight fingers long oar?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে বৈঠা বলা হয় এবং এটি আট আঙুলি বলে একে আট আঙুলি বৈঠা বলা হয়। এ বৈঠা দ্বারা বেয়ে দেহরূপ তরীকে বৈতরণী অতিক্রম করাতে হয় বলে রূপক সাহিত্যে একে বৈঠা বলা হয়।
৮. সুরসিকের পার হওয়া কী?
(What is the crossing of good-humorist?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে অটলতা অর্জনকারী ঊর্ধ্বরেতাদের সুরসিক বলা হয়। অটলতা বা পারমিতা অর্জনকারীরা অনায়াসে বৈতরণী অতিক্রম করতে পারেন। বৈতরণী অতিক্রমণ করাকে রূপক সাহিত্যে পার হওয়া বলা হয়।
৯. অরসিকের ডুবে মরা কী?
(What is the drowning death of non-humorist ?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যমযজ্ঞে শুক্র নিয়ন্ত্রণ করতে অপারগদেরকে রূপক সাহিত্যে অরসিক এবং শুক্রপাত করাকে ডুবে মরা বলা হয়। অরসিকরা হাজার শ্বাস পর্যন্ত অটল থাকতে পারেন না। ফলে তারা বৈতরণী অতিক্রমণ করতেও পারেন না। টল হওয়ার কারণে অরসিকরা বৈতরণীর পাড়েই শুক্রপাতরূপ মরণ দ্বারা ডুবে যান।
১০. খালের তর্জনগর্জন দেখে অধিকাংশ লোক পালিয়ে যাওয়া কী?
(What the fleeing of most people to seeing bluster the canal?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈতরণীকে প্রবল খরস্রোতা ও প্লবতাহীন নদ বা খাল বলা হয়। কেবল পাকাসাধক ভিন্ন এ স্বর্গীয় নদ বা খালটি সাধারণ লোক অতিক্রম করতে পারে না। অর্থাৎ অটলসাধক ভিন্ন সবাই এ খালটি অতিক্রম করতে ভয় করে। এ জন্যই এখানে খালের তর্জনগর্জন দেখে সবার পালিয়ে যাওয়া বলা হয়েছে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

৬. আপন দেশের মধুরবাণী (অষ্টম পর্ব)

৬. আপন দেশের মধুরবাণী
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“আপন দেশের মধুরবাণী
গুরু আমায় শোনাও না
দেশবাসী কয় উল্টাকথা
সোজা করে শোনায় না।
নিশিতে সূর্য উদয় কোন দেশে
দিনে চাঁদের আলো আসে (গো)
চাঁদ-সুরুজ এক অক্ষে ভাসে
তাকালে কেউ দেখে না।
কোথায় নারী বাইরে পুরুষ ঘরে
এক নারী বহু পতি ধরে (গো)
দ- হয় পুরুষের পরে
যাবজ্জীবন জেলখানা।
কোথায় বিচারক হয় আসামী
আপন বিচার করেন আপনি (গো)
বলন কাঁইজি ভেদ না জানি
শুধালে কেউ বলে না।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি বলনটির মধ্যে বাংলাভাষায় আত্মতত্ত্ব ও আত্মদর্শনের শিক্ষাদীক্ষার চরম দৈন্যতার অনুপম চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষ করে এখানে উপমান ও উপমিতপদের বিষয়টি চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
বিশ্বের সব রূপক সাহিত্যে কেবল উপমান পদ ব্যবহার করা হয় পক্ষান্তরে প্রকৃতমূলক বা উপমেয় বা উপমিতপদ কোথাও ব্যবহার করা হয় না। এ বিষয়টি বিশ্বের অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষই জানেন না। এ জন্য রূপক সাহিত্য দ্বারা যুগেযুগে সর্বপ্রথম শিক্ষিতরাই বিভ্রান্ত হয়েছেন। তারপর সাধারণ লোক শিক্ষিত লোকদের অনুসরণ করতে গিয়ে মহাবিভ্রান্তির করালগ্রাসে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছেন। উল্লেখ্য উপমিতপদাদিই হলো প্রকৃত এবং উপমানপদাদি হলো রূপক। রূপক সাহিত্য রূপক পরিভাষা ও ছদ্মনাম পরিভাষা ব্যবহার করে লেখা হয়। একে উপমানপদ বলা হয়। অপরদিকে মূলক চিরকালই ঢেকে রাখা হয়। কিন্তু আত্মতত্ত্বজ্ঞানহীন নব্য শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত জ্ঞানপাপীরা রূপক পরিভাষা বা ছদ্মনাম পরিভাষা বা উপমান পদের উপমিতরূপটি অন্বেষণ না করে বা রূপক পরিভাষার মূলক উদ্ঘাটন না করে কেবল মনগড়াভাবে রূপক সাহিত্যের অনুবাদ, ব্যাখ্যা ও টীকা-টীপ্পনী নির্মাণ করে থাকেন। পরবর্তিকালে তা প্রাণঘাতি বা মরণঘাতি দর্শনের রূপ নেয়। মহাধীমান বলন কাঁইজি রূপক সাহিত্যে ব্যবহৃত কেবল উপমান পদের আলোচনা, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণাদিকেই দেশবাসীর উল্টা কথা বলে অভিহিত করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে ১.যে অর্থালংকারে উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয় তাকে উপমা বলে (রতীরণ) ২.মানবদেহের বিষয়বস্তু, শক্তি ও অবস্থাকে প্রকৃতির বিষয়বস্তু, শক্তি ও অবস্থার সাথে তুলনামূলক বর্ণনাকে আধ্যাত্মিক উপমা বা লৌকিকা বলা হয়। মূল বিষয়টি হলো- আত্মতত্ত্বভিত্তিক রূপকথার শিক্ষামূলক ছোটছোট গল্পকাহিনীকে উপমা বলা হয়। পারস্যের সুবিখ্যাত রূপকাররা তাদের উপমান পদাদিকে কোথাও কোথাও শরিয়ত (ﺸﺭﻴﻌﺖ), মাজাযি (ﻤﺟﺎﺯﻯ), তাশবিহ (আ.ﺘﺸﺒﻴﻪ), মুতাশাবিয়া (ﻤﺘﺸﺒﻊ), মিসাল (আ.ﻤﺜﺎﻝ), ইসতেয়ারা (ﺍﺴﺘﻌﺎﺮﺓ), কিনায়া (ﻜﻨﺎﻴﻪ), ইশারাত (ﺍﺸﺎﺮﺓ), তাওরিয়া (ﺘﻭﺭﻴﺔ) এবং আপা (আ.ﺍﻔﻮﺍﻩ) বলে অভিহিত করে থাকেন এবং এ সত্তাদি দ্বারা সৃষ্ট ছোটছোট গল্পকাহিনীকে তারা মু’জিঝা (আ.ﻤﻌﺠﺯﺓ) বলে থাকেন।
পক্ষান্তরে তারা তাদের উপমেয় বা উপমিত পদাদিকে কোথাও কোথাও মিনহায (ﻤﻨﻬﺎﺝ), হাক্বিক্বি (ﺤﻗﻴﻗﻰ), সরিহ (ﺼﺮﻴﺢ), মুহকাম (ﻤﺤﻜﻢ), তাবির (ﺘﻌﺒﻴﺭ), তা’বিল (ﺗﻌﻭﻴﻞ) ও এরফান (ﻋﺮﻔﺎﻦ) ইত্যাদি বলে অভিহিত করেছেন এবং এ সত্তাদি দ্বারা কখনই রূপক সাহিত্য নির্মাণ করা যায় না। এ জন্য তারাও কখনো এসব সত্তা দ্বারা রূপক সাহিত্য নির্মাণ করেননি। অন্যদিকে ইংরেজি ভাষায় রূপক পরিভাষাদিকে মিথ (myth), এ্যালিগরি (allegory), মেটাফোর (metaphor), ফকলোর (folklore) ও মিস্টিক (mystic) ইত্যাদি বলা হয় এবং এসব রূপক পরিভাষা দ্বারা নির্মিত সাহিত্যকে ইংরেজি ভাষায় ‘mytholog’ (মিথোলজি) বলা হয়।
তদ্রূপ বাংলা ভাষায় উপমা, তুলনা, সাদৃশ্য, উদাহরণ, দৃষ্টান্ত, রূপক, ছদ্ম, কৃত্রিম ও অপ্রকৃত ইত্যাদিকে লৌকিকা, জনশ্রুতি, গুজব, রটনা, জনরব, কিংবদন্তি, চমৎকার, ছোটকি, প্রপক ও লৌকসত্তা বলে অভিহিত করা হয়। তবে এককথায় একে চমৎকার বলে অভিহিত করা হয়। এগুলো সঠিকভাবে বুঝতে না পারা হতেই আমাদের সমাজে সর্বাধিক জ্ঞানান্ধতা, শাস্ত্রীয় অন্ধবিশ্বাস, শাস্ত্রীয় অনুরাগ, আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হয়ে থাকে। অত্র কাব্যে কাঁইজি একেই দেশবাসীর উল্টা কথা বলে অভিহিত করেছেন। অতঃপর কাঁইজি বলেছেন রূপক বর্ণনার ধারা অনুযায়ী একটি অচেনা উপমেয় গোপন দেশ আছে। সেখানে নিশিতে সূর্য দৃশ্যমান হয় এবং দিবসে চন্দ্র দৃশ্যমান হয়ে থাকে। সেদেশে রবি ও শশী একটি অক্ষ দ্বারাই চলাফেরা করে। উপমানবাদীরা কেউই তা অনুধাবন করতে পারেন না।
কাঁইজির মতে সেদেশে নারীরা বাইরে এবং পুরুষরা ঘরে থাকেন। তারপরও পাপের দণ্ড পুরুষের ওপরই হয়ে থাকে। সেটাও হয় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। অত্র কাব্যে কাঁইজি আরো বলেছেন সেদেশে বিচারকই বিবাদী এবং যার বিচার তিনিই করে থাকেন। কাঁইজি এখানে উপমার চাদর দ্বারা উপমিত পদাদি ঢেকে রেখে পুরো বর্ণনাটি উপস্থাপন করেছেন। উপমান ও উপমিত পদের ব্যাপারে ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করা ব্যতীত কেউই এরূপ রূপককাব্যের সঠিক মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেন না। রূপক সাহিত্যাদি পাঠ করা ও প্রচার করার পূর্বে সব গবেষক, অনুবাদক, ব্যাখ্যাকার, টীকাকার ও টীপ্পনীকারদের অবশ্যই সাহিত্যের উপমান ও উপমিত পদ সম্পর্কে ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করা একান্ত প্রয়োজন।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)
/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
আসামী১, আসামী২, কাঁই, কাঁইজি। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. আপনদেশ কী? (What is the native land?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে নিজের জন্মভূমিকেই আপনদেশ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে আত্মতত্ত্বজ্ঞানের স্তরকেই কেবল আপনদেশ বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী আত্মতত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী ব্যক্তিকেই আপন দেশের মানুষ বলা হয়।
২. উল্টাকথা কী? (What is the reversed-saying?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যে কোন প্রকার তেড়া কথাকেই উল্টাকথা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রূপকের আড়ালে মূলক লুকিয়ে রেখে আলোচনা করাকে উল্টাকথা বলা হয়।
৩. নিশি কী? নিশিতে সূর্যোদয় হয় কিভাবে?
(What is the nightlife? How to Sunrise in the nightlife?))
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে রাত্রিকেই নিশি বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজস্বলা রমণীদের রজকালকে নিশি এবং পবিত্রকালকে দিবস বলা হয়। সাধারণত রাতকে নিশি এবং সৌরম-লের প্রধানতম জ্যোতিষ্ককে সূর্য বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজকালকে নিশি এবং কাঁইকে সূর্য বলা হয়। দেহবিশ্বে ছয় প্রহরে একদিন এবং তিন প্রহরে একরাত হয়। রূপক সাহিত্যের কোন কোন সুমহান রূপকার দেহজগতের- ১.ঊষা ২.নিশা ৩.ঊর্ধ্বা ৪.শংকা ৫.বিপদ ৬.নীরব ৭.নিরাপদ ৮.অর্যমা ও ৯.স্রাবণ্য- এ নয়টি প্রহরের মধ্যে অর্যমা, স্রাবণ্য ও ঊষা- এ তিন প্রহরকে রাত বলে থাকেন। তাঁরা কাঁইকে সূর্যও বলে থাকেন। এ সূত্রানুযায়ী কাঁই রূপকার্থে রাতের অর্যমা প্রহরে মানবদেহে অবতরণ করে থাকেন। তাই তাঁরা কাঁইকে রাতে উদিত সূর্য বলে গণ্য করে থাকেন। রাতের অর্যমা প্রহরে সূর্যরূপ কাঁই অবতরণ করেন বলে রূপক সাহিত্যে রাতে সূর্য উদয়ের কথা বলা হয়।
৪. দিন কী? দিনে চাঁদ উদয় হয় কিভাবে?
(What is the day? How to the moon-rise in the day?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে সূর্যদৃশ্যমান হওয়ার পর হতে সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্তসময়কে দিন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজস্বলা রমণীদের পবিত্রকালকে দিন এবং রজকালকে নিশি বলা হয়। দেহবিশ্বে আট (৮) প্রহরে দিন এবং এক প্রহরে রাত হয়। এ সূত্রানুযায়ী দেহজগতের- ১.ঊষা ২.নিশা ৩.ঊর্ধ্বা ৪.শংকা ৫.বিপদ ৬.নীরব ৭.নিরাপদ ৮.অর্যমা ও ৯.স্রাবণ্য- এ নয়টি প্রহরের মধ্যে ১.ঊষা ২.নিশা ৩.ঊর্ধ্বা ৪.শংকা ৫.বিপদ ৬.নীরব ৭.নিরাপদ ও ৮.অর্যমা- এ ৮টি প্রহরকে দিন বলা হয়। আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা সাঁইকে চন্দ্রও বলে থাকেন। এ সূত্রানুযায়ী সাঁই দিনের ঊষা প্রহরে মানবদেহে অবতরণ করেন বলেই সাঁইকে দিনে উদিত চন্দ্র বলা হয়। দিনের ঊষা প্রহরে চন্দ্ররূপ সাঁই অবতরণ করেন বলে রূপক সাহিত্যে দিনে চন্দ্র উদয়ের কথা বলা হয়।
৫. চাঁদ সুরুজ এক অক্ষে ভাসে কিভাবে?
(How to sun-moon floating in an axis?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আধ্যাত্মিকবিজ্ঞানের সূত্রানুসারে বৈতরণীকে ত্রিধারার এক অক্ষ বলা হয়। তার মধ্যে সাদা ধারাকে সাঁই ও কালো ধারাকে কাঁই বলা হয়। সাঁই ও কাঁই এ পথেই চলাচল করে বলে সাঁই ও কাঁইয়ের এক অক্ষ বলা হয়। অপরদিকে সৌরবিশ্বের চাঁদ ও সূর্য ভিন্নভিন্ন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে। তাই রূপক সাহিত্যের সুমহান রূপকারগণ বলেন যে সৌর-জগতের চাঁদ ও সূর্য ভিন্নভিন্ন কক্ষপথে পরিভ্রমণ করলেও দেহবিশ্বের চাঁদ ও সূর্য একই কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে থাকে।
৬. নারী কী? নারী বাইরে থাকে কিভাবে?
(What is women? How to women stay outside?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত ভগচিহ্নধারিণী প্রাণীকে নারী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে নরদেহের রতীকে নারী বলা হয়। বিশ্বের সব শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক রূপক সাহিত্যে কেবল রতী দ্বারাই নারীচরিত্রাদি সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। যেমন- কমলা, লক্ষ্মী, দূর্গা এবং হাজিরা, কুলসুম ও ফাত্বিমা প্রমুখ। তবে কেবল আদিমানব বা আদিপিতা নির্মাণের ক্ষেত্রেই শুক্রকে পুরুষচরিত্র কল্পনা করা হয়ে থাকে। যেমন- পুরাণীদের আদিপিতা গোবিন্দ এবং কুরানীদের আদিপিতা আদম প্রমুখ। শুক্র সহজে পাওয়া যায়। এ জন্য রূপক সাহিত্যে শুক্রকে বাইরের সদস্য বলা হয়। অপরদিকে সাঁই ও কাঁই কঠোর সাধন করেও আহরণ করা কঠিন বলে সাঁই ও কাঁইকে অনেক গভীরের সম্পদ বা ঘরের ধন বলা হয়। আর এ সূত্র ধরেই রূপক সাহিত্যে রতীরূপ নারীকে বাইরের ও ঈশ্বররূপ উপাস্য-দ্বয়কে ঘরের সদস্য বলা হয়ে থাকে।
৭. পুরুষ কী? পুরুষ ঘরে থাকে কিভাবে?
(What is male? How to male stay at home?
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে শিশ্নচিহ্নধারী প্রাণীকে পুরুষ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে জ্ঞান, গুরুসুধা ও মধুকে পুরুষ বলা হয়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত অধিক শক্তিশালী কোন সত্তাকেও পুরুষ বলা হয়ে থাকে। সাঁই ও কাঁইকে কঠোর সাধন করেও আহরণ করা কঠিন বলে সাঁই ও কাঁইকে অনেক গভীরের সম্পদ বা ঘরের ধন বলা হয়। অপরদিকে শুক্র সহজে পাওয়া যায়। এ জন্য শুক্রকে বাইরের সদস্য বলা হয়। আর এ সূত্র ধরেই রূপক সাহিত্যে ঈশ্বররূপ উপাস্য দ্বয়কে ঘরের ও রতীরূপ নারীকে বাইরের সদস্য বলা হয়ে থাকে।
৮. একনারী বহুপতি ধরে কিভাবে?
(How to a woman took many husband?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত ভগচিহ্নধারিণী প্রাণীকে নারী ও শিশ্নচিহ্নধারী প্রাণীকে পতি বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রতীকে নারী এবং সুধাকে পতি বলা হয়। এ সূত্র ধরেই একই রতী একাধিক ডিম্বাণু নিষিক্ত করে এবং একাধিক আত্মা সঞ্চারণ করে বলে রূপক সাহিত্যে একনারীর বহু পতি গ্রহণ করা বলা হয়ে থাকে।
৯. যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কী? (What is the life imprisonment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয় বিচারালয় কর্তৃক ২৫ বছরের দ- প্রদান করাকেই যাবজ্জীবন কারাদ- বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে জীবের দেহধারণ করাকেই কারাগারে বন্দী হওয়া বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ আত্মাকে যে কোন ধড়ে সঞ্চারণ করাকেই জীবের কারাগারে বন্দী হওয়া বলা হয়ে থাকে।
১০. বিচারক আসামী হয় কিভাবে? (How to judge the accused?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে লোকসমাজে দেখা যায় বিবাদীর কৃত অপরাধের বিচার করেন বিচারক অর্থাৎ একজনে অপরাধ করেন এবং আরেকজন বিচারকরূপে বিচারকার্য পরিচালনা করে থাকেন কিন্তু রূপক সাহিত্যে বলা হয় যিনি অপরাধী তিনিই তাঁর বিচার করেন। যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের বিচার নিজে করা না হয় ততক্ষণ সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। কার্যতঃ আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মুখে শোনা যায় সন্তানরূপে পুনর্জন্ম গ্রহণকারী মানুষ মাত্রই বিবাদী। আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মতে সন্তান ও পিতা একই ব্যক্তি কেবল ধড়ান্তর মাত্র। এ সূত্র ধরেই আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা বলে থাকেন- “পিতা যখন পুত্রের বিচার করেন এবং পুত্র যখন পিতার বিচার করেন তখন বিচারকই বিবাদী এবং বিবাদীই বিচারক হন। অর্থাৎ পিতাই সন্তান এবং সন্তানই পিতা হন। এছাড়া কোথাও কোথাও জ্ঞানকে বিবাদী ও বিচারকও বলা হয়ে থাকে।
১১. আপন বিচার আপনি করেন কিভাবে?
(How does own Judgment manually?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আপন বিচার করা বলতে কাঁইজি নিজের শুক্র নিজে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আপন অমৃত আপনি আহরণ করাকে বুঝিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বিচারক ও বিবাদী একজনই। কারণ শুক্রপাত করে যিনি অপরাধী, শুক্র নিয়ন্ত্রণ করে তিনিই বিচারক। এ জন্যই রূপক সাহিত্যে যিনি বিচারক তিনিই বিবাদী এরূপ বলা হয়। মূল বিষয় হলো মানুষের বিবেক হলো বিচারক এবং মন হলো বিবাদী এবং জ্ঞান হলো বাদী।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

“চাঁদকে কেউ চাঁদ ডাকিলে” (সপ্তম পর্ব)

৫. চাঁদকে কেউ চাঁদ ডাকিলে
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————
“চাঁদকে কেউ চাঁদ ডাকিল”
চাঁদে কী আর কথা কয়
দৃশ্যাদৃশ্য বিধির বিধান
মহাশূন্যে ভেঁসে রয়।
যেথার বস্তূ সেথা রলে
কী হবে ছাই নাম জপিলে
নামিরা নাম করে লীলে
তাতে কী আর বস্তূ পায়।
উপবীত কী জপমালা
হরে কৃষ্ণ জপ নিরালা
নেচে গেয়ে জপে ভালা
শেষকালে ফল একই হয়।
বলন কাঁইজি বসে ভনে
নামিরা রয় ডুবে নামে
বাঘে মারে দূর্বাবনে
শেষে করে হায়ঃ হায়ঃ।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক এবং বাংলাভাষার যুগান্তকারী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এ বলনটির মধ্যে কাঁইজি নামজপনারূপ পারম্পরিক সংস্কারটির স্বরূপ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন।
এখানে কাঁইজি বলেছেন সৌর-জগতের চাঁদকে শত ডাকাডাকি করলেও সে নামির সাথে কথা বলে না কারণ সে জড়পদার্থ। তবে প্রকৃতির নিয়মে চাঁদ কেবল দৃশ্য ও অদৃশ্য হয়ে থাকে মাত্র তদ্রুপ সাঁই ও কাঁইকে যতই ডাকাডাকি করা হোক না কেন তারাও নামির সাথে কথা বলেন না কারণ তারাও জড়পদার্থ। তবে কেবল অটলসাধনা দ্বারাই মানবের উপাস্যদ্বয়কে আহরণ করা সম্ভব।
অতঃপর কাঁইজি বলেছেন যে- জপনা করে যদি জপিত উপাস্যকে না পাওয়া যায় তবে জপনা করেই লাভ কী? যারা উপবীত বা জপমালা দ্বারা সর্বক্ষণ বা মাঝে মাঝে উপাস্যের নামজপনা করে থাকেন আর যারা করেন না উভয়েরই শেষফল শূন্য। নামী এবং অনামী উভয়ই শেষকালে হায়ঃ হায়ঃ করেন এবং বলেন- “আইলাম আর গেলাম, খাইলাম আর ছুইলাম, দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না।”
কাঁইজির উদাত্ত আহ্বান হলো- নামজপনা কেবল নামাশ্রয়ের কাজমাত্র। উল্লেখ্য মানবের আশ্রয় মোট ৬টি। যথা- ১.মন্ত্রাশ্রয় ২.নামাশ্রয় ৩.ভাবাশ্রয় ৪.প্রেমাশ্রয় ৫.রসাশ্রয় এবং ৬.রূপাশ্রয়। সেজন্য সাধককে কেবল জপনা নিয়ে বসে থাকলেই চলবে না বরং আগ্রহী ও কৌতুহলী সাধককে ক্রমে ক্রমে ভাবাশ্রয়, প্রেমাশ্রয় ও রসাশ্রয় অতিক্রম করে সিদ্ধি স্তর বা রূপাশ্রয়ে উত্তীর্ণ হতে হবে। এ জন্য কাঁইজি এখানে আগ্রহী সাধকদের ক্রমে ক্রমে সিদ্ধিস্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
উপবীত, কৃষ্ণ, চাঁদ, জপমালা, দুর্বাবন, নামী, বস্তু, বাঘ, মহাশূন্য, লীলে। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions and Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. চাঁদ কী? (What is Moon?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বর্তমান বিজ্ঞানের আবিষ্কার সৌর জগতের পৃথিবী নামক গ্রহের একটি উপগ্রহকে চাঁদ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তুকেই চাঁদ বলা হয় (যেমন গুরুচাঁদ)। তবে এখানে কাঁইজি পৃথিবীর উপগ্রহকেই চাঁদ বলে অভিহিত করেছেন।
২. বিধির বিধান কী? (What is the act of God?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আমাদের এ পৃথিবীতে অনেক দর্শনের মানুষ বাস করেন। একেক দর্শনে একেক সত্তাকে বিধি বা নিয়ামক বলা হয়। যেমন- প্রকৃতিবাদীরা কেবল প্রকৃতিকেই বিধি বা নিয়ামক বলে থাকেন। তদ্রƒপ বিজ্ঞানীরা শক্তিকে, দার্শনিকরা জ্ঞানকে, মরমীরা শ্বাসকে, পুরাণীরা ব্রহ্মাকে, কুরানীরা আল্লাহকে এবং আত্মতাত্ত্বিকরা কেবল কাঁইকে বিধি বা নিয়ামক বলে থাকেন। এ সূত্র হতে প্রকৃতির চিরাচরিত নিয়মকেই বিধির বিধান বলা হয়।
৩. মহাশূন্য কী? (What is the vesoljska?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সারা সৃষ্টিজগৎকেই মহাশূন্য বলা হয়। কারণ সৃষ্টিজগৎ পুরোটাই শূন্য। যেসব জ্যোতিষ্ক আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তাও মহাশূন্যের মধ্যেই ভাসমান। অর্থাৎ সারাবিশ্বটাকেই মহাশূন্য বলা হয়।
৪. নামজপনা কী? (What is the Hymnody?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে মোট ৬টি আশ্রয় রয়েছে। যথা- ১.মন্ত্রাশ্রয়, ২.নামাশ্রয়, ৩.ভাবাশ্রয়, ৪.প্রেমাশ্রয়, ৫.রসাশ্রয় ও ৬.রূপাশ্রয়। এর মধ্যে নামাশ্রয়ের মূল কার্যক্রম হলো কেবল উপাস্যের নামজপনা করা। রূপক সাহিত্যে বর্ণিত উপাস্যদের সুন্দর সুন্দর নামাদি পুনঃপুন উচ্চারণ করাকে নামজপনা বলা হয়। অর্থাৎ কোন উপাস্যের নাম পুনঃপুন উচ্চারণ করাকেই নামজপনা বলা হয়।
৫. নামী কাকে বলে? (What is called the hymnodist?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
নামাশ্রয়ের আউল সাধকদেরকেই নামী বলা হয়। নামিরা নামজপনার ঊর্ধ্বে অন্য কোন সাধন করতে চান না এবং তারা রূপক সাহিত্যাদির মন্ত্রাদির তত্ত্বাদিও উদ্ঘাটন করতে চান না। উপাস্যের নামজপনাকারীকেই নামী বলা হয়।
৬. উপবীত কী? (What is the paternoster?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
নামজপনার ছড়াকেই উপবীত বা জপমালা বলা হয়। কাঠ বা ধাতু দ্বারা নির্মিত ছোটছোট গুঁটি মাল্যবৎ একত্রে গ্রন্থন করে উপাস্যের নামজপনার জন্য যে ছড়া নির্মাণ করা হয় তাকেই উপবীত বা জপমালা বলা হয়। তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক যুগে যান্ত্রিক (ডিজিটাল. Digital)) উপবীতও আবিষ্কার হয়েছে।
Digit [ডিজিট] (রূপ)বি আঙুলি, কর, finger (ফিঙ্গার) {ই}
Digital [ডিজিটাল] (রূপ)বি আঙুলি সম্বন্ধীয়, আঙুল দ্বারা চালানো যায় এরূপ {ই}
৭. “হরে কৃষ্ণ হরে রাম” কী? (What is the Lord thief God thief?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এটি পুরাণীদের বীজ মন্ত্র। এর সরল অর্থ হলো- কৃষ্ণ চোর ও রাম চোর। এখানে কৃষ্ণ হলো কাঁই এবং রাম হলো- সাঁই। অর্থাৎ কাঁই চোর এবং সাঁই চোর। অনুরূপভাবে বলা যায় ব্রহ্মা চোর ও বিষ্ণু চোর, লর্ডস চোর ও গড চোর এবং আল্লাহ চোর ও রাসুল চোর। সারাবিশ্বের সব রূপক সাহিত্যেই এ সত্তাদ্বয়কে চোর বলা হয়। এ সত্তাদ্বয় মানবদেহের মধ্যে চোরের মতো অবস্থান করে। সাধারণ মানুষ হন্নে হয়ে অন্বেষণ করেও তাঁদের দর্শন পায় না বলেই তাদের চোর বলা হয়। যেমন- লালন সাঁইজি বলেছেন “ধরো চোর হাওয়ার ঘরে, ফাঁদ পেতে, সে কিরে সামান্য চোরা, ধরবি কোনাকাঞ্চিতে। ২পাতালে চোরের বহর, দেখায় আকাশের ওপর, তিনতারে হচ্ছে খবর, শুভাশুভ যোগ মতে। ৩কেবা চোর কেবা সেনা, কে করে ঠিক ঠিকানা, হাওয়ায় তার বারামখানা, হাওয়ায় মূলাধার তাতে। ৪চোর ধরে রাখবি যদি, হৃদগারদ করগে খাঁটি, লালন কয় খুঁটিনাটি, থাকতে কী সে দেয় ছুঁতে” (পবিত্র লালন- ৫৬৬)
৮. নামীদের নামে ডুবে থাকা কী? (What is the hymnic name Concentrated?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে উপাস্যের নামজপনাকারীকেই নামী বলা হয়। উপাস্যের নামজপনার এ সাধনস্তরকে নামাশ্রয় বলা হয়। এ আশ্রয়ের সাধকরা কেবলই উপাস্যের নামজপনায় ব্যতিব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে হেলাদুলেও জপনা করে থাকেন। নামীদের মধ্যে জপনা করতে করতে কাউকে মূর্ছা যেতেও দেখা যায়। নামিরা কয়েকজন একত্রে বসে বা দাঁড়িয়ে বড়বড় ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে এরূপ জপনা করা আরম্ভ করেন যে তাদের উপাস্য আকাশে কিংবা পাতালে থাকলেও তাদের সম্মুখে না এসে উপায় নেই। একেই নামীদের নামকীর্তনে ডুবে থাকা বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে কেউ জানেন না যে তারা যাকে ডাকছেন সে উপাস্য একটি ‘bogus boo’,
৯. দূর্বাবনে বাঘে মারা কী?
(What is killed by tigers of cynodon dactylon-forest?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
দূর্বা এক প্রকার ক্ষুদ্র ঘাস। এ ঘাসের বিশাল অঞ্চলকেই দূর্বাবন বলা হয়। এ বনে বাঘ থাকারও কথা নয় এবং মানুষ মারাও কথা নয়। তবে দূর্বাবনে বাঘে মারার উদাহরণটি দীর্ঘদিন যাবৎ অনেক সাহিত্যিক ও মরমী গীতিকাররা স্ব-স্ব সাহিত্যের মধ্যে ব্যবহার করে আসছেন কেন? যেমন মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “যদি থাকে এ কপালে, রত্ন এনে দেয় গোপালে, কপালের বিমতি হলে, দূর্বাবনে বাঘে মারে” (পবিত্র লালন- ৯০১/২)। অর্থাৎ কাপুরুষতা ও দুর্বলতার জন্য কেবল ব্যর্থতা ও পরাজয়তা দ্বারা আক্রান্ত হওয়াকে দূর্বাবনে বাঘে মারার কথা বলা হয়। কাঁইজিও এখানে তদ্রুপই বলেছেন।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
(সূত্রতথ্যঃ)
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

বন্দনা বলন’ (দ্বিতীয় পর্ব)

‘বন্দনা বলন’ (Anthem. এ্যান্থিম)
Hymn Bolon (হেম বলন)/ ‘ترنيمة بيالون’ (তারনিমা বিয়ালুন)
*. দয়ালের বন্দনা, আমার গুরুর বন্দনা
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“দয়ালের বন্দনা
আমার গুরুর বন্দনা
ত্রিধারা নিদানে অধম
পাই যেন চরণখানা।
বন্দি যত জ্ঞানীর চরণ
যত আছেন সাধু মহাজন (গো)
দূরে কাছের ভাই বন্ধুগণ
বন্দিলাম সবজনা।
বন্দিলাম জনক জননী
বন্দিলাম গুরু গুণী (গো)
বন্দি সকল সহকর্মী
সহযোগী সবজনা।
বলন কাঁইজির দেহ বন্দি
অদ্য গীতির আসর বন্দি (গো)
সহযোগির চরণ বন্দি
বন্দিলাম যন্ত্রখানা।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের জগদ্বিখ্যাত সংস্কারক, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও প্রখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি বলন আধ্যাত্মিক পরিবারের সর্ব প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সর্ব প্রকার সঙ্গীতানুষ্ঠানের কেবল বন্দনাবাণী রূপেই এ বলনটি নির্মাণ করেছেন। এ বন্দনাটি পরিবেশনে একদিকে যেমন সময়ও সাশ্রয় হয় অপরদিকে অনুষ্ঠানের গাম্ভির্যতাও রক্ষা হয়। প্রায় যত্রতত্রই লক্ষ্য করা যায় বাংভারতের বাউলরা কোন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের পূর্বে এমন লম্বা বন্দনা করেন যে, কোন কোন বন্দনা আধা ঘন্টাও ছাড়িয়ে যায়। দর্শক বা শ্রোতাগণ যে বিরক্ত হয়ে যান সে ব্যাপারটি তাদের কোন স্মরণেই থাকে না। বিষয়টি বিবেচনা করেই কাঁইজি নাতিদীর্ঘ এ বন্দনাবাণীটি নির্মাণ করেছেন। অতি অল্প কথায় বন্দনারূপ এ অমীয়বাণীটির মধ্যে কাঁইজি প্রায় সব বিষয়ই সন্নিবেশিত করেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে। এ বাণীটির দ্বারা মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই সার্থকভাবেই বন্দনা করা সম্ভব। এখন হতে এ বলনটি বলন ঘরানার উদ্বোধনিবাণী বা বন্দনাবাণী রূপেই বিবেচিত হবে।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
চরণ, ত্রিধারা, দয়াল, নিদান, বন্দনা, যন্ত্র। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)/ ‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. গুরু কাকে বলে? (What is called the Preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
২. গুরু কত প্রকার ও কী কী? (What kinds of Preceptor and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
গুরু চার প্রকার- ১.মানুষগুরু (জ্ঞান) ২.জগৎগুরু (শ্বাস) ৩.কামগুরু (বিম্বল) এবং ৪.পরমগুরু (সাঁই)। নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
১. মানুষগুরু (জ্ঞান)
Man preceptor (ম্যান প্রিসিপ্টর)/ ‘بشر معلم’ (বাশারা মুয়াল্লিম)
মানুসগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী মানুষকে শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে।
মানুষগুরুর শুধু আকার ও আকৃতিকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত। কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের জ্ঞান। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির পাঠশালার শিক্ষক-শিক্ষিকাগণসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন সম্প্রদায় নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন- সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে, মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। (“গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
২. জগৎগুরু (শ্বাস)
Supreme preceptor (সুপ্রিম প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم العليا’ (মুয়াল্লিমাল আলিয়া)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Supreme preceptor)
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে বাতাস বলতে বায়ুমণ্ডলে চলমান বাতাস না বুঝিয়ে বরং নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বুঝানো হয়। নাসিকার শ্বাসরূপ জগৎগুরু ডান ও বাম গতি ধারণ করে সর্বসময় শিষ্য বা ভক্তকুলের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিষ্যগণকে জীবনের প্রতিটি কাজের শুভাশুভ সংবাদাদি প্রদান করে থাকেন। শ্বাসরূপ বাতাস বিশ্বব্যাপী বিরাজমান বলে রূপক সাহিত্যে তাকে জগৎগুরু বলা হয়। মানুষগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে না কিন্তু জগৎগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারেন। এ গুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং সারা চরাচর, গুরু তুমি পতিতপাবন পরমও ঈশ্বর” (পবিত্র লালন- ৪২/১)। আবার লোকনাথ ব্র‏হ্মচারী লিখেছেন- “রণে, বনে, পাহাড়ে ও জঙ্গলে যেখানে আমাকে স্মরণ করবে সেখানেই আমাকে পাবে।”
৩. কামগুরু (বিম্বল)
Cupid (কিউপিড)/ ‘صولجان’ (সাওলাজান)/ ‘كيوبيد’ (কিউবিদ)
কামগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Cupid)
রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে কামগগুরু বলে।
কামগুরুর কোন ভজন নেই। এ গুরুকে শাসন করাই ভক্তের কাজ। চারপ্রকার গুরুর মধ্যে কেবল কামগুরুকে শাসন করতে হয়। এ গুরু অটল না হওয়া পর্যন্ত একে ক্রমে ক্রমে শাসন করতেই হবে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪) ২.“প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২) ৩.“প্রেম-বাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১) ৪.“প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)
৪. পরমগুরু (সাঁই)
Prime preceptor (প্রাইম প্রিসিপ্টর)/
‘مؤدب المطلق’ (মুয়াদ্দিব আলমুত্বাল্লাক্ব)
পরমগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Prime preceptor)
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। সাঁই হলেন তরলমানুষ- যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে পরমগুরু বলা হয়। এ পরমগুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“ত্রিবেণীর ত্রিধারে, মীনরূপে গুরু বিরাজ করে, কেমন করে ধরবি তারে, বলরে অবুঝ মন” (পবিত্র লালন- ১৫৩/৩) ২.“হলে অমাবতীর বার, মাটি রসে হয় সরোবর, সাধু গুরু বৈষ্টম তিনে, উদয় হয় সে যোগের দিনে” (পবিত্র লালন- ১৬২/২)।”
৩. বন্দনা কী? (What is hymn?)
উত্তর (Answers)/ / ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কোন কিছুর স্তুতি বা স্তব করাকে বন্দনা বলা হয় কিন্তু পারিভাষিকভাবে সব আসরে গাওয়া প্রথম গীতিটিকে বন্দনা বলা হয়।
৪. ত্রিধারা কী? (What is tri-stream?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যে কোন তিনটির মিলনকে ত্রিধারা বলা হয় কিন্তু রূপকসহিত্যে বৈকুণ্ঠ ও নাসিকাকে ত্রিধারা বলা হয়। বৈকুণ্ঠ হতে ১.লাল, ২.সাদা ও ৩.কালো এ তিনটি ধারা এবং নাসিকা হতে ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষূম্না এ তিনটি স্নায়ু প্রবাহিত বলেই এদেরকে ত্রিধারা বলা হয়।
৫. চরণ কত প্রকার ও কী কী? (What kind of leg and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসহিত্যে চরণ চার প্রকার। ১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
অভয়চরণ (Fearless Leg)/ ‘قدم بلا خوف’ (ক্বাদিমা বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ (Pairs Leg)/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ (Flushed Leg)/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজনের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ (Excellent Leg)/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে।
২. রূপক সাহিত্যে বলাইকে শ্রীচরণ বলে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম