শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

দেহ (প্রথম পর্ব)

৩৪. দেহ
Body (বডি)/ ‘جسم’ (জেসিমা)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলক-পরিবারের অন্যতম একটি ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘দেহপরিবার’ প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘পৃথিবী’, উপমান পরিভাষা ‘অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘বপু ও ভুবন’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয়’। এটি একটি ‘উপমান-প্রধান’ মূলক।
দেহ বি খাঁচা, ধড়, পিঞ্জর, body, corpus, physique, substance, trunk, organism, ‘جسم’ (জেসিমা), বদন (.ﺒﺪﻦ) (আল) কংকাল, কলেবর (আবি) ১.উষ্ট্র, ঘোড়া, নদীয়া, নবদ্বীপ, পাহাড়, ব্রহ্মা্ণ্ড, হাতি ২.কল্পতরু, কল্পদ্রুম, কল্পবৃক্ষ (ইপ) world (আপ) আলম (.ﻋﺎﻠﻡ), ক্ববর (.ﻘﺑﺮ), জাহান (ফা.ﺠﻬﺎﻦ), ফিল (.ﻔﻴﻞ), মিসর (.ﻤﺻﺮ), মুলুক (.ﻤﻟﻚ), শাজারা (.ﺸﺠﺮﺓ) (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবার প্রধান ও রূপক সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) জীবের স্থূল আকারকে দেহ বা রূপকার্থে রথ বলা হয় (ছনা) দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয় (চাপ) ‘বপু ও ভুবন’ (উপ) অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি (রূ) পৃথিবী (দেত) দেহ
দেহের সংজ্ঞা (Definition of body)
জীবের স্থূল আকারকে দেহ বলে।
দেহের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of body)
আত্মা, জ্ঞান ও মন বহনকারী জীবন্ত কাঠামোকে দেহ বলে।
দেহের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন (Short Reports of the ‘Body’Wink
মূলক = দেহ
রূপক = পৃথিবী
উপমান = অশ্ব, কানন, গাড়ি, জাহাজ, তরী, পাহাড়, বৃক্ষ ও হাতি
চারিত্রিক = বপু ও ভুবন
ছদ্মনাম = দেবালয়, বিশ্ব, ব্রজ, মন্দির, রথ, শাস্ত্র ও স্বর্গালয়
দেহের আভিধানিক, রূপক, উপমান, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষা তুলে ধরা হলো-
মূলক সদস্যঃ দেহ।
আভিধানিক প্রতিশব্দঃ অঙ্গ, অবয়, অবয়ব, আকার, আকৃতি, কঙ্কাল, কলেবর, কায়, কায়া, গা, গাত্র, ঠাট, তনু, ধড়, রূপ, শরীর ও স্থূলদেহ।
রূপক পরিভাষাঃ পৃথিবী।
উপমান পরিভাষাঃ অগ্নিগিরি, অদ্রি, অশ্ব, উষ্ট্র, উষ্ট্রী, ঐরাবত, কানন, খাঁচা, গজ, গাছ, গাড়ি, গিরি, গাঁ, গৃহ, গেরাম, গ্রাম, ঘড়ি, ঘর, ঘোড়া, জাহাজ, ঝি, টিলা, ডোঙ্গা, তরণী, তরান্ধু, তরিত্র, তরী, তরু, দেশ, ধরণী, ধরা, ধাম, নাও, পর্বত, পাঠমন্দির, পাঠশালা, পাহাড়, পিঞ্জর, পুস্তক, বন, বাটী, বাড়ি, বিদ্যাপীঠ, বিদ্যালয়, বৃক্ষ, ভবন, ভিটা, ভূমি, ভেলা, মঠ, মাটি, মেঘ, যান, রাজ্য, রাষ্ট্র, শকট ও হাতি।
চারিত্রিক পরিভাষাঃ অত্রি, ইরা, গান্ধার, গিরিরাজ, জীমূত, জম্বু, তক্ষ, দশবল, দশরথ, দ্রুম, নগেন্দ্র, নিখিল, পল্লব, পৃথ্বী, বদর, বপু, বলাহক, বসুমতী, বিপিন, বিমান, ভুবন, মান্দাস, মেঘলা, মেদিনী, মেদেনী, শমি ও শৈলেন।
ছদ্মনাম পরিভাষাঃ অংশকলা, অবনি, অভ্র, অম্ভোজ, অম্ভোদ, অরণ্য, অর্ণবতরী, অর্ণবপোত, অর্ণবযান, অর্ধনারীশ্বর, অশ্বযান, আখড়া, আদল, আদিপুরাণ, আপণ, আবাস, আয়ুর্বেদ, আসন, উইঢিবি, উট, উটজ, উড়্ণ্তপা, উড়োজাহাজ, উপনিষদ, উপপুরাণ, উপবেদ, ঋক্ষ, ঋগবেদ, কঠোপনিষদ, কদম, কল্পগিরি, কল্পতরু, কল্পদ্রুম, কল্পবৃক্ষ, কল্পলতা, কাননিকা, কারাগার, কারাগৃহ, কাষ্ঠপুত্তল, কাষ্ঠপুত্তলিকা, কাষ্ঠফলক, কাষ্ঠমঞ্চ, কাষ্ঠাসন, কুটির, কুটজ, কুলায়, কুলায়িকা, কুশপুত্তলিকা, কুসুমকানন, কোশল, ক্রন্দ, ক্রৌঞ্চদ্বীপ, ক্ষিতি, ক্ষিতিধর, ক্ষিতিভৃৎ, ক্ষোণী, খাঞ্চা, গিরিবর, গৈরেয়, ঘন, চতুর্দশভুবন, চরা, চরাচর, চাঁদোয়া, চিত্রকূট, চৌদ্দহাতী, ছত্র, ছত্রশালা, ছায়াতরু, জগ, জগৎ, জগৎসংসার, জগন্মণ্ড, জগমণ্ডল, জঙ্গল, জনপদ, জনপাদ, জম্বুদ্বীপ, জলদ, জলধর, জলমুখ, জীবলোক, জীবালয়, ঝর্ঝরিক, টাপু, তনুয়া, তপোবন, তরুবর, তরুরাজ, তৃণকুটির, তোয়দ, তোয়ধর, ত্রিদশালয়, ত্রিদিব, দশকুশী, দশকোষী, দশচক্র, দশমূল, দশাক্ষর, দশার্ণদেশ, দে, দেবপুরী, দেবলোক, দেবালয়, দেয়া, দেহপিঞ্জর, দেহভাণ্ডার, দ্রবিড়, ধরতি, ধরাতল, ধরাধর, ধরাধাম, ধরিত্রী, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মপুস্তক, ধর্মশাস্ত্র, নগ, নগপতি, নগরাজ, নগাধিপ, নগাধিপতি, নগাধিরাজ, নদে, নয়দুয়ারী, নরযান, নরলোক, না (নৌকা), নিত্যগোলক, নিত্যপুরী, নিদর্শনপাহাড়, নিরুক্ত, নৃলোক।
পঞ্চগড়, পঞ্চবটী, পয়োমুখ, পর্ণ, পর্ণকুটির, পর্ণশয্যা, পর্ণশালা, পর্ণী, পর্বতকন্দর, পর্বতপতি, পল্লবী, পল্লি, পশার, পশুশালা, পাঞ্চাল, পাড়া, পাদপ, পান্থপাদপ, পাপতরণী, পার্গু, পীঠস্থান, পুথি, পুরাণ, পুস্তকাগার, পুস্তকালয়, পুস্তিকা, প্রতীক, প্রবালদ্বীপ, প্রাণীজগৎ, প্রাসাদ, প্রেমঘড়ি, প্রেমডালি, প্রেমতরণী, প্রেমনৌকা, বঙ্গ, বদরি, বদরিকা, বনানী, বসতবাটি, বসতবাড়ি, বসতভিটা, বসুধা, বসুন্ধরা, বস্তি, বস্ত্রকুটির, বস্ত্রগৃহ, বস্ত্রাবাস, বাজি, বাঞ্ছাকল্পতরু, বাটিকা, বারদুয়ারি, বারিতস্কর, বারিরথ, বালুচর, বাসা, বাস্তু, বিটপী, বিদ্যামন্দির, বিশ্ব, বিশ্বকোষ, বিশ্বচরাচর, বিশ্বজগৎ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্বভুবন, বিশ্বসংসার, বিশ্বসাহিত্য, বিষবৃক্ষ, বৃহৎবৃন্দাবন, বেদ, বেদান্ত, বেশ্ম, বৈদ্যশাস্ত্র, বোধিদ্রুম, বোধিবৃক্ষ, ব্যোমযান, ব্রজ৩, ব্রহ্মাণ্ড, ভব, ভবতরী, ভবধাম, ভবলোক, ভারতবর্ষ, ভিটে, ভুঁই, ভূ, ভূতময়, ভূতাবাস, ভূধর, ভূভৃৎ, ভূবলয়, ভূমণ্ডল, ভূলোক, ভূমিরুহ, ভূমীরুহ, ভূর্লোক, ভেদবিদ্যালয়, ভোগায়তন, মণিকুট্টিম, মনুষ্যলোক, মনুসংহিতা, মন্দির, মরুজাহাজ, মরুসাগর, মর্ত্য, মর্ত্যধাম, মর্ত্যভূমি, মর্ত্যলোক, মলয়পর্বত, মলয়াচল, মলয়াপর্বত, মহাকাব্য, মহাকাশবিমান, মহাচ্ছায়, মহাদেশ, মহাপুরাণ, মহাবন, মহাভারত, মহামৃগ, মহাযান, মহারণ্য, মহারথ, মহারাষ্ট্র, মহাশূন্যযান, মহি, মহী, মহীতল, মহীধর, মহীরুহ, মাচা, মাচান, মাচিয়া, মাতঙ্গ, মতামহ, মাতুলালয়, মুরৎ, মূরতি, মূর্তিমন্ত, মূর্তিমান, মৃৎপাত্র, মৃৎভাণ্ডার, যজুর্বেদ, যাববাহন, যোগবাশিষ্ট, রজতগিরি, রথ, রাসমণ্ডল, রূপরেখা, লালদালান, লোক, শক্রবাহ, শরণদ্বীপ, শাখী, শাস্ত্র, শিখরী, শিবির, শৈল, সংসার, সংহিতা, সদ্ম, সমাধি, সমাধিক্ষেত্র, সমাধিস্থল, সমাধিস্থান, সাম্রাজ্য, স্থান, স্বর্গালয়, স্বগৃহ, স্বগ্রাম, স্বর্ণপিঞ্জর, স্বর্ণপ্রতিমা, হরাদ্রি, হরিণবাড়ি, হস্তিনাপুর, হস্তী ও হিরণ্যদা।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি।
৩৪. দেহ, Body (বডি) ‘جسم’ (জেসিমা)
৩৪/১. পৃথিবী , World (ওয়ার্ল্ড) ‘عالم’ (আলম)
৩৪/২. অশ্ব , Horse (হর্স) ‘ﻔﺮﺱ’ (ফারাস)
৩৪/৩. কানন, Garden (গার্ডেন) ‘ﺒﺴﺘﺎﻦ’ (বুস্তান)
৩৪/৪. গাড়ি, Carriage (ক্যারিজ) ‘عَرَبَة’ (আরাবা)
৩৪/৫. জাহাজ, Ship (শিপ) ‘سفينة’ (সফিনা)
৩৪/৬. তরী, Yawl (ইওল) ‘قارب’ (ক্বারিবা)
৩৪/৭. পাহাড়, Mountain (মাউনটেন) ‘ﺠﺒﻞ’ (জাবালা)
৩৪/৮. বৃক্ষ , Plant (প্ল্যান্ট) ‘نبات’ (নুবাত)
৩৪/৯. হাতি, Elephant (এলিফেন্ট) ‘ﻔﻴﻝ’ (ফিল)
৩৪/১০. বপু , Bulk (বাল্ক) ‘السائبة’ (আসসাবিয়া)
৩৪/১১. ভুবন, Globe (গ্লোব) ‘كون’ (কাওয়ান)
৩৪/১২. দেবালয়, Sanctum (সেঙ্কটাম) ‘معتكفه’ (মু’তাকিফাহ)
৩৪/১৩. বিশ্ব, Microcosm (মাইক্রোজিম) ‘مصغرا’ (মুসাগারাং)
৩৪/১৪. ব্রজ , Flesh (ফ্ল্যাস) ‘الجسد’ (আজজেসেম)
৩৪/১৫. মন্দির , Temple (টেম্পল) ‘معب د’ (মুয়াব্বাদ)
৩৪/১৬. রথ, Chariot (ক্যারিয়ট) ‘مركبة’ (মুরাক্কাবা)
৩৪/১৭. শাস্ত্র , Scripture (স্ক্রিপচার) ‘شريعة’ (শরিয়া)
৩৪/১৮. স্বর্গালয়, Eden (ইডেন) ‘عدن’ (আদন)
দেহের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of body)
১. “আত্মা নামিবে ভুবনে হইলে মিলন সুদিন সুজনে, দেহ ভাঙ্গিয়া গড়িবে যেদিন, সে দিনটি রেখ স্মরণে (বলন তত্ত্বাবলী- ১১)
২. “আরবিতে যাকাতের মানি, এ দেহের নির্যাস মণি, অটলে পায় স্বরূপখনি, যার যার দিব্যজ্ঞানে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৭৬)
৩. “চৌদ্দপোয়া দেহের গড়ন, ধরতে যদি পারো লালন, তবে স্বদেশী চলন, জানবি দিব্যজ্ঞান অনুসারে” (পবিত্র লালন- ৭৯৭/৪)
৪. “দেহের খবর বলি শোনরে মন, দেহের উত্তর দিকে আছে বেশি দক্ষিণেতে কম” (পবিত্র লালন- ৫৫০/১)
৫. “পিতার বীর্যে পুত্রের সৃজন, তাতেই পিতার পুনর্জনম, সুধা শুক্রে দেহের গঠন, আলেকরূপে ফিরে সদায়” (পবিত্র লালন- ৫৩৮/২)
৬. “সাঁই মিলে গুরু ভজনে, চৌদ্দতলা দেহভুবনে, বিনয় করে বলন ভনে, যারা মরার আগে মরে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪১)
দেহের প্রকারভেদ (Classification of body)
দেহ দুই প্রকার। যথা- ১.নরদেহ ও ২.নারীদেহ।
১. নরদেহ (Male body)
শিশ্নচিহ্নধারী দেহকে নরদেহ বলে।
এ বিষয়টি নিয়ে নরদেহ মাত্রিকায় সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।
২. নারীদেহ (Female body)
ভগচিহ্নধারী দেহকে নারীদেহ বলে।
এ বিষয়টি নিয়ে নারীদেহ মাত্রিকায় সবিস্তার আলোচনা করা হয়েছে।
দেহের উপকার (Benefits of body)
১. দেহের দ্বারা মন ও জ্ঞানের বিকাশসাধন হয়।
২. এটি জীব প্রজাতির পরিচয় বহন করে।
৩. এটি জীবের আহার্যরূপে ব্যবহার হয়।
৪. এর চর্ম ও হাড় ব্যবহারিক দ্রব্যাদি প্রস্তুতে ব্যবহার করা যায়।
দেহ গঠনের উপাদান (Body building components)
অধিকাংশ আত্মতাত্ত্বিক সুমহান মনীষীদের মতে মানবদেহ মোট আঠারটি বিষয়বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত। এ আঠারটি সদস্যকে আবার তিনভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে।
যেমন- পিতার চারসদস্য, মাতার চারসদস্য এবং প্রকৃতির দশসদস্য।
পিতার চারসদস্য (Four members of father)
১.হাড় ২.হৃদরা ৩.শুক্র ও ৪.ঘিলু।
মাতার চারসদস্য (Four members of mother)
১.চুল ২.চামড়া ৩.মাংস ও ৪.চর্বি।
প্রকৃতির দশসদস্য (Ten members of nature)
১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহবা ৫.ত্বক ৬.বাক্ ৭.পাণি ৮.পাদ ৯.পায়ু ও ১০.উপস্থ।
হুর 3
দেহের পরিচয় (Identity of body)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দেহ’ পরিবারের ‘মূলকসদস্য’ বিশেষ। জীবের আত্মা, মন ও জ্ঞানধারণকারী আধারকে দেহ বলা হয়। প্রতিটি জীবের মাথা হতে লেজ বা পায়ের নখ পর্যন্ত পুরো অংশকে একত্রে দেহ বলা হয়। দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, বিষয়বস্তু, অবস্থা ও শক্তিগুলোকে রূপকসাহিত্যে প্রতীতি, দৈবিকা, জ্যোতিকা, দেবতা ও সুর বলা হয়। অর্থাৎ আরবি ভাষায় ‘ﻤﻟﻚ’ (মালাকা), ফার্সিভাষায় ‘ﻔﺮﺸﺗﻪ’ (ফেরেস্তা) এবং ইংরেজি ভাষায় angel বলা হয়। আত্মদর্শনের রিপু, রুদ্র ও দশার সদস্যদের অসুর এবং অন্যান্য সব সদস্যদের সুর বলে রূপকসাহিত্যে বিবেচনা করা হয়। দেহের সব সদস্যকে একত্রে সুরাসুর বলে। রূপক সাহিত্যের অসংখ্য প্রতীতি ও দৈবিকার আবাস্থল এ মানবদেহ। এ জন্য মানবদেহকে দেবপুরী বা দেবধাম বা দেবালয় বা স্বর্গপুরী ইত্যাদি বলা হয়। ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মা, বিষ্ণু, হরি, নিতাই, রাম, লক্ষ্মণ, সীতা, শিব, কালী ও মহাদেবসহ রূপক সাহিত্যের সর্ব প্রকার কল্পিত প্রতীতি বা দৈবিকা ও উপাস্যগণ এ মানবদেহেই বাস করেন। তদ্রূপ আরব-বিশ্বের আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ), রাসুল (ﺭﺴﻮﻝ), আদম (ﺁﺪﻢ), জিন (ﺠﻥ) ও জান্নাতসহ (ﺠﻨﺔ) রূপক সাহিত্যের সর্ব প্রকার রূপকচরিত্র ও উপাস্যগণ এ মানবদেহেই বাস করেন। দেহকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। ১.আকাশ ২.ভূমি ও ৩.পাতাল। আকাশ- নাভি হতে ঊর্ধ্বাঙ্গকে আকাশ ধরা হয়। ভূমি- নাভি হতে নিম্নাঙ্গকে ভূমি ধরা হয়। পাতাল- জঠর বা গর্ভাশয়কে পাতাল ধরা হয়। গর্ভাশয়রূপ এ পাতালেই বাংভারতীয় রূপক সাহিত্যের ব্রহ্মা ও বিষ্ণু এবং আরবীয় রূপক সাহিত্যের আল্লাহ ও রাসুল অবতরণ করেন। একজন সুবিজ্ঞ সাধকগুরুর সহচার্য গ্রহণ করে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু বা আল্লাহ ও রাসুলের সন্ধান করতে হয়।
দেহ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের রচিত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ (১ম খণ্ড) গ্রন্থটি পাঠ করতে পারেন। কারণ উক্ত গ্রন্থটির মধ্যে কেবল মানবদেহ, দেহ সৃষ্টি ও দেহের ক্রমবিকাশ নিয়েই আলোচনা করা হয়েছে। আমাদের আলোচ্য এ দেহই হলো রূপক সাহিত্যের আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেহ নামক এ বিশ্ববিদ্যালয় যিনি একবার উত্তরণ করেন তিনিই বিশ্ববিখ্যাত মহামানবরূপে স্বীকৃতিলাভ করেন। আমাদের এ আত্মদর্শনেই রূপক সাহিত্যের সব উপাদন অবস্থিত। এ আত্মদর্শনের মূলক, রূপক, ব্যাপক, উপমান ও সংখ্যাসূত্রাদির সাহায্যে বিশ্বের সব শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও পারম্পরিক গ্রন্থ গ্রন্থিকা নির্মিত হয়েছে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে, কুবৃক্ষে সুফল পেয়েছে, আমার মনের ঘোর গেল না” (পবিত্র লালন- ৮২৮/৩)। অর্থাৎ যে কোন লোক একবার আত্মতত্ত্ব ভালোভাবে জেনে নিলেই তিনি দিব্যজ্ঞানী হয়ে যান। অর্থাৎ বিশ্বের সব শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিকজ্ঞান কেবল ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ অর্জন করার দ্বারা অর্জন করা যায়।
সাধারণত সারা সৃষ্টি জগৎকে বিশ্ব বলা হয়। তবে রূপক সাহিত্যে কেবল মানবদেহকে বিশ্ব বলা হয়। আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা বলে থাকেন- “বিশ্ব একটি বৃহত্তম মানুষ এবং মানুষ একটি ক্ষুদ্রতম বিশ্ব।” অর্থাৎ মানুষ বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রূপ এবং বিশ্ব মানুষের বৃহত্তম রূপ। আর এ সূত্র ধরেই আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মুখে শুনতে পাওয়া যায়- “যা আছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে মানবভাণ্ডে।” এরূপ কথা পবিত্র কুরানেও স্পটতই উল্লেখ আছে। যথা- “ وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ(২০) وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ(২১)”- উচ্চারণঃ “ওয়া ফিল আরদি আয়াতুল্লিল মুক্বিনিনা (২০) ওয়া ফি আনফুসিকুম, আফালা তুবসিরুন (২১)।” অর্থঃ “বিশ্বাসিদের জন্য পৃথিবীর যত নিদর্শন, তোমাদের মধ্যেই রয়েছে- তোমরা কর না দর্শন।” আধ্যাত্মিক প্রবাদটি হলো- “যা আছে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে, তা আছে মানবভাণ্ডে।”
আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু তথ্যঃ (Some information of Modern science)
১. একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের রক্তের পরিমাণ তার মোট ভরের ১৩ ভাগের ১ ভাগ।
২. দেহে অম্লজান বহনকারী লোহিত রক্ত কণিকা ২৫০০ কোটি। এরা চার মাস বাঁচে।
৩. দেহে রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্ত কণিকা ২৫০ কোটি এবং এরা অর্ধদিন বাঁচে।
৪. একস্থান হতে আরম্ভ করে ঐ স্থানে ফিরে আসতে একটি রক্ত কণিকার ১ লক্ষ কি.মি পথ অতিক্রম করতে হয়। তা পৃথিবী ৭ বার অতিক্রম করার সমান।
৫. দেহের শিরাকে পাশাপাশি সাজালে দেড় একর ভূমির প্রয়োজন হবে।
৬. দেহের স্নায়ুতন্ত্র এত লম্বা যে তা দ্বারা পৃথিবী ৭ বার পেচানো সম্ভব।
৭. অনুভূতি স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে দিয়ে ঘণ্টায় ২০০ মাইল বেগে পরিবাহিত হয়।
৮. মনে অনুভূতির উদয় হলে তা মস্তিষ্কে পৌঁছতে ০.১ সেকেন্ড সময় লাগে।
৯. মানব সন্তান জন্মের সময় তার দেহে হাড় থাকে ৩৫০টি।
১০. ৭০ বছর বয়সী একজন মানুষ সারা জীবনে ৪০ হাজার লিটার মূত্র ত্যাগ করে।
১১. প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের দেহের চামড়ার পরিমাণ ২০ বর্গফুল।
১২. মানুষের দেহের চামড়ার ওপরে লোম থাকে প্রায় ১ কোটি।
১৩. একজন মানুষের শরীরে যে পরিমাণ চর্বি থাকে তা দ্বারা ৭টি বড় কেক প্রস্তত করা যাবে।
১৪. মানবদেহে ৬৫০টি পেশি আছে। কেবল মুখেই ৩০টি পেশি আছে। হাসার সময় ১৫টিরও অধিক পেশি সক্রিয় হয়। কোন কোন কাজের সময় ২০০টিরও অধিক পেশি সক্রিয় হয়।
১৫. মস্তিষ্ক ১০ হাজার ঘ্রাণ চিনতে ও মনে রাখতে পারে।
আলোচ্য মূলকের রূপক ও ব্যাপক পরিভাষাদি নিচে আলোচনা করা হলো।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন