১৯. ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে
————————————————————-
“ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে
তার উল্টাপাল্টা কথায় বুঝি ভুতে ধরেছে।
স্বর্গ-মর্ত্য পাতাল জোড়া তিনভূতের করাল থাবা
পঞ্চভূতে করছে খেলা ফাঁক দিলে গোল খাবা
রক্তিমজলা দীঘির পাশে
মরাগরু উড়ে বাতাসে
মরে শেষে হায়-হুতাশে
মরা তার পিছু নিয়েছে।
তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে
জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে
জোয়ান কী বালক বৃদ্ধ
একপাকে করে সিদ্ধ
কত করে ত্রিশূল বিদ্ধ
অমাবস্যার পরে সে।
ভূতের বাড়ির পশ্চিমে অন্ধকার যে কুঠরি
ঐ বন্দিশালে বন্দি রাখে মরামানুষ ধরি ধরি
করে মরা গরু ভজনা
বিচারপালা হয় সূচনা
বলন কয় সে ভেদখানা
জানাও গো আমার কাছে।”
সারমর্ম
বাংলাভাষার প্রখ্যাত গীতিকার, বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি একটি উপমান প্রধান গীতিকাব্য। কাঁইজি এখানে টলন, ভ্রূণধারণ এবং প্রসব ইত্যাদি বিষয়ের সুনিপুণ ও সারগর্ভ আলোচনা তুলে ধরেছেন।
আমাদের মানবদেহ পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত বলে দেহকে ভূতের বাড়ি, গুরুর পিতার পতন হতেই গুরুর জন্ম বলে গুরুর মরাগরু ভোজন এবং উপমানপদ দ্বারা নির্মিত বর্ণনাকে গুরুর উল্টাপাল্টা কথা বলে অভিহিত করেছেন।
কাঁইজি ভূতের বাড়ির উপমান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন সেখানে স্বর্গ-মর্ত্য ও পাতাল অবধি তিনটিভূত থাবা ধরে থাকে। আবার সেখানে পঞ্চভূতের খেলা চলমান। সামান্য ত্রুটি হলেই বড় বিপদের মধ্যে পড়তে হবে। সেখানে লালজলের একটি দীঘি আছে তার ওপর মরাগরুও বাতাসে উড়তে থাকে। যে দেখে মরা তারই পিছু নেয়। অবশেষে সে ব্যক্তি হায়ঃ হায়ঃ করতে করতে মারা যায়। তারপর কাঁইজি বলেছেন ভূতত্রয় তেমাথা পথে বসে থাকে। দুর্বলপুরুষ পেলেই তারা আক্রমণ করে। তারপর ত্রিশূল দ্বারা হত্যা করে এবং মরামাথাদি বাতাস দ্বারা রান্না করে। তাদের আরো একটি বৈশিষ্ট হলো শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ এক চুলায় ও এক হাঁড়িতেই পাক করে। কাঁইজি ঐ ভূতত্রয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো ভূতের বাড়ির পশ্চিমদিকে অত্যন্ত অন্ধকার একটি কুঠরি রয়েছে। মরা মানুষগুলো তারা সেখানে বন্দী রাখে। সেখানে মরারা মরাগরু খায়। যখনি কোন মরা মরাগরু খায় তখনি তাকে আবার মানবকুলে জনম নিতে হয়। মানবকুলে জনম নিলেই তাদের আবার নতুন করে সংসারের ঝায়ঝামেলা ঘাড়ে নিতে হয়। এ সংসারের দায়েই তাদের বিবেকের বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। পরিশেষে বলা যায় শিষ্যের পক্ষে গুরুর নিকট এরূপ উপমান প্রধান গীতিকাব্য উপস্থাপন করা একেবারেই বিরল। এ জন্য নিঃসন্দেহে বলা যায় এ কাব্যটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গীতি-কাব্যের মধ্যে অন্যতম হওয়ার অধিকার রাখে।
আত্মদর্শন
কাঁইজি এখানে ভূতের বাড়ি বলতে মানবদেহ, নিমন্ত্রণ বলতে যজ্ঞ আহ্বান, মরাগরু বলতে রতী, উল্টাকথা বলতে উপমানপদ, স্বর্গ বলতে বৈকুণ্ঠ, মর্ত্য বলতে বৈতরণী, পাতাল বলতে রমণী, তিনভূত বলতে ত্রিধারা, দিঘী বলতে বৈকুণ্ঠ, বাতাস বলতে শ্বাস, মরা বলতে সন্তান, তেমাথা বলতে ভৃগু, রাস্তা বলতে বৈতরণী, কাপুরুষ বলতে টল, চুলা বলতে বৈতরণী, মরামাথা বলতে বিম্বল, একপাকে সিদ্ধ বলতে কবন্ধের হাতে সবার মৃত্যু, ত্রিশূল বলতে ত্রিধারা, অমাবস্যা বলতে রজকাল, পশ্চিম বলতে নাম্ব, অন্ধকার কুঠরি বলতে বৈকুণ্ঠ, বন্দীশাল বলতে দেহ, বন্দী বলতে মানুষ, মরাগরু ভজন বলতে সন্তানপালন এবং বিচার বলতে ব্যক্তির যাবতীয় কার্যক্রমকে বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
অমাবস্যা, কাপুরুষ, কুঠরি, গরু, গুরু, গোল, চুলা, জোয়ান, তেমাথা, ত্রিশূল, দীঘি, পঞ্চভূত, পশ্চিম, পাতাল, বন্দী, বন্দীশাল, বাতাস, বালক, বৃদ্ধ, ভূত, মরা, মর্ত্য, মানুষ, সিদ্ধি, স্বর্গ। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
১.মরা গরু খাওয়া কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে সর্ব প্রকার জীব, শুক্রপাত, শুক্র ও সন্তানকে মরা বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি মরাগরু বলতে কেবল শুক্রপাতকেই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ কাঁইজি এখানে শুক্রপাত করাকে গুরুর মরাগরু খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
২.গুরুকে ভুতে ধরা কী?
উত্তর- গুরুর দেহ পঞ্চভূতে নির্মিত এবং গুরু সর্বদা পঞ্চভূতের আলোচনা করে থাকেন। এসব কারণে ঠেস মেরে বলা হয় গুরুকে ভুতে ধরেছে ও গুরু ভূতের ব্যাপারী ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রূপকথার ভুতে গুরুকে ধরবে বা গুরু কালোছায়ার কবলে পতিত হবেন এটা কল্পনাতীত।
৩.মর্ত্য ও স্বর্গ কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে দেহকে মর্ত্য এবং জ্ঞানকে স্বর্গ বা বৈতরণীকে মর্ত্য এবং বৈকুণ্ঠকে স্বর্গ বলা হয়। স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণের সূত্রটি নিচে দেওয়া হলো-
স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণ সূত্র
যখন শিষ্য মর্ত্য তখন গুরু স্বর্র্গ
যখন মন মর্ত্য তখন জ্ঞান স্বর্গ
যখন দেহ মর্ত্য তখন আত্মা স্বর্গ
যখন নারী মর্ত্য তখন নর স্বর্গ
যখন বৈতরণী মর্ত্য তখন বৈকুণ্ঠ স্বর্গ
যখন পাছধড় মর্ত্য তখন আগধড় স্বর্গ
৪.ভূত কত প্রকার?
উত্তর- ভূত দুই প্রকার। যথা- ১.ভূত ও ২.ভুত।
১.ভূত- জগৎসৃষ্টির আদি উপাদানকে ভূত বলে।
ভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
২.ভুত- রূপ কথার কালোছায়াকে ভুত বলে।
এটি অস্তিত্বহীন একটি সত্তা। কেবল কিছু কিংবদন্তি ব্যতীত এর কোন বাস্তবতা নেই। রূপকথার ভুত বলতে কালোছায়া, উপসর্গ ও প্রেতাত্মা ইত্যাদি বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে ভূত বলতে কেবল বিশ্বসৃষ্টির আদি-উপাদানাদিকে বুঝায়।
৫.পঞ্চভূত কী কী?
উত্তর- বিশ্বসৃষ্টির আদিউপাদানকে আদিভূত বা পঞ্চভূত বলা হয়। আদিভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
৬.গোল খাওয়া কী?
উত্তর- Goal (গোল) ইংরেজি শব্দ। এর অর্থ গন্তব্যস্থান, লক্ষ্য, অভিষ্ট, ‘পদগোলক’ খেলায় যে স্থানে গোলক প্রবেশ করাতে পারলে বিজয় অর্জন এগিয়ে যায়, বিজয় এগিয়ে নেওয়ার জন্য গোলক প্রবিষ্ট করানোর স্থান ইত্যাদি। সাধারণত মাঠের আবদ্ধ সীমানায় গোলক প্রবেশ করানোকে গোলক খাওয়া বা গোলক দেওয়া বুঝায় কিন্তু আলংকারিক অর্থে যে কোন বিপদের সম্মুখীন হওয়াকেই গোলক খাওয়া বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে সন্তানরূপে জন্মান্তরে যাওয়াকে গোলক খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
৭.রক্তিম-জলা দীঘি কী?
উত্তর- লালবর্ণের জলপূর্ণ দীঘিকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়। কুসুমিতাদের বৈকুণ্ঠ হতে প্রতি মাসেই রজরূপ লালজল নিঃসৃত হয়ে থাকে বলেই বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়।
৮.মরাগরু বাতাসে উড়া কী?
উত্তর- সাধারণত গরুর মড়ক বা শবকে মরাগরু বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও শুক্রপাতকে মরাগরু বলা হয়। নাসিকার শ্বাসের গতিবেগের দ্বারা শুক্ররূপ মরাগরু সৃষ্টি হয় বলে বলন কাঁইজি রূপকার্থে মরাগরু বাতাসে উড়ার কথা বলেছেন।
৯.মরার পিছু নেওয়া কী?
উত্তর- অনেক প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন- ১.প্রয়াণ ২.ঘুম ৩.অজ্ঞান ৪.দীক্ষাগ্রহণ ৫.পাণিগ্রহণ ৬.অখ-তা ৭.শুক্রধর ৮.শুক্রপাত ৯.সন্তানগ্রহণ ১০.কবন্ধ ১১.শিশ্ন ১২.সন্তান ১৩.বৈরাগ্য ১৪.সংযম ১৫.মড়ক ১৬.পরিত্যক্ত ১৭.শুকানো ও ১৮.বিপদগ্রস্থ ইত্যাদি। তবে এখানে কাঁইজি মরা পিছু নেওয়া বলতে কেবল অজ্ঞনতা শুক্রপাত ও বিপদগ্রস্থ হওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন।
১০. তেমাথা কী?
উত্তর- তিনটি পথের মোড়কে তেমাথা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল ত্রিবেণীকে তেমাথা বলা হয়। ত্রিবেণী দ্বারা লাল, সাদা ও কালো এ তিনটি ধারা প্রবাহিত হয় বলেই একে তেমাথা, ত্রিপুর ও ত্রিবেণী ইত্যাদি বলা হয়।
১১. কাপুরুষ কে?
উত্তর- সাধারণত ভয়ে কর্তব্যচ্যুত হয় বা আত্মসম্মান বিসর্জন দেয় এরূপ ব্যক্তিকে কাপরুষ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কাপুরুষ বলতে কেবল গমনপথে শুক্রপাতকারীদের বুঝানো হয়। পুরুষত্বহীন বলেই এদের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১২.জলের চুলায় মরা-মাথা বাতাসে রান্না করা কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে জলের চুলা বলতে বৈকুণ্ঠ, মরামাথা বলতে শুক্র এবং বাতাস বলতে নাসিকার শ্বাসকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ নাসিকার শ্বাসরূপ বাতাস দ্বারা শুক্ররূপ মরামাথা সৃষ্টি করে জলের চুলারূপ বৈকুণ্ঠে নিষিক্ত করাকে কাঁইজি জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করা বলে অভিহিত করেছেন।
১৩.একপাকে সব সিদ্ধ করা কী?
উত্তর- বৈতরণী এমনই এক স্বর্গীয়নদী যে এ নদীতে সবাই নৌকা বাইতে পারেন। মাঝির বৈঠা ছোট হলে নদীটি আপনা অপনিই সংকোচিত হয় এবং বৈঠা বড় হলে তা আপনাপনিই স্ফীত হয়ে থাকে। আর্থাৎ বৈঠাসই জল নির্ধারণ করাই স্বর্গীয়নদীটির বিশেষ বৈশিষ্ট। তদ্রূপ বৈকুণ্ঠও এমনই এক স্বর্গীয়চুলা যে এখানে অম্বুক হতে হাতি পর্যন্ত নিষিক্ত হয়ে থাকে। গরুও যেভাবে নিষিক্ত করে হাতিও ঠিক সেরূপেই নিষিক্ত করে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণ এ প্রক্রিয়াকেই কাঁইজি সব একপাকে সিদ্ধ হওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
১৪. ত্রিশূলবিদ্ধ করা কী?
উত্তর- সাধারণত ত্রিফলাযুক্ত অস্ত্র দ্বারা বিদ্ধ করে প্রাণীবধ করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে বাণ স্থাপন করার পর ভগপথেই শুক্রপাত করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয়। এখানে কাঁইজি কবন্ধে ইন্দ্রিয় স্থাপনপূর্বক আত্মহত্যা করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
১৫. অমাবস্যা কী?
উত্তর- সাধারণত চন্দ্রকলার অদৃশ্য হওয়াকে অমাবস্যা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজকালকে অমাবস্যা বলা হয়। উল্লেখ্য এ সূত্রটি পৃথিবীর সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকার মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। এসব সূত্রের কোন প্রকার পরিবর্তন নেই।
১৬. ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি কী?
উত্তর- দেহধামকে ভূতের বাড়ি, আগধড়কে পশ্চিম, পাছধড়কে পূর্ব এবং বৈকুণ্ঠকে অন্ধকার কুঠরি বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ কুঠরিটি দেহের পশ্চিমদিকে অবস্থিত বলে বৈকুণ্ঠকে ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি বলা হয়।
১৭. মরা-মানুষ বন্দি করার রহস্য কী?
উত্তর- সাধারণত যে কোন মড়ক বা শবকে মরা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র, শুক্রপাত ও সন্তান ইত্যাদিকে মরা বলা হয়। সন্তানরূপ মরাকে বৈকুণ্ঠে ১০ মাস বন্দী রাখা হয় বলে কাঁইজি সন্তানের গর্ভকালকে বন্দীকৃত মরামানুষ বলে অভিহিত করেছেন।
১৮. মরা-গরু খাওয়ার বিচার কী?
উত্তর- বিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজি মরা-গরু খাওয়া বলতে সন্তানগ্রহণ করাকে বুঝিয়েছেন এবং মরা-গরু খাওয়ার বিচার বলতে এক জনমের দণ্ডের কথা বলেছেন। এক জনমের দণ্ড বলতে রূপক সাহিত্যে পিতা-মাতার সন্তান লালনপালন করা এবং সন্তানের সংসার যাতনা সহ্য করা বুঝায়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী)
লেখকঃ খোরশেদ আলম
————————————————————-
“ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে
তার উল্টাপাল্টা কথায় বুঝি ভুতে ধরেছে।
স্বর্গ-মর্ত্য পাতাল জোড়া তিনভূতের করাল থাবা
পঞ্চভূতে করছে খেলা ফাঁক দিলে গোল খাবা
রক্তিমজলা দীঘির পাশে
মরাগরু উড়ে বাতাসে
মরে শেষে হায়-হুতাশে
মরা তার পিছু নিয়েছে।
তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে
জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে
জোয়ান কী বালক বৃদ্ধ
একপাকে করে সিদ্ধ
কত করে ত্রিশূল বিদ্ধ
অমাবস্যার পরে সে।
ভূতের বাড়ির পশ্চিমে অন্ধকার যে কুঠরি
ঐ বন্দিশালে বন্দি রাখে মরামানুষ ধরি ধরি
করে মরা গরু ভজনা
বিচারপালা হয় সূচনা
বলন কয় সে ভেদখানা
জানাও গো আমার কাছে।”
সারমর্ম
বাংলাভাষার প্রখ্যাত গীতিকার, বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি একটি উপমান প্রধান গীতিকাব্য। কাঁইজি এখানে টলন, ভ্রূণধারণ এবং প্রসব ইত্যাদি বিষয়ের সুনিপুণ ও সারগর্ভ আলোচনা তুলে ধরেছেন।
আমাদের মানবদেহ পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত বলে দেহকে ভূতের বাড়ি, গুরুর পিতার পতন হতেই গুরুর জন্ম বলে গুরুর মরাগরু ভোজন এবং উপমানপদ দ্বারা নির্মিত বর্ণনাকে গুরুর উল্টাপাল্টা কথা বলে অভিহিত করেছেন।
কাঁইজি ভূতের বাড়ির উপমান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন সেখানে স্বর্গ-মর্ত্য ও পাতাল অবধি তিনটিভূত থাবা ধরে থাকে। আবার সেখানে পঞ্চভূতের খেলা চলমান। সামান্য ত্রুটি হলেই বড় বিপদের মধ্যে পড়তে হবে। সেখানে লালজলের একটি দীঘি আছে তার ওপর মরাগরুও বাতাসে উড়তে থাকে। যে দেখে মরা তারই পিছু নেয়। অবশেষে সে ব্যক্তি হায়ঃ হায়ঃ করতে করতে মারা যায়। তারপর কাঁইজি বলেছেন ভূতত্রয় তেমাথা পথে বসে থাকে। দুর্বলপুরুষ পেলেই তারা আক্রমণ করে। তারপর ত্রিশূল দ্বারা হত্যা করে এবং মরামাথাদি বাতাস দ্বারা রান্না করে। তাদের আরো একটি বৈশিষ্ট হলো শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ এক চুলায় ও এক হাঁড়িতেই পাক করে। কাঁইজি ঐ ভূতত্রয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো ভূতের বাড়ির পশ্চিমদিকে অত্যন্ত অন্ধকার একটি কুঠরি রয়েছে। মরা মানুষগুলো তারা সেখানে বন্দী রাখে। সেখানে মরারা মরাগরু খায়। যখনি কোন মরা মরাগরু খায় তখনি তাকে আবার মানবকুলে জনম নিতে হয়। মানবকুলে জনম নিলেই তাদের আবার নতুন করে সংসারের ঝায়ঝামেলা ঘাড়ে নিতে হয়। এ সংসারের দায়েই তাদের বিবেকের বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। পরিশেষে বলা যায় শিষ্যের পক্ষে গুরুর নিকট এরূপ উপমান প্রধান গীতিকাব্য উপস্থাপন করা একেবারেই বিরল। এ জন্য নিঃসন্দেহে বলা যায় এ কাব্যটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গীতি-কাব্যের মধ্যে অন্যতম হওয়ার অধিকার রাখে।
আত্মদর্শন
কাঁইজি এখানে ভূতের বাড়ি বলতে মানবদেহ, নিমন্ত্রণ বলতে যজ্ঞ আহ্বান, মরাগরু বলতে রতী, উল্টাকথা বলতে উপমানপদ, স্বর্গ বলতে বৈকুণ্ঠ, মর্ত্য বলতে বৈতরণী, পাতাল বলতে রমণী, তিনভূত বলতে ত্রিধারা, দিঘী বলতে বৈকুণ্ঠ, বাতাস বলতে শ্বাস, মরা বলতে সন্তান, তেমাথা বলতে ভৃগু, রাস্তা বলতে বৈতরণী, কাপুরুষ বলতে টল, চুলা বলতে বৈতরণী, মরামাথা বলতে বিম্বল, একপাকে সিদ্ধ বলতে কবন্ধের হাতে সবার মৃত্যু, ত্রিশূল বলতে ত্রিধারা, অমাবস্যা বলতে রজকাল, পশ্চিম বলতে নাম্ব, অন্ধকার কুঠরি বলতে বৈকুণ্ঠ, বন্দীশাল বলতে দেহ, বন্দী বলতে মানুষ, মরাগরু ভজন বলতে সন্তানপালন এবং বিচার বলতে ব্যক্তির যাবতীয় কার্যক্রমকে বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
অমাবস্যা, কাপুরুষ, কুঠরি, গরু, গুরু, গোল, চুলা, জোয়ান, তেমাথা, ত্রিশূল, দীঘি, পঞ্চভূত, পশ্চিম, পাতাল, বন্দী, বন্দীশাল, বাতাস, বালক, বৃদ্ধ, ভূত, মরা, মর্ত্য, মানুষ, সিদ্ধি, স্বর্গ। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
১.মরা গরু খাওয়া কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে সর্ব প্রকার জীব, শুক্রপাত, শুক্র ও সন্তানকে মরা বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি মরাগরু বলতে কেবল শুক্রপাতকেই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ কাঁইজি এখানে শুক্রপাত করাকে গুরুর মরাগরু খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
২.গুরুকে ভুতে ধরা কী?
উত্তর- গুরুর দেহ পঞ্চভূতে নির্মিত এবং গুরু সর্বদা পঞ্চভূতের আলোচনা করে থাকেন। এসব কারণে ঠেস মেরে বলা হয় গুরুকে ভুতে ধরেছে ও গুরু ভূতের ব্যাপারী ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রূপকথার ভুতে গুরুকে ধরবে বা গুরু কালোছায়ার কবলে পতিত হবেন এটা কল্পনাতীত।
৩.মর্ত্য ও স্বর্গ কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে দেহকে মর্ত্য এবং জ্ঞানকে স্বর্গ বা বৈতরণীকে মর্ত্য এবং বৈকুণ্ঠকে স্বর্গ বলা হয়। স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণের সূত্রটি নিচে দেওয়া হলো-
স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণ সূত্র
যখন শিষ্য মর্ত্য তখন গুরু স্বর্র্গ
যখন মন মর্ত্য তখন জ্ঞান স্বর্গ
যখন দেহ মর্ত্য তখন আত্মা স্বর্গ
যখন নারী মর্ত্য তখন নর স্বর্গ
যখন বৈতরণী মর্ত্য তখন বৈকুণ্ঠ স্বর্গ
যখন পাছধড় মর্ত্য তখন আগধড় স্বর্গ
৪.ভূত কত প্রকার?
উত্তর- ভূত দুই প্রকার। যথা- ১.ভূত ও ২.ভুত।
১.ভূত- জগৎসৃষ্টির আদি উপাদানকে ভূত বলে।
ভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
২.ভুত- রূপ কথার কালোছায়াকে ভুত বলে।
এটি অস্তিত্বহীন একটি সত্তা। কেবল কিছু কিংবদন্তি ব্যতীত এর কোন বাস্তবতা নেই। রূপকথার ভুত বলতে কালোছায়া, উপসর্গ ও প্রেতাত্মা ইত্যাদি বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে ভূত বলতে কেবল বিশ্বসৃষ্টির আদি-উপাদানাদিকে বুঝায়।
৫.পঞ্চভূত কী কী?
উত্তর- বিশ্বসৃষ্টির আদিউপাদানকে আদিভূত বা পঞ্চভূত বলা হয়। আদিভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
৬.গোল খাওয়া কী?
উত্তর- Goal (গোল) ইংরেজি শব্দ। এর অর্থ গন্তব্যস্থান, লক্ষ্য, অভিষ্ট, ‘পদগোলক’ খেলায় যে স্থানে গোলক প্রবেশ করাতে পারলে বিজয় অর্জন এগিয়ে যায়, বিজয় এগিয়ে নেওয়ার জন্য গোলক প্রবিষ্ট করানোর স্থান ইত্যাদি। সাধারণত মাঠের আবদ্ধ সীমানায় গোলক প্রবেশ করানোকে গোলক খাওয়া বা গোলক দেওয়া বুঝায় কিন্তু আলংকারিক অর্থে যে কোন বিপদের সম্মুখীন হওয়াকেই গোলক খাওয়া বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে সন্তানরূপে জন্মান্তরে যাওয়াকে গোলক খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
৭.রক্তিম-জলা দীঘি কী?
উত্তর- লালবর্ণের জলপূর্ণ দীঘিকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়। কুসুমিতাদের বৈকুণ্ঠ হতে প্রতি মাসেই রজরূপ লালজল নিঃসৃত হয়ে থাকে বলেই বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়।
৮.মরাগরু বাতাসে উড়া কী?
উত্তর- সাধারণত গরুর মড়ক বা শবকে মরাগরু বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও শুক্রপাতকে মরাগরু বলা হয়। নাসিকার শ্বাসের গতিবেগের দ্বারা শুক্ররূপ মরাগরু সৃষ্টি হয় বলে বলন কাঁইজি রূপকার্থে মরাগরু বাতাসে উড়ার কথা বলেছেন।
৯.মরার পিছু নেওয়া কী?
উত্তর- অনেক প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন- ১.প্রয়াণ ২.ঘুম ৩.অজ্ঞান ৪.দীক্ষাগ্রহণ ৫.পাণিগ্রহণ ৬.অখ-তা ৭.শুক্রধর ৮.শুক্রপাত ৯.সন্তানগ্রহণ ১০.কবন্ধ ১১.শিশ্ন ১২.সন্তান ১৩.বৈরাগ্য ১৪.সংযম ১৫.মড়ক ১৬.পরিত্যক্ত ১৭.শুকানো ও ১৮.বিপদগ্রস্থ ইত্যাদি। তবে এখানে কাঁইজি মরা পিছু নেওয়া বলতে কেবল অজ্ঞনতা শুক্রপাত ও বিপদগ্রস্থ হওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন।
১০. তেমাথা কী?
উত্তর- তিনটি পথের মোড়কে তেমাথা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল ত্রিবেণীকে তেমাথা বলা হয়। ত্রিবেণী দ্বারা লাল, সাদা ও কালো এ তিনটি ধারা প্রবাহিত হয় বলেই একে তেমাথা, ত্রিপুর ও ত্রিবেণী ইত্যাদি বলা হয়।
১১. কাপুরুষ কে?
উত্তর- সাধারণত ভয়ে কর্তব্যচ্যুত হয় বা আত্মসম্মান বিসর্জন দেয় এরূপ ব্যক্তিকে কাপরুষ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কাপুরুষ বলতে কেবল গমনপথে শুক্রপাতকারীদের বুঝানো হয়। পুরুষত্বহীন বলেই এদের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১২.জলের চুলায় মরা-মাথা বাতাসে রান্না করা কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে জলের চুলা বলতে বৈকুণ্ঠ, মরামাথা বলতে শুক্র এবং বাতাস বলতে নাসিকার শ্বাসকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ নাসিকার শ্বাসরূপ বাতাস দ্বারা শুক্ররূপ মরামাথা সৃষ্টি করে জলের চুলারূপ বৈকুণ্ঠে নিষিক্ত করাকে কাঁইজি জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করা বলে অভিহিত করেছেন।
১৩.একপাকে সব সিদ্ধ করা কী?
উত্তর- বৈতরণী এমনই এক স্বর্গীয়নদী যে এ নদীতে সবাই নৌকা বাইতে পারেন। মাঝির বৈঠা ছোট হলে নদীটি আপনা অপনিই সংকোচিত হয় এবং বৈঠা বড় হলে তা আপনাপনিই স্ফীত হয়ে থাকে। আর্থাৎ বৈঠাসই জল নির্ধারণ করাই স্বর্গীয়নদীটির বিশেষ বৈশিষ্ট। তদ্রূপ বৈকুণ্ঠও এমনই এক স্বর্গীয়চুলা যে এখানে অম্বুক হতে হাতি পর্যন্ত নিষিক্ত হয়ে থাকে। গরুও যেভাবে নিষিক্ত করে হাতিও ঠিক সেরূপেই নিষিক্ত করে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণ এ প্রক্রিয়াকেই কাঁইজি সব একপাকে সিদ্ধ হওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
১৪. ত্রিশূলবিদ্ধ করা কী?
উত্তর- সাধারণত ত্রিফলাযুক্ত অস্ত্র দ্বারা বিদ্ধ করে প্রাণীবধ করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে বাণ স্থাপন করার পর ভগপথেই শুক্রপাত করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয়। এখানে কাঁইজি কবন্ধে ইন্দ্রিয় স্থাপনপূর্বক আত্মহত্যা করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
১৫. অমাবস্যা কী?
উত্তর- সাধারণত চন্দ্রকলার অদৃশ্য হওয়াকে অমাবস্যা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজকালকে অমাবস্যা বলা হয়। উল্লেখ্য এ সূত্রটি পৃথিবীর সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকার মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। এসব সূত্রের কোন প্রকার পরিবর্তন নেই।
১৬. ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি কী?
উত্তর- দেহধামকে ভূতের বাড়ি, আগধড়কে পশ্চিম, পাছধড়কে পূর্ব এবং বৈকুণ্ঠকে অন্ধকার কুঠরি বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ কুঠরিটি দেহের পশ্চিমদিকে অবস্থিত বলে বৈকুণ্ঠকে ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি বলা হয়।
১৭. মরা-মানুষ বন্দি করার রহস্য কী?
উত্তর- সাধারণত যে কোন মড়ক বা শবকে মরা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র, শুক্রপাত ও সন্তান ইত্যাদিকে মরা বলা হয়। সন্তানরূপ মরাকে বৈকুণ্ঠে ১০ মাস বন্দী রাখা হয় বলে কাঁইজি সন্তানের গর্ভকালকে বন্দীকৃত মরামানুষ বলে অভিহিত করেছেন।
১৮. মরা-গরু খাওয়ার বিচার কী?
উত্তর- বিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজি মরা-গরু খাওয়া বলতে সন্তানগ্রহণ করাকে বুঝিয়েছেন এবং মরা-গরু খাওয়ার বিচার বলতে এক জনমের দণ্ডের কথা বলেছেন। এক জনমের দণ্ড বলতে রূপক সাহিত্যে পিতা-মাতার সন্তান লালনপালন করা এবং সন্তানের সংসার যাতনা সহ্য করা বুঝায়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী)
লেখকঃ খোরশেদ আলম
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন