শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

কারে জানাব মনের ব্যথারে

২০. কারে জানাব মনের ব্যথারে
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’(লুহানা)- বিচ্ছেদ
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)- খেমটা
————————————————————-
“কারে জানাব মনের ব্যথারে
কইলে ব্যথা সারে না
কোথায় রইলে দয়ালবন্ধু
একবার দেখা দাও না।
আমার ভূতেন্দ্রিয় পঞ্চজন
আমারে করিল হীন
তিনশোষাটটি রইল ঋণ
পরিমাপ ঠিক হলো না।
আমার দ্বারেন্দ্রিয় নয়জনা
কারো কথা কেউ মানে না
চুরাশিতল এ ঘরখানা
রক্ষা বুঝি হলো না।
তিনশোতেত্রিশ দেব ছিল
একে একে বিদায় নিলো
বলন কয় দু’টি ফল
আমায় এনে দেখাও না।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বাংলাভাষার মসিসংগ্রামী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এ বলনটির মধ্যে একজন বিদগ্ধ সাধকের হৃদয় বিদারক করুণ আকুতি অনুপমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।বিদগ্ধ সাধকের আর্তনাদ হলো দয়াল সাঁইয়ের জন্য এত সাধনভজন করেও তিনি সাঁইয়ের দেখা পাননি। তিনি সাঁইয়ের দর্শন পাবার জন্য অত্যন্ত ব্যকুল।
তাঁর আরো দুঃখ হলো তাঁর ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহ্বা ও ৫.ত্বক- এ পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় তাঁকে যথাযথ জ্ঞান প্রদান করে না। তাই অমৃতসুধার ৩৬০ ধারাও তিনি আহরণ করতে পারেন না। এর কারণ সাধক নিজেই বর্ণনা করেছেন। তা হলো যমযজ্ঞের সময়ে তাপনের পরিমাপ তাঁর যথাযথ হয় না।
ব্যর্থতার আরো আত্মোভিযোগ হলো সে তাঁর বাহ্য নয়দ্বার যথাযথ শাসন করতে পারেনি। তাই তারা তাঁর বশীভূত হয়নি। এজন্য তাঁর শুক্ররক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাই তাঁর ৮৪ করের এ দেহটি রক্ষা হচ্ছে না। পরিশেষে তিনি বলেছেন যৌবনকাল বিদায় নিয়েছে। ফলে প্রতীতিরাও সব একে একে বিদায় নিচ্ছেন কিন্তু সুধা ও মধু এ দু’টি মানবফল তাঁর ভাগ্যে আর বুঝি জুটল না। কাঁইজির সর্বশেষ আকুতি হলো কেউ যদি এ দু’টি মানবফলের সন্ধান জেনে থাকেন তবে অবশ্যই তা এনে যেন তাঁকে দেখানো হয়। মূলতঃ এ কাব্যের দ্বারা কাঁইজি মানবফলের যে আকুতি প্রকাশ করেছেন তা অত্যন্ত বেদনাবিধুর বৈ নয়।
আত্মদর্শন (Theosophy) বা আত্মতত্ত্ব (Theology)
কাঁইজি এখানে ভূতিন্দ্র পঞ্চজন বলতে পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, তিনশোষাট ঋণ বলতে ৩৬০ মূর্তি, দ্বারিন্দ্র নয়জন বলতে নয়দ্বার, চুরাশিতল বলতে ৮৪ ফের, তিনশোতেত্রিশ দেব বলতে ৩৩৩ দেব এবং দু’টি ফল বলতে সাঁই ও কাঁইকে বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
দয়াল, দয়ালবন্ধু, দেব, দ্বারিন্দ্র, ফল, ভূতিন্দ্র। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)
/ ‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. পঞ্চ ভূতেন্দ্রিয় কী?
(What is the penta perceptive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে পঞ্চ-জ্ঞানেন্দ্রিয়কে ভূতেন্দ্রিয়ও বলা হয়। জ্ঞানেন্দ্রিয়াদি হলো- ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহ্বা ও ৫.ত্বক।
২. তিনশোষাট ঋণ কী?
(What is the three hundred and sixty loan?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আর্তবাদের প্রথম আর্তব হতে গতার্তবা হওয়া পর্যন্ত যৌবনকালের ৩০ বছরে প্রতিমাসে ১টি করে মোট ৩৬০টি অমৃত আগমন করে। এ ৩৬০ অমৃতকেই কাঁইজি ৩৬০ ঋণ বলে অভিহিত করেছেন।
৩. দ্বারেন্দ্রিয় নয়জন কে কে?
(Who is nine gates-organ?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে মানবের বাহ্য ৯টি দ্বারকে দ্বারিন্দ্র বলা হয়। বাহ্য ৯টি দ্বার হলো- দুই চক্ষু কোটর, দুই কর্ণ কুহর, দুই নাসারন্ধ্র, মুখগহ্বর, জলদ্বার ও মলদ্বার।
৪. চুরাশি-তলা ঘর কী?
(What is the eighty-four storied house?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে ৮৪ করবিশিষ্ট দেহকে ৮৪ তলা ঘর বলা হয়। ৮৪ কর হলো- হাতের কব্জিসহ ১ হাতে ২০ কর। এ জন্য ২ হাতে ৪০ কর। অনুরূপভাবে ২ পায়ে ৪০ কর। হাত পায়ের ৮০টি কর আবার ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ও ৪.বাতাসরূপ এ আদি চতুর্ভূতের ওপর দণ্ডায়মান। সেজন্য ৮০ কর ও ৪টি ভূতের যোগফল ৮৪। এ জন্য মানবদেহকেই রূপক সাহিত্যে ৮৪তলা ঘর বলা হয়।
৫. ৩৩৩ দেব কে কে?
(Who are 333 angel?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
ত্রিধারার ৩, তিন তারের ৩ এবং ত্রিলোকের ৩। এ তিনটি ৩কে স্থাপক সূত্র দ্বারা সরলভাবে স্থাপন করে ৩৩৩ সংখ্যাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন পবিত্র বেদে রয়েছে- “সে গাভী বসুগণের জন্য ৩৩৩টি গাভী উৎপন্ন করে। তখন প্রজাপতি সে গাভীকে রুদ্রগণকে দান করেন” (কৃষ্ণযজুর্বেদ সংহিতা সপ্তম কা-, প্রথম প্রপাঠক, য- ৫)। এছাড়াও বেদের বিভিন্ন মন্ত্রে এর আরো অনেক প্রমাণ রয়েছে। পরিশেষে বলা যায় পুরাণীদের ৩৩৩ দেব সংখ্যাটির দ্বারা ত্রিধারা, তিনতার ও ত্রিলোক বুঝায়। এছাড়া ৬৬৬৬, ৬৬৬ ও ৩৬০ এসব সংখ্যা কেবল বেদ হতেই নিষ্পন্ন হয়েছে।
৬. দু’টি ফল কী কী?
(What are two fruits?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
বৈকুণ্ঠে স্বায়ম্ভুরূপে সৃষ্ট সুধা ও মধুকে রূপক সাহিত্যে দু’টি ফল বলা হয়। যেমন কানাইশাহ বলেছেন “প্রেমের গাছে দু’টি ফল রসে করে টলমল।” বিস্তারিত জানতে হলে বিশিষ্ট আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজির ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য একান্ত অনুরোধ রইল।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী)
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন