শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

পাগল দেখি পাগলের মাস্টার (চর্তুদশ পর্ব)

১৩. পাগল দেখি পাগলের মাস্টার
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“পাগল দেখি পাগলের মাস্টার,
ছিঁড়া তার সব জোড়া দিয়ে,
বাজায় বসে ট্যাঞ্জিস্টার।
দেখাদেখি গড়ে বিদ্যালয়,
তারা গণে দিন বারাটায়,
মুখের দ্বারা সাগর শুকায়,
চাটাম মারাই সারাসার।
অনুমানের ঘোড়ায় চড়ে,
মথুরা মদিনায় ঘুরে,
বিমানযোগে আকাশে উড়ে,
চিনে না যমদুয়ার।
দিন উড়িয়ে মন আনন্দে,
শেষকালে বসে কান্দে,
অধীন বলন ছন্দ বান্ধে,
অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের জগদ্বিখ্যাত সংস্কারক, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও প্রখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এ বলনটির মধ্যে খুষ্কমূষ্ক দিশারী ও অজ্ঞ অনুসারীদের শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক ভুয়া সম্পর্কের বিয়টি অত্যন্ত চমৎকাররূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। অথবা কাঁইজি এখানে চোরে চোরে মাস্তুত ভাই বা পাগলে পাগলে খালত ভাই এ বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কাঁইজি এখানে যথার্থই বলেছেন যে পাগলরা যেরূপ ছেঁড়াছুটা তার ও লতালাকড়িরূপ বিরক্তিকর দ্রব্যাদি জোড়াতালি দিয়ে বেতার বা আলাপী নির্মাণ করে বাজানোর পায়তারা করে। কখনো দিয়াশলাইয়ের ঠোস ও টুলীর সঙ্গে তার লাগিয়ে কথা বলাবলি করে তদ্রূপ অজ্ঞ গুরু-গোঁসাইরাও শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদাদি কিংবা দর্শন ও বিজ্ঞানের খিচুড়িবৎ সামান্য কিংবা যৎকিঞ্চিৎ বা ভাসা ভাসা আনুমানিক জ্ঞান দ্বারা শিষ্য-শিষ্যা ও অনুসারীদের লালন-পালন বা প্রতিপালনের পায়তারা করে থাকেন। উল্লেখ্য বর্তমানে এক অজ্ঞ আরেকদল অজ্ঞ লোকের স্বয়ংসিদ্ধ গুরুরূপে প্রতিনিয়তই আত্মপ্রকাশ করছে। বিষয়টি একেবারেই পাগল পাগলের প্রভুর মতো হাস্যকর বৈ নয়।
অতঃপর কাঁইজি বলেছেন এসব অজ্ঞরা কেবল দেখাদেখি শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অনুষ্ঠান, পূজা ও পার্বণাদি করে যাচ্ছেন। দিনে তারকা গণনার মতো তারা প্রতিনিয়তই মিথ্যা কথা, কিংবোদন্তিময় যতসব রূপকথা, মনগড়া ব্যাখ্যা ও আনুমানিক সিদ্ধান্ত ইত্যাদি করতে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। তারা এমনভাবে কথা বলেন যে, তাদের মুখের কথায় যমুনা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। এগুলো কেবলই তাদের চাটামি বৈ নয়।
কাঁইজি আরো বলেছেন এসব অজ্ঞ, ভণ্ড ও স্বয়ংসিদ্ধ গুরু-গোঁসাইরা যুক্তি, বিজ্ঞান ও দর্শনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সব কথাই কেবল অনুমানে বলে থাকেন। সন্তান ও সংসাররূপ বিদ্যালয় নির্মাণ করে পাগলরূপী গুরু- গোঁসাইরা কানার দিবসে তারা গণনার মতো করে- পুণ্য-বাণিজ্য, স্বর্গ-বাণিজ্য, স্রষ্টা-বাণিজ্য, ধ্যান-বাণিজ্য, জপনা-বাণিজ্য এবং ভুয়া-দিব্যজ্ঞান বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছেন। কানার মনগড়া তারকা গণনার মতোই এঁদের পুরো কার্যক্রমই কেবলই মনগড়া। পক্ষান্তরে তাদের ও শিষ্যদের অতীব প্রয়োজনীয় ও সাধনীয় শুক্র ও সুধারূপ অমূল্য সম্পদ যে অবমূল্যায়ন হচ্ছে ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা তাদের কোন স্মরণও নেই। কাঁইজি আরো বলেছেন মূর্খ তাপসরা সর্বদা কেবল অনুমানের ঘোড়ায় চড়ে বেড়ান। যার যার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক বিধান অনুসারে স্বতীর্থ ভ্রমণের জন্য কেউবা বৃন্দাবন ও মথুরা আবার কেউবা মক্কা ও মদিনা ভ্রমণ করে থাকেন কিন্তু এসবের অর্থ ও তত্ত্ব সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। বকধার্মিকরা তীর্থ ভ্রমণের পর নিজেকে আরো বড় মাপের দিশারী বলে প্রকাশ করে থাকেন। এসব ভণ্ডদের ধারণা চট্টগ্রাম ও আজমীর ভ্রমণ না করলে নাকি গুরুই হওয়া যায় না।
পক্ষান্তরে যে যমদুয়ার ও যে যমের হাত হতে আত্মরক্ষা করার জন্য শিষ্যপদ গ্রহণ বা শিষ্যপদ প্রদান করার একান্ত প্রয়োজন তা তাদের জানাও নেই এবং বুঝাও নেই। সর্বশেষে কাঁইজি বলেছেন এসব অন্ধ, মতবাদান্ধ ও খুষ্ক পাগলরা হেলায় খেলায় পাগলামি ছাগলামি করে যৌবনকাল হারিয়ে বৃদ্ধকালে আস্তানা-আস্তানায় ও আশ্রম-আশ্রমে ঘুরে আশীর্বাদ ভিক্ষা করে বেড়ান এবং কঠিনভাবে অনুশোচনা করে বলতে থাকেন- “আইলাম আর গেলাম, খাইলাম আর ছুঁইলাম, ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না।” এটাই অত্যন্ত চমৎকার ব্যাপার। অত্র কাব্যে কাঁইজির উদাত্ত আহ্বান হলো- অজ্ঞদের দিশারী না হয়ে গুরু-শিষ্য সবাই দিব্যদিশারীর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করে মানবজনম ধন্য করা সবারই একান্ত প্রয়োজন।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)
/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
ঘোড়া, চাটাম, ট্যাঞ্জিস্টার, পাগল, বিদ্যালয়, বিমান, মথুরা, মদিনা, মাস্টার, যমদুয়ার, যমুনা, সাগর। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. পাগল কে? (Who is crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধীদের পাগল বলা হয় কিন্তু এখানে কাঁইজি শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গুরু-গোঁসাই এবং তাঁদের শিষ্য ও অনুসারীদের পাগল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
২. পাগলের মাস্টার কে? (Who is the master of crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
অত্র বলনে কাঁইজি পাগল বলতে খুষ্কমুষ্ক গুরু ও শিষ্য উভয়কেই বুঝিয়েছেন কিন্তু পাগলের শিক্ষক বলতে কেবল খুষ্কমূষ্ক দিশারী বা গুরু-গোঁসাইদের বুঝিয়েছেন।
৩. পাগলের ট্যাঞ্জিস্টার বাজানো কী?
(What is the transistor playing of the crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
ভাঙ্গাপচা বিরক্তিকর দ্রব্যাদি দ্বারা নির্মিত বেতারবৎ যন্ত্র মুখে বাজানোই হলো পাগলের বেতার বাজানো। কিন্তু এ অবস্থাটি আমাদের সমাজের অজ্ঞ ও অশিক্ষিত গুরু- গোঁসাইয়ের শাস্ত্রীয়, পারম্পরিক ও দার্শনিক-মতবাদ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের খিঁচুড়িবৎ আলোচনার সাথে তুলনা করেই কাঁইজি অত্র কাব্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় কী?
(What is the school of emulation construct?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
কাঁইজি অনুমানপ্রসূত মতবাদ ও দাম্পত্যকে দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় বলে অভিহিত করেছেন। এ সূত্র ধরে বলা যায় দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয়টি হলো কেবলই মানবসমাজ ও মনগড়া মতবাদ। মানবসমাজ বা মানবসভ্যতাকে এবং শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদাদিকে কাঁইজি এখানে দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় বলে অভিহিত করেছেন।
৫. মুখের দ্বারা সাগর শুকানো কী?
(What is the sea-dried by the mouth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাগর শুকানো অসম্ভব ব্যাপার। কাঁইজি এখানে পাগলদের সারশূন্য বড় বড় কথা বলাকে তাদের মুখের দ্বারা সাগর শুকানোর সাথে তুলনা করেছেন।
৬. পাগলের চাটামমারা কী? (What is the vacuous of the crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
পাগলরা অনেক সময় তাদের চোখের সামনে যা দেখে তাকেই লক্ষ্য করে বলে এটা আমার। যেমন বলা যায় রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর থানার ৭নং ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের কলণ্ঠিয়া গ্রামের কলুপাড়ার মকছেদের ছেলে বেলাল পাগলা। হেমন্তে মাঠে গেলে সে বলে- “এ মাঠের সব ধান আমার”, গমের সময়ে মাঠে গিয়ে বলে- “এ মাঠের সব গম আমার।” তদ্রূপ গাড়ি দেখলে সে বলে- “এ গাড়িটি আমার।” ভালো বাড়ি দেখলে সে বলে- “এ বাড়িটি আমার।” এছাড়া পাগলরা সব সময়ই তো বলতে থাকে- “আমি এটা করতে পারি।”, “আমি ওটা করতে পারি।” এসবকেই পাগলের চাটাম মারা বলা হয়।
চাটাম বি ১.আষাড়ে, Fantastic, Vacuous ২.অসার গল্প, আষাঢ়ে গল্প, অন্তঃসারশূন্য গল্প, Frivolous stories, fantastic stories, vacuous story
৭. অনুমানের ঘোড়া কী? (What is the assumptions horse?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
প্রমাণ, যুক্তি ও দর্শনহীন কল্পনা, ধারণা ও আলোচনাকেই অনুমান বলা হয়। এ অনুমানাদিকেই রূপক সাহিত্যে অনুমানের ঘোড়া বলা হয়। কারণ ঘোড়া যেমন দ্রুতগামী অনুমান বা অন্ধবিশ্বাসও তেমন দ্রুতগামী। এ জন্যই এ রূপক কাব্যটির মধ্যে কাঁইজি অনুমানকে ঘোড়ার সাথে তুলনা করেছেন।
৮. মথুরায় ভ্রমণ করা কী? (What is the travel at beehive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মথুরা বর্তমান ভারতের একটি বিশিষ্ট-নগরী। পুরাণী মনীষীদের একদল মনে করেন এখানে কৃষ্ণের হাতে কংসরাজের মৃত্যু হয়। আবার আরেকদল পুরাণী মনীষী বিশ্বাস করেন এটি একটি বৃহৎ-নগরী এবং এটি নির্মাণ করেছেন মধুদৈত্য। এটি যমুনানদীর দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এখানেই মহামতি শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। এছাড়া তাদের মতে এটি একটি সুমহান তীর্থস্থানও বটে। তারা আরো বলেন যে “এ তীর্থটি ভ্রমণ করা সব মানুষের একান্ত প্রয়োজন এবং এটি ভ্রমণ করা অনেক পুণ্যের কাজও বটে।”
৯. মদিনায় ভ্রমণ করা কী? (What is the travel at capital?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মদিনা বর্তমান সৌদি আরবের হেজাজের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল বিশেষ। এ অঞ্চলের মধ্যেই কুরানোক্ত মুহাম্মদের সমাধি অবস্থিত। কুরানী-মনীষীদের মতে সমাধিটি একটি সুমহান তীর্থস্থান। এটি ভ্রমণ করা সব হাজিদের একান্ত কর্তব্য। এছাড়া কুরানী মুনীষিরা আরো বলেন যে এটি দর্শন করা অনেক পুণ্যের কাজ।
১০. যম-দুয়ার কী? (What is the Annihilator door?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যমের আসা যাওয়ার তোরণকে যমদুয়ার বলা হয়। কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বৈতরণীকে যমদুয়ার বলা হয়। কারণ এই স্বর্গীয় নদী পথটি দ্বারা কামবাসনারূপ যম চলাফেরা করে থাকেন। এ দুয়ার দ্বারা যম চলাচল করে বলেই একে যমদুয়ার বলা হয়।
১১. দিন উড়ানো কী? (What is the day-squander?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
অবহেলা করে বা হেলা করে জীবনের মূল্যবান সময়কে তুচ্ছ কাজে নষ্ট করা বা আলসেমি করে নষ্ট করাকেই দিন উড়ানো বলা হয়। অর্থাৎ অজ্ঞতা ও অবহেলা করে যৌবনকাল নষ্ট করাকেই দিন উড়ানো বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন