শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

তিনমাসে আঠারো সন্তান (ত্রয়ো দশ পর্ব)

১২. তিনমাসে আঠারো সন্তান
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“তিনমাসে আঠারো সন্তান
জাতি-কুল-মান সব গেল
মানুষ না চিনে বাবা
কার সাথে বিয়া দিলো।
মেয়ে মেয়ে বেচাকেনা
পুরুষ গেলে কেউ বাঁচে না
না দিয়ে গুরু-দক্ষিণা
জনমভর ডাঙ্গায় মলো।
না জুগিয়ে পারের কড়ি
আগেই করে দৌড়াদৌড়ি
আছাড় খায় উঠানে পড়ি
ঘরে প্রবেশ কই হলো।
নিশিদিনে চোরের হানা
কী ধন লুটে টের পায় না
বলন কয় সাঁই এলো না
মহা কাল-শমন এলো।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
উপমহাদেশের বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক গীতিকার ও মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য সুবিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি উপমান পরিভাষা প্রধান একটি গীতিকাব্য। অত্র কাব্যে কাঁইজির কল্পিত অপ্সরা হলেন ‘রতী’ এবং কিংবদন্তি স্বামী হলেন স্বয়ং ‘বিম্বল’। এখানে কাঁইজি রতীর বুকফাটা করুণ আর্তনাদ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অত্র কাব্যে রতীর করুণ আর্তনাদ হলো- তাঁর বাবা-মা যাচাই না করেই বিম্বলের সাথে তাঁর বিয়ে দিয়েছেন! বিয়ের তিনমাসের মধ্যে ১৮টি সন্তান হয়েছে। উপমিত দেশের কথা উপমান দেশে প্রচার করলে তা সম্পূর্ণ উল্টা বলেই মনে হয়। কাঁইজি যে দেশের কথা বর্ণনা করেছেন তা হলো ‘উপমিতদেশ’। সে দেশের কথা বলতে গিয়ে কাঁইজি বলেছেন সেদেশে কেবল মেয়ে মেয়েই বেচাকেনা হয়। সে দেশে যিনি সঠিক পরিমাণ গুরুদক্ষিণা না দিয়ে গুরুদর্শন করতে চান তিনি ডাঙ্গাতেই মৃত্যুবরণ করেন। কাঁইজি আরো বলেছেন- যারা বৈতরণী উত্তরণ করার মতো কড়ি সংগ্রহ না করেই শূন্য-হাতে দৌড়াদৌড়ি করে, তারা যার যার ঘরের দুয়ারেই আছাড় খেয়ে মারা যায়। গুরুর ঘরে প্রবেশ করতে পারে না কোনক্রমেই। কাঁইজি আরো বলেছেন- সে দেশে রাত্রি-দিন পুরো সময় ধরেই চোর, দস্যু ও দৈত্যরূপ দুর্বৃত্তরা মূল্যবান সম্পদাদি অপহণের জন্য পুনঃপুন হানা দিতেই থাকে। দস্যু ও দুর্বৃত্তরা সাধারণ ও নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি লুটপাট করে মূল্যবান ধনরত্ন নিয়ে যায়। কিন্তু কী ধন নিয়ে যায় অজ্ঞরা তা অনুধাবনও করতে পারে না।
পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন একজন আত্মতাত্ত্বিক ও পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ ব্যতীত কোন সাধকই কেবল দেখাদেখি ও অনুমানে সাঁইদর্শন করতে পারেন না। তবুও অনেক মানুষ যৌবনকাল হেলায় খেলায় ধ্বংস করে বৃদ্ধকালে কেবল হাহুতাশ করতে থাকেন।
আত্মদর্শন (Theosophy) বা আত্মতত্ত্ব (Theology)
কাঁইজি এখানে তিনমাস বলতে ত্রিধারা এবং আঠারোসন্তান বলতে ১৮ ধামকেই বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
আছাড়, উঠান, গুরু, গুরুদক্ষিণা, ঘর, চোর, টের, ডাঙ্গা, ধন, পারের কড়ি, পুরুষ, বাবা, মহাকাল, মেয়ে১, মেয়ে২, লুট, শমন, হানা। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. তিনমাসে আঠারো সন্তান কী?
(What is eighteen children within three months?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে তিনতার বা ত্রিধারাকে তিনমাস এবং ১৮ ধামকে আঠারো সন্তান বলা হয়। তিনতার হলো- ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষুম্না। ত্রিধারা হলো- ১.লাল, ২.সাদা ও ৩.কালো। ১৮ ধাম হলো- বাবার ৪ সত্তা। যথা- ১.হাড় ২.হৃদরা ৩.শুক্র ও ৪.ঘিলু- মায়ের চার সত্তা হলো- ১.চুল ২.চামড়া ৩.মাংস ও ৪.চর্বি এবং প্রকৃতির ১০ সত্তা হলো- ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহবা ৫.ত্বক ৬.বাক্ ৭.পাণি ৮.পাদ ৯.পায়ু ও ১০.উপস্থ।
২. মেয়ে মেয়েই বেচাকেনা কী?
(What is the girl girl trading?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে অটল বা ঊর্ধ্বরেতা সাধককে মেয়ে বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী এখানে প্রথম মেয়ে অর্থ অটল এবং দ্বিতীয় মেয়ে অর্থ রজস্বলা। একমাত্র অটল অটল স্বামীই নবোঢ়া স্ত্রীর নিকট হতে প্রেমের বিনিময়ে অমৃত আহরণ করতে পারেন বলে মেয়ে মেয়েই বেচাকেনার কথা বলা হয়।
৩. গুরু-দক্ষিণা কী?
(What is the preceptor honorarium?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
গুরুদেবকে প্রদত্ত সর্ব প্রকার উপহারকে গুরু-দক্ষিণা বলা হয়। তবে প্রকৃত গুরু-দক্ষিণা হলো অটলগমন দ্বারা স্বরূপদর্শন সাধনের পূর্ণ-সময়। অর্থাৎ ১,০০০ শ্বাস বা ৪২ মিনিট সময়। কারণ এ সময় পরিপূর্ণ না করা পর্যন্ত স্বরূপদর্শন করা সম্ভব হয় না।
৪. ডাঙ্গায় মরা কী?
(What is the die at the shore?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বৈতরণীকে ডাঙ্গা এবং শুক্রপাত করাকে মরা বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী বৈতরণীতে মৃত্যুবরণ করাকে ডাঙ্গায় ডুবে মরা বলা হয়। অন্য মতে বৈকুণ্ঠকে গভীরজল এবং বৈতরণীকে ডাঙ্গা বলা হয়। এ অনুযায়ী বৈতরণীতে মৃত্যুবরণ করাকেই ডাঙ্গায় ডুবে মরা বলা হয়। যেমন- কবি মামুন নদীয়া লিখেছেন- “মামুন নদীয়া যমুনায় গিয়া ডাঙ্গায় ডুবে মরিলরে।”
৫. পারাপারের কড়ি কী?
(What is the crossing cowrie?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত নৌকার ভাড়াকে পারের কড়ি বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে সঠিক কামসাধনকে পারের কড়ি বলা হয়। যে সাধকের কামসাধন সঠিক হয়েছে সে অনায়াসে বৈতরণী পাড়ি দিতে পারেন। কিন্তু যার সাধন হয়নি সে খেয়ায় উঠে কাঞ্ছিতেই পড়ে যায় এবং পাড়ের নিকটেই ডুবে মারা যায়। সাধনরূপ কড়ি ছাড়া কেউই বৈতরণীরূপ খেয়া পার হতে পারেন না।
৬. উঠানে আছাড় খাওয়া কী?
(What is the tumble at the courtyard?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত ঘরের সামনের প্রাঙ্গন বা অঙ্গনকে উঠান এবং হঠাৎ পিছলে পড়াকে আছাড় বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে বৈতরণীকে উঠান এবং মৃত্যুবরণ করাকে আছাড় খাওয়া বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী বৈতরণীতে শুক্রপাত করাকে উঠানে আছাড় খাওয়া বলা হয়েছে।
৭. নিশিদিনে চোরের হানা কী?
(What is the burglar strikes in nightlife-day?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে রজকালকে নিশি, পবিত্রতাকে দিন এবং কামরিপুকে চোর বলা হয়। কামরিপুরূপ চোর যুবকরূপ ধনীকে ক্ষণকালও বিরাম দেয় না। সে প্রতিনিয়তই ধনীর ঘরে হানা দেয় এবং ধনীর গোলা হতে শুক্ররূপ ধন হরণ করে নিয়ে যায়। একেই কবি এখানে নিশিদিনে চোরের হানা বলে অভিহিত করেছেন।
৮. ধন লুটা কী?
(What is the riches plunder?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত সম্পদাদি হরণ করাকেই ধন লুটা বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে যৌবন, জ্ঞান, চরিত্র, শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কেবল শুক্রকেই ধন বলা হয়েছে। কামরিপু কাম প্রলোভন দিয়ে নরগণের নিকট হতে ক্রমে ক্রমেই এ সম্পদ হরণ করে নেয়। একেই ধন লুটা বলা হয়।
৯. মহাকাল শমন কী?
(What is the senility Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বিম্বল, বার্ধক্য ও প্রয়াণ ইত্যাদিকে মহাকাল বলা হয়। তবে এখানে কেবল বার্ধক্যকে মহাকাল বলা হয়েছে। এটি মানুষের চূড়ান্তকাল বলেই একে মহাকাল বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন