৮. কী শমন আইলরে জানি (জানিরে)
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কী শমন আইলরে জানি (জানিরে)
গরিব না খাইয়া মরে
(ওরে) গরিব না খাইয়া মরে
ধনীর কোঠায় মালপানি।
লেংড়া যায় পথ পাড়িতে
অন্ধ যায় জনসভাতে
বোবা যায় বক্তব্য দিতে
বয়রা শুনে বোবার বাণী।
বাদুড়ের আমদানি যেমন
মানুষের চলা তেমন
বুঝতে চায় না গুরুর বচন
খায়রে শুধু চুবানি।
পাইতে সে অমূল্যরতন
ভজ গিয়া গুরুর চরণ
ভাবিয়া কয় কাঁইজি বলন
পাবিরে ধনের খনি।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের উত্তরণের সার্থক রূপকার, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বাংলা-ভাষার সুবিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কৈশোরকাল অতিক্রম করে যৌবনকালে পদার্পণ করা এবং যুবক যুবতীর করণীয় সাধনাদির প্রতি কাঁইজি এখানে আলোকপাত করেছেন।
কাঁইজি যৌবনের আগমনকে যমের আগমন বলে উল্লেখ করেছেন। যম যেরূপ জীবকে হত্যা করে। যৌবনকালে উদিত চন্দ্রচেতনাও সেরূপ জীবকে হত্যা করে। এ জন্য কাঁইজি এরূপ তুলনা করেছেন। রূপক সাহিত্যে কুসুমিতাকে ধনী এবং যুবককে নিঃস্ব বলা হয়। এ সূত্র ধরে কাঁইজি বলেছেন স্বর্গীয় অমৃতজলের সরবরাহ কেবল কুসুমিতা-দের নিকট কিন্তু যুবকদের নিকট কেবল শুম্ভবিম্ব ব্যতীত আর কিছুই নেই।
তাই তিনি বলেছেন নিঃস্বরা অভাবে থাকেন কিন্তু বিত্তশালীদের নিকট ধনের প্রাচুর্যতা। কাঁইজি বিম্বলকে রূপকভাবে লেংড়া এবং কবন্ধকে অন্ধ বলেছেন। আবার বিম্বলকে বোবা এবং কবন্ধকে বয়রা বলে অভিহিত করেছেন। এখানে বিম্বল ও কবন্ধের কাম নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অতঃপর কাঁইজি অত্যন্ত তাচ্ছিল্য করে বলেছেন বাদুড় যেরূপ একের অনুসরণ করে অন্যেরা চলাফেরা করে, জীবকুল শ্রেষ্ঠ মানুষও তদ্রূপ কোন কিছু যাচাই-বাছাই না করেই চলাফেরা করে। মানুষ এতই অধম যে, অনেকেই স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মানতেও চান না। যারা স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মান্য করতে চান না কেবল তারাই পুনঃপুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
পরিশেষে কাঁইজি অমৃতরূপ অমূল্যধন বা অমৃতসুধা আহরণ করতে হলে বা হস্তগত করতে হলে একজন পাকা সাধকগুরুর শরণ গ্রহণ করতে বলেছেন। একজন সাধকগুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করলে অতি সহজে ঊর্ধ্বরেতা বা অটল হওয়া যায় এবং অমৃতরসেরও সন্ধানলাভ করা যায়।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
অন্ধ, কোঠা, গুরুরবচন, চুবানি, জনসভা, গরীব, ধনী, নেংড়া, পথ, বয়রা, বোবা, মালপানি, শমন। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. শমন কী? (What is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
বাংলা শমন শব্দটির অর্থ যম। কিন্তু ইংরেজি Summons (সমন) শব্দটির অর্থ বিচারালয়ে উপস্থিত হওয়ার আদেশপত্র। কাঁইজি এখানে বাংলা শমন পরিভাষাটির দ্বারা কেবল মানবের চন্দ্রচেতনাকে বুঝিয়েছেন। এ জন্য শমন অর্থ ‘চন্দ্রচেতনা’। বিচারালয়ের শমনের বলে সৈনিকরা যেভাবে অভিযুক্তকে বন্দী করে, চন্দ্রচেতনাও সেভাবে যুবক-যুবতীদের কামবাসনা দ্বরা বন্দী করে বলেই রূপক সাহিত্যে চন্দ্রচেতনাকে শমন বলা হয়।
২. শমন আসা কী? (What is Annihilator come?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত শমন বলতে যম বা বিপদাপদকে বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শমন বলতে কেবল চন্দ্রচেতনাকে বুঝায়। এখানে শমন আসা বলতে কাঁইজি কিশোর-কিশোরীর নিকট যৌবনের প্রথম ঢেউ অনুভব হওয়ার কথা বুঝিয়েছেন।
৩. গরিব কে? (Who is the poor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
‘ﻏﺭﻴﺐ’ (গরিব) আরবি শব্দ। এর অর্থ দরিদ্র, নিঃস্ব, অসহায়, বিদেশী ও আগন্তক। সাধারণত নিঃস্ব ও অসহায়কে দরিদ্র বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবককে দরিদ্র এবং যুবতীকে ধনী বলা হয়। এছাড়া রূপক সাহিত্যে কোন কোন ক্ষেত্রে যৌবনকালকেও ধনী বলে উল্লেখ করতে দেখা যায়।
৪. ধনী কে? (Who is the richest?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিত্তবান, ক্ষমতাধর ও সম্পদশালীকে ধনী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবতী ও যৌবনকালকে ধনী বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে কেবল যুবতীকেই ধনী বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যুবতীরা অমৃতরস ধারণ ও বহন করে বলে যুবতীকে ধনী বলা হয়।
৫. ধনীর কোঠায় মালপানি কী?
(What is the water resource of richest compartment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনীর কোঠা এবং অমৃতকে জলসম্পদ (মালপানি) বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি কুসুমিতাদের জঠরে অবস্থিত অমৃতকে ধনীর কোঠার জলসম্পদ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মালপানি [ﭙﺎﻨﻰ ﻤﺎﻞ] বি জলপণ্য, জলসম্পদ, জলবৎ অমৃতসুধা (আল) অর্থ, কড়ি, সম্পদ “কী শমন আইলরে জানি (জানিরে), গরিব না খাইয়া মরে, (ওরে) গরিব না খাইয়া মরে, ধনীর কোঠায় মালপানি” (বলন তত্ত্বাবলী-৭৩)। (রূপ)বি পালনকর্তা, ঈশ্বর, বুদ্ধ, পতি, স্বামী, guardian, রব (আ.ﺮﺐ) (আবি) উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ (আদৈ) খোদা (ফা.ﺨﺪﺍ), মা’বুদ (আ.ﻤﻌﺑﻭﺪ), মুহাম্মদ (আ.ﻤﺤﻤﺪ), রাসুল (আ.رَسُول) (আপ) কাওসার (আ.ﻜﻭﺛﺮ), ফুরাত (আ.ﻔﺭﺍﺖ) (ইপ) God, nectar, elixir (পরি) এরূপ তরলমানুষ যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি (সংজ্ঞা)
১.সারা জগতের পালনকর্তাকে সাঁই বলা হয়
২.দ্বিপস্থ জীবের মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনকারী শ্বেতবর্ণের জীবজলকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে সাঁই বলা হয় (দেপ্র) পালনকর্তা পরিবারের রূপকসদস্য ও রূপক সাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতিবিশেষ (ছনা) ঈশ্বর, চোর, পরমগুরু, প্রভু (চরি) লালন (উপ) অমৃতসুধা, উপাস্য, গ্রন্থ, চন্দ্র, ধন, ননি, পাখি, ফল, স্বর্গীয়ান্ন (রূ) সাঁই (দেত) পালনকর্তা {আ.মাল.ﻤﺎﻞ+ হি.পানি. ﭙﺎﻨﻰ}
৬. লেংড়া কে? (Who is lame?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিকল পেয়ে ব্যক্তিকে লেংড়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে লেংড়া বলা হয়। বিম্বলের পা নেই তবু সে লাফিয়ে লাফিয়ে গমনাগমন করতে পারে বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৭. অন্ধ কে? (Who is blind?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত চোখে দেখে না এরূপ ব্যক্তিকে অন্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে অন্ধ বলা হয়। কবন্ধের চোখ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৮. বোবা কে? (Who is dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বল কথা বলতে পারে না বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৯. বয়রা কে? (Who is deaf?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে বয়রা বলা হয়। কবন্ধের শ্রবণ করার মতো কর্ণ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১০. বয়রা বোবার বাণী শোনে কিভাবে?
(How to hear the deaf the word of the dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা এবং মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কবন্ধকে বয়রা এবং বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বলের যমযজ্ঞের আহ্বানে কবন্ধের সাঁড়া দেওয়াকে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি বয়রার বোবার বাণী শোনার সাথে তুলনা করেছেন।
১১. চুবানি খাওয়া কী? (What is the immersion eat?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত জলের মাঝে পড়ে গিয়ে জলাদি পান করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যমযজ্ঞে গিয়ে শুক্রপাতরূপ আত্মহত্যা করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয়।
১২. অমূল্যরতন কী? (What is invaluable wealth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অনেক মূল্যবান দ্রব্যকে অমূল্যরতন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধারূপ অমৃতরসদ্বয়কে অমূল্যরতন বলা হয়।
১৩. গুরুর চরণ কী? (What is the preceptor’s leg?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে চার প্রকার চরণের সন্ধান পাওয়া যায়।
১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
নিচে এদের বিবরণ দেওয়া হলো।
অভয়চরণ/Fearless Leg/ ‘قدم بلا خوف’ (কুদুম বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ/Pairs Leg/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ/ Flushed Leg/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজণের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ/ Excellent Leg/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে। ২.রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে শ্রীচরণ বলে।
বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বলন কাঁইজি গুরুর চরণ বলতে এখানে কেবল সাঁই ও কাঁইরূপ পরমগুরুর দর্শনলাভের কথা বুঝিয়েছেন।
১৪. গুরুর চরণ ভজতে হয় কিভাবে?
(How to chant the leg of preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে প্রকৃত গুরু বলতে কেবল সাঁই ও কাঁইকেই বুঝায়। এ জন্য সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাকেই গুরুর চরণ ভজন করা বলা হয়। এ মতানুসারে বলা যায় সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাই হলো গুরুর চরণ ভজন করা।
১৫. ধন কী? (What is riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান ও যৌবন ইত্যাদিকে সম্পদ বা ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি কেবল সুধাকেই ধন বলে অভিহিত করেছেন।
১৬. ধনের খনি কী? (What is the mine of riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত খনিজ সম্পদের অবস্থান অঞ্চলকে খনি বলা হয়। তবে অনেক মূল্যবান ধনের গচ্ছিত ভাণ্ডার ধনের খনি বলা হয়। পক্ষান্তরে রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনের খনি বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কী শমন আইলরে জানি (জানিরে)
গরিব না খাইয়া মরে
(ওরে) গরিব না খাইয়া মরে
ধনীর কোঠায় মালপানি।
লেংড়া যায় পথ পাড়িতে
অন্ধ যায় জনসভাতে
বোবা যায় বক্তব্য দিতে
বয়রা শুনে বোবার বাণী।
বাদুড়ের আমদানি যেমন
মানুষের চলা তেমন
বুঝতে চায় না গুরুর বচন
খায়রে শুধু চুবানি।
পাইতে সে অমূল্যরতন
ভজ গিয়া গুরুর চরণ
ভাবিয়া কয় কাঁইজি বলন
পাবিরে ধনের খনি।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের উত্তরণের সার্থক রূপকার, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বাংলা-ভাষার সুবিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কৈশোরকাল অতিক্রম করে যৌবনকালে পদার্পণ করা এবং যুবক যুবতীর করণীয় সাধনাদির প্রতি কাঁইজি এখানে আলোকপাত করেছেন।
কাঁইজি যৌবনের আগমনকে যমের আগমন বলে উল্লেখ করেছেন। যম যেরূপ জীবকে হত্যা করে। যৌবনকালে উদিত চন্দ্রচেতনাও সেরূপ জীবকে হত্যা করে। এ জন্য কাঁইজি এরূপ তুলনা করেছেন। রূপক সাহিত্যে কুসুমিতাকে ধনী এবং যুবককে নিঃস্ব বলা হয়। এ সূত্র ধরে কাঁইজি বলেছেন স্বর্গীয় অমৃতজলের সরবরাহ কেবল কুসুমিতা-দের নিকট কিন্তু যুবকদের নিকট কেবল শুম্ভবিম্ব ব্যতীত আর কিছুই নেই।
তাই তিনি বলেছেন নিঃস্বরা অভাবে থাকেন কিন্তু বিত্তশালীদের নিকট ধনের প্রাচুর্যতা। কাঁইজি বিম্বলকে রূপকভাবে লেংড়া এবং কবন্ধকে অন্ধ বলেছেন। আবার বিম্বলকে বোবা এবং কবন্ধকে বয়রা বলে অভিহিত করেছেন। এখানে বিম্বল ও কবন্ধের কাম নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অতঃপর কাঁইজি অত্যন্ত তাচ্ছিল্য করে বলেছেন বাদুড় যেরূপ একের অনুসরণ করে অন্যেরা চলাফেরা করে, জীবকুল শ্রেষ্ঠ মানুষও তদ্রূপ কোন কিছু যাচাই-বাছাই না করেই চলাফেরা করে। মানুষ এতই অধম যে, অনেকেই স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মানতেও চান না। যারা স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মান্য করতে চান না কেবল তারাই পুনঃপুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
পরিশেষে কাঁইজি অমৃতরূপ অমূল্যধন বা অমৃতসুধা আহরণ করতে হলে বা হস্তগত করতে হলে একজন পাকা সাধকগুরুর শরণ গ্রহণ করতে বলেছেন। একজন সাধকগুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করলে অতি সহজে ঊর্ধ্বরেতা বা অটল হওয়া যায় এবং অমৃতরসেরও সন্ধানলাভ করা যায়।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
অন্ধ, কোঠা, গুরুরবচন, চুবানি, জনসভা, গরীব, ধনী, নেংড়া, পথ, বয়রা, বোবা, মালপানি, শমন। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. শমন কী? (What is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
বাংলা শমন শব্দটির অর্থ যম। কিন্তু ইংরেজি Summons (সমন) শব্দটির অর্থ বিচারালয়ে উপস্থিত হওয়ার আদেশপত্র। কাঁইজি এখানে বাংলা শমন পরিভাষাটির দ্বারা কেবল মানবের চন্দ্রচেতনাকে বুঝিয়েছেন। এ জন্য শমন অর্থ ‘চন্দ্রচেতনা’। বিচারালয়ের শমনের বলে সৈনিকরা যেভাবে অভিযুক্তকে বন্দী করে, চন্দ্রচেতনাও সেভাবে যুবক-যুবতীদের কামবাসনা দ্বরা বন্দী করে বলেই রূপক সাহিত্যে চন্দ্রচেতনাকে শমন বলা হয়।
২. শমন আসা কী? (What is Annihilator come?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত শমন বলতে যম বা বিপদাপদকে বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শমন বলতে কেবল চন্দ্রচেতনাকে বুঝায়। এখানে শমন আসা বলতে কাঁইজি কিশোর-কিশোরীর নিকট যৌবনের প্রথম ঢেউ অনুভব হওয়ার কথা বুঝিয়েছেন।
৩. গরিব কে? (Who is the poor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
‘ﻏﺭﻴﺐ’ (গরিব) আরবি শব্দ। এর অর্থ দরিদ্র, নিঃস্ব, অসহায়, বিদেশী ও আগন্তক। সাধারণত নিঃস্ব ও অসহায়কে দরিদ্র বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবককে দরিদ্র এবং যুবতীকে ধনী বলা হয়। এছাড়া রূপক সাহিত্যে কোন কোন ক্ষেত্রে যৌবনকালকেও ধনী বলে উল্লেখ করতে দেখা যায়।
৪. ধনী কে? (Who is the richest?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিত্তবান, ক্ষমতাধর ও সম্পদশালীকে ধনী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবতী ও যৌবনকালকে ধনী বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে কেবল যুবতীকেই ধনী বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যুবতীরা অমৃতরস ধারণ ও বহন করে বলে যুবতীকে ধনী বলা হয়।
৫. ধনীর কোঠায় মালপানি কী?
(What is the water resource of richest compartment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনীর কোঠা এবং অমৃতকে জলসম্পদ (মালপানি) বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি কুসুমিতাদের জঠরে অবস্থিত অমৃতকে ধনীর কোঠার জলসম্পদ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মালপানি [ﭙﺎﻨﻰ ﻤﺎﻞ] বি জলপণ্য, জলসম্পদ, জলবৎ অমৃতসুধা (আল) অর্থ, কড়ি, সম্পদ “কী শমন আইলরে জানি (জানিরে), গরিব না খাইয়া মরে, (ওরে) গরিব না খাইয়া মরে, ধনীর কোঠায় মালপানি” (বলন তত্ত্বাবলী-৭৩)। (রূপ)বি পালনকর্তা, ঈশ্বর, বুদ্ধ, পতি, স্বামী, guardian, রব (আ.ﺮﺐ) (আবি) উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ (আদৈ) খোদা (ফা.ﺨﺪﺍ), মা’বুদ (আ.ﻤﻌﺑﻭﺪ), মুহাম্মদ (আ.ﻤﺤﻤﺪ), রাসুল (আ.رَسُول) (আপ) কাওসার (আ.ﻜﻭﺛﺮ), ফুরাত (আ.ﻔﺭﺍﺖ) (ইপ) God, nectar, elixir (পরি) এরূপ তরলমানুষ যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি (সংজ্ঞা)
১.সারা জগতের পালনকর্তাকে সাঁই বলা হয়
২.দ্বিপস্থ জীবের মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনকারী শ্বেতবর্ণের জীবজলকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে সাঁই বলা হয় (দেপ্র) পালনকর্তা পরিবারের রূপকসদস্য ও রূপক সাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতিবিশেষ (ছনা) ঈশ্বর, চোর, পরমগুরু, প্রভু (চরি) লালন (উপ) অমৃতসুধা, উপাস্য, গ্রন্থ, চন্দ্র, ধন, ননি, পাখি, ফল, স্বর্গীয়ান্ন (রূ) সাঁই (দেত) পালনকর্তা {আ.মাল.ﻤﺎﻞ+ হি.পানি. ﭙﺎﻨﻰ}
৬. লেংড়া কে? (Who is lame?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিকল পেয়ে ব্যক্তিকে লেংড়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে লেংড়া বলা হয়। বিম্বলের পা নেই তবু সে লাফিয়ে লাফিয়ে গমনাগমন করতে পারে বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৭. অন্ধ কে? (Who is blind?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত চোখে দেখে না এরূপ ব্যক্তিকে অন্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে অন্ধ বলা হয়। কবন্ধের চোখ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৮. বোবা কে? (Who is dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বল কথা বলতে পারে না বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৯. বয়রা কে? (Who is deaf?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে বয়রা বলা হয়। কবন্ধের শ্রবণ করার মতো কর্ণ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১০. বয়রা বোবার বাণী শোনে কিভাবে?
(How to hear the deaf the word of the dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা এবং মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কবন্ধকে বয়রা এবং বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বলের যমযজ্ঞের আহ্বানে কবন্ধের সাঁড়া দেওয়াকে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি বয়রার বোবার বাণী শোনার সাথে তুলনা করেছেন।
১১. চুবানি খাওয়া কী? (What is the immersion eat?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত জলের মাঝে পড়ে গিয়ে জলাদি পান করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যমযজ্ঞে গিয়ে শুক্রপাতরূপ আত্মহত্যা করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয়।
১২. অমূল্যরতন কী? (What is invaluable wealth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অনেক মূল্যবান দ্রব্যকে অমূল্যরতন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধারূপ অমৃতরসদ্বয়কে অমূল্যরতন বলা হয়।
১৩. গুরুর চরণ কী? (What is the preceptor’s leg?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে চার প্রকার চরণের সন্ধান পাওয়া যায়।
১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
নিচে এদের বিবরণ দেওয়া হলো।
অভয়চরণ/Fearless Leg/ ‘قدم بلا خوف’ (কুদুম বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ/Pairs Leg/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ/ Flushed Leg/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজণের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ/ Excellent Leg/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে। ২.রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে শ্রীচরণ বলে।
বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বলন কাঁইজি গুরুর চরণ বলতে এখানে কেবল সাঁই ও কাঁইরূপ পরমগুরুর দর্শনলাভের কথা বুঝিয়েছেন।
১৪. গুরুর চরণ ভজতে হয় কিভাবে?
(How to chant the leg of preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে প্রকৃত গুরু বলতে কেবল সাঁই ও কাঁইকেই বুঝায়। এ জন্য সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাকেই গুরুর চরণ ভজন করা বলা হয়। এ মতানুসারে বলা যায় সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাই হলো গুরুর চরণ ভজন করা।
১৫. ধন কী? (What is riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান ও যৌবন ইত্যাদিকে সম্পদ বা ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি কেবল সুধাকেই ধন বলে অভিহিত করেছেন।
১৬. ধনের খনি কী? (What is the mine of riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত খনিজ সম্পদের অবস্থান অঞ্চলকে খনি বলা হয়। তবে অনেক মূল্যবান ধনের গচ্ছিত ভাণ্ডার ধনের খনি বলা হয়। পক্ষান্তরে রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনের খনি বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন