শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

“হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর (নবম পর্ব)

৭. হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর
রাগিণী/ (Tune) ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“হায়ঃ হায়ঃরে শূন্যের ওপর
যে বান্ধিল এমন সুন্দর ঘর।
বসতবাড়ি নাই ভুবনে
ভেসে রয় সে মহাশূন্যে
সাধু-গুরুর চরণ ভিন্নে
মিলে না তার খবর।
বাহান্ন কুঠরি ঘরে
নয়দুয়ার তল ওপরে
দয়াল কাঁইজি বিরাজ করে
খুপরি ঘরের ভিতর।
হস্ত পদ নাইরে মাথা
ইঙ্গিতে সে বলে কথা
বলন কয় মূলবারতা
সূক্ষ্মভাবে ধর অধর।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, প্রখ্যাত আত্মতত্ত্ব গবেষক, উপ-মহাদেশের বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক লেখক, শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের উত্তরণের সার্থক রূপকার, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসংগ্রামী এবং প্রখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে কাঁইজি বৈকুণ্ঠের অবস্থানের প্রতি আলোকপাত করেছেন।
কাঁইজি বলেছেন বৈকুণ্ঠধাম এত সুন্দর ও মনোরোম করে কাঁই নির্মাণ করেছেন যে যুগের শেষদিন পর্যন্ত বর্ণনা করলেও কারো পক্ষেই তা শেষ করা সম্ভব হবে না। অবাক হওয়ার বিষয় হলো- যিনি এত সুন্দর করে স্বর্গধাম নির্মাণ করেছেন জগতের কোথাও তাঁর বসতভিটা নেই। তিনি চিরকালই মহাশূন্যে ভেসে থাকেন। এ বিষয়টি এতই গোপন যে সাধারণ মানুষ কিছুতেই কাঁইয়ের সন্ধান জানতে পারেন না কিন্তু কাঁইজি বলেছেন সাধক-গুরুর নিকট শিষ্যত্বগ্রহণ করলে অনায়াসে যে কোন সাধকই তাঁর সন্ধান জানতে পারেন।
যেমন পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে- “ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدَ الرَّحْمَانُ عِبَادَهُ بِالْغَيْبِ إِنَّهُ كَانَ وَعْدُهُ مَأْتِيًّا(৬১)” উচ্চারণঃ “জান্নাতি আদনি আল্লাতি ওয়াদার রাহমানু ইবাদাহু বিলগাইবি, ইন্নাহু কানা ওয়াদাহু মা’তিয়্যা” অর্থ- “নিত্যস্বর্গ! যা তাঁর দাসকে গোপনে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। নিশ্চয় তার অঙ্গীকার পূরণযোগ্য।” (কুরান, মরিয়ম- ৬১)। সুন্দর ঘরটির ৫২টি কুঠরি রয়েছে। রূপক সাহিত্যে যাকে ‘বাহান্নহাট’ বলা হয়। ঘরটির ৯টি দুয়ার আছে- রূপক সাহিত্যে যাকে ‘নয়দ্বার’ বলা হয়। তারপরও দয়াল কাঁইজি একটি খুপরি ঘরের ভিতর বাস করেন। কাঁইজি আরো বলেছেন সমস্ত জীবজগৎ যিনি সৃষ্টি করেছেন- সে কাঁইয়ের হাত, পা, মুখ ও মাথা কিছুই নেই। তিনি কেবল ইঙ্গিত দ্বারাই তাঁর আগমন ও প্রত্যাগমন বার্তা প্রেরণ করে থাকেন। পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন একজন পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ করে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাঁইসাধন করা বা কাঁইদর্শন করা সবারই একান্ত উচিৎ।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)
/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
ইঙ্গিত, খুপরি, গুরু, ঘর, চরণ, ভুবন, মহাশূন্য (গর্ভাশয়), মূলবারতা, সাধু। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. এ কাব্যটির বক্তা কে? (Who is the speaker of the poem?
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এ কাব্যটি এমন একজন দিব্যজ্ঞানী সাধকের নিশ্চিত সত্যবাণী যিনি স্বয়ং সাঁই ও কাঁইয়ের দর্শনলাভ করেছেন। সাঁই ও কাঁইয়ের নিশ্চিত দর্শনলাভকারী ভিন্ন এরূপ নিশ্চিত কথা কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয়। এখানে কাঁইজি একজন সাধকের উদ্ধৃতি দিয়েই এরূপ নিশ্চিতবাণী উচ্চারণ করেছেন।
২. শূন্যের ওপর নির্মিত সুন্দর ঘরটি কী?
(What is the beautiful house built on vesoljska?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে দেহ ও বৈকুণ্ঠকে শূন্যের ওপর নির্মিত ঘর বলা হয়। তবে এখানে কেবল বৈকুণ্ঠকেই কাঁইজি শূন্যের ওপর নির্মিত ঘর বলে উল্লেখ করেছেন। এ ঘরটি প্রায় সব দ্বিপস্থ জীবের স্ত্রীরাই বহন করে থাকে। মাটি হতে শূন্যের ওপর বৈকণ্ঠরূপ ঘরটি অবস্থিত বলেই বৈকুণ্ঠকে শূন্যের ওপর বাঁধা ঘর বলা হয়।
৩. মহাশূন্যে ভাসে কে? (Who is float on the vesoljska?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে মহাশূন্য বলা হয়। সাঁই ও কাঁই সব সময়ই এ মহাশূন্যেই ভাসতে থাকেন। এ জন্য সাঁই ও কাঁইকে সর্বদা মহাশূন্যে ভাসমান বলা হয়।
৪. বাহান্ন কুঠরি কী? (What is fifty-two compartment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্য বাহান্ন-পণ্যারকে ৫২ কুঠরি বলা হয়। ৫২ পণ্যার হলো- ১.একনিরীক্ষ ২.দুইফল ৩.তিনতার ৪.চারচন্দ্র ৫.পঞ্চবাণ ৬.ছয়রিপু ৭.সাতকর্ম ৮.অষ্টাঙ্গ ৯.নয়দ্বার ১০.দশইন্দ্রিয় ১১.এগাররুদ্র ১২.বারোনেতা ১৩.তেরনদী ১৪.চৌদ্দপোয়া ১৫.পনেরচল ১৬.ষোলকলা ১৭.আঠারোধাম, ১৮.ঊনিশরক্ষী ১৯.বিশাঙুল ২০.একুশদিন ২১.তেইশজোড়া ২২.চব্বিশপক্ষ ২৩.পঁচিশগুণ ২৪.সাতাশনক্ষত্র ২৫.ত্রিশবছর ২৬.বত্রিশদাঁত ২৭.ছত্রিশরবি ২৮.বাহান্নহাট ২৯.চুয়ান্নমাথা ৩০.বাহাত্তরকম্প ৩১.আশিকর ৩২.চুরাশিফের ৩৩.দুইশতছয়হাড় ৩৪.৩১০ গর্ভবাস ৩৫.৩৬০মূর্তি ৩৬.৫০০শ্বাস ৩৭.৬৬৬ সূপারি ৩৮.হাজার মাস ৩৯.৬৬৬৬ সূপারিচ ও ৪০.কোটিঊর্ণ।
এছাড়াও রূপক সাহিত্যের বিশ্ববরেণ্য মনীষীগণ নিচের ১২টি রূপকসংখ্যাকেও প্রায় মূলকের মতো সমমান বলেই গণ্য করে থাকেন। ১.তেত্রিশপ্রতীতি (স্থাপক) ২.চল্লিশতলা (যোজক) ৩.তিপ্পান্নগলি (যোজক) ৪.পঞ্চান্নধারা (যোজক) ৫.ষাটহাত (শূন্যক) ৬.তিষট্টিবাই (স্থাপক) ৭.ছিষট্টিতল (স্থাপক) ৮.সত্তরজন (শূন্যক) ৯.সাতাত্তরপালা (স্থাপক) ১০.নব্বইভাগ (শূন্যক) ১১.নিরানব্বইনাম (স্থাপক) ও ১২.শতদল (শূন্যক)। (৪০ + ১২ = ৫২)। এ ৫২ সংখ্যামূলককেই ৫২ কুঠরি বলা হয়। অথবা দেহের ২০ আঙুল ও ৩২ দাঁতের সমষ্টি ৫২ কে একত্রে রূপক সাহিত্যে ৫২ পণ্যার বলা হয়।
৫. নয়দুয়ার কী কী? (What is nine doors?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে মানবদেহের বাহ্য ৯টি দ্বারকে একত্রে নয়দুয়ার বলা হয়। ৯টি দ্বার হলো- দুই চোখ, দুই কর্ণ, নাসিকার দুই ছিদ্র, মুখ, জলদ্বার ও পায়ু।
৬. কোন্ খুপরি ঘরে কাঁই বাস করেন? (What shack room Lord live in?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠরূপ ছোট স্বর্গীয়ঘরকে খুপরি ঘর এবং জীবের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ খুপরি ঘরেই কাঁই বসবাস করেন।
৭. ইঙ্গিত কী? (What is Indication?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যে কোন সংকেতকেই ইঙ্গিত বলা হয়। স্বর্গীয়বাণীগুলো হলো- ১.চিত্র, ২.চিন্তা, ৩.কম্পন ও ৪.স্পন্দন, ৫.তাপ, ৬.চাপ ও ৭.চুম্বক ইত্যাদি।
৮. অধরা ধরা যায় কিভাবে? (How to catch the elusive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে সাঁই ও কাঁইকে অধর বলা হয়। একজন পাকা সাধকগুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করে ঊর্ধ্বরেতা সাধন শিক্ষা করলেই কেবল অধর ধরা যায়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন