বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

বন্দনা বলন’ (দ্বিতীয় পর্ব)

‘বন্দনা বলন’ (Anthem. এ্যান্থিম)
Hymn Bolon (হেম বলন)/ ‘ترنيمة بيالون’ (তারনিমা বিয়ালুন)
*. দয়ালের বন্দনা, আমার গুরুর বন্দনা
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“দয়ালের বন্দনা
আমার গুরুর বন্দনা
ত্রিধারা নিদানে অধম
পাই যেন চরণখানা।
বন্দি যত জ্ঞানীর চরণ
যত আছেন সাধু মহাজন (গো)
দূরে কাছের ভাই বন্ধুগণ
বন্দিলাম সবজনা।
বন্দিলাম জনক জননী
বন্দিলাম গুরু গুণী (গো)
বন্দি সকল সহকর্মী
সহযোগী সবজনা।
বলন কাঁইজির দেহ বন্দি
অদ্য গীতির আসর বন্দি (গো)
সহযোগির চরণ বন্দি
বন্দিলাম যন্ত্রখানা।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের জগদ্বিখ্যাত সংস্কারক, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও প্রখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি বলন আধ্যাত্মিক পরিবারের সর্ব প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সর্ব প্রকার সঙ্গীতানুষ্ঠানের কেবল বন্দনাবাণী রূপেই এ বলনটি নির্মাণ করেছেন। এ বন্দনাটি পরিবেশনে একদিকে যেমন সময়ও সাশ্রয় হয় অপরদিকে অনুষ্ঠানের গাম্ভির্যতাও রক্ষা হয়। প্রায় যত্রতত্রই লক্ষ্য করা যায় বাংভারতের বাউলরা কোন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের পূর্বে এমন লম্বা বন্দনা করেন যে, কোন কোন বন্দনা আধা ঘন্টাও ছাড়িয়ে যায়। দর্শক বা শ্রোতাগণ যে বিরক্ত হয়ে যান সে ব্যাপারটি তাদের কোন স্মরণেই থাকে না। বিষয়টি বিবেচনা করেই কাঁইজি নাতিদীর্ঘ এ বন্দনাবাণীটি নির্মাণ করেছেন। অতি অল্প কথায় বন্দনারূপ এ অমীয়বাণীটির মধ্যে কাঁইজি প্রায় সব বিষয়ই সন্নিবেশিত করেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে। এ বাণীটির দ্বারা মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই সার্থকভাবেই বন্দনা করা সম্ভব। এখন হতে এ বলনটি বলন ঘরানার উদ্বোধনিবাণী বা বন্দনাবাণী রূপেই বিবেচিত হবে।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
চরণ, ত্রিধারা, দয়াল, নিদান, বন্দনা, যন্ত্র। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)/ ‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. গুরু কাকে বলে? (What is called the Preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
২. গুরু কত প্রকার ও কী কী? (What kinds of Preceptor and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
গুরু চার প্রকার- ১.মানুষগুরু (জ্ঞান) ২.জগৎগুরু (শ্বাস) ৩.কামগুরু (বিম্বল) এবং ৪.পরমগুরু (সাঁই)। নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
১. মানুষগুরু (জ্ঞান)
Man preceptor (ম্যান প্রিসিপ্টর)/ ‘بشر معلم’ (বাশারা মুয়াল্লিম)
মানুসগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী মানুষকে শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে।
মানুষগুরুর শুধু আকার ও আকৃতিকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত। কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের জ্ঞান। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির পাঠশালার শিক্ষক-শিক্ষিকাগণসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন সম্প্রদায় নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন- সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে, মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। (“গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
২. জগৎগুরু (শ্বাস)
Supreme preceptor (সুপ্রিম প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم العليا’ (মুয়াল্লিমাল আলিয়া)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Supreme preceptor)
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে বাতাস বলতে বায়ুমণ্ডলে চলমান বাতাস না বুঝিয়ে বরং নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বুঝানো হয়। নাসিকার শ্বাসরূপ জগৎগুরু ডান ও বাম গতি ধারণ করে সর্বসময় শিষ্য বা ভক্তকুলের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিষ্যগণকে জীবনের প্রতিটি কাজের শুভাশুভ সংবাদাদি প্রদান করে থাকেন। শ্বাসরূপ বাতাস বিশ্বব্যাপী বিরাজমান বলে রূপক সাহিত্যে তাকে জগৎগুরু বলা হয়। মানুষগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে না কিন্তু জগৎগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারেন। এ গুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং সারা চরাচর, গুরু তুমি পতিতপাবন পরমও ঈশ্বর” (পবিত্র লালন- ৪২/১)। আবার লোকনাথ ব্র‏হ্মচারী লিখেছেন- “রণে, বনে, পাহাড়ে ও জঙ্গলে যেখানে আমাকে স্মরণ করবে সেখানেই আমাকে পাবে।”
৩. কামগুরু (বিম্বল)
Cupid (কিউপিড)/ ‘صولجان’ (সাওলাজান)/ ‘كيوبيد’ (কিউবিদ)
কামগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Cupid)
রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে কামগগুরু বলে।
কামগুরুর কোন ভজন নেই। এ গুরুকে শাসন করাই ভক্তের কাজ। চারপ্রকার গুরুর মধ্যে কেবল কামগুরুকে শাসন করতে হয়। এ গুরু অটল না হওয়া পর্যন্ত একে ক্রমে ক্রমে শাসন করতেই হবে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪) ২.“প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২) ৩.“প্রেম-বাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১) ৪.“প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)
৪. পরমগুরু (সাঁই)
Prime preceptor (প্রাইম প্রিসিপ্টর)/
‘مؤدب المطلق’ (মুয়াদ্দিব আলমুত্বাল্লাক্ব)
পরমগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Prime preceptor)
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। সাঁই হলেন তরলমানুষ- যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে পরমগুরু বলা হয়। এ পরমগুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“ত্রিবেণীর ত্রিধারে, মীনরূপে গুরু বিরাজ করে, কেমন করে ধরবি তারে, বলরে অবুঝ মন” (পবিত্র লালন- ১৫৩/৩) ২.“হলে অমাবতীর বার, মাটি রসে হয় সরোবর, সাধু গুরু বৈষ্টম তিনে, উদয় হয় সে যোগের দিনে” (পবিত্র লালন- ১৬২/২)।”
৩. বন্দনা কী? (What is hymn?)
উত্তর (Answers)/ / ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কোন কিছুর স্তুতি বা স্তব করাকে বন্দনা বলা হয় কিন্তু পারিভাষিকভাবে সব আসরে গাওয়া প্রথম গীতিটিকে বন্দনা বলা হয়।
৪. ত্রিধারা কী? (What is tri-stream?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যে কোন তিনটির মিলনকে ত্রিধারা বলা হয় কিন্তু রূপকসহিত্যে বৈকুণ্ঠ ও নাসিকাকে ত্রিধারা বলা হয়। বৈকুণ্ঠ হতে ১.লাল, ২.সাদা ও ৩.কালো এ তিনটি ধারা এবং নাসিকা হতে ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষূম্না এ তিনটি স্নায়ু প্রবাহিত বলেই এদেরকে ত্রিধারা বলা হয়।
৫. চরণ কত প্রকার ও কী কী? (What kind of leg and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসহিত্যে চরণ চার প্রকার। ১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
অভয়চরণ (Fearless Leg)/ ‘قدم بلا خوف’ (ক্বাদিমা বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ (Pairs Leg)/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ (Flushed Leg)/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজনের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ (Excellent Leg)/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে।
২. রূপক সাহিত্যে বলাইকে শ্রীচরণ বলে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন