সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৪

আত্মার প্রকারভেদ- ০৩

আত্মার প্রকারভেদ
আত্মা পাঁচ (৫) প্রকার- ১.ভূতাত্মা (পঞ্চভূত) ২.মানবাত্মা (মন), ৩.মহাত্মা (জ্ঞান) ৪.জীবাত্মা (সাঁই) ও পরমাত্মা (কাঁই)।
এছাড়াও নিম্নরূপেও আত্মার বিভাগ করতে দেখা যায়।
(ক) ১.ক্ষিতি ২.অপ ৩.তেজ ৪.মরুৎ ও ৫.ব্যোম (সংস্কৃত)।
(খ) ১.পরমাত্মা ২.ভূতাত্মা ৩.জীবাত্মা ৪.প্রেতাত্মা ও ৫.গোআত্মা (বাউল)।
(গ) ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ (আত্মতত্ত্ব)।
(ঘ) ১.পরমাত্মা ২.ভূতাত্মা ৩.জীবাত্মা ৪.আত্মারাম ও ৫.আত্মারামেশ্বর (পুরাণী)।
(ঙ) ১.রুহে জিসমানি (رُوحِ ﺟﺴﻤﺎﻨﻰ) ২.রুহে সুলত্বানি (رُوحِ ﺴﻟﻄﺎﻨﻰ) ৩.রুহুল আমিন (رُوحٌ ﺍﻟﻤﻴﻦ) ৪.রুহুল কুদুস (رُوحٌ ﺍﻟﻘﺪﺲ) ও ৫.রুহুল্লাহ (رُوحٌ ﺍﻠﻟﻪ) (কুরানী)।
আত্মার সমন্বয়সাধন
১.অপ ২.অলোক ৩.আগুন ৪.আত্মারাম ৫.আত্মারামেশ্বর ৬.ক্ষিতি ৭.গোয়াত্মা ৮.জল ৯.জীবাত্মা ১০.তেজ ১১.পরমাত্মা ১২.প্রেতাত্মা ১৩.বাতাস ১৪.ব্যোম ১৫.ভূতাত্মা ১৬.মরুৎ ১৭.মহাত্মা ১৮.মাটি ১৯.মানবাত্মা ২০.রুহুল আমিন (رُوحٌ ﺍﻟﻤﻴﻦ) ২১.রুহুল কুদুস (رُوحٌ ﺍﻟﻘﺪﺲ) ২২.রুহুল্লাহ (رُوحٌ ﺍﻠﻟﻪ) ২৩.রুহে জিসমানি (رُوحِ ﺟﺴﻤﺎﻨﻰ) ও ২৪.রুহে সুলত্বানি (رُوحِ ﺴﻟﻄﺎﻨﻰ)। আত্মা সম্পর্কে প্রাপ্ত এসব পরিভাষাদির অভিধা বা অর্থ জেনে নেওয়ার পর আলোচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে আমরা মনে করি বিধায় নিচে আত্মার পরিভাষাদির অভিধা তুলে ধরা হলো-
(ওপরোক্ত পরিভাষাগুলোর অবিধা জানতে মূল গ্রন্থ দেখুন)
তৃতীয় পর্ব…
৩. মহাত্মা (জ্ঞান)
মহাত্মা হলো জীবের জ্ঞান। সর্ব জীবে ন্যূনাধিক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও একে অন্য কোন নামে নামকরণ না করে মহাত্মা বলার কারণ হলো- মহাত্মা একমাত্র মানবের মধ্যেই সর্বাধিক সার্থক, সাবলীল ও শক্তিশালিরূপে দেখা যায়। সেজন্য এ আত্মাকে মহাত্মা বলা হয়। একমাত্র জ্ঞানের দ্বারা মানুষ সর্বসৃষ্টির ওপর শক্তিশালিরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে বলে জ্ঞানকে মহাত্মা বলা হয়।
মহাত্মার সংজ্ঞা
১. ব্যবহার ও সুবিধাদির দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী আত্মাকে জ্ঞান বা মহাত্মা বলে।
২. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যেসব তথ্যাদি চিত্তপটে সঞ্চিত থাকে তাকে জ্ঞান বা মহাত্মা বলে।
৩. কোন বিষয় বা বস্তুর বাস্তবতা জ্ঞাত হওয়ার জন্য তার প্রকৃত বিচার বিশ্লেষণ চিত্তপটে সঞ্চিত হওয়াকে জ্ঞান বা মহাত্মা বলে।
মহাত্মার (জ্ঞানের) প্রকারভেদ
মহাত্মা দ্বারা যেহেতু জ্ঞান বুঝায় সেহেতু মহাত্মার প্রকারভেদের স্থলে জ্ঞানের প্রকারভেদ আলোচনা করাই যুক্তসঙ্গত হবে বলে আমরা মনে করি। নিচের জ্ঞানের সংক্ষিপ্ত প্রকারভেদ আলোচনা করা হলো।
জ্ঞান সাধারণত দুই প্রকার। যথা- ১.অপরাজ্ঞান ও ২.পরাজ্ঞান বা ১.বৈষয়িকজ্ঞান ও ২.পারম্পরিকজ্ঞান।
১. অপরাজ্ঞান (knowledge of universals)
সাধারণত বৈষয়িকজ্ঞানাদিকে অপরাজ্ঞান বলে। যেমন- মহাকাশবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি।
বিশেষ কারণেই বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করার প্রয়োজন পড়ে। একমাত্র মানুষ ব্যতীত অন্যান্য জীবের বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করার কোন প্রয়োজন পড়ে না। মানুষ বিভিন্ন বিভাগে কর্ম বা বৃত্তি গ্রহণের জন্য বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করে। আবার এমনও অনেক মানুষ রয়েছে যারা কোন বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করে না। তাদের নিকট বৈষয়িকজ্ঞানের কোন মূল্যও নেই। যে ব্যক্তির অক্ষরজ্ঞান নেই তার নিকট গ্রন্থাদির কোন মূল্য নেই। গ্রন্থের মধ্যে কী লেখা রয়েছে নিরক্ষরব্যক্তিরা কখনো তা উদ্ধার করতে সক্ষম নয়।
২. পরাজ্ঞান (knowledge of particulars)
যে জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং স্রষ্টা বা ব্রহ্মা সম্পর্কে জানা যায় তাকে পরাজ্ঞান বলে।
ব্রহ্মা সম্পর্কে একবার জেনে নিলেই বিশ্বের সব জ্ঞান জানা যায়। তাই বলা হয় পরাজ্ঞানির জানার কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। কারণ ব্রহ্মজ্ঞানই একমাত্র প্রকৃতজ্ঞান। অন্যান্যজ্ঞানাদি পরাজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞানের ছায়া মাত্র। সাধারণ মানুষ সাধারণজ্ঞান ও বৈষয়িকজ্ঞান দ্বারাই চলাফিরা বৃত্তি ও কর্মাদি সম্পাদন করতে পারে। আত্মতত্ত্ব বা পারম্পরিকগণের জন্য পরাজ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন। কারণ পরাজ্ঞান ব্যতীত সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও নগরকর্তা- এ ত্রিকর্তার সত্য ও সঠিক সন্ধানলাভ করা যায় না।
আবার পরাজ্ঞান ব্যতীত আত্মতত্ত্বজ্ঞানও অর্জন করা যায় না। একবার পরাজ্ঞান অর্জন করলে মতবাদবিশ্বের সব জ্ঞানই তার অর্জিত হয়ে যায়। বিশ্বে যতসব যতসব সাম্প্রদায়িকপথ বা মত রয়েছে একবার পরাজ্ঞান অর্জনের দ্বারা তা একবারেই শিক্ষা করা যায়। এ পরাজ্ঞানকেই বাংলায় আধ্যাত্মিকজ্ঞান, আরবিতে এলমে রুহানিয়াত (ﻋﻟﻢ ﺭﻮﺤﺎﻨﻴﺔ) বা ইংরেজিতে স্পিরিচুয়েলিজম (Spiritualism) বলে। মানবসন্তান জন্মগ্রহণের পর দেহ, আত্মা ও মন প্রকৃতিগতভাবেই অর্জন করে থাকে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নাসিকা যোগে বাতাসের মাধ্যমে অম্লজান সংযুক্ত হওয়ার সঙ্গেসঙ্গেই জ্ঞানের সৃষ্টি হয়। শৈশবকালে জীবের জ্ঞানও একেবারে শিশুই থাকে। শৈশবকাল অতিক্রম করে কৈশোরকালে পদার্পণের সঙ্গেসঙ্গেই জীবের মধ্যে চন্দ্রচেতনার (সঙ্গম) প্রবণতা উৎপত্তি হতে থাকে। এ সময় জীবের কিশোররা একেবারে অজ্ঞানিও থাকে না, আবার পরিপূর্ণ জ্ঞানিও হয় না।
১. বৈষয়িকজ্ঞান
উন্নত জীবন যাপন বা বৃত্তিয়াদি গ্রহণের উদ্দেশ্যে অর্জিত প্রযুক্তি ও প্রকৌলগতজ্ঞানকে বৈষয়িকজ্ঞান বলে। বৈষয়িকজ্ঞান অনেক প্রকার হতে পারে। যেমন- কৃষিবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি।
২. পারম্পরিকজ্ঞান
গুরুশিষ্যের মাধ্যমে প্রচার প্রসারকৃত আত্মদর্শন ও আত্মতত্ত্ব সম্পর্কীয় আশ্রমভিত্তিক জ্ঞানকে পারম্পরিকজ্ঞান বলে। যেমনÑ রূপকসাহিত্য, আত্মতত্ত্বভিত্তিক সূত্রাবলী ও আধ্যাত্মিকবিজ্ঞান ইত্যাদি।
জ্ঞানের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
মানব সন্তান জন্মগ্রহণ বা বিকশিত হওয়ার পর মহাত্মা বা জ্ঞানের উৎপত্তি হয়। জ্ঞান বা মহাত্মা উৎপত্তি হওয়ার পর একেবারে শিশু অবস্থায় থাকে। ক্রমেক্রমে জ্ঞান পূর্ণভাবে বিকশিত হয়।
ব্যক্তির মহাত্মা সম্বন্ধে দার্শনিকগণ বলেন যে- মহাত্মা সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি সত্তা। তারা আরো বলে থাকেন যে- মূল বৈক্তিকসদস্য মাত্র তিনটি যথা- ১.দেহ ২.আত্মা ও ৩.জ্ঞান। এ জ্ঞানকেই চৈতন্যসত্তা, বিবেক বা মন ইত্যাদি নামে ডাকা হয়ে থাকে। প্রকৃতপক্ষে একজন ব্যক্তির নিকট দেহ, আত্মা ও জ্ঞান এ তিনটি মৌলিকসত্তা ভিন্ন অন্য কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই। এ সূত্র হতেই দার্শনিকগণ বলেন যে- ব্যক্তির মধ্যে মন বা মানবাত্মা বলে মৌলিক বা প্রকৃত কোন আত্মা বা সত্তা নেই।
তবে জ্ঞান বা মহাত্মা যায়-ই বলি না কেন ব্যক্তির দেহ ও আত্মার পরে তৃতীয় একটি সত্তার অস্তিত্ব সবাই স্বীকার করে থাকেন। এ তৃতীয়সত্তাকেই আধ্যাত্মিকবিজ্ঞানে মহাত্মা বা জ্ঞান বলা হয়। এ তৃতীয়সত্তারটির উৎপত্তি সম্পর্কে দার্শনিকগণ ধারণা করেন যে- প্রথমে আত্মা ও পরে দেহ সৃষ্টির পর যখন আত্মা ও দেহ মিলিত হয়ে ব্যক্তিকে জীবন্ত করে তখন ব্যক্তির যাবতীয় জৈবিক কার্যাদি পরিচালনা করার জন্য তৃতীয় একটি সত্তার প্রয়োজন হয়। এ সত্তাটিই হলো ব্যক্তির জ্ঞান বা মহাত্মা। ব্যক্তির এ শক্তিটি ব্যক্তির স্মরণশক্তি, বিচারশক্তি, বিশ্লেষণশক্তি বা অনুধাবনশক্তি ইত্যাদি নামে পরিচিত।
ইতিমধ্যে অনেক দার্শনিক উল্লিখিত শক্তিগুলোর সমন্বিত রূপকেই মহাত্মা বা জ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন। উল্লেখ্য আমাদের প্রণীত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ ৫ম খণ্ড গ্রন্থটির মধ্যে আমরা মন ও জ্ঞানকে পৃথকপৃথক বা ভিন্নভিন্ন সত্তারূপে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছি।
ব্যক্তির দেহ ও জীবাত্মা হতেই জ্ঞান বা মহাত্মার উৎপত্তি। জীবন্তব্যক্তি যা কিছু দেখে, যা কিছু করে, যা কিছু শুনে ও যা কিছু অনুধাবন করে তার স্মৃতিভাণ্ডার, গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন ইত্যাদি হতেই মহাত্মা বা জ্ঞানের উদ্ভব। মহাত্মা বা জ্ঞান কোন প্রাকৃতিকশক্তিও নয় আবার কোন পদার্থও নয় বরং এটি একটি কৃত্রিমশক্তি বিধায় এটি অন্য কোন উৎস্য হতে ব্যক্তির দেহে সংযুক্ত হয়েছে বলে প্রমাণ করাও সঠিক হবে না।
পরিশেষে বরা যায় ব্যক্তির দেহ (আদিচতুর্ভূত- আগুন জল মাটি ও বাতাস) ও জীবাত্মার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া হতেই মহাত্মা বা জ্ঞানের উদ্ভব হয়েছে। অতঃপর ক্রমেক্রমে বৈষয়িকজ্ঞান ও পারম্পরিকজ্ঞানের উদ্ভদ হয়েছে। বিস্তারিত বিবরণ আমাদের প্রণীত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ ৫ম খণ্ড গ্রন্থটির মধ্যে বর্ণনা করা হয়েছে। বিস্তারিত জানা ও বুঝার জন্য উক্ত গ্রন্থটি পাঠ করে নিতে পারেন।
আমরা এখানে এতটুকুই বলতে চাই যে- মহাত্মা বা জ্ঞান একটি শিশুর মধ্যে প্রথমে একেবারে শূন্য হয়েই উৎপত্তি হয়। অতঃপর ক্রমেক্রমে তা বিকশিত হতে থাকে। উপসংহারে বলা যায় আত্মার বিচার, আত্মার পুনরুত্থান, আত্মার জন্মান্তর ও আত্মার দোষগুণ আছে ইত্যাদি মতের প্রবক্তা দার্শনিক ও সাম্প্রদায়িক মতানুসারিগণ হয়ত এ মহাত্মার কথাই বলে থাকেন। নচেত জীবের প্রকৃত জীবাত্মারূপ বিদ্যুৎশক্তিটি এরূপ কোন দোষে দোষী বা এরূপ কোন গুণে গুণী কখনই হতে পারে না।
জৈব্যতা
জৈব্যতা (রূপ)বি জীবের প্রাণ সঞ্চার ক্ষমতা, জীবাত্মা উৎপাদনকারী পদার্থ, যে শক্তির বলে জীবের জীবাত্মা উৎপাদিত হয়। যেমন খাদ্যসার।
খাদ্য হতে যে সার উৎপাদিত হয় তা-ই জৈব্যতা। জীব খাদ্য গ্রহণের পর পাকস্থলি তা পরিপাক করে খাদ্যসার বের করে নেয় এবং জল ও মলের মাধ্যমে অসার পদার্থাদি বের করে দেয়। এ সার হতে রক্ত ও রস উৎপাদিত হয়। খাদ্যসার বা জৈব্যতা ব্যতীত জীব রক্ত ও রস উৎপাদন করতে পারে না। রক্ত ও রস উৎপাদন করতে না পারলে জীবাত্মারূপ বিদ্যুৎশক্তিও উৎপাদিত হতে পারে না। ফলে জীব ক্রমেক্রমে প্রয়াণকোলে ঢলে পড়ে। জীবাত্মা উৎপাদনকারী খাদ্যশক্তিই জৈব্যতা।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্র- আত্মার সৃষ্টি রহস্য (আত্মমুক্তির পথ)- বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন