শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪

জ্ঞান (জ্ঞান- ১ম পর্ব)

জ্ঞান (৩০)
Wisdom (উইসডোম)/ ‘ﻋﻟﻢ’ (ইলিম)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলক-পরিবারের একটি অন্যতম ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘জ্ঞান’ পরিবার প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘গুরু’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’। এটি একটি ‘রূপক-প্রধান’ মূলক।
জ্ঞান বি বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, wisdom, ‘ﻋﻟﻢ’ (ইলিম) (আবি) বিচারক, উপদেষ্টা, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবার প্রধান ও রূপক সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
জ্ঞানের সংজ্ঞা (Definition of Wisdom)
পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা উৎপন্ন বোধশক্তিকে জ্ঞান বলে।
জ্ঞানের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Wisdom)
সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শক্তি অনুধাবন শক্তিকে জ্ঞান বলে।
জ্ঞানের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন (Short Reports of the ‘Wisdom’Wink
জ্ঞানের আভিধানিক, রূপক, উপমান, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষা তুলে ধরা হলো-
মূলকঃ Radical/ ‘جذري’ (জিযরি)
জ্ঞান।
আভিধানিক প্রতিশব্দঃ Lexical synonyms/ ‘مرادفات معجمية’ (মুরাদিফাত মু’জামিয়া)
গেয়ান, ঘিলু, তত্ত্ব, তত্ত্বজ্ঞান, ধী ও বিদ্যা।
রূপক পরিভাষাঃ Metaphorical terms/ ‘مصطلحات مجازية’ (মুস্তালাহাত মাজাঝিয়া)
গুরু।
উপমান পরিভাষাঃ Analogical terms/ ‘مصطلحات متشابه’ (মুস্তালাহাত মুতাশাবিহ)
আলো, আলোক, দীপ, বর্তি, বর্তিক, বর্তিকা, বসন ও ভূষণ।
চারিত্রিক পরিভাষাঃ Characteristic terms/ ‘مصطلحات خصيصة’ (মুস্তালাহাত খাসিসা)
অক্ষয়, অতিবলা, অরিন্দম, নরদেব, বিদ্যাবল, বিদ্যাবান, মার্কণ্ডেয় ও সম্বিত।
ছদ্মনাম পরিভাষাঃ Pseudonymous terms/ ‘مصطلحات باسم مستعار’ (মুস্তালাহাত বিসমে মুস্তায়ারি)
অপিশুন, অমূর্ত, আচার্য, উপদেশক, কল্পসূত্র, কুপি, গৃহমণি, গোঁসাই, গোপ্ত, গোস্বামী, চালক, চৈতন্য, জ্ঞানদাতা, ঠাকুরমশাই, ঠাকুরমহাশয়, তপঃপ্রভাব, তপোবল, তরপণ্য, তারিক, তমোজ্যোতি, তমোমণি, তিমিরনাশক, তিমিররিপু, তিমিরারি, দিয়ড়ি, দিশারী, দীক্ষক, দীপক, দীপতি, দেশনা, দেশিক, দেশিকোত্তম, ধর্মগুরু, ধর্মাচার্য, ধর্মাধ্যক্ষ, ধনসম্পদ, ধনসম্পত্তি, ধীতমান, ধীসচিব, নিদেষ্টা, পণ্ডিত, পরাজ্ঞান, প্রতিবোধ, প্রতিবোধন, প্রতীত, প্রাচীর, প্রাজ্ঞ, বসনভূষণ, বস্তুজ্ঞান, বস্ত্র, বাতি, বিদ্যাদাতা, বিদ্যানিধি, বিদ্যাপতি, বিদ্যাবিনোদ, বিদ্যাবিশারদ, বিদ্যাভূষণ, বিদ্যারত্ন, বিদ্যার্ণব, বিদ্যালংকার, বিদ্যাসাগর, বিদ্বান, বিপ্র, বিশারদ, বুদ্ধি, বুধ, বোদ্ধা, বোধ, বোধন, বোধি, ভট্টাচার্য, ভট্টাক, ভবভূষণ, ভুনি, ভূষা, মনীষা, মস্তক, মহাগুরু, মহাত্মা, মহাপরিচালক, মহাপোষাক, মহাবোধ, মহাবোধী, মানুষগুরু, মার্ক-, মেধা, যন্তা, যাজন, রাজশক্তি, শিক্ষক, শিক্ষাগুরু, শিক্ষাদাতা, শুদ্ধোদন, শুদ্ধোদনি, সংবিৎ, সংবিত্তি, সংবিদ, সংবেদ, সৎগুরু, সম্বিৎ, সুমেধাঃ, স্বর্ণভূষণ, স্বর্ণালংকার, স্মৃতি, স্যমন্তকমণি।
জ্ঞানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Wisdom)
১. “আপনি যখন নাই আপনার, কারে বলো আমার আমার, সিরাজ সাঁইজি কয় লালনরে তোর, জ্ঞান নাইরে।” (পবিত্র লালন- ৪৯৩/৪)(মুখঃ- “তুমি কার আজ কেবা তোমার, এ সংসারে, মিছে মায়ায় মজিয়ে মন, কী করোরে”)
২. “আমরা সব মদিনাবাসী, ছিলাম যেমন বনবাসী, তুমি এলে জ্ঞান পেয়েছি, পেয়েছি যে সান্ত¡না।” (পবিত্র লালন- ৪৯৮/৩)(মুখঃ- “তোমার মত দয়ালবন্ধু, আর পাব না, দেখা দিয়ে ও হে রাসুল, ছেড়ে যেও না”)
৩. “আমার দেখে শুনে, জ্ঞান হলো না, কী করতে কী করলাম দুগ্ধেতে মিশালাম চনা।” (পবিত্র লালন- ১২৭/১)
৪. “এ পথে অর্থ ঢুঁড়ে, কারো জ্ঞান বসবে ধড়ে, কেউ বলে লালন ভেড়ে, ফ্যাঁকড়া কেউ বুঝে না।” (পবিত্র লালন- ৬৫/৪)(মুখঃ- “আকার কী নিরাকার সাঁই রাব্বানা, আহাম্মদ আর আহাদ নামের, বিচার হলে যায় জানা”)
৫. “জন্মান্ধ আমার নয়ন, গুরু তুমি করো সচেতন, চরণ দেখবে অধীন লালন, জ্ঞানাঞ্জন দাও নয়নে।” (পবিত্র লালন- ৪১৫/৪)(মুখঃ- “গুরু সুভাব দাও আমার মনে, তোমার চরণ যেন ভুলিনে”)
৬. “মন তুই ভেড়–য়া বাঙাল জ্ঞান ছাড়া, সদরের সাজ করলি ভালো, পাছবাড়িতে নাই বেড়া।” (পবিত্র লালন- ৭৪১/১)
৭. “যে ধনে উৎপত্তি প্রাণধন, সে ধনের হলো না যতন, অকালে ফল পাকায় লালন, দেখেশুনে জ্ঞান হলো না।” (পবিত্র লালন- ৮২৮/৪)(মুখঃ- “যেখানে সাঁইর বারামখানা, শুনলে মন চমকে উঠে, দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা”)
জ্ঞানের কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of Wisdom)
১. “অন্ধকূপে পড়ে রইলি, জাগতিক জ্ঞানে জ্ঞানী হলি, কোথায় হতে কেনবা এলি, তার গণনা করলি না।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৫)
২. “অমূল্য দোকান খুলিয়া দয়াময় তেমাথা পথে, শিষ্যের পানে রয় চাহিয়া, আপনার ধন বিলাতে, মনের দরে জ্ঞান বেচিয়া, দান করে ধনের খনি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯২)
৩. “আদিতত্ত্ব আত্মা ইন্দ্রিয় রাসুল বহন করে, মহাজ্ঞানীরা আপন আত্মা পায় দেখিবারে, তত্ত্বধারী হলে জ্ঞান- উপধর বলে জ্ঞানীগণ, বলন কয় পরমগুরু হলেন তিনি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৭৩)
৪. “আল্লাহ রাসুল আছে আমার এ দেহে, জ্ঞান হলো না, অজানা এক মানুষের করণ, তলে করছে আনাগোনা।” (পবিত্র লালন- ১৮১/১)
৫. “কত অন্ধকার ঘরে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছ, হেলা করে অন্ধকারে আমায়ে ফেলে রেখেছ, আমি বুঝি এত ভারি, তায় অকূলে রাখলে ফেলিয়া।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৩)
৬. “কানা বড় বড়াই করে, বুদ্ধিজীবি নামটি ধরে, মিছে জ্ঞানের লড়াই করে, মূলেতে কিছু বুঝে না।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৯)
৭. “কার্য দ্বারা জ্ঞান হয় যে, অটলচাঁদ নেমেছে ব্রজে, নইলে সে বিষম বিষে, কালীদহে বাঁচত না।” (পবিত্র লালন- ৪৯৯/২)
৮. “খুলবি সাঁই নিগম কারা, মনে লাগা জ্ঞানের পারা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮৯)
৯. “গুরুর দয়া হলে, স্বরূপ সহজে মিলে, জাবারুতের পর্দা খুলে, দেখায় সেরূপ বর্তমান, সিরাজ সাঁইজি বলেরে লালন, আর কবে হবে জ্ঞান।” (পবিত্র লালন- ৫৮১/৪)
১০. “চন্দ্র সাদা সূর্য কালো, যাতে উদয় জ্ঞানের আলো, কোন্ সাধনে পাবো বলো, তাই এখন কারে শুধাই।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮২)
১১. “জানগে যা গুরুর দ্বারে, জ্ঞান উপাসনা, কোন্ মানুষের কেমন কৃতি, যাবেরে জানা।” (পবিত্র লালন- ৪৬৫/১)
১২. “জেনে শব্দভেদের জ্ঞান, মাতৃভাষায় শাস্ত্র জানো, কী ঘুমে রইলি ঘোর, নিগূঢ়ভাব জাগলনারে তোর।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২১)
১৩. “জ্ঞানই করে মহীয়ান গোপন প্রকাশ্য দুই জ্ঞান, অর্জন করে হও মহান সর্বপরে জ্ঞানীর মান।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২২)
১৪. “জ্ঞান গুরুর বাক্ বিতরণ, মনের মনুষ্যত্ব অর্জন, এক বিম্বলের সব লেখন, লিখে নিজের চামকুঠিতে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৩৯)
১৫. “জ্ঞান মূলতঃ দুই প্রকরণ, রূপক ও গোপন, গ্রন্থে রয় রূপক আকারে, হৃদয়ে গোপনের গোপন।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৪)
১৬. “জ্ঞান যার মনের ওপরে, সে অধরাকে ধরতে পারে, লালন কয় বিনয় করে, কে জানে তাহা।” (পবিত্র লালন- ৭৪৯/৪)
১৭. “জ্ঞানের পারায় ভাব লাগিয়ে, ত্রিবেণী পাড়ে বসগে গিয়ে, নয়নে নিরীক্ষ বান্ধিয়ে, ঝরার খালে রাখ পাহারা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮৯)
১৮. “তুই মদনা চাষা ভাই, তোর জ্ঞান কিছুই নাই, প্রতিপদ বিনে অমাবস্যায়, হাল বয়ে কাল হও কেনে।” (পবিত্র লালন- ১৬২/৩)
১৯. “ধড়ে কে শিষ্য হয়, কে শিষ্য করে, শুনলে জ্ঞান হয় তাইত শুধাই, যে জানো সে বলো মোরে।” (পবিত্র লালন- ৫৫৪/১)
২০. “পুষ্করিণী সাড়ে তিন রতি, ঘাটলাতে জ্ঞানের বাতি, নয়শিরে নয় ধার খেলে, দই দুগ্ধ উদয় চন্দ্র রামানন্দ ভক্তবৃন্দ, পারের ঘাটে একদিন যদি মিলে।” (পবিত্র লালন- ১৫৯/২)
২১. “প্রকৃতি নীতিই কাঁইয়ের বাণী অবলোকন করলি না, শাস্ত্র-গ্রন্থে দেহভেদ লেখা একবার ভেবে দেখলি না, আত্মা ইন্দ্রিয় মন জ্ঞান- শাস্ত্র নির্মাণ উপকরণ, বিনয় করে বলছে বলন- খোঁজ কর আপন ধড়ে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮৭)
২২. “বলন কাঁইজি ভাবিয়া কয়, চৈতন্যদেব মাহদি হয়, জ্ঞান বিনে ধরা নাহি দেয়, মিছে শুধু কুলের বড়াই।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৬)
২৩. “বলন কাঁইজি ভেবে বলে, সে জ্ঞান কেউ কিঞ্চিৎ পেলে, জুড়ি নাই তার ত্রিম-লে, সবাই রয় তার পদতলে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৫)
২৪. “বাড়ির মালিক চেনার বাঞ্ছা করো, আগে গিয়ে মানুষ ধরো, গুরুর কাছে জ্ঞান পাকা করো, অনুমানে রেখ না।” (পবিত্র লালন- ২৭৭/২)
২৫. “মানুষগুরু হয় আকারে- জগৎগুরু রয় নিরাকারে, জ্ঞান দ্বারা ধরো তারে- নিকটে সে দূরে নয়, দমে যায় দমেতে আসে- দিনরজনী ডানে বাঁয় সে, ফাঁদ পাঁতিয়া ধর কষে- ভক্তি দিয়ে উত্তরা বায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
২৬. “মায়ের গুরু পুতের শিষ্য, দেখে জীবের জ্ঞান নৈরাশ্য, তার মনের কী উদ্দেশ্য, ভেবে বুঝা যায় কিসে।” (পবিত্র লালন- ৪৮৬/৩)
২৭. “মূলধন জ্ঞান মন দেহ, ছিনে নিতে পারে না কেহ, অটলমণি সুধাগৃহ, নিষ্ঠাজন যত্নবান।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮২)
২৮. “যদি কেউ হয় চক্ষুষ্মান, সে দেখে সেরূপ বর্তমান, লালন কয় তার জ্ঞান-ধ্যান, হরি দেখার পুঁতিমালা।” (পবিত্র লালন- ৩৪৪/৪)
২৯. “যার মন চেতন নাই ধড়ে, যেমন কাকের বাসায় কোকিলের ছা, বন্ধকী কারবারে, জ্ঞান হলে আদার খাওয়ার, অমনি উড়াল মারে।” (পবিত্র লালন- ৮২০/১)
৩০. “যে শিষ্য জ্ঞান পিপাসী, অচিন চিনে হয় তাপস্বী, রহে না তার কর্মফাঁসি, খাঁসা শিষ্য সেজনা” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৩)
৩১. “রাতকানারে চরাতে যাই, দিনকানাই লয়ে, জ্ঞানকানার সঙ্গ ধরে, পড়লাম বিষম ফেরে।” (পবিত্র লালন- ৮২০/২)
৩২. “রূপের গাছে চাঁদ ধরেছে ভাই, থেকে থেকে ঝলক দেখা যায়, চাঁদের বাজার দেখে- চাঁদ ঘুরানি লাগে, দেখিস পাছে হসনে জ্ঞানহারা।” (পবিত্র লালন- ৪৩৫/৩)
৩৩. “শরিয়ত জ্ঞান-বুদ্ধি শান্ত করে, কেমন করে, রোজা নামাজ শরিয়তের কাজ, আসল শরিয়ত বলছ কারে।” (পবিত্র লালন- ৮৮২/১)
৩৪. “শুনি গো জ্ঞান ইন্দ্রিয় গুণে, রইবে সে রিপু নিধনে, ইঙ্গিত যা পায় বিধানে, আমি বলিতে ডরাই।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫৬)
৩৫. “শুম্ভবিম্ব নাই যে ফুলে, সেথায় মধুকর কেমনে খেলে, পড় সহজ প্রেমস্কুলে, জ্ঞানের উদয় হলে যাবে ভুল।” (পবিত্র লালন- ২০৬/৩)
জ্ঞান-চক্ষু (Wisdom eye)/ ‘حكمة العين’ (হাকুমাত আলয়াইন)
১. “আমার মনেরে বুঝাই কিসে, কুলের ঘোরে আমার জ্ঞান চক্ষু আঁধার, ঘিরল যেন রাহুতে এসে, বনে আগুন লাগলে দেখে সর্ব লোকে, মনের আগুন কে দেখে মনকোঠা ফেঁসে।” (পবিত্র লালন- ১৩৮/১)
২. “গুরু জ্ঞান সঁপে যারে, তার মনের আন্ধার যায় দূরে, জ্ঞানচক্ষে দেখে তারে, তাই ভাবছ মনেমনে।” (পবিত্র লালন- ৫২২/৩)
৩. “মানুষগুরু যে ভজেছে, জ্ঞাননয়ন তার খুলেছে, অমূল্যধন সে পেয়েছে, ভেসে আনন্দ সলিলে।” (পবিত্র লালন- ৯৪৮/৩)
৪. “মায়ের বাম অঙ্গে কেবা, বাবা দায়ে ঠেকায় সেবা, লালন ভনে তাপিত মনে, জ্ঞান নয়নে দিবেন বলে।” (পবিত্র লালন- ১৩৯/৪)
৫. “শক্তিহারা ভাবুক যে, কপটভাবের কুরসিক সে, লালন বলে তার- জ্ঞানচক্ষু আঁধার, রাগের পথ চিনে না।” (পবিত্র লালন- ১৮১/৪)
৬. “সাধ্য কিরে আমার সেরূপ চিনিতে, অহর্নিশি মায়াঠুসি আমার জ্ঞান চক্ষেতে।” (পবিত্র লালন- ৯৪২/১)
আদ্য-জ্ঞান (Primeval-wisdom)/ ‘بدائية حكمة’ (বিদায়িয়া আলহাকমা)
*. “আদ্যজ্ঞান যার সূক্ষ্মমোক্ষ, সাধক তার উপলক্ষ, অপরূপ তার বৃক্ষ, দেখলে জীবের পাপ থাকে না।” (পবিত্র লালন- ১০৬/৩)(মুখঃ- “আপন ঘরের খবর নেনা, অনায়াসে দেখতে পাবি, কোন্খানে সাঁইর বারামখানা”)
১. “আদমি হলে আদম চিনে, পশু কী তার মর্ম জানে, লালন কয় আদ্যজ্ঞানে, আদম চিনলে হয়।” (পবিত্র লালন- ১১১/৪)
২. “নীরাকার জ্যোতিতে এ ধরণীতে আসে দিনমণি, ভবে তারা সদায় পায় দরশন যারা জ্ঞানী-গুণী, রাসুল হলো তত্ত্ববাহক- অধ্যাত্ম্য-জ্ঞানের ধারক, আত্মা ইন্দ্রিয় উদ্দীপক বহনকারক পানি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৭৩)
আধ্যাত্মিক জ্ঞান (Spiritual-wisdom)/ ‘حكمة الروحية’ (হাকুমাত আররুহিয়া)
১. “গোঁসাই হয় জ্ঞানের গুরু, আধ্যাত্মিক জ্ঞানের তরু, গুরুহীন জ্ঞান দুরুদুরু, বৃথায় মানবজনম।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৬১)
২. “জাগতিক জ্ঞানে গেলি মারা, আধ্যাত্মিক জ্ঞান রইলি হারা, তাই দেখি পাগলপারা, সংসারের মায়ায় চিরকাল।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৭)
৩. “শিষ্য হলে মনে প্রাণে, দয়াল দর্শন হয় জীবনে, বলন কয় আধ্যাত্মিক জ্ঞানে, সবার ভাগ্যে হয় না।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৩)
দিব্যজ্ঞান (Theosophy)/ ‘استبطان’ (ইস্তেবতান)
*. “আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে, কুবৃক্ষে সুফল পেয়েছে, আমার মনের ঘোর গেল না।” (পবিত্র লালন- ৮২৮/৩)(মুখঃ- “যেখানে সাঁইর বারামখানা, শুনলে মন চমকে উঠে, দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা”)
*. “আত্মা শুধু থাকে ধড়ে, যত পাপ সব মনে করে, দিব্যজ্ঞানের সূক্ষ্মবিচারে, মন দাদা আসামী হয়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৩)(মুখঃ- “পাপের বিচার নিয়ে, পড়ছে সবে গোলকধাঁধায়, পাপ করে মন ব্যাপারী, আত্মার ওপর বিচার লয়”)
*. “ক্ষীর মতি সুধা রতী, দুগ্ধ মান মহান অতি, দেখিতে পাবিরে সেইখানে- সপ্তবিংশে হয়রে উদয়, কালোশশীর পরিচয়, বলন কয় দিব্যজ্ঞানে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৬৭)(মুখঃ- “যাবি যদি ঊর্ধ্বগমনে (মি’রাজ) গমনে, সাধুর চরণ করগে ভজন, গোপনে নিরজনে”)
*. “চোর এলে অটলের ঘরে, সাধকজনা জানতে পারে, লালন বলে স্বরূপ মিলে, দিব্যজ্ঞানের উদয়েতে” (পবিত্র লালন- ৮৭৮/৩)(মুখঃ- “লাগল ধুম প্রেমের থানাতে, মনচোরা পড়েছে ধরা রসিকের হাতে, ও সে ধরেছে চোরকে, হাওয়ায় ফাঁদ পেতে”)
*. “নিরাকারে জ্যোতির্ময় যে, সাকার আকার হলো সে, যে দিব্যজ্ঞানী হয়- সে জানতে পায়, কলিযুগে হয় মানব অবতার।” (পবিত্র লালন- ৯২৬/৩)(মুখঃ- “সর্ব সাধন সিদ্ধি হয় তার, (ভবে) মানুষগুরু নিষ্ঠা যার”)
*. “বিবিদের নাই মুসলমানি, পৈতা যার নাই সেও তো বামনী, বুঝরে ভাই দিব্যজ্ঞানী, লালন তেমনি জাত একখান।” (পবিত্র লালন- ৯১৯/৪)(মুখঃ- “সবাই বলে লালন ফকির, হিন্দু কী যবন, লালন বলে আমি আমার, না জানি সন্ধান”)
*. “মাটির ঢিবি কাঠের ছবি, ভূতভবিষ্যৎ আর দেবাদেবী, ভুলে না এসব রূপী, মানুষ ভজ দিব্যজ্ঞানে।” (পবিত্র লালন- ৭৮১/২)(মুখঃ- “মানুষতত্ত্ব যার সত্য হয় মনে, সেকি অন্য তত্ত্ব মানে”)
————————————————————-
১. “আকারে হয়ে জুদা, খোদা সে বলে খোদা, দিব্যজ্ঞানী নইলে কী তা, কেউ পায় জানতে।” (পবিত্র লালন- ৩৩৮/৩)
২. “আপন ঘরে কে কথা কয়, না জেনে আকাশে দেখায়, হায়াতরূপে কেবা হেথায়, লালন ভাবে দিব্যজ্ঞানে।” (পবিত্র লালন- ৪৭৩/৪)
৩. “আরবিতে যাকাতের মানি, এই দেহের নির্যাস মণি, অটলে পায় স্বরূপ-খনি, যার যার দিব্যজ্ঞানে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৬৫)
৪. “একচন্দ্রে চারচন্দ্র মিশে রয়, ক্ষণেক ক্ষণেক ভিন্নরূপ হয়, খবর করো মণিকোঠায়, দাস্যপনা করে দিব্যজ্ঞানে।” (পবিত্র লালন- ৪৪৩/৩)
৫. “গোরারূপ ঝুঝতে পারে কে এমন, ছিল পুরুষ করল নারীর বেশ ধারণ, দিব্যজ্ঞানে বলছে লালন, আছে শতদলে ভাব মনিহারা।” (পবিত্র লালন- ২৩৭/৪)
৬. “চৌদ্দপোয়া দেহের গড়ন, ধরতে যদি পারো লালন, তবে স্বদেশী চলন, জানবি দিব্যজ্ঞান অনুসারে।” (পবিত্র লালন- ৭৯৭/৪)
৭. “জ্ঞান ভা-ারী দয়ালরে, দিব্যজ্ঞান দান কর আমারে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৩)
৮. “তারে দিব্যজ্ঞানে দেখ না মনোরায়, ঝরার খালে বাঁধ বাঁধলে, রূপেরমানুষ ঝলক দেয়।” (পবিত্র লালন- ৪৮৭/১)
৯. “দিব্যজ্ঞান সত্যের ঠিকানা, নিজকে নিজে যায়রে চেনা, গুরুকৃপায় স্বর্গ কেনা, তরিতে উড়াইয়া পাল।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৭)
১০. “দিব্যজ্ঞানের জ্ঞানী যারা, খোদা কিরূপ জানে তারা, জানবে কেমনে অজ্ঞানীরা, জ্ঞানীর মর্ম জানে জ্ঞানীজনে।” (পবিত্র লালন- ৫২২/২)
১১. “দেহধামে মনের বিচার, সাধুশাস্ত্রে তাই প্রচার, বলন কয় মূল ব্যাপার, দেখরে চেয়ে দিব্যজ্ঞানে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮২)
১২. “নিচে ওপর থরে থরে, সাড়েনয় দরজা ঘরে, নয়-দরজা তার- জানতে হয় সবার, আধ-দরজা চিনলে দিব্যজ্ঞানী হয়।” (পবিত্র লালন- ৮৪৬/২)
১৩. “পাপের বিচার দেহধামে, নীরবে নীরবে দেখ গণে, বলন কয় দিব্যজ্ঞানে, দেহত্যাগের পর কিছু নাই।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৬৩)
১৪. “বামে বেদ ডানে কুরান, মাঝখানে ফকিরের বয়ান, যার হয়েছে দিব্যজ্ঞান, কেবল সে দেখতে পায়।” (পবিত্র লালন- ১৯৬/২)
১৫. “বাহ্যজ্ঞান অর্জন করলি, নরকবাস বুঝিয়া নিলি, দিব্যজ্ঞান বিনে স্বর্গ হারালি, সুখে দুঃখে মিলেনা তাল।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৭)
১৬. “ভুলব না ভুলব না বলি, কাজের বেলা ঠিক থাকে না, কটাক্ষে মন পাগল করে, দিব্যজ্ঞানে দিয়ে হানা।” (পবিত্র লালন- ৭২৩/১)
১৭. “যদি চিনো সাঁইয়ের ছবি, তবে দিব্যজ্ঞানী হবি, গুপ্তজ্ঞানের ভাণ্ডার সবি, প্রকাশ হয় দীপ্তকর।” (পবিত্র লালন- ৫৩৩/৩)
১৮. “লাল জরদ ছাওয়াদ মনি, বলব কী তার রূপ বাখানি, দেখতে যেমন পরশমণি, দিব্যজ্ঞানে ভূমণ্ডলে।” (পবিত্র লালন- ৩১৩/২)
১৯. “শুম্ভরস হয় সেই রসখানা, শাস্ত্রীয় গ্রন্ত পড়ে দেখনা, এ ছিল যাকাত নমূনা, বলন কয় দিব্যজ্ঞানে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৬৫)
২০. “শুক্লপক্ষে ব্রহ্মাণ্ডে গমন, কৃষ্ণপক্ষে যায় নিজভুবন, লালন বলে- সে রূপলীলে, দিব্যজ্ঞানী সে জানে।” (পবিত্র লালন- ৭৩৯/৪)
২১. “সহজমানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে, পাবিরে অমূল্যনিধি পাবি বর্তমানে।” (পবিত্র লালন- ৯২৮/১)
২২. “সেই প্রহরেই আততত্ত্ব নামে নিধুবনে, দিব্যজ্ঞানের হয়রে উদয় পাইলে জীবনে, যেতে চূড়ার ওপর- মরে ডাঙ্গার ’পর, বলন কয় নয় বহুদূর- পাইলে সঠিক সন্ধানী।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৬৪)
২৩. “স্বয়ংরূপ দর্পণে ধরে, মানবরূপ সৃষ্টি করে (হে), দিব্যজ্ঞানী যারা- ভাবে বুঝে তারা, মানুষ ভজে কার্যসিদ্ধি করে যায়।” (পবিত্র লালন- ৫২৬/২)
গুপ্ত-জ্ঞান (secrecy-wisdom)/ ‘حكمة السرية’ (হাকুমাত আসসুররিয়া)
* “যদি চিনো সাঁইয়ের ছবি, তবে দিব্যজ্ঞানী হবি, গুপ্তজ্ঞানের ভাণ্ডার সবি, প্রকাশ হয় দীপ্তকর।” (পবিত্র লালন- ৫৩৩/৩)
সূক্ষ্ম-জ্ঞান (Penetrative wisdom)/ ‘حكمة مخترق’ (হাক্বিমা মুকতারাক্ব)
* “দেশ সমস্যা অনুসারে, ভিন্ন বিধান হতে পারে, লালন বলে সূক্ষ্মজ্ঞান বিচারে, পাপ-পুণ্য নাই বালাই।” (পবিত্র লালন- ৬২৩/৪)(মুখঃ- “পাপ পুণ্যের কথা আমি কারেবা শুধাই, এ দেশে যা পাপ গণ্য অন্য দেশে পুণ্য তাই”)
ঠুনকো-জ্ঞান (Fragile wisdom)/ ‘حكمة المتقصف’ (হাকুমাত আলমাতাক্বাসাফ)
* “ঠুনকো জ্ঞানে বড়াই করে, ভাষাতে ভেদাভেদ করে, মূলে শাস্ত্র ভিন্ন নয়রে, ভিন্ন করে লোভ পাপে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৬)
বস্তু-জ্ঞান (Material wisdom)/ ‘حكمة المواد’ (হাকুমাত আলমুয়াদ)
* “শুনে ব্রহ্মজ্ঞানীর বাক্য, দরবেশেরা করে ঐক্য, বস্তুজ্ঞান যার নাই- নামব্রহ্মে কী পায়, লালন কয় তারা এ কী কথা কয়।” (পবিত্র লালন- ২৯৪/৪)
স্থূল-জ্ঞান (Gross wisdom)/ ‘حكمة الإجمالي’ (হাকুমাত আলইজমালি)
* “থেকে সাধুর চরণতলে, তোর স্থুল-জ্ঞান সূক্ষ্ম হলে, পরকাল পাবি ইহকালে, বলন কয় ভেদখানা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৩)
মহাজ্ঞান (Prescience)/ ‘البصرية’ (আলবাসারিয়া)/ ‘علم الغيب’ (আলিম আলগায়িব)
১. “মন গেলিনা সৃষ্টি মূলে, মহাজ্ঞান সাগরের কূলে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৫)
২. “মহাজ্ঞান পেয়ে তিলিক, কত সাধক হয় শাস্ত্রযাজক, কেউ হয় শাস্ত্র প্রচারক, তাও তুই রলি ভুলে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৫)
রূপক-জ্ঞান (Metaphor-Wisdom)/ ‘حكمة الاستعارة’ (হাকুমাত আলইস্তেয়ারা)
* “রূপক-জ্ঞান জ্ঞানের খোলস, চোখ মেলে দেখরে অলস, এখন তোর হলো না হুঁশ, পরকাল কী ভাব কানা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৩)
মানুষ্য-জ্ঞান (Mankind Wisdom)/ ‘حكمة البشرية’ (হাকুমাত আলবাশারিয়া)
* “গুরুকে মনুষ্যজ্ঞান যার, অধঃপথে গতি হয় তার, লালন বলে তাই আমার, ঘটল মনের কুস্বভাবে।” (পবিত্র লালন- ৩৯৮/৪)
ভক্তি-জ্ঞান (Devotion Wisdom)/ ‘حكمة التفان’ (হাকুমাত আলতাফানি)
* “মানুষ মক্কায় পড় নামাজ, যাতে রাজি হয় বেনিয়াজ, ভক্তিজ্ঞান মিশিয়ে ভজ, লালন ভেবে হয় পাগল।” (পবিত্র লালন- ৫৯৭/৪)
ব্রহ্ম-জ্ঞান (Theology)/ ‘لاهوت’ (লাহুত), ‘علم اللاهوت’ (আলিমা আল্লাহুত), ‘حكمة اللاهوت’ (হাকুমাত আল্লাহুত)
১. “বৈষ্ণবের ভজন ভালো, তাদের ভক্তি বলও ছিল, ব্রহ্মজ্ঞানী যারা- সদায় বলে তারা, শাক্ত বৈষ্ণবের নাই স্বয়ং পরিচয়।” (পবিত্র লালন- ২৯৪/৩)
২. “ব্রহ্মজ্ঞানী খ্রিস্টানেরা, নামব্রহ্ম সার বলেন তারা, দরবেশগণ কয় বস্তু কোথায়, দেখ নারে।” (পবিত্র লালন- ৩১৭/৩)
৩. “যেজন ব্রহ্মজ্ঞানী হয়, নামব্রহ্ম সার করে সদায়, স্বরূপ রূপ-দর্পণে- স্বরূপ দেখে নয়নে, লালন বলে দীপ্ত রসিক যারা।” (পবিত্র লালন- ৯০০/৪)
৪. “শুনে ব্রহ্মজ্ঞানীর বাক্য, দরবেশেরা করে ঐক্য, বস্তুজ্ঞান যার নাই- নামব্রহ্মে কী পায়, লালন কয় তারা এ কী কথা কয়।” (পবিত্র লালন- ২৯৪/৪)
৫. “সাধুসঙ্গ করোরে মন, অনর্থের হয় বিবর্তন, ব্রহ্মজ্ঞানে ইন্দ্রিয় দমন, হবেরে সঙ্গগুণে।” (পবিত্র লালন- ৯৪১/২)
মারিফত-জ্ঞান (Acquaintance Wisdom)/ ‘العلم المعرفة’ (আলইলমু আলমারিফা)
* “রূপক বর্ণনা শরিয়তে, হক্ব বলে হাক্বিক্বতে, ত্বরিক্বত সাধনপথ, মারিফত জ্ঞান অর্জন করা, হতে হয় জ্যান্তমরা, লালন কয় অধরা ধরা, সে বড় কঠিন ধন।” (পবিত্র লালন- ৯৮৯/৩)
হাক্বিক্বত-জ্ঞান (Realism)/ ‘العلم الحقيقة’ (আলইলমু আলহাক্বিক্বাত)
* “নবির চরণ রেখো স্মরণ, পাবে হাক্বিক্বতের জ্ঞান, লালন বলে এলো শমন, মিযান খাড়া সামনে।” (পবিত্র লালন- ৭৩৫/৪)
পাপ-পুণ্য-জ্ঞান (Sin-virtue Wisdom)/ ‘حكمة الخطيئة-الفضيلة’ (হাকিমা আলখাতিয়া-আলফাদিলা)
১. “গোপী বিনে জানে কেবা, শুদ্ধরস অমৃতসেবা, গোপীর পাপ-পূণ্য জ্ঞান থাকে না, কৃষ্ণদর্শনে।” (পবিত্র লালন- ৯৭০/২)
২. “মিঠার জন্য এঁটো দিই মা, পাপ-পুণ্যি জ্ঞান থাকে না, গোপাল খেলে হই সান্ত¡না, পাপ-পুণ্যি কে ভাবে।” (পবিত্র লালন- ২৫৫/২)
৩. “শুদ্ধাশুদ্ধ নাই জ্ঞান, সাতবার খেয়ে একার স্নান, করেন সদায়, সে যে অসাধ্যকে সাধ্য করে, জীবে যা না ছোঁয় ঘৃণায়।” (পবিত্র লালন- ৪২৩/৩)
৪. “সাতবার খেয়ে একবার স্নান, নাই পূজা নাই পাপ-পুণ্য জ্ঞান, অসাধ্যরে সাধ্যবিধান, শিখাচ্ছে সব ঘাটে পথে” (পবিত্র লালন- ২২০/২)(মুখঃ- “এনেছে এক নবিন আইন নদীয়াতে, বেদ পুরাণ সব দিচ্ছে দুষে, সে আইনের বিচার মতে”)
নব্বই হাজার-জ্ঞান (Ninety thousand wisdom)/ ‘حكمة تسعون الف’ (হাকিমা তাসাউনা আলাফ)
* “নব্বই হাজার জ্ঞানে, আঠার হাজার দেশ তারি, বাহাত্তর হাজার তারে, চব্বিশ হাজার প্রচারী।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৩৫)
পঞ্চান্নধারা-জ্ঞান (Fifty five Article Wisdom)/
‘خمسة وخمسون المادة الحكمة’ (খামসা ওয়া খামসুনা আলমাদা আলহাকিমা)
* “পঞ্চান্নধারা জ্ঞানের পারা সজাগ রেখে সুগমে, ওরে ভবসিন্ধু পাড়ি দিও নিরীক্ষ রেখে নয়নে, সৌদামিনী দিনরজনী, বাস করে মেঘের আড়লে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৫)
জ্ঞানের ওপর কয়েকটি পূর্ণাঙ্গ বলন
(Some full Bolon on the Wisdom)
১. “জ্ঞানই করে মহীয়ান গোপন প্রকাশ্য দুই জ্ঞান
অর্জন করে হও মহান সর্বপরে জ্ঞানীর মান।
জাগতিক জ্ঞানে মরে
তত্ত্বজ্ঞান চৈতন্য করে
তুলে তারে বিশ্ব পরে
সম্মান যশ জয়গান।
গোপন প্রকাশ্য দুই ধারা
আত্মতত্ত্ব-জ্ঞানী সাধক যারা
এই ভবেতে মহান তারা
তারা সাঁইজি দয়াল চাঁন।
উভয় জ্ঞানী সাধুজনা
এক জ্ঞানী পণ্ডিত কানা
বলন কয় পাগল মনা
আগেতে হও সাবধান।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২২)
২. “জ্ঞান ভাণ্ডারী দয়ালরে
দিব্যজ্ঞান দান কর আমারে।
কত শত মুনি ঋষি
যেই জ্ঞান শিখে দিবানিশি
হয়ে গহীন অরণ্যবাসী
ত্যাগী যোগী এ সংসারে।
এই ভবে যত সাধুগণ
যেথা করে জ্ঞান অন্বেষণ
সেখানে করাও পদার্পণ
আপনি এসে হাত ধরে।
বিশ্বজনীন যে সুখ্যাতি
সে ভেদেতে শিখাও গীতি
বলন কাঁইজির এ মিনতি
দিব্যজ্ঞানী কর মোরে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৩)
৩. “জ্ঞান মূলতঃ দুই প্রকরণ রূপক ও গোপন
গ্রন্থে রয় রূপক আকারে হৃদয়ে গোপনের গোপন।
এ দেহের ইঙ্গিত বুঝাতে
বাণী লিখে ঐশি শাস্ত্রতে
গ্রন্থ তামামী- ঐশিবাণী
গোঁসাইরা কয় কাঁইকথন।
রূপক গোপন দুইধারা
প্রচার করে যাজক যারা
গ্রন্থ উপমা- হৃদে গোপনা
উভয় জ্ঞানী বিজ্ঞজন।
রূপক গ্রন্থ পড়ে তামাম
তর্কবিদ্যায় হয় বলীয়ান
কয় বলন- করো ভজন
দিব্যজ্ঞান করে অর্জন। ” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৪)
৪. “নিজকে বড় ভাবলি জ্ঞানী
মন তুই বড় অজ্ঞানী।
করে শত জ্ঞান বিতরণ
নিজেরে কয় অবোধ লালন
পড়ে কর সে জ্ঞান অর্জন
সাঁই লালনের মধুরবাণী।
জ্ঞানগুরু লালন সাঁইজি
তার অমূল্যবাণী পেয়ে আজি
ঘুরতেছরে মন সাধু সাজি
মূলে কিছুই শিখনি।
দয়াল সাঁইজি বলে বলন
চিনলি না গুরু কী ধন
শুনলি না বাউলের গান
আত্ম-জ্ঞান মহাখনি।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৬১)
৫. “মন কেন মুরিদ হইলি না
আর কয় জনম থাকবি কানা।
যেই শিষ্য জ্ঞান-সন্ধানী
চৈতন্য জ্ঞান দেয় গুরুগুণি
সে গুরুর কারণে শুনি
লাভ করে অচিনজনা।
যে শিষ্য জ্ঞান পিপাসী
অচিন চিনে হয় তাপস্বী
রহে না তার কর্মফাঁসি
খাঁসা শিষ্য সে জনা।
শিষ্য হলে মনে প্রাণে
দয়াল দর্শন হয় জীবনে
বলন কয় আধ্যাত্মিক জ্ঞানে
সবার ভাগ্যে হয় না।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩৩)
জ্ঞানের প্রকারভেদ (Classification of Wisdom)
জ্ঞান দুই প্রকার। যথা- ১.পরাজ্ঞান ও ২.অপরাজ্ঞান।
১. পরাজ্ঞান (Universal knowledge)
যে জ্ঞান দ্বারা স্বয়ং সাঁই ও কাঁইকে চেনা ও জানা যায় এবং অন্যান্য সব জ্ঞানের ওপর আধিপত্যলাভ করা যায় তাকে পরাজ্ঞান বলে।
২. অপরাজ্ঞান (Particular knowledge)
যে জ্ঞান নিজেও ভালোভাবে বুঝা যায় না এবং অন্যকেও ভালোভাবে বুঝানো যায় না তাকেই অপরাজ্ঞান বলে। যেমন- চমৎকার বা আরবিভাষায় মুযিজা (ﻤﻌﺠﺯﺓ)।
ভালো জ্ঞান অর্জনের উপকার
(Benefit achieving of better knowledge)
১. সূক্ষ্ম ও স্থূল উভয় জ্ঞানার্জনের দ্বারা সুখী ও সুন্দর জীবন যাপন করা যায়।
২. সঠিক ও সূক্ষ্মজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে মানবজনমের প্রকৃত সার্থকতা উপলব্ধি করা যায়।
মন্দ জ্ঞান অর্জনের অপকার
(Disservice achieving of evil knowledge)
মন্দ জ্ঞান অর্জনের দ্বারা জীবন দুঃখময় হয়।
জ্ঞানের পরিচয় (Identity of Wisdom)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘মূলকসদস্য’ বিশেষ। কোন কিছু অধ্যয়ন, অনুশীলন বা গবেষণাশক্তিকে জ্ঞান বলা হয়। জ্ঞান এক প্রকার শক্তি। জ্ঞানের অনেক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। যেমন- কৃষি সম্প্রসারণ জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান, শাস্ত্রীয় জ্ঞান এবং আধ্যাত্মিক জ্ঞান ইত্যাদি। আমরা এখানে শুধু আধ্যাত্মিক জ্ঞান (বেদের ভাষায় পরাজ্ঞান বা কুরানের ভাষায় মিনহাজ) নিয়ে স্বল্পবিস্তার আলোচনা করার চেষ্টা করব। আধ্যাত্মিক জ্ঞানও কয়েক প্রকার রয়েছে। যেমন- আত্মতত্ত্ব জ্ঞান, শুক্র নিয়ন্ত্রণ জ্ঞান, জন্মনিয়ন্ত্রণ জ্ঞান, সাঁইতত্ত্ব জ্ঞান ও কাঁইতত্ত্ব জ্ঞান ইত্যাদি।
বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম শাস্ত্রীয় গ্রন্থ হলো ‘বেদ’- যা আজ হতে প্রায় তেতাল্লিশশত (৪,৩০০) বছর পূর্বে সংস্কৃতভাষায় সর্ব প্রথম সংকলিত হয়েছিল। সেখানেও জ্ঞানকে দুভাগে ভাগ করে বলা হয়েছে জ্ঞান দু প্রকার ১.অপরাজ্ঞান ২.পরাজ্ঞান। যেমন- পবিত্র বেদে উল্লেখ করা হয়েছে-
“দ্বে বিদ্যে বেদিতব্যে ইতি স্ব
যদ্ব্রহ্মবিদ্যে বদস্তি পরা চৈবপরা চ। ৪
তসপরা ঋগে¦দ যজুর্বেদো সামবেদোহথর্ববেদ
শিক্ষা কল্পো ব্যাকরণং নিরুক্তং ছন্দো জ্যোতিষমিত। ৫” (বেদ)।
অর্থঃ ব্রহ্মবিদগণ বলে থাকেন পরাজ্ঞান ও অপরাজ্ঞান এ দু’টি আয়ত্ত করতে হবে। অপরাবিদ্যা হলো ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদের শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দ ও জ্যোতিষ। আর পরাবিদ্যা হলো তাই- যা দ্বারা স্বয়ং ব্রহ্মাকে অধিকার করা যায়। অন্যদিকে আজ হতে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে আরবি ভাষায় রচিত অন্য মহাগ্রন্থ কুরানেও এ একই উক্তি উচ্চারণ করে বলা হয়েছে- “لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَ مِنْهَاجًا” (লিকুল্লি জায়ালনা মিনকুম শিরয়াতাও ওয়া মিনহাজ)”। অর্থ- “তোমাদের প্রত্যেকের জন্য বিধানমূলক ও প্রকৃতপথ রয়েছে” (কুরান, মায়িদা- ৪৮)। অসংখ্য হাদিসের মধ্যে জ্ঞান দু প্রকারের প্রমাণ রয়েছে। আমরা এ গ্রন্থে মহাগ্রন্থিক প্রমাণ ভিন্ন গ্রহণ করিনি। এ জন্য হাদিসের প্রমাণাদি তুলে ধরতে ব্যর্থ হলাম। স্থূল-জ্ঞান দ্বারা প্রমাণ বিতর্ক ও প্রতিউত্তর ইত্যাদি করা যায় কিন্তু সূক্ষ্ম-জ্ঞান দ্বারা সাঁই ও কাঁইকে চেনা যায়।
পূর্বজন্মে পিতারূপে সূক্ষ্ম-জ্ঞান অর্জনের কাজ আরম্ভ করলে সন্তানরূপে পরজন্মে তা অর্জন করা অত্যন্ত সহজ হয়। কিন্তু পিতারূপে গুরুবাদী সূক্ষ্ম-জ্ঞান বিদ্বেষী হলে পুত্ররূপে পরজন্মে তা গ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়। বলতে গেলে গুরুবাদী আত্মতত্ত্ব জ্ঞান কয়েক জনম দ্বারা পূর্ণতালাভ করে। যেমন- পিতার বৃদ্ধ বয়সে কোন দিব্যজ্ঞানী গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করলেন। তিনি যতটুকু জ্ঞান অর্জন করলেন তা পুত্রকে শিক্ষা দিলেন এবং পুত্রকে উক্ত গুরুদেবের নিকট দীক্ষিত করলেন। এটাকেই বলা হয় পুত্রের দুই জনমের জ্ঞান প্রাপ্ত হওয়া। এবার পুত্রের প্রাপ্ত জ্ঞান তার পুত্রকে শিক্ষা দিলে এবং পুত্র আবার জ্ঞানার্জন করলে একে বলা হয় তার তিনজনমের জ্ঞানপ্রাপ্ত হওয়া।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন