সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৪

মানুষগুরু (জ্ঞান- ৬ষ্ঠ পর্ব)

৩০/৪. মানুষগুরু
Man preceptor/ ‘معلم البشر’ (মুয়াল্লিম আলবাশার)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘জ্ঞান’, রূপক পরিভাষা ‘গুরু’ উপমান পরিভাষা ‘আলো’ এবং চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’
মানুষ (রূপ)বি মানব, মানুষ্য, মনু, লোক, জন, নৃ, নর, ব্যক্তি, man, person, microcosm, prick, mankind, mortality, humankind, ‘بشر’ (বাশারা), ‘رجل’ (রাজুলা), ‘إنسان’ (ইন্সান), ‘شخص’ (শাখসা), ‘المرء’ (আলমারউ) বিণ মানবীয়, বয়ঃপ্রাপ্ত, মানুষ্য সম্পর্কীয়, মানবীয় গুণসম্পন্ন (আবি) ঈশ্বর, গুরু, গোঁসাই, স্বামী, নারায়ণ, নিরঞ্জন, বিষ্ণু, মৎস্য, রাম, সাঁই, স্বরূপ, হরি (উপ) চাঁদ (রূ) সাঁই (দেত) পালনকর্তা স্ত্রী মানুষী।
মানুষগুরু (রূপ)বি মানুষরূপী গুরু, মানুষরূপী গোঁসাই, Man preceptor, ‘بشر معلم’ (বাশারা মুয়াল্লিম) (প্র) রূপক সাহিত্যে বর্ণিত ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু- এ চার প্রকার গুরুর অন্যতম (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (.ﻋﻘﻝ), ইলিম (.ﻋﻟﻢ) (আভা) বিচারক, উপদেষ্টা, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয় ২.চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা রূপকার্থে মানুষগুরু বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান {বাং.মানুষ+ বাং.গুরু}
মানুষগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Man preceptor)
১. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
২. “গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
৩. “হক্বের ওপর থাকবে যখন, লাহুত মুক্বাম চিনবে তখন, এ সত্য জেনে ও মন, মানুষগুরু ধরলে না” (পবিত্র লালন- ৭৪২/৩)
মানুষগুরুর ওপর একটি পূর্ণ বলন
(A full Bolon on the Man preceptor)
“গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়
জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়।
মানুষগুরুর প্রেমপণ্যারে- জগৎগুরু চলে ফিরে
ধরতে গেলে যায়রে দূরে- পরমগুরু কাছে রয়-
মানুষগুরু হইলে সদয়- জগৎগুরু দেয় পরিচয়
জানতে হয় তা নিরালায়- ভক্তিভজন রেখে ভয়।
মানুষগুরু হয় আকারে- জগৎগুরু রয় নিরাকারে
জ্ঞান দ্বারা ধরো তারে- নিকটে সে দূরে নয়
দমে যায় দমেতে আসে- দিনরজনী ডানে বাঁয় সে
ফাঁদ পাঁতিয়া ধর কষে- ভক্তি দিয়ে উত্তরা বায়।
জগৎগুরু অপারলীলা- দেখবি তার রূপ রঙ্গিলা
করিসনে আর অবহেলা- সময় তোর অধিক নাই-
উত্তরা বায় ধরলে পাড়ি- মানুষগুরু হয় কা-ারী
বলন কয় ভয় কী তারি- কালসমন দূরে পালায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
মানুষগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে। যেমন- বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Man preceptor)
রূপক সাহিত্যে গুরুপদ প্রাপ্ত ব্যক্তির জ্ঞানকে গুরু বলে। যেমন সম্বিত।
মানুষগুরুর প্রকারভেদ (Classification of Man preceptor)
মানুষগুরু দুই প্রকার। যথা- ১.আধ্যাত্মিক গুরু ও ২.জাগতিক গুরু।
১. আধ্যাত্মিক গুরু (Spiritual preceptor)
আত্মদর্শন বা পরাবিদ্যার শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকারীকে আধ্যাত্মিক গুরু বলে। যেমন- আত্মতাত্ত্বিক গুরু।
২. জাগতিক গুরু (Mundane preceptor)
বৈষয়িকবিদ্যা শিক্ষাদানকারী প-িতকে জাগতিক গুরু বলে। যেমন- শিক্ষক।
আবার মানুষগুরু দুই প্রকার। ১.উপমান মানুষগুরু ও ২.উপমিত মানুষগুরু।
১. উপমান মানুষগুরু (Analogical Man preceptor)
মানুষরূপী গুরুকে উপমান মানুষগুরু বলে।
২. উপমিত মানুষগুরু (Compared Man preceptor)
রূপক সাহিত্যে মানুষের জ্ঞানকে উপমিত মানুষগুরু বলে।
মানুষগুরুর পরিচয় (Identity of Man preceptor)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ বিশেষ। সাধারণত সর্ব প্রকার জ্ঞানীকেই মানুষগুরু বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে পিতা-মাতা, শ্বশুর-শাশুড়ী, চাচা, মামাসহ সর্ব প্রকার বয়জ্যেষ্ঠ লোককেই মানুষগুরু বলা হয়। সর্ব প্রকার শিক্ষাগুরু ও দীক্ষাগুরুকেও মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয়। শুধু আকার ও আকৃতিধারী জ্ঞানীকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের ‘জ্ঞান’। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ মানুষগুরু হলো মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির ‘জ্ঞান’
পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
রক্তমাংসে নির্মিত মানুষকে গোঁসাই বা গুরু ভাবা, গোঁসাই বা গুরুর ছবি ধ্যান করা, গোঁসাই বা গুরুর মুখম-লের ধ্যান করা সর্বকালে সর্ব ঘরানাতেই নিষিদ্ধ ছিল, এখনো নিষিদ্ধ আছে এবং ভবিষ্যতেও নিষিদ্ধ থাকবে। যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ করে তারা একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই করে। আবার যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ ভাবে তারাও একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই ভাবে। এরূপ গোঁসাই গুরুর সঙ্গ পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গেই আত্মতাত্ত্বিক সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে অত্যন্ত মজার বিষয় হলো আমাদের দেশেরমানুষ কেবল দীক্ষাগুরুকেই মানুষগুরুরূপে মূল্যায়ন করে থাকেন। ওপরোক্ত শ্রদ্ধাবান ও মান্যবর ব্যক্তিদেরকেও সাধারণমানুষ বলেই মনে করে থাকেন। আবার অনেকে একাধিক মানুষগুরু গ্রহণ করাকে অবৈধ বলে মনে করে থাকেন অথচ কবি কামিনী রায় লিখেছেন-
“জগৎজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
নানানভাবে নতুন বিষয় শিখি দিবারাত্র।”
এছাড়া জনৈক মরমীকবি বলেছেন-
“গুরু ধরি শতশত শিখি কত মন্ত্র-তন্ত্র
যার কাছে আলো পাবো তার নামের দোহাই দিব।”
পরিশেষে বলা যায় বয়জ্যেষ্ঠরা সবাই মানুষগুরু। এছাড়া প্রথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিা শিক্ষক-শিক্ষিকারাও আমাদের মানুষগুরু। জ্ঞানার্জনের জন্য একাধিক মানুষগুরু গ্রহণ করা সর্বকালে সর্বস্থলেই বৈধ ছিল এবং এখনো তা বৈধই রয়েছে। তবুও বাংভারতের মূর্খ গুরু গোঁসাইরা “একাধিক গুরু গ্রহণ করা যায় না, এক রাতা দু’বার বলি দেওয়া যায় না, এক মাথা দু’বার বিক্রি করা যায় না।”- এসব কথা বলে সাধারণ মানুষকে মহাবিভ্রান্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শাস্ত্রান্ধতা থেকে বের করে পরম্পরা-অন্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ এক অন্ধকার হতে বের করে আরেক অন্ধকারে নিক্ষেপ করছে। এরূপ কূট চক্রান্ত চলতে থাকরে সাধারণ মানুষ কখনোই সঠিক পথের সন্ধানলাভ করতে পারবে না।
একাধিক গোঁসাই- গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ প্রসঙ্গ
(Context to taking pupilage the multiple Guru-Preceptor)
প্রত্যেক মানুষকে ন্যূনতমপক্ষে চারজন আধ্যাত্মিক দীক্ষাগুরু গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। পূর্বকালে একজন গুরু গ্রহণের নির্দেশ থাকলেও বর্তমানে সেটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বর্তমানে অনেক স্বয়ংসিদ্ধি গুরু গোঁসাই প্রতিনিয়ত আবির্ভূত হচ্ছেন। যে যেমনে পারে গুরুপদ সংগ্রহ করছে। এ জন্য পূর্বকালে একজন গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হতো কিন্তু বর্তমানে চার চারজন গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা ব্যতীত কেউই সম্যক আত্মতত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী হতে পারবেন না। কিছুকিছু ভ-গুরু- যারা সামান্যতম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকজ্ঞানও রাখেন না কেবল তারাই শিষ্যদের বলে থাকেন যে, “যেমন এক রাতা দু’বার বলি করা যায় না তাদৃশ একজন শিষ্যও দুই গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারে না।” তারা আরো বলেন যে, “এক ব্যক্তি একাধিক গুরু বা গোঁসাইয়ের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলে নিরীক্ষ গ্রহণ করবে কার?” তারা একটিবারও ভেবে দেখেন না যে, একজন ছাত্র প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণি সমাপ্ত করার জন্য কতজন শিক্ষকের নিকট হতে বিদ্যাশিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তাতে তাদের নিরীক্ষ গ্রহণের কোন ক্ষতি হয় না। কেবল গুরুর নিকট এলেই যত নিরীক্ষ গ্রহণ ও রাতা বলি করার ফোতোয়া। এসব অজ্ঞরা তো গুরুতত্ত্বই জানেন না।
এক বিপণিতে যেমন সর্বশ্রেণির পণ্য পাওয়া যায় না তদ্রূপ এক গুরুর নিকটও সর্ব প্রকার জ্ঞান পাওয়া যায় না। উপমাস্বরূপ বলা যায় একজন গুরুর নিকট কেবল শাস্ত্রীয় মতবাদের জ্ঞান থাকে, অন্য গুরুর নিকট কেবল পরম্পরারজ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল আত্মতত্ত্বের জ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল দার্শনিকজ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল বৈজ্ঞানিকজ্ঞান থাকে আবার আরেক গুরুর নিকট ভাষাজ্ঞান বিদ্যমান থাকে। আলোচ্য সর্ব প্রকার জ্ঞানার্জনকারী গুরুর সংখ্যা একেবারেই বিরল। এ জন্য একাধিক গুরু গ্রহণ করেই ক্রমে ক্রমে সর্ব প্রকার জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই বুদ্ধিমান লোকের উত্তম কাজ। যেমন বলা হয়-
“গুরু ধরব শতশত
শিখব শত মন্ত্রতন্ত্র
যার কাছে জ্ঞানের আলো পাবো
তাঁর নামের দোহায় দিব।”
আবার বলা হয়-
“গুরু ধরব শতশত মন্ত্র শিখব যত যার
মনের কালি দূর করবে যে দোহাই দিব তার।”
মহাত্মা লালন সাঁইজি স্বয়ং বলেছেন-
“তাইতো বলি ওরে কানা,
সর্বজীব হয় গুরুজনা,
চৈতন্য-গুরু করো সাধনা,
তাতে কর্মদোষ যায়।” (পবিত্র লালন- ৬৩৭/৩)
আধ্যাত্মিক জ্ঞানহীন অজ্ঞ ও ধান্ধাবাজ গুরু-গোঁসাইরা বলে থাকেন যে- “একাধিক গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা যায় না।” এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অমূলক ও অবিশ্বাস্য কথা। এরূপ কথা কখনই বিশ্বাস করা যায় না। এ প্রসঙ্গে কবি কামিনী রায় লিখেছেন-
“জগৎজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
নানানভাবে নানান জিনিস শিখি দিবারাত্র।”
অশিক্ষা ও কুশিক্ষায় জর্জরিত হওয়া ও নোংরা রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগে যতসব বিভ্রান্ত মতবাদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে আমাদের এ স্বর্গনীড় সোনার বাংলাদেশ। এদেশের যত্রতত্র আগাছার মতো গিসগিস করে গজিয়ে উঠেছে যতসব ভ-পির, গল্পসার বক্তা, কণ্ঠসার বাউল, হাতুড়ে চিকিৎসক, নোংরা রাজনীতিজীবী, অন্ধ শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়ী, জ্ঞানহীন গণক, আনাড়ী বৈদ্য, অনভিজ্ঞ সাপুড়ে, অজ্ঞ জিনবাজ ও ভুতরাজ কবিরাজ। এরা মানুষের কাছ থেকে কেবল টাকাই হাতিয়ে নেওয়া জানে, মানুষকে কেবল বিপদের মুখেই ঠেলে দিতে পারে কিন্তু দিতে পারে না বাস্তব কিছু।
বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারণ বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩০০টি রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর কোন দেশেই এত পির, এত আখড়া, এত উরশ, এত বাউলগান, এত পালগান, এত মাজার, এত মসজিদ, এত ইজতেমা, এত ওয়াজ ও এত উগ্রবাদী দল নেই। পৃথিবীর বড়বড় দেশে মাত্র কয়েকটি শাস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের লোক বাস করে কিন্তু আমাদের এ ক্ষুদ্র দেশটিতে প্রায় ৫০টির অধিক শাস্ত্রীয় মতবাদের লোক বাস করে। বর্তমানে শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদের ধুরন্ধর শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদজীবিদের বিনা পুঁজির লাভজনক রমরমা এসব ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তাদের অভয় বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু আমাদের অসহায় এ বাংলাদেশ। জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের এখন সজাগ হতে হবে। সত্যপথ, দর্শন ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে আবার একাত্তরের মতো গর্জে উঠতে হবে।
বিভিন্ন কারণে একাধিক গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। যেসব কারণে একাধিক গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায় তা হলো-
১. গোঁসাই বা গুরু যদি প্রয়াণলাভ করেন। তখন অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা সর্বক্ষেত্রে ও সর্ব ঘরানাতেই বৈধ বা সিদ্ধ রয়েছে।
২. গোঁসাই বা গুরু যদি জীবনের তরে দেশান্তরি হন। যেমন- অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তবে অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৩. যদি কোন কারণে একই দেশে, এক অঞ্চল হতে অন্য কোন অঞ্চলে গুরু বা শিষ্যের যে কোন একজনের হঠাৎ স্থানান্তরের কারণে- তাদের মধ্যে ব্যবধান এত অধিক হয় যে গোঁসাই বা গুরুর সাথে সাক্ষাত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরুর নিকট হতে অনুমতি সাপেক্ষ অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট পুনঃ শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরু যদি অনুমতি না-ও দেয় তবুও অন্যগুরু গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৪. যদি কোন কারণে গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার স¤পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এরং কোন ক্রমেই গুরুর সহচার্য লাভের সম্ভবনা না থাকে তবে অন্যত্র শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়।
৫. চুরি, দস্যুতা ও নরহত্যা ইত্যাদির মতো বড়বড় দোষ কোন গোঁসাই বা গুরুর মধ্যে পাওয়া গেলে এরূপ গুরু পরিত্যাগ করে অন্য কোন গুরুদেবের নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৬. উচ্চ আত্মদর্শন শিক্ষালাভের জন্য গোঁসাই বা গুরুর অনুমতি সাপেক্ষ অসংখ্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরুর অনুমতি না পেলেও উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করা যায়।
৭. গোঁসাই বা গুরু যদি আত্মদর্শন বা আত্মতত্ত্ব বা দিব্যজ্ঞান না জানেন ও না বুঝেন তবে অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করা সর্বকালে সর্বস্থলেই সিদ্ধ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট (Current Situation)
১. গোঁসাই বা গুরুর শিষ্যবর্গ যদি এত অধিক হয় যে, লোকের ভিড়ে তিনি নিজ নিজ শিষ্য চিনতে অসমর্থ। তবে আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা অর্জনের জন্য এরূপ গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
২. গোঁসাই বা গুরুর আশ্রমে আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা শিক্ষাদীক্ষার পরিবর্তে যদি কেবল মিলাদ, সামা, কাওয়ালি, গজল, জিকির, গান, নৃত্য, শাস্ত্রীয় উপাসনা (পূজা/ ধ্যান/ প্রাণায়াম ও নামাজ) চলতে থাকে- তবে এরূপ গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে আত্মতত্ত্ব জ্ঞানী সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
৩. যে সব গোঁসাই বা গুরু শিষ্যদের আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরা-তত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা না করে কেবল শিষ্য বাড়ানোর প্রতিযোগীতার লিপ্ত থাকে এবং শিষ্য বাড়ানোর জন্য অডিও/ ভিডিও প্রচার করে থাকে- সে সব গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সাধক-গোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
৪. সর্বপরি গোঁসাই বা গুরু গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো, নিজকে চেনা, সনাতনী পদ্ধতিতে শুক্রনিয়ন্ত্রণ করা, শাস্ত্রীয় ও পার¤পরিক মতবাদাদির প্রকৃত আত্মদর্শন জানা ও আত্মশুদ্ধি করা। গ্রহণকৃত গোঁসাই বা গুরুর নিকট এসব উদ্দেশ্য অর্জন না হলে উক্ত গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গে সাধক গোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
গুরু হওয়ার যোগ্যতা
(The Minimum qualifications of preceptor-being)
গুরুপদ গ্রহণ বা গুরু হওয়ার জন্য, একজন সাধককে অবশ্যই প্রথমে মনোশুদ্ধি করতে হবে। মনোশুদ্ধি করার মূল অস্ত্রই হলো জ্ঞান। জ্ঞান ভিন্ন নিজের মনোশুদ্ধি করা যায় না। গুরু নিজের মনোশুদ্ধি করতে না পারলে, শিষ্যের মনোশুদ্ধি করবেন কিভাবে?
১. গুরুপদ গ্রহণ করতে হলে, তাঁকে অবশ্যই নিজ মাতৃভাষা, ইংরেজি ও আরবি এ তিনটির যে কোন একটি শিক্ষাক্রমের সর্বশেষ পদবি অর্জন করতে হবে। যেমন- বাঙালীদের জন্য বাংলায় স্নাতকোত্তর, ইংরেজ ও আরবিদের জন্য তাদের স্বস্ব মাতৃভাষায় তার সমমানের পদবি।
২. ঘারনিক গুরুদেবের নিকট হতে, আত্মতত্ত্ব বা পরাজ্ঞানার্জন করতে হবে। এতে অন্তত একযুগের সাধন ও পাকা ঘারনিক গুরুদেবের সহচার্য একান্ত প্রয়োজন। গুরুদেবের পাশেপাশে বা গুরুদেবের সাথে সাথে থেকে গুরুবৃত্তির বাস্তবজ্ঞান অর্জন করতে হবে। তা না হলে নিজে গুরুবৃত্তি করতে গিয়ে পদে পদে বিপদের সমম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।
৩. প্রচলিত ঘারনিক ও শাস্ত্রীয়জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
৪. প্রচলিত বিজ্ঞান ও দর্শনজ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে হবে।
৫. গুরুপদ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সর্ব প্রকার ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পরিহার করতে হবে। কারণ কোন বৃত্তিতে নিয়োজিত থেকে, কখনো স্বাধীনভাবে গুরুবৃত্তি করা যায় না। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য প্রয়োজন বোধে নিজে স্বাধীন ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে।
৬. গুরুবৃত্তি করার আকাক্সক্ষা থাকলে, বিবাহের পূর্ব হতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। দাম্পত্য জীবনে কোন প্রকার সন্তান গ্রহণ করা যাবে না। সন্তান গ্রহণের পরে শিষ্যপদ গ্রহণকারীদের প্রসঙ্গ ভিন্ন। গুরু গোঁসাইগণেরও উচিৎ সন্তান গ্রহণকারীদের গুরুপদ না দেওয়া। এক সন্তানের জনক গুরুপদ পাবার জন্য বিবেচনাধীন হলেও, একাধিক সন্তানের জনকগণ কোনক্রমেই গুরুপদ গ্রহণ করতে পারবেন না। এজন্য কোন গুরু গোঁসাই একাধিক সন্তানের পিতাকে গুরুপদ দান করতে পারবেন না। যদিও কোন গুরু গোঁসাই এরূপ কাজ করেন তবে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। বিশ্বের সর্বজান্তা হলেও একাধিক সন্তানের পিতা গুরু হতে পারবেন না।
৭. গুরু বা গোঁসাইপদ গ্রহণের জন্য সর্ব শাস্ত্রীয়জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যেন সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় মতবাদের লোকজনদের শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিকজ্ঞান দান করা সম্ভব হয়।
৮. শাস্ত্রীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির বিরোধী কোন পথ বা মত কোন গুরু গোঁসাই ব্যক্ত করতে পারবেন না।
৯. কৃচ্ছ্বতা সাধন বা অলৌকিক চমৎকারাদি দেখিয়ে কোন গুরু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবেন না। যদি এরূপ করেন তবে তিনি অবাঞ্ছিত বলে প্রমাণিত হবেন।
গুরুর-দ্বায়িত্ব প্রদানের নিয়মাবলী
(The providing rules of preceptor-responsibilities)
গুরুপদ (রূপ)বি গুরুবৃত্তি, গুুরুবৃত্তি করার দায়িত্ব, শিষ্যদের দীক্ষা ও ভেদ প্রদানের দায়িত্ব {বাং.গুরু+ বাং.পদ}
পদ (রূপ)বি চরণ, পা, পদচিহ্ন, পদাংক, পদক্ষেপ, পায়ের ছাপ, কবিতার পঙক্তি বা চরণ, বৈষ্ণব কবিদের রচিত কবিতা ও গান (পদাবলী), সম্মান, কাজের ভার, স্থান, বসতি (জনপদ), উপাধি, পদবি, অনুগ্রহ, আশ্রয় (পদে রাখা), বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যাদি (আল) অধিকার, আধিপত্য (ব্যা) বিভক্তিযুক্ত শব্দ, ক.বিশেষ্য খ.বিশেষণ গ.সর্বনাম ঘ.অব্যয় ও ঙ.ক্রিয়া- এই পাঁচ প্রকার শব্দ (আবি) বলাই, মদন, কামদেব, সুরেশ্বর (রূ) বিম্বল (দেত) বলাই।
গুরুপদ প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কোন শিষ্যের মধ্যে, গুরু হওয়ার যোগ্যতা বিকশিত হলে কেবল তাঁকেই গুরুপদ প্রদান করা যায়। সব শিষ্যকেই গুরুপদ দেওয়া যায় না। যে শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ঘারনিকশিক্ষা সমাপন করতে সক্ষম হয়েছে, সাথে সাথে ধীশক্তি, বিনয়, ভক্তি, প্রেম ও বিশ্বাসের পূর্ণতা অর্জন করেছে কেবল তাঁকেই গুরুপদ প্রদান করা যায়। আত্মতাত্ত্বিকদের বর্ণনা অনুসারে- গুরুপদ প্রদানের কয়েক প্রকার নিয়ম লক্ষ্য করা যায়। গুরুপদ প্রদানের কয়েকটি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো।
১. প্রথম নিয়ম (The first rule)
শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপণান্তে- ঘারনিকশিক্ষাও সমাপণ করবেন। অতঃপর স্ব-শুক্র নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করবেন। শুক্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়ার পর, সাঁই সাধন আরম্ভ করবেন। অতঃপর কামসাধন দ্বারা সাঁই আহরণ করে, তা গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব সাঁই নামক উক্ত মানবজল নিয়ে, আশ্রমে উপস্থিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করবেন। অতঃপর তিনি গুরুদেবের আমন্ত্রণ অনুযায়ী উক্ত মানবজল নিয়ে, গুরুদেবের আশ্রমে উপস্থিত হবেন। অন্তত তিন হতে চারবার এরূপ মানবজল আহরণের পর, উক্ত ব্যক্তি গুরুপদ গ্রহণের প্রার্থিও হতে পারবেন। নিজে প্রত্যক্ষভাবে সাঁই আহরণকারী, এরূপ মহান সাধক যদি গুরুপদ প্রার্থী হন।
তবে গুরুদেব একটি বিশেষ গোপন সভার আয়োজন করবেন। তিনি বিশেষ বিশেষ ও প্রবীণ প্রবীণ শিষ্যগণকে উক্ত গোপন সভায় উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ করবেন এবং গুরুপদ প্রার্থির জন্য- শ্বেতবর্ণের ধুতি, ওড়না, উষ্ণীষ ও কোপনি নির্মাণ করাবেন। অতঃপর বিশিষ্ট জনদের উপস্থিতিতে গুরুদেব কঠিনমানুষ হয়ে তরলমানুষ আখেটি করার দুঃসাধ্য সাধনটির আলোচনা করবেন। মানুষ সাধনবলে এ দুর্লভ সাধনটিও যে করতে পারেন তা তিনি সবিস্তারে আলোচনা করবেন। অতঃপর তিনি সর্ব সম্মুখে আহরণকৃত উক্ত সাঁই বা মানবজল বের করে সবাইকে দেখাবেন। সবাইকে বুঝিয়ে দিবেন যে ইনিই হলেন আমাদের পালনকর্তা, ইনিই হলেন আমাদের উপাস্য লালন, ইনিই হলেন মানবের প্রকৃত উপাস্য, এটিই হলো মানুষের দেহ হতে আহারিত তরলমানুষ। এনিই হলেন- সাধকের মনেরমানুষ প্রেমেরমানুষ অচিনমানুষ ও ভাবেরমানুষ। সাধনবলে আমাদের এ সাধক এ সাঁইয়ের সন্ধানলাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্য তিনি আজ হতে সাঁইজি।
গুরুদেব নিজ হাতে উক্ত মানবজল উপস্থিত সবাইকে অল্পঅল্প করে পান করাবেন। এ মানবজল পানই অনুষ্ঠানের প্রসাদরূপে গণ্য হবে। এ মানবজল ব্যতীত অদ্য সভায় আর কোন প্রসাদ প্রদান করা যাবে না। এটিই হলো সর্বোত্তম অনুষ্ঠান এবং এটিই হলো সর্বোত্তম প্রসাদ। স্বর্গীয় এ প্রসাদ পানের পর মর্ত্যীয় অন্য কোন প্রসাদের প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না। এ সময় উপস্থিত বিশিষ্ট শিষ্যগণ গুরুদেবকে ভক্তি প্রদান করবেন। অতঃপর সবাই একত্রে “আলেক সাঁই” বলে ধুপ ধুনাসহ জোকার দিতে দিতে- ধুতি, ওড়না, উষ্ণীষ ও কোপনি পাপনি পরিয়ে দিবেন। অতঃপর মানবজল আহরণকারী সাধক গুরুদেবকে, চতুর্ভক্তি প্রদান করার পর সর্বশেষে সাষ্টাঙ্গ ভক্তি প্রদান করবেন। গুরুদেব উপস্থিত সবাইকে নিয়ে সাঁইভক্তি (হাতের চিৎপার্শ্ব দ্বারা) প্রদান করবেন। এ ভক্তি দ্বারা প্রমাণ করা হয় যে আজ হতে গুরু ও শিষ্য কর্মগুণে একস্তর প্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ গুরু ও শিষ্য আজ হতে উভয়ই গুরু। এ বৈঠকেই গুরুদেব ঘোষণা করে দিবেন যে আজ হতে অমুক আমার প্রতিনিধি। আমার অবর্তমানে আপনারা তাঁকে গুরুরূপে মান্য করবেন। এখন হতে আপনারা তাঁর নিকট হতে শিষ্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন।
২. দ্বিতীয় নিয়ম (The second rule)
শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপণান্তে- ঘারনিকশিক্ষাও সমাপণ করবেন। অতঃপর স্ব-শুক্র নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করবেন। শুক্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়ার পর সাঁই সাধন আরম্ভ করবেন। অতঃপর কামসাধন দ্বারা সাঁই আহরণ করে তা গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব মানবজল নিয়ে আশ্রমে উপস্থিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করবেন। গুরুদেবের আমন্ত্রণ অনুযায়ী উক্ত মানবজল নিয়ে তিনি গুরুদেবের আশ্রমে উপস্থিত হবেন। যদি তিনি এরূপ সাধন করতে ব্যর্থ হন তবে তিনি কুম্ভক সাধনের মাধ্যমে কোপনি গ্রহণ বা গুরুপদ গ্রহণ করবেন।
চারজানু আসনে বসে প্রতিদিন কুম্ভক সাধন করবেন। অর্থাৎ নাসিকার বাইয়ে শ্বাসের বারো আঙ্গুলি গতি হ্রাস করতে আরম্ভ করবেন। সর্বশেষে শ্বাসের গতি নাসিকার ডগা পর্যন্ত এসে সীমাবদ্ধ হলে নাসিকায় হাত দিয়েও যখন তার শ্বাস প্রশ্বাসের গতি অনুভব করা যাবে না তখন তিনি গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। অতঃপর উক্ত অনুষ্ঠানে গুরুদেব তাঁকে প্রয়াত বলে ঘোষণা করবেন। উক্ত অনুষ্ঠানে গুরুদেব তাঁকে শববৎ স্নান করানো ও স্নান শেষে শববসন পরিধান করানোর আদেশ করবেন। অতঃপর শব স্নানাদি শেষে তাঁকে শববহন কাষ্ঠাসনে করে চারজনে কাঁধে নিয়ে চৌদ্দক্রোশ অর্থাৎ চৌদ্দধাপ গমন করবেন। অতঃপর কাঁধ হতে কাষ্ঠাসন নামিয়ে বিশ্রাম করবেন। এভাবে তিন বিশ্রাম পরে তাঁকে কাষ্ঠাসন হতে নামিয়ে শববসন মুক্ত করবেন। অতঃপর নতুন নির্মাণকৃত শ্বেতবর্ণের কাপড়ের পাপনি, ওড়না, কোপনি ও উষ্ণীষ পরিয়ে, ভক্তি ভজন সমাপন করবেন। অতঃপর সাতস্তর কাপড় দ্বারা চক্ষু বন্ধন করে চৌদ্দবাড়ি ভিক্ষা করে এনে, তা রান্না করে ভিক্ষান্ন প্রসাদ ভোজন করাবেন। লালন ঘরানার মনীষীগণের মতে- এ দিবস হতে কোপনি গ্রহণকারী আর সংসার জীবন যাপন করতে পারবেন না। এ জন্য তিনি প্রকৃত সাধুরূপে গণ্য হবেন। একই বৈঠকে গুরুদেব ঘোষণা করে দিবেন যে, আজ হতে অমুক আমার প্রতিনিধি। আমার অবর্তমানে আপনারা এঁকে গুরুরূপে মান্য করবেন। এখন হতে আপনারা তাঁর নিকট হতে শিষ্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন।
৩. তৃতীয় নিয়ম (The third rule)
প্রাতিষ্ঠানিক বা আশ্রমভিত্তিক কোন প্রকার জ্ঞানবিদ্যা অর্জন না করেও কেবল গুরু প্রদত্ত গোপন নামটি জপনা করতে করতে যদি হঠাৎ কোন শিষ্যের স্তনের মাংসপি-টি নড়াচড়া আরম্ভ করে, একে তারা হৃদোন্মোচন বলে থাকেন। অজ্ঞ সাধকরা হৃদোন্মোচন হওয়াকে গুরুপদ প্রাপ্তির উপযুক্ত হওয়া বলে মনে করেন। এ জন্য কোন শিষ্যের হৃদোন্মোচন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা তাকে গুরুপদ দান করেন। এ নিয়মটি একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ যে কোন লোক ইচ্ছা করলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই যার যার স্তনের মাংসপি-টি নাচাতে পারেন। এজন্য নামজপনা করার কোন প্রয়োজন হয় না। এ জন্য স্তনের মাংসপি-টি নাচানোকে গুরুপদের মত এরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তির মাপকাঠি নিরূপণ করা একেবারেই অযৌক্তিক। এ জন্য বলা যায় এ পদ্ধটি মনগড়া ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।
ওপরোক্ত দু’টি পদ্ধতি ভিন্ন গুরুপদ প্রদানের কোন নিয়ম পরাম্পরাবিদ্যায় নেই। তবে অজ্ঞ সাধকরা কেউ কেউ তৃতীয় নিয়মের দ্বারাও গুরুপদ প্রদাণ করে থাকেন। তৃতীয় নিয়মে গুরুপদ প্রদান করা আত্মদর্শনে গ্রহণযোগ্যতা নেই। এছাড়াও যারা পত্র দ্বারা মৌখিকভাবে বা আলাপীর মাধ্যমে গুরুপদ দান করে থাকেন সেগুলোকে ঘারনিক বিদ্যার গুরুপদ প্রদান বলা যায় না। সেগুলো একান্ত মনগড়া ও ঠুনকোভাবে নির্মিত পদ্ধতি। পত্র দ্বারা মৌখিকভাবে ও আলাপীর মাধ্যমে গুরুপদের মতো দুর্লভপদ প্রদান করা, বিশ্বের কোন আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানীই সমর্থন করেন না। এ জন্য এগুলোকে ঘারনিক পদ্ধতিও বলা যায় না। আর এভাবে গুরুপদ প্রাপ্তদেরকে গুরুদেব বলা যাবে না। বরং তাদের মূর্খ বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। কারণ গুরুপদ এতো সহজ নয় যে। মাত্র ২০০০/= টাকার বিনিময়ে, গুরুদেবের মেয়েকে বিবাহ করার বিনিময়ে বা গুরুদেবের সাথে দু বছর ভ্রমণ করে পাওয়া পদ কখনই গুরুপদ হতে পারে না। প্রকৃত আত্মতাত্ত্বিক মনীষীগণের মতে গুরুপদ ওপরোক্ত দু’টি বিধিমালার মাধ্যমে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রচলিত পির, ফকির, শায়িক্ব ও মাশায়িক্বরা পত্র দ্বারা, মৌখিকভাবে, আলাপীর মাধ্যমে কিম্বা যেন তেনভাবে গুরুপদ দিয়ে থাকেন। ঘারনিক গুরুপদ ও পির ফকিরের গুরুপদ প্রদান ও মান্যতার বিচারের দায়িত্ব সুবিজ্ঞ পাঠককুলের ওপর ছেড়ে দিলাম।
গুরু-গোঁসাইয়ের কার্যক্রম (The activities of Guru-Preceptor)
শিষ্যদের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার সময়, সব গুরু গোঁসাইদের নিচে বর্ণিত বিষয়াদি মেনে চলা একান্ত আবশ্যক। তা না হলে শিষ্যগণ পূর্ণজ্ঞানী হয়ে গড়ে উঠতে পারবেন না।
১. অপ্রচলিত ও বিদেশীশব্দাদির অর্থ বুঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা শিষ্যদের পক্ষে অসম্ভব। এ জন্য অপ্রলিত ও বিদেশী পরিভাষাদির আভিধানিক, পারিভাষিক ও ব্যবহারিক অর্থ শিষ্যদের অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
২. বাংলাশব্দাদি বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী, আরবিশব্দাদি আরবি নাহু ছরফ অুনুযায়ী এবং ইংরেজিশব্দাদি ইংরেজি গ্রামার অনুযায়ী অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
৩. গ্রন্থে উল্লিখিত শব্দের বিষয়ে ও সংখ্যার সূত্রাদি পৃথকপৃথকভাবে উদাহরণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৪. মূল গ্রন্থের কঠিন কঠিন বাক্যাদির জন্য, সহজসহজ বাক্য গঠন করে, বুঝিয়ে দিতে হবে।
৫. কোন বিষয়ের প্রকারাদি বুঝানোর সময়, তার সব প্রকার উল্লেখ করে, তার কারণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৬. একটি বিষয় বুঝানোর সময় যথা সম্ভব সর্ব মতবাদ ও সর্ব ঘরানার প্রাথমিক ধারণা অবশ্যই শিষ্যদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও ঘারনিক মতবাদের তুলনামূলক আলোচনা করতে হবে।
৭. রূপক সাহিত্য ও আত্মতত্ত্ব ভালোভাবে জানেন না, এরূপ কোন গুরু গোঁসাইয়ের কখনো শাস্ত্রীয় ও ঘারনিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া উচিৎ নয়।
৮. জন সাধারণের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান পরিধির সীমা বহির্ভূত, উচ্চস্তরের কোন বর্ণনা সাধারণ জনসভায় করা যাবে না। জনৈক মনীষী বলেছেন- “তোমরা লোকজনের জ্ঞানের পরিধি বুঝে কথা বলো, যেন তারা সহজে বুঝতে পারে।”
৯. গুরু গোঁসাইগণ তাদের বক্তৃতার দ্বারা কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ, দল, ঘরানা ও ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ করে, বিরোধিতা করতে পারবেন না। তবে বিশৃংখলার সম্মুখীন হতে হবে।
১০. বক্তৃতার সময় গুরু গোঁসাইগণের হাঁসিঠাট্টা করা উচিৎ নয়। কারণ তাতে শ্রতাদের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
১১. বক্তৃতার সময়ে গুরু গোঁসাইদের মনগড়া কথা বলা উচিৎ নয়। কারণ তাতে অনেক ভুল কথা ও ভুল সিদ্ধান্ত সৃষ্টি হতে পারে। প্রমাণহীন মনগড়া গল্পকাহিনী দ্বারা শ্রোতাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
১২. বক্তৃতার মধ্যে আসা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি, দুবার বা তিনবার পর্যন্ত পুনঃপুন বর্ণনা করে, শ্রোতাদের হৃদয়ঙ্গম করাতে প্রচেষ্টা করতে হবে।
গুরুপদ রহিত হওয়ার কারণাদি
(Reasons to repealed preceptor-responsibilities)
সাঁইসাধন ও কুম্ভসাধনে কৃতকার্য হওয়ার পরই কেবল গুরুপদ গ্রহণ করতে হয়। গুরুপদ গ্রহণ করে, যদি এ পদের মর্যাদা রক্ষা করা না হয়, তবে অবশ্যই গুরুপদ রহিত হয়ে যায়। উল্লেখ্য গুরুপদ ধ্বংসকারী উপসর্গ অনেক। তবে তার মধ্যে অর্থ ও নারী এ দু’টিই গুরুপদ ধ্বংসকারী প্রধান উপসর্গ। গুরুপদ রহিত হওয়ার কারণাদি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু শিষ্যদের সম্মুখে প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তবে অবশ্যই তার গুরুপদ রহিত হয়ে যায়।
২. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু কোন প্রকার অর্থ আত্মসাৎ করে এবং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয়ে প্রমাণিত হয়, তবে তার গুরুপদ রহিত হয়ে যাবে। এ অবস্থায় কোন শিষ্য এরূপ ব্যক্তিকে গুরু বলে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
৩. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু নারীঘটিত কোন প্রকার অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয়ে প্রমাণিত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় কোন শিষ্য এরূপ ব্যক্তিকে গুরুরূপে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
৪. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি চৌর্য দস্যুতা অপহরণ মিথ্যা ও যে কোন প্রকার হত্যা যজ্ঞের সাথে জড়িত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
৫. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি কোন প্রকার মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
৬. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোন প্রকার দণ্ডপ্রাপ্ত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন