‘গণবলন’
General Bolon/ ‘عامة بيالون’ (আম্মা বিয়ালুন)
*. কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
কাঁইয়ের ধ্বজা ধর
শ্বেতবসনের কোপনি পরে
মরার আগে মর।
মানব-করণী সেরেসুরে
মরার আগে যেজন মরে
যমে আর ছঁয় না তারে
মুক্তি পায় ভবের পর।
শোলা যেমন জলে ডুবে না
মরা তেমন আর মরে না
এসব কথা জানতে মনা
সাধকগুরুর চরণ ধর।
পেয়ে ধন হারাই যেজন
কেবল তার হয়রে মরণ
বিনয়ে কয় কাঁইজি বলন
পেয়েছে সে মরার বর।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, উপমহাদেশের আত্মদর্শনের প্রখ্যাত লেখক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এখানে কাঁইসাধন ও কাঁইদর্শন এবং কাঁই প্রেমের প্রতি গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন। কাঁইজি বলেছেন প্রয়াণের পর প্রত্যেক মানব শবকেই সাদাবসনে আবৃত করা হয়। শ্বেতবসনে আচ্ছাদিত প্রয়াণোত্তর সত্তা কোন প্রকার কর্মাকর্ম সম্পাদন করতে পারে না তদ্রূপ সবাই শ্বেত বসন পরিধান করো এবং অন্যায় ও অপকর্ম চিরতরে পরিহার করো। এটাই হবে সবার জন্য মরার আগে মরা। সবাই কেবল কাঁইপ্রেম এবং কাঁই স্মরণে হৃদয় উদ্ভাসিত করো। কাঁইয়ের অস্তিত্ব চিরসত্য এবং তিনি চিরস্বায়ম্ভুত। অতঃপর কাঁইজি বলেছেন চন্দ্রচেতনাকে অবদমন করে যারা অটলত্ব অর্জন করেছেন অপমৃত্যু তাদের স্পর্শও করতে পারে না। কেবল অটল সাধকরাই এ ধরাধামে মুক্তি পেয়ে থাকেন। অত্যন্ত চমৎকার একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা কাঁইজি বর্ণনা করেছেন যে, পাটকাঠি যেমন জলে ডুবে না তদ্রূপ অটলরাও কামের নিকট পরাজয় বরণ করেন না এবং বৈতরণীর জলে কখনই নিমজ্জিত হন না। এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ তত্ত্বের আলোচনা বা গভীর হতে গভীরতম আলোচনা কেবল পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ করেই সবার আহরণ করা উচিৎ। পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন শৈশব ও কৈশোরকাল অতিক্রমণ করে যৌবনে পদার্পণ করলে প্রত্যেক মানবসন্তান কাম, শুক্র, সুধা ও মধু এসব সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকে। যথাযথ জ্ঞানার্জন না করে যারা এসব সম্পদ অজ্ঞতা ও আলস্যের বশবর্তী হয়ে উড়িয়ে দেন বা হারিয়ে ফেলেন কেবল তারাই পুনঃপুন মরতে থাকবেন এবং পুনর্জন্মরূপ নাগরদোলায় ঘুরতে থাকবেন। যতদিন পর্যন্ত তারা একজন পাকা সাধক-গুরুর শরণাপন্ন না হবে ততদিন পর্যন্ত তাদের এরূপ দৈন্যদশা চলতেই থাকবে। তাই বুদ্ধিমান লোকের কাজ হচ্ছে যৌবনের প্রারম্ভেই একজন পাকা গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
কাঁই, কাঁইজি, কোপনি, ধন, ধ্বজা, বর, মরণ, মরা, মানব-করণী, মুক্তি, যম, শোলা। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions and Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. কাঁই কে? (Who is Lord?)/ ‘من هو الله؟’ (মান হুয়া আল্লাহ)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে কেবল জীবের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়। তবে মরমী ও আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা কাঁইকে সারাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তাও বলে থাকেন। তাদের মতে কাঁই প্রতিমাসে একবার স্বর্গধাম হতে মর্ত্যধামে অবতরণ করে থাকেন। এ সময়ই সাধকরা তাঁর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দর্শনলাভ করে কাঁইজি উপাধিলাভ করে থাকেন।
২. কাঁইয়ের ধ্বজা কী? (What is the Lord’s pennant?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
কাঁই সত্য, জগৎ সত্য, জন্ম সত্য ও প্রয়াণ সত্য। এ জন্য জগতে সত্যের প্রতিষ্ঠা করাই মানবের কাজ। এ জন্য সত্যের ঝাণ্ডাকে কাঁইয়ের ঝাণ্ডা বা কাঁইয়ে ধ্বজা বলা হয়। অর্থাৎ কাঁইয়ের ধ্বজা বলতে কেবল সত্যের ধ্বজা বুঝানো হয়েছে।
৩. কোপনি কী? (What is the Pallium?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
হাতের কনুইকে কোপনি বলা হয়। এ সূত্র ধরে কনুই পর্যন্ত প্রলম্বিত গাপনিকে কোপনি বলা হয়।
৪. মরার আগে মরা কী? (What is the Die before you die?)
‘ما هو الموت قبل أن يموت؟’, (মা হুয়া আলমাউতু ক্বাবলা আন্ তামুত?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখানে প্রথম মরা দ্বারা শুক্রপাত এবং দ্বিতীয় মরা দ্বারা দীক্ষাগ্রহণ বুঝানো হয়েছে। ফলে বাক্যটির মর্মার্থ হলো রমণদেশে গিয়ে শুক্রপাত করার পূর্বে দীক্ষাগ্রহণ করে শুক্র নিয়ন্ত্রণ কৌশল শিক্ষা করা। উল্লেখ্য রূপক সাহিত্যে প্রায় ১৮ প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। নিচে তা উল্লেখ করা হলো।
১. প্রয়াণ (দেহত্যাগ) (Death)
“মরলে পাব বেহেস্তখানা, তা শুনতে মন মানে না, বাক্বির লোভে নগদ পাওনা, কে ছাড়ে এ ভুবনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/৩)।
২. ঘুম (Sleep)
“শুয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মরে সারা (বলন)।”
৩. অজ্ঞতা (Ignorance)
“তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে, জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৬)।
৪. দীক্ষাগ্রহণ (Initiation)
১.“মরার আগে মরা।”
২.“মরার আগে মরতে পারে, বাঘ টাগে কী করতে পারে, সে মরা কী আবার মরে, মরলে সে অমর হয়” (পবিত্র লালন- ১১০/৩)।
৫. পাণিগ্রহণ (Marriage)
“গত এক ফাল্গুন মরেছে (বিবাহ করেছে) (বলন)।”
৬. অখণ্ডতা (Integrity)
“মরেছিল সাঁইজি লালন, পাইনে তাঁর পুনর্জনম, এমন মরা মরে কয়জন, স্বেচ্ছা ঝুলে ফাঁসিতে” (বলন তত্ত্বাবলী)।
৭. শুক্রধর (অটল) (Semen defender)
“মরতে পারলে ধরতে পারা যায়, মুখের কথা না” (পবিত্র লালন- ৩৯০/৩)।
৮. শুক্রপাত (Ejaculation)
“ভজো মানুষের চরণ দু’টি, নিত্যবস্তু হবে খাঁটি, মরলে হবে সব মাটি, ত্বরায় এভেদ লও জেনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/২)।
৯. সন্তান (Progeny)
“মরাকে আর মারবি কতো, বেন্ধে যমরশিতে, যমের কী আর সাধ্য আছে আবার তারে মারিতে (বলন তত্ত্বাবলী)।”
১০. সন্তানগ্রহণ (Taking offspring)
“এক জনমে কয়বার মরে, দেখে না গণনা করে (বলন)।”
১১. কবন্ধ (Comet)
“মরায় মরা গিলা (বলন)।”
১২. শিশ্ন (Penis)
“বাঁজানারীর ছেলে মরল, একি হলো দায়, মরা ছেলের কান্না দেখে, মোল্লাজি ডরায়” (পবিত্র লালন- ৬৮৪/১)।
১৩. বৈরাগ্য (Dispassion)
“মরার আগে কেউ স্বাধীন হয় না (বলন)।”
১৪. সংযম (Restraint)
“মরণের আগেতে মরা, আপন মন বলিদান করা, প্রাণ অপেক্ষা যে পিয়ারা, তারে কী বুঝায় শরায়” (পবিত্র লালন- ২৮৭/৩)।
১৫. মড়ক (Corpse)
“মরা ছাগল পথের পাশে পড়ে আছে (বলন)।”
১৬. পরিত্যক্ত (Rejected)
“তিনজন মরেছে বা (ঙঁঃ. আউট) হয়েছে (বলন)।”
১৭. শুকানো (Arid)
“মরা গাছ।”
১৮. বিপদগ্রস্থ (Imperil)
“মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।”
৫. মানব-করণী কী? (What is the man accomplishment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক ও বৃত্তিজাত কার্যাদিকেই মানব-করণী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র নিয়ন্ত্রণ, সাঁই-দর্শন ও কাঁই-দর্শনকেই মানব-করণী বলা হয়।
৬. যম কে? (Who is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মৃত্যুদানকারী প্রতীতিকে যম বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল চন্দ্রচেতনাকে যম বলা হয়। চন্দ্রচেতনা শুক্রপাতরূপ মৃত্যু সংঘটন করে বলেই তাঁকেই মৃত্যুদানকারী প্রতীতি বলা হয়।
৭. মানুষ মুক্তি পায় কিভাবে? (How to get released people?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আত্মতত্ত্ব দর্শন ভালোভাবে শিক্ষা করার পর মানুষ যখন মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করে তখন তার মুক্তি হয়। অর্থাৎ রূপক সাহিত্যে মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকেই মানুষের মুক্তিলাভ করা বলা হয়।
৮. সাধক-গুরু কে? (Who is the ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
নিজে প্রত্যক্ষভাবে ১.আউল ২.বাউল ৩.নাড়া ও ৪.সাঁইজি- এ চারটি সাধনস্তরের সাধনভজন যথাযথভাবে সমাপ্ত করে, যিনি গুরু পরম্পরা হতে গুরুপদলাভ করেন তাঁকেই সাধকগুরু বলা হয়। নাতিগুরু, পুতিগুরু ও গদিনশিন গুরু হতে এদের মর্যাদা হাজার স্তর ঊর্ধ্বে।
৯. সাধক-গুরুর চরণ ধরা কী?
(What is the Leg caught of ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে সাধক-গুরুর নিকট দীক্ষা নেওয়াকেই সাধক-গুরুর চরণ ধরা বলা হয়।
১০. ধন কাকে বলে? (What is called the Riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, অলংকার ও বিত্তবৈভব ইত্যাদিকে ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যৌবন, জ্ঞান, শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি ধন বলতে শুক্র ও সুধা উভয়কেই বুঝিয়েছেন।
১১. মরণ কাকে বলে? (What is called the dying?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মরণ বলতে সাধারণত প্রয়াণ বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে মরণ বলতে কেবল শুক্রপাত বুঝায়। উল্লেখ্য বিশ্বের সব রূপক সাহিত্যেই শুক্রপাতকে মরণ বলা হয়।
১২. মরার বর কী? (What is the boon to die?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখনি মরবে এরূপ বাণীকে মরার বর বলা হয় কিন্তু মরার বর বলতে এখানে অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে প্রতি জনমে জনমেই শুক্রপাত-রূপ মরার কথা বলা হয়েছে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম
General Bolon/ ‘عامة بيالون’ (আম্মা বিয়ালুন)
*. কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
কাঁইয়ের ধ্বজা ধর
শ্বেতবসনের কোপনি পরে
মরার আগে মর।
মানব-করণী সেরেসুরে
মরার আগে যেজন মরে
যমে আর ছঁয় না তারে
মুক্তি পায় ভবের পর।
শোলা যেমন জলে ডুবে না
মরা তেমন আর মরে না
এসব কথা জানতে মনা
সাধকগুরুর চরণ ধর।
পেয়ে ধন হারাই যেজন
কেবল তার হয়রে মরণ
বিনয়ে কয় কাঁইজি বলন
পেয়েছে সে মরার বর।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, উপমহাদেশের আত্মদর্শনের প্রখ্যাত লেখক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এখানে কাঁইসাধন ও কাঁইদর্শন এবং কাঁই প্রেমের প্রতি গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন। কাঁইজি বলেছেন প্রয়াণের পর প্রত্যেক মানব শবকেই সাদাবসনে আবৃত করা হয়। শ্বেতবসনে আচ্ছাদিত প্রয়াণোত্তর সত্তা কোন প্রকার কর্মাকর্ম সম্পাদন করতে পারে না তদ্রূপ সবাই শ্বেত বসন পরিধান করো এবং অন্যায় ও অপকর্ম চিরতরে পরিহার করো। এটাই হবে সবার জন্য মরার আগে মরা। সবাই কেবল কাঁইপ্রেম এবং কাঁই স্মরণে হৃদয় উদ্ভাসিত করো। কাঁইয়ের অস্তিত্ব চিরসত্য এবং তিনি চিরস্বায়ম্ভুত। অতঃপর কাঁইজি বলেছেন চন্দ্রচেতনাকে অবদমন করে যারা অটলত্ব অর্জন করেছেন অপমৃত্যু তাদের স্পর্শও করতে পারে না। কেবল অটল সাধকরাই এ ধরাধামে মুক্তি পেয়ে থাকেন। অত্যন্ত চমৎকার একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা কাঁইজি বর্ণনা করেছেন যে, পাটকাঠি যেমন জলে ডুবে না তদ্রূপ অটলরাও কামের নিকট পরাজয় বরণ করেন না এবং বৈতরণীর জলে কখনই নিমজ্জিত হন না। এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ তত্ত্বের আলোচনা বা গভীর হতে গভীরতম আলোচনা কেবল পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ করেই সবার আহরণ করা উচিৎ। পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন শৈশব ও কৈশোরকাল অতিক্রমণ করে যৌবনে পদার্পণ করলে প্রত্যেক মানবসন্তান কাম, শুক্র, সুধা ও মধু এসব সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকে। যথাযথ জ্ঞানার্জন না করে যারা এসব সম্পদ অজ্ঞতা ও আলস্যের বশবর্তী হয়ে উড়িয়ে দেন বা হারিয়ে ফেলেন কেবল তারাই পুনঃপুন মরতে থাকবেন এবং পুনর্জন্মরূপ নাগরদোলায় ঘুরতে থাকবেন। যতদিন পর্যন্ত তারা একজন পাকা সাধক-গুরুর শরণাপন্ন না হবে ততদিন পর্যন্ত তাদের এরূপ দৈন্যদশা চলতেই থাকবে। তাই বুদ্ধিমান লোকের কাজ হচ্ছে যৌবনের প্রারম্ভেই একজন পাকা গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
কাঁই, কাঁইজি, কোপনি, ধন, ধ্বজা, বর, মরণ, মরা, মানব-করণী, মুক্তি, যম, শোলা। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions and Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. কাঁই কে? (Who is Lord?)/ ‘من هو الله؟’ (মান হুয়া আল্লাহ)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে কেবল জীবের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়। তবে মরমী ও আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা কাঁইকে সারাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তাও বলে থাকেন। তাদের মতে কাঁই প্রতিমাসে একবার স্বর্গধাম হতে মর্ত্যধামে অবতরণ করে থাকেন। এ সময়ই সাধকরা তাঁর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দর্শনলাভ করে কাঁইজি উপাধিলাভ করে থাকেন।
২. কাঁইয়ের ধ্বজা কী? (What is the Lord’s pennant?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
কাঁই সত্য, জগৎ সত্য, জন্ম সত্য ও প্রয়াণ সত্য। এ জন্য জগতে সত্যের প্রতিষ্ঠা করাই মানবের কাজ। এ জন্য সত্যের ঝাণ্ডাকে কাঁইয়ের ঝাণ্ডা বা কাঁইয়ে ধ্বজা বলা হয়। অর্থাৎ কাঁইয়ের ধ্বজা বলতে কেবল সত্যের ধ্বজা বুঝানো হয়েছে।
৩. কোপনি কী? (What is the Pallium?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
হাতের কনুইকে কোপনি বলা হয়। এ সূত্র ধরে কনুই পর্যন্ত প্রলম্বিত গাপনিকে কোপনি বলা হয়।
৪. মরার আগে মরা কী? (What is the Die before you die?)
‘ما هو الموت قبل أن يموت؟’, (মা হুয়া আলমাউতু ক্বাবলা আন্ তামুত?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখানে প্রথম মরা দ্বারা শুক্রপাত এবং দ্বিতীয় মরা দ্বারা দীক্ষাগ্রহণ বুঝানো হয়েছে। ফলে বাক্যটির মর্মার্থ হলো রমণদেশে গিয়ে শুক্রপাত করার পূর্বে দীক্ষাগ্রহণ করে শুক্র নিয়ন্ত্রণ কৌশল শিক্ষা করা। উল্লেখ্য রূপক সাহিত্যে প্রায় ১৮ প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। নিচে তা উল্লেখ করা হলো।
১. প্রয়াণ (দেহত্যাগ) (Death)
“মরলে পাব বেহেস্তখানা, তা শুনতে মন মানে না, বাক্বির লোভে নগদ পাওনা, কে ছাড়ে এ ভুবনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/৩)।
২. ঘুম (Sleep)
“শুয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মরে সারা (বলন)।”
৩. অজ্ঞতা (Ignorance)
“তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে, জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৬)।
৪. দীক্ষাগ্রহণ (Initiation)
১.“মরার আগে মরা।”
২.“মরার আগে মরতে পারে, বাঘ টাগে কী করতে পারে, সে মরা কী আবার মরে, মরলে সে অমর হয়” (পবিত্র লালন- ১১০/৩)।
৫. পাণিগ্রহণ (Marriage)
“গত এক ফাল্গুন মরেছে (বিবাহ করেছে) (বলন)।”
৬. অখণ্ডতা (Integrity)
“মরেছিল সাঁইজি লালন, পাইনে তাঁর পুনর্জনম, এমন মরা মরে কয়জন, স্বেচ্ছা ঝুলে ফাঁসিতে” (বলন তত্ত্বাবলী)।
৭. শুক্রধর (অটল) (Semen defender)
“মরতে পারলে ধরতে পারা যায়, মুখের কথা না” (পবিত্র লালন- ৩৯০/৩)।
৮. শুক্রপাত (Ejaculation)
“ভজো মানুষের চরণ দু’টি, নিত্যবস্তু হবে খাঁটি, মরলে হবে সব মাটি, ত্বরায় এভেদ লও জেনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/২)।
৯. সন্তান (Progeny)
“মরাকে আর মারবি কতো, বেন্ধে যমরশিতে, যমের কী আর সাধ্য আছে আবার তারে মারিতে (বলন তত্ত্বাবলী)।”
১০. সন্তানগ্রহণ (Taking offspring)
“এক জনমে কয়বার মরে, দেখে না গণনা করে (বলন)।”
১১. কবন্ধ (Comet)
“মরায় মরা গিলা (বলন)।”
১২. শিশ্ন (Penis)
“বাঁজানারীর ছেলে মরল, একি হলো দায়, মরা ছেলের কান্না দেখে, মোল্লাজি ডরায়” (পবিত্র লালন- ৬৮৪/১)।
১৩. বৈরাগ্য (Dispassion)
“মরার আগে কেউ স্বাধীন হয় না (বলন)।”
১৪. সংযম (Restraint)
“মরণের আগেতে মরা, আপন মন বলিদান করা, প্রাণ অপেক্ষা যে পিয়ারা, তারে কী বুঝায় শরায়” (পবিত্র লালন- ২৮৭/৩)।
১৫. মড়ক (Corpse)
“মরা ছাগল পথের পাশে পড়ে আছে (বলন)।”
১৬. পরিত্যক্ত (Rejected)
“তিনজন মরেছে বা (ঙঁঃ. আউট) হয়েছে (বলন)।”
১৭. শুকানো (Arid)
“মরা গাছ।”
১৮. বিপদগ্রস্থ (Imperil)
“মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।”
৫. মানব-করণী কী? (What is the man accomplishment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক ও বৃত্তিজাত কার্যাদিকেই মানব-করণী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র নিয়ন্ত্রণ, সাঁই-দর্শন ও কাঁই-দর্শনকেই মানব-করণী বলা হয়।
৬. যম কে? (Who is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মৃত্যুদানকারী প্রতীতিকে যম বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল চন্দ্রচেতনাকে যম বলা হয়। চন্দ্রচেতনা শুক্রপাতরূপ মৃত্যু সংঘটন করে বলেই তাঁকেই মৃত্যুদানকারী প্রতীতি বলা হয়।
৭. মানুষ মুক্তি পায় কিভাবে? (How to get released people?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আত্মতত্ত্ব দর্শন ভালোভাবে শিক্ষা করার পর মানুষ যখন মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করে তখন তার মুক্তি হয়। অর্থাৎ রূপক সাহিত্যে মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকেই মানুষের মুক্তিলাভ করা বলা হয়।
৮. সাধক-গুরু কে? (Who is the ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
নিজে প্রত্যক্ষভাবে ১.আউল ২.বাউল ৩.নাড়া ও ৪.সাঁইজি- এ চারটি সাধনস্তরের সাধনভজন যথাযথভাবে সমাপ্ত করে, যিনি গুরু পরম্পরা হতে গুরুপদলাভ করেন তাঁকেই সাধকগুরু বলা হয়। নাতিগুরু, পুতিগুরু ও গদিনশিন গুরু হতে এদের মর্যাদা হাজার স্তর ঊর্ধ্বে।
৯. সাধক-গুরুর চরণ ধরা কী?
(What is the Leg caught of ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে সাধক-গুরুর নিকট দীক্ষা নেওয়াকেই সাধক-গুরুর চরণ ধরা বলা হয়।
১০. ধন কাকে বলে? (What is called the Riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, অলংকার ও বিত্তবৈভব ইত্যাদিকে ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যৌবন, জ্ঞান, শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি ধন বলতে শুক্র ও সুধা উভয়কেই বুঝিয়েছেন।
১১. মরণ কাকে বলে? (What is called the dying?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মরণ বলতে সাধারণত প্রয়াণ বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে মরণ বলতে কেবল শুক্রপাত বুঝায়। উল্লেখ্য বিশ্বের সব রূপক সাহিত্যেই শুক্রপাতকে মরণ বলা হয়।
১২. মরার বর কী? (What is the boon to die?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখনি মরবে এরূপ বাণীকে মরার বর বলা হয় কিন্তু মরার বর বলতে এখানে অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে প্রতি জনমে জনমেই শুক্রপাত-রূপ মরার কথা বলা হয়েছে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন