বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

বন্দনা বলন’ (দ্বিতীয় পর্ব)

‘বন্দনা বলন’ (Anthem. এ্যান্থিম)
Hymn Bolon (হেম বলন)/ ‘ترنيمة بيالون’ (তারনিমা বিয়ালুন)
*. দয়ালের বন্দনা, আমার গুরুর বন্দনা
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“দয়ালের বন্দনা
আমার গুরুর বন্দনা
ত্রিধারা নিদানে অধম
পাই যেন চরণখানা।
বন্দি যত জ্ঞানীর চরণ
যত আছেন সাধু মহাজন (গো)
দূরে কাছের ভাই বন্ধুগণ
বন্দিলাম সবজনা।
বন্দিলাম জনক জননী
বন্দিলাম গুরু গুণী (গো)
বন্দি সকল সহকর্মী
সহযোগী সবজনা।
বলন কাঁইজির দেহ বন্দি
অদ্য গীতির আসর বন্দি (গো)
সহযোগির চরণ বন্দি
বন্দিলাম যন্ত্রখানা।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের জগদ্বিখ্যাত সংস্কারক, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও প্রখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি বলন আধ্যাত্মিক পরিবারের সর্ব প্রকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সর্ব প্রকার সঙ্গীতানুষ্ঠানের কেবল বন্দনাবাণী রূপেই এ বলনটি নির্মাণ করেছেন। এ বন্দনাটি পরিবেশনে একদিকে যেমন সময়ও সাশ্রয় হয় অপরদিকে অনুষ্ঠানের গাম্ভির্যতাও রক্ষা হয়। প্রায় যত্রতত্রই লক্ষ্য করা যায় বাংভারতের বাউলরা কোন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশনের পূর্বে এমন লম্বা বন্দনা করেন যে, কোন কোন বন্দনা আধা ঘন্টাও ছাড়িয়ে যায়। দর্শক বা শ্রোতাগণ যে বিরক্ত হয়ে যান সে ব্যাপারটি তাদের কোন স্মরণেই থাকে না। বিষয়টি বিবেচনা করেই কাঁইজি নাতিদীর্ঘ এ বন্দনাবাণীটি নির্মাণ করেছেন। অতি অল্প কথায় বন্দনারূপ এ অমীয়বাণীটির মধ্যে কাঁইজি প্রায় সব বিষয়ই সন্নিবেশিত করেছেন অত্যন্ত চমৎকারভাবে। এ বাণীটির দ্বারা মাত্র চার মিনিটের মধ্যেই সার্থকভাবেই বন্দনা করা সম্ভব। এখন হতে এ বলনটি বলন ঘরানার উদ্বোধনিবাণী বা বন্দনাবাণী রূপেই বিবেচিত হবে।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
চরণ, ত্রিধারা, দয়াল, নিদান, বন্দনা, যন্ত্র। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)/ ‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. গুরু কাকে বলে? (What is called the Preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
২. গুরু কত প্রকার ও কী কী? (What kinds of Preceptor and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
গুরু চার প্রকার- ১.মানুষগুরু (জ্ঞান) ২.জগৎগুরু (শ্বাস) ৩.কামগুরু (বিম্বল) এবং ৪.পরমগুরু (সাঁই)। নিচে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
১. মানুষগুরু (জ্ঞান)
Man preceptor (ম্যান প্রিসিপ্টর)/ ‘بشر معلم’ (বাশারা মুয়াল্লিম)
মানুসগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী মানুষকে শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে।
মানুষগুরুর শুধু আকার ও আকৃতিকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত। কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের জ্ঞান। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির পাঠশালার শিক্ষক-শিক্ষিকাগণসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন সম্প্রদায় নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন- সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে, মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। (“গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
২. জগৎগুরু (শ্বাস)
Supreme preceptor (সুপ্রিম প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم العليا’ (মুয়াল্লিমাল আলিয়া)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Supreme preceptor)
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে বাতাস বলতে বায়ুমণ্ডলে চলমান বাতাস না বুঝিয়ে বরং নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বুঝানো হয়। নাসিকার শ্বাসরূপ জগৎগুরু ডান ও বাম গতি ধারণ করে সর্বসময় শিষ্য বা ভক্তকুলের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিষ্যগণকে জীবনের প্রতিটি কাজের শুভাশুভ সংবাদাদি প্রদান করে থাকেন। শ্বাসরূপ বাতাস বিশ্বব্যাপী বিরাজমান বলে রূপক সাহিত্যে তাকে জগৎগুরু বলা হয়। মানুষগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে না কিন্তু জগৎগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারেন। এ গুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং সারা চরাচর, গুরু তুমি পতিতপাবন পরমও ঈশ্বর” (পবিত্র লালন- ৪২/১)। আবার লোকনাথ ব্র‏হ্মচারী লিখেছেন- “রণে, বনে, পাহাড়ে ও জঙ্গলে যেখানে আমাকে স্মরণ করবে সেখানেই আমাকে পাবে।”
৩. কামগুরু (বিম্বল)
Cupid (কিউপিড)/ ‘صولجان’ (সাওলাজান)/ ‘كيوبيد’ (কিউবিদ)
কামগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Cupid)
রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে কামগগুরু বলে।
কামগুরুর কোন ভজন নেই। এ গুরুকে শাসন করাই ভক্তের কাজ। চারপ্রকার গুরুর মধ্যে কেবল কামগুরুকে শাসন করতে হয়। এ গুরু অটল না হওয়া পর্যন্ত একে ক্রমে ক্রমে শাসন করতেই হবে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪) ২.“প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২) ৩.“প্রেম-বাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১) ৪.“প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)
৪. পরমগুরু (সাঁই)
Prime preceptor (প্রাইম প্রিসিপ্টর)/
‘مؤدب المطلق’ (মুয়াদ্দিব আলমুত্বাল্লাক্ব)
পরমগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Prime preceptor)
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
রূপক সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। সাঁই হলেন তরলমানুষ- যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে পরমগুরু বলা হয়। এ পরমগুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“ত্রিবেণীর ত্রিধারে, মীনরূপে গুরু বিরাজ করে, কেমন করে ধরবি তারে, বলরে অবুঝ মন” (পবিত্র লালন- ১৫৩/৩) ২.“হলে অমাবতীর বার, মাটি রসে হয় সরোবর, সাধু গুরু বৈষ্টম তিনে, উদয় হয় সে যোগের দিনে” (পবিত্র লালন- ১৬২/২)।”
৩. বন্দনা কী? (What is hymn?)
উত্তর (Answers)/ / ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কোন কিছুর স্তুতি বা স্তব করাকে বন্দনা বলা হয় কিন্তু পারিভাষিকভাবে সব আসরে গাওয়া প্রথম গীতিটিকে বন্দনা বলা হয়।
৪. ত্রিধারা কী? (What is tri-stream?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যে কোন তিনটির মিলনকে ত্রিধারা বলা হয় কিন্তু রূপকসহিত্যে বৈকুণ্ঠ ও নাসিকাকে ত্রিধারা বলা হয়। বৈকুণ্ঠ হতে ১.লাল, ২.সাদা ও ৩.কালো এ তিনটি ধারা এবং নাসিকা হতে ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষূম্না এ তিনটি স্নায়ু প্রবাহিত বলেই এদেরকে ত্রিধারা বলা হয়।
৫. চরণ কত প্রকার ও কী কী? (What kind of leg and what?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসহিত্যে চরণ চার প্রকার। ১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
অভয়চরণ (Fearless Leg)/ ‘قدم بلا خوف’ (ক্বাদিমা বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ (Pairs Leg)/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ (Flushed Leg)/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজনের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ (Excellent Leg)/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে।
২. রূপক সাহিত্যে বলাইকে শ্রীচরণ বলে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

‘গণবলন’

‘গণবলন’
General Bolon/ ‘عامة بيالون’ (আম্মা বিয়ালুন)
*. কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কাঁইয়ের ধ্বজা ধররে সবাই
কাঁইয়ের ধ্বজা ধর
শ্বেতবসনের কোপনি পরে
মরার আগে মর।
মানব-করণী সেরেসুরে
মরার আগে যেজন মরে
যমে আর ছঁয় না তারে
মুক্তি পায় ভবের পর।
শোলা যেমন জলে ডুবে না
মরা তেমন আর মরে না
এসব কথা জানতে মনা
সাধকগুরুর চরণ ধর।
পেয়ে ধন হারাই যেজন
কেবল তার হয়রে মরণ
বিনয়ে কয় কাঁইজি বলন
পেয়েছে সে মরার বর।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, উপমহাদেশের আত্মদর্শনের প্রখ্যাত লেখক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এখানে কাঁইসাধন ও কাঁইদর্শন এবং কাঁই প্রেমের প্রতি গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন। কাঁইজি বলেছেন প্রয়াণের পর প্রত্যেক মানব শবকেই সাদাবসনে আবৃত করা হয়। শ্বেতবসনে আচ্ছাদিত প্রয়াণোত্তর সত্তা কোন প্রকার কর্মাকর্ম সম্পাদন করতে পারে না তদ্রূপ সবাই শ্বেত বসন পরিধান করো এবং অন্যায় ও অপকর্ম চিরতরে পরিহার করো। এটাই হবে সবার জন্য মরার আগে মরা। সবাই কেবল কাঁইপ্রেম এবং কাঁই স্মরণে হৃদয় উদ্ভাসিত করো। কাঁইয়ের অস্তিত্ব চিরসত্য এবং তিনি চিরস্বায়ম্ভুত। অতঃপর কাঁইজি বলেছেন চন্দ্রচেতনাকে অবদমন করে যারা অটলত্ব অর্জন করেছেন অপমৃত্যু তাদের স্পর্শও করতে পারে না। কেবল অটল সাধকরাই এ ধরাধামে মুক্তি পেয়ে থাকেন। অত্যন্ত চমৎকার একটি দৃষ্টান্তের দ্বারা কাঁইজি বর্ণনা করেছেন যে, পাটকাঠি যেমন জলে ডুবে না তদ্রূপ অটলরাও কামের নিকট পরাজয় বরণ করেন না এবং বৈতরণীর জলে কখনই নিমজ্জিত হন না। এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ তত্ত্বের আলোচনা বা গভীর হতে গভীরতম আলোচনা কেবল পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ করেই সবার আহরণ করা উচিৎ। পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন শৈশব ও কৈশোরকাল অতিক্রমণ করে যৌবনে পদার্পণ করলে প্রত্যেক মানবসন্তান কাম, শুক্র, সুধা ও মধু এসব সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকে। যথাযথ জ্ঞানার্জন না করে যারা এসব সম্পদ অজ্ঞতা ও আলস্যের বশবর্তী হয়ে উড়িয়ে দেন বা হারিয়ে ফেলেন কেবল তারাই পুনঃপুন মরতে থাকবেন এবং পুনর্জন্মরূপ নাগরদোলায় ঘুরতে থাকবেন। যতদিন পর্যন্ত তারা একজন পাকা সাধক-গুরুর শরণাপন্ন না হবে ততদিন পর্যন্ত তাদের এরূপ দৈন্যদশা চলতেই থাকবে। তাই বুদ্ধিমান লোকের কাজ হচ্ছে যৌবনের প্রারম্ভেই একজন পাকা গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
কাঁই, কাঁইজি, কোপনি, ধন, ধ্বজা, বর, মরণ, মরা, মানব-করণী, মুক্তি, যম, শোলা। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions and Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. কাঁই কে? (Who is Lord?)/ ‘من هو الله؟’ (মান হুয়া আল্লাহ)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে কেবল জীবের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়। তবে মরমী ও আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা কাঁইকে সারাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তাও বলে থাকেন। তাদের মতে কাঁই প্রতিমাসে একবার স্বর্গধাম হতে মর্ত্যধামে অবতরণ করে থাকেন। এ সময়ই সাধকরা তাঁর সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দর্শনলাভ করে কাঁইজি উপাধিলাভ করে থাকেন।
২. কাঁইয়ের ধ্বজা কী? (What is the Lord’s pennant?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
কাঁই সত্য, জগৎ সত্য, জন্ম সত্য ও প্রয়াণ সত্য। এ জন্য জগতে সত্যের প্রতিষ্ঠা করাই মানবের কাজ। এ জন্য সত্যের ঝাণ্ডাকে কাঁইয়ের ঝাণ্ডা বা কাঁইয়ে ধ্বজা বলা হয়। অর্থাৎ কাঁইয়ের ধ্বজা বলতে কেবল সত্যের ধ্বজা বুঝানো হয়েছে।
৩. কোপনি কী? (What is the Pallium?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
হাতের কনুইকে কোপনি বলা হয়। এ সূত্র ধরে কনুই পর্যন্ত প্রলম্বিত গাপনিকে কোপনি বলা হয়।
৪. মরার আগে মরা কী? (What is the Die before you die?)
‘ما هو الموت قبل أن يموت؟’, (মা হুয়া আলমাউতু ক্বাবলা আন্ তামুত?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখানে প্রথম মরা দ্বারা শুক্রপাত এবং দ্বিতীয় মরা দ্বারা দীক্ষাগ্রহণ বুঝানো হয়েছে। ফলে বাক্যটির মর্মার্থ হলো রমণদেশে গিয়ে শুক্রপাত করার পূর্বে দীক্ষাগ্রহণ করে শুক্র নিয়ন্ত্রণ কৌশল শিক্ষা করা। উল্লেখ্য রূপক সাহিত্যে প্রায় ১৮ প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। নিচে তা উল্লেখ করা হলো।
১. প্রয়াণ (দেহত্যাগ) (Death)
“মরলে পাব বেহেস্তখানা, তা শুনতে মন মানে না, বাক্বির লোভে নগদ পাওনা, কে ছাড়ে এ ভুবনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/৩)
২. ঘুম (Sleep)
“শুয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মরে সারা (বলন)।”
৩. অজ্ঞতা (Ignorance)
“তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে, জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৬)
৪. দীক্ষাগ্রহণ (Initiation)
১.“মরার আগে মরা।”
২.“মরার আগে মরতে পারে, বাঘ টাগে কী করতে পারে, সে মরা কী আবার মরে, মরলে সে অমর হয়” (পবিত্র লালন- ১১০/৩)
৫. পাণিগ্রহণ (Marriage)
“গত এক ফাল্গুন মরেছে (বিবাহ করেছে) (বলন)।”
৬. অখণ্ডতা (Integrity)
“মরেছিল সাঁইজি লালন, পাইনে তাঁর পুনর্জনম, এমন মরা মরে কয়জন, স্বেচ্ছা ঝুলে ফাঁসিতে” (বলন তত্ত্বাবলী)
৭. শুক্রধর (অটল) (Semen defender)
“মরতে পারলে ধরতে পারা যায়, মুখের কথা না” (পবিত্র লালন- ৩৯০/৩)
৮. শুক্রপাত (Ejaculation)
“ভজো মানুষের চরণ দু’টি, নিত্যবস্তু হবে খাঁটি, মরলে হবে সব মাটি, ত্বরায় এভেদ লও জেনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮/২)
৯. সন্তান (Progeny)
“মরাকে আর মারবি কতো, বেন্ধে যমরশিতে, যমের কী আর সাধ্য আছে আবার তারে মারিতে (বলন তত্ত্বাবলী)।”
১০. সন্তানগ্রহণ (Taking offspring)
“এক জনমে কয়বার মরে, দেখে না গণনা করে (বলন)।”
১১. কবন্ধ (Comet)
“মরায় মরা গিলা (বলন)।”
১২. শিশ্ন (Penis)
“বাঁজানারীর ছেলে মরল, একি হলো দায়, মরা ছেলের কান্না দেখে, মোল্লাজি ডরায়” (পবিত্র লালন- ৬৮৪/১)
১৩. বৈরাগ্য (Dispassion)
“মরার আগে কেউ স্বাধীন হয় না (বলন)।”
১৪. সংযম (Restraint)
“মরণের আগেতে মরা, আপন মন বলিদান করা, প্রাণ অপেক্ষা যে পিয়ারা, তারে কী বুঝায় শরায়” (পবিত্র লালন- ২৮৭/৩)
১৫. মড়ক (Corpse)
“মরা ছাগল পথের পাশে পড়ে আছে (বলন)।”
১৬. পরিত্যক্ত (Rejected)
“তিনজন মরেছে বা (ঙঁঃ. আউট) হয়েছে (বলন)।”
১৭. শুকানো (Arid)
“মরা গাছ।”
১৮. বিপদগ্রস্থ (Imperil)
“মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।”
৫. মানব-করণী কী? (What is the man accomplishment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণভাবে রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক, সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক, ব্যবসায়িক ও বৃত্তিজাত কার্যাদিকেই মানব-করণী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র নিয়ন্ত্রণ, সাঁই-দর্শন ও কাঁই-দর্শনকেই মানব-করণী বলা হয়।
৬. যম কে? (Who is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মৃত্যুদানকারী প্রতীতিকে যম বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল চন্দ্রচেতনাকে যম বলা হয়। চন্দ্রচেতনা শুক্রপাতরূপ মৃত্যু সংঘটন করে বলেই তাঁকেই মৃত্যুদানকারী প্রতীতি বলা হয়।
৭. মানুষ মুক্তি পায় কিভাবে? (How to get released people?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আত্মতত্ত্ব দর্শন ভালোভাবে শিক্ষা করার পর মানুষ যখন মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করে তখন তার মুক্তি হয়। অর্থাৎ রূপক সাহিত্যে মরণ ও জন্মনিয়ন্ত্রণ করাকেই মানুষের মুক্তিলাভ করা বলা হয়।
৮. সাধক-গুরু কে? (Who is the ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
নিজে প্রত্যক্ষভাবে ১.আউল ২.বাউল ৩.নাড়া ও ৪.সাঁইজি- এ চারটি সাধনস্তরের সাধনভজন যথাযথভাবে সমাপ্ত করে, যিনি গুরু পরম্পরা হতে গুরুপদলাভ করেন তাঁকেই সাধকগুরু বলা হয়। নাতিগুরু, পুতিগুরু ও গদিনশিন গুরু হতে এদের মর্যাদা হাজার স্তর ঊর্ধ্বে।
৯. সাধক-গুরুর চরণ ধরা কী?
(What is the Leg caught of ascetic preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে সাধক-গুরুর নিকট দীক্ষা নেওয়াকেই সাধক-গুরুর চরণ ধরা বলা হয়।
১০. ধন কাকে বলে? (What is called the Riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, অলংকার ও বিত্তবৈভব ইত্যাদিকে ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যৌবন, জ্ঞান, শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি ধন বলতে শুক্র ও সুধা উভয়কেই বুঝিয়েছেন।
১১. মরণ কাকে বলে? (What is called the dying?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মরণ বলতে সাধারণত প্রয়াণ বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে মরণ বলতে কেবল শুক্রপাত বুঝায়। উল্লেখ্য বিশ্বের সব রূপক সাহিত্যেই শুক্রপাতকে মরণ বলা হয়।
১২. মরার বর কী? (What is the boon to die?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
এখনি মরবে এরূপ বাণীকে মরার বর বলা হয় কিন্তু মরার বর বলতে এখানে অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও কুশিক্ষার কারণে প্রতি জনমে জনমেই শুক্রপাত-রূপ মরার কথা বলা হয়েছে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

সোমবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৪

মানুষগুরু (জ্ঞান- ৬ষ্ঠ পর্ব)

৩০/৪. মানুষগুরু
Man preceptor/ ‘معلم البشر’ (মুয়াল্লিম আলবাশার)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘জ্ঞান’, রূপক পরিভাষা ‘গুরু’ উপমান পরিভাষা ‘আলো’ এবং চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’
মানুষ (রূপ)বি মানব, মানুষ্য, মনু, লোক, জন, নৃ, নর, ব্যক্তি, man, person, microcosm, prick, mankind, mortality, humankind, ‘بشر’ (বাশারা), ‘رجل’ (রাজুলা), ‘إنسان’ (ইন্সান), ‘شخص’ (শাখসা), ‘المرء’ (আলমারউ) বিণ মানবীয়, বয়ঃপ্রাপ্ত, মানুষ্য সম্পর্কীয়, মানবীয় গুণসম্পন্ন (আবি) ঈশ্বর, গুরু, গোঁসাই, স্বামী, নারায়ণ, নিরঞ্জন, বিষ্ণু, মৎস্য, রাম, সাঁই, স্বরূপ, হরি (উপ) চাঁদ (রূ) সাঁই (দেত) পালনকর্তা স্ত্রী মানুষী।
মানুষগুরু (রূপ)বি মানুষরূপী গুরু, মানুষরূপী গোঁসাই, Man preceptor, ‘بشر معلم’ (বাশারা মুয়াল্লিম) (প্র) রূপক সাহিত্যে বর্ণিত ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু- এ চার প্রকার গুরুর অন্যতম (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (.ﻋﻘﻝ), ইলিম (.ﻋﻟﻢ) (আভা) বিচারক, উপদেষ্টা, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয় ২.চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা রূপকার্থে মানুষগুরু বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান {বাং.মানুষ+ বাং.গুরু}
মানুষগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Man preceptor)
১. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
২. “গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
৩. “হক্বের ওপর থাকবে যখন, লাহুত মুক্বাম চিনবে তখন, এ সত্য জেনে ও মন, মানুষগুরু ধরলে না” (পবিত্র লালন- ৭৪২/৩)
মানুষগুরুর ওপর একটি পূর্ণ বলন
(A full Bolon on the Man preceptor)
“গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়
জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়।
মানুষগুরুর প্রেমপণ্যারে- জগৎগুরু চলে ফিরে
ধরতে গেলে যায়রে দূরে- পরমগুরু কাছে রয়-
মানুষগুরু হইলে সদয়- জগৎগুরু দেয় পরিচয়
জানতে হয় তা নিরালায়- ভক্তিভজন রেখে ভয়।
মানুষগুরু হয় আকারে- জগৎগুরু রয় নিরাকারে
জ্ঞান দ্বারা ধরো তারে- নিকটে সে দূরে নয়
দমে যায় দমেতে আসে- দিনরজনী ডানে বাঁয় সে
ফাঁদ পাঁতিয়া ধর কষে- ভক্তি দিয়ে উত্তরা বায়।
জগৎগুরু অপারলীলা- দেখবি তার রূপ রঙ্গিলা
করিসনে আর অবহেলা- সময় তোর অধিক নাই-
উত্তরা বায় ধরলে পাড়ি- মানুষগুরু হয় কা-ারী
বলন কয় ভয় কী তারি- কালসমন দূরে পালায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
মানুষগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে। যেমন- বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Man preceptor)
রূপক সাহিত্যে গুরুপদ প্রাপ্ত ব্যক্তির জ্ঞানকে গুরু বলে। যেমন সম্বিত।
মানুষগুরুর প্রকারভেদ (Classification of Man preceptor)
মানুষগুরু দুই প্রকার। যথা- ১.আধ্যাত্মিক গুরু ও ২.জাগতিক গুরু।
১. আধ্যাত্মিক গুরু (Spiritual preceptor)
আত্মদর্শন বা পরাবিদ্যার শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকারীকে আধ্যাত্মিক গুরু বলে। যেমন- আত্মতাত্ত্বিক গুরু।
২. জাগতিক গুরু (Mundane preceptor)
বৈষয়িকবিদ্যা শিক্ষাদানকারী প-িতকে জাগতিক গুরু বলে। যেমন- শিক্ষক।
আবার মানুষগুরু দুই প্রকার। ১.উপমান মানুষগুরু ও ২.উপমিত মানুষগুরু।
১. উপমান মানুষগুরু (Analogical Man preceptor)
মানুষরূপী গুরুকে উপমান মানুষগুরু বলে।
২. উপমিত মানুষগুরু (Compared Man preceptor)
রূপক সাহিত্যে মানুষের জ্ঞানকে উপমিত মানুষগুরু বলে।
মানুষগুরুর পরিচয় (Identity of Man preceptor)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ বিশেষ। সাধারণত সর্ব প্রকার জ্ঞানীকেই মানুষগুরু বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে পিতা-মাতা, শ্বশুর-শাশুড়ী, চাচা, মামাসহ সর্ব প্রকার বয়জ্যেষ্ঠ লোককেই মানুষগুরু বলা হয়। সর্ব প্রকার শিক্ষাগুরু ও দীক্ষাগুরুকেও মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয়। শুধু আকার ও আকৃতিধারী জ্ঞানীকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের ‘জ্ঞান’। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ মানুষগুরু হলো মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির ‘জ্ঞান’
পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
রক্তমাংসে নির্মিত মানুষকে গোঁসাই বা গুরু ভাবা, গোঁসাই বা গুরুর ছবি ধ্যান করা, গোঁসাই বা গুরুর মুখম-লের ধ্যান করা সর্বকালে সর্ব ঘরানাতেই নিষিদ্ধ ছিল, এখনো নিষিদ্ধ আছে এবং ভবিষ্যতেও নিষিদ্ধ থাকবে। যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ করে তারা একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই করে। আবার যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ ভাবে তারাও একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই ভাবে। এরূপ গোঁসাই গুরুর সঙ্গ পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গেই আত্মতাত্ত্বিক সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
অন্যদিকে অত্যন্ত মজার বিষয় হলো আমাদের দেশেরমানুষ কেবল দীক্ষাগুরুকেই মানুষগুরুরূপে মূল্যায়ন করে থাকেন। ওপরোক্ত শ্রদ্ধাবান ও মান্যবর ব্যক্তিদেরকেও সাধারণমানুষ বলেই মনে করে থাকেন। আবার অনেকে একাধিক মানুষগুরু গ্রহণ করাকে অবৈধ বলে মনে করে থাকেন অথচ কবি কামিনী রায় লিখেছেন-
“জগৎজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
নানানভাবে নতুন বিষয় শিখি দিবারাত্র।”
এছাড়া জনৈক মরমীকবি বলেছেন-
“গুরু ধরি শতশত শিখি কত মন্ত্র-তন্ত্র
যার কাছে আলো পাবো তার নামের দোহাই দিব।”
পরিশেষে বলা যায় বয়জ্যেষ্ঠরা সবাই মানুষগুরু। এছাড়া প্রথমিক, নিম্নমাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণিা শিক্ষক-শিক্ষিকারাও আমাদের মানুষগুরু। জ্ঞানার্জনের জন্য একাধিক মানুষগুরু গ্রহণ করা সর্বকালে সর্বস্থলেই বৈধ ছিল এবং এখনো তা বৈধই রয়েছে। তবুও বাংভারতের মূর্খ গুরু গোঁসাইরা “একাধিক গুরু গ্রহণ করা যায় না, এক রাতা দু’বার বলি দেওয়া যায় না, এক মাথা দু’বার বিক্রি করা যায় না।”- এসব কথা বলে সাধারণ মানুষকে মহাবিভ্রান্তির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। শাস্ত্রান্ধতা থেকে বের করে পরম্পরা-অন্ধতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ এক অন্ধকার হতে বের করে আরেক অন্ধকারে নিক্ষেপ করছে। এরূপ কূট চক্রান্ত চলতে থাকরে সাধারণ মানুষ কখনোই সঠিক পথের সন্ধানলাভ করতে পারবে না।
একাধিক গোঁসাই- গুরুর শিষ্যত্ব গ্রহণ প্রসঙ্গ
(Context to taking pupilage the multiple Guru-Preceptor)
প্রত্যেক মানুষকে ন্যূনতমপক্ষে চারজন আধ্যাত্মিক দীক্ষাগুরু গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। পূর্বকালে একজন গুরু গ্রহণের নির্দেশ থাকলেও বর্তমানে সেটি আর গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ বর্তমানে অনেক স্বয়ংসিদ্ধি গুরু গোঁসাই প্রতিনিয়ত আবির্ভূত হচ্ছেন। যে যেমনে পারে গুরুপদ সংগ্রহ করছে। এ জন্য পূর্বকালে একজন গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলেই যথেষ্ট হতো কিন্তু বর্তমানে চার চারজন গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা ব্যতীত কেউই সম্যক আত্মতত্ত্বজ্ঞানের অধিকারী হতে পারবেন না। কিছুকিছু ভ-গুরু- যারা সামান্যতম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকজ্ঞানও রাখেন না কেবল তারাই শিষ্যদের বলে থাকেন যে, “যেমন এক রাতা দু’বার বলি করা যায় না তাদৃশ একজন শিষ্যও দুই গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারে না।” তারা আরো বলেন যে, “এক ব্যক্তি একাধিক গুরু বা গোঁসাইয়ের নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলে নিরীক্ষ গ্রহণ করবে কার?” তারা একটিবারও ভেবে দেখেন না যে, একজন ছাত্র প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শ্রেণি সমাপ্ত করার জন্য কতজন শিক্ষকের নিকট হতে বিদ্যাশিক্ষা গ্রহণ করে থাকে। তাতে তাদের নিরীক্ষ গ্রহণের কোন ক্ষতি হয় না। কেবল গুরুর নিকট এলেই যত নিরীক্ষ গ্রহণ ও রাতা বলি করার ফোতোয়া। এসব অজ্ঞরা তো গুরুতত্ত্বই জানেন না।
এক বিপণিতে যেমন সর্বশ্রেণির পণ্য পাওয়া যায় না তদ্রূপ এক গুরুর নিকটও সর্ব প্রকার জ্ঞান পাওয়া যায় না। উপমাস্বরূপ বলা যায় একজন গুরুর নিকট কেবল শাস্ত্রীয় মতবাদের জ্ঞান থাকে, অন্য গুরুর নিকট কেবল পরম্পরারজ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল আত্মতত্ত্বের জ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল দার্শনিকজ্ঞান থাকে, আরেক গুরুর নিকট কেবল বৈজ্ঞানিকজ্ঞান থাকে আবার আরেক গুরুর নিকট ভাষাজ্ঞান বিদ্যমান থাকে। আলোচ্য সর্ব প্রকার জ্ঞানার্জনকারী গুরুর সংখ্যা একেবারেই বিরল। এ জন্য একাধিক গুরু গ্রহণ করেই ক্রমে ক্রমে সর্ব প্রকার জ্ঞানার্জন করে যাওয়াই বুদ্ধিমান লোকের উত্তম কাজ। যেমন বলা হয়-
“গুরু ধরব শতশত
শিখব শত মন্ত্রতন্ত্র
যার কাছে জ্ঞানের আলো পাবো
তাঁর নামের দোহায় দিব।”
আবার বলা হয়-
“গুরু ধরব শতশত মন্ত্র শিখব যত যার
মনের কালি দূর করবে যে দোহাই দিব তার।”
মহাত্মা লালন সাঁইজি স্বয়ং বলেছেন-
“তাইতো বলি ওরে কানা,
সর্বজীব হয় গুরুজনা,
চৈতন্য-গুরু করো সাধনা,
তাতে কর্মদোষ যায়।” (পবিত্র লালন- ৬৩৭/৩)
আধ্যাত্মিক জ্ঞানহীন অজ্ঞ ও ধান্ধাবাজ গুরু-গোঁসাইরা বলে থাকেন যে- “একাধিক গুরুর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করা যায় না।” এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, অমূলক ও অবিশ্বাস্য কথা। এরূপ কথা কখনই বিশ্বাস করা যায় না। এ প্রসঙ্গে কবি কামিনী রায় লিখেছেন-
“জগৎজোড়া পাঠশালা মোর সবার আমি ছাত্র
নানানভাবে নানান জিনিস শিখি দিবারাত্র।”
অশিক্ষা ও কুশিক্ষায় জর্জরিত হওয়া ও নোংরা রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগে যতসব বিভ্রান্ত মতবাদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে আমাদের এ স্বর্গনীড় সোনার বাংলাদেশ। এদেশের যত্রতত্র আগাছার মতো গিসগিস করে গজিয়ে উঠেছে যতসব ভ-পির, গল্পসার বক্তা, কণ্ঠসার বাউল, হাতুড়ে চিকিৎসক, নোংরা রাজনীতিজীবী, অন্ধ শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়ী, জ্ঞানহীন গণক, আনাড়ী বৈদ্য, অনভিজ্ঞ সাপুড়ে, অজ্ঞ জিনবাজ ও ভুতরাজ কবিরাজ। এরা মানুষের কাছ থেকে কেবল টাকাই হাতিয়ে নেওয়া জানে, মানুষকে কেবল বিপদের মুখেই ঠেলে দিতে পারে কিন্তু দিতে পারে না বাস্তব কিছু।
বহিঃবিশ্বের বিভিন্ন দেশ হতে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কারণ বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩০০টি রাষ্ট্র থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর কোন দেশেই এত পির, এত আখড়া, এত উরশ, এত বাউলগান, এত পালগান, এত মাজার, এত মসজিদ, এত ইজতেমা, এত ওয়াজ ও এত উগ্রবাদী দল নেই। পৃথিবীর বড়বড় দেশে মাত্র কয়েকটি শাস্ত্রীয় সম্প্রদায়ের লোক বাস করে কিন্তু আমাদের এ ক্ষুদ্র দেশটিতে প্রায় ৫০টির অধিক শাস্ত্রীয় মতবাদের লোক বাস করে। বর্তমানে শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদের ধুরন্ধর শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদজীবিদের বিনা পুঁজির লাভজনক রমরমা এসব ব্যবসা-বাণিজ্যের অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় তাদের অভয় বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু আমাদের অসহায় এ বাংলাদেশ। জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের এখন সজাগ হতে হবে। সত্যপথ, দর্শন ও বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনে আবার একাত্তরের মতো গর্জে উঠতে হবে।
বিভিন্ন কারণে একাধিক গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। যেসব কারণে একাধিক গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায় তা হলো-
১. গোঁসাই বা গুরু যদি প্রয়াণলাভ করেন। তখন অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা সর্বক্ষেত্রে ও সর্ব ঘরানাতেই বৈধ বা সিদ্ধ রয়েছে।
২. গোঁসাই বা গুরু যদি জীবনের তরে দেশান্তরি হন। যেমন- অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তবে অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৩. যদি কোন কারণে একই দেশে, এক অঞ্চল হতে অন্য কোন অঞ্চলে গুরু বা শিষ্যের যে কোন একজনের হঠাৎ স্থানান্তরের কারণে- তাদের মধ্যে ব্যবধান এত অধিক হয় যে গোঁসাই বা গুরুর সাথে সাক্ষাত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরুর নিকট হতে অনুমতি সাপেক্ষ অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট পুনঃ শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরু যদি অনুমতি না-ও দেয় তবুও অন্যগুরু গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৪. যদি কোন কারণে গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার স¤পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এরং কোন ক্রমেই গুরুর সহচার্য লাভের সম্ভবনা না থাকে তবে অন্যত্র শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়।
৫. চুরি, দস্যুতা ও নরহত্যা ইত্যাদির মতো বড়বড় দোষ কোন গোঁসাই বা গুরুর মধ্যে পাওয়া গেলে এরূপ গুরু পরিত্যাগ করে অন্য কোন গুরুদেবের নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই।
৬. উচ্চ আত্মদর্শন শিক্ষালাভের জন্য গোঁসাই বা গুরুর অনুমতি সাপেক্ষ অসংখ্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করা যায়। এরূপ ক্ষেত্রে গোঁসাই বা গুরুর অনুমতি না পেলেও উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট শিষ্যত্বপদ গ্রহণ করা যায়।
৭. গোঁসাই বা গুরু যদি আত্মদর্শন বা আত্মতত্ত্ব বা দিব্যজ্ঞান না জানেন ও না বুঝেন তবে অন্য গোঁসাই বা গুরুর নিকট দীক্ষাগ্রহণ করা সর্বকালে সর্বস্থলেই সিদ্ধ।
বর্তমান প্রেক্ষাপট (Current Situation)
১. গোঁসাই বা গুরুর শিষ্যবর্গ যদি এত অধিক হয় যে, লোকের ভিড়ে তিনি নিজ নিজ শিষ্য চিনতে অসমর্থ। তবে আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা অর্জনের জন্য এরূপ গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
২. গোঁসাই বা গুরুর আশ্রমে আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা শিক্ষাদীক্ষার পরিবর্তে যদি কেবল মিলাদ, সামা, কাওয়ালি, গজল, জিকির, গান, নৃত্য, শাস্ত্রীয় উপাসনা (পূজা/ ধ্যান/ প্রাণায়াম ও নামাজ) চলতে থাকে- তবে এরূপ গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে আত্মতত্ত্ব জ্ঞানী সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
৩. যে সব গোঁসাই বা গুরু শিষ্যদের আত্মতত্ত্ব/ আত্মদর্শন/ দেহতত্ত্ব, পর¤পরা-তত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকবিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা না করে কেবল শিষ্য বাড়ানোর প্রতিযোগীতার লিপ্ত থাকে এবং শিষ্য বাড়ানোর জন্য অডিও/ ভিডিও প্রচার করে থাকে- সে সব গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সাধক-গোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
৪. সর্বপরি গোঁসাই বা গুরু গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হলো, নিজকে চেনা, সনাতনী পদ্ধতিতে শুক্রনিয়ন্ত্রণ করা, শাস্ত্রীয় ও পার¤পরিক মতবাদাদির প্রকৃত আত্মদর্শন জানা ও আত্মশুদ্ধি করা। গ্রহণকৃত গোঁসাই বা গুরুর নিকট এসব উদ্দেশ্য অর্জন না হলে উক্ত গোঁসাই বা গুরু পরিত্যাগ করে সঙ্গে সঙ্গে সাধক গোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
গুরু হওয়ার যোগ্যতা
(The Minimum qualifications of preceptor-being)
গুরুপদ গ্রহণ বা গুরু হওয়ার জন্য, একজন সাধককে অবশ্যই প্রথমে মনোশুদ্ধি করতে হবে। মনোশুদ্ধি করার মূল অস্ত্রই হলো জ্ঞান। জ্ঞান ভিন্ন নিজের মনোশুদ্ধি করা যায় না। গুরু নিজের মনোশুদ্ধি করতে না পারলে, শিষ্যের মনোশুদ্ধি করবেন কিভাবে?
১. গুরুপদ গ্রহণ করতে হলে, তাঁকে অবশ্যই নিজ মাতৃভাষা, ইংরেজি ও আরবি এ তিনটির যে কোন একটি শিক্ষাক্রমের সর্বশেষ পদবি অর্জন করতে হবে। যেমন- বাঙালীদের জন্য বাংলায় স্নাতকোত্তর, ইংরেজ ও আরবিদের জন্য তাদের স্বস্ব মাতৃভাষায় তার সমমানের পদবি।
২. ঘারনিক গুরুদেবের নিকট হতে, আত্মতত্ত্ব বা পরাজ্ঞানার্জন করতে হবে। এতে অন্তত একযুগের সাধন ও পাকা ঘারনিক গুরুদেবের সহচার্য একান্ত প্রয়োজন। গুরুদেবের পাশেপাশে বা গুরুদেবের সাথে সাথে থেকে গুরুবৃত্তির বাস্তবজ্ঞান অর্জন করতে হবে। তা না হলে নিজে গুরুবৃত্তি করতে গিয়ে পদে পদে বিপদের সমম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।
৩. প্রচলিত ঘারনিক ও শাস্ত্রীয়জ্ঞান অর্জন করতে হবে।
৪. প্রচলিত বিজ্ঞান ও দর্শনজ্ঞান অবশ্যই অর্জন করতে হবে।
৫. গুরুপদ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে সর্ব প্রকার ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রীয় বৃত্তি পরিহার করতে হবে। কারণ কোন বৃত্তিতে নিয়োজিত থেকে, কখনো স্বাধীনভাবে গুরুবৃত্তি করা যায় না। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য প্রয়োজন বোধে নিজে স্বাধীন ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করতে হবে।
৬. গুরুবৃত্তি করার আকাক্সক্ষা থাকলে, বিবাহের পূর্ব হতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। দাম্পত্য জীবনে কোন প্রকার সন্তান গ্রহণ করা যাবে না। সন্তান গ্রহণের পরে শিষ্যপদ গ্রহণকারীদের প্রসঙ্গ ভিন্ন। গুরু গোঁসাইগণেরও উচিৎ সন্তান গ্রহণকারীদের গুরুপদ না দেওয়া। এক সন্তানের জনক গুরুপদ পাবার জন্য বিবেচনাধীন হলেও, একাধিক সন্তানের জনকগণ কোনক্রমেই গুরুপদ গ্রহণ করতে পারবেন না। এজন্য কোন গুরু গোঁসাই একাধিক সন্তানের পিতাকে গুরুপদ দান করতে পারবেন না। যদিও কোন গুরু গোঁসাই এরূপ কাজ করেন তবে তা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে না। বিশ্বের সর্বজান্তা হলেও একাধিক সন্তানের পিতা গুরু হতে পারবেন না।
৭. গুরু বা গোঁসাইপদ গ্রহণের জন্য সর্ব শাস্ত্রীয়জ্ঞান অর্জন করতে হবে। যেন সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় মতবাদের লোকজনদের শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিকজ্ঞান দান করা সম্ভব হয়।
৮. শাস্ত্রীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও বৈজ্ঞানিক রীতিনীতির বিরোধী কোন পথ বা মত কোন গুরু গোঁসাই ব্যক্ত করতে পারবেন না।
৯. কৃচ্ছ্বতা সাধন বা অলৌকিক চমৎকারাদি দেখিয়ে কোন গুরু মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারবেন না। যদি এরূপ করেন তবে তিনি অবাঞ্ছিত বলে প্রমাণিত হবেন।
গুরুর-দ্বায়িত্ব প্রদানের নিয়মাবলী
(The providing rules of preceptor-responsibilities)
গুরুপদ (রূপ)বি গুরুবৃত্তি, গুুরুবৃত্তি করার দায়িত্ব, শিষ্যদের দীক্ষা ও ভেদ প্রদানের দায়িত্ব {বাং.গুরু+ বাং.পদ}
পদ (রূপ)বি চরণ, পা, পদচিহ্ন, পদাংক, পদক্ষেপ, পায়ের ছাপ, কবিতার পঙক্তি বা চরণ, বৈষ্ণব কবিদের রচিত কবিতা ও গান (পদাবলী), সম্মান, কাজের ভার, স্থান, বসতি (জনপদ), উপাধি, পদবি, অনুগ্রহ, আশ্রয় (পদে রাখা), বিভিন্ন প্রকার দ্রব্যাদি (আল) অধিকার, আধিপত্য (ব্যা) বিভক্তিযুক্ত শব্দ, ক.বিশেষ্য খ.বিশেষণ গ.সর্বনাম ঘ.অব্যয় ও ঙ.ক্রিয়া- এই পাঁচ প্রকার শব্দ (আবি) বলাই, মদন, কামদেব, সুরেশ্বর (রূ) বিম্বল (দেত) বলাই।
গুরুপদ প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। কোন শিষ্যের মধ্যে, গুরু হওয়ার যোগ্যতা বিকশিত হলে কেবল তাঁকেই গুরুপদ প্রদান করা যায়। সব শিষ্যকেই গুরুপদ দেওয়া যায় না। যে শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও ঘারনিকশিক্ষা সমাপন করতে সক্ষম হয়েছে, সাথে সাথে ধীশক্তি, বিনয়, ভক্তি, প্রেম ও বিশ্বাসের পূর্ণতা অর্জন করেছে কেবল তাঁকেই গুরুপদ প্রদান করা যায়। আত্মতাত্ত্বিকদের বর্ণনা অনুসারে- গুরুপদ প্রদানের কয়েক প্রকার নিয়ম লক্ষ্য করা যায়। গুরুপদ প্রদানের কয়েকটি নিয়ম নিচে তুলে ধরা হলো।
১. প্রথম নিয়ম (The first rule)
শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপণান্তে- ঘারনিকশিক্ষাও সমাপণ করবেন। অতঃপর স্ব-শুক্র নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করবেন। শুক্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়ার পর, সাঁই সাধন আরম্ভ করবেন। অতঃপর কামসাধন দ্বারা সাঁই আহরণ করে, তা গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব সাঁই নামক উক্ত মানবজল নিয়ে, আশ্রমে উপস্থিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করবেন। অতঃপর তিনি গুরুদেবের আমন্ত্রণ অনুযায়ী উক্ত মানবজল নিয়ে, গুরুদেবের আশ্রমে উপস্থিত হবেন। অন্তত তিন হতে চারবার এরূপ মানবজল আহরণের পর, উক্ত ব্যক্তি গুরুপদ গ্রহণের প্রার্থিও হতে পারবেন। নিজে প্রত্যক্ষভাবে সাঁই আহরণকারী, এরূপ মহান সাধক যদি গুরুপদ প্রার্থী হন।
তবে গুরুদেব একটি বিশেষ গোপন সভার আয়োজন করবেন। তিনি বিশেষ বিশেষ ও প্রবীণ প্রবীণ শিষ্যগণকে উক্ত গোপন সভায় উপস্থিত হওয়ার আমন্ত্রণ করবেন এবং গুরুপদ প্রার্থির জন্য- শ্বেতবর্ণের ধুতি, ওড়না, উষ্ণীষ ও কোপনি নির্মাণ করাবেন। অতঃপর বিশিষ্ট জনদের উপস্থিতিতে গুরুদেব কঠিনমানুষ হয়ে তরলমানুষ আখেটি করার দুঃসাধ্য সাধনটির আলোচনা করবেন। মানুষ সাধনবলে এ দুর্লভ সাধনটিও যে করতে পারেন তা তিনি সবিস্তারে আলোচনা করবেন। অতঃপর তিনি সর্ব সম্মুখে আহরণকৃত উক্ত সাঁই বা মানবজল বের করে সবাইকে দেখাবেন। সবাইকে বুঝিয়ে দিবেন যে ইনিই হলেন আমাদের পালনকর্তা, ইনিই হলেন আমাদের উপাস্য লালন, ইনিই হলেন মানবের প্রকৃত উপাস্য, এটিই হলো মানুষের দেহ হতে আহারিত তরলমানুষ। এনিই হলেন- সাধকের মনেরমানুষ প্রেমেরমানুষ অচিনমানুষ ও ভাবেরমানুষ। সাধনবলে আমাদের এ সাধক এ সাঁইয়ের সন্ধানলাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। এ জন্য তিনি আজ হতে সাঁইজি।
গুরুদেব নিজ হাতে উক্ত মানবজল উপস্থিত সবাইকে অল্পঅল্প করে পান করাবেন। এ মানবজল পানই অনুষ্ঠানের প্রসাদরূপে গণ্য হবে। এ মানবজল ব্যতীত অদ্য সভায় আর কোন প্রসাদ প্রদান করা যাবে না। এটিই হলো সর্বোত্তম অনুষ্ঠান এবং এটিই হলো সর্বোত্তম প্রসাদ। স্বর্গীয় এ প্রসাদ পানের পর মর্ত্যীয় অন্য কোন প্রসাদের প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না। এ সময় উপস্থিত বিশিষ্ট শিষ্যগণ গুরুদেবকে ভক্তি প্রদান করবেন। অতঃপর সবাই একত্রে “আলেক সাঁই” বলে ধুপ ধুনাসহ জোকার দিতে দিতে- ধুতি, ওড়না, উষ্ণীষ ও কোপনি পাপনি পরিয়ে দিবেন। অতঃপর মানবজল আহরণকারী সাধক গুরুদেবকে, চতুর্ভক্তি প্রদান করার পর সর্বশেষে সাষ্টাঙ্গ ভক্তি প্রদান করবেন। গুরুদেব উপস্থিত সবাইকে নিয়ে সাঁইভক্তি (হাতের চিৎপার্শ্ব দ্বারা) প্রদান করবেন। এ ভক্তি দ্বারা প্রমাণ করা হয় যে আজ হতে গুরু ও শিষ্য কর্মগুণে একস্তর প্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ গুরু ও শিষ্য আজ হতে উভয়ই গুরু। এ বৈঠকেই গুরুদেব ঘোষণা করে দিবেন যে আজ হতে অমুক আমার প্রতিনিধি। আমার অবর্তমানে আপনারা তাঁকে গুরুরূপে মান্য করবেন। এখন হতে আপনারা তাঁর নিকট হতে শিষ্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন।
২. দ্বিতীয় নিয়ম (The second rule)
শিষ্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাপণান্তে- ঘারনিকশিক্ষাও সমাপণ করবেন। অতঃপর স্ব-শুক্র নিয়ন্ত্রণ করার প্রশিক্ষণ আরম্ভ করবেন। শুক্র নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হওয়ার পর সাঁই সাধন আরম্ভ করবেন। অতঃপর কামসাধন দ্বারা সাঁই আহরণ করে তা গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব মানবজল নিয়ে আশ্রমে উপস্থিত হওয়ার সময় নির্ধারণ করবেন। গুরুদেবের আমন্ত্রণ অনুযায়ী উক্ত মানবজল নিয়ে তিনি গুরুদেবের আশ্রমে উপস্থিত হবেন। যদি তিনি এরূপ সাধন করতে ব্যর্থ হন তবে তিনি কুম্ভক সাধনের মাধ্যমে কোপনি গ্রহণ বা গুরুপদ গ্রহণ করবেন।
চারজানু আসনে বসে প্রতিদিন কুম্ভক সাধন করবেন। অর্থাৎ নাসিকার বাইয়ে শ্বাসের বারো আঙ্গুলি গতি হ্রাস করতে আরম্ভ করবেন। সর্বশেষে শ্বাসের গতি নাসিকার ডগা পর্যন্ত এসে সীমাবদ্ধ হলে নাসিকায় হাত দিয়েও যখন তার শ্বাস প্রশ্বাসের গতি অনুভব করা যাবে না তখন তিনি গুরুদেবকে জানাবেন। গুরুদেব বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। অতঃপর উক্ত অনুষ্ঠানে গুরুদেব তাঁকে প্রয়াত বলে ঘোষণা করবেন। উক্ত অনুষ্ঠানে গুরুদেব তাঁকে শববৎ স্নান করানো ও স্নান শেষে শববসন পরিধান করানোর আদেশ করবেন। অতঃপর শব স্নানাদি শেষে তাঁকে শববহন কাষ্ঠাসনে করে চারজনে কাঁধে নিয়ে চৌদ্দক্রোশ অর্থাৎ চৌদ্দধাপ গমন করবেন। অতঃপর কাঁধ হতে কাষ্ঠাসন নামিয়ে বিশ্রাম করবেন। এভাবে তিন বিশ্রাম পরে তাঁকে কাষ্ঠাসন হতে নামিয়ে শববসন মুক্ত করবেন। অতঃপর নতুন নির্মাণকৃত শ্বেতবর্ণের কাপড়ের পাপনি, ওড়না, কোপনি ও উষ্ণীষ পরিয়ে, ভক্তি ভজন সমাপন করবেন। অতঃপর সাতস্তর কাপড় দ্বারা চক্ষু বন্ধন করে চৌদ্দবাড়ি ভিক্ষা করে এনে, তা রান্না করে ভিক্ষান্ন প্রসাদ ভোজন করাবেন। লালন ঘরানার মনীষীগণের মতে- এ দিবস হতে কোপনি গ্রহণকারী আর সংসার জীবন যাপন করতে পারবেন না। এ জন্য তিনি প্রকৃত সাধুরূপে গণ্য হবেন। একই বৈঠকে গুরুদেব ঘোষণা করে দিবেন যে, আজ হতে অমুক আমার প্রতিনিধি। আমার অবর্তমানে আপনারা এঁকে গুরুরূপে মান্য করবেন। এখন হতে আপনারা তাঁর নিকট হতে শিষ্যপদ গ্রহণ করতে পারবেন।
৩. তৃতীয় নিয়ম (The third rule)
প্রাতিষ্ঠানিক বা আশ্রমভিত্তিক কোন প্রকার জ্ঞানবিদ্যা অর্জন না করেও কেবল গুরু প্রদত্ত গোপন নামটি জপনা করতে করতে যদি হঠাৎ কোন শিষ্যের স্তনের মাংসপি-টি নড়াচড়া আরম্ভ করে, একে তারা হৃদোন্মোচন বলে থাকেন। অজ্ঞ সাধকরা হৃদোন্মোচন হওয়াকে গুরুপদ প্রাপ্তির উপযুক্ত হওয়া বলে মনে করেন। এ জন্য কোন শিষ্যের হৃদোন্মোচন হলে আনুষ্ঠানিকভাবে তারা তাকে গুরুপদ দান করেন। এ নিয়মটি একেবারেই ভিত্তিহীন। কারণ যে কোন লোক ইচ্ছা করলে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই যার যার স্তনের মাংসপি-টি নাচাতে পারেন। এজন্য নামজপনা করার কোন প্রয়োজন হয় না। এ জন্য স্তনের মাংসপি-টি নাচানোকে গুরুপদের মত এরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তির মাপকাঠি নিরূপণ করা একেবারেই অযৌক্তিক। এ জন্য বলা যায় এ পদ্ধটি মনগড়া ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক।
ওপরোক্ত দু’টি পদ্ধতি ভিন্ন গুরুপদ প্রদানের কোন নিয়ম পরাম্পরাবিদ্যায় নেই। তবে অজ্ঞ সাধকরা কেউ কেউ তৃতীয় নিয়মের দ্বারাও গুরুপদ প্রদাণ করে থাকেন। তৃতীয় নিয়মে গুরুপদ প্রদান করা আত্মদর্শনে গ্রহণযোগ্যতা নেই। এছাড়াও যারা পত্র দ্বারা মৌখিকভাবে বা আলাপীর মাধ্যমে গুরুপদ দান করে থাকেন সেগুলোকে ঘারনিক বিদ্যার গুরুপদ প্রদান বলা যায় না। সেগুলো একান্ত মনগড়া ও ঠুনকোভাবে নির্মিত পদ্ধতি। পত্র দ্বারা মৌখিকভাবে ও আলাপীর মাধ্যমে গুরুপদের মতো দুর্লভপদ প্রদান করা, বিশ্বের কোন আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানীই সমর্থন করেন না। এ জন্য এগুলোকে ঘারনিক পদ্ধতিও বলা যায় না। আর এভাবে গুরুপদ প্রাপ্তদেরকে গুরুদেব বলা যাবে না। বরং তাদের মূর্খ বলাই যুক্তিযুক্ত হবে। কারণ গুরুপদ এতো সহজ নয় যে। মাত্র ২০০০/= টাকার বিনিময়ে, গুরুদেবের মেয়েকে বিবাহ করার বিনিময়ে বা গুরুদেবের সাথে দু বছর ভ্রমণ করে পাওয়া পদ কখনই গুরুপদ হতে পারে না। প্রকৃত আত্মতাত্ত্বিক মনীষীগণের মতে গুরুপদ ওপরোক্ত দু’টি বিধিমালার মাধ্যমে দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে প্রচলিত পির, ফকির, শায়িক্ব ও মাশায়িক্বরা পত্র দ্বারা, মৌখিকভাবে, আলাপীর মাধ্যমে কিম্বা যেন তেনভাবে গুরুপদ দিয়ে থাকেন। ঘারনিক গুরুপদ ও পির ফকিরের গুরুপদ প্রদান ও মান্যতার বিচারের দায়িত্ব সুবিজ্ঞ পাঠককুলের ওপর ছেড়ে দিলাম।
গুরু-গোঁসাইয়ের কার্যক্রম (The activities of Guru-Preceptor)
শিষ্যদের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার সময়, সব গুরু গোঁসাইদের নিচে বর্ণিত বিষয়াদি মেনে চলা একান্ত আবশ্যক। তা না হলে শিষ্যগণ পূর্ণজ্ঞানী হয়ে গড়ে উঠতে পারবেন না।
১. অপ্রচলিত ও বিদেশীশব্দাদির অর্থ বুঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা শিষ্যদের পক্ষে অসম্ভব। এ জন্য অপ্রলিত ও বিদেশী পরিভাষাদির আভিধানিক, পারিভাষিক ও ব্যবহারিক অর্থ শিষ্যদের অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
২. বাংলাশব্দাদি বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী, আরবিশব্দাদি আরবি নাহু ছরফ অুনুযায়ী এবং ইংরেজিশব্দাদি ইংরেজি গ্রামার অনুযায়ী অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
৩. গ্রন্থে উল্লিখিত শব্দের বিষয়ে ও সংখ্যার সূত্রাদি পৃথকপৃথকভাবে উদাহরণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৪. মূল গ্রন্থের কঠিন কঠিন বাক্যাদির জন্য, সহজসহজ বাক্য গঠন করে, বুঝিয়ে দিতে হবে।
৫. কোন বিষয়ের প্রকারাদি বুঝানোর সময়, তার সব প্রকার উল্লেখ করে, তার কারণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৬. একটি বিষয় বুঝানোর সময় যথা সম্ভব সর্ব মতবাদ ও সর্ব ঘরানার প্রাথমিক ধারণা অবশ্যই শিষ্যদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও ঘারনিক মতবাদের তুলনামূলক আলোচনা করতে হবে।
৭. রূপক সাহিত্য ও আত্মতত্ত্ব ভালোভাবে জানেন না, এরূপ কোন গুরু গোঁসাইয়ের কখনো শাস্ত্রীয় ও ঘারনিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া উচিৎ নয়।
৮. জন সাধারণের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান পরিধির সীমা বহির্ভূত, উচ্চস্তরের কোন বর্ণনা সাধারণ জনসভায় করা যাবে না। জনৈক মনীষী বলেছেন- “তোমরা লোকজনের জ্ঞানের পরিধি বুঝে কথা বলো, যেন তারা সহজে বুঝতে পারে।”
৯. গুরু গোঁসাইগণ তাদের বক্তৃতার দ্বারা কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ, দল, ঘরানা ও ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ করে, বিরোধিতা করতে পারবেন না। তবে বিশৃংখলার সম্মুখীন হতে হবে।
১০. বক্তৃতার সময় গুরু গোঁসাইগণের হাঁসিঠাট্টা করা উচিৎ নয়। কারণ তাতে শ্রতাদের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
১১. বক্তৃতার সময়ে গুরু গোঁসাইদের মনগড়া কথা বলা উচিৎ নয়। কারণ তাতে অনেক ভুল কথা ও ভুল সিদ্ধান্ত সৃষ্টি হতে পারে। প্রমাণহীন মনগড়া গল্পকাহিনী দ্বারা শ্রোতাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
১২. বক্তৃতার মধ্যে আসা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি, দুবার বা তিনবার পর্যন্ত পুনঃপুন বর্ণনা করে, শ্রোতাদের হৃদয়ঙ্গম করাতে প্রচেষ্টা করতে হবে।
গুরুপদ রহিত হওয়ার কারণাদি
(Reasons to repealed preceptor-responsibilities)
সাঁইসাধন ও কুম্ভসাধনে কৃতকার্য হওয়ার পরই কেবল গুরুপদ গ্রহণ করতে হয়। গুরুপদ গ্রহণ করে, যদি এ পদের মর্যাদা রক্ষা করা না হয়, তবে অবশ্যই গুরুপদ রহিত হয়ে যায়। উল্লেখ্য গুরুপদ ধ্বংসকারী উপসর্গ অনেক। তবে তার মধ্যে অর্থ ও নারী এ দু’টিই গুরুপদ ধ্বংসকারী প্রধান উপসর্গ। গুরুপদ রহিত হওয়ার কারণাদি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু শিষ্যদের সম্মুখে প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তবে অবশ্যই তার গুরুপদ রহিত হয়ে যায়।
২. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু কোন প্রকার অর্থ আত্মসাৎ করে এবং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয়ে প্রমাণিত হয়, তবে তার গুরুপদ রহিত হয়ে যাবে। এ অবস্থায় কোন শিষ্য এরূপ ব্যক্তিকে গুরু বলে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
৩. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- যদি কোন গুরু নারীঘটিত কোন প্রকার অপকর্মে লিপ্ত হয় এবং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয়ে প্রমাণিত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় কোন শিষ্য এরূপ ব্যক্তিকে গুরুরূপে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
৪. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি চৌর্য দস্যুতা অপহরণ মিথ্যা ও যে কোন প্রকার হত্যা যজ্ঞের সাথে জড়িত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
৫. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি কোন প্রকার মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
৬. গুরুপদ গ্রহণ করার পর- গুরুপদ প্রাপ্তব্যক্তি- যদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোন প্রকার দণ্ডপ্রাপ্ত হয়, তবে তার গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যাবে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

সম্বিত (জ্ঞান- ৫ম পর্ব)

৩০/৩. সম্বিত
Sensors (সেন্সর্স)/ ‘مجسات’ (মুজাসাত)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘চারিত্রিক পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘জ্ঞান’, রূপক পরিভাষা ‘গুরু’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’
সম্বিত (রূপ)বি জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রতীক্ষা, সংকেত, Sensors, ‘مجسات’ (মুজাসাত), sense, ‘مدركات’ (মুদরিকাত), knowledge, আক্বল (আ.ﻋﻘﻝ), ইলিম (আ.ﻋﻟﻢ) বিণ সম্ভাষণ, light, ‘ﻨﻮﺮ’ (নুর) (আবি) প্রজ্ঞা, বিচারক (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘চারিত্রিক পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) রূপক সাহিত্যে জীবের জ্ঞানশক্তিকে সম্বিত বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
সম্বিতের ১টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(A highly important quotations of Sensors)
“বহু বেদ পড়াশুনা, সম্বিতে পায়রে মনা, সদা শিব যোগী সে না, সদায় ধ্যানযজ্ঞ করে, শ্মশানে মশানে- ফিরে সর্বখানে, কিঞ্চিতের লাগিয়ে” (পবিত্র লালন- ৫০৬/৪)
সম্বিতের সংজ্ঞা (Definition of Sensors)
রূপক সাহিত্যে জীবের জ্ঞানশক্তিকে সম্বিত বলে।
সম্বিতের পরিচয় (Identity of Sensors)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘চারিত্রিক পরিভাষা’ বিশেষ। তবু বিশ্বের অধিকাংশ শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক পণ্ডিত একে রক্তমাংসে গড়া মানুষ বলে মনে করে থাকেন। ফলে মানবকল্যাণের জন্য নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদিও বর্তমানে মুখথুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। সে জন্যই সারাবিশ্বে আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মরণকবলে পতিত হয়েছে কেবল ঐশিবাদীরাই। আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মূল হোতা বলতে বিশ্ববাসী এখন কেবল ঐশিবাদী ও অবতারবাদী শাস্ত্রীয়দেরকেই চিনেন ও জানেন। সমাজের রক্ষণশীল শাস্ত্রীয় পণ্ডিত, বৈখ্যিক ও টৈকিকরা আত্মদর্শনমূলক গ্রন্থাদির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও টীকা প্রদান করতে গিয়েই ছিন্নমূলরূপে ছিটকে পড়েছেন। এ জন্যই সমাজের সর্বত্রই শাস্ত্রীয়দের এরূপ করুণ পরিণতি।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

শনিবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০১৪

আলো (জ্ঞান- ৪র্থ পর্ব)


৩০/২. আলো
Light (লাইট)/ ‘ﻨﻮﺮ’ (নুর)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘উপমান পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘জ্ঞান’, রূপক পরিভাষা ‘গুরু’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’
আলো (রূপ)বি আলোক, জ্যোতি, দীপ্তি, প্রভা, দীপ, রূপ, সৌন্দর্য বিণ উজ্জ্বল, আলোকিত, Light, ‘ﻨﻮﺮ’ (নুর) (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (.ﻋﻘﻝ), ইলিম (.ﻋﻟﻢ) (আভা) বিচারক (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘উপমান পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.আকারী পদার্থাদি দৃষ্টিগোচর হওয়ার শক্তিকে আলো বলা হয় ২.রূপক সাহিত্যে জ্ঞানকে রূপকার্থে আলো বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
২.আলো অব্য সম্বোধনসূচক শব্দ (আলো বউ)।
আলোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Light)
১. “অন্ধকার ঘুচাইয়া যেমন আলোয় দিলো ভরে, আবার কেন বিদায় নিলো বিশ্ব পাগল করে, মনের ব্যথা মনে জানেরে, ব্যথা ফুরাই না জনমে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৭)। (মুখঃ- “ডুবিল গগনের শশীরে ও শশী ডুবিল গগণে, কিবা হারাইলাম জীবনে”)।
২. “কত অন্ধকার ঘরে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছ, হেলা করে অন্ধকারে আমায়ে ফেলে রেখেছ, আমি বুঝি এত ভারি, তায় অকূলে রাখলে ফেলিয়া।” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৩)। (মুখঃ- “কত অন্ধকার ঘরে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছ, হেলা করে অন্ধকারে আমায়ে ফেলে রেখেছ, আমি বুঝি এত ভারি, তায় অকূলে রাখলে ফেলিয়া”)
৩. “সাদা চাঁদ আলো যোগায়, কালো চাঁদ আঁধার ঘুচায়, ভয় রহে না ঝরে মরায়, যুগল চাঁদ প্রতি মাসে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮১)। (মুখঃ- “পাতালের চাঁদ উদয় আকাশে, তিনদিন রয় সাধনপুরে, দ্বিখ- হয় অনায়াশে”)
আলোর কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি
(Some ordinary quotations of Light)
১. “উত্তরা সুর বাজে ভালো, হৃদ কমলে জ্বলে আলো, দক্ষিণা সুর বদন কালো, বিখ-ন ঘটিয়া যায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫৯)
২. “চন্দ্র সাদা সূর্য্য কালো, যাতে উদয় জ্ঞানের আলো, কোন্ সাধনে পাবো বল, তা এখন কারে শুধাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮২)
সাধারণ আলো অর্থে ‘আলো’ পরিভাষাটির ব্যবহার
(Using the terminology Light sense for ordinary Light)
*. “একচাঁদে জগৎ আলো, একবীজে সব জন্ম হলো, লালন বলে মিছে কলহ, ভবে শুনতে পাই।” (পবিত্র লালন- ৭০৭/৪)(“ভক্তের দ্বারে বান্ধা আছেন সাঁই, হিন্দু কী যবন বলে, জাতির বিচার নাই”)
*. “দীপের আলো দেখে যেমন, উড়ে পড়ে পতঙ্গগণ, অবশেষে হারায় জীবন, আমায় মন তাই করলি হারে।” (পবিত্র লালন- ৩৩৬/৩)। (মুখঃ- “কেন মলিরে মন, ঝাঁপ দিয়ে তোর বাবারপুকুরে, দেখি চিত্ত কামে মত্ত, পাগলপারা প্রায় তোরে”)
*. “নিশিতে সূর্য উদয় কোন্ দেশে, দিনে চাঁদের আলো আসে (গো), চাঁদ-সুরুজ এক অক্ষে ভাসে, তাকালে কেউ দেখে না।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫)। (মুখঃ- “আপনদেশের মধুরবাণী, গুরু আমায় শোনাও না, দেশবাসী কয় উল্টাকথা, সোজা করে শোনায় না”)
*. “পূর্ণিমাশশী বিলীন হইলে তমসা নেমে আসে, মনেরমানুষ ছাড়িয়া গেলে নয়নজলে ভাসে, ডুবিয়া গেলে রবি শশীরে, ঐ আলো জ্বলে কী কিরণে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৭)। (মুখঃ- “ডুবিল গগনের শশীরে ও শশী ডুবিল গগণে, কিবা হারাইলাম জীবনে”)
*. “শতদল আর সহস্র দল, একরূপে করছে আলো, সেরূপে যে নয়ন দিলো, মহাকাল তার কী করবে।” (পবিত্র লালন- ৭১৯/২)। (মুখঃ- “ভাবের উদয় যেদিন হবে, সেদিন হৃদকমলে রূপ ঝলক দিবে”)
*. “সাদা ও কালো দু’টি শশী, আলো জ্বালায় দিবানিশি, চাঁদ কুড়াতে সাধু সন্ন্যাসী, বসে রয় তেমাথায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১০৫)। (মুখঃ- “চাঁদের নদে চাঁদ ভেসে যায়, কোন্ সাধনে ধরবি তারে, ধরতে গেলে দূরে পালায়”)
————————————————————-
১. “আছে নূরের শ্রেষ্ঠনূর, জানে সদায় সুচতুর, জীব যারা, যে নূরের আলোতে হয়, নূর জোহরা।” (পবিত্র লালন- ৪৬১/৩)
২. “আজবলীলা মানুষগঙ্গায়, আলোর ওপর জলময়, যেদিন শুকায় জল- সব হয় বিফল, মীন পালায় শূন্য ’পরে।” (পবিত্র লালন- ৯৫০/৩)
৩. “আঠারো মুক্বামে জানা, মহারসের বারামখানা, সে রসের ভিতরে সে-না, আলো করে সাঁই” (পবিত্র লালন- ১১২/৩)
৪. “আলেক শহরে আজব কুদরতি, রাতে উদয় ভানু দিবসে চাঁদি, আলোর খবর যে জানে- দেখতে পায় নয়নে, লালন বলে চাঁদ দেখেছে তারা।” (পবিত্র লালন- ৪৩৫/৪)
৫. “আলোক উদ্ভব নিত্যগোলক, তাতে বিরাজে পূর্ণব্রহ্ম আলেক, হলে দ্বিদল নির্ণয়- জানা যায়, বাঁধা থাকে না সাধনদ্বারে।” (পবিত্র লালন- ৩১৫/২)
৬. “কৌশলী বিন্দুতরু তেলে, অবিরত প্রদীপ জ্বলে, পূর্ব পশ্চিম মধ্য মূলে, আলোতে উজ্বালাময়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮৬)
৭. “ছেলের রূপে ভুবন আলো হলো, কোথায় অকস্মাৎ জন্ম হলো, লালন বলে সে ছেলের গুণ, কারো কারো হৃদয়ে গাঁথা।” (পবিত্র লালন- ৫৫২/৪)
৮. “জগৎ আলো করেছে সাঁই, ফুটিয়ে প্রেমের কলি, কী শোভা করেছে সাঁই, তার কাননে এক মালি।” (পবিত্র লালন- ৪৫৪/১)
৯. “দেখ আজগুবি একফুল ফুটেছে, ক্ষণেক্ষণে মুদিত হয় ফুল, ক্ষণে আলো করছে।” (পবিত্র লালন- ৫৩২/১)
১০. “নূরেতে মুক্বাম ঘিরা, তার ভিতরে সাত সিতারা, তার ওপরে যুগলতারা, আলো করে ত্রিভুবন।” (পবিত্র লালন- ৪৫/২)
১১. “প্রদীপ দানিতে দীপ রাখা, কম আলোতে বেশি দেখা, ঊর্ধ্বমু-ে চেরাগ সেথা, চিমনি ঘিরা সদায়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৬)
১২. “প্রদীপ যেন তারকা দেখায়, একতরু তেলে জ্বলে সদায়, পূর্বে কিম্বা পশ্চিমেও নয়, আলো রয় বিজলিময়।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৬)
১৩. “ফুল ফুটে হয় জগৎ আলো, তারে দেখে মন শীতল হলো, লালন কয় উপায় বলো, খেলছে সাধু দরবেশ অলি।” (পবিত্র লালন- ৪৫৪/৩)
১৪. “বিকার যার শান্ত হলো, হৃদকমলে সদায় আলো, যথায় মন্দ তথায় ভালো, অবশ্য সে পায় দেখা।” (পবিত্র লালন- ৬৯৮/২)
১৫. “মাধবীতলায় গায়, মাধবী-লতার ছায়, দেখ দেখ সই লতায় পাতায়, বন্ধুরূপে আলো।” (পবিত্র লালন- ৭৭৫/২)
১৬. “যেরূপ দেখি তাইতো আঁখি, হয়ে যায়রে বিভোল, দীপের আলো দেখে যেমন, পতঙ্গ পুড়ে মরল।” (পবিত্র লালন- ৩৯৯/২)
১৭. “লালন বলে দেখবি ভালো, চাররঙে করেছে আলো, একরঙ গোপনে রয়, চারদিকে লাল জহুরা।” (পবিত্র লালন- ৫৪২/৪)
১৮. “সবে বলে কালো কালো, কালো নয় সে চাঁদের আলো, সে যে কালাচাঁদ- নাই এমন চাঁদ, যে চাঁদের তুলনা তারি সনে।” (পবিত্র লালন- ৪৮৫/২)
১৯. “সাধক যদি হয় বিহারী, সাঁই আলোক হয় সবারি, কেউ মরা মরে না- ধরা সে দেয় না, ধরতে গেলে পালায় অচিনদেশে।” (পবিত্র লালন- ৭৭২/৩)
আলোর সংজ্ঞা (Definition of Light)
আকারী পদার্থাদি দৃষ্টিগোচর হওয়ার শক্তিকে আলো বলে।
আলোর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Light)
রূপক সাহিত্যে জ্ঞানকে রূপকার্থে আলো বলে।
আলোর প্রকারভেদ (Classification of Light)
আলো দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান আলো ও ২.উপমিত আলো।
১. উপমান আলো (Analogical Light)
আকারী পদার্থাদি দৃষ্টিগোচর হওয়ার শক্তিকে উপমান আলো বলে। যেমন- সূর্যরশ্মি।
২. উপমিত আলো (Compared Light)
রূপক সাহিত্যে জ্ঞানকে উপমিত আলো বলে।
আলোর পরিচয় (Identity of Light)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘উপমান পরিভাষা’ বিশেষ। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকায় এর ন্যূনাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এ পরিভাষাটি একেক গ্রন্থে একেক ভাষায় ব্যবহার হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠক-পাঠিকা ও শ্রোতাদের তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। সাধারণত আকারী পদার্থাদি দৃষ্টিগোচর হওয়ার শক্তিকেই আলো বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে জ্ঞানকে আলো বলা হয়। আলো ব্যতীত যেমন কোন কিছুই দেখা ও বুঝা যায় না তদ্রূপ জ্ঞান ব্যতীত কোন কিছুই জানা ও বুঝা যায় না।
এ জন্য জ্ঞানকে আলোর সাথে তুলনা করা হয়ে থাকে। উল্লেখ্য রূপক সাহিত্যে ব্যবহৃত আলো পরিভাষাটির দ্বারা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই জ্ঞান অর্থ প্রকাশ করে কিন্তু অত্যন্ত মজার বিষয় হলো বাংভারতের খুষ্কমুষ্ক শাস্ত্রীয় মতানুসারী প-িত আত্মতত্ত্বজ্ঞানহীন শাস্ত্রীয় মতানুসারী বক্তা, শাস্ত্রীয় মতানুসারী লেখক, গবেষক, অভিধানবেত্তা, অনুবাদক, বৈখ্যিক, টৈকিক ও আলোচকরা রূপক সাহিত্যের আলো পরিভাষাটির দ্বারা কেবল জ্যোতি গ্রহণ করে আসছেন দীর্ঘদিন হতে। ফলে মানবকল্যাণের জন্য নির্মিত বিশ্ববিখ্যাত শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদিও বর্তমানে মুখথুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে। সে জন্যই সারাবিশ্বে আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মরণকবলে পতিত হয়েছেন কেবল ঐশিবাদিরাই। আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মূল হোতা বলতে বিশ্ববাসী কেবল ঐশিবাদী ও অবতারবাদীদেরকেই চিনেন ও জানেন।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

শুক্রবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৪

গুরু (জ্ঞান- ৩য় পর্ব)

গুরু (৩০/১)
Preceptor (প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم’ (মুয়াল্লিম)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপক পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘জ্ঞান’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’
গুরু (রূপ)বি উপদেষ্টা, উপদেশক, শিক্ষক, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী, শাস্ত্রীয় জীবনের উপদেষ্টা, সাধনপন্থা নির্দেশক, সম্মানে বা বয়সে জ্যেষ্ঠ, মাননীয় ব্যক্তি, preceptor, ‘معلم’ (মুয়াল্লিম) বিণ ভারী, গুণসম্পন্ন, দুর্বহ, দায়িত্বপূর্ণ, কঠিন, মহান, দুরূহ, শ্রদ্ধেয়, মাননীয়, অতিশয়, অধিক (ব্যা) দীর্ঘ মাত্রাযুক্ত (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (.ﻋﻘﻝ), ইলিম (.ﻋﻟﻢ) (আভা) বিচারক (আদৈ) মুর্শিদ (.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘রূপক পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে গুরু বলা হয় ২.চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা রূপকার্থে গুরু বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
গুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Preceptor)
১. “আপনদেশের মধুরবাণী, গুরু আমায় শোনাও না, দেশবাসী কয় উল্টাকথা, সোজা করে শোনায় না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫)
২. “গুরু উপায় বলো না, জনমদুঃখী কপালপোড়া, গুরু আমি একজনা” (পবিত্র লালন- ৩৮৯/১)
৩. “ভবে লাফালাফি কর না, ওরে আমার পাগল মনা, ভাঙ্গবে এই রঙ্গ খানারে, গুরু বিনে কেউ রবে না” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৩)
গুরুর কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি
(Some ordinary quotations of Preceptor)
১. “গুরু উপায় কী আমার, কেমনে হব ত্রিবেণী পার” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯১)
২. “গুরুকৃপা যার হলো, ফুলের মূল সে চিনল, লালন মহাফেরে পড়ল, ভবের ভক্তিঘটে” (পবিত্র লালন-৩৪৮/৪)
৩. “ত্রিতাপ জ্বালায় পরাণ পুড়ে গুরু উপায় বল না, প্রেমজ্বালায় অঙ্গ জ্বলে মদনজ্বালা সহে না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৩৩)
৪. “সুখের নীড় স্বর্গপুরী, মাসান্তে আসে হুরী, গুরু দিলে মিলে সবারি, গুরু বিনে মিলে না ছাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩৮)
গুরুর সংজ্ঞা (Definition of Preceptor)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
গুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Preceptor)
চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা গুরু বলে।
গুরুর প্রকারভেদ (Classification of Preceptor)
গুরু চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু।
১. মানুষগুরু (Man preceptor)
মানুষগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Man preceptor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে। যেমন বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Man preceptor)
রূপক সাহিত্যে গুরুপদ প্রাপ্ত ব্যক্তির জ্ঞানকে গুরু বলে। যেমন সম্বিত।
মানুষগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Man preceptor)
১. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
২. “হক্বের ওপর থাকবে যখন, লাহুত মুক্বাম চিনবে তখন, এ সত্য জেনে ও মন, মানুষগুরু ধরলে না” (পবিত্র লালন- ৭৪২/৩)
৩. “গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
মানুষগুরুর প্রকারভেদ (Classification of Man preceptor)
মানুষগুরু দুই প্রকার। যথা- ১.আধ্যাত্মিক গুরু ও ২.জাগতিক গুরু।
১. আধ্যাত্মিক গুরু (Spiritual preceptor)
আত্মদর্শন বা পরাবিদ্যার শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকারীকে আধ্যাত্মিক গুরু বলে। যেমন- আত্মতাত্ত্বিক গুরু।
২. জাগতিক গুরু (Mundane preceptor)
বৈষয়িকবিদ্যা শিক্ষাদানকারী পণ্ডিতকে জাগতিক গুরু বলে। যেমন- বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর পরিচয় (Identity of Man preceptor)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয়। শুধু আকার ও আকৃতিধারী জ্ঞানীকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের ‘জ্ঞান’। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ মানুষগুরু হলো মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির ‘জ্ঞান’
পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়ায় সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
রক্তমাংসে নির্মিত মানুষকে গোঁসাই বা গুরু ভাবা, গোঁসাই বা গুরুর ছবি ধ্যান করা, গোঁসাই বা গুরুর মুখম-লের ধ্যান করা সর্বকালে সর্ব ঘরানাতেই নিষিদ্ধ ছিল, এখনো নিষিদ্ধ আছে এবং ভবিষ্যতেও নিষিদ্ধ থাকবে। যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ করে তারা একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই করে। আবার যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ ভাবে তারাও একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই ভাবে। এরূপ গোঁসাই গুরুর সঙ্গ পরিত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মতাত্ত্বিক সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
২. জগৎগুরু (Supreme preceptor)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Supreme preceptor)
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Supreme preceptor)
রূপক সাহিত্যে নাসিকার শ্বাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Supreme preceptor)
১. “অখ- ম-লাকারং ব্যাপ্তং সারাচরাচর, গুরু তুমি পতিতপাবন পরমও ঈশ্বর” (পবিত্র লালন- ৪২/১)
২. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
৩. “রণে, বনে, পাহাড়ে ও জঙ্গলে যেখানে আমাকে স্মরণ করবে সেখানেই আমাকে পাবে” (লোকনাথ)।”
জগৎগুরুর পরিচয় (Identity of Supreme preceptor)
রূপক সাহিত্যে বাতাস বলতে বায়ুম-লে চলমান বাতাস না বুঝিয়ে বরং নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বুঝানো হয়। নাসিকার শ্বাসরূপ জগৎগুরু ডান ও বাম গতি ধারণ করে সর্বসময় শিষ্য বা ভক্তকুলের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিষ্যগণকে জীবনের প্রতিটি কাজের শুভাশুভ সংবাদাদি প্রদান করে থাকেন। শ্বাসরূপ বাতাস বিশ্বব্যাপী বিরাজমান বলে রূপক সাহিত্যে তাকে জগৎগুরু বলা হয়।
মানুষগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে না কিন্তু জগৎগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারেন। উপরোক্ত উক্তিদ্বয় মানুষগুরুর ক্ষেত্রে কখনই প্রযোজ্য নয় বরং এসব উক্তি কেবল জগৎগুরু শ্বাস বা নাসিকার বাতাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ আমাদের নাসিকার শ্বাসরূপ গুরু বিশ্বের সর্বত্র সবার নিকটই একই সময়ে সমানভাবে অবস্থান করতে পারেন কিন্তু রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষগুরু বিশ্বের সর্বত্রই একই সময়ে সমানভাবে অবস্থান করতে পারেন না। শক্তি বিশ্বের সর্বত্রই সমানভাবে অবস্থান করতে পারে কিন্তু বস্তু বিশ্বের সর্বত্রই সমানভাবে অবস্থান করতে পারে না। কারণ শক্তি অসীম কিন্তু বস্তু সসীম। অথচ বস্তু ও শক্তির এসব সূত্রাদি না জানা এবং গুরুর প্রকারভেদ ও গুরুতত্ত্ব না জানা খুষ্কমূষ্ক পরম্পরা অনুরাগী ও খুষ্কমূষ্ক রূপক প-িতরা অযথায় যত্রতত্র তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। গভীরজ্ঞান বা আত্মতত্ত্বজ্ঞানের দৈন্যতাহেতু কুটতার্কিকদের তর্কবিতর্ক হতে অনেকক্ষেত্রে হাতাহাতি বা সমর-সংগ্রামেরও উৎপত্তি হতেও দেখা যায় মাঝে মাঝে।
৩. কামগুরু (Cupid)
কামগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Cupid)
শাস্ত্রীয়দের মতে কামের প্রতীতি মদনকে কামগুরু বলে।
কামগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Cupid)
রূপক সাহিত্যে পুরুষ জীবের শিশ্নকে কামগগুরু বলে।
কামগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Cupid)
১. “পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪)
২. “প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না” (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২)
৩. “প্রেমবাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১)
৪. “প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)
কামগুরুর পরিচয় (Identity of Cupid)
পৃথিবীর সব রূপক সাহিত্যে শিশ্নকে কামগুরু বা কামের দেবতা বলা হয়। কাম ব্যতীত যেমন জীবের প্রজন্ম টিকিয়ে রাখা যায় না তেমন কোন প্রজাতির জীব সাংসারিক, সামাজিক, দলবদ্ধ বা সঙ্ঘবদ্ধ হতেও পারে না। জীবের প্রজাতি টিকিয়ে রাখার জন্য কামশাস্ত্রে কামের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম তেমন কামযজ্ঞ পরিচালনার জন্য শিশ্নের গুরুত্ব আরো অপরিসীম। কামযজ্ঞ পরিচালনা করার গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করেই শিশ্নকে কামদেবতা বা কামপ্রতীতি বা কামগুরু বলা হয়। Indian mythology (ইন্ডিয়ান মিথোলোজি) তে শিশ্নকে শিব, মহাদেব, মদন, রাবণ, লম্বোদর, গণেশ ও দেবরাজ বলা হয়। অর্থাৎ Indian mythologyতে শিশ্নকে personification (পার্সোনিফিকেশন) বা anthropomorphism (এ্যান্থ্রোপামোফিজম) করে বলা হয় দেবরাজ। Indian mythology (ইন্ডিয়ান মিথোলোজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Jove (জোব), Greek mythology (গ্রিক মিথোলোজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Zeus (জিউস) এবং Roman mythology (রোমান মিথোলোজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Jupiter (জুপিটার)।
Jove [জোব] বি ইন্দ্র, দেবরাজ, Indra, Zeus, Jupiter, ‘إندرا’ (ইন্দ্রা), ‘شركة إندرا’ (শারিকাত ইন্দ্রা), ‘جوبيتر إله الرومان’ (জুবিদার ইলহা আররুমান) (প্র) পুরাণী মুনীষিদের মতে ঋকবেদের প্রধান দেবতা {}
Zeus [জিউস] বি দেবাধিপতি, মহাদেব, Jove, Jupiter, ‘زيوس’ (ঝিউস), ‘زوس’ (ঝুস), ‘زيوس كبير الآلهة’ (ঝিউস কাবির আলয়ালিহা) (প্র) প্রাচীন গ্রিক দেবরাজ বা দেবাধিদেব, গ্রিক পুরাণোক্ত দেবরাজ {}
Jupiter [জুপিটার] বি বৃহস্পতি, সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ, Jove, Zeus, ‘جوبيتر’ (জুবিতার), ‘المشترى’ (আলমুশতারি), ‘كوكب المشتري’ (কাওকাব আলমুশতারি), ‘جوبيتر كبير آلهة اليوناني’ (জুবিতার কাবির আলিহাত আলইউনানি) (প্র) রোমানদের দেবরাজ {}
পরিশেষে বলা যায় ভারতীয়দের দেবরাজ, গ্রিকদের দেবরাজ এবং রোমানদের দেবরাজই হলো আমাদের আলোচ্য কামগুরু শিশ্ন।
৪. পরমগুরু (Prime preceptor)
পরমগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Prime preceptor)
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Prime preceptor)
জীবজগতের পালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Prime preceptor)
১. “অনুরাগের তরণী করো, ধারা চিনে উজানে ধরো, লালন কয় করতে পারো, পরমগুরুর ঠিকানা” (পবিত্র লালন- ৮২৭/৪)
২. “আদিতত্ত্ব আত্মা ইন্দ্রিয় রাসুল বহন করে, মহাজ্ঞানীরা আপন আত্মা পায় দেখিবারে, তত্ত্বধারী হলে জ্ঞান- উপধর বলে জ্ঞানীগণ, বলন কয় পরমগুরু হলেন তিনি” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৭৩)
৩. “পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪)
৪. “পরমগুরু বড়ই রঙ্গিলা আমার মনভোলা, কত নামে ধরাধামে করে আকারে লীলাখেলা” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১১)
৫. “মানুষগুরুর প্রেমপণ্যারে- জগৎগুরু চলে ফিরে, ধরতে গেলে যায়রে দূরে- পরমগুরু কাছে রয়, মানুষগুরু হইলে সদয়- জগৎগুরু দেয় পরিচয়, জানতে হয় তা নিরালায়- ভক্তিভজন রেখে ভয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
৬. “ত্রিবেণীর ত্রিধারে, মীনরূপে গুরু বিরাজ করে, কেমন করে ধরবি তারে, বলরে অবুঝ মন” (পবিত্র লালন- ১৫৩/৩)
৭. “হলে অমাবতীর বার, মাটি রসে হয় সরোবর, সাধু গুরু বৈষ্টম তিনে, উদয় হয় সে যোগের দিনে” (পবিত্র লালন- ১৬২/২)
পরমগুরুর পরিচয় (Identity of Prime preceptor)
রূপক সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। সাঁই হলেন তরলমানুষ- যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেননি। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট, সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে পরমগুরু বলা হয়। এ পরমগুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “অনুরাগের তরণী করো, ধারা চিনে উজানে ধরো, লালন কয় করতে পারো, পরমগুরুর ঠিকানা” (পবিত্র লালন- ৮২৭/৪)
গুরুর কয়েকটি ইংরেজি পরিভাষা (Thesaurus words for guru)
abecedarian, angel, authority, boss, bwana, chief, doctor, dominie, educationist, educator, elder, fellow, goodman, husband, illuminate, instructor, intellectual, liege, lord, master, mentor, overlord, paramount, paterfamilias, patriarch, patron, pedagogue, philosopher, preceptor, professor,sage, saint, sapient, savant, scholar, seer, teacher, thinker, yogi.
গুরু পরিভাষাটির উৎপত্তি প্রসঙ্গ
(Origin context of the Guru terminology)
শিখ শাস্ত্রীয় যাজক নানক (১৫ এপ্রিল ১৪৬৯- ২২ সেপ্টেম্বর ১৫৩৯) সর্ব প্রথম গুরু পরিভাষাটি আবিষ্কার করেন। তারপর হতে শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ এ উপাধি ব্যবহার আরম্ভ করেন। তবে শাস্ত্রীয় শিখ প-িত ও বৈখ্যিকদের মতে গুরু মাত্র ১০জন। অবশিষ্ট সব অনুসারী। আর কেউ গুরু হতে বা গুরু উপাধি গ্রহণ করতে পারবে না। পরবর্তিকালে এ উপাধিটি ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
Title of the first 10 leaders of Sikhism.
The first was Nanak, who before his death (1539) began the tradition that allowed the Guru to name his successor. He was followed by 2.Angad (1539–1552) 3.Amar Das 4.Ramdas (1574–1581) 5.Arjan 6.Hargobind 7.Hari Rai 8.Hari Krishen (1661–1664) 9.Tegh Bahadur (1664–1675) and 10.Gobind Singh. In time the Guru became as much a military as a spiritual leader. Gobind Singh discontinued the office in 1708 and vested its authority in the Sikh sacred scripture, the Adi Granth.
গুরু নানকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (Short Introduction of Guru Nanak)
Guru Nanak is an Indian religious leader who founded Sikhism in dissent from the caste system of Hinduism; he taught that all men had a right to search for knowledge of God and that spiritual liberation could be attained by meditating on the name of God (1469-1539) [syn: {Nanak}]
গুরুতত্ত্ব (Preceptor mystery)
গোঁসাই বা গুরুতত্ত্ব অত্যন্ত কঠিন। এটি সাধক-গুরু বা সাধক-গোঁসাই ব্যতীত অন্য কেউ বুঝে না। ভারপ্রাপ্ত গোঁসাই-গুরু, ছেলেগুরু, নাতিগুরু, পুতিগুরু, ত্রোতিগুরু, গদিনশিনগুরু, জামাইগুরু, ভাইগুরু, ভগ্নীপতি-গুরু, মামাগুরু ও খালুগুরুর জানার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ আমাদের দেশে কেবল এসব গুরুর আমদানী অধিক। বর্তমানে সাধকগুরু নেই বললেও ভুল হবে না। এ কারণেই বর্তমানে পরম্পরা শিক্ষার এরূপ করুণদশা। যেমন মহাত্মা লালন সাঁইজি বলেছেন-
১. “মুর্শিদতত্ত্ব অথৈ গভীরে, চাররসের মূল সে রস, রসিক হলে জানতে পারে” (পবিত্র লালন- ৭৯৭/১)
২. “যার কালিমা দিন দুনিয়ায়, সে শিষ্য হয় কোন্ কালিমায়, লিহাজ করে দেখ মনোরায়, গুরুতত্ত্ব অথৈ গভীরে” (পবিত্র লালন- ৫৩০/২)
গুরুর পরিচয় (Identity of Preceptor)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘রূপক পরিভাষা’ বিশেষ। সাধারণত যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকেই গুরু বলা হয়। রূপক সাহিত্যে গুরু মোট চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু। এখানে উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন যে, দুই হতে চার ক্রম পর্যন্ত গুরুগুলো মানুষ নন তা পরিষ্কারভাবেই বুঝা যায়। কিন্তু এক ক্রম গুরুও কখনোই মানুষ নন। বরং প্রথম গুরুটি হলো মানুষগুরুর জ্ঞান। জগৎগুরু হলো বাতাস। আর বাতাস অর্থ নাসিকার শ্বাস। কামগুরু হলো মদন। আর মদন হলো শিশ্ন। পরমগুরু হলো সাঁই। আর সাঁই হলো সুধা। এবার বলা যায় চার প্রকার গুরু হলো- ১.জ্ঞান ২.শ্বাস ৩.শিশ্ন ও ৪.সুধা।
গুরুর গুরুর পরিচয় (Identity of preceptor of preceptor)
গুরুর গুরু হলো জ্ঞান। জ্ঞানের ঊর্ধ্বে আর কোন গুরু নেই। জ্ঞানই সব গুরুর শ্রেষ্ঠ গুরু। জ্ঞান এমনি এক সম্পদ যে এটি বহন করতে কোন প্রকার গাড়ি ঘোড়ার প্রয়োজন হয় না। মানুষগুরুর নিকট জ্ঞানরূপ শ্রেষ্ঠগুরু অবস্থান করে বলেই জ্ঞানী লোকগণকে গুরু বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে।
‘জয়গুরু’ বলার তাৎপর্য
(Significance to say ‘Guruwin’/ ‘Preceptorwin’Wink
গুরু চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু। এ চার প্রকার গুরুর মধ্যে কেবল জগৎগুরুর শুভসংবাস গ্রহণের সময়ই শিষ্যদের ‘জয়গুরু’ বলা প্রয়োজন।
কোন শিষ্য প্রথমে মানুষগুরুর নিকট শিক্ষাগ্রহণ করে জগৎগুরু ও পরমগুরুর সন্ধানলাভ করে। জগৎগুরু ও পরমগুরুকে চেনা ও জানার পর শিষ্যরা সর্বসময় জগৎগুরু ও পরমগুরুকে নিজের কাছে দেখতে পায়। জগৎগুরু শ্বাস কোন সংবাদ নিয়ে যখন কোন শিষ্যের নিকট উপস্থিত হন এবং কোন শিষ্য যদি তা অনুভব করতে পারে তবে সঙ্গে সঙ্গে শিষ্য তাঁকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করে থাকে। এ হতেই মানুষগুরু ও জগৎগুরু উভয় ক্ষেত্রেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার প্রথা উৎপত্তি হয়।
একজন পাকাগুরুই মানবজীবনের সর্বময় সুখ শান্তির মূল। এ জন্য গুরুর সুখই শিষ্যের সুখ। গুরুর শান্তিই শিষ্যের শান্তি। এ হতেই শিষ্যরা গুরু, দাদাগুরু, গুরুভাই, গুরুবোন ও গুরুমা সবার সম্বোধনেই ‘জয়গুরু’ বলে থাকে। ‘জয়গুরু’ অর্থ গুরুর জয় হোক। গুরু তো বিজয়ী। বিজয়ী না হলে তিনি তো গুরুই হতে পারতেন না। তবে বিজয়ীকে আবার জয়ী হওয়ার আশীর্বাদ করার কারণ কী? উত্তর হলো- এরূপ প্রশ্নের উত্তর হলো প্রত্যেক নর-নারীর নিকটই সর্বদা তিন-তিনজন করে গুরু অবস্থান করেন। এ জন্য শিষ্য-শিষ্যারা অন্য কাউকে আদৌ ‘জয়গুরু’ বলে কোন সম্বোধন করে না বরং প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিজের গুরুত্রয়কেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করে থাকে। প্রত্যেকের নিকট তিনজন করে গুরু বিদ্যমান থাকার অর্থ হলো পুরুষের নিকট সর্বদা অবস্থান করে ১.জ্ঞান, ২.শ্বাস ও ৩.শিশ্ন এবং নারীর নিকট সর্বদা অবস্থান করেন ১.জ্ঞান, ২.শ্বাস ও ৩.সাঁই। প্রত্যেক মানবের চারজন গুরুর মধ্যে পুরুষের নিকট থাকে না ‘সাঁই’ এবং নারীর নিকট থাকে না ‘শিশ্ন’। অর্থাৎ পুরুষের নিকট কখনো ‘সাঁই‘ থাকেন না এবং নারীর নিকট কখনই ‘শিশ্ন’ থাকে না। এ জন্য বলা হয় বিশ্বের প্রতিটি মানুষের নিকট সর্বদা তিনজন গুরু বিদ্যমান থাকে। ‘সাঁই’ যেমন সারাজগতের পরমগুরু তদ্রূপ ‘শিশ্ন’ সারাজগতের কামগুরু। এ জন্য প্রত্যেক মানুষের চারজন গুরুর কথা বলা হয়।
কামগুরুর কোন ভজন নেই। এ গুরুকে শাসন করাই ভক্তের কাজ। চারপ্রকার গুরুর মধ্যে কেবল কামগুরুকে শাসন করতে হয়। এ গুরু অটল না হওয়া পর্যন্ত একে ক্রমে ক্রমে শাসন করতেই হবে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪) ২.“প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২) ৩.“প্রেমবাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১) ৪.“প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)। পরমগুরুকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার নিয়ম পরম্পরা মতবাদে নেই। কারণ এ গুরু সবার ভাগ্যে মিলেও না আর যদিওবা মিলে তবে কেবল একে অন্যকেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করা হয় কিন্তু পরমগুরুকে কখনই সম্বোধন করা হয় না। সারকথা হলো কেবল মানুষগুরু ও জগৎগুরুকেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করা প্রয়োজন পক্ষান্তরে পরমগুরু ও কামগুরুকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার কোন প্রয়োজন নেই।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

জ্ঞানেন্দ্রিয় (জ্ঞান- ২য় পর্ব)

৩০/০. জ্ঞানেন্দ্রিয়
Sense organ (সেন্স ওর্গান)/ ‘حاسة’ (হাসসাত) ‘خناس’ (খুন্নাস)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ মূলকের অন্যতম একটি ‘সহযোগীমূলক’ সদস্য। এর প্রকৃতমূলক ‘জ্ঞান’, রূপক পরিভাষা ‘গুরু’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’। এটি ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীনস্থ একটি সহযোগী মূলক
জ্ঞান (রূপ)বি বুদ্ধি, চেতনা, পাণ্ডিত্য, বিদ্যা, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, অনুভবশক্তি, বিদ্যাবত্তা, পরমতত্ত্ব, বুঝা বা বিচার করার ক্ষমতা (আবি) বিচারক, পণ্ডিত, গুরু, উপদেষ্টা, দীক্ষক, দেশিক, মতবাদজীবনের উপদেষ্টা (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
জ্ঞানেন্দ্রিয় (রূপ)বি মানবদেহের অনুভূতিসম্পন্ন ইন্দ্রিয়, পঞ্চপিতা, Sense organ,, ‘حاسة’ (হাসসাত), sensors, ‘مجسات’ (মুজাসাত) ‘خناس’ (খুন্নাস) (আবি) পাণ্ডব, শিক্ষক (আপ) খান্নাস (আ.ﺨﻨﺎﺲ) (ইপ) minster (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘সহযোগীমূলক’ সদস্য ও রূপক সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) মানবদেহের জ্ঞানদাতা শক্তিকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু দিশারী (চাপ) বিজ্ঞানী (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
‘الْخَنَّاس’ [আলখান্নাস] বি কুমন্ত্রণাকারী, যে মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়, Whisperer {}
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Sense organ)
“الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ” “مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ” (মিন শাররি আলওয়াছওয়াছ আলখান্নাস) (আল্লাযি ইউওয়াসয়িসু ফি সুদুরি আন্নাস)(Min sharri alwaswasi alkhannas) (Allajee youwasisu fee sudoori annas). “সংবেদকদের কর্তব্যাকর্তব্য ক্ষতি হতে মুক্তি চাই।” “যারা মানুষের মনকে পরামর্শ প্রদান করে সদাই।” “From the scrupulosity evil of this sensors” “The psyche of mankind who whispers” (কুরান- সুরা নাছ-৪-৫)
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সংজ্ঞা (Definition of Sense organ)
জীবদেহের বোধসম্পন্ন সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়াদিকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলে। যেমন- চক্ষু ও কর্ণ।
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের উপকার (Benefits of Sense organ)
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের সাহায্যে জীবকুল জীবনযাপনের জ্ঞানপ্রাপ্ত হয়।
জ্ঞানেন্দ্রিয়ের পরিচয় (Identity of Sense organ)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির একটি ‘সহযোগীমূলক’ সদস্য বিশেষ। কোন কিছুর জ্ঞানদানকারী ইন্দ্রিয়াদিকে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলা হয়। জীবদেহের- ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহবা ও ৫.ত্বক- এ পঞ্চশক্তিকে রূপক সাহিত্যে একত্রে জ্ঞানেন্দ্রিয় বলা হয়। জ্ঞানেন্দ্রিই সারাবিশ্বের একমাত্র ঐশিশিক্ষক। জীবদেহের সূক্ষ্মশক্তিগুলোর সমষ্টিকেই পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় বলা হয়। এসব ইন্দ্রিয়ের কার্যক্রম ও শক্তি এতো ব্যাপক যে একেকটি জ্ঞানেন্দ্রিয়ের ওপর কয়েকটি গ্রন্থ লেখলেও শেষ হবে না। স্বর্গধামের যত প্রকার প্রতীতি মর্ত্যধামে কর্তব্যরত রয়েছেন তাদের মধ্যে এ পাঁচজনই অন্যতম। রূপক সাহিত্যে শ্রেষ্ঠ এ পঞ্চ প্রতীতিকে শ্রেষ্ঠ পাঁচজনও বলা হয়। মানুষের পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় পঞ্চ-প্রকার জ্ঞান প্রদান করে থাকে। যেমন- চক্ষু দর্শন-জ্ঞান, কর্ণ শ্রবণ-জ্ঞান, নাসিকা ঘ্রাণ-জ্ঞান, জিহ্বা স্বাদ-জ্ঞান ও ত্বক মানুষকে শীত-গ্রীষ্ম জ্ঞান প্রদান করে থাকে। এছাড়া মানুষের চক্ষু ও নাসিকা আরো দু’টি অতিন্দ্রীয় আধ্যাত্মিক-জ্ঞান প্রদান করে থাকে। যেমন- চক্ষু দূরদর্শন ও অতীত-ভবিষ্যতের জ্ঞান প্রদান করে থাকে। নাসিকা মানুষকে শুভাশুভ বা কার্যাদির আগাম ভালোমন্দ জ্ঞান প্রদান করে থাকে।
মানষের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে এসব ইন্দ্রিয়ের কার্য ক্ষমতাও ক্রমে ক্রমে হ্রাস পায়। এ জন্য রূপক সাহিত্যে একে ক্রমে ক্রমে দূরে গমনকারী বলা হয়। আলোচ্য মূলকের রূপক ও ব্যাপক পরিভাষাদি নিচে আলোচনা করা হলো।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি