শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০১৫

আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে গুরুর প্রকারভেদ

গুরু Preceptor (প্রিসিপ্টর)/ ‘معلم’ (মুয়াল্লিম)
————————————————————————
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপক পরিভাষা’। এর প্রকৃত-মূলক ‘জ্ঞান’, সহযোগী-মূলক ‘জ্ঞানেন্দ্রিয়’, উপমান পরিভাষা ‘আলো’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘সম্বিত’ ও ছদ্মনাম পরিভাষা ‘মানুষগুরু’
গুরু (রূপ)বি উপদেষ্টা, উপদেশক, শিক্ষক, দীক্ষক, দেশিক, দিশারী, শাস্ত্রীয় জীবনের উপদেষ্টা, সাধনপন্থা নির্দেশক, সম্মানে বা বয়সে জ্যেষ্ঠ, মাননীয় ব্যক্তি, Preceptor, ‘معلم’ (মুয়াল্লিম) বিণ ভারী, গুণসম্পন্ন, দুর্বহ, দায়িত্বপূর্ণ, কঠিন, মহান, দুরূহ, শ্রদ্ধেয়, মাননীয়, অতিশয়, অধিক (ব্যা) দীর্ঘ মাত্রাযুক্ত (আবি) জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, knowledge, আক্বল (আ.ﻋﻘﻝ), ইলিম (আ.ﻋﻟﻢ) (আভা) বিচারক (আদৈ) মুর্শিদ (আ.ﻤﺭﺷﺪ), পির (ফা.ﭙﻴﺭ) (ইদৈ) master, teacher (দেপ্র) এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের ‘রূপক পরিভাষা’ ও রূপক-সাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে গুরু বলা হয় ২.চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা রূপকার্থে গুরু বলা হয় (ছনা) মানুষগুরু (চাপ) সম্বিত (উপ) আলো (রূ) গুরু (দেত) জ্ঞান।
গুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Preceptor)
১. “আপনদেশের মধুরবাণী, গুরু আমায় শোনাও না, দেশবাসী কয় উল্টাকথা, সোজা করে শোনায় না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫)
২. “গুরু উপায় বলো না, জনমদুঃখী কপালপোড়া, গুরু আমি একজনা” (পবিত্র লালন- ৩৮৯/১)
৩. “ভবে লাফালাফি কর না, ওরে আমার পাগল মনা, ভাঙ্গবে এই রঙ্গ খানারে, গুরু বিনে কেউ রবে না” (বলন তত্ত্বাবলী- ২২৩)
গুরুর কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of Preceptor)
১. “গুরু উপায় কী আমার, কেমনে হব ত্রিবেণী পার” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯১)
২. “গুরুকৃপা যার হলো, ফুলের মূল সে চিনল, লালন মহাফেরে পড়ল, ভবের ভক্তিঘটে” (পবিত্র লালন-৩৪৮/৪)
৩. “ত্রিতাপ জ্বালায় পরাণ পুড়ে গুরু উপায় বলো না, প্রেমজ্বালায় অঙ্গ জ্বলে মদনজ্বালা সহে না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৩৩)
৪. “সুখের নীড় স্বর্গপুরী, মাসান্তে আসে হুরী, গুরু দিলে মিলে সবারি, গুরু বিনে মিলে না ছাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩৮)
গুরুর সংজ্ঞা (Definition of Preceptor)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকে গুরু বলে।
গুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Preceptor)
চিত্তপটে সঞ্চিত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্যাদিকে জ্ঞান বা গুরু বলে।
গুরুর প্রকারভেদ (Classification of Preceptor)
গুরু চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু।
১. মানুষগুরু/ Inductor (ইন্ডাক্টর)/ ‘مغو’ (মোগু)
মানুষগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Inductor)
মানুষ আকারধারী যে মহান মনীষী সাধারণ মানুষকে জ্ঞান শিক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলে। যেমন বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Inductor)
রূপক-সাহিত্যে গুরুপদ প্রাপ্ত ব্যক্তির জ্ঞানকে গুরু বলে। যেমন সম্বিত।
মানুষগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Inductor)
১. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
২. “হক্বের ওপর থাকবে যখন, লাহুত মুক্বাম চিনবে তখন, এ সত্য জেনে ও মন, মানুষগুরু ধরলে না” (পবিত্র লালন- ৭৪২/৩)
৩. “গুরু যার থাকে সদয়, শমন বলে কিসের ভয়, লালন বলে মন তুই আমায়, করলি দুষি” (পবিত্র লালন- ১৪৩/৪)
মানুষগুরুর প্রকারভেদ (Classification of Inductor)
মানুষগুরু দুই প্রকার। যথা- ১.আধ্যাত্মিক গুরু ও ২.জাগতিক গুরু।
১. আধ্যাত্মিক গুরু (Spiritual preceptor)
আত্মদর্শন বা পরাবিদ্যার শিক্ষাদীক্ষা প্রদানকারীকে আধ্যাত্মিক গুরু বলে। যেমন- আত্মতাত্ত্বিক গুরু।
২. জাগতিক গুরু (Mundane preceptor)
বৈষয়িকবিদ্যা শিক্ষাদানকারী পণ্ডিতকে জাগতিক গুরু বলে। যেমন- বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
মানুষগুরুর পরিচয় (Identity of Inductor)
যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাকে মানুষগুরু বলা হয়। শুধু আকার ও আকৃতিধারী জ্ঞানীকে মানুষগুরু বলা হয় না। মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির মধ্যে যে জ্ঞান রয়েছে প্রকৃতপক্ষে সে জ্ঞানকেই গুরু বলা হয়। কারণ জ্ঞান হলো নিত্য, অক্ষয়, অমর ও অনন্ত কিন্তু আকারধারী মানুষ অনিত্য ও ধ্বংসশীল। অর্থাৎ আকারধারী মানুষকে মানুষগুরু বলে সম্বোধন করলেও প্রকৃতপক্ষে মানুষগুরু হলো মানুষের ‘জ্ঞান’। গুরুদেবের জ্ঞানকে মানুষগুরু বলা হয়। অর্থাৎ মানুষগুরু হলো মানুষগুরুরূপ ব্যক্তির ‘জ্ঞান’
পিতা-মাতা, বড়ভাই, বড়বোন, শ্বশুর-শাশুড়ী, দাদা-দাদী, মামা-মামী ও সর্বশ্রেণির শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ সবাই প্রত্যেক মানুষের জন্য মানুষগুরু। যার নিকট হতে কোন জ্ঞানার্জন করা হয় তিনিই গুরু। আবার আধ্যাত্মিক দীক্ষকগণও মানুষগুরু। গুরুর কোন জাত নেই এবং গুরুর কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই। মানুষগুরু যে কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ বা যে কোন গোত্রের হতে পারেন। যে কোন মতবাদের বা যে কোন গোত্রের লোক তাঁর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। গুরু ভক্তের উদ্ধারকারী বা ত্রাতা। মানুষগুরু প্রকৃতগুরু নয়। প্রকৃতগুরু হলেন সাঁই। এ জন্য প্রকৃতগুরুর সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত একের পর এক মানুষগুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করে যাওয়ায় সব বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতগুরুর সন্ধানলাভ করার জন্য একাধিক গুরুর নিকট হতে জ্ঞানার্জন করা সর্বকালেই সিদ্ধ। প্রকৃতগুরুর সন্ধান পেয়ে গেলে মানুষগুরু আর পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই।
রক্তমাংসে নির্মিত মানুষকে গোঁসাই বা গুরু ভাবা, গোঁসাই বা গুরুর ছবি ধ্যান করা, গোঁসাই বা গুরুর মুখম-লের ধ্যান করা সর্বকালে সর্ব ঘরানাতেই নিষিদ্ধ ছিল, এখনো নিষিদ্ধ আছে এবং ভবিষ্যতেও নিষিদ্ধ থাকবে। যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ করে তারা একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই করে। আবার যে সব গোঁসাই বা গুরু এরূপ ভাবে তারাও একান্ত গুরুতত্ত্ব না জেনে ও না বুঝেই ভাবে। এরূপ গোঁসাই গুরুর সঙ্গ পরিত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গেই আত্মতাত্ত্বিক সাধকগোঁসাই বা সাধকগুরুর নিকট পুনঃদীক্ষা গ্রহণ করা সবার একান্ত প্রয়োজন।
২. জগৎগুরু Inhaler (ইনহ্যালার)/ ‘مستنشق’ (মুস্তানাশাক্ব)
জগৎগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Inhaler)
সারাবিশ্বে বিরাজিত বাতাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Inhaler)
রূপক-সাহিত্যে নাসিকার শ্বাসকে জগৎগুরু বলে।
জগৎগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Inhaler)
১. “অখণ্ড মণ্ডলাকারং ব্যাপ্তং সারাচরাচর, গুরু তুমি পতিতপাবন পরমঈশ্বর” (পবিত্র লালন- ৪২/১)
২. “গুরু চেনা সহজ নয়রে গুরু চেনা সহজ নয়, জগৎগুরু চিনতে গেলে মানুষগুরু ভজতে হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)।
৩. “রণে, বনে, জলে ও জঙ্গলে যেখানে আমাকে স্মরণ করবে সেখানেই আমাকে পাবে” (লোকনাথ)।”
জগৎগুরুর পরিচয় (Identity of Inhaler)
রূপক-সাহিত্যে বাতাস বলতে বায়ুম-লে চলমান বাতাস না বুঝিয়ে বরং নাসিকা যোগে চলাচলকারী শ্বাসকে বুঝানো হয়। নাসিকার শ্বাসরূপ জগৎগুরু ডান ও বাম গতি ধারণ করে সর্বসময় শিষ্য বা ভক্তকুলের সাথে সাথে অবস্থান করেন এবং প্রতিনিয়ত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শিষ্যগণকে জীবনের প্রতিটি কাজের শুভাশুভ সংবাদাদি প্রদান করে থাকেন। শ্বাসরূপ বাতাস বিশ্বব্যাপী বিরাজমান বলে রূপক-সাহিত্যে তাকে জগৎগুরু বলা হয়।
মানুষগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে না কিন্তু জগৎগুরু জগতের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারেন। উপরোক্ত উক্তিদ্বয় মানুষগুরুর ক্ষেত্রে কখনই প্রযোজ্য নয় বরং এসব উক্তি কেবল জগৎগুরু শ্বাস বা নাসিকার বাতাসের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ আমাদের নাসিকার শ্বাসরূপ গুরু বিশ্বের সর্বত্র সবার নিকটই একই সময়ে সমানভাবে অবস্থান করতে পারেন কিন্তু রক্তমাংসে গড়া একজন মানুষগুরু বিশ্বের সর্বত্রই একই সময়ে সমানভাবে অবস্থান করতে পারেন না। শক্তি বিশ্বের সর্বত্রই সমানভাবে অবস্থান করতে পারে কিন্তু বস্তু বিশ্বের সর্বত্রই সমানভাবে অবস্থান করতে পারে না। কারণ শক্তি অসীম কিন্তু বস্তু সসীম। অথচ বস্তু ও শক্তির এসব সূত্রাদি না জানা এবং গুরুর প্রকারভেদ ও গুরুতত্ত্ব না জানা খুষ্কমূষ্ক পরম্পরা অনুরাগী ও খুষ্কমূষ্ক রূপক প-িতরা অযথায় যত্রতত্র তর্কবিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। গভীরজ্ঞান বা আত্মতত্ত্বজ্ঞানের দৈন্যতাহেতু কুটতার্কিকদের তর্কবিতর্ক হতে অনেকক্ষেত্রে হাতাহাতি বা সমর-সংগ্রামেরও উৎপত্তি হতেও দেখা যায় মাঝে মাঝে।
৩. কামগুরু (Cupid)/ ‘صولجان’ (সাওলাজান)
কামগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Cupid)
শাস্ত্রীয়দের মতে কামের প্রতীতি মদনকে কামগুরু বলে।
কামগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Cupid)
রূপক-সাহিত্যে পুরুষ জীবের শিশ্নকে কামগগুরু বলে।
কামগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Cupid)
১. “পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪)
২. “প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না” (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২)
৩. “প্রেমবাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১)
৪. “প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)
কামগুরুর পরিচয় (Identity of Cupid)
পৃথিবীর সব রূপক-সাহিত্যে শিশ্নকে কামগুরু বা কামের দেবতা বলা হয়। কাম ব্যতীত যেমন জীবের প্রজন্ম টিকিয়ে রাখা যায় না তেমন কোন প্রজাতির জীব সাংসারিক, সামাজিক, দলবদ্ধ বা সঙ্ঘবদ্ধ হতেও পারে না। জীবের প্রজাতি টিকিয়ে রাখার জন্য কামশাস্ত্রে কামের গুরুত্ব যেমন অপরিসীম তেমন কামযজ্ঞ পরিচালনার জন্য শিশ্নের গুরুত্ব আরো অপরিসীম। কামযজ্ঞ পরিচালনা করার গুরুত্বের প্রতি লক্ষ্য করেই শিশ্নকে কামদেবতা বা কামপ্রতীতি বা কামগুরু বলা হয়। Indian mythology (ইন্ডিয়ান মিথোলজি) তে শিশ্নকে শিব, মহাদেব, মদন, রাবণ, লম্বোদর, গণেশ ও দেবরাজ বলা হয়। অর্থাৎ Indian mythologyতে শিশ্নকে personification (পার্সোনিফিকেশন) বা anthropomorphism (এ্যান্থ্রোপামোফিজম) করে বলা হয় দেবরাজ। Indian mythology (ইন্ডিয়ান মিথোলজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Jove (জোব), Greek mythology (গ্রিক মিথোলজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Zeus (জিউস) এবং Roman mythology (রোমান মিথোলজি) এর দেবরাজকে বলা হয় Jupiter (জুপিটার)।
Jove [জোব] বি ইন্দ্র, দেবরাজ, Indra, Zeus, Jupiter, ‘إندرا’ (ইন্দ্রা), ‘شركة إندرا’ (শারিকাত ইন্দ্রা), ‘جوبيتر إله الرومان’ (জুবিদার ইলহা আররুমান) (প্র) পুরাণী মুনীষিদের মতে ঋকবেদের প্রধান দেবতা {ই}
Zeus [জিউস] বি দেবাধিপতি, মহাদেব, Jove, Jupiter, ‘زيوس’ (ঝিউস), ‘زوس’ (ঝুস), ‘زيوس كبير الآلهة’ (ঝিউস কাবির আলয়ালিহা) (প্র) প্রাচীন গ্রিক দেবরাজ বা দেবাধিদেব, গ্রিক পুরাণোক্ত দেবরাজ {ই}
Jupiter [জুপিটার] বি বৃহস্পতি, সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ, Jove, Zeus, ‘جوبيتر’ (জুবিতার), ‘المشترى’ (আলমুশতারি), ‘كوكب المشتري’ (কাওকাব আলমুশতারি), ‘جوبيتر كبير آلهة اليوناني’ (জুবিতার কাবির আলিহাত আলইউনানি) (প্র) রোমানদের দেবরাজ {ই}
পরিশেষে বলা যায় ভারতীয়দের দেবরাজ, গ্রিকদের দেবরাজ এবং রোমানদের দেবরাজই হলো আমাদের আলোচ্য কামগুরু শিশ্ন।
৪. পরমগুরু Beverage (বেভ্যারিজ)/ ‘مشروبات’ (মাশরুবাত)
পরমগুরুর সংজ্ঞা (Definition of Beverage)
জীবের লালনপালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Beverage)
জীবজগতের পালনকর্তা সাঁইকে পরমগুরু বলে।
পরমগুরুর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Beverage)
১. “অনুরাগের তরণী করো, ধারা চিনে উজানে ধরো, লালন কয় করতে পারো, পরমগুরুর ঠিকানা” (পবিত্র লালন- ৮২৭/৪)
২. “আদিতত্ত্ব আত্মা ইন্দ্রিয় রাসুল বহন করে, মহাজ্ঞানীরা আপন আত্মা পায় দেখিবারে, তত্ত্বধারী হলে জ্ঞান- উপধর বলে জ্ঞানীগণ, বলন কয় পরমগুরু হলেন তিনি” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৭৩)
৩. “পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪)
৪. “পরমগুরু বড়ই রঙ্গিলা আমার মনভোলা, কত নামে ধরাধামে করে আকারে লীলাখেলা” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১১)
৫. “মানুষগুরুর প্রেমপণ্যারে- জগৎগুরু চলেফেরে, ধরতে গেলে যায়রে দূরে- পরমগুরু কাছে রয়, মানুষগুরু হইলে সদয়- জগৎগুরু দেয় পরিচয়, জানতে হয় তা নিরালায়- ভক্তিভজন রেখে ভয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯৬)
৬. “ত্রিবেণীর ত্রিধারে, মীনরূপে গুরু বিরাজ করে, কেমন করে ধরবি তারে, বলরে অবুঝ মন” (পবিত্র লালন- ১৫৩/৩)
৭. “হলে অমাবতীর বার, মাটি রসে হয় সরোবর, সাধু গুরু বৈষ্টম তিনে, উদয় হয় সে যোগের দিনে” (পবিত্র লালন- ১৬২/২)
পরমগুরুর পরিচয় (Identity of Beverage)
রূপক-সাহিত্যে সাঁইকে পরমগুরু বলা হয়। সাঁই হলেন তরলমানুষ- যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি। মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালনকারী সুমিষ্ট, সুপেয় ও শ্বেতবর্ণের জল। মাতৃজঠরে সর্ব জীবের ভ্রূণ লালনকারী অমৃতরসকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে পরমগুরু বলা হয়। এ পরমগুরু ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- “অনুরাগের তরণী করো, ধারা চিনে উজানে ধরো, লালন কয় করতে পারো, পরমগুরুর ঠিকানা” (পবিত্র লালন- ৮২৭/৪)
গুরুর কয়েকটি ইংরেজি পরিভাষা (Thesaurus words for guru)
abecedarian, angel, authority, boss, bwana, chief, doctor, dominie, educationist, educator, elder, fellow, goodman, husband, illuminate, instructor, intellectual, liege, lord, master, mentor, overlord, paramount, paterfamilias, patriarch, patron, pedagogue, philosopher, preceptor, professor,sage, saint, sapient, savant, scholar, seer, teacher, thinker, yogi.
গুরু পরিভাষাটির উৎপত্তি প্রসঙ্গ
(Origin context of the Guru terminology)
শিখ শাস্ত্রীয় যাজক নানক (১৫ এপ্রিল ১৪৬৯- ২২ সেপ্টেম্বর ১৫৩৯ খ্রিস্টাব্দ) সর্ব প্রথম গুরু পরিভাষাটি আবিষ্কার করেন। তারপর হতে শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিবর্গ এ উপাধি ব্যবহার আরম্ভ করেন। তবে শাস্ত্রীয় শিখ পণ্ডিত ও বৈখ্যিকদের মতে গুরু মাত্র ১০জন। অবশিষ্ট সব অনুসারী। আর কেউ গুরু হতে বা গুরু উপাধি গ্রহণ করতে পারবে না। পরবর্তীকালে এ উপাধিটি ক্রমে ক্রমে ভারতবর্ষসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
Title of the first 10 leaders of Sikhism.
The first was Nanak, who before his death (1539) began the tradition that allowed the Guru to name his successor. He was followed by 2.Angad (1539–1552) 3.Amar Das 4.Ramdas (1574–1581) 5.Arjan 6.Hargobind 7.Hari Rai 8.Hari Krishen (1661–1664) 9.Tegh Bahadur (1664–1675) and 10.Gobind Singh. In time the Guru became as much a military as a spiritual leader. Gobind Singh discontinued the office in 1708 and vested its authority in the Sikh sacred scripture, the Adi Granth.
গুরু নানকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (Short Introduction of Guru Nanak)
Guru Nanak is an Indian religious leader who founded Sikhism in dissent from the caste system of Hinduism; he taught that all men had a right to search for knowledge of God and that spiritual liberation could be attained by meditating on the name of God (1469-1539) [syn: {Nanak}]
গুরুতত্ত্ব (Preceptor mystery)
গোঁসাই বা গুরুতত্ত্ব অত্যন্ত কঠিন। এটি সাধক-গুরু বা সাধক-গোঁসাই ব্যতীত অন্য কেউ বুঝে না। ভারপ্রাপ্ত গোঁসাই-গুরু, ছেলেগুরু, নাতিগুরু, পুতিগুরু, ত্রোতিগুরু, গদিনশিনগুরু, জামাইগুরু, ভাইগুরু, ভগ্নীপতি-গুরু, মামাগুরু ও খালুগুরুর জানার তো প্রশ্নই আসে না। অথচ আমাদের দেশে কেবল এসব গুরুর আমদানী অধিক। বর্তমানে সাধকগুরু নেই বললেও ভুল হবে না। এ কারণেই বর্তমানে পরম্পরা শিক্ষার এরূপ করুণদশা। যেমন মহাত্মা লালন সাঁইজি বলেছেন-
১. “মুর্শিদতত্ত্ব অথৈ গভীরে, চাররসের মূল সে রস, রসিক হলে জানতে পারে” (পবিত্র লালন- ৭৯৭/১)
২. “যার কালিমা দিন দুনিয়ায়, সে শিষ্য হয় কোন্ কালিমায়, লিহাজ করে দেখ মনোরায়, গুরুতত্ত্ব অথৈ গভীরে” (পবিত্র লালন- ৫৩০/২)
গুরুর পরিচয় (Identity of Preceptor)
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘জ্ঞান’ পরিবারের অধীন একটি ‘রূপক পরিভাষা’ বিশেষ। সাধারণত যে মহান মনীষী মানুষকে নৈতিক শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন তাঁকেই গুরু বলা হয়। রূপক-সাহিত্যে গুরু মোট চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু, ২.জগৎগুরু, ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু। এখানে উল্লেখ করা একান্ত প্রয়োজন যে, দুই হতে চার ক্রম পর্যন্ত গুরুগুলো মানুষ নন তা পরিষ্কারভাবেই বুঝা যায়। কিন্তু এক ক্রম গুরুও কখনোই মানুষ নন। বরং প্রথম গুরুটি হলো মানুষগুরুর জ্ঞান। জগৎগুরু হলো বাতাস। আর বাতাস অর্থ নাসিকার শ্বাস। কামগুরু হলো মদন। আর মদন হলো শিশ্ন। পরমগুরু হলো সাঁই। আর সাঁই হলো সুধা। এবার বলা যায় চার প্রকার গুরু হলো- ১.জ্ঞান ২.শ্বাস ৩.শিশ্ন ও ৪.সুধা।
গুরুর গুরুর পরিচয় (Identity of preceptor of preceptor)
গুরুর গুরু হলো জ্ঞান। জ্ঞানের ঊর্ধ্বে আর কোন গুরু নেই। জ্ঞানই সব গুরুর শ্রেষ্ঠ গুরু। জ্ঞান এমনি এক সম্পদ যে এটি বহন করতে কোন প্রকার গাড়ি ঘোড়ার প্রয়োজন হয় না। মানুষগুরুর নিকট জ্ঞানরূপ শ্রেষ্ঠগুরু অবস্থান করে বলেই জ্ঞানী লোকগণকে গুরু বলে সম্বোধন করা হয়ে থাকে।
‘জয়গুরু’ বলার তাৎপর্য
(Significance to say ‘Guruwin’/ ‘Preceptorwin’Wink
গুরু চার প্রকার। যথা- ১.মানুষগুরু ২.জগৎগুরু ৩.কামগুরু ও ৪.পরমগুরু। এ চার প্রকার গুরুর মধ্যে কেবল জগৎগুরুর শুভসংবাস গ্রহণের সময়ই শিষ্যদের ‘জয়গুরু’ বলা প্রয়োজন।
কোন শিষ্য প্রথমে মানুষগুরুর নিকট শিক্ষাগ্রহণ করে জগৎগুরু ও পরমগুরুর সন্ধানলাভ করে। জগৎগুরু ও পরমগুরুকে চেনা ও জানার পর শিষ্যরা সর্বসময় জগৎগুরু ও পরমগুরুকে নিজের কাছে দেখতে পায়। জগৎগুরু শ্বাস কোন সংবাদ নিয়ে যখন কোন শিষ্যের নিকট উপস্থিত হন এবং কোন শিষ্য যদি তা অনুভব করতে পারে তবে সঙ্গে সঙ্গে শিষ্য তাঁকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করে থাকে। এ হতেই মানুষগুরু ও জগৎগুরু উভয় ক্ষেত্রেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার প্রথা উৎপত্তি হয়।
একজন পাকাগুরুই মানবজীবনের সর্বময় সুখ শান্তির মূল। এ জন্য গুরুর সুখই শিষ্যের সুখ। গুরুর শান্তিই শিষ্যের শান্তি। এ হতেই শিষ্যরা গুরু, দাদাগুরু, গুরুভাই, গুরুবোন ও গুরুমা সবার সম্বোধনেই ‘জয়গুরু’ বলে থাকে। ‘জয়গুরু’ অর্থ গুরুর জয় হোক। গুরু তো বিজয়ী। বিজয়ী না হলে তিনি তো গুরুই হতে পারতেন না। তবে বিজয়ীকে আবার জয়ী হওয়ার আশীর্বাদ করার কারণ কী? উত্তর হলো- এরূপ প্রশ্নের উত্তর হলো প্রত্যেক নর-নারীর নিকটই সর্বদা তিন-তিনজন করে গুরু অবস্থান করেন। এ জন্য শিষ্য-শিষ্যারা অন্য কাউকে আদৌ ‘জয়গুরু’ বলে কোন সম্বোধন করে না বরং প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিজের গুরুত্রয়কেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করে থাকে। প্রত্যেকের নিকট তিনজন করে গুরু বিদ্যমান থাকার অর্থ হলো পুরুষের নিকট সর্বদা অবস্থান করে ১.জ্ঞান, ২.শ্বাস ও ৩.শিশ্ন এবং নারীর নিকট সর্বদা অবস্থান করেন ১.জ্ঞান, ২.শ্বাস ও ৩.সাঁই। প্রত্যেক মানবের চারজন গুরুর মধ্যে পুরুষের নিকট থাকে না ‘সাঁই’ এবং নারীর নিকট থাকে না ‘শিশ্ন’। অর্থাৎ পুরুষের নিকট কখনো ‘সাঁই‘ থাকেন না এবং নারীর নিকট কখনই ‘শিশ্ন’ থাকে না। এ জন্য বলা হয় বিশ্বের প্রতিটি মানুষের নিকট সর্বদা তিনজন গুরু বিদ্যমান থাকে। ‘সাঁই’ যেমন সারাজগতের পরমগুরু তদ্রƒপ ‘শিশ্ন’ সারাজগতের কামগুরু। এ জন্য প্রত্যেক মানুষের চারজন গুরুর কথা বলা হয়।
কামগুরুর কোন ভজন নেই। এ গুরুকে শাসন করাই ভক্তের কাজ। চারপ্রকার গুরুর মধ্যে কেবল কামগুরুকে শাসন করতে হয়। এ গুরু অটল না হওয়া পর্যন্ত একে ক্রমে ক্রমে শাসন করতেই হবে। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজি লিখেছেন- ১.“পরমগুরু প্রেম পিরিতি, কামগুরু হয় নিজপতি, কাম ছাড়া প্রেম পায় কী গতি, তাই ভাবে লালন” (পবিত্র লালন- ২৬৫/৪) ২.“প্রেম প্রকৃতি স্বরূপসতী, কামগুরু হয় নিজপতি, ও মন অনুরাগী না হলে, ভজন সাধন হয় না (পবিত্র লালন- ৬৪৯/২) ৩.“প্রেমবাজারে কে যাবি, তোরা আয় গো আয়, প্রেমগুরু কল্পতরু, প্রেমরসে মেতে রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/১) ৪.“প্রেমের রাজা মদনমোহন, নির্হেতু প্রেম সাধনে শ্যাম, ধরে রাধার যুগলচরণ, প্রেমের সহচরী গোপীগণ, গোপীর দ্বারে বাঁধা রয়” (পবিত্র লালন- ৬৫১/২)। পরমগুরুকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার নিয়ম পরম্পরা মতবাদে নেই। কারণ এ গুরু সবার ভাগ্যে মিলেও না আর যদিওবা মিলে তবে কেবল একে অন্যকেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করা হয় কিন্তু পরমগুরুকে কখনই সম্বোধন করা হয় না। সারকথা হলো কেবল মানুষগুরু ও জগৎগুরুকেই ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করা প্রয়োজন পক্ষান্তরে পরমগুরু ও কামগুরুকে ‘জয়গুরু’ বলে সম্বোধন করার কোন প্রয়োজন নেই।
(সংক্ষিপ্ত)
তথ্যসূত্রঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৪র্থ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

দাজ্জাল বাস্তব প্রাণী নাকি বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য

দাজ্জাল বাস্তব প্রাণী নাকি বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য
(‘ﺪﺠﺎﻞ’/ Vampire real creatures or personality traits)
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পারস্য রূপক-সাহিত্যে ব্যবহৃত একটি রূপক পরিভাষা। এটি যেমন বাংলা পরিভাষা নয় তেমন এটি পবিত্র কুরানের কোথাও উল্লেখ নেই। প্রসঙ্গটি নিয়ে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন লেখা দেখা যায়। আবার ভিন্ন ভিন্ন আলোচনাও শোনা যায়। তাই আমরা এখানে পরিভাষাটির সামান্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। আশা করা যায় আমাদের এ ক্ষুদ্র বিশ্লেষণটি পারস্য রূপক-সাহিত্যে ব্যবহৃত ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) নামক রূপক পরিভাষাটির সঠিক অভিধাবোধ সৃষ্টি করতে সহায়তা করবে।
দজল [ﺪﺠﻝ] (রূপ)বি মিথ্যা, ঠেঁটামি, টেঁটনি, প্রতারণা, প্রবঞ্চনা বি মিথ্যুক, ঠেঁটা, টেঁটন, প্রতারক, প্রবঞ্চক {}
দজলাঃ [ﺪﺠﻠﺔ] (রূপ)বি ঠেঁটামি, টেঁটনি, প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, মিথ্যা বিণ ঠেঁটা, টেঁটন, প্রতারক, প্রবঞ্চক, মিথ্যুক (প্র) ১ ইরাকের বিখ্যাত নদী বিশেষ ২ মর্ত্যধাম হতে স্বর্গধামে গমনের একমাত্র নদী (আবি) বৈতরণী, গয়া, গণ্ডকী, গোদাবরী, ফল্গু, মন্দাকিনী, যমুনা, সুরধুনী, সুরনদী (ভাঅ) জননপথ, vagina, সাওয়া (আ.ﺴﻭﺀﺓ) (ইপ) canal (আপ) বরজখ (আ.ﺒﺮﺯﺥ) (দেপ্র) ১.এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘বৈতরণী’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপক-সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১ বর্তমান ইরাকের একটি বিখ্যাত নদীকে ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) বলা হয় ২ রূপক-সাহিত্যে ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত প্রলম্বিত স্ত্রী জননপথকে বৈতরণী বা রূপকার্থে ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) বলা হয় (ছনা) খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ (চাপ) ডাঙ্গা, বিরজা ও যমুনা (উপ) উঠান, দুয়ার ও পথ (রূ) নদী (দেত) বৈতরণী {}
দজলানদী (রূপ)বি প্রতারক নদী, প্রতারণাকারী নদী, প্রবঞ্চনাকারী নদী (ব্য্য) অমৃতসুধা প্রদান করবে বলে কামযজ্ঞে আমন্ত্রণ করে কিন্তু পরিশেষে অমৃতসুধা না দিয়ে ওপরন্ত প্রবঞ্চনা করে পুরুষের শুক্রসম্পদ অপহরণ করে নিয়ে যায় বলে রূপক-সাহিত্যে জননপথ বা বৈতরণীকে প্রতারণাকারী নদী বলা হয় (আবি) গয়া, ফল্গু, যমুনা, সুরধুনী, দজলাঃ (ﺪﺠﻠﺔ), বরজখ (আ.ﺒﺮﺯﺥ) (সংজ্ঞা) ১ বর্তমান ইরাকের একটি বিখ্যাত নদীকে ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) বলা হয় ২ রূপক-সাহিত্যে ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত প্রলম্বিত স্ত্রী জননপথকে বৈতরণী বা রূপকার্থে ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) নদী বলা হয় (ছনা) খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ (চাপ) ডাঙ্গা, বিরজা ও যমুনা (উপ) উঠান, দুয়ার ও পথ (রূ) নদী (দেত) বৈতরণী {.দজলা. ﺪﺠﻠﺔ +বাং.নদী}
নদী (রূপ)বি তটিনী, তরঙ্গিনী, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিনী, শৈবলিনী, সরিৎ, স্বাভাবিক জলস্রোত, চারক্রোশের অধিক বাহিনী জলনালি, পাহাড় হ্রদ প্রস্রবণ প্রভৃতি হতে উৎপন্ন ও নানা জনপদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত জলস্রোত (আবি) বিরজা, গয়া, ফল্গু, সুরধুনী, বৈতরণী হয় (ছনা) খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ (চাপ) ডাঙ্গা, বিরজা ও যমুনা (উপ) উঠান, দুয়ার ও পথ (রূ) নদী (দেত) বৈতরণী।
দজ্জাল [ﺪﺠﺎﻞ] ⇒ দাজ্জাল [ﺪﺠﺎﻞ]।
আরবি ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) হতে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির উদ্ভব হয়েছে। যেহেতু ‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ) এর অনুবাদ বাংভারতীয় যমুনা। সেহেতু যমুনার বর্ণনার পরে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) এর বর্ণনা তুলে ধরতে চাই। এখানে যমুনার বর্ণনা তুলে ধরা হলো।
যমুনা Lethe (লিদি)/ ‘دجلة’ (দাজলা)
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘বৈতরণী’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘চারিত্রিক পরিভাষা’। এর প্রকৃতমূলক ‘যোনিপথ’, রূপান্তরিত-মূলক ‘বৈতরণী’, রূপক পরিভাষা ‘নদী’, উপমান পরিভাষা ‘উঠান, দুয়ার ও পথ’, অন্যান্য চারিত্রিক পরিভাষা ‘ডাঙ্গা ও বিরজা’ ও ছদ্মনাম পরিভাষা ‘খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ’
যমুনা (রূপ)বি কালিন্দী, বাংলাদেশের নদী বিশেষ, উত্তর ভারতের নদী বিশেষ, খবঃযব, ‘دجلة’ (দাজলা), Tigris (প্র) ১.বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রসস্ত নদী বিশেষ ২.পুরাণোক্ত যমের বোন, সূর্যের কন্যা (আবি) গয়া, গণ্ডকী, গোদাবরী, ফল্গু, বিরজা, বৈতরণী, ব্রজ, ভবনদী, মন্দাকিনী, মায়ানদী, সুরধুনী ও সুরনদী (ভাপ) অযোধ্যা (আভা) উঠান, ডাঙ্গা, দুয়ার, খাল, নালা (ভাঅ) জননপথ, vagina, সাওয়া (আ.ﺴﻭﺀﺓ) (ইপ) canal (আপ) দজলা (ﺪﺠﻠﺔ), বরজখ (আ.ﺒﺮﺯﺥ) (দেপ্র) এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘বৈতরণী’ পরিবারের ‘চারিত্রিক পরিভাষা’ ও রূপক-সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদীকে যমুনা বলা হয় ২.ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত জননপথকে বৈতরণী বা রূপকার্থে যমুনা বলা হয় (ছনা) খাল, নালা ও যমুনা (চাপ) ডাঙ্গা, বিরজা ও সুড়ঙ্গ (উপ) উঠান, দুয়ার ও পথ (রূ) নদী (দেত) বৈতরণী।
Lethe [লিদি] বি বিস্মৃতি, অতীত বিস্মরণ, forgetting, oblivion, ‘النسيان نهر’ (আবি) যমুনা, গয়া, গণ্ডকী, গোদাবরী, পদ্মা, ফল্গু, বিরজা, বৈতরণী, ব্রহ্মপুত্র, মন্দাকিনী, সংযমনী, সুরধুনী ও সুরনদী (ব্য্য) যে নদীতে অবগাহন করে মানুষ তার অতীতকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে যায়, A river in Hades whose water when drunk made the psyche of the dead forget their life on earth (প্র) গ্রিক পুরাণোক্ত মৃত্যু-পুরীর বিস্মরণের নদী, নারকী অঞ্চলের একটি নদী। বিদেহী আত্মাদের বাধ্য করা হয় বিস্মৃতি উৎপাদন পান করতে বা তারা যা করেছিল সেসব কিছু ভুলে যেতে বা পৃথিবীতে জীবিত থাকাকালীন যা জানতো {}
“A slow and silent stream,
Lethe, the river of oblivion, rolls
Her watery labyrinth, whereof who drinks
Forthwith his former state and being forgets,
Forgets both joy and grief, pleasure and pain.” Milton.
যমুনার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি (Some highly important quotations of Lethe)
১. “কোথা সে নিকুঞ্জবন, কোথা সে যমুনা এখন, কোথা সে গোপীনিগণ, আহা মরি” (পবিত্র লালন- ৬৭৫)
২. “ডুব না জেনে ডুব দিতে গিয়ে, কতজনা প্রাণ হারায়, প্রেমযমুনায় নাইতে গিয়ে, ডুবে মরিল ডাঙ্গায়” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৬)
৩. “মরণের আগে মরিয়া যেজন সেথা গিয়াছে, অফুরন্ত গুদাম ঘরের মহাজনী পাইয়াছে, জরামৃত যমুনা পাড়ে- দুয়েকজনে যাইতে পারে, আখেটি আখেটক মারে, বলন কয় তুলনা নাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৬০)
যমুনার সাধারণ উদ্ধৃতি (Some ordinary quotations of Lethe)
১. “আমি কেন এলাম যমুনা ঘাটে, ঐ কালারূপ দেখলাম তটে, আমার কাঙ্খের কলসি কাঙ্খে রইল, দু’নয়নের জলে, কলসি ভেসে গেল” (পবিত্র লালন- ৫৬৩/২)
২. “আমায় ভিক্ষা ঝোলা দে সাজিয়ে, ওলো প্রাণসজনী, আমি জাত বেচিব মেঙ্গে খাবো, প্রেমযমুনার পানি” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৯)
৩. “একদিন গিয়েছিলাম সে যমুনার ঘাটে, কত কথা মনে পড়ল গো পথে, আমি রাধে সারানিশি কেঁদে কাটাই, তবু তো দেখা দিলো না” (পবিত্র লালন- ২৫১/২)
৪. “এনে মহাজনের ধন, বিনাশ করলি ক্ষ্যাপা, সদ্য বাক্বির দায় যাবি যমুনায়, হবেরে কপালে দায়মাল ছাপা” (পবিত্র লালন- ২২১/১)
৫. “এসো গো দয়াল বন্ধু শ্যাম কালাচাঁন, মনের বনে ফুল ফুটেছে, প্রেমযমুনায় ভরা বান” (বলন তত্ত্বাবলী- ৫৪)
৬. “গঙ্গা যমুনা আর সরস্বতী নদী, উঠেছে ঢেউ পাতাল ভেদি, পার হয়ে যাও, অকূল সমুদ্দরি” (পবিত্র লালন- ৭৭৪/২)
৭. “চাঁদ পাড়তে যমুনা ঘাটে, ডুবিস নারে মাথা কেটে, উদয়-অস্ত প্রতিমাসে, ভেদ জেনে ভাঙ্গরে বসে, ঐ চাঁদে জগৎ উজ্বালা, বলন কয় তুলনা নাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৩২)
৮. “চামকুঠরী প্রেমযমুনা, মৎস্য ধরাই উপাসনা, মিঠাবারি প্রেমমালখানা, মৎস্য চলে কফিন পরা” (বলন তত্ত্বাবলী- ১)
৯. “তোরা যদি দেখিস কালারে, বলে দে খবর আমারে, নইলে আমি প্রাণ ত্যাজিব যমুনার জলে, কালার আশায় জীবন গেল একাকী” (পবিত্র লালন- ৩২৪/৩)
১০. “দয়াল তোমার নাম নিয়ে, তরী ভাসালাম যমুনায়, তুমি নাবিক পারের মালিক, সে আশায় চড়েছি নায়” (পবিত্র লালন- ৫১১/১)
১১. “প্রেমযমুনা চৌদ্দভুবন, তিনঘাটে রয় তিনজন, মাঝখানে স্বরূপ কিরণ, ভাসছে সে নীরাকারে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩০০)
১২. “প্রেমযমুনার মিষ্টিজল, স্বরূপ কী চিনলি না, দেখ দেখ প্রেমযমুনায়, চলছে সেথা ত্রিঝরণা” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮৮)
১৩. “প্রেমযমুনার মিষ্টি পানি, সাধু গোঁসাই খায়রে শুনি, অধীন বলনকে দাও আনি, গুরু তোমায় ভজিবার” (বলন তত্ত্বাবলী- ৯১)
১৪. “ফাঁদ পাতিয়া মানুষ ধরে প্রেমযমুনার ত্রিপুরে, মানুষ ধরে ভোর-দুপুরে জেলখানায় রাখে ভরে” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৯০)
১৫. “বলাই যাসনে যমুনা ঘাটে, নিবে তোর মাথা কেটে।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৯৮)
১৬. “বান এলে প্রেমযমুনায়, ধ্যান রাখলে মণিকোঠায়, বলন কাঁইজি বলে তাই, পাবি সে জল কৌশলে” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১৬)
১৭. “বৃন্দাবনের মাখন ছানাই, পেট তো ভরে নাই, নৈদে এসে দই চিড়াতে ভুলেছে কানাই, যার বেণুর সুরে ধেনু ফিরে, যমুনার জল উজান ধায়” (পবিত্র লালন- ৯৬১/৩)
১৮. “মণিপুরী প্রেমতরী, কোন্দিন হবে ক্ষীরধর, প্রেমযমুনার ত্রিমোহনায়, শ্যামবন্ধুর ঘর” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৩১)
১৯. “মন তোর ত্রিবেণী ডিঙ্গিখানা, ভরা গাঙ্গে কেন বাইলি না, শুকায় গেলে প্রেমযমুনা, কী পাবিরে বাইলে তরী” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৭৯)
২০. “মনরে ত্রিধারা বয় এক নদেতে দেখ যমুনা পাড়ে, রক্তিম ধারা ওপরে বহে আর সাদা কালো ভিতরে, কোমল কোঠায় কর প্রণাম- সঙ্গে লয়ে গুরু ধিয়ান, কতজন হয় মহান- পেয়ে সেথা স্বরূপমনি” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৪)
২১. “যমুনার জলে আমি, স্নান করতে যাব না, মাথায় আছে কালো কেশ, তাও রাখব না, কালো কাজল ভালো নয়, যেজন নয়নে দেয়, কালসাপে দংশিলে, বিষে অঙ্গ জ্বলে যায়” (পবিত্র লালন- ৬৯১/২)
২২. “রূপ স্বরূপ চমৎকার লীলা আট প্রহরে চলে, হারায় মাণিক জন্মনালে সেই যমুনা শুকালে, বলন কয় দিন থাকতে- মিশে যাও গুরুর জাতে, এক জনমে এ ধরাতে- পাবিরে স্বরূপখনি” (বলন তত্ত্বাবলী- ২১৪)
২৩. “সাঁতার শিখলি না, প্রেমযমুনার ডুবুরী হলি না, বিল বাওড়ে ফাও ডুবালি, ঐ অথৈজলে নামলি না” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৮৮)
যমুনার সংজ্ঞা (Definition of Lethe)
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদীকে যমুনা বলে।
যমুনার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Lethe)
ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত স্ত্রী জননপথকে বৈতরণী বা রূপকার্থে যমুনা বলে।
যমুনার প্রকারভেদ (Classification of Lethe)
যমুনা দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান যমুনা ও ২.উপমিত যমুনা।
১. উপমান যমুনা (Analogical Lethe)
বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদীকে উপমান যমুনা বলে।
২. উপমিত যমুনা (Compared Lethe)
ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত স্ত্রী জননপথকে বৈতরণী বা উপমিত যমুনা বলে।
যমুনার পরিচয় (Identity of Lethe)
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘বৈতরণী’ পরিবারের অধীন একটি ‘চারিত্রিক পরিভাষা’ বিশেষ। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকায় এর ন্যূনাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এ পরিভাষাটি একেক গ্রন্থে একেক ভাষায় ব্যবহার হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠক-পাঠিকা ও শ্রোতাদের তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। সাধারণত বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রশস্ত নদীকে যমুনা বলা হয় কিন্তু রূপক-সাহিত্যে ভগ হতে ভৃগু পর্যন্ত স্ত্রী জননপথকে বৈতরণী বা রূপকার্থে যমুনা বলা হয়। স্বর্গীয়নদী বৈতরণী যেরূপ মানুষের দ্বারা সৃষ্টি নয় বরং প্রতীতিদের দ্বারা সৃষ্টি তদ্রূপ যমুনাও মানুষের দ্বারা সৃষ্টি নয় বরং স্বর্গীয় প্রতীতিদের দ্বারা সৃষ্টি। এ জন্য যমুনাকে বৈতরণীর সাথে তুলনা করা হয়। অত্যন্ত বেদনার ব্যাপার হলো অধিকাংশ শাস্ত্রীয় মতানুসারী পণ্ডিত ও বক্তারা রূপক-সাহিত্যে ব্যবহৃত যমুনা বলতে কেবল বাংভারতের (বাংলাদেশ ও ভারত) যমুনা নদীকেই বুঝেন এবং বুঝিয়ে থাকেন।
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল)
এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য সারণির ‘বৈতরণী’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘চারিত্রিক পরিভাষা’। এর প্রকৃতমূলক ‘যোনিপথ’, রূপান্তরিতমূলক ‘বৈতরণী’, রূপক পরিভাষা ‘নদী’, উপমান পরিভাষা ‘উঠান, দুয়ার ও পথ’, অন্যান্য চারিত্রিক পরিভাষা ‘ডাঙ্গা, বিরজা ও যমুনা’ ও ছদ্মনাম পরিভাষা ‘খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ’
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) নামক দৈবিকাটি পারস্য রূপক-সাহিত্যের শাস্ত্রীয় বিশ্বাসমূলক একটি অনন্য দৈবিকা। এ দৈবিকাটিকে কেন্দ্র করে পারস্য সুবিজ্ঞ রূপকারগণ অসংখ্য লৌকিকা নির্মাণ করেছেন। সুমহান ও সুবিজ্ঞ রূপকারগণ কর্তৃক নির্মিত এরূপ অনন্য ও অনুপম লৌকিকাদি একত্র করেই সম্পাদিত হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত অগণিত মহাগ্রন্থ বা শাস্ত্রীয়গ্রন্থ। আরববিশ্বের অসংখ্য দৈবিকার মধ্যে আরবিভাষার ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটি একটি অনন্য ও অনুপম দৈবিকা। উক্ত সত্তাটির অলৌকিক গল্পকাহিনী জানার পর উক্ত পরিভাষাটির তথ্য, তত্ত্ব ও প্রকৃততাৎপর্য জানাও আমাদের একান্ত প্রয়োজন। এজন্য আলোচ্য পরিভাষাটির প্রকৃত সত্তা, অর্থ ও আত্মদর্শনের মূলক উদ্ঘাটনের জন্য নিচে কয়েকটি অভিধান অবিকল অনুরূপ বা হুবহু তুলে ধরা হলো। অতঃপর সম্যক পর্যালোচনা শেষে সঠিক সমাধান প্রদানের চেষ্টা করা হলো।
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির অনুবাদাদি
১. আরবি-বাংলা অভিধান (বাংলা একাডেমি)।
ﺪﺠﺎﻞ (দাজ্জাল)- প্রতারক, দাজ্জাল নামক খোদাদ্রোহী- যে পৃথিবীর শেষযুগে প্রকাশ পাবে।
২. আল-কাওসার (আধুনিক আরবি-বাংলা অভিধান)।
ﺪﺠﺎﻞ [দাজ্জাল] মহাপ্রতারক, তরবারীর ধার।
৩. উর্দু-বাংলা অভিধান (ফ’রহঙ্গ-ই-রব্বানি)।
ﺪﺠﺎﻞ (দজ্জাল) আঃ নাঃ পুং মিথ্যাবাদী, প্রতারক, একচক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তি, ইসা (আঃ) এর শত্রু বা প্রতিপক্ষ।
৪. আরবি ফার্সি তুর্কি হিন্দি উর্দু শব্দের অভিধান (বাংলা একাডেমি)।
দাজ্জাল বিণ মিথ্যাবাদী, দুর্দান্ত, অত্যাচারী, অবাধ্য, দস্যি, দুর্বিনীত, শাসনের বহির্ভূত বি একচোকা লোক- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে হযরত ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে {.ﺪﺠﺎﻞ}
৫. ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (বাংলা একাডেমি)।
দাজ্জাল বি কুরানীদের শাস্ত্রীয়বিশ্বাস অনুযায়ী দুর্দান্ত অত্যাচারী ব্যক্তি- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে বলে কথিত আছে বিণ মিথ্যাবাদী, দুর্দান্ত, অত্যাচারী, দুষ্ট, দস্যি, শাসনের বহির্ভূত {.ﺪﺠﺎﻞ}
বিভিন্ন অভিধানাদি হতে প্রাপ্ত পরিভাষা
বিণ প্রতারক, মিথ্যাবাদী, দুর্দান্ত, অত্যাচারী, দুষ্ট, দস্যি, অবাধ্য, দুর্বিনীত, মহাপ্রতারক বি তরবারীর ধার, শাসনের বহির্ভূত, একচক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তি, ইসা (আঃ)- এর শত্রু বা প্রতিপক্ষ, দাজ্জাল নামক খোদাদ্রোহী- যে পৃথিবীর শেষযুগে প্রকাশ পাবে, মুসলমানদের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী দুর্দান্ত অত্যাচারী ব্যক্তি- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে বলে কথিত আছে, একচোখা লোক- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে হযরত ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে।”
পর্যালোচনা (The discussion)
ওপরোক্ত পরিভাষাাদির মধ্যে একটিও আরবি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির প্রকৃত বাংলা অনুবাদ নয়। কারণ আরবি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটি আরবি দাজলা (ﺪﺠﻟﺔ) পরিভাষা হতে উদ্ভূত হয়েছে। আরবি দাজলা (ﺪﺠﻟﺔ) পরিভাষাটির অর্থ (প্র) দাজলা নদী, ইরাকের অন্তর্গত তাইগ্রিস নদী, ইরাকের বিখ্যাত দাজলা নদী (আবি) তটিনী, তরঙ্গিনী, স্রোতস্বিনী, প্রবাহিনী, শৈবলিনী, সরিৎ, স্বাভাবিক জলস্রোত ইত্যাদি। এ জন্য আরবি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির অর্থ নদী সম্বন্ধে হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তবে “বিণ প্রতারক, মিথ্যাবাদী, দুর্দান্ত, অত্যাচারী, দুষ্ট, দস্যি, অবাধ্য, দুর্বিনীত, মহাপ্রতারক” এ অংশটুকু রূপকানুবাদ বা ভাবার্থ এবং “বি তরবারীর ধার, শাসনের বহির্ভূত, একচক্ষুবিশিষ্ট ব্যক্তি, ইসা এর শত্রু বা প্রতিপক্ষ, দাজ্জাল নামক খোদাদ্রোহী- যে পৃথিবীর শেষযুগে প্রকাশ পাবে, মুসলমানদের শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী দুর্দান্ত অত্যাচারীব্যক্তি- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে বলে কথিত আছে, একচোখা লোক- যে ক্বিয়ামতের অব্যবহিত পূর্বে হযরত ইমাম মেহেদীর সময়ে জন্মগ্রহণ করে নিজেকে খোদা বলে দাবি করবে ও বহু লোকের ঈমান নষ্ট করবে”- এ অংশটুকু আরবি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির প্রকৃত-সত্তা বা অভিধা উদ্ঘাটনের জন্য পার্সিয়ান রূপক-সাহিত্য শিল্প দ্বারা নির্মিত রূপকলৌকিকা।
সমাধান (The solution)
দাজ্জাল [ﺪﺠﺎﻞ] (রূপ)বি দস্যু, লুণ্ঠক, তস্কর, দুর্দান্ত অত্যাচারী বিণ দস্যি, অবাধ্য, দুরন্ত, দুর্দান্ত, অশান্ত, নির্ভীক, অপহারক, দুর্বিনীত, অত্যাচারী, অসমসাহসী, প্রতারক, মিথ্যাবাদী, নির্যাতনকারী, হরণকারী, নিপীড়নকারী, নিষ্পেষণকারী, লুণ্ঠনকারী, অপহরণকারী, প্রবঞ্চক, বলপূর্বক অপহরণকারী, শাসনের বহির্ভূত, শক্তির দ্বারা পরদ্রব্য হরণকারী, ধারালো তরবারি (প্র) কুরানী মনীষীদের রূপক বর্ণনা মতে প্রলয়ক্ষণের পূর্বে এক চোখ অন্ধ একজন লোকের আবির্ভাব হয় এবং নিজকে বড় বলে ঘোষণা করে অনেক লোকের ক্ষতিসাধন করে। এ সময় চৈতন্যদেব (জ্ঞান) এর আগমন ঘটে এবং তার হাতে সে ধ্বংপ্রাপ্ত হয় (ব্য্য) ১ ভৃগু-সত্তার ত্রিধারারূপ তিনটি চোখ রয়েছে, একটি প্রকৃতির নিয়মে প্রতি মাসেই উম্মুক্ত হয় এবং অবশিষ্ট চোখদ্বয় বন্ধ থাকে। পারস্য রূপকারগণ বন্ধ চোখদ্বয়কে এক চোখ গণনা করে থাকেন এবং বন্ধ চোখটিকে অন্ধচোখ বলে অভিহিত করে থাকেন। তারা বলে থাকেন হিবাচী বা ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) এক চক্ষু কানা ২ নরজীবের শুক্রসম্পদ হরণ করে বলে হিবাচীকে দস্যু বলা হয় (আবি) যোনি, vagina, ফারজ (আ.ﻔﺮﺝ) (আঞ্চ) গুয়া, সেঁটা, গাঁড় (আভা) কানাই, করঙ্গ, অযোধ্যা, গোকুল, গোষ্ঠ, চিতা, চুলা, নৌকা, পাথর, ব্রজ (দেপ্র) এটি রূপক-সাহিত্যের বৈক্তিক- বৈশিষ্ট্য সারণির ‘কানাই’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপক-সাহিত্যের একটি প্রতীতি বিশেষ (ইপ) origin (আদৈ) মক্কা (আ.ﻤﻜﺔ), হামান (আ.ﻫﺎﻤﺎﻦ), হারুত (আ.ﻫﺎﺭﻮﺓ) (সংজ্ঞা) ১ সাধারণত সর্ব প্রকার লুণ্ঠককেই দস্যু বা ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) বলা হয় ২ রূপক-সাহিত্যে কবন্ধকে কানাই বা রূপকার্থে দস্যু বা ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) বলা হয় (ছনা) খাল, নালা ও সুড়ঙ্গ (চাপ) ডাঙ্গা, বিরজা ও যমুনা (উপ) উঠান, দুয়ার ও পথ (রূ) নদী (দেত) বৈতরণী {আরবি.‘ﺪﺠﻠﺔ’ (দজলাঃ)>}
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) সম্পর্কে ইঞ্জিলের লৌকিকা
“৩. কেউ যেন কোনভাবেই তোমাদের ভুল পথে নিয়ে না যায়, কারণ সেদিন আসবার আগে প্রভুর বিরুদ্ধে ভীষণ বিদ্রোহ হবে, আর সে ‘অবাধ্য-পুরুষ’ যে নরকী সে প্রকাশিত হবে।
৪. সাঁই বলে যা কিছু আছে সে সবার বিরুদ্ধে এবং সব উপাসনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে বড় করে দেখাবে, এমনকি সে কাঁইয়ের মন্দিরে বসে নিজেকে কাঁই বলে ঘোষণা করবে।
৫. আমি যখন তোমাদের কাছে ছিলাম, তখন এসব কথা যে তোমাদের বলতাম, তা কী তোমাদের মনে পড়ে না?
৬. সে ‘অবাধ্য-পুরুষ’ যাতে ঠিক সময়ের আগে প্রকাশিত হতে না পারে, সেজন্য যা এখন তাকে বাধা দিয়ে রাখছে, তা তো তোমরা জানো। তোমরা এও জানতে পেরেছ যে, ‘অবাধ্য-পুরুষ’ এব গোপন কার্যকলাপ এখনও চলছে।
৭. কিন্তু যিনি তাকে বাধা দিয়ে রাখছেন তিনি সরে না যাওয়া পর্যন্ত বাধা দিতেই থাকবেন। তারপরে সে ‘অবাধ্য-পুরুষ’ প্রকাশিত হবে।
৮. মহাত্মা কানীন তাঁর মুখের নিঃশ্বাসে তাকে ধ্বংস করবেন এবং তার মহিমাপূর্ণ উপস্থিতির দ্বারা তার শক্তি শেষ করে দিবেন।
৯. সে ‘অবাধ্য-পুরুষ’ যখন আসবে, তখন তার সঙ্গে থাকবে ব্যর্থশক্তি। সে শক্তি প্রকাশ পাবে সর্ব প্রকার মিথ্যা চিহ্ন এবং কুহক ও শক্তির কাজের মধ্যে।
১০. ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাওয়া লোকদের ঠকাবার সর্ব প্রকার দুষ্ট ছলনার মধ্যে। এ লোকেরা ধ্বংস হবে, কারণ মুক্তি পাবার জন্য তারা সত্যকে ভালোবাসেনি এবং তা গ্রহণও করেনি।
১১. এ জন্য প্রভু তাদের নিকট এমন এক শক্তি পাঠাবেন যা তাদের ভুল পথে নিয়ে যাবে, যেন তারা মিথ্যায় বিশ্বাস করে।
১২. ফলে যারা সত্যের ওপর বিশ্বাস না করে অন্যায় কাজে আনন্দ পেয়েছে, তাদের সবাইকে পুনর্জন্মে অপরাধী বলে ধরা হবে” (ইঞ্জিল, ২ থিষলিনীকীয়-২/৩-১২)
পবিত্র কুরানে তো কোথাও ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির কোন ব্যবহার নেই। ওপরোক্ত আলোচনার মধ্যেও ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির হুবহু ব্যবহার নেই। মহাগ্রন্থাদি হতে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটির হুবহু ব্যবহার তুলে ধরার জন্য আমরা পবিত্র ইঞ্জিল হতে আরো কিছু উদ্ধৃতি নিচে তুলে ধরব। “এ যুগের শেষে অর্থাৎ দ-ায়মান দিনে যে ‘জঘন্য লোকটা’ এ পৃথিবীতে দেখা দিবে পবিত্র ইঞ্জিল গ্রন্থে তাকেই ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) বলা হয়েছে (ইঞ্জিল, ইউহোন্না- ২/১৮-২২)
সে কাঁইয়ের দাসদের ওপর ভীষণ অত্যাচার করবে এবং তার উপাসনা করবার জন্য তাদের ওপর বল প্রয়োগ করবে। ইঞ্জিল গ্রন্থে তাকে ‘অবাধ্য পুরুষ’ নামেও ডাকা হয়েছে (ইঞ্জিল, ২ থিষলিনীকীয়-২/৩, ৬)
মহাত্মা কানীন যখন এ পৃথিবীতে মহিমার সাথে আবার ফিরে আসবেন তখন তিনি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) এর ওপর ধ্বংস অবতরণ করবেন এবং তাকে ও তার দলকে পরাজিত করবেন (কিতাবুল মোকাদ্দস, শব্দের অর্থ ও টীকা)
“১৮.সন্তানেরা, এ-ই শেষ সময়! তোমরা তো শুনেছ যে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) আসছে, কিন্তু আরো অনেক ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) এরই মধ্যে এসে গেছে। তাই আমরা বুঝতে পারছি যে এ-ই শেষ সময়! ১৯.এ ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) রা আমাদের মধ্যে থেকে বের হয়ে গেছে। তারা কিন্তু আমাদের লোক ছিল না। যদি তারা আমাদেরই হতো তবে আমাদের সঙ্গেই থাকত কিন্তু তারা বের হয়ে গেছে বলে বুঝা যাচ্ছে, তারা কেউই আমাদের নয়। ২০.তোমরা কিন্তু সে পবিত্রজনের নিকট হতে অভিষেক পেয়েছ অর্থাৎ আত্মা পেয়েছ এবং তোমরা সবাই সত্যকে জানতে পেরেছ। ২১.সত্যকে জানো না বলে যে আমি তোমাদের কাছে লেখলাম তা নয় কিন্তু তোমরা সত্যকে জানো এবং এও জানো যে, সত্য থেকে মিথ্যা আসে না। সে জন্যই আমি তোমাদের নিকট লেখলাম। ২২.যে বলে কানীন সত্য নন সে মিথ্যাবাদী ছাড়া আর কী? পিতা ও পুত্রকে যে অস্বীকার করে সে-ই তো ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) (ইঞ্জিল, ইউহোন্না- ২/১৮-২২)
বর্তমানে কুরানীরা যে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) নিয়ে অধিক বাড়াবাড়ি করে যাচ্ছে- কার্যত দেখা যায় সে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটি তাদের শাস্ত্রীয়গ্রন্থ পবিত্র কুরানের কোথাও উল্লেখ নেই। তারা ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) সম্পর্কে যা কিছু বলে বেড়াচ্ছে বা প্রচার করে যাচ্ছে তা সবই পবিত্র ইঞ্জিল (ﺍﻧﺠﻴﻝ) এর বাণী। যারা কুরান ছাড়া অন্য কোন গ্রন্থাদি মানে না, তারা আবার অন্যান্য গ্রন্থের বিবরণাদি নিয়ে এতো তোলপাড় করে কিজন্য, তা এখন ভাববার সময় এসেছে। সময় এসেছে তলিয়ে দেখার। একটি অদ্ভূতজন্তুর আবির্ভাব হওয়া সম্পর্কে পবিত্র কুরানে যে বর্ণনাটি পাওয়া যায় তা এরূপ- “وَإِذَا وَقَعَ الْقَوْلُ عَلَيْهِمْ أَخْرَجْنَا لَهُمْ دَابَّةً مِنْ الْأَرْضِ تُكَلِّمُهُمْ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا بِآيَاتِنَا لَا يُوقِنُونَ” অর্থ- “যখন তাদের প্রতিশ্রুত সময় আসবে, তখন আমরা ভূতল হতে একটি জীব বের করব- যা তাদের সাথে কথা বলবে, এ কারণে যে মানুষ আমাদের কথা বিশ্বাস করতো না” (কুরান, সুরা- নমল-৮২)
এ মন্ত্রটি দ্বারাও দাজ্জাল প্রমাণ হয় না।
দাজ্জালের পরিচয় (The identity of Vampire)
‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটি পারস্য রূপকারগণের আবিষ্কৃত রূপক-সাহিত্যের একটি পরিভাষা। বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্যাদির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী একটি সত্তাকে বুঝানোর জন্য এ পরিভাষাটির সৃষ্টি করা হয়েছে। বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য কয়েক হাজার রয়েছে। তার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী-সত্তা হলো জননপথ বা ‘হিবাচী’। যাকে যমদূতের নদী বলে নামকরণ করা হয়েছে রূপক-সাহিত্যে।
হাস্যকর বিষয় হচ্ছে রূপক-সাহিত্যে ব্যবহৃত রূপক পরিভাষাগুলোকে বর্তমানে বাস্তব সত্তা বা বাস্তব চরিত্র মনে করে বাংভারতের কিছু কিছু লোক ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) ব্যবসা আরম্ভ করেছে। ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল)-বাজরা ও ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) ব্যবসায়ীরা কী একবারও ভেবে দেখে না যে, নাটক, গল্প, কাহিনী, উপন্যাস, সারী, জারী, পালা, ছড়া ও বৈঠকীর মধ্যে রূপকথার বাঘ, সাপ, পরী, দৈত্য, দানব, অপ্সরা, কিন্নরী ও গন্ধর্ব থাকে। এসব তো রূপকথার জীব। বাস্তবে এদের অস্তিত্ব পূর্বেও যেমন ছিল না বর্তমানেও তেমন নেই।
বাংভারতীয় রূপক-সাহিত্যে যেমন রয়েছে- প্রজাপতি, গড়ুর ও রথ ইত্যাদি দৈবযান পারস্য রূপক-সাহিত্যেও তেমন রয়েছে- বোরাক ও রফরফ ইত্যাদি ঐশিযান।
Greek mythology এর মধ্যে যেমন- Acheron (অ্যাকেরন), Arethusa (আর্থিজা), Cocytus (কোসাইটাস), Oocytes (ওওসাইটিস), Lethe (লিদি), Olyras (ওলেরাস), Pactolus (প্যাক্টোলাস), Phlegethon (প্লেগেদন) ও Styx (স্টেক্স) ইত্যাদি স্বর্গীয় ও নারকী নদীর নাম পাওয়া যায়। তেমন বাংভারতের রূপক-সাহিত্যের মধ্যেও ১ অলকানন্দা, ইরাবতী, কালিন্দী, গঙ্গা, গণ্ডকী, গয়া, গোদাবরী, গোমতী, চন্দ্রভাগা, তমসা, তিস্তা, পদ্মা, ফল্গু, বিপাশা, বিরজা, বৈতরণী, ব্রহ্মপুত্র, ভাগীরথী, মন্দাকিনী, মেঘনা, যমুনা, শতদ্রু, সংযমনী, সরষু, সুরধুনী ও সুরনদী ২ কামনদী, প্রেমনদী, ভবনদী, মায়ানদী, রূপনদী ও স্বরূপনদী ইত্যাদি স্বর্গীয় ও নারকী নদীর নাম পাওয়া যায়। তেমনি পার্সিয়ানদের নির্মিত আউলিয়া, আম্বিয়া, সুলত্বানিয়া ও মুলুকিয়ার কাসাস, হিকায়াত ও আদাবুর রায়ায়াতের মধ্যে ফুরাত, দজলা ও নীলনদের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এসব একটিও বাস্তব নয়। সবই রূপকথার নদী। তবে রূপকথার এসব নদ-নদী পরিভাষার মূলক হচ্ছে জননপথ।
প্রকৃত বিষয় হচ্ছে দাজ্জাল, ইয়াঝুজ-মাঝুজ ও দাব্বাতুল-আরদ এসব হচ্ছে কুরানী মনীষীদের বিভিন্ন বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্যের বা একই বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্যের রূপক বর্ণনা। এগুলোর মূলক উদ্ঘাটন করা প্রত্যেক পাঠকের একান্ত কর্তব্য। এখানে দাজ্জাল কোন মানুষও নয় আবার কোন প্রাণীও নয়। দাজ্জাল হচ্ছে মানবদেহের একটি বৈক্তিক-মূলক। যার বাস্তব সত্তা হচ্ছে স্ত্রীদের জননপথ।
বিশ্বের সব ভাষায় অধিকাংশ মরমী সঙ্গীত এ হিবাচী নিয়েই রচিত। যেমন-
১. “কী সন্ধানে যাই সেখানে
মনেরমানুষ যেখানে
আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
দিবারাতি নাই সেখানে।
যেতে পথে কামনদীতে
পাড়ি দিতে ত্রিবেণে
কতো ধনীর ভারা যাচ্ছে মারা
পড়ে নদীর ঘোর তুফানে।
রসিক যারা পার হয় তারা
তারাই নদীর ধারা চিনে
তারা উজান তরী যাচ্ছে বেয়ে
তারাই স্বরূপ সাধন জানে।
লালন বলে ম’লাম জ্বলে
ম’লাম আমি নিশি দিনে
মনেরমানুষ ঘরে রেখে
কী ধন খুঁজো বনে বনে।” (পবিত্র লালন- ২৯৯)।
২. “উবুদ করা নদী দেখলাম ভাই
আসমানে তার তলি
কত জাহাজ মুল্লুক যাচ্ছে মারা
শুনে নদীর কলকলি।
জোয়ার এলে উঠে সোনা
অজোয়ারে উঠে লোনা
আচ্ছা মজার ফেলি।
ও সে রসিক মাঝি দিচ্ছে পাড়ি
অরসিক সব যাচ্ছে মরি
সদায় খেয়ে চুবু চুবানি।
লালন কয় সদায় থেকো অনুরাগে
হোসনে যেন খলখলি।” (পবিত্র লালন- ৭০৩)
৩. “মারিস না কানাই ওরে
যতনের এ বলাইরে।
চুরি করে ছয়টি চোরা
আমার বলাই পড়ে ধরা
মারিস নারে নিষ্ঠুর মারা
তোর অথৈ পারাপারে।
নেংড়া কেমনে চুরি করে
কেউ না নিলে সঙ্গে করে
দয়া নাই তোর অন্তরে
নির্মম কেন তুই এতরে।
তোরে জানাই ওরে কানাই
নির্দোষী আমার বলাই
বলন কয় পড়শি জ্বালায়
আমার বলাই চুরি করে।” (বলন তত্ত্বাবলী-২৫৫)
৪. “ডুব না জেনে ডুব দিতে গিয়ে
কতজনা প্রাণ হারায়
প্রেমযমুনায় নাইতে গিয়ে
ডুবে মরিল ডাঙ্গায়।
গ্রন্থে যার নাই নিদর্শনা
অরসিকে ভেদ জানে না
ভেদের কথা কইতে মানা
শিষ্য বিনে অশিষ্যায়।
নিঠাঁইয়েতে সাঁই পাড়িতে
কত ভরা ডুবে ডাঙ্গাতে
কেউ কেউ পায় সামান্যেতে
বিশ্বাসী গুরুর কৃপায়।
জলের মাঝে রয় অজলা
অথৈজলে লীলাখেলা
সুরসিকে মিলায় মেলা
ভাবিয়া কয় বলন তাই।” (বলন তত্ত্বাবলী-১২৬)
বৈক্তিক বৈশিষ্ট্যের মহাশক্তিধর এ বৈতরণী বা কানাইকে পারস্য রূপকারগণ ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) নামকরণ করেছেন। দাজ্জালকে (ﺪﺠﺎﻞ) বিভিন্ন উপাধিতে ভূষিত করার কারণাদি নিম্নরূপ। আরবি ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) পরিভাষাটিকে আমরা বাংলাভাষায় “হিবাচী” পরিভাষাটি দ্বারা অনুবাদ করে আলোচনা সামনে অগ্রসর করার চেষ্টা করেছি।
১. দাজ্জালকে (ﺪﺠﺎﻞ) মহাপ্রতারক বলার কারণ
হিবাচীকে মহাপ্রতারক বলা হয় এ জন্য যে, সে কামরিপুর সাহায্য নিয়ে ছলনা করে বা প্রতারণা করে নর-নারীকে কামরাজ্যে নিয়ে যায়। অতঃপর ভুলিয়ে ভালিয়ে জীবের শুক্রসম্পদ অপহরণ করে।
২. দাজ্জালকে (ﺪﺠﺎﻞ) মহাদস্যু বলার কারণ
হিবাচীকে মহাদস্যু বলা হয় এ জন্য যে, সে বৈতরণী ঘাটে দস্যুর মতো ওঁৎ পেতে বসে থাকে নরগণ কামপথ অতিক্রম করতে যাওয়া মাত্রই বল প্রয়োগ করেই শুক্রসম্পদ হরণ করে নিয়ে নেয়।
৩. দাজ্জালকে (ﺪﺠﺎﻞ) একচোখ কানা বলার কারণ
হিবাচীকে রূপক-সাহিত্যে ত্রিবেণী বা ত্রিবেণী বলে। ত্রিবেণীর তিনটি দ্বার। যথা- ১.রজদ্বার ২.সুধাদ্বার ও ৩.মধুদ্বার। পারস্য দরবেশদের মতে সুধাদ্বার ও মধুদ্বার বলে পৃথকপৃথক দ্বারের অস্তিত্ব ভৃগুপথে নেই। তবে সুধাধারা ও মধুধারা সময়ের ব্যবধানে ভৃগু-সত্তার একই দ্বার দ্বারায় প্রবাহিত হয়। এ জন্য তারা ধারণা করেন ভৃগু-সত্তার প্রকৃত দ্বার দু’টি। যথা- ১.রজদ্বার ও ২.সুধাদ্বার। প্রায় দশবছর বয়সের সময় প্রকৃতির নিয়মে আপনা হতেই রজদ্বারটি উম্মুক্ত হয়ে স্বায়ম্ভু-সত্তা রজধারা প্রবাহিত হয়। এ ধারা প্রবাহিত হওয়ার ফলেই অরজা বা কিশোরী রজস্বলা বা যুবতীরমণীতে পরিণত হয়। অতঃপর প্রতি মাসেই এ দ্বারটি উম্মুক্ত হয়ে স্রাবধারা প্রবাহিত হওয়া অব্যহত থাকে। কিন্তু সুধাধারা প্রবাহিত না হওয়াই সুধাদ্বারটি চিরবন্ধ থাকে। যেমন-
“আমার ঘরের চাবি পরের হাতে
কেমনে খুলে সে ধন
দেখব চোখেতে।
আপন ঘরে বোঝায় সোনা
পরে করে লেনা দেনা
আমি হলাম জনমকানা
না পাই দেখতে।
রাজি হলে দারওয়ানি
দ্বার খুলে দিবেন তিনি
তারে বা কৈ চিনি জানি
বেড়াই কুপথে।
এই মানুষে আছে রে ধন
যারে বলে মানুষরতন
লালন বলে পেয়ে সে ধন
পারলাম না চিনতে।” (পবিত্র লালন- ১৬)
কোন সুবিজ্ঞ সাধু সন্ন্যাসীর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করে পরাজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান অর্জন করার পরই সাধকগণ উক্ত গুপ্তদ্বারটি উম্মুক্ত করতে পারেন। ওপরোক্ত দ্বারদ্বয়কে পারস্য দরবেশগণ দুই চোখ বলে অভিহিত করেছেন। এ জন্য তারা উম্মুক্ত দ্বারটিকে সচল চোখ এবং বন্ধ বা গুপ্তদ্বারটিকে অন্ধ চোখ বলে উপমা নির্মাণ করেছেন। এ সূত্র ধরেই পারস্য দরবেশগণ বলে থাকেন ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) বা হিবাচীর এক চোখ কানা।
৪. দাজ্জালকে (ﺪﺠﺎﻞ) হযরত ইসা- এর শত্রু বলার কারণ
রূপক-সাহিত্যে কাঁই বা ব্রহ্মা বা আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) বা লড স্বয়ং জীবকুলের স্রষ্টা। তিনি জীবের মুক্তির জন্য যুগেযুগে স্বর্গধাম হতে আমাদের এ মর্ত্যধামে অবতরণ করেন। সাধু সন্ন্যাসীগণ বা রূপকারগণ মনে করেন যে, কাঁইয়ের দর্শনলাভ করাই জীবের একমাত্র মুক্তির পথ। কিন্তু কাঁইয়ের দর্শনলাভের একমাত্র প্রধান অন্তরায় হলো হিবাচী। বীরত্বের সাথে শুক্ররণে এক হাজার (১,০০০) বছর শুক্রপাতহীনভাবে পাশাখেলায় জয়ী না হলে তার জন্য কাঁইধামে গমনের গুপ্তপথটি উন্মোচন করা হয় না। এ জন্য কাঁই বা ইসা (ﻋﻴﺲٰ) ও সাধক ভক্তের সাথে দেখা করতে পারেন না। আবার যারা শুক্রপাত করে তখন কাঁই বা ইসা (ﻋﻴﺲٰ) সে শুক্রশক্তির দ্বারা জীব সৃষ্টি করে সে জীবকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। হিবাচী কাঁইকে একদিকে যেমন সাধক ভক্তের সাথে দেখা করতে দেয় না অন্যদিকে তেমন একটি জীবের সর্ব প্রকার দায় দায়িত্বের দায়ে কাঁই বা ইসাকে (ﻋﻴﺲٰ) আরো একজনমের জন্য আবদ্ধ করে। সে জন্যই বলা হয় হিবাচী কাঁই বা ইসা (ﻋﻴﺲٰ) এর শত্রু।
৫. শেষযুগে ‘ﺪﺠﺎﻞ’ (দাজ্জাল) বের হওয়ার কারণ
মানবদেহ সুগঠিত হওয়ার পর নরদেহে সর্বশেষে আগমন করে দাড়ি-মুচ এবং নারীদেহে সর্বশেষে আগমন করে বসিধ (জোয়ার) প্রতীতি। দাড়ি ও মুচ আগমন করে কৈশোরকালরূপ বিত্র প্রতীতিকে হত্যা করে নরগণের যৌবনের ঘোষণা প্রদান করে এবং বসিধ প্রতীতি আগমন করে কৈশোরকালরূপ বিত্র প্রতীতিকে হত্যা করে নারীগণকে যুবতী বা রজস্বলা বলে ঘোষণা প্রদান করে। বসিধ প্রতীতি আগমন না করলে কিশোরীরা যুবতী হয় না। এ জন্য কিশোরীদের হিবাচী প্রতীতি সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও তারা মৈথুনক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। নারীদেহের সর্বশেষে বসিধ প্রতীতির আগমন দ্বারা হিবাচী সর্বশেষে সক্রিয় হয় বলে রূপক-সাহিত্যে শেষযুগে তার বহিঃপ্রকাশ বলে উপাখ্যানাদি রচনা করা হয়।
৬. দাজ্জাল কর্তৃক (ﺪﺠﺎﻞ) মানুষ হত্যা করে আবার জীবিত করার রহস্য
জনৈক মরমীকবি লিখেছেন-
“কার ঘরের রমণী গো লাগে চিনিচিনি
কপালে তিলকের ফোটা চিকন গোয়ালিনী।
নারীর প্রেমে কেউ মজ না দুইদিন হীন আলেয়ায়
চাঁদ দেখিয়ে ফাঁদ পাতবে গলাতে রশি লাগায়
সাপের মতো ছোবল দিবে
সাজিয়া নাগিনী।”
হিবাচীর কাজ হলো কামরিপুর সহযোগিতায় নর ও নারীকে কামের প্রতি প্রলুব্ধ করা, অতঃপর নর ও নারীগণ যখন কামকেলিতে রতো হয় তখন শুক্রপাতরূপ আত্মহত্যা দ্বারা নরগণকে হত্যা করে মাত্র ৩০৯ দিন বা ১০ মাস ৯ দিনের ব্যবধানে তাকে পুনরায় জীবিত করে স্বর্গধামরূপ জঠর হতে মর্ত্যধামরূপ পৃথিবীতে প্রেরণ করা। যেমন-
“বাঘের ডাকে অন্তর কাঁপে মধুপুরের সেই ঘরে
কে যাবি শিকারে মানুষ কে যাবি শিকারে।
বাঘিনীর নাকটি বোঁচা কেউ তারে দিওনা খোঁচা
বাঘিনীর কোমর উঁচা চায় সে আড়ে আড়ে
যে শিকারী গিয়াছিল বাঘ ধরিবারে
কত শিকারী ধরে খেল গুলি-বন্দুক সহকারে।
শিকারীরা নিশিকালে নিরবে যাও জঙ্গলে
নিশানাটা ঠিক করিয়া বসে রও আড়ালে
এমন জোরে ছাড়ো গুলি এক গুলিতেই মরে
ধন্যরে শিকারী ব্যাটা ধন্য আমি বলি তারে।
শাহজালাল দরবেশে বলে যাবি যদি বাঘ জঙ্গলে
ভাবের বন্দুক প্রেমের গুলি হাতে নাওরে তুলে
পঞ্চস্থানে পঞ্চগুলি যে লাগাতে পারে
বাঘের সঙ্গে করলে পিরিত এক গুলিতে ঢলে পড়ে।” (মরমী কবি জালাল)
বিশ্বের বিভিন্ন রূপক-সাহিতে এর বিভিন্ন প্রকার নাম রয়েছে। কেউ বাঘ, কেউ নাগিনী, কেউ বৈতরণী, আবার কেউবা প্রেমনদীও বলেছেন। হিবাচীও একজন বিশিষ্ট প্রতীতি। হিবাচী প্রতীতি জীবকুলকে শুক্রপাতরূপ হত্যা দ্বারা হত্যা করে সন্তানরূপে জীবিত করেন। একমাত্র পাকা সাধক ভিন্ন কেউই তার ভীষণ আক্রমণের মরণকবল হতে আত্মরক্ষা করতে পারেন না।
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ
লেখকঃ বলন কাঁইজি

প্রথমপ্রহর (৬ পর্বের ১ম পর্ব)

সারাবিশ্বের সর্বপ্রকার আউল, বাউল, নাড়া, সাঁইজি ও কাঁইজিদের শাস্ত্রীয়, পারম্পরিক, মরমী ও আত্মতাত্ত্বিক গ্রন্থ গ্রন্থিকায় (বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, গীতা, ত্রিপিটক, তৌরাত, যাবুর, ইঞ্জিল, কুরান, হাদিস, লালন, জালাল ও বলন) বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্যের ৯৯টি মূলকের আলোচনা করা হয়। (এ ৯৯টি মূলকই হচ্ছে আধ্যাত্মিবিদ্যা বা আধ্যাত্মিকভাষার বর্ণ বা অক্ষর। ভাষা শিক্ষার জন্য যেমন বর্ণ বা অক্ষর শেখা আবশ্যক, আত্মতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিকবিদ্যা জানা ও বুঝার জন্য তেমন মূলক বা বৈক্তিক-বৈশিষ্ট্য জানা ও বুঝা আবশ্যক।) আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব বা আধ্যাত্মিক বিদ্যায় এর একেকটি মূলককে একেকটি ‘পরিবার’ বলা হয়। (একেকটি পরিবারের অধীনে ন্যূনতম ২টি হতে ৩,০০০টি পর্যন্ত সদস্য রয়েছে। সদস্যগুলোকে পরিবারের অধীনে অবলিগ (/) দিয়ে দেখানো হয়। যেমন- ৫২/১ ও ৫২/২ ইত্যাদি।) এ সূত্র ধরেই ‘প্রথমপ্রহর’ আধ্যাত্মিক বিদ্যার ৫২তম মূলক বা ৫২তম পরিবার। এ পরিবারের অধীনে মোট ৬টি সদস্য রয়েছে। এখানে কেবল ‘প্রথমপ্রহর’ এর আলোচনা করা হলো।
————————————————————————————————————————
৫২. প্রথমপ্রহর
First hours (ফাস্ট আওয়ারস)/ ‘ساعات الأولى’ (সায়াত আলয়াউয়াল)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলক-পরিবারের একটি অন্যতম ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘প্রথমপ্রহর’ পরিবার প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘ঊষা’ উপমান পরিভাষা ‘সকাল’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘আদিত্য’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘প্রতিপদ ও সোমবার’। এটি একটি ‘উপমান-প্রধান’ মূলক। এটি রূপকসাহিত্যে বহুল ব্যবহৃত একটি মূলক। রূপক সাহিত্যের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন পরিভাষায় এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। সে জন্য সহজে এটি পাঠক শ্রোতার দৃষ্টিগোচর হয় না।
প্রথমপ্রহর বি সকাল, প্রত্যুষ, ভোর, বিয়ান, first hours, ‘ساعات الأولى’ (সায়াত আলয়াউয়াল) (প্র) ১.পবিত্রতার প্রথম প্রহর ২.সাঁই আগমনের সময় (আবি) ঊষা, প্রতিপদ, Aurora, dawn, morning, (.ﻔﺠﺮ’ (ফাজারা), ‘.ﻆﻬﺮ’ (জোহর), ‘.ﻔﻟﻖ’ (ফালাক্ব), ‘.ﺼﺑﺢ’ (সুবহ) ‘.ﺑﺭﺍﺀﺓ’ (বারায়াত), ‘ফা.ﺸﺑﻰ ﺑﺭﺍﺀﺓ’ (শবেবরাত), ‘.ﺍﻮﻞ ﻮﻗﺖ’ (আওয়াল ওয়াক্ত) (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘প্রথমপ্রহর’ পরিবার প্রধান ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সব কিছুর প্রথম সময়কে প্রথমপ্রহর বলা হয় ২.রজস্বলাদের শুক্লপক্ষের প্রথম সাড়েতিন দিন সময়কে প্রথমপ্রহর বলা হয় (ছনা) প্রতিপদ (চাপ) আদিত্য (উপ) সকাল (রূ) ঊষা (দেত) প্রথমপ্রহর {বাং.প্রথম+ বাং.প্রহর}
প্রহর (রূপ)বি যাম, তিনঘণ্টা, দিনরাতের এক অষ্টমাংশ (আবি) সাড়েতিন দিন, ৮৪ ঘণ্টা সময়, ২৮দিনে ৮ প্রহর (প্র) ১.স্রাবণ্য ২.ঊষা ৩.নিশা ৪.ঊর্ধ্বা ৫.শংকা ৬.বিপদ ৭.নীরব ৮.নিরাপদ ও ৯.অর্যমা- দেহপঞ্জিকার এ নয়টি প্রহর বিশেষ।
Attototto vad 6
প্রথমপ্রহরের সংজ্ঞা (Definition of First hours)
কোন কিছুর প্রারম্ভিক সময়কেই প্রথমপ্রহর বলে।
প্রথমপ্রহরের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of First hours)
রজস্বলাদের রজস্রাব বিদায়ের পর পবিত্রতার প্রথম সাড়েতিন সময়কে প্রথমপ্রহর বলে।
প্রথমপ্রহরের সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন (Short Reports of the ‘First hours’Wink
মূলকঃ প্রথমপ্রহর।
রূপকঃ ঊষা।
উপমানঃ সকাল।
চারিত্রিকঃ আদিত্য।
ছদ্মনামঃ প্রতিপদ ও সোমবার।
প্রথমপ্রহরের আভিধানিক, রূপক, উপমান, চারিত্রিক ও ছদ্মনাম পরিভাষা তুলে ধরা হলো-
মূলক সদস্যঃ প্রথমপ্রহর।
রূপক পরিভাষাঃ ঊষা।
উপমান পরিভাষাঃ প্রত্যুষ, প্রভাত, প্রাতঃ, প্রাতঃকাল, প্রাহ্ন, বিয়ান, বিহান, বিহানবেলা, বেয়ান, বেয়ানবেলা, বেহান, বেহানবেলা, ভোর১ ও সকাল।
চারিত্রিক পরিভাষাঃ আদিত্য, আর্ক, বালশশী ও বালেন্দু।
ছদ্মনাম পরিভাষাঃ অক্ষয়তৃতীয়া, অরুণোদয়, উদয়কাল, দিনমুখ, পূর্বাহ্ন, প্রতিপদ, যমদ্বিতীয়া, সোমবার ও সোমপর্যায়।
বাংলা = ইংরেজি = আরবি
৫২. প্রথমপ্রহর (First hours/ ‘ساعات الأولى’ (সায়াত আলয়াউয়াল)
৫২/১. ঊষা (Aurora (অরোরা) ‘ﻔﺠﺮ’ (ফাজারা)
৫২/২. সকাল (Morning (মর্নিং) ‘صباح’ (সাবহা)
৫২/৩. আদিত্য (Helio (হিলিও) ‘شمسي’ (শামসি)
৫২/৪. প্রতিপদ (Retrograde (রিটরোগ্রেড) ‘تقهقري’ (তাক্বাহকুরি)
৫২/৫. সোমবার (Monday (মনডে) ‘ يوم الاثنين’ (ইয়াওমা আলইসনাইন)
প্রথমপ্রহরের ১টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(A highly important quotations of First hours)
“এরপর থেকে সে দক্ষিণালয়ের ওপর প্রত্যেক দিন নিয়মিতভাবে দুইটা করে ভেড়ার বাচ্চা দক্ষিণা দিবে, তার প্রত্যেকটার বয়স হবে একবছর। একটা দক্ষিণা দিতে হবে সকালবেলায় ও অন্যটা সন্ধ্যাবেলায়। প্রথম ভেড়াটির সঙ্গে এককেজি আটশত গ্রাম মিহি ময়দা প্রায় একলিটার সেচা জলপায়ের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে দক্ষিণা দিতে হবে” (তৌরাত, স্থানান্তর, ২৯/৩৮- ৪০)
প্রথমপ্রহরের প্রকারভেদ (Classification of First hours)
প্রথমপ্রহর তিন প্রকার। যথা- ১.সৌর প্রথমপ্রহর ২.পৌরাণিক প্রথমপ্রহর ও ৩.কৌরানিক প্রথমপ্রহর।
১. সৌর প্রথমপ্রহর (Solar First hours)
ভারতবর্ষের সুবিজ্ঞ রূপকার ও মরমী মনীষীগণের মতে আগে রাত এবং পরে দিনের সূচনা হয়। তাই তাঁরা আগে রাত ও পরে দিন গণনা করে থাকেন। যেমন- তাঁরা সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য দৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে রাত এবং সূর্য দৃশ্যমান হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে দিন গণনা করে থাকেন। অন্যদিকে বৈষয়িক মনীষীরা আগে দিন ও পরে রাত গণনা করে থাকেন। তাই তারা সূর্য দৃশ্য হওয়ার পর হতে আগে দিন গণনা করেন এবং সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পর হতে রাত গণনা করে থাকেন। এ সূত্র হতে তারা দুপরের পূর্বভাগকে দিনের প্রথমপ্রহর এবং পরবর্তী ভাগকে দ্বিতীয় প্রহর গণনা করে থাকেন। ঠিক তেমনি মধ্যরাতের পূর্বভাগকে রাতের প্রথমপ্রহর এবং পরবর্তী ভাগকে দ্বিতীয় প্রহর গণনা করে থাকেন।
২. পৌরাণিক প্রথমপ্রহর (Mythological First hours)
ভারতবর্ষের সুবিজ্ঞ রূপকার ও মরমী মনীষীগণের মতে আগে রাত এবং পরে দিনের সূচনা হয়। তাই তাঁরা আগে রাত ও পরে দিন গণনা করে থাকেন। যেমন- তাঁরা সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য দৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে রাত এবং সূর্য দৃশ্যমান হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে দিন গণনা করে থাকেন। আবার রূপক সাহিত্যে রজস্বলা রমণীদের রজকালকে রাত ও পবিত্রতাকে দিন ধরা হয়। এ জন্য দেখা যায় আগে রাত ও পরে দিনের উদয় হয়। তবে পরবর্তিকালের নীতিনির্ধারকরা বাংলা দিন গণনা আগে ও রাত গণনা পরে আরম্ভ করেন। তাই রূপকারগণ আবার বাংলা দিন গণনার সূত্রের সাথে সঙ্গতি রেখে উপমা নির্মাণ করার জন্য রজস্বলা রমণীদের পবিত্রতাকে গণনার প্রথমপ্রহররূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। অর্থাৎ ভারতবর্ষীয় পৌরাণিক রূপক সাহিত্য অনুযায়ী রজস্বলাদের পবিত্রতার প্রথমপ্রহর ঊষাকেই প্রকৃত প্রথমপ্রহর ধরা হয়।
৩. কৌরানিক প্রথমপ্রহর (Triadic First hours)
আরববিশ্বের সুবিজ্ঞ রূপকার ও মরমী মনীষীগণের মতে আগে রাত এবং পরে দিনের সূচনা হয়। তাই তাঁরা আগে রাত ও পরে দিন গণনা করে থাকেন। যেমন- তাঁরা সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য দৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে রাত এবং সূর্য দৃশ্যমান হওয়ার পর হতে আরম্ভ করে সূর্য অদৃশ্য হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে দিন গণনা করে থাকেন। রূপক সাহিত্যে রজস্বলা রমণীদের রজকালকে রাত ও পবিত্রতাকে দিন ধরা হয়। এ জন্য দেখা যায় আগে রাত ও পরে দিনের উদয় হয়। তাই রূপকারগণ আরবি দিন গণনার সূত্রের সাথে সঙ্গতি রেখে উপমা নির্মাণ করার জন্য রজস্বলা রমণীদের রজকালকে গণনার প্রথমপ্রহররূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। অর্থাৎ আরববিশ্বের কুরানী রূপক সাহিত্য অনুযায়ী রজস্বলাদের রজকাল স্রাবণ্যকেই প্রথমপ্রহর ধরা হয়। তবে সাধনের জন্য পবিত্রতার প্রথমপ্রহরই যে প্রকৃত প্রথমপ্রহর এ ব্যাপারে সারাবিশ্বের আত্মতাত্ত্বিকগণ একমত।
পরিশেষে বলা যায় বিভিন্ন প্রথম প্রহরের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু ভারতবর্ষীয় সাধুমত এবং পারস্য অলিমতের মধ্যে দুই প্রকার প্রথমপ্রহর লক্ষ্য করা যায়। ভারতবর্ষীয় সাধু মতে প্রথমপ্রহর পবিত্রতার সূচনা হতে আরম্ভ হয় কিন্তু পারস্য অলিদের মতে প্রথমপ্রহর রজস্বলাদের রজস্রাব আরম্ভ হওয়ার সময় হতে আরম্ভ হয়। তাই পারস্য অলিগণের মতে আগে রাত আসে- যেহেতু রজস্রাবকে সাধুবিদ্যায় রাত ধরা হয়। এবং ভারতবর্ষীয় সাধু ও সন্ন্যাসীগণের মতে আগে দিন আসে- যেহেতু পবিত্রতার ২৭ দিনকে দিন ধরা হয়। উল্লেখ্য বাংলা দিন গণনা করা হয় সকাল ৬টা হতে আরম্ভ করে পরের দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত। ইংরেজি দিন গণনা করা হয় রাত ১২টা হতে আরম্ভ করে পরের রাত ১২টা পর্যন্ত। আরবি দিন গণনা করা হয় সন্ধ্যা ৬টা হতে আরম্ভ করে পরের সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত।
প্রথমপ্রহরের উপকার (Benefits of First hours)
১. প্রথমপ্রহরে মানবদেহ হতে সাঁইয়ের সন্ধান পাওয়া যায়।
২. প্রথমপ্রহরে মৈথুন ক্রিয়ার সন্তান জন্ম হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকে না।
প্রথমপ্রহরের পরিচয় (Identity of First hours)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘প্রথমপ্রহর’ পরিবারের ‘মূলকসদস্য’ বিশেষ। রজস্বলা রমণীদের পবিত্রতার সর্বপ্রথম সাড়েতিন দিবসকে রূপক সাহিত্যে প্রথমপ্রহর বলা হয়। সুমহান আত্মতাত্ত্বিক মনীষীগণের মতে রজস্বলাদের রজস্রাব আরম্ভ হওয়ার সময় হতেই স্রাবণ্য প্রহরের সূচনা হয়। বসিধ বা সরস্বতী একপ্রহর অবস্থান করেই বিদায় গ্রহণ করেন। অতঃপর পবিত্রতার শুভ সুচনা হয়। এ পবিত্রতা বা পূর্ণিমার সর্বপ্রথম পর্যায় বা প্রহরকেই আত্মদর্শনে প্রথমপ্রহররূপে গণনা করা হয়। ফলে প্রথমপ্রহর বলতে দৈহিকপ্রহর গণনার দ্বিতীয়প্রহর বুঝায়। অর্থাৎ আত্মতাত্ত্বিকদের গণনা মতে রজস্রাবের দ্বিতীয় প্রহরই পবিত্রতার প্রথম হয়। এ গণনা মতে রজস্বলাদের রজকালীন সাড়েতিন দিন সময়কে রাত বা অমাবস্যা বলে। পরবর্তী পবিত্রতার ২৭দিন সময়কে পূর্ণিমা বা দিন বলে। ফলে আলোচ্য প্রথমপ্রহরকে দিনের প্রথমপ্রহর বুঝায়। অর্থাৎ আত্মতাত্ত্বিকদের গণনায় রজস্রাবের সূচনা হতে দ্বিতীয় প্রহর বা দিনের প্রথম সাড়েতিন দিন বা এক প্রথর সময়কেই প্রথমপ্রহর বলে বুঝানো হয়। এককথায় রজস্বলা রমণীদের পবিত্রতা আরম্ভ হওয়ার প্রথম সাড়েতিন দিন সময়কেই রূপক সাহিত্যের প্রথমপ্রহর বুঝায়। এটি জর্জিয়ান বা মায়া ক্যালেন্ডারের কোন গণনা নয় বরং এটি স্বয়ং দেহপঞ্জিকার গণনা। এ গণনা অনুযায়ী সারাবিশ্বের সব রূপক সাহিত্য নির্মাণ করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত রূপক সাহিত্যাদিই পরবর্তিকালে শাস্ত্রীয় গ্রন্থে পরিণত হয়। আলোচ্য মূলকের অন্যান্য ব্যাপক পরিভাষাদি নিচে আলোচনা করা হলো।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে

১৯. ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে
————————————————————-
“ভূতের বাড়ি নিমন্ত্রণে গুরু মরাগরু খেয়েছে
তার উল্টাপাল্টা কথায় বুঝি ভুতে ধরেছে।
স্বর্গ-মর্ত্য পাতাল জোড়া তিনভূতের করাল থাবা
পঞ্চভূতে করছে খেলা ফাঁক দিলে গোল খাবা
রক্তিমজলা দীঘির পাশে
মরাগরু উড়ে বাতাসে
মরে শেষে হায়-হুতাশে
মরা তার পিছু নিয়েছে।
তেমাথা রাস্তায় বসে কাপুরুষ পাইলে ধরে
জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করে
জোয়ান কী বালক বৃদ্ধ
একপাকে করে সিদ্ধ
কত করে ত্রিশূল বিদ্ধ
অমাবস্যার পরে সে।
ভূতের বাড়ির পশ্চিমে অন্ধকার যে কুঠরি
ঐ বন্দিশালে বন্দি রাখে মরামানুষ ধরি ধরি
করে মরা গরু ভজনা
বিচারপালা হয় সূচনা
বলন কয় সে ভেদখানা
জানাও গো আমার কাছে।”
সারমর্ম
বাংলাভাষার প্রখ্যাত গীতিকার, বিখ্যাত বাঙালী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি একটি উপমান প্রধান গীতিকাব্য। কাঁইজি এখানে টলন, ভ্রূণধারণ এবং প্রসব ইত্যাদি বিষয়ের সুনিপুণ ও সারগর্ভ আলোচনা তুলে ধরেছেন।
আমাদের মানবদেহ পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত বলে দেহকে ভূতের বাড়ি, গুরুর পিতার পতন হতেই গুরুর জন্ম বলে গুরুর মরাগরু ভোজন এবং উপমানপদ দ্বারা নির্মিত বর্ণনাকে গুরুর উল্টাপাল্টা কথা বলে অভিহিত করেছেন।
কাঁইজি ভূতের বাড়ির উপমান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন সেখানে স্বর্গ-মর্ত্য ও পাতাল অবধি তিনটিভূত থাবা ধরে থাকে। আবার সেখানে পঞ্চভূতের খেলা চলমান। সামান্য ত্রুটি হলেই বড় বিপদের মধ্যে পড়তে হবে। সেখানে লালজলের একটি দীঘি আছে তার ওপর মরাগরুও বাতাসে উড়তে থাকে। যে দেখে মরা তারই পিছু নেয়। অবশেষে সে ব্যক্তি হায়ঃ হায়ঃ করতে করতে মারা যায়। তারপর কাঁইজি বলেছেন ভূতত্রয় তেমাথা পথে বসে থাকে। দুর্বলপুরুষ পেলেই তারা আক্রমণ করে। তারপর ত্রিশূল দ্বারা হত্যা করে এবং মরামাথাদি বাতাস দ্বারা রান্না করে। তাদের আরো একটি বৈশিষ্ট হলো শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ এক চুলায় ও এক হাঁড়িতেই পাক করে। কাঁইজি ঐ ভূতত্রয়ের আরেকটি বৈশিষ্ট উল্লেখ করেছেন। সেটি হলো ভূতের বাড়ির পশ্চিমদিকে অত্যন্ত অন্ধকার একটি কুঠরি রয়েছে। মরা মানুষগুলো তারা সেখানে বন্দী রাখে। সেখানে মরারা মরাগরু খায়। যখনি কোন মরা মরাগরু খায় তখনি তাকে আবার মানবকুলে জনম নিতে হয়। মানবকুলে জনম নিলেই তাদের আবার নতুন করে সংসারের ঝায়ঝামেলা ঘাড়ে নিতে হয়। এ সংসারের দায়েই তাদের বিবেকের বিচারের সম্মুখীন হতে হয়। পরিশেষে বলা যায় শিষ্যের পক্ষে গুরুর নিকট এরূপ উপমান প্রধান গীতিকাব্য উপস্থাপন করা একেবারেই বিরল। এ জন্য নিঃসন্দেহে বলা যায় এ কাব্যটি অত্যন্ত উচ্চপর্যায়ের গীতি-কাব্যের মধ্যে অন্যতম হওয়ার অধিকার রাখে।
আত্মদর্শন
কাঁইজি এখানে ভূতের বাড়ি বলতে মানবদেহ, নিমন্ত্রণ বলতে যজ্ঞ আহ্বান, মরাগরু বলতে রতী, উল্টাকথা বলতে উপমানপদ, স্বর্গ বলতে বৈকুণ্ঠ, মর্ত্য বলতে বৈতরণী, পাতাল বলতে রমণী, তিনভূত বলতে ত্রিধারা, দিঘী বলতে বৈকুণ্ঠ, বাতাস বলতে শ্বাস, মরা বলতে সন্তান, তেমাথা বলতে ভৃগু, রাস্তা বলতে বৈতরণী, কাপুরুষ বলতে টল, চুলা বলতে বৈতরণী, মরামাথা বলতে বিম্বল, একপাকে সিদ্ধ বলতে কবন্ধের হাতে সবার মৃত্যু, ত্রিশূল বলতে ত্রিধারা, অমাবস্যা বলতে রজকাল, পশ্চিম বলতে নাম্ব, অন্ধকার কুঠরি বলতে বৈকুণ্ঠ, বন্দীশাল বলতে দেহ, বন্দী বলতে মানুষ, মরাগরু ভজন বলতে সন্তানপালন এবং বিচার বলতে ব্যক্তির যাবতীয় কার্যক্রমকে বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
অমাবস্যা, কাপুরুষ, কুঠরি, গরু, গুরু, গোল, চুলা, জোয়ান, তেমাথা, ত্রিশূল, দীঘি, পঞ্চভূত, পশ্চিম, পাতাল, বন্দী, বন্দীশাল, বাতাস, বালক, বৃদ্ধ, ভূত, মরা, মর্ত্য, মানুষ, সিদ্ধি, স্বর্গ। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
১.মরা গরু খাওয়া কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে সর্ব প্রকার জীব, শুক্রপাত, শুক্র ও সন্তানকে মরা বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি মরাগরু বলতে কেবল শুক্রপাতকেই বুঝিয়েছেন। অর্থাৎ কাঁইজি এখানে শুক্রপাত করাকে গুরুর মরাগরু খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
২.গুরুকে ভুতে ধরা কী?
উত্তর- গুরুর দেহ পঞ্চভূতে নির্মিত এবং গুরু সর্বদা পঞ্চভূতের আলোচনা করে থাকেন। এসব কারণে ঠেস মেরে বলা হয় গুরুকে ভুতে ধরেছে ও গুরু ভূতের ব্যাপারী ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রূপকথার ভুতে গুরুকে ধরবে বা গুরু কালোছায়ার কবলে পতিত হবেন এটা কল্পনাতীত।
৩.মর্ত্য ও স্বর্গ কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে দেহকে মর্ত্য এবং জ্ঞানকে স্বর্গ বা বৈতরণীকে মর্ত্য এবং বৈকুণ্ঠকে স্বর্গ বলা হয়। স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণের সূত্রটি নিচে দেওয়া হলো-
স্বর্গ-মর্ত্য নির্মাণ সূত্র
যখন শিষ্য মর্ত্য তখন গুরু স্বর্র্গ
যখন মন মর্ত্য তখন জ্ঞান স্বর্গ
যখন দেহ মর্ত্য তখন আত্মা স্বর্গ
যখন নারী মর্ত্য তখন নর স্বর্গ
যখন বৈতরণী মর্ত্য তখন বৈকুণ্ঠ স্বর্গ
যখন পাছধড় মর্ত্য তখন আগধড় স্বর্গ
৪.ভূত কত প্রকার?
উত্তর- ভূত দুই প্রকার। যথা- ১.ভূত ও ২.ভুত।
১.ভূত- জগৎসৃষ্টির আদি উপাদানকে ভূত বলে।
ভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
২.ভুত- রূপ কথার কালোছায়াকে ভুত বলে।
এটি অস্তিত্বহীন একটি সত্তা। কেবল কিছু কিংবদন্তি ব্যতীত এর কোন বাস্তবতা নেই। রূপকথার ভুত বলতে কালোছায়া, উপসর্গ ও প্রেতাত্মা ইত্যাদি বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে ভূত বলতে কেবল বিশ্বসৃষ্টির আদি-উপাদানাদিকে বুঝায়।
৫.পঞ্চভূত কী কী?
উত্তর- বিশ্বসৃষ্টির আদিউপাদানকে আদিভূত বা পঞ্চভূত বলা হয়। আদিভূত মোট পাঁচটি। যথা- ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ৪.বাতাস ও ৫.বিদ্যুৎ।
৬.গোল খাওয়া কী?
উত্তর- Goal (গোল) ইংরেজি শব্দ। এর অর্থ গন্তব্যস্থান, লক্ষ্য, অভিষ্ট, ‘পদগোলক’ খেলায় যে স্থানে গোলক প্রবেশ করাতে পারলে বিজয় অর্জন এগিয়ে যায়, বিজয় এগিয়ে নেওয়ার জন্য গোলক প্রবিষ্ট করানোর স্থান ইত্যাদি। সাধারণত মাঠের আবদ্ধ সীমানায় গোলক প্রবেশ করানোকে গোলক খাওয়া বা গোলক দেওয়া বুঝায় কিন্তু আলংকারিক অর্থে যে কোন বিপদের সম্মুখীন হওয়াকেই গোলক খাওয়া বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে সন্তানরূপে জন্মান্তরে যাওয়াকে গোলক খাওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
৭.রক্তিম-জলা দীঘি কী?
উত্তর- লালবর্ণের জলপূর্ণ দীঘিকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়। কুসুমিতাদের বৈকুণ্ঠ হতে প্রতি মাসেই রজরূপ লালজল নিঃসৃত হয়ে থাকে বলেই বৈকুণ্ঠকে রক্তিমজলা দীঘি বলা হয়।
৮.মরাগরু বাতাসে উড়া কী?
উত্তর- সাধারণত গরুর মড়ক বা শবকে মরাগরু বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও শুক্রপাতকে মরাগরু বলা হয়। নাসিকার শ্বাসের গতিবেগের দ্বারা শুক্ররূপ মরাগরু সৃষ্টি হয় বলে বলন কাঁইজি রূপকার্থে মরাগরু বাতাসে উড়ার কথা বলেছেন।
৯.মরার পিছু নেওয়া কী?
উত্তর- অনেক প্রকার মরার সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন- ১.প্রয়াণ ২.ঘুম ৩.অজ্ঞান ৪.দীক্ষাগ্রহণ ৫.পাণিগ্রহণ ৬.অখ-তা ৭.শুক্রধর ৮.শুক্রপাত ৯.সন্তানগ্রহণ ১০.কবন্ধ ১১.শিশ্ন ১২.সন্তান ১৩.বৈরাগ্য ১৪.সংযম ১৫.মড়ক ১৬.পরিত্যক্ত ১৭.শুকানো ও ১৮.বিপদগ্রস্থ ইত্যাদি। তবে এখানে কাঁইজি মরা পিছু নেওয়া বলতে কেবল অজ্ঞনতা শুক্রপাত ও বিপদগ্রস্থ হওয়ার কথাই বুঝিয়েছেন।
১০. তেমাথা কী?
উত্তর- তিনটি পথের মোড়কে তেমাথা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল ত্রিবেণীকে তেমাথা বলা হয়। ত্রিবেণী দ্বারা লাল, সাদা ও কালো এ তিনটি ধারা প্রবাহিত হয় বলেই একে তেমাথা, ত্রিপুর ও ত্রিবেণী ইত্যাদি বলা হয়।
১১. কাপুরুষ কে?
উত্তর- সাধারণত ভয়ে কর্তব্যচ্যুত হয় বা আত্মসম্মান বিসর্জন দেয় এরূপ ব্যক্তিকে কাপরুষ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কাপুরুষ বলতে কেবল গমনপথে শুক্রপাতকারীদের বুঝানো হয়। পুরুষত্বহীন বলেই এদের এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১২.জলের চুলায় মরা-মাথা বাতাসে রান্না করা কী?
উত্তর- রূপক সাহিত্যে জলের চুলা বলতে বৈকুণ্ঠ, মরামাথা বলতে শুক্র এবং বাতাস বলতে নাসিকার শ্বাসকে বুঝানো হয়। অর্থাৎ নাসিকার শ্বাসরূপ বাতাস দ্বারা শুক্ররূপ মরামাথা সৃষ্টি করে জলের চুলারূপ বৈকুণ্ঠে নিষিক্ত করাকে কাঁইজি জলের চুলায় মরামাথা বাতাসে রান্না করা বলে অভিহিত করেছেন।
১৩.একপাকে সব সিদ্ধ করা কী?
উত্তর- বৈতরণী এমনই এক স্বর্গীয়নদী যে এ নদীতে সবাই নৌকা বাইতে পারেন। মাঝির বৈঠা ছোট হলে নদীটি আপনা অপনিই সংকোচিত হয় এবং বৈঠা বড় হলে তা আপনাপনিই স্ফীত হয়ে থাকে। আর্থাৎ বৈঠাসই জল নির্ধারণ করাই স্বর্গীয়নদীটির বিশেষ বৈশিষ্ট। তদ্রূপ বৈকুণ্ঠও এমনই এক স্বর্গীয়চুলা যে এখানে অম্বুক হতে হাতি পর্যন্ত নিষিক্ত হয়ে থাকে। গরুও যেভাবে নিষিক্ত করে হাতিও ঠিক সেরূপেই নিষিক্ত করে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষিক্তকরণ এ প্রক্রিয়াকেই কাঁইজি সব একপাকে সিদ্ধ হওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
১৪. ত্রিশূলবিদ্ধ করা কী?
উত্তর- সাধারণত ত্রিফলাযুক্ত অস্ত্র দ্বারা বিদ্ধ করে প্রাণীবধ করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে বাণ স্থাপন করার পর ভগপথেই শুক্রপাত করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলা হয়। এখানে কাঁইজি কবন্ধে ইন্দ্রিয় স্থাপনপূর্বক আত্মহত্যা করাকে ত্রিশূলবিদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।
১৫. অমাবস্যা কী?
উত্তর- সাধারণত চন্দ্রকলার অদৃশ্য হওয়াকে অমাবস্যা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে রজকালকে অমাবস্যা বলা হয়। উল্লেখ্য এ সূত্রটি পৃথিবীর সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকার মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়। এসব সূত্রের কোন প্রকার পরিবর্তন নেই।
১৬. ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি কী?
উত্তর- দেহধামকে ভূতের বাড়ি, আগধড়কে পশ্চিম, পাছধড়কে পূর্ব এবং বৈকুণ্ঠকে অন্ধকার কুঠরি বলা হয়। বৈকুণ্ঠরূপ কুঠরিটি দেহের পশ্চিমদিকে অবস্থিত বলে বৈকুণ্ঠকে ভূতের বাড়ির পশ্চিমের অন্ধকার কুঠরি বলা হয়।
১৭. মরা-মানুষ বন্দি করার রহস্য কী?
উত্তর- সাধারণত যে কোন মড়ক বা শবকে মরা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শুক্র, শুক্রপাত ও সন্তান ইত্যাদিকে মরা বলা হয়। সন্তানরূপ মরাকে বৈকুণ্ঠে ১০ মাস বন্দী রাখা হয় বলে কাঁইজি সন্তানের গর্ভকালকে বন্দীকৃত মরামানুষ বলে অভিহিত করেছেন।
১৮. মরা-গরু খাওয়ার বিচার কী?
উত্তর- বিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজি মরা-গরু খাওয়া বলতে সন্তানগ্রহণ করাকে বুঝিয়েছেন এবং মরা-গরু খাওয়ার বিচার বলতে এক জনমের দণ্ডের কথা বলেছেন। এক জনমের দণ্ড বলতে রূপক সাহিত্যে পিতা-মাতার সন্তান লালনপালন করা এবং সন্তানের সংসার যাতনা সহ্য করা বুঝায়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী)
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কারে জানাব মনের ব্যথারে

২০. কারে জানাব মনের ব্যথারে
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’(লুহানা)- বিচ্ছেদ
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)- খেমটা
————————————————————-
“কারে জানাব মনের ব্যথারে
কইলে ব্যথা সারে না
কোথায় রইলে দয়ালবন্ধু
একবার দেখা দাও না।
আমার ভূতেন্দ্রিয় পঞ্চজন
আমারে করিল হীন
তিনশোষাটটি রইল ঋণ
পরিমাপ ঠিক হলো না।
আমার দ্বারেন্দ্রিয় নয়জনা
কারো কথা কেউ মানে না
চুরাশিতল এ ঘরখানা
রক্ষা বুঝি হলো না।
তিনশোতেত্রিশ দেব ছিল
একে একে বিদায় নিলো
বলন কয় দু’টি ফল
আমায় এনে দেখাও না।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বাংলাভাষার মসিসংগ্রামী মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এ বলনটির মধ্যে একজন বিদগ্ধ সাধকের হৃদয় বিদারক করুণ আকুতি অনুপমভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।বিদগ্ধ সাধকের আর্তনাদ হলো দয়াল সাঁইয়ের জন্য এত সাধনভজন করেও তিনি সাঁইয়ের দেখা পাননি। তিনি সাঁইয়ের দর্শন পাবার জন্য অত্যন্ত ব্যকুল।
তাঁর আরো দুঃখ হলো তাঁর ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহ্বা ও ৫.ত্বক- এ পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয় তাঁকে যথাযথ জ্ঞান প্রদান করে না। তাই অমৃতসুধার ৩৬০ ধারাও তিনি আহরণ করতে পারেন না। এর কারণ সাধক নিজেই বর্ণনা করেছেন। তা হলো যমযজ্ঞের সময়ে তাপনের পরিমাপ তাঁর যথাযথ হয় না।
ব্যর্থতার আরো আত্মোভিযোগ হলো সে তাঁর বাহ্য নয়দ্বার যথাযথ শাসন করতে পারেনি। তাই তারা তাঁর বশীভূত হয়নি। এজন্য তাঁর শুক্ররক্ষা করা সম্ভব হয়নি। তাই তাঁর ৮৪ করের এ দেহটি রক্ষা হচ্ছে না। পরিশেষে তিনি বলেছেন যৌবনকাল বিদায় নিয়েছে। ফলে প্রতীতিরাও সব একে একে বিদায় নিচ্ছেন কিন্তু সুধা ও মধু এ দু’টি মানবফল তাঁর ভাগ্যে আর বুঝি জুটল না। কাঁইজির সর্বশেষ আকুতি হলো কেউ যদি এ দু’টি মানবফলের সন্ধান জেনে থাকেন তবে অবশ্যই তা এনে যেন তাঁকে দেখানো হয়। মূলতঃ এ কাব্যের দ্বারা কাঁইজি মানবফলের যে আকুতি প্রকাশ করেছেন তা অত্যন্ত বেদনাবিধুর বৈ নয়।
আত্মদর্শন (Theosophy) বা আত্মতত্ত্ব (Theology)
কাঁইজি এখানে ভূতিন্দ্র পঞ্চজন বলতে পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয়, তিনশোষাট ঋণ বলতে ৩৬০ মূর্তি, দ্বারিন্দ্র নয়জন বলতে নয়দ্বার, চুরাশিতল বলতে ৮৪ ফের, তিনশোতেত্রিশ দেব বলতে ৩৩৩ দেব এবং দু’টি ফল বলতে সাঁই ও কাঁইকে বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
দয়াল, দয়ালবন্ধু, দেব, দ্বারিন্দ্র, ফল, ভূতিন্দ্র। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)
/ ‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. পঞ্চ ভূতেন্দ্রিয় কী?
(What is the penta perceptive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে পঞ্চ-জ্ঞানেন্দ্রিয়কে ভূতেন্দ্রিয়ও বলা হয়। জ্ঞানেন্দ্রিয়াদি হলো- ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহ্বা ও ৫.ত্বক।
২. তিনশোষাট ঋণ কী?
(What is the three hundred and sixty loan?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
আর্তবাদের প্রথম আর্তব হতে গতার্তবা হওয়া পর্যন্ত যৌবনকালের ৩০ বছরে প্রতিমাসে ১টি করে মোট ৩৬০টি অমৃত আগমন করে। এ ৩৬০ অমৃতকেই কাঁইজি ৩৬০ ঋণ বলে অভিহিত করেছেন।
৩. দ্বারেন্দ্রিয় নয়জন কে কে?
(Who is nine gates-organ?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে মানবের বাহ্য ৯টি দ্বারকে দ্বারিন্দ্র বলা হয়। বাহ্য ৯টি দ্বার হলো- দুই চক্ষু কোটর, দুই কর্ণ কুহর, দুই নাসারন্ধ্র, মুখগহ্বর, জলদ্বার ও মলদ্বার।
৪. চুরাশি-তলা ঘর কী?
(What is the eighty-four storied house?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে ৮৪ করবিশিষ্ট দেহকে ৮৪ তলা ঘর বলা হয়। ৮৪ কর হলো- হাতের কব্জিসহ ১ হাতে ২০ কর। এ জন্য ২ হাতে ৪০ কর। অনুরূপভাবে ২ পায়ে ৪০ কর। হাত পায়ের ৮০টি কর আবার ১.আগুন ২.জল ৩.মাটি ও ৪.বাতাসরূপ এ আদি চতুর্ভূতের ওপর দণ্ডায়মান। সেজন্য ৮০ কর ও ৪টি ভূতের যোগফল ৮৪। এ জন্য মানবদেহকেই রূপক সাহিত্যে ৮৪তলা ঘর বলা হয়।
৫. ৩৩৩ দেব কে কে?
(Who are 333 angel?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
ত্রিধারার ৩, তিন তারের ৩ এবং ত্রিলোকের ৩। এ তিনটি ৩কে স্থাপক সূত্র দ্বারা সরলভাবে স্থাপন করে ৩৩৩ সংখ্যাটি সৃষ্টি করা হয়েছে। যেমন পবিত্র বেদে রয়েছে- “সে গাভী বসুগণের জন্য ৩৩৩টি গাভী উৎপন্ন করে। তখন প্রজাপতি সে গাভীকে রুদ্রগণকে দান করেন” (কৃষ্ণযজুর্বেদ সংহিতা সপ্তম কা-, প্রথম প্রপাঠক, য- ৫)। এছাড়াও বেদের বিভিন্ন মন্ত্রে এর আরো অনেক প্রমাণ রয়েছে। পরিশেষে বলা যায় পুরাণীদের ৩৩৩ দেব সংখ্যাটির দ্বারা ত্রিধারা, তিনতার ও ত্রিলোক বুঝায়। এছাড়া ৬৬৬৬, ৬৬৬ ও ৩৬০ এসব সংখ্যা কেবল বেদ হতেই নিষ্পন্ন হয়েছে।
৬. দু’টি ফল কী কী?
(What are two fruits?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
বৈকুণ্ঠে স্বায়ম্ভুরূপে সৃষ্ট সুধা ও মধুকে রূপক সাহিত্যে দু’টি ফল বলা হয়। যেমন কানাইশাহ বলেছেন “প্রেমের গাছে দু’টি ফল রসে করে টলমল।” বিস্তারিত জানতে হলে বিশিষ্ট আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজির ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য একান্ত অনুরোধ রইল।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ (প্রশ্নোত্তরে বলন তত্ত্বাবলী)
লেখকঃ খোরশেদ আলম

পাগল দেখি পাগলের মাস্টার (চর্তুদশ পর্ব)

১৩. পাগল দেখি পাগলের মাস্টার
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“পাগল দেখি পাগলের মাস্টার,
ছিঁড়া তার সব জোড়া দিয়ে,
বাজায় বসে ট্যাঞ্জিস্টার।
দেখাদেখি গড়ে বিদ্যালয়,
তারা গণে দিন বারাটায়,
মুখের দ্বারা সাগর শুকায়,
চাটাম মারাই সারাসার।
অনুমানের ঘোড়ায় চড়ে,
মথুরা মদিনায় ঘুরে,
বিমানযোগে আকাশে উড়ে,
চিনে না যমদুয়ার।
দিন উড়িয়ে মন আনন্দে,
শেষকালে বসে কান্দে,
অধীন বলন ছন্দ বান্ধে,
অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের জগদ্বিখ্যাত সংস্কারক, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও প্রখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কাঁইজি এ বলনটির মধ্যে খুষ্কমূষ্ক দিশারী ও অজ্ঞ অনুসারীদের শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক ভুয়া সম্পর্কের বিয়টি অত্যন্ত চমৎকাররূপে ফুটিয়ে তুলেছেন। অথবা কাঁইজি এখানে চোরে চোরে মাস্তুত ভাই বা পাগলে পাগলে খালত ভাই এ বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
কাঁইজি এখানে যথার্থই বলেছেন যে পাগলরা যেরূপ ছেঁড়াছুটা তার ও লতালাকড়িরূপ বিরক্তিকর দ্রব্যাদি জোড়াতালি দিয়ে বেতার বা আলাপী নির্মাণ করে বাজানোর পায়তারা করে। কখনো দিয়াশলাইয়ের ঠোস ও টুলীর সঙ্গে তার লাগিয়ে কথা বলাবলি করে তদ্রূপ অজ্ঞ গুরু-গোঁসাইরাও শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদাদি কিংবা দর্শন ও বিজ্ঞানের খিচুড়িবৎ সামান্য কিংবা যৎকিঞ্চিৎ বা ভাসা ভাসা আনুমানিক জ্ঞান দ্বারা শিষ্য-শিষ্যা ও অনুসারীদের লালন-পালন বা প্রতিপালনের পায়তারা করে থাকেন। উল্লেখ্য বর্তমানে এক অজ্ঞ আরেকদল অজ্ঞ লোকের স্বয়ংসিদ্ধ গুরুরূপে প্রতিনিয়তই আত্মপ্রকাশ করছে। বিষয়টি একেবারেই পাগল পাগলের প্রভুর মতো হাস্যকর বৈ নয়।
অতঃপর কাঁইজি বলেছেন এসব অজ্ঞরা কেবল দেখাদেখি শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অনুষ্ঠান, পূজা ও পার্বণাদি করে যাচ্ছেন। দিনে তারকা গণনার মতো তারা প্রতিনিয়তই মিথ্যা কথা, কিংবোদন্তিময় যতসব রূপকথা, মনগড়া ব্যাখ্যা ও আনুমানিক সিদ্ধান্ত ইত্যাদি করতে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। তারা এমনভাবে কথা বলেন যে, তাদের মুখের কথায় যমুনা পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। এগুলো কেবলই তাদের চাটামি বৈ নয়।
কাঁইজি আরো বলেছেন এসব অজ্ঞ, ভণ্ড ও স্বয়ংসিদ্ধ গুরু-গোঁসাইরা যুক্তি, বিজ্ঞান ও দর্শনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সব কথাই কেবল অনুমানে বলে থাকেন। সন্তান ও সংসাররূপ বিদ্যালয় নির্মাণ করে পাগলরূপী গুরু- গোঁসাইরা কানার দিবসে তারা গণনার মতো করে- পুণ্য-বাণিজ্য, স্বর্গ-বাণিজ্য, স্রষ্টা-বাণিজ্য, ধ্যান-বাণিজ্য, জপনা-বাণিজ্য এবং ভুয়া-দিব্যজ্ঞান বাণিজ্য করে বেড়াচ্ছেন। কানার মনগড়া তারকা গণনার মতোই এঁদের পুরো কার্যক্রমই কেবলই মনগড়া। পক্ষান্তরে তাদের ও শিষ্যদের অতীব প্রয়োজনীয় ও সাধনীয় শুক্র ও সুধারূপ অমূল্য সম্পদ যে অবমূল্যায়ন হচ্ছে ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে তা তাদের কোন স্মরণও নেই। কাঁইজি আরো বলেছেন মূর্খ তাপসরা সর্বদা কেবল অনুমানের ঘোড়ায় চড়ে বেড়ান। যার যার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক বিধান অনুসারে স্বতীর্থ ভ্রমণের জন্য কেউবা বৃন্দাবন ও মথুরা আবার কেউবা মক্কা ও মদিনা ভ্রমণ করে থাকেন কিন্তু এসবের অর্থ ও তত্ত্ব সম্পর্কে তারা কিছুই জানেন না। বকধার্মিকরা তীর্থ ভ্রমণের পর নিজেকে আরো বড় মাপের দিশারী বলে প্রকাশ করে থাকেন। এসব ভণ্ডদের ধারণা চট্টগ্রাম ও আজমীর ভ্রমণ না করলে নাকি গুরুই হওয়া যায় না।
পক্ষান্তরে যে যমদুয়ার ও যে যমের হাত হতে আত্মরক্ষা করার জন্য শিষ্যপদ গ্রহণ বা শিষ্যপদ প্রদান করার একান্ত প্রয়োজন তা তাদের জানাও নেই এবং বুঝাও নেই। সর্বশেষে কাঁইজি বলেছেন এসব অন্ধ, মতবাদান্ধ ও খুষ্ক পাগলরা হেলায় খেলায় পাগলামি ছাগলামি করে যৌবনকাল হারিয়ে বৃদ্ধকালে আস্তানা-আস্তানায় ও আশ্রম-আশ্রমে ঘুরে আশীর্বাদ ভিক্ষা করে বেড়ান এবং কঠিনভাবে অনুশোচনা করে বলতে থাকেন- “আইলাম আর গেলাম, খাইলাম আর ছুঁইলাম, ভবে দেখলাম শুনলাম কিছুই বুঝলাম না।” এটাই অত্যন্ত চমৎকার ব্যাপার। অত্র কাব্যে কাঁইজির উদাত্ত আহ্বান হলো- অজ্ঞদের দিশারী না হয়ে গুরু-শিষ্য সবাই দিব্যদিশারীর নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করে মানবজনম ধন্য করা সবারই একান্ত প্রয়োজন।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)
/ ‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
ঘোড়া, চাটাম, ট্যাঞ্জিস্টার, পাগল, বিদ্যালয়, বিমান, মথুরা, মদিনা, মাস্টার, যমদুয়ার, যমুনা, সাগর। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর
(Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. পাগল কে? (Who is crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মস্তিষ্ক প্রতিবন্ধীদের পাগল বলা হয় কিন্তু এখানে কাঁইজি শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গুরু-গোঁসাই এবং তাঁদের শিষ্য ও অনুসারীদের পাগল বলে আখ্যায়িত করেছেন।
২. পাগলের মাস্টার কে? (Who is the master of crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
অত্র বলনে কাঁইজি পাগল বলতে খুষ্কমুষ্ক গুরু ও শিষ্য উভয়কেই বুঝিয়েছেন কিন্তু পাগলের শিক্ষক বলতে কেবল খুষ্কমূষ্ক দিশারী বা গুরু-গোঁসাইদের বুঝিয়েছেন।
৩. পাগলের ট্যাঞ্জিস্টার বাজানো কী?
(What is the transistor playing of the crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
ভাঙ্গাপচা বিরক্তিকর দ্রব্যাদি দ্বারা নির্মিত বেতারবৎ যন্ত্র মুখে বাজানোই হলো পাগলের বেতার বাজানো। কিন্তু এ অবস্থাটি আমাদের সমাজের অজ্ঞ ও অশিক্ষিত গুরু- গোঁসাইয়ের শাস্ত্রীয়, পারম্পরিক ও দার্শনিক-মতবাদ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের খিঁচুড়িবৎ আলোচনার সাথে তুলনা করেই কাঁইজি অত্র কাব্যে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় কী?
(What is the school of emulation construct?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
কাঁইজি অনুমানপ্রসূত মতবাদ ও দাম্পত্যকে দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় বলে অভিহিত করেছেন। এ সূত্র ধরে বলা যায় দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয়টি হলো কেবলই মানবসমাজ ও মনগড়া মতবাদ। মানবসমাজ বা মানবসভ্যতাকে এবং শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদাদিকে কাঁইজি এখানে দেখাদেখি গড়া বিদ্যালয় বলে অভিহিত করেছেন।
৫. মুখের দ্বারা সাগর শুকানো কী?
(What is the sea-dried by the mouth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাগর শুকানো অসম্ভব ব্যাপার। কাঁইজি এখানে পাগলদের সারশূন্য বড় বড় কথা বলাকে তাদের মুখের দ্বারা সাগর শুকানোর সাথে তুলনা করেছেন।
৬. পাগলের চাটামমারা কী? (What is the vacuous of the crazy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
পাগলরা অনেক সময় তাদের চোখের সামনে যা দেখে তাকেই লক্ষ্য করে বলে এটা আমার। যেমন বলা যায় রাজশাহী জেলার দুর্গাপুর থানার ৭নং ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের কলণ্ঠিয়া গ্রামের কলুপাড়ার মকছেদের ছেলে বেলাল পাগলা। হেমন্তে মাঠে গেলে সে বলে- “এ মাঠের সব ধান আমার”, গমের সময়ে মাঠে গিয়ে বলে- “এ মাঠের সব গম আমার।” তদ্রূপ গাড়ি দেখলে সে বলে- “এ গাড়িটি আমার।” ভালো বাড়ি দেখলে সে বলে- “এ বাড়িটি আমার।” এছাড়া পাগলরা সব সময়ই তো বলতে থাকে- “আমি এটা করতে পারি।”, “আমি ওটা করতে পারি।” এসবকেই পাগলের চাটাম মারা বলা হয়।
চাটাম বি ১.আষাড়ে, Fantastic, Vacuous ২.অসার গল্প, আষাঢ়ে গল্প, অন্তঃসারশূন্য গল্প, Frivolous stories, fantastic stories, vacuous story
৭. অনুমানের ঘোড়া কী? (What is the assumptions horse?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
প্রমাণ, যুক্তি ও দর্শনহীন কল্পনা, ধারণা ও আলোচনাকেই অনুমান বলা হয়। এ অনুমানাদিকেই রূপক সাহিত্যে অনুমানের ঘোড়া বলা হয়। কারণ ঘোড়া যেমন দ্রুতগামী অনুমান বা অন্ধবিশ্বাসও তেমন দ্রুতগামী। এ জন্যই এ রূপক কাব্যটির মধ্যে কাঁইজি অনুমানকে ঘোড়ার সাথে তুলনা করেছেন।
৮. মথুরায় ভ্রমণ করা কী? (What is the travel at beehive?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মথুরা বর্তমান ভারতের একটি বিশিষ্ট-নগরী। পুরাণী মনীষীদের একদল মনে করেন এখানে কৃষ্ণের হাতে কংসরাজের মৃত্যু হয়। আবার আরেকদল পুরাণী মনীষী বিশ্বাস করেন এটি একটি বৃহৎ-নগরী এবং এটি নির্মাণ করেছেন মধুদৈত্য। এটি যমুনানদীর দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। এখানেই মহামতি শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়। এছাড়া তাদের মতে এটি একটি সুমহান তীর্থস্থানও বটে। তারা আরো বলেন যে “এ তীর্থটি ভ্রমণ করা সব মানুষের একান্ত প্রয়োজন এবং এটি ভ্রমণ করা অনেক পুণ্যের কাজও বটে।”
৯. মদিনায় ভ্রমণ করা কী? (What is the travel at capital?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মদিনা বর্তমান সৌদি আরবের হেজাজের অন্তর্ভুক্ত একটি অঞ্চল বিশেষ। এ অঞ্চলের মধ্যেই কুরানোক্ত মুহাম্মদের সমাধি অবস্থিত। কুরানী-মনীষীদের মতে সমাধিটি একটি সুমহান তীর্থস্থান। এটি ভ্রমণ করা সব হাজিদের একান্ত কর্তব্য। এছাড়া কুরানী মুনীষিরা আরো বলেন যে এটি দর্শন করা অনেক পুণ্যের কাজ।
১০. যম-দুয়ার কী? (What is the Annihilator door?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত যমের আসা যাওয়ার তোরণকে যমদুয়ার বলা হয়। কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বৈতরণীকে যমদুয়ার বলা হয়। কারণ এই স্বর্গীয় নদী পথটি দ্বারা কামবাসনারূপ যম চলাফেরা করে থাকেন। এ দুয়ার দ্বারা যম চলাচল করে বলেই একে যমদুয়ার বলা হয়।
১১. দিন উড়ানো কী? (What is the day-squander?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
অবহেলা করে বা হেলা করে জীবনের মূল্যবান সময়কে তুচ্ছ কাজে নষ্ট করা বা আলসেমি করে নষ্ট করাকেই দিন উড়ানো বলা হয়। অর্থাৎ অজ্ঞতা ও অবহেলা করে যৌবনকাল নষ্ট করাকেই দিন উড়ানো বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী

তিনমাসে আঠারো সন্তান (ত্রয়ো দশ পর্ব)

১২. তিনমাসে আঠারো সন্তান
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“তিনমাসে আঠারো সন্তান
জাতি-কুল-মান সব গেল
মানুষ না চিনে বাবা
কার সাথে বিয়া দিলো।
মেয়ে মেয়ে বেচাকেনা
পুরুষ গেলে কেউ বাঁচে না
না দিয়ে গুরু-দক্ষিণা
জনমভর ডাঙ্গায় মলো।
না জুগিয়ে পারের কড়ি
আগেই করে দৌড়াদৌড়ি
আছাড় খায় উঠানে পড়ি
ঘরে প্রবেশ কই হলো।
নিশিদিনে চোরের হানা
কী ধন লুটে টের পায় না
বলন কয় সাঁই এলো না
মহা কাল-শমন এলো।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
উপমহাদেশের বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক গীতিকার ও মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য সুবিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। এটি উপমান পরিভাষা প্রধান একটি গীতিকাব্য। অত্র কাব্যে কাঁইজির কল্পিত অপ্সরা হলেন ‘রতী’ এবং কিংবদন্তি স্বামী হলেন স্বয়ং ‘বিম্বল’। এখানে কাঁইজি রতীর বুকফাটা করুণ আর্তনাদ অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
অত্র কাব্যে রতীর করুণ আর্তনাদ হলো- তাঁর বাবা-মা যাচাই না করেই বিম্বলের সাথে তাঁর বিয়ে দিয়েছেন! বিয়ের তিনমাসের মধ্যে ১৮টি সন্তান হয়েছে। উপমিত দেশের কথা উপমান দেশে প্রচার করলে তা সম্পূর্ণ উল্টা বলেই মনে হয়। কাঁইজি যে দেশের কথা বর্ণনা করেছেন তা হলো ‘উপমিতদেশ’। সে দেশের কথা বলতে গিয়ে কাঁইজি বলেছেন সেদেশে কেবল মেয়ে মেয়েই বেচাকেনা হয়। সে দেশে যিনি সঠিক পরিমাণ গুরুদক্ষিণা না দিয়ে গুরুদর্শন করতে চান তিনি ডাঙ্গাতেই মৃত্যুবরণ করেন। কাঁইজি আরো বলেছেন- যারা বৈতরণী উত্তরণ করার মতো কড়ি সংগ্রহ না করেই শূন্য-হাতে দৌড়াদৌড়ি করে, তারা যার যার ঘরের দুয়ারেই আছাড় খেয়ে মারা যায়। গুরুর ঘরে প্রবেশ করতে পারে না কোনক্রমেই। কাঁইজি আরো বলেছেন- সে দেশে রাত্রি-দিন পুরো সময় ধরেই চোর, দস্যু ও দৈত্যরূপ দুর্বৃত্তরা মূল্যবান সম্পদাদি অপহণের জন্য পুনঃপুন হানা দিতেই থাকে। দস্যু ও দুর্বৃত্তরা সাধারণ ও নিরীহ মানুষের ঘরবাড়ি লুটপাট করে মূল্যবান ধনরত্ন নিয়ে যায়। কিন্তু কী ধন নিয়ে যায় অজ্ঞরা তা অনুধাবনও করতে পারে না।
পরিশেষে কাঁইজি বলেছেন একজন আত্মতাত্ত্বিক ও পাকা সাধকগুরুর শরণগ্রহণ ব্যতীত কোন সাধকই কেবল দেখাদেখি ও অনুমানে সাঁইদর্শন করতে পারেন না। তবুও অনেক মানুষ যৌবনকাল হেলায় খেলায় ধ্বংস করে বৃদ্ধকালে কেবল হাহুতাশ করতে থাকেন।
আত্মদর্শন (Theosophy) বা আত্মতত্ত্ব (Theology)
কাঁইজি এখানে তিনমাস বলতে ত্রিধারা এবং আঠারোসন্তান বলতে ১৮ ধামকেই বুঝিয়েছেন।
রূপক পরিভাষা
(Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
আছাড়, উঠান, গুরু, গুরুদক্ষিণা, ঘর, চোর, টের, ডাঙ্গা, ধন, পারের কড়ি, পুরুষ, বাবা, মহাকাল, মেয়ে১, মেয়ে২, লুট, শমন, হানা। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. তিনমাসে আঠারো সন্তান কী?
(What is eighteen children within three months?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে তিনতার বা ত্রিধারাকে তিনমাস এবং ১৮ ধামকে আঠারো সন্তান বলা হয়। তিনতার হলো- ১.ইড়া, ২.পিঙ্গলা ও ৩.সুষুম্না। ত্রিধারা হলো- ১.লাল, ২.সাদা ও ৩.কালো। ১৮ ধাম হলো- বাবার ৪ সত্তা। যথা- ১.হাড় ২.হৃদরা ৩.শুক্র ও ৪.ঘিলু- মায়ের চার সত্তা হলো- ১.চুল ২.চামড়া ৩.মাংস ও ৪.চর্বি এবং প্রকৃতির ১০ সত্তা হলো- ১.চক্ষু ২.কর্ণ ৩.নাসিকা ৪.জিহবা ৫.ত্বক ৬.বাক্ ৭.পাণি ৮.পাদ ৯.পায়ু ও ১০.উপস্থ।
২. মেয়ে মেয়েই বেচাকেনা কী?
(What is the girl girl trading?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে অটল বা ঊর্ধ্বরেতা সাধককে মেয়ে বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী এখানে প্রথম মেয়ে অর্থ অটল এবং দ্বিতীয় মেয়ে অর্থ রজস্বলা। একমাত্র অটল অটল স্বামীই নবোঢ়া স্ত্রীর নিকট হতে প্রেমের বিনিময়ে অমৃত আহরণ করতে পারেন বলে মেয়ে মেয়েই বেচাকেনার কথা বলা হয়।
৩. গুরু-দক্ষিণা কী?
(What is the preceptor honorarium?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
গুরুদেবকে প্রদত্ত সর্ব প্রকার উপহারকে গুরু-দক্ষিণা বলা হয়। তবে প্রকৃত গুরু-দক্ষিণা হলো অটলগমন দ্বারা স্বরূপদর্শন সাধনের পূর্ণ-সময়। অর্থাৎ ১,০০০ শ্বাস বা ৪২ মিনিট সময়। কারণ এ সময় পরিপূর্ণ না করা পর্যন্ত স্বরূপদর্শন করা সম্ভব হয় না।
৪. ডাঙ্গায় মরা কী?
(What is the die at the shore?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বৈতরণীকে ডাঙ্গা এবং শুক্রপাত করাকে মরা বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী বৈতরণীতে মৃত্যুবরণ করাকে ডাঙ্গায় ডুবে মরা বলা হয়। অন্য মতে বৈকুণ্ঠকে গভীরজল এবং বৈতরণীকে ডাঙ্গা বলা হয়। এ অনুযায়ী বৈতরণীতে মৃত্যুবরণ করাকেই ডাঙ্গায় ডুবে মরা বলা হয়। যেমন- কবি মামুন নদীয়া লিখেছেন- “মামুন নদীয়া যমুনায় গিয়া ডাঙ্গায় ডুবে মরিলরে।”
৫. পারাপারের কড়ি কী?
(What is the crossing cowrie?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত নৌকার ভাড়াকে পারের কড়ি বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে সঠিক কামসাধনকে পারের কড়ি বলা হয়। যে সাধকের কামসাধন সঠিক হয়েছে সে অনায়াসে বৈতরণী পাড়ি দিতে পারেন। কিন্তু যার সাধন হয়নি সে খেয়ায় উঠে কাঞ্ছিতেই পড়ে যায় এবং পাড়ের নিকটেই ডুবে মারা যায়। সাধনরূপ কড়ি ছাড়া কেউই বৈতরণীরূপ খেয়া পার হতে পারেন না।
৬. উঠানে আছাড় খাওয়া কী?
(What is the tumble at the courtyard?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত ঘরের সামনের প্রাঙ্গন বা অঙ্গনকে উঠান এবং হঠাৎ পিছলে পড়াকে আছাড় বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে বৈতরণীকে উঠান এবং মৃত্যুবরণ করাকে আছাড় খাওয়া বলা হয়। এ সূত্রানুযায়ী বৈতরণীতে শুক্রপাত করাকে উঠানে আছাড় খাওয়া বলা হয়েছে।
৭. নিশিদিনে চোরের হানা কী?
(What is the burglar strikes in nightlife-day?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে রজকালকে নিশি, পবিত্রতাকে দিন এবং কামরিপুকে চোর বলা হয়। কামরিপুরূপ চোর যুবকরূপ ধনীকে ক্ষণকালও বিরাম দেয় না। সে প্রতিনিয়তই ধনীর ঘরে হানা দেয় এবং ধনীর গোলা হতে শুক্ররূপ ধন হরণ করে নিয়ে যায়। একেই কবি এখানে নিশিদিনে চোরের হানা বলে অভিহিত করেছেন।
৮. ধন লুটা কী?
(What is the riches plunder?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত সম্পদাদি হরণ করাকেই ধন লুটা বলা হয়। কিন্তু রূপকসাহিত্যে যৌবন, জ্ঞান, চরিত্র, শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কেবল শুক্রকেই ধন বলা হয়েছে। কামরিপু কাম প্রলোভন দিয়ে নরগণের নিকট হতে ক্রমে ক্রমেই এ সম্পদ হরণ করে নেয়। একেই ধন লুটা বলা হয়।
৯. মহাকাল শমন কী?
(What is the senility Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বিম্বল, বার্ধক্য ও প্রয়াণ ইত্যাদিকে মহাকাল বলা হয়। তবে এখানে কেবল বার্ধক্যকে মহাকাল বলা হয়েছে। এটি মানুষের চূড়ান্তকাল বলেই একে মহাকাল বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

১০. চাঁদ হয়েছে চাঁদে উদয়

১০. চাঁদ হয়েছে চাঁদে উদয়
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“চাঁদ হয়েছে চাঁদে উদয়
চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ
চাঁদেই বিশ্ব জ্যোতির্ময়।
আপনগর্ভে রেখে পতি
অনূঢ়া হয় গর্ভবতী
জলের মাঝে জ্বলছে বাতি
আকাশে বসিয়া সাঁই।
পুরাণীরা কাশীধামে
কুরানীরা কয় মদিনে
চাঁদের উদয় হচ্ছে দিনে
রাতে সে চাঁদ গুপ্ত রয়।
ননী খেতে মদনচোরা
আপন বুকে মারল ছোরা
বলন কয় কেমন গোরা
ভেবে অন্ত নাহি পায়।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, বাংলাভাষার যুগান্তকারী আত্মতাত্ত্বিক লেখক, শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গন উত্তরণের সার্থক রূপকার, বাংলাভাষার বিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে আলোচ্য বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে।
কাঁইজি এখানে কৈশোর চাঁদের গায়ে যৌবন চাঁদ উদয় হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কৈশোরের গায়ে যৌবন চাঁদ উদয় হওয়াকে কাঁইজি চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ বলে অভিহিত করেছেন। কৈশোর চাঁদের ওপর যৌবন চাঁদ উদিত না হলে কিশোর কিশোরী সৌন্দর্যপ্রিয় ও জ্যোতির্ময় হয়ে উঠে না। কিশোর কিশোরীর দেহে যৌবন উদিত হওয়াকেই কাঁইজি বিশ্ব জ্যোতির্ময় হওয়া বলে অভিহিত করেছেন।
এছাড়া কাঁইজি অত্র কাব্যে আরো একটি চাঁদের কথা বলেছেন এবং এটিই অত্র কাব্যের প্রকৃত চাঁদ। কাঁইজির মতে এ চাঁদটি হলেন সাঁই। কাঁইজির মতে উপমেয় একটি দেশ আছে। সেদেশে অনূঢ়ার গর্ভে তার স্বামী জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু আমাদের দেশে এরূপ হওয়া চিরনিষিদ্ধ। এদেশে জলের মধ্যে বাতি নিভে যায় কিন্তু কাঁইজির সেদেশে জলের মাঝে দিব্যি বাতি জ্বলে এবং বর্তমানেও তা জ্বলছে।
কাঁইজি সে চাঁদের অবস্থান সম্পর্কে বলেছেন পুরাণীরা বলেন কাশীধামে কিন্তু কুরানীরা বলেন মদিনায় সে চাঁদ উদিত হয়। কাঁইজি বলেছেন- শাস্ত্রীয় মতাবলম্বীরা সাঁইরূপ সে চাঁদের অবস্থান সম্পর্কে যে যা-ই বলুন না কেন, সে চাঁদ এদেশের চাঁদের মতো রাতে উদয় হয় না বরং সে চাঁদ দিবসে উদয় হয় এবং রাতের বেলায় গুপ্ত রয়।
সাঁইয়ের বস্তুগত নাম ‘ননি’। বিম্বল একজন প্রতীতি। পুরাণীরা যাকে মদনচোরা বলে থাকেন। এ বিম্বল প্রতীতি চাঁদরূপ সে ননি আহরণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন। সাঁইয়ের অপর চারিত্রিক নাম ‘গোরা’। তাই কাঁইজি বলেছেন ‘গোরা’রূপ সে চাঁদ যে কেমন! অনন্তকাল ভাবলেও তার কোন অন্ত পাওয়া সম্ভব নয়।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
অনূঢ়া, কাশী, কাশীধাম, কুরানী, গোরা, চন্দ্রগ্রহণ, চাঁদ, ছোরা, দিন, ননি, পুরাণী, মদনচোরা, মদিনা, রাত, সাঁই। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. চাঁদ চাঁদে উদয় হয় কিভাবে?
(How moon is rising to the moon?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে মানবসন্তানের কৈশোরকালকে চাঁদ এবং যৌবন উদয় হওয়াকে চাঁদ উদয় হওয়া বলা হয়। কৈশোরকালরূপ চাঁদের গায়ে যৌবনচাঁদ উদয় হয় বলে যৌবন উদয় হওয়াকে রূপকসাহিত্যে চাঁদের গায়ে চাঁদ উদয় হওয়া বলা হয়।
২. চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ হয় কিভাবে?
(How is the moon moon `Lunar eclipse’?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
চন্দ্রগ্রহণ অর্থ চন্দ্র সাময়িক অদৃশ্য হওয়া। রূপকসাহিত্যে কৈশোরকালকে ও যৌবনকালকে যেমন চাঁদ বলা হয়। তদ্রূপ যৌবন উদয় হওয়াকেও চাঁদ উদয় হওয়া বলা হয়। যৌবন চাঁদ উদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কৈশোরচাঁদ চিরদিনের মতো অদৃশ্য হয়ে যায়। এ জন্য বলে যৌবনচাঁদ দ্বারা কৈশোর চাঁদের গ্রহণ হওয়া বলা হয়। এ সূত্র হতেই চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ বলা হয়। অর্থাৎ একচাঁদ এসে আরেক চাঁদ অদৃশ্য করাকেই চাঁদে চাঁদে চন্দ্রগ্রহণ বলা হয়েছে।
৩. গর্ভে পতি রেখে অনূঢ়া গর্ভবতী হয় কিভাবে?
(How are pregnant celibate Keep husband in the womb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বিশ্বের সর্ব প্রকার বিচিকে অনূঢ়া এবং বিচির মধ্যে সুপ্তভাবে অবস্থিত ভ্রূণকে পতি/ সন্তান বলা হয়। যেমন- তেঁতুল বিচিকে অনূঢ়া এবং সে বিচির মধ্যে সুপ্ত তেঁতুল গাছের ভ্রূণকে তার পতি বা সন্তান বলা হয়। এ সূত্র হতে বলা হয়েছে “আপনগর্ভে রেখে পতি, অনূঢ়া হয় গর্ভবতী।” অর্থাৎ বিচিরূপ অনূঢ়ার ভ্রূণরূপ পতি ধারণ করা।
৪. জলের মাঝে বাতি জ্বলে কিভাবে?
(How to ignite the lamp in the water?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে দেহকে জল এবং জ্ঞানকে বাতি বলা হয়। দেহ জল দ্বারা নির্মিত বলেই দেহকে জলবৎ বলা হয়। বাতি যেমন আলো ছড়ায় জ্ঞানও তদ্রূপ আলো ছড়ায় বলে জ্ঞানকে আলো বা বাতির সাথে তুলনা করা হয়। জলময় দেহের মধ্যে দিব্যজ্ঞানের উদয় হওয়াকে জলের মধ্যে বাতি জ্বলা বলা হয়।
৫. কোন্ আকাশে সাঁই বাস করেন?
((What sky God live in?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে নাভিকে মধ্যমূল, নাভির নিচের অংশকে ভূমি এবং নাভির ওপরের অংশকে আকাশ ধরা হয়। এছাড়া বৈতরণীকে পাতাল ও বৈকুণ্ঠকে আকাশ ধরা হয়। বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিকদের মতে বৈকুণ্ঠ-রূপ আকাশে সাঁই বাস করে থাকেন।
৬. কাশীধাম কী? (What is the Grassy?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
পুরাণী মুনীষীদের রূপক বর্ণনা মতে এটি বিখ্যাত একটি তীর্থস্থান এবং এটি বর্তমান ভারতের একটি নগরী বিশেষ। কাশ যেখানে উৎপন্ন হয় তাকে কাশী বলে। কাশবন হতে যেরূপ কাশতৃণ উদ্গমন হয় তদ্রূপ বৈকুণ্ঠ হতে সন্তান উদ্ভব হয় বলে রূপকসাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে কাশী বা কাশীধাম বলা হয়। অর্থাৎ রূপকসাহিত্যে কাশী হলো বৈকুণ্ঠ।
৭. মদিনা কী? (What is the town?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
মদিনা (ﻤﺪﻴﻧﻪ) আরবি শব্দ। এর অর্থ- নগর, হাট, তীর্থ, বাণিজ্যকেন্দ্র, ব্যবসাকেন্দ্র, বিপণিচক্র, গন্তব্যস্থল, তীর্থস্থান, সুজলা-সুফলা ও শস্য-শ্যামলা ভূমি। এর পূর্বনাম ছিল ইয়াসরিব (আ.ﻴﺜﺮﺐ)। কুরানী মনীষীদের রূপক বর্ণনা মতে আরব দেশের অন্যতম প্রধান-নগর এবং কুরানীদের বিশ্ব তীর্থস্থান, কুরানোক্ত মুহাম্মদ জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে স্থানান্তরিত হয়ে এখানে আসেন এবং তাঁর সমাধিও এখানে অবস্থিত। বিশিষ্ট আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মতে বৈকুণ্ঠই সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র। যেহেতু এ নগর হতে বিশ্বের সর্ব প্রকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর উদ্ভব। রূপকসাহিত্যে একে ঢাকা, নিধুয়া, কাশী, মথুরা, বৈকুণ্ঠ ও স্বর্গ ইত্যাদি বলা হয়।
৮. দিনে চাঁদ উদয় হয় কিভাবে?
(How the moon is rising in the day?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে রজস্বলাদের পবিত্রতার ২৭ দিনকে দিন এবং সাঁইকে চাঁদ বলা হয়। পবিত্রতারূপ দিনে সাঁইরূপ চাঁদের উদয় হয় বলে রূপকসাহিত্যে দিনে চাঁদ উদয়ের কথা বলা হয়।
৯. মদনচোরা ননি খেতে গিয়ে আপনবুকে ছুরি মারেন কিভাবে?
(How to stabbed Cupid own-chest to eat cream?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে বিম্বলকে মদনচোরা, সাঁইকে ননি এবং শুক্রপাত করাকে আপনবুকে ছুরি মারা বলা হয়। সাঁই-সাধন বা সাঁইদর্শন করতে গিয়ে মদনবাবুর টলে যাওয়াকে তার আপনবুকে ছুরি মারা বলা হয়।
১০. অন্তহীন গোরা কে? (Who is unendingly Lord?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপকসাহিত্যে পালনকর্তা ও কবন্ধকে গোরা বা গৌর বলা হয়। বিশ্বের অনেক মহাগ্রন্থে জীবের পালনকর্তা ও সৃষ্টিকর্তাকে প্রায় একই সত্তারূপে ব্যবহার করা হয়। এখানে পালনকর্তা দ্বারা সৃষ্টিকর্তাকেই বুঝানো হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা সাকারে একরূপ হলেও আকারে অনন্তরূপ। এ জন্য রূপকসাহিত্যে সৃষ্টিকর্তাকে অন্তহীন গোরা বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম

কী শমন আইলরে জানি (দশম পর্ব)

৮. কী শমন আইলরে জানি (জানিরে)
রাগিণী/ (Tune)/ ‘لحن’ (লুহানা)-
তাল/ (Rhythm)/ ‘إيقاع’ (ইক্বাউ)-
————————————————————-
“কী শমন আইলরে জানি (জানিরে)
গরিব না খাইয়া মরে
(ওরে) গরিব না খাইয়া মরে
ধনীর কোঠায় মালপানি।
লেংড়া যায় পথ পাড়িতে
অন্ধ যায় জনসভাতে
বোবা যায় বক্তব্য দিতে
বয়রা শুনে বোবার বাণী।
বাদুড়ের আমদানি যেমন
মানুষের চলা তেমন
বুঝতে চায় না গুরুর বচন
খায়রে শুধু চুবানি।
পাইতে সে অমূল্যরতন
ভজ গিয়া গুরুর চরণ
ভাবিয়া কয় কাঁইজি বলন
পাবিরে ধনের খনি।”
সারমর্ম (Essence)/ ‘جوهر’ (জুহার)
শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অঙ্গনের উত্তরণের সার্থক রূপকার, বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, বাংলা কাব্যাঙ্গনের যুগান্তকারী মসিসৈনিক এবং বাংলা-ভাষার সুবিখ্যাত মরমীকবি বলন কাঁইজির নির্মিত বিখ্যাত গীতিকাব্য ‘বলন তত্ত্বাবলী’ হতে বিখ্যাত এ বলনটি গ্রহণ করা হয়েছে। কৈশোরকাল অতিক্রম করে যৌবনকালে পদার্পণ করা এবং যুবক যুবতীর করণীয় সাধনাদির প্রতি কাঁইজি এখানে আলোকপাত করেছেন।
কাঁইজি যৌবনের আগমনকে যমের আগমন বলে উল্লেখ করেছেন। যম যেরূপ জীবকে হত্যা করে। যৌবনকালে উদিত চন্দ্রচেতনাও সেরূপ জীবকে হত্যা করে। এ জন্য কাঁইজি এরূপ তুলনা করেছেন। রূপক সাহিত্যে কুসুমিতাকে ধনী এবং যুবককে নিঃস্ব বলা হয়। এ সূত্র ধরে কাঁইজি বলেছেন স্বর্গীয় অমৃতজলের সরবরাহ কেবল কুসুমিতা-দের নিকট কিন্তু যুবকদের নিকট কেবল শুম্ভবিম্ব ব্যতীত আর কিছুই নেই।
তাই তিনি বলেছেন নিঃস্বরা অভাবে থাকেন কিন্তু বিত্তশালীদের নিকট ধনের প্রাচুর্যতা। কাঁইজি বিম্বলকে রূপকভাবে লেংড়া এবং কবন্ধকে অন্ধ বলেছেন। আবার বিম্বলকে বোবা এবং কবন্ধকে বয়রা বলে অভিহিত করেছেন। এখানে বিম্বল ও কবন্ধের কাম নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অতঃপর কাঁইজি অত্যন্ত তাচ্ছিল্য করে বলেছেন বাদুড় যেরূপ একের অনুসরণ করে অন্যেরা চলাফেরা করে, জীবকুল শ্রেষ্ঠ মানুষও তদ্রূপ কোন কিছু যাচাই-বাছাই না করেই চলাফেরা করে। মানুষ এতই অধম যে, অনেকেই স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মানতেও চান না। যারা স্ব স্ব গুরুদেবের আদেশ-নিষেধ মান্য করতে চান না কেবল তারাই পুনঃপুন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন।
পরিশেষে কাঁইজি অমৃতরূপ অমূল্যধন বা অমৃতসুধা আহরণ করতে হলে বা হস্তগত করতে হলে একজন পাকা সাধকগুরুর শরণ গ্রহণ করতে বলেছেন। একজন সাধকগুরুর নিকট শিষ্যপদ গ্রহণ করলে অতি সহজে ঊর্ধ্বরেতা বা অটল হওয়া যায় এবং অমৃতরসেরও সন্ধানলাভ করা যায়।
রূপক পরিভাষা (Metaphorical Terminology)/
‘مصطلحات مجازي’ (মুস্তালাহাত মুজাঝিয়া)
অন্ধ, কোঠা, গুরুরবচন, চুবানি, জনসভা, গরীব, ধনী, নেংড়া, পথ, বয়রা, বোবা, মালপানি, শমন। অত্র গ্রন্থের শেষে ‘রূপক পরিভাষার অভিধা’ অনুচ্ছেদ দেখুন।
প্রশ্ন ও উত্তর (Questions & Answers)/
‘اسئلة واجابات’ (আসইলা ওয়া ইজাবাত)
১. শমন কী? (What is Annihilator?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
বাংলা শমন শব্দটির অর্থ যম। কিন্তু ইংরেজি Summons (সমন) শব্দটির অর্থ বিচারালয়ে উপস্থিত হওয়ার আদেশপত্র। কাঁইজি এখানে বাংলা শমন পরিভাষাটির দ্বারা কেবল মানবের চন্দ্রচেতনাকে বুঝিয়েছেন। এ জন্য শমন অর্থ ‘চন্দ্রচেতনা’। বিচারালয়ের শমনের বলে সৈনিকরা যেভাবে অভিযুক্তকে বন্দী করে, চন্দ্রচেতনাও সেভাবে যুবক-যুবতীদের কামবাসনা দ্বরা বন্দী করে বলেই রূপক সাহিত্যে চন্দ্রচেতনাকে শমন বলা হয়।
২. শমন আসা কী? (What is Annihilator come?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত শমন বলতে যম বা বিপদাপদকে বুঝায় কিন্তু রূপক সাহিত্যে শমন বলতে কেবল চন্দ্রচেতনাকে বুঝায়। এখানে শমন আসা বলতে কাঁইজি কিশোর-কিশোরীর নিকট যৌবনের প্রথম ঢেউ অনুভব হওয়ার কথা বুঝিয়েছেন।
৩. গরিব কে? (Who is the poor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
‘ﻏﺭﻴﺐ’ (গরিব) আরবি শব্দ। এর অর্থ দরিদ্র, নিঃস্ব, অসহায়, বিদেশী ও আগন্তক। সাধারণত নিঃস্ব ও অসহায়কে দরিদ্র বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবককে দরিদ্র এবং যুবতীকে ধনী বলা হয়। এছাড়া রূপক সাহিত্যে কোন কোন ক্ষেত্রে যৌবনকালকেও ধনী বলে উল্লেখ করতে দেখা যায়।
৪. ধনী কে? (Who is the richest?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিত্তবান, ক্ষমতাধর ও সম্পদশালীকে ধনী বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যুবতী ও যৌবনকালকে ধনী বলা হয়। তবে কাঁইজি এখানে কেবল যুবতীকেই ধনী বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যুবতীরা অমৃতরস ধারণ ও বহন করে বলে যুবতীকে ধনী বলা হয়।
৫. ধনীর কোঠায় মালপানি কী?
(What is the water resource of richest compartment?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনীর কোঠা এবং অমৃতকে জলসম্পদ (মালপানি) বলা হয়। অর্থাৎ বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি কুসুমিতাদের জঠরে অবস্থিত অমৃতকে ধনীর কোঠার জলসম্পদ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
মালপানি [ﭙﺎﻨﻰ ﻤﺎﻞ] বি জলপণ্য, জলসম্পদ, জলবৎ অমৃতসুধা (আল) অর্থ, কড়ি, সম্পদ “কী শমন আইলরে জানি (জানিরে), গরিব না খাইয়া মরে, (ওরে) গরিব না খাইয়া মরে, ধনীর কোঠায় মালপানি” (বলন তত্ত্বাবলী-৭৩)(রূপ)বি পালনকর্তা, ঈশ্বর, বুদ্ধ, পতি, স্বামী, guardian, রব (আ.ﺮﺐ) (আবি) উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, স্বরূপ (আদৈ) খোদা (ফা.ﺨﺪﺍ), মা’বুদ (আ.ﻤﻌﺑﻭﺪ), মুহাম্মদ (আ.ﻤﺤﻤﺪ), রাসুল (আ.رَسُول) (আপ) কাওসার (আ.ﻜﻭﺛﺮ), ফুরাত (আ.ﻔﺭﺍﺖ) (ইপ) God, nectar, elixir (পরি) এরূপ তরলমানুষ যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি (সংজ্ঞা)
১.সারা জগতের পালনকর্তাকে সাঁই বলা হয়
২.দ্বিপস্থ জীবের মাতৃজঠরে ভ্রূণ লালনপালনকারী শ্বেতবর্ণের জীবজলকে পালনকর্তা বা রূপকার্থে সাঁই বলা হয় (দেপ্র) পালনকর্তা পরিবারের রূপকসদস্য ও রূপক সাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতিবিশেষ (ছনা) ঈশ্বর, চোর, পরমগুরু, প্রভু (চরি) লালন (উপ) অমৃতসুধা, উপাস্য, গ্রন্থ, চন্দ্র, ধন, ননি, পাখি, ফল, স্বর্গীয়ান্ন (রূ) সাঁই (দেত) পালনকর্তা {.মাল.ﻤﺎﻞ+ হি.পানি. ﭙﺎﻨﻰ}
৬. লেংড়া কে? (Who is lame?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত বিকল পেয়ে ব্যক্তিকে লেংড়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে লেংড়া বলা হয়। বিম্বলের পা নেই তবু সে লাফিয়ে লাফিয়ে গমনাগমন করতে পারে বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৭. অন্ধ কে? (Who is blind?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত চোখে দেখে না এরূপ ব্যক্তিকে অন্ধ বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে অন্ধ বলা হয়। কবন্ধের চোখ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৮. বোবা কে? (Who is dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বল কথা বলতে পারে না বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
৯. বয়রা কে? (Who is deaf?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল কবন্ধকে বয়রা বলা হয়। কবন্ধের শ্রবণ করার মতো কর্ণ নেই বলেই তার এরূপ নামকরণ করা হয়েছে।
১০. বয়রা বোবার বাণী শোনে কিভাবে?
(How to hear the deaf the word of the dumb?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত কানে শোনে না এরূপ প্রাণীকে বয়রা এবং মুখে কথা বলতে পারে না এরূপ প্রাণীকে বোবা বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কবন্ধকে বয়রা এবং বিম্বলকে বোবা বলা হয়। বিম্বলের যমযজ্ঞের আহ্বানে কবন্ধের সাঁড়া দেওয়াকে বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক বলন কাঁইজি বয়রার বোবার বাণী শোনার সাথে তুলনা করেছেন।
১১. চুবানি খাওয়া কী? (What is the immersion eat?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত জলের মাঝে পড়ে গিয়ে জলাদি পান করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে যমযজ্ঞে গিয়ে শুক্রপাতরূপ আত্মহত্যা করাকে চুবানি খাওয়া বলা হয়।
১২. অমূল্যরতন কী? (What is invaluable wealth?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অনেক মূল্যবান দ্রব্যকে অমূল্যরতন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধারূপ অমৃতরসদ্বয়কে অমূল্যরতন বলা হয়।
১৩. গুরুর চরণ কী? (What is the preceptor’s leg?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে চার প্রকার চরণের সন্ধান পাওয়া যায়।
১.অভয়চরণ ২.যুগলচরণ ৩.রাঙাচরণ ও ৪.শ্রীচরণ।
নিচে এদের বিবরণ দেওয়া হলো।
অভয়চরণ/Fearless Leg/ ‘قدم بلا خوف’ (কুদুম বাল্লা খাউওয়াফা)
পিতা-মাতা ও গুরুজনের চরণকে অভয়চরণ বলে।
যুগলচরণ/Pairs Leg/ ‘قدم أزواج’ (ক্বাদিমা আজওয়াজ)
উপস্থ বা নাসার চন্দ্রশ্বাস ও সূর্যশ্বাসকে একত্রে যুগলচরণ বলে।
রাঙাচরণ/ Flushed Leg/ ‘قدم طهرتها’ (ক্বাদিমা ত্বহেরাতহা)
চক্ষুদ্বয়বন্ধ করে ধ্যানরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গুরুজণের আলোকময় চরণকে রাঙাচরণ বলে।
শ্রীচরণ/ Excellent Leg/ ‘قدم ممتاز’ (ক্বাদিমা মুমতাঝ)
১.সাঁই ও কাঁই দর্শনকে শ্রীচরণ বলে। ২.রূপক সাহিত্যে বিম্বলকে শ্রীচরণ বলে।
বিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও বলন কাঁইজি গুরুর চরণ বলতে এখানে কেবল সাঁই ও কাঁইরূপ পরমগুরুর দর্শনলাভের কথা বুঝিয়েছেন।
১৪. গুরুর চরণ ভজতে হয় কিভাবে?
(How to chant the leg of preceptor?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
রূপক সাহিত্যে প্রকৃত গুরু বলতে কেবল সাঁই ও কাঁইকেই বুঝায়। এ জন্য সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাকেই গুরুর চরণ ভজন করা বলা হয়। এ মতানুসারে বলা যায় সাঁইসাধন ও কাঁইসাধন করাই হলো গুরুর চরণ ভজন করা।
১৫. ধন কী? (What is riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত অর্থ, সম্পদ, জ্ঞান ও যৌবন ইত্যাদিকে সম্পদ বা ধন বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল শুক্র ও সুধাকে ধন বলা হয়। তবে এখানে কাঁইজি কেবল সুধাকেই ধন বলে অভিহিত করেছেন।
১৬. ধনের খনি কী? (What is the mine of riches?)
উত্তর (Answers)/ ‘إجابة’ (ইজাবা)
সাধারণত খনিজ সম্পদের অবস্থান অঞ্চলকে খনি বলা হয়। তবে অনেক মূল্যবান ধনের গচ্ছিত ভাণ্ডার ধনের খনি বলা হয়। পক্ষান্তরে রূপক সাহিত্যে বৈকুণ্ঠকে ধনের খনি বলা হয়।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ
(প্রশ্নোত্তরে)
বলন তত্ত্বাবলী
লেখকঃ খোরশেদ আলম