শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৪

মন্দা- প্রথম পর্ব

একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকারধারি মানব দেহকে, মনের রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
প্রথম পর্ব…
১. অহংকার
অহংকার (রূপ)বি অহমিকা, গর্ব, গৌরব, বড়াই, আমিত্ব, ব্যক্তিত্ব, আত্মচেতনা, অহংজ্ঞান।
অহংকারের সংজ্ঞা
নিজকে অপরের চেয়ে মর্যাদায় বড় ধারণা করে সস্তুষ্টিলাভ করাকে অহংকার বলে।
অহংকার অত্যন্ত কঠিন অন্যায়। গর্বকারী সবার নিকট চিরঘৃণিত।
কবি যথার্থই বলেছেন-
“আপনাকে যে বড় বলে বড় সে নয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সে হয়।”

অহংকার উৎপত্তির কারণাদি
মানব মনে অহংকার উৎপত্তির অনেক কারণ থাকলেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিচে তুলে ধরব। যথা- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার।
১. জ্ঞান
দিব্যজ্ঞান ব্যতীত শুধু বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করার দ্বারা মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়। কেবল বৈষয়িকজ্ঞান অর্জনকারী দিব্যজ্ঞানহীন লোকেরা সুমধুরসুরে বক্তব্য দিতে গিয়ে মনেমনে ভাবেন তার মত সুন্দর করে অন্য কেউ বক্তব্য দিতে পারবেন না। আধ্যজ্ঞানহীন নির্বোধরাই এরূপ কল্পনা করে থাকে। তারা বড়াই করে যত ওপরে উঠতে চায় অবশেষে তারা ততই নিচে পতিত হয়।
২. কর্ম
আধ্যাত্মিকজ্ঞান না থাকার কারণে সাধারণ সাধক বা উপাসকরা যত্রতত্র যখন তখন প্রকাশ করতে থাকে যে আজ এ এভাবে উপাসনা বা সাধন করে এ এ শক্তি অর্জন করেছি বা এ এ দেখেছি। এগুলোই তাদের আত্ম অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। আবার এমনও কিছু অজ্ঞ-সাধক বা অজ্ঞ-উপাসক রয়েছে, যারা মানবদেহের অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কম্পন বা স্পন্দন সর্বদা লক্ষ্য করতে থাকে। অতঃপর অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কোন একটির সামান্য কম্পনাদি বা সামান্য ব্যতিক্রম অনুভব করলেই তারা যত্রতত্র প্রকাশ করে বেড়াতে থাকে যে আমার এ গ্রন্তির মধ্যে এ এ হচ্ছে। এগুলোই তাদের আত্ম অহমিকার প্রমাণ বা ইঙ্গিত। এসবের দ্বারা তারা সাধারণ্যের নিকট ক্রমেক্রমে মর্যাদাহানী হতে থাকে। দিব্যজ্ঞানী সুবিজ্ঞ সাধু সন্ন্যাসিগণ কখনো এরূপ করেন না।
৩. বংশ
বংশ বা গোত্রের কারণেও মনের মধ্যে আত্ম অহমিকার সৃষ্টি হয়। দিব্যজ্ঞান না থাকার কারণেই তারা যেখানে সেখানে বলে বসে আমি অমুক উচ্চবংশের সন্তান, আমার বাবার এ এ ছিল, আমাদের সাতপুরুষ ছিলেন গুরু বা গোঁসাই ইত্যাদি। আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন অজ্ঞরাই সর্বদা বংশ গৌরবে মত্ত থাকে। জ্ঞানহীন লোক যে পশুতুল্য তারা তা একবারও ভেবে দেখে না।
৪. সৌন্দর্য
বিদ্যাহীনরা প্রায় সময়ই স্ব-স্ব রূপ ও যৌবনের গৌরব করে। দৈহিক গঠন ও রূপলাবণ্যের গৌরব যারা করে তারা একবারও ভেবে দেখে না যে মাত্র কয়েক বছর পরই এ রূপলাবণ্যে এমন ভাটা পড়বে যে কেউ তার প্রতি ফিরেও দেখবে না। একমাত্র মূর্খদের মুখেই এরূপ রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোভা পায়। আবার অনেক সময় মূর্খ শিষ্যদের মুখেও তাদের গুরু-গোঁসাই-গণের রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোনা যায়। জ্ঞান ও সাধনহীন রূপ-লাবণ্য পূজারী গুরু-গোঁসাইয়ের লাবণ্য ও মাধুরির বর্ণনা করতে গিয়ে মূর্খ শিষ্যরা যে লোক সমাজে ক্রমেক্রমে হাসি ও ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হচ্ছে তাতে তাদের কোন দৃষ্টি নেই। নিজের ও প্রিয়জনের রূপ-লাবণ্যের বর্ণনা করাও আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
৫. শক্তি
বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সমিতি বা সংসদের বড়বড় পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তারা প্রায় সময় তাদের ক্ষমতার দ্বারা গর্ববোধ প্রকাশ করে বা বড়াই করে কথা বলে থাকেন। এ পদশক্তি ব্যবহার করে তার অধীনস্থ অঞ্চলের সর্বত্র শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তাই তাকে এরূপ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে এরূপ জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা পদশক্তির অপব্যবহার বা পদশক্তির গর্ববোধ প্রকাশ করতে থাকে। তারা একবার ভেবে দেখে না যে এ পদশক্তি মাত্র কয়েক বছরের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে যদি শক্তির সৎব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং যদি শক্তির অসৎ ব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদ হতে অনেক নিচে নিক্ষেপ করা হবে।
৬. সম্পদ
সম্পদশালী ও বিত্তবানরা প্রায়ই তাদের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে থাকে। সম্পদশালিরা তাদের সম্পদের বড়াই করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। আবার অনেক মূর্খ শিষ্যরাও তাদের বিত্তবান গুরু-গোঁসাইয়ের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে। তারা বলেÑ “আমাদের বাবাজানের এ আছে! সে আছে” ইত্যাদি। এগুলো বলা তাদের আত্মগর্ব বৈ কিছু নয়। সম্পদের অধিকারিরা কখনো এরূপ চিন্তা করে না যে তার সম্পদের ওপর কোন কোন অধীনস্থের কী কী স্বত্ব রয়েছে। প্রাপকদের স্বত্বাদি আদৌ সঠিকরূপে প্রদান করা হয়েছে কী না? তারা প্রায়ই অপরের স্বত্বাদি হরণ করে সম্পদের গর্বে মত্ত থাকে। সম্পদের গর্ব করা নিঃসন্দেহে আত্ম অহংকার।
৭. জনবল
যে ব্যক্তির জনবল অধিক সে ব্যক্তি প্রায়ই গর্ব বা দম্ভ প্রকাশ করে কথা বলে বেড়ায় সর্বত্র। আবার আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু-গোঁসাইরাও প্রায় তাদের শিষ্য সংখ্যাধিক্যের দাম্ভিক্য প্রকাশ করে থাকে যত্রতত্র। যাদের শিষ্যসংখ্যা স্বল্প তাদের তারা গণনায় রাখে না। জনবল থাকা সত্ত্বেও যে গর্ব করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। যে কোন ব্যক্তির জনবলের গর্ব করা প্রকাশ্য অহংকারের বহিঃপ্রকাশ।
৮. অলংকার
উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করেও পুনঃপুন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে পথ চলে এবং যত্রতত্র উত্তম বসন বা অলংকারাদির গর্ব প্রকাশ করে। এ অলংকারটির মূল্য এতো, এটি বিদেশী, এ বসন অমুক দেশ হতে আনিয়েছি ইত্যাদি। উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করে এরূপ কথা বলাও আত্ম অহমিকা বা আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ বৈ নয়।
অহংকারের লক্ষণাদি
আত্ম অহংকার বা আত্ম অহমিকার অনেক প্রকার লক্ষণ বা চিহ্ন রয়েছে নিচে কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১. সত্য বিষয় মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
২. সত্যপথের গুরু গোঁসাইয়ের নিয়মনীতি মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৩. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে লজ্জাবোধ করা।
৪. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে না চাওয়া। যেমন- নিজের পাদুকাটাও পরিষ্কার করতে মনে না চাওয়া।
৫. সত্য বিচার মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৬. নিজের অন্যায় প্রমাণীত হওয়ার পরও স্বীকার করতে মনে না চাওয়া।
৭. প্রতিবেশীদের সাথে মিলেমিশে চলতে মনে না চাওয়া।
৮. যার যার প্রাপ্যাদি যথাযথ প্রদান করতে মনে না চাওয়া।
৯. কেউ তিরস্কার করলে বা কষ্ট দিলে তা সহ্য করতে না পারা।
১০. সমাজের নিচু শ্রেণির নিঃস্ব ও অসহায় লোকদের নিকটে বসতে না দেওয়া।
১১. কেউ কোন উপদেশ দিলে তা ভ্র-কুঞ্চিত করে অবহেলা করা।
১২. আত্মীয় স্বজন বা সাক্ষাত প্রার্থিদের সাথে দেখা করতে না যাওয়া।
১৩. কাহাকেও সাক্ষাত সম্বোধন না করা।
১৪. অন্যান্যদের অবজ্ঞার চক্ষে দেখা।
১৫. সাধারণ লোকদের সাথে ইতরপ্রাণিরূপ আচরণ করা।
বর্তমান সমাজে এমনও লোক দেখা যায় যে সামান্য একটি বৃত্তি করে বা সামান্য একটু লেখাপড়া করে নিজের পরিবারের জন্যও হাটের পণ্যাদি ক্রয় করে ঝুলিতে ভরে হাতে বহন করতে চায় না। এটা স্পষ্ট আত্মঅহমিকার চিহ্ন। সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে এরূপ অহংকার রোগ সবচেয়ে অধিক। আবার কিছু কিছু মূর্খ গুরু-গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিদের মধ্যেও এ আত্ম অহমিকা রোগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মধ্য প্রাচ্যের শাস্ত্রাদির মধ্যে কথিত আছে- “হযরত মুহাম্মদ নিজে উঠ ও ছাগল ইত্যাদি চরাতেন, এসব পশুদের খাদ্যপানীয় দিতেন, উট ও ছাগলের দুগ্ধ দোহন করে তা হাটে বিক্রি করে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে তা নিজের হাতে বহন করে আনতেন। তিনি নিজের ঘর নিজেই ঝাড়– দিতেন। স্ত্রী ও দাস দাসীদের প্রায় সর্ব কাজেই অংশগ্রহণ করতেন। অতিথিদের নিজ হাতে পানাহার করাতেন। তিনি নিজের হাতে কাপড়-চোপড় ধৌত করতেন। অথচ তিনি ছিলেন- পৃথিবীর সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান ব্যক্তিত্ব। আমাদের বর্তমান সমাজের কথিত গুরু গোঁসাই, সাধু সাঁইজি ও সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতরা, যারা তাঁরই কথিত মহানবাণিগুলো প্রচার ও প্রসার করেন তারাই কী এরূপ কার্যাদি করে থাকেন? কখনো করেন না। এসব কার্যাদি তারা তাদের অনুসারিদের দিয়ে করিয়ে নেন। তারা এসব কাজকর্মাদি করলে লজ্জায় বা ব্রীড়ায় মূর্ছিত হয়ে যাবেন। আবার আমাদের সমাজে কিছু গুরু-গোঁসাই দেখা যায় তারাও নিজে হাতে সামান্য জলটুকুও ঢেলে পান করতে চান না। এসবই তাদের দিব্যজ্ঞানের অজ্ঞতা এবং আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক অহংকারী সাঁইজির ঘটনা
একজন ভণ্ড সাঁইজি এক থাম্বারের (স্টেশন. station) উচ্চ শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করছিলেন। তার সাতে কয়েকজন পরিচারক ছিল। কয়েকজন পরিচারক তার একার সেবা করেও কেউ সামান্য অবকাশও পাচ্ছিল না। একজন পাখা দ্বারা বাতাস করছে একজন পান প্রস্তুত করছে একজন তার বিছানার পার্শ্বে তার আদেশাদি পালনের জন্য করজোড়ে সদা প্রস্তুত রয়েছে এবং আরো একজন তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার জন্য বিপণিতে গেছে। সাধারণ লোকজন এসব দৃশ্য দেখে তাকে দেখার জন্য সবাই ভীড় করতে লাগল। মনে হয় যেন সাইজি কোন উচ্চবংশের লাটনন্দন হবেন। ৪০ নিচের বয়সের লালবর্ণের সাইজি একটার পর একটা পান খেয়ে ঠোঁট দু’টি লাল করে রেখেছেন। উক্ত স্থানে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলেও তার মুখে কোন জ্ঞানের কথা নেই। কোন লোক জনকে বসার জন্যও বললেন না। কোন লোকের সাথে একটি কথাও বললেন না। বর্ণিত সবই জ্ঞানহীন সাইজির আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক পণ্ডিতের ঘটনা
একজন নামধারী সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত হাটে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন বটে কিন্তু একজন শিষ্যের অভাবে এক খিলি পান এনে খেতে পারলেন না। বারুইয়ের নিকট হতে পানের খিলি চেয়ে নিলে তিনি লজ্জায় মূর্ছা যেতে পারেন। অজ্ঞ ও খুষ্কমূষ্ক নামধারী ও ভেকধারী সাধু ও পণ্ডিতদের মধ্যে কী পরিমাণ আত্ম অহমিকা রয়েছে এসবই তার প্রমাণ।
অহংকারী পণ্ডিতের ঘটনা
সাম্প্রদায়িক একজন ভণ্ডপণ্ডিত তার এক ভৃত্য না থাকায় প্রায় ঘণ্টাকাল অবধি বর্চ্যরে প্রবল বেগসহ বর্চ্যরে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরিচারক এলে তাকে বললেন- “তুই আমার কাপড়টা নষ্ট করার উপক্রম করেছিস!” ভৃত্য বলল- “পণ্ডিতজি ঠেকাবশতঃ বদনাটা নিজ হাতে তুলে নিলে আপনার মান সম্মানের কী কোন দোষ হতো!” পণ্ডিত বললেন- “গর্ধবটা! তুই কয়েক বছর ধরে আমার কাছে আছিস! কোন সময় নিজ হাতে বদনা নিতে দেখেছিস! নিজ হাতে বদনা নিয়ে বর্চ্যে যাওয়া কী আমার পক্ষে শোভা পায়!”
এক ভেকধারী সাঁইজির ঘটনা
একদিন এক ভণ্ড সাঁইজি আমাদের বাসায় অতিথিরূপে আগমন করলেন। আমার ভাতিজাসহ তার আসার কথা ছিল তাই তাকে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তা না হলে তাকে আমাদের বাসায় নিমন্ত্রণের প্রশ্নই আসে না। তার আগমনের কথা শুনে কয়েকজন পাঠক শিষ্য এসে উপস্থিত হলো। অজ্ঞ সাঁইজি আমাদের জ্ঞানগত দর্শনগত ও পারম্পরিক অবস্থাদি না জেনে ও না শুনেই অশুদ্ধ ও গোজামিল দ্বারা লালনবাণী শোনাতে আরম্ভ করলেন। কেউ দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাইলে বা কেউ দুয়েকটা ভুল ধরে বসলেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং প্রশ্নকারিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন। ভীতি প্রদর্শন করার জন্য তিনি বলেন যে- “অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক অধ্যাপক আমার সামনে কথা বলতে সাহস পান না। অমুক বিশ্বাবিদ্যালয়ের অমুক অমুক শিক্ষক আমার বাড়িতে গিয়ে বসে বসে আমার কথা শ্রবণ করে দিশে পান না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাশ নিই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত ছাত্রদের সক্সেগ বসে বসে আমার লেকসার শুনেন ইত্যাদি।” কিছুক্ষণ পরে চা পরিবেশন করা হলো তিনি আমাদের পরিবেশিত কাপে চা পান করলেন না। তিনি তার ঝুলির মধ্যে হতে কাপ বের করে তাতে করে চা পান করলেন। তিনি একা একা প্রলাপ করে রাত একটা বাজিয়ে দিলেন। তবুও কেউ কিছু জানতে চাইলেই তিনি বলতেন এখানে হোটেল থাকলে হোটেলে গিয়ে উঠতাম। এগুলো পুরটাই ভণ্ড ও অজ্ঞ সাঁইজিদের আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ। ওপরোক্ত দৃষ্টান্তাদি সবই আত্ম অহমিকা বা দম্ভ বা গর্ববোধের লক্ষণ ও প্রমাণ।
অহংকার তাড়ানোর উপায়
দু প্রকারে অহংকার তাড়ানো যায়। যথা- ১.জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো ও ২.কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো।
১. জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো
যে ব্যক্তির মনে আমিত্বের উৎপত্তি হয় তার চিন্তা করা উচিৎ কোন্ কারণে তার মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়েছে? যদি জ্ঞানের কারণে অহমিকার উৎপত্তি হয়ে থাকে তবে তাকে তার চেয়ে উচ্চজ্ঞানিদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে এবং মনকে বলতে হবে আমার চেয়েও অধিকজ্ঞানী লোক পৃথিবীতে রয়েছেন তবে তারা তো এরূপ অহমিকা দেখায় না। তবেই মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে।
২. কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো
মনের মধ্যে যদি উত্তম কর্ম দ্বারা অহমিকার উৎপত্তি হয় তবে মনকে বলতে হবে আমার কর্মের চেয়েও অনেক অনেক অধিক ভালো কর্মী মহান ব্যক্তিও পৃথিবীতে রয়েছেন। তাদের দ্বারা তো এরূপ অহমিকা প্রকাশ পায় না। তবে ক্রমেক্রমে মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে। এছাড়াও- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার ইত্যাদি দ্বারা মনে অহমিকার উৎপত্তি হলে এগুলো কেন দেওয়া হয়েছে! এগুলো কী কী কাজে ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি একটু ভালোভাবে চিন্তা করলেও মনের মাঝে উদিত অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। যাকে দেখলে অহংকার সৃষ্টি হয় তাকে সম্মান প্রদর্শন করলে আত্ম অহমিকা হ্রাস পায়। যে বিষয়ে মনে অহংকারের উৎপত্তি হয় সে বিষয়ে আরো বিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাথে আলোচনা করলে অহংকার অনেকাংশে হ্রাস পেতে থাকে। এছাড়াও একজন দিব্যজ্ঞানী পাকা গুরুদেবের নিকট হতে মানসপট অপবিত্রকারী বা নষ্টকারী রিপু রুদ্র মন্দা ও দশা সম্পর্কে একবার ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করলে মনের অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
যেসব প্রয়োজনীয় কাজকর্মাদি করতে লজ্জাবোধ হয় সেসব কার্যাদি নিজ হাতে অধিক অধিকরূপে করা। যেমন- গুরু, গোঁসাই ও পণ্ডিতদের মাঝে মাঝে পরিবারের গরু, ছাগল, কুকুর বিড়ালকে খাদ্যপানীয় দেওয়া, তাদের স্নান করানো ও দুগ্ধ দোহন করা। নিজেদের ঘর দুয়ার ঝাড়– দেওয়া, নিজের কাপড় চোপড় নিজ হাতে ধৌত করা, নিজের গায়ে নিজে পাখা দ্বারা বাতাস করা, স্ত্রীদের সাথে মাঝে মাঝে ঘরের বিভিন্ন কাজকর্মে অংশগ্রহণ করা, অতিথিদেরকে নিজ হাতে খাদ্যাদি পরিবেশন করা, হাট হতে মাঝেমাঝে নিজ হাতে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে আনা ইত্যাদি। এরূপে কিছুদিন সংসারের ছোটখাট কাজকর্মাদি করতে থাকলে আত্ম অহমিকার মাত্রা ক্রমেক্রমে অন্তর হতে হ্রাস পেতে থাকবে।
প্রত্যেক ব্যক্তির জেনে রাখা উচিৎ যে ওপরে উল্লিখিত কার্যাদি সঠিকভাবে নিজে নিজে করা বড়ই কঠিন এজন্য একজন দিব্যজ্ঞানী পাকাগুরু বা গোঁসাইয়ের সহচার্য গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। বিজ্ঞ দিব্যজ্ঞানী গুরু ব্যতীত মনের এসব রোগ ব্যাধি প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থাৎ সব সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে থেকে একজন পাকা গুরুদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে একজন রোগী যেভাবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধপথ্য গ্রহণ করে শারীরিক রোগব্যাধি উপশম করে তদ্রপ তুমিও পাকা গুরুদেবের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের মনের রোগ ব্যাধি উপশম করো। আরো উল্লেখ করা যায় যে একজন পণ্ডিতব্যক্তি সাধারণ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমি জ্ঞানী এবং এ ব্যক্তি নিরক্ষর তবুও আমরা উভয় বিভিন্ন প্রকার পাপাদি কর্মে লিপ্ত আছি তবে নিরক্ষরব্যক্তি পাপাদি করে না জেনে এবং আমি পাপাদি করি জেনে বুঝে বিধায় নিরক্ষরব্যক্তি আমার চেয়ে অনেক উত্তম।
আবার নিরক্ষর উপাসকব্যক্তি কোন পণ্ডিতব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি পণ্ডিত এবং আমি নিরক্ষর তিনি উপাসনা করেন জেনে ও বুঝে কিন্তু আমি উপাসনা করি না জেনে ও না বুঝে কাজেই আমি যতই উপাসনা করি না কেন আমার মর্যাদা পণ্ডিতব্যক্তি উপাসনা না করলেও তার মর্যাদা হতে অনেক নিচে। আবার অধিক বয়সিব্যক্তি কোন অল্প বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমার বয়স অধিক এবং এ ব্যক্তির বয়স স্বল্প আমি যতদিন ধরে পাপাদি করছি এ ব্যক্তি ততদিন ধরে পাপ কার্যাদি করে না। কাজেই আমার বয়স অধিক হোলেও আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। আবার অল্প বয়সিব্যক্তি কোন অধিক বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি বয়সে আমার চেয়ে অনেক অধিক এ ব্যক্তি যতদিন ধরে উপাসনা করছে আমি ততদিন উপাসনা করার সময় পাইনি। কাজেই আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। জ্ঞান দ্বারা নিজের মনকে এরূপ প্রশিক্ষণ না দিলে মনের গভীর তলদেশ হতে নিজের আমিত্ব বা অহংকার কখনই বিতাড়িত করা যায় না। যারা শুধু মুখে বলে আমি নগন্যব্যক্তি, আমি জঘন্যব্যক্তি, আমি পাপিব্যক্তি, আমি অধমব্যক্তি ইত্যাদি তারা প্রকাশ্য কপটব্যক্তি। তাদের মনের মধ্যেই অহংকার নামক রোগটি অত্যধিক।
যেমন একজন সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত বক্তা বক্তব্য আরম্ভ করার পূর্বে প্রায় বলে থাকে “আমিপাপী ও অধমব্যক্তি, আমি অনুপযুক্ত ব্যক্তি, আমি আর আপনাদের কী বক্তব্য শোনাব! তখন একজন শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে যদি বলেন যে আপনি আপনি দয়া করে বসুন। আপনি যখন পাপী, অধম ও অনুপযুক্ত তখন আপনার বক্তব্য না শুনে আমরা একজন উপযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শুনব। তবেই উক্ত বক্তার ভিতরের প্রকৃত রূপটা জানা যাবে বক্তার চোখেমুখে রক্ত আসে কী না? আর যদি তিনি গুরু হয়ে থাকেন তবে তার ভক্তদের দাপটে টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে যাবে। এরূপ বক্তা ও গুরু-গোঁসাইরা বাহ্যিকভাবে নম্রতা প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই অধিক অহংকারী তাতে কোন সন্দেহ নেই।
উল্লেখ্য পণ্ডিত, বক্তা, গুরু ও গোঁসাই দুই প্রকার। যথা- ১.ভণ্ড ও ২.দিব্যজ্ঞানী। যারা অজ্ঞ ও ভণ্ড তারাই মূলত আত্ম অহমিকার বেড়াজালে আবদ্ধ কিন্তু যাঁরা বিজ্ঞ ও দিব্যজ্ঞানী তাঁরা মনের সর্ব প্রকার অহমিকা হতে চিরমুক্ত। মনের অহংকাররূপ কঠিন ব্যাধি হতে পরিত্রাণ লাভের জন্য প্রথমে আত্মতত্ত্ব ও পরে আপনার লালনকে অবশ্যই চিনতে হবে। মনকে বুঝাতে হবে আমি কিভাবে শূন্য হতে সৃষ্টি হয়েছি প্রয়াণের পর আমার দেহটি পড়ে গলে পোকা মাকড়ের খাদ্যে পরিণত হবে। আবার আমার সমস্ত দেহই মূল্যহীন কেননা সারাপেট অত্যন্ত দুর্গন্ধময় মল ও জলে পরিপূর্ণ। ফলে আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষের পক্ষে কখনই আত্ম অহমিকা বা অহংকার করা উচিৎ নয়।যেমন কোন কবি বলেছেন-
“ধন জন যৌবন মিছে অহংকার
নয়ন মুদলে পরে কেউ নয় কার”।

অন্য কবি বলেছেন-

“কে বলে মানুষ বড় বুদ্ধিমান
বুদ্ধি থাকলে কী হয়
মরলে কে করে তার সন্ধান।
জন্ম নিলে মরণ আছে
বরং দুইদিন আগে পাছে
চিরদিন কেউ না বাঁচে
কেউ না করে তার বিধান।
তবু যারা মানুষ মরে
তার স্বভাব এ সংসারে
লভ্য বিদ্যাবুদ্ধির জোরে
শেল বন্দুক কলের কামান।
সত্য বিদ্যাবুদ্ধির ফলে
আকাশে উড়ে কৌশলে
থাকতে পারে জলে-স্থলে
আজব এ বিজ্ঞান।
বেশি নয় দিন দু’চারি
জাকজমকের বাহাদুরি
তারাও মরে আমরাও মরি
শেষকালে ফল এক সমান।”

মানব মনের মরণব্যাধি আত্ম অহমিকা বা অহংকার হতে বেঁচে থাকা সবার অবশ্যই প্রয়োজন।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি

মন্দা- দ্বিতীয় পর্ব

একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকারধারি মানব দেহকে, মনের রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
দ্বিতীয় পর্ব…
২. হিংসা
হিংসা (রূপ)বি ঈর্ষা, দ্বেষ, বিদ্বেষ, মাৎসর্য্য, বধ, হনন, অনিষ্ট, ক্ষতি, অপকার, পরশ্রীকাতরতা, পরের ক্ষতি সাধন করার বাসনা।
হিংসার সংজ্ঞা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে মনের মাঝে অসহ্যভাবের উৎপত্তি হওয়াকে হিংসা বলে।
হিংসা উৎপত্তির কারণ
মানব মনে হিংসা উৎপত্তির কারণ অনেক তবে নিচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো-
১. শত্রুতা হতে ক্রমেক্রমে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়।
২. কোন লোককে সমশ্রেণিতে উন্নীত হতে দেখলে মনে হিংসার সৃষ্টি হয়।
৩. হেয় ও ঘৃণিত লোকের উন্নতি দেখলে মনে হিংসার উদ্রেক হয়।
৪. যার উন্নতির প্রতি অভিশাপ করা ছিল হঠাৎ তার উন্নতি দেখলে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়।
৫. আকাঙ্ক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালে তার প্রতি মনে হিংসার সৃষ্টি হয়।
৬. নেতৃত্ব গ্রহণের আগ্রহ অত্যধিক হোলে উক্ত পদপ্রার্থির মনে অন্যান্য প্রার্থিদের প্রতি হিংসার উৎপত্তি হয়।
৭. জন্মগতভাবে নিকৃষ্ট মনোভাবের লোকেরা বাহ্যিক কোন কারণ না থাকলেও মানুষের সাথে অযথাই হিংসা করে থাকে। কারো উন্নতিই তারা সহ্য করতে পারে না। মানুষের বিপদাদির কথা শুনলে তারা মনেমনে আনন্দ অনুভব করে। এরা কৃপণ লোকের চেয়েও আরো নিকৃষ্ট।
হিংসার লক্ষণাদি
ঝগড়া, দ্বন্দ্ব, কলহ, দলাদলি ও পক্ষপাতিতা ইত্যাদিই হিংসার লক্ষণ।
হিংসার প্রকারভেদ
হিংসা দু প্রকার- ১.মৌন হিংসা ও ২.কর্মগত হিংসা।
১. মৌন হিংসা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে মনেমনে তার ধ্বংস কামনা করাকে মনগত হিংসা বলে। যেমন- অভিশম্পাত করা।
২. কর্মগত হিংসা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে তা ধ্বংস করার জন্য নাশকতামূলক বিভিন্ন কাজকর্ম করাকে কর্মগত হিংসা বলে। যেমন- ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগ করা।
হিংসা তাড়ানোর উপায়
হিংসা তাড়ানোর উপায় দু’টি। যথা- ১.জ্ঞান দ্বারা হিংসা তাড়ানো ও ২.কর্ম দ্বারা হিংসা তাড়ানো।
১. জ্ঞান দ্বারা হিংসা তাড়ানো
উন্নতি দেখে যার সম্পর্কে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়েছে- তার ব্যাপারে সর্ব সময় এরূপ ধারণা করা যে এ ব্যক্তি ভালো কর্ম করেছে বলেই তার উন্নতি হয়েছে আমিও তার মতো ভালো কাজকর্মাদি করলে আমারও এরূপ উন্নতি হতো। পিছনে যত সময় অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু এখন থেকে আর বৃথা সময় নষ্ট করব না এখন থেকে আমিও ব্যবসা-বৃত্তিতে গভীর মনোযোগ দিলাম। মনকে জ্ঞান দ্বারা এরূপভাবে বুঝাতে থাকলে মন হতে ক্রমেক্রমে হিংসা বিদায় হতে থাকে।
২. কর্ম দ্বারা হিংসা তাড়ানো
যার প্রতি হিংসার সৃষ্টি হয়েছে, তার সাথে সর্বদা উত্তম ব্যবহার করা। সর্বত্র তার প্রশংসা অধিক অধিক করা। হিংসা করা সম্পূর্ণই নিষিদ্ধ ও মানবিক নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তবে হিংসার বৈধরূপ হলো- প্রতিযোগিতা। হিংসা করা অবৈধ কিন্তু প্রতিযোগিতা করা বৈধ।
প্রতিযোগিতা
প্রতিযোগিতা (রূপ)বি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরুদ্ধতা।
প্রতিযোগিতার সংজ্ঞা
১. বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
২. উন্নতিলাভকারির মতো উন্নতিলাভ করার জন্য বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
প্রতিযোগিতার প্রকারভেদ
প্রতিযোগিতা দু প্রকার- ১.জ্ঞান দ্বারা প্রতিযোগিতা ও ২.কর্ম দ্বারা প্রতিযোগিতা।
১. জ্ঞানগত প্রতিযোগিতা
কোন ব্যক্তি যে বিষয়ে যে জ্ঞান দ্বারা উন্নতিলাভ করেছে সে বিষয়ে তার চেয়ে অধিক জ্ঞানার্জন করলে অবশ্যই তার চেয়েও অধিক উন্নতিলাভ করা যাবে। এরূপ ভেবে উক্ত জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করাকে জ্ঞানগত প্রতিযোগিতা বলে। এটা সর্বযুগেই সম্পূর্ণ সিদ্ধ।
২. কর্মগত প্রতিযোগিতা
উন্নতি লাভকারী ব্যক্তি যে যে কাজ যেরূপভাবে করে উন্নতিলাভ করেছে সে সে কাজ তার চেয়ে আরো ভালোভাবে করলে অবশ্যই তার চেয়েও অধিক উন্নতিলাভ করা যাবে। এরূপ ভেবে উক্ত কার্যাদি সুসম্পাদন করায় মনোনিবেশ করাকে কর্মগত প্রতিযোগিতা বলে। এটা সর্বকালে সর্ব সম্মতিক্রমেই সিদ্ধ বা বৈধ।
প্রতিযোগিতার উপকার
১. প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করলে যে কোন কাজ দ্রুত শেষ করা যায়।
২. প্রতিযোগিতার দ্বারা যে কোন কাজের দ্রুত সফলতালাভ করা যায়।
প্রতিযোগিতার অপকার
১. প্রতিযোগিতা মূলক কাজকর্মাদি অনেক ক্ষেত্রেই সুষ্ঠ ও সুন্দর হয় না কিন্তু স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা অটুট রেখে ধীর ও স্থিরভাবে কার্যাদি সম্পাদন করলে সর্বক্ষেত্রেই তা সুষ্ঠ ও সুন্দর হয়।
২. প্রাতিযোগীতার দ্বারা প্রাপ্ত সফলতা প্রায় ক্ষেত্রে অধিককাল স্থায়ী হয় না কিন্তু প্রতিযোগিতা ব্যতিরেখে ধীর ও স্থিরভাবে কার্যাদি সম্পাদন করলে সর্বক্ষেত্রেই তার ফল অধিককাল স্থায়ী হয়।
হিংসা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে পার্থক্য
১. কারো সচ্ছল অবস্থা ও উন্নতি দেখে মনের মাঝে অসহ্য-ভাবের উৎপত্তি হওয়াকে হিংসা বলে।
২. বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
১. হিংসা দুই প্রকার- ১.জ্ঞানগত সিংসা ও ২.কর্মগত হিংসা।
২. প্রতিযোগিতা দুই প্রকার- ১.জ্ঞান দ্বারা প্রতিযোগিতা ও ২.কর্ম দ্বারা প্রতিযোগিতা।
১. হিংসা করা সম্পূর্ণ অবৈধ
২. প্রতিযোগিতা করা সম্পূর্ণ বৈধ
১. হিংসার পরিণাম ধ্বংস
২. প্রতিযোগিতার পরিণাম সাফল্য।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি

মন্দা- তৃতীয় পর্ব

একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকারধারি মানব দেহকে, মনের রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
তৃতীয় পর্ব…
৩. শত্রুতা
শত্রুতা (রূপ)বি বৈরিতা, প্রতিকূলতা, শ্ত্রুর ন্যায় আচরণ।
শত্রুতার সংজ্ঞা
কারো সাথে মনেমনে বৈরীভাব পোষণ করাকে শত্রুতা বলে।
শত্রুতার প্রকারভেদ
শত্রুতা দুই প্রকার। যথা- ১.মৌনিক শত্রুতা ও ২.দৈহিক শত্রুতা।
১. মৌনিক শত্রুতা
কারো উন্নতি ও সম্পদাদি ধ্বংস হওয়ার জন্য মনেমনে কামনা করা বা অভিশম্পাত করাকে মৌনিক শত্রুতা বলে।
২. দৈহিক শত্রুতা
কারো উন্নতি ও সম্পদাদি ধ্বংস করার জন্য- ভাংচুর, ঔষধ প্রয়োগ, অগ্নি সংযোগ বা জল সংযোগ করাকে দৈহিক শত্রুতা বলে।
শত্রুতা উৎপত্তির কারণ
আকাঙ্ক্ষার অন্তরায় হতে মনে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। কেউ যদি কারো অবসম্ভাবি প্রাপ্য বিষয়-বস্তু হস্তগত হওয়ার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় তবে তার সাথে শত্রুতার সৃষ্টি হয়। যেমন- কোন ভূমি ক্রয় করার জন্য সব ব্যবস্থাদিসম্পন্ন করার পর অন্য কেউ এসে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্য দিয়ে তা ক্রয় করে নেয় তবে তার সাথে মনেমনে শত্রুতার সৃষ্টি হয়।
শত্রুতার লক্ষণ
নিশ্চিত প্রাপ্য বিষয়-বস্তু হস্তগত হওয়ার অন্তরায় সৃষ্টিকারী ব্যক্তির সাথে চলাফেরা করতে বা মিলেমিশে থাকতে মনে না চাওয়া।
শত্রুতার অশান্তি তাড়ানোর উপায়
উভয় প্রকার শত্রুতাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ উভয় প্রকার শত্রুতা হতে বিরত থাকা সকলের জন্য একান্ত আবশ্যক কর্তব্য। ক্ষতি দর্শনে মনে শত্রুতার উদয় হোলে ধৈর্য ধারণ করে থাকা এবং যেসব ক্ষতি দর্শনে মনে শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছে তা প্রকৃতির পরীক্ষা ধারণা করা এবং পরবর্তিকালে হয়ত এর চেয়ে আরো অধিক ভালো বিষয়-বস্তু পেয়ে যেতে পারি মনে এরূপ ধারণা করা। মনকে জ্ঞান দ্বারা এরূপ যুক্তি দিতে থাকলে অন্তর হতে ক্রমেক্রমে শত্রুতার অশান্তি বিতাড়িত হতে থাকে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি

মন্দা- চতুর্থ পর্ব

একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকার ধারি মানব দেহকে, মনের রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যাধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১. অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪. রাগ ৫. কুৎসা ৬. লিপ্সা ৭. মিথ্যা ৮. কৃপণতা ৯. কলা ও ১০. আমিত্ব।
চতুর্থ পর্ব…
৪. রাগ
রাগ (রূপ)বি ক্রোধ, রোষ, কোপ, ক্ষোভ, রক্তবর্ণ, রক্তি, অনুরাগ, প্রেম, প্রণয়, আসক্তি, মমতা, সুরের বিন্যাসের পদ্ধতি বিভাগ, ১. ভৈরব, ২. কৌশিক ৩. হিন্দোল ৪. দীপক ৫. শ্রী ৬. মেঘ- এ ছয়টি মূল রাগ।
রাগের সংজ্ঞা
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
রাগ উৎপত্তির কারণ
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণহেতু মনে ক্রোধ বা রাগের উৎপত্তি হয়। রাগ সর্বসময় দোষণীয়। মনের মাঝে প্রজ্জ্বলিত রাগ প্রশমন করাই সাধুত্ব।
রাগের উপস্থিতি
মন অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হওয়ার সাথেসাথে বদনও অগ্নিমূর্তি ধারণ করাই ক্রোধ বা রাগের উপস্থিতির চিহ্ন।
রাগ প্রশমনের উপায়
মনের মাঝে ক্রোধ বা রাগ সৃষ্টি হোলে জ্ঞান দ্বারা মনকে এরূপভাবে বুঝাতে হবে যে কাজ করতে গেলে লাভ-ক্ষতি বা ভালো-মন্দ উভয়ই তো হতে পারে বিধায় ক্ষতি হলে কোন প্রকার উদ্বিগ্ন না হয়ে আগে চিন্তা করতে হবে ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু? আরো চিন্তা করতে হবে সংঘটিত ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠা যাবে কিভাবে? ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে তা কাটিয়ে উঠার প্রতি মনোনিবেশ করলে ক্রমেক্রমে ক্রোধ বা রাগ প্রশমন হতে থাকে। যেমন- ধরি তোমার ছোট ছেলের হাত হতে পড়ে গিয়ে একটি বাতি ভেঙ্গে গেছে শুনে তোমার মনে ক্রোধের উৎপত্তি হয়েছে। তুমি আগে চিন্তা করো বাতিটির মূল্য কত? তা আবার ক্রয় করা যাবে কী না? আরো চিন্তা করো বাতিটির মূল্য অধিক না ছেলেটির মূল্য অধিক? আরো চিন্তা করো সামান্য অর্থ দ্বারা তো বাতিটি ক্রয় করা যাবে কিন্তু ছেলেকে মারধর করলেও তো ভাঙ্গা বাতিটি আর জোড়া লাগবে না এবং বাতিটি আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এসব চিন্তা করতে করতেই ক্রোধ বা রাগ অনেকটাই প্রশমন হয়ে যায়।
সমাজের কিছু অজ্ঞলোক বা জ্ঞানহীন শিষ্যরা মনে করে গুরু ও গোঁসাইগণের কোন প্রকার রাগই থাকতে পারে না। এরূপ কথা সঠিক নয়। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণির আত্মরক্ষামূলক রাগ অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। তবে ক্ষতিকারক রাগ দমন করে রাখা প্রত্যেকেরই উচিৎ।
রূপক উদাহরণ
উপদেশ প্রদানের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো-
একটি সর্প মানুষের ক্ষতি না করার অঙ্গীকার করে এক সাধু বাবার নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। ইঁচড়েপাকা ছেলেরা সাপটির সন্ধান পাওয়ার পর তার লেজ ধরে পথে পথে টেনেহেঁচড়ে অনেক আমোদ-প্রমোদ করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেল। অতঃপর সাধুবাবা এসে সর্পটির এ অবস্থা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার এরূপ অবস্থা কেন”! সে বলল- “আপনি আমাকে রাগ দমনের যে উপদেশ দিয়েছিলেন সে উপদেশ মান্য করতে গিয়েই আমার এরূপ অবস্থা”! সাধুবাবা বললেন- “বোকা সর্প! আমি মানুষের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছি বটে- রাগ প্রদর্শন করে আত্মরক্ষা করতেও কী তোকে নিষেধ করেছি!” পরের দিন দুষ্ট ছেলেরা আবার সর্পটির সন্ধান পেয়ে তার লেজ ধরতে গেল তখন সর্পটি ভীষণভাবে গর্জন করে তাদের আক্রমণের কলা ধরল তখন ভয়ে দুষ্ট ছেলেরা সব পালিয়ে গেল এবং সর্পটির আত্মরক্ষা হলো। তাই রাগ দমনের যে মাত্রা রয়েছে তা সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে আমাদের অবস্থা সে সর্পের মতোই হবে। অবসম্ভাবী ক্ষতি হতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও দেশ রক্ষা করতে যে পরিমাণ রাগের প্রয়োজন তা করা অবশ্যই আবশ্যক। কার্যত দেখা যায় সমাজের লোকের নিকট ভালো সাধুবাবা রূপে মর্যাদা পাওয়ার জন্য আধ্যজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিরা সে সর্পের মতো কলা ধরে বকধার্মিক সেজে বসে রয়েছে। শিষ্যদের সামনে তারা কোন প্রকার রাগই করতে চান না। জ্ঞানহীন এ পাপিষ্ঠরাই সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিসাধন করে। পরিশেষে বলা যায় রাগ যে একেবারে করাই যাবে না এরূপ কিছু নয় তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমাণ মতো রাগ করা সম্পূর্ণ সিদ্ধও রয়েছে।
অনুরাগ
অনুরাগ (রূপ)বি ১.রাগতুল্য, রাগসদৃশ, রাগ অপেক্ষা ক্ষুদ্র ক্রোধ (এতো অনুরাগ ভালো নয়)
২.প্রেম, প্রীতি, সোহাগ, আদর, স্নেহ, যত্ন, প্রবৃত্তি, আসক্তি (সনৃ) রাগের সহচর, দোষ, ফল ক্রিবিণ যদৃচ্ছা, যেমন ইচ্ছা।
অনুরাগের সংজ্ঞা
সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কুটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
মানুষের মনের মধ্যে উৎপন্ন রাগ মুখের ভাষা দ্বারা কিংবা অক্সগপ্রত্যক্সগ দ্বারা প্রকাশ না করে ধৈর্য ধারণ করতে করতে এক পর্যায়ে রাগের মাত্রা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না বরং তা মনের মাঝে সুপ্ত বা সাময়িক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে। মনের মাঝে সঞ্চিত অকার্যকর ও নিষ্ক্রিয় এ রাগাদিই পরবর্তীতে অনুরাগে পরিণত হয়। ফলে রাগের অবশিষ্ট কিছু অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ রাগের যে অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায় তাই অনুরাগ। আরো বলা যায় মনের মাঝে সুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সঞ্চিত থাকা ছোটখাট রাগাদিই অনুরাগ।
অনুরাগের লক্ষণ
অনুরাগ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় সময় নিরব থাকার চেষ্টা করে। সে সহজে কারো সাথে কথা বলতে বা সৌজন্যমূলক কোন আলাপ করতে চায় না। সে স্বেচ্ছাচারীর মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ কর্মটুকুই করতে থাকে। এ সময় সে কারো সাথে সহজে মিশতেও চায় না। সর্বসময় তাকে উদাসী উদাসী বলে মনে হয়। তাদের প্রত্যাহিক স্বাভাবিক কাজকর্মও তারা যথা সময়ে যথা নিয়মে করতে চায় না। যেমন- স্নান ও পানাহার। অনুরাগী বা মলিনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিবারের অন্যান্যদের সাথে স্নান ও পানাহার করতে চায় না বরং সামান্য আগে ও পরেই তারা করে থাকে। পানাহার, স্নান বা ঘুমের জন্য পুনঃপুন তাদের সাধতে হয়।
অনুরাগের উপকার
১. সরাসরি রাগ করা দ্বারা যা অর্জন করা সম্ভব নয় অনুরাগ দ্বারা তা অর্জন করা যায়।
২. অনুরাগ দ্বারা যে কোন সমস্যার শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যায়।
৩. রাগের দ্বারা অবসম্ভাবী যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় অনুরাগ দ্বারা তা হতে হয় না।
রাগ ও অনুরাগের পার্থক্য
১. কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
১. সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
২. রাগের দ্বারা প্রেম-প্রীতি ধ্বংস হয়।
২. অনুরাগ দ্বারা প্রেমে ও প্রীতি আরো প্রগাঢ় হয়।
১. রাগের দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয় না।
২. অনুরাগ দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয়।
১. রাগের পরিণতি ধ্বংস ও বিচ্ছেদ।
২. অনুরাগের পরিণতি মিলন ও মিমাংসা।
১. বড়বড় ক্ষতিকারক বিষয় হতে রাগের উৎপত্তি।
২. ছোটখাট বিষয়াদি হতে অনুরাগের উৎপত্তি।
১. রাগ সবার সাথে করা যায়।
২. অনুরাগ একান্ত প্রিয়জন ব্যতীত করা যায় না।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্র – আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি।

রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গঃ

রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গ:
(আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব ভেদ, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, নরত্বারোপ, স্বরূপদর্শন, আধ্যাত্মিকবিদ্যা ও বলন দর্শন)
রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গ: ০১.
সাহিত্য দুই প্রকার। যথা- ১. সাধারণ সাহিত্য (general literature) ও ২. রূপকসাহিত্য (fabulous literature)।
কেবল সাম্প্রদায়িক ও মরমী সাহিত্যই রূপকসাহিত্য আর সব সাধারণ সাহিত্য। আর রূপকসাহিত্যের সর্বদা দুটো দিক আছে।
(ক) রূপকদর্শন (mythology) ও (খ) আত্মদর্শন (theology)।
রূপকদর্শন (mythology) টি সবাই ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু আত্মদর্শন (theology) অনেকেই জানেন না। এ জন্যই সৃষ্টি হয় দলাদলি, উগ্রবাদ, আতংবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। যেমন কুরানিরা সবাই কারবালা উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র আলির mythology ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু theology অনেকেই জানেন না। তদ্রূপ পুরাণিরা সাবাই রামায়ণ উপন্যাসের নায়ক রামের mythology ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু theology অনেকেই জানেন না। শাস্ত্রীয় mythology এর theology না জানাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল কারণ। mythology কে যারা theology তে বা আত্মতত্ত্বে রূপান্তর করতে বা convert করতে পারেন না তারাই সাম্প্রদায়িক। পরিশেষে চিরন্তন একটি কথা এভাবে বলা যায়- সব mythology এর theology আছে কিন্তু সব theology এর mythology এখনো সৃষ্টি হয়নি।
সংক্ষিপ্ত।
সূত্রতথ্য
আত্মতত্ত্ব ভেদ (ষষ্ঠ খণ্ড)

রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গঃ

রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গ:
(আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব ভেদ, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, নরত্বারোপ, স্বরূপদর্শন, আধ্যাত্মিকবিদ্যা ও বলন দর্শন)
রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গ: ০১.
সাহিত্য দুই প্রকার। যথা- ১. সাধারণ সাহিত্য (general literature) ও ২. রূপকসাহিত্য (fabulous literature)।
কেবল সাম্প্রদায়িক ও মরমী সাহিত্যই রূপকসাহিত্য আর সব সাধারণ সাহিত্য। আর রূপকসাহিত্যের সর্বদা দুটো দিক আছে।
(ক) রূপকদর্শন (mythology) ও (খ) আত্মদর্শন (theology)।
রূপকদর্শন (mythology) টি সবাই ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু আত্মদর্শন (theology) অনেকেই জানেন না। এ জন্যই সৃষ্টি হয় দলাদলি, উগ্রবাদ, আতংবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। যেমন কুরানিরা সবাই কারবালা উপন্যাসের অন্যতম চরিত্র আলির mythology ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু theology অনেকেই জানেন না। তদ্রূপ পুরাণিরা সাবাই রামায়ণ উপন্যাসের নায়ক রামের mythology ন্যূনাধিক জানেন কিন্তু theology অনেকেই জানেন না। শাস্ত্রীয় mythology এর theology না জানাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল কারণ। mythology কে যারা theology তে বা আত্মতত্ত্বে রূপান্তর করতে বা convert করতে পারেন না তারাই সাম্প্রদায়িক। পরিশেষে চিরন্তন একটি কথা এভাবে বলা যায়- সব mythology এর theology আছে কিন্তু সব theology এর mythology এখনো সৃষ্টি হয়নি।
সংক্ষিপ্ত।
সূত্রতথ্য
আত্মতত্ত্ব ভেদ (ষষ্ঠ খণ্ড)

রূপকসাহিত্য প্রসঙ্গঃ


আধ্যাত্মিকবিদ্যার উৎপত্তি..

আধ্যাত্মিকবিদ্যার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ: (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন টীকা)
আত্মদর্শন-১
আধ্যাত্মিকবিদ্যার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
আধ্য বিণ আধ্যাত্মিকবিদ্যা সম্বন্ধীয়, আধ্যাত্মিকজ্ঞান সম্বন্ধীয় (আধ্যশক্তি)।
আধ্যজ্ঞান (রূপ)বি পরাজ্ঞান, ভেদজ্ঞান, ভেদবিধান, আত্মতত্ত্বজ্ঞান, আধ্যাত্মিকজ্ঞান, যে জ্ঞান দ্বারা জীবের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তাকে চিনা যায়।
আধ্যাত্মিক বিণ অধ্যাত্মিক, মানসিক, পারমার্থিক, আত্ম হতে উৎপন্ন, আত্ম সম্বন্ধীয়, spiritual. {বাং.আদি+ বাং.অতীত>}
আধ্যাত্মিকজ্ঞান (রূপ)বি আধ্যজ্ঞান, ভেদজ্ঞান, পরাজ্ঞান, ব্র‏হ্মজ্ঞান, আত্মিকজ্ঞান, মানসিকজ্ঞান, পারমার্থিকজ্ঞান, আত্ম সমন্বীয় জ্ঞান, spiritual knowledge.
আধ্যাত্মিকবিদ্যার সংজ্ঞা
আদি ও অতীত বিষয়ক বিদ্যাকে আধ্যাত্মিকবিদ্যা বলে।
আধ্যাত্মিকবিদ্যার উপকারিতা
১. আধ্যাত্মিকবিদ্যা মানুষের সুখী, প্রশান্তিময় ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবনের শিক্ষা দেয়।
২. আধ্যাত্মিকবিদ্যা পাঠের দ্বারা চুল ও দাড়ি কাঁচা রাখা ও চিরসুস্বাস্থ্য রক্ষা করার সুব্যবস্থাদি জানা যায়।
৩. আধ্যাত্মিকবিদ্যা প্রচার ও প্রসার দ্বারা বিশ্বজুড়ে শান্তিময় ও সুসভ্য সমাজ গঠন করা যায়।
৪. এ বিদ্যা পাঠ করার দ্বারা বৈজ্ঞানিক সর্ব প্রকার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার ছাড়াই মধুময় দাম্পত্য অতিবাহিত করা যায়।
আধ্যাত্মিকবিদ্যার উৎপত্তিমূল বা শিকড়ের সন্ধান করতে হলে সর্ব প্রথমে মহাশূন্য হতে বর্তমানকাল পর্যন্ত সৃষ্টিপর্বের ১০টি যুগ সম্পর্কে অবশ্যই জ্ঞানার্জন করা প্রয়োজন। এছাড়াও মানবসভ্যতার সপ্তযুগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা এ বিষয়টিকে আরো স্বচ্ছ করে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করে। নিচে মানবসভ্যতার সাতটি যুগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো-
১. আধুনিকযুগ (১,৯০০ খ্রি. হতে বর্তমানকাল পর্যন্ত)
২. মধ্যযুগ (১,৬০০- ১,৮০০ খ্রি.)
৩. আদিমযুগ (১,২০০- ১,৫০০ খ্রি.)
৪. ধাতুরযুগ (১,১০০- ১,৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
৫. প্রস্তরযুগ (১,৬০০- ৬,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
৬. প্রাগৈতিহাসিকযুগ (৬,১০০- ৮,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
৭. আদিযুগ (৮,১০০- ৪৮,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)।
উল্লেখ্য আধুনিক বিজ্ঞানিদের সর্বসম্পতিক্রমে পৃথিবীর আদিপ্রাণী অম্বুকের উদ্ভবের পর হতেই জীবসভ্যতারযুগ ধরা হয়। তবে কেবল ৪৮,০০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ হতেই মানবসভ্যতাযুগ ধরা হয়। অন্নদিকে পদার্থযুগ, শক্তিযুগ ও কারযুগকে সভ্যতারযুগ বলা হয় না।
৮. পদার্থযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- —— খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
৯. শক্তিযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- ———খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
১০. কারযুগ (১,৫০০,০০,০০,০০০- ——–খ্রিস্ট পূর্বাব্দ)
প্রায় একঅব্জ পাঁচনর্ব্যুদ (১,৫০০,০০,০০,০০০) বছর পূর্বে পৃথিবীর আদিপ্রাণী অম্বুকের সৃষ্টি হয়েছিল বলে বর্তমানে অধিকাংশ বিজ্ঞানিরা একমত। প্রায় আড়াইলক্ষব ছর (২,৫০,০০০) পূর্বে মানুষের উদ্ভব হয়েছে বলে বর্তমানে অনেক গবেষক ও মনীষীদের ধারণা। মানুষের উদ্ভবের পর হতে প্রায় দুইলক্ষবছর (২,০০,০০০) মানবসভ্যতার কোন উন্নয়ন হয়নি। অতঃপর প্রায় পঞ্চাশসহস্রবছর (৫০,০০০) পূর্বে ইঙ্গিতরূপেই ভাষার আবিষ্কার হয়। তখন হতেই মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রা আরম্ভ হয়। মানবসভ্যতার আধুনিকযুগ হতে প্রস্তরযুগ পর্যন্ত শিল্পকলা, স্থাপত্যবিদ্যা ও ভাস্কর্য নির্মাণে মানুষের বিভিন্ন উপকরণাদি ব্যবহারের অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন আধুনিক সভ্যতায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে লোহা, তামা ও ইস্পাত ইত্যাদি। আবার বস্ত্রাদি নির্মাণে ব্যবহার হচ্ছে তুলা। তেমনি প্রস্তরযুগে ভাস্কর্য ও শিল্পাদি নির্মাণের জন্য অধিক ব্যবহার করা হতো পাথর ও মাটি।
আদিযুগের মানুষ প্রযুক্তি নির্মাণ বা প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা প্রযুক্তি নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত উপাদানের ব্যবহার কোন কিছুই জানত না। তখন মানুষের কেবল আহার ও বিনোদন ব্যতীত সময় কাটানোর মতো কোন বিনোদন ব্যবস্থাই ছিল না। আহার অন্বেষণ ও বন্য জীবজন্তুর আক্রমণ হতে আত্মরক্ষার জন্য মানুষ তখন দলবদ্ধ বা সঙ্গবদ্ধভাবে বসবাস করত। তখন আহার ও বিহারের ফাঁকে ফাঁকে গোত্রপ্রধান বা দলপ্রধানরা স্ব-স্ব দল বা গোত্রের উচ্ছৃংখল, বিচ্ছৃংখল, উগ্র ও চরমপন্থিদের সুচ্ছৃংখল, সঙ্গবদ্ধ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য শিক্ষামূলক বিভিন্ন ছোটকি বা চমৎকার নির্মাণে ব্যস্ত থাকতেন। কারণ তখন ছোটকি বা চমৎকার নির্মাণ করতে কেবল জ্ঞান ভিন্ন অন্য কোন উপকরণের প্রয়োজন হতো না। আর এসব নির্মাণের জন্য তাদের কাগজ ও লেখনীর কোন প্রয়োজন হতো না। তখন তারা এসব মনেমনে নির্মাণ করতেন এবং মুখে মুখে প্রচার করতেন। আবার মাঝে মাঝে দলপ্রধানরা স্ব-স্ব নির্মিত ছোটকি ও চমৎকার বৈঠকীও করতেন। মানুষের আজকের কথ্য ও লেখ্য ভাষা আবিষ্কার ও ভাষার ব্যবহার আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিতের মাধ্যমেই স্রষ্টার ভয়ভীতি দ্বারা দুষ্টদের শাসন ও শিষ্টদের পালন করা হতো। তখন স্বর্গের সুখ ও নরকের ভয় দেখানো প্রথার প্রচলন যে ছিল না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। তবে স্রষ্টার ভয় যে দেখান হতো, তা শক্ত করেই বলা যায়। তখন ইঙ্গিতেই বলা হতো স্রষ্টা তোমাদের সব কিছু দেখেন বিধায় তোমরা অন্যায় করলে স্রষ্টা তোমাদের শাস্তি দিবেন। রূপকার দলপ্রধানদের নির্মিত ছোটকি বা চমৎকারাদির নামধাম ব্যবহার করে অন্যান্য দলপ্রধানরা তা দ্বারা দুর্বলদের ভয়ভীতি দেখিয়ে শাসনপালনও করতেন। প্রত্যেক গোত্র প্রধানরা তখন অন্যায়ের পরিমাণ অনুযায়ী অন্যাকারিকে শাস্তি অবশ্যই দিতেন। তা না হোলে দল বা গোত্র পরিচালনা করা কোন মতেই সম্ভব হতো না। এছাড়াও তারা অপরাধীদের ইঙ্গিতের মাধ্যমেই তাদের ভবিষ্যৎ দিক নির্দেষণাও দিতেন। এ হতেই অনুমান করা যায় যে রূপকার্থে নির্মিত নিরাকার স্রষ্টার ভয় দেখিয়ে দুষ্টদের শাসন ও শিষ্টদের পালন করার পদ্ধতি তখনি আবিষ্কার হয়েছিল বা প্রতিষ্ঠালাভ করেছিল। আত্মদর্শনের বিষয়-বস্তু নিয়ে রূপকার্থে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, আদিমানব, বর্থ্য, স্বর্গ ও নরক নির্ধারণ করে নির্মিত নীতি ও নৈতিকতা শিক্ষামূলক গল্প- কাহিনিকেই রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ বলা হয়।
আরো বলা যায় প্রাগৈতিহাসিকযুগ হতেই রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ গুরু পরম্পরার মাধ্যমে কালাতিপাত করতে করতে লেখন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এসেছিল। অতঃপর লেখন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়াই তা চামড়া, প্রস্তর ও গাছের পাতায় লিখে রাখার ব্যবস্থা চালু করা হয়। অতঃপর কাগজ আবিষ্কার হওয়ার পর রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করা আরম্ভ হয়। পৃথিবীর কোন্ প্রদেশে রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ আবিষ্কার আগে হয়েছিল এমন কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় না। তবে এশিয়া মহাদেশেই সর্ব প্রথম মানববসতি স্থাপিত হয়েছিল বলে প্রত্নতাত্ত্বিক ও গবেষণালব্ধ অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। সে সূত্র ধরে বলা যায় রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ সর্ব প্রথম উদ্ভাবন হয়েছিল এশিয়া মহাদেশে। রূপক পরিভাষা ও রূপকপরিভাষা নির্মাণ করে সাহিত্য নির্মাণ এটি একটি শিল্প। এর নাম রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ শিল্প। অত্যন্ত বাস্তবতার ভিত্তিতে বলা যায় এটি মানবসভ্যতার সর্ব প্রাচীন শিল্প বিধায় “একে মানবসভ্যতার প্রথম বা আদিশিল্প বলা হয়।” তবে বিশিষ্ট রূপকার, আচার্য ও ঋষিদের অভাবে বর্তমানে এ শিল্পটি মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে।
এবার শক্ত করেই বলা যায় কী প্রাগৈতিহাসিকযুগ ও কী ধাতুরযুগ বরং প্রস্তর-যুগেই এ রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ আবিষ্কার হয়েছিল। কারণ যে কোন শিল্প সৃষ্টি করতে হোলে অনেক উপকরণের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রস্তুরযুগে শিল্পাদি সৃষ্টি করার কোন উপাদান অবশ্যই ছিল না। তাই শিল্পকার্যে মানুষ আত্মনিয়োগ করতে পারত না। কিন্তু রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাণ করতে কেবল জ্ঞান ও বুদ্ধি ভিন্ন অন্য কোন উপাদানের প্রয়োজন হয় না। ‘Fabulous literature’ মূল উপাদান হলো কেবল চারটি। যথা- ১.মূলকশব্দ ও ২.রূপকপরিভাষা এবং ৩.মূলকসংখ্যা ও ৪.রূপকসংখ্যা। এ দ্বারাই দৈবিকা ও চমৎকার অনায়াসে সৃষ্টি করা যায়। আর এসব উপাদান মানবদেহেই অফুরন্ত পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিকবিদ্যা চিরসত্য ও চিরন্তন অনন্যবিদ্যা। এ বিদ্যা অসভ্য ও বর্বর মানুষকে সুসভ্য মানবসমাজ গঠনে অবর্ণনীয় ভূমিকা পালন করে। মানুষের কর্ম ও সুখী জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা করা হলো রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ এর মূল বৈশিষ্ট্য।
‘শরীর মাধ্যাং খলুঃ মতবাদ সাধনং’, অর্থাৎ শরীর ভালো না থাকলে কারো শাস্ত্রীয়কর্ম হয় না। এজন্য সাম্প্রদায়িক সংস্কারাদি সাধনার আগে স্বাস্থ্যরক্ষা করা একান্ত প্রয়োজন। সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানের মতেও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার। মানুষের এ অধিকার জাতিসংঘ মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণাপত্রে স্বীকৃত। ১৯৪৮ সনের ১০ই ডিসেম্বর ঘোষণার ২৫(ক) ধারায় বলা হয়েছে- “নিজের ও নিজ পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের নিমিত্ত পর্যাপ্ত জীবনমানের অধিকার প্রত্যেকের রয়েছে। শিশুকে সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী হয়ে বেঁচে উঠার সুযোগ দিতে হবে এবং শিশুর অধিকার থাকবে পর্যাপ্ত চিকিৎসালাভের।” জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রাদি উক্ত ঘোষণা মেনে চলতে বাধ্য। সেজন্য বাংলাদেশের সংবিধানে ১৮(১) ধারায় রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে বলা হয়েছে- “জনগণের পুষ্টির উন্নয়ন স্বাস্থ্যের উন্নতি সাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য করবে।” এ অধ্যায়ের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে- “স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে সব নাগরিকের সমতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র সর্বদা সচেষ্ট হবে।” এ হলো জনগণের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনগত ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি।
আধ্যাত্মিকবিদ্যার পরিচয়
বাংভারতীয়/ ‘Bangladesh and India’ উপমহাদেশে প্রাথমিক যুগের সংস্কৃত ভাষা মধ্যযুগের সংস্কৃত ভাষায় প্রবেশ করে শব্দের অর্থ প্রয়োগের কিছুটা পরিবর্তন সাধিত হয়। অনুরূপভাবে মধ্যযুগের সংস্কৃতভাষা আধুনিক বাংলাভাষায় প্রবেশ করলে শব্দের অর্থ প্রয়োগ এবং যথাশব্দ গ্রহণে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়, পরবর্তিতে আরও পরিবর্তন হতে পারে এটাই সুস্থ বিবেকের দাবি। আজ হতে প্রায় পাঁচসহস্র বছর পূর্বে আমাদের ভারতবর্ষের অসংখ্য সাধু সন্ন্যাসী মুনি ও ঋষিদের দ্বারা বৈক্তিকসদস্যাদির রূপকনামকরণের মাধ্যমে রচিত আত্মতত্ত্বনর্ভর অমূল্যবাণির দ্বারাই বিশ্বে সর্বপ্রথম মানবকল্যাণে রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ চর্চার সূচনা হয় এবং এটাই ছিল পৃথিবীর আদিসাহিত্য। একমাত্র আধ্যাত্মিক সাহিত্যের রূপকবর্ণনার দ্বারাই সাধুরা মানুষের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, শুক্রনিয়ন্ত্রণ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, সুখী পরিবার ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের সুশিক্ষা প্রদান করে এসেছিলেন। তখনও রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ এ অমূল্যবাণিগুলো মুখে মুখেই ছিল। ক্রমে ক্রমে এর গুরুত্ব ও কল্যাণকারিতার প্রতি লক্ষ্য করে এর ব্যাপক চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রায় চারসহস্র বছর পূর্বে সংস্কৃত ভাষায় ‘বেদ’ নামক একটি মহাগ্রন্থ রচিত হয়। এটা ছিল পৃথিবীর আদি আধ্যাত্মিকগ্রন্থ। ক্রমে ক্রমে গ্রন্থটির ব্যাপকতা ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে ও প্রচার প্রসার হতে থাকে। গ্রন্থটির জনপ্রিয়তার প্রতি লক্ষ্য করেই পরবর্তিকালে এর ব্যাখ্যা গ্রন্থ উপনিষদাদি রচিত হতে থাকে। অতঃপর এর রূপকব্যাখ্যা গ্রন্থ পুরাণাদি রচিত হয়। অতঃপর উপন্যাস আকারে রচিত হয় বেদনির্ভর ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ গ্রন্থাদি।
সংস্কৃত ভাষার আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ‘বেদ’ এর ব্যাপক চর্চা, অনুশীলন, প্রচার, প্রসার ও ক্রম বিস্তৃতি এবং এর উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য করে পালি ভাষাসহ পার্শ্ববর্তী অন্যান্য ভাষাতেও ক্রমে ক্রমে আধ্যাত্মিকবিদ্যা চর্চা, অনুশীলন ও গবেষণার সূচনা হয়। অতঃপর পালিভাষার শ্রমণ রাও সংস্কৃত ভাষার সাধু দের নির্ধারিত ও চয়িত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গোবিন্দ, শিব, কালী, হরি, নিতাই, গয়া, কাশী, মথুরা ও বৃন্দাবন ইত্যাদি শব্দ ও আধ্যাত্মিক সূত্রগুলো যথাযথ রেখে স্ব-স্ব ভাষায় আধ্যাত্মিক সাহিত্য রচনা করতে আরম্ভ করেন। সংস্কৃতভাষায় ব্যবহৃত শব্দগুলো ও সূত্রগুলো ব্যবহার করে প্রায় ৫০০ বছর ব্যবধানে ১৭টি গ্রন্থের সমন্বয়ে পালিভাষায় রচিত হয় অপর একটি আধ্যাত্মিকমহাগ্রন্থ ত্রিপিটক। (উল্লেখ্য বৈদিক গ্রন্থাদিতে ব্যবহৃত রূপকশব্দাবলী, সূত্রাবলী ও উপমাশৈলী এবং ত্রিপিটকনির্ভর গ্রন্থাদিতে ব্যবহৃত রূপকশব্দাবলী সূত্রাবলী ও উপমাশৈলী হুবহু একই)। পরবর্তিতে রূপকার্থে ত্রিপিটকনির্ভর আরও অসংখ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়।
বেদ ও ত্রিপিটক নির্ভর আধ্যাত্মিক শাস্ত্র গুলোর ব্যাপক চর্চা ও অনুশীলন হতে থাকে সারাএশিয়া মহাদেশে। মধ্যযুগীয় বর্বর জাতির সুখী পরিবার ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে অবৈজ্ঞানিক মধ্যযুগের ভারত-বর্ষীয় রূপক সাহিত্যের অসাধারণ ভূমিকা দেখে মধ্য-প্রাচ্যের পারস্য অলি ও আবদালরাও রূপক সাহিত্যের চর্চা ও অনুশীলন আরম্ভ করে। অত্যধিক চর্চা, অনুশীলন ও অধ্যাবসায়ের ফলে তারাও ‘Fabulous literature’ আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য ভারতে আধ্যাত্মিকবিদ্যা উৎপত্তির প্রায় দুইসহস্র বছর পরে পারস্য উপমহাদেশে ‘Fabulous literature’ রচনার শুভ সূচনা হয়। ভারতীয় ‘Fabulous literature’ সূত্রগুলো ও উপমা নির্মাণশৈলী একই রেখে কেবল শব্দ চয়নের ধারা পরিবর্তন করে অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও গোবিন্দ ইত্যাদি শব্দকে- আল্লাহ, রাসুল ও আদম ইত্যাদি শব্দের দ্বারা পরিবর্তন করে অসংখ্য ‘Fabulous literature’ রচিত হয়। উল্লেখযোগ্য এসব মহাগ্রন্থ গুলো রচনার সূত্রগুলো, উপমা নির্মাণশৈলী ও রূপক পরিভাষা চয়ন- আল্লাহ, রাসুল, নবি, আদম, হাওয়া, হাবিল, কাবিল, হারুৎ, মারুৎ, ইসা, মুসা, দাউদ ও সুলাইমান ইত্যাদি একই। আরও উল্লেখ্য ভারতীয় mythology ও পারস্য mythology এ উভয় বিদ্যারই ভাব, সূত্রগুলো, উৎপত্তিমূল এবং উপমা নির্মাণশৈলী একই শুধু রূপকার্থে চয়িতশব্দ গুলোই ভিন্ন।
এভাবে একই সূত্র ও উপমা নির্মাণশৈলীর দ্বারা রচিত mythology কেবল রূপক পরিভাষা চয়নের ভিন্নতার দ্বারা ভারতীয় ও পারস্য দু’বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অতঃপর উভয় mythology ক্রমে ক্রমে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রচার ও প্রসার লাভ করতে থাকে। উল্লেখ্য ‘Indian’ mythology প্রায় তিনসহস্র (৩০০০) বছর পূর্বে পারস্য উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল। পারস্য সুবিজ্ঞ সাধুরা এর সব রূপক পরিভাষাকে স্বস্ব মাতৃভাষায় সার্থক অনুবাদ করেই তা গ্রহণ করেছিলেন। ৩০০০ বছর পরে অর্থাৎ আজ হতে মাত্র ছয়শত (৬০০) বছর পূর্বে সে পারস্য mythology পুনরায় ভারতবর্ষে প্রবেশ করে। কিন্তু আজো এ উপমহাদেশের অনুবাদকরা পারস্য ‘Fabulous literature’ এর রূপক পরিভাষাদির সার্থক অনুবাদ করতে সক্ষম হননি। অনুবাদকরা অনুবাদ করার সময়ে আল্লাহ, রাসুল, আদম, হাওয়া, ইসা, মুসা ও সুলাইমান ইত্যাদি রূপক পরিভাষার সফল কোন অনুবাদ না করে নামপদ বা বিশেষ্যপদ বলে তা হুবহু রেখে দিয়েছেন।
ফলে সাধারণ জনগণের নিকট এটা নতুন বা ভিন্ন কোন অভিনব বিদ্যা বলে প্রতীয়মান হয়ে আসছে। উল্লেখ্য গত অর্ধ শতাব্দি হতে বাংভারতীয় উপমহাদেশের নব্য অনুবাদকরা পারস্য আধ্যাত্মিক বিদ্যা নির্ভর বিভিন্ন গ্রন্থ বাংলাভাষায় অনুবাদ করার সময়ে পারস্য ‘Fabulous literature’ রূপক পরিভাষা গুলোকে নামপদ বা বিশেষ্যপদ বলে কোন অনুবাদ বা প্রতিশব্দ প্রণয়ন না করে হুবহু তাই রেখে দিয়েছেন। এমনকি কোনো অনুবাদক বা অভিধানবেত্তা রূপক পরিভাষা গুলোর কোন প্রকার অর্থও প্রদান করেননি। ব্যাপারটি সম্পূর্ণ উল্টো কারণ সাধারণ সাহিত্যে নামপদের কোন অনুবাদ হয় না বটে কিন্তু ‘Fabulous literature’ চয়িত নামপদ গুলোর কয়েক শত পর্যন্ত প্রতিশব্দ হয়ে থাকে। প্রায় সহস্র বছর পূর্ব হতে পারস্য সাধুদের ভারতবর্ষে আগমনের মধ্যমে আল্লাহ, রাসুল, আদম, হাওয়া, ইসা, মুসা, সুলাইমান, জিব্রাইল, মিকাইল, জান্নাত ও জাহান্নাম ইত্যাদি পারস্য আধ্যাত্মিক সাহিত্যের রূপক পরিভাষা গুলো বাংভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। অতঃপর প্রায় ৬০০ বছর পূর্বে মোঘল সম্রাটদের আধিপত্যের ছত্রছায়ায় পারস্য পণ্ডিতদের দ্বারা পারস্য mythology হতে সংস্কারিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারগুলো শাস্ত্রীয় Guidelines নামে ভারতবর্ষে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠালাভ করে। তখন হতেই শাস্ত্রীয় Guidelines আশ্রয়িদের নিকট হতে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের বহু কষ্টার্জিত বাংভারতীয় mythology বা প্রকৃত আত্মদর্শন ‘real introspection’ বা ‘real theosophy’ ক্রমেক্রমে অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বিলুপ্ত হতে থাকে। অর্থ্যাৎ প্রকৃত আত্মদর্শন (real introspection) মারা যায় এবং প্রতীকী আত্মদর্শন (symbolic introspection) সমাজে প্রতিষ্ঠালাভ করে। সমাজের প্রায় সর্বত্রই (realism) এর পরিবর্তে (symbolism) প্রতিষ্ঠা হতে আরম্ভ করে। ফলে বাস্তব আত্মদর্শনের প্রতি সৃষ্টি হতে থাকে বিদ্বেষ ও বিরোধের বিষোদগারপূর্ণ মনোভাব।
অতঃপর পারস্য ‘Fabulous literature’ হতে সংস্কারিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় Guidelines গুলোর ধ্বজাধারী পরগাছা নব্যপণ্ডিতরা আমাদের ভারতীয় আদি mythologyকে মন্দ, পরিত্যাজ্য ও বিপথগামী বলে কটুক্তিপূর্ণ ধৃষ্টতা প্রদর্শন করতে আরম্ভ করে। অপরদিকে কালের আবর্তন ও বিবর্তনের ফলে প্রায় চারসহস্র বছরের ব্যবধানে ভারতীয় পণ্ডিতরাও ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গোবিন্দ, শিব, কালী, রাম, লক্ষ্মণ ও সীতা ইত্যাদি আধ্যাত্মিক সাহিত্যের ‘Metaphor terminologies’ এর উৎপত্তিমূল হারিয়ে ফেলে প্রায় দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে আল্লাহ, রাসুল, আদম, হাওয়া, হারুৎ, মারুৎ, জান্নাত, জাহান্নাম এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গোবিন্দ, কানাই, বলাই, স্বর্গ ও নরক ইত্যাদি ‘Metaphor terminology’ এর দ্বারা উভয় ‘Fabulous literature’ প্রকৃতভাবে কী বা কাকে বুঝানো হয় এবং এর মর্মভেদইবা কী এর উপকারিতাইবা কী ইত্যাদির প্রতি কোন পণ্ডিত লক্ষ্য করেননি ।
তার পরিবর্তে সাধারণ জনগণের নিকট ক্রমে ক্রমে বিভিন্ন উপমা দ্বারা জনশ্রুতি, গুজব, রটনা, লোকশ্রুতি, কিংবদন্তি, রূপকথা, লোককথা, জনপ্রবাদ, লোকপ্রবাদ, কথিত কথা, লোক পরস্পরায় প্রচলিত কথা, লোকমুখে প্রচারিত কথা, লোক পরস্পরায় শ্রুত ও কথিত কথা, লোক পরস্পরায় রটা কথা, দীর্ঘদিন ধরে লোকমুখে চলে আসা কথা ইত্যাদি অন্তঃসারশূন্য গল্প-কাহিনি রূপে পরিণত করেছেন বিশ্বের সব মহান রূপকসাহিত্যকে। এ জন্য আধ্যাত্মিক সাহিত্যের অমর ও অমূল্য রূপক কাহিনি গুলো মূলশিক্ষা ও স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে। ফলে আধ্যাত্মিক সাহিত্যের উপমা গুলোর ওপর ভিত্তি করে যাত্রাপালা, নাটক-নাটিকা ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনি শিল্প নির্মাতারা। আধ্যাত্মিক সাহিত্যের নিয়ম অনুযায়ী নির্মিত ও উপস্থাপিত মনোরম ছোটছোট গল্পগুলো ক্রমে ক্রমে নাটক-নাটিকা, ছায়াচিত্র, গ্রন্থ-গ্রন্থিকা ও লোক সাহিত্যের দ্বারা পৃথিবীর সর্বত্র প্রায় সর্বভাষায় সর্ব সাধারণের নিকট মর্মগ্রাহী ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠতে থাকে।
ভারতবর্ষের ‘Fabulous literature’ দৈবিকা বা প্রতীতিদের আত্মতত্ত্ব অলৌকিক কাহিনিই আরব বিশ্বে মুজেযা ও কারামত নামে পরিচিতি লাভ করে। এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষণীয় ও উপদেশমূলক গল্প আকারে পাঠ দানেরও শুভ-সূচনা হয়। মহাভারতে রূপকার্থে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয় চির অমর মহাকাব্য ‘শ্রীমদ্ভগবদ গীতা, রামায়ণে রাম-রাবণের এক ভয়াবহ কল্পিত যুদ্ধ বর্ণনা করা হয়। বিশ্ববিখ্যাত মহাগ্রন্থ রামায়ণের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয় মহাকাব্য ‘মেঘনাথ বধ’ এবং মহাগ্রন্থ বেদের ওপর ভিত্তি করে শাস্ত্রীয় Guidelines রূপে রচিত হয় ‘উপনিষদগুলো। আরো পরে আধ্যাত্মিক সাহিত্যের রূপকগল্প গুলোর ওপর ভিত্তি করে রচিত হতে থাকে অসংখ্য উপন্যাস, মহাকাব্য ও মহাগ্রন্থ। উপন্যাসের মধ্যে পারস্য উপন্যাস গুলো উল্লেখযোগ্য। আরব বিশ্বের সুবিখ্যাত কাববালা উপন্যাসের ফুরাত নদির তীরবর্তী হোসেন বধ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয় অমরগ্রন্থ ‘বিষাদসিন্ধু’ ও মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’।
অতঃপর আরব্য বিশ্বের মূল মহাগ্রন্থ গুলোর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তি কালে রচিত হতে থাকে শাস্ত্রীয় Guidelines বিষয়ক ব্যক্তি মতামত নির্ভর হানাফি, শাফিয়ি, মালিকি ও হাম্বলি ইত্যাদি ফিক্বা গ্রন্থ। মানব জাতীর চির কল্যাণের জন্য থরে বিথরে রচিত হয়েছে হাদিস’ গ্রন্থগুলো। এগুলো মূল মহাগ্রন্থ গুলোর রূপক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নির্ভর এবং আধ্যাত্মিক সাহিত্যের চিরন্তনবাণী আত্মতত্ত্ব ও সাধন তত্ত্ব বিষয়ক মহামূল্যবান গ্রন্থ। বস্তুত মূল মহাগ্রন্থ তৌরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কুরান হতে কয়েকশত বছর ব্যবধানের কারণে ও রূপকার্থে রচিত হাদিস গ্রন্থগুলো এবং শাস্ত্রীয় Guidelines বিষয়ক ফিক্বা গ্রন্থ গুলো রচিত হওয়ার কারণে মানুষ ক্রমেক্রমে মূল মহাগ্রন্থগুলোর real theosophy পরিহার করে শাস্ত্রীয় Guidelines এর প্রতি ঝুঁকে পড়তে আরম্ভ করে। ফলে theosophy বা সাধু শাস্ত্রীয় অমূল্য শিক্ষাও ক্রমেক্রমে অবলুপ্ত হতে থাকে। উল্লেখ্য শাস্ত্রীয়দর্শন ও প্রকৃত আত্মদর্শন এক নয়। তারপরও সাধারণ মানুষ শাস্ত্রীয় সাম্প্রদায়িক দর্শনকে প্রকৃত দর্শন মনে করে ক্রমেক্রমে শাস্ত্রীয় সাম্প্রদায়িক দর্শন নির্ভর হয়ে পড়তে আরম্ভ করে।
অবলুপ্ত theosophy পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুগেযুগে বড়বড় সাধু সন্ন্যাসিরা অবর্ণনীয় প্রচেষ্টা ও প্রয়াস করে গেছেন। ফলে শাস্ত্রীয় Guidelines বর্তমান থাকা সত্ত্বেও আধ্যাত্মিকপন্থিদের জন্য ক্বাদরিয়া, চিস্তিয়া, নক্সাবন্দিয়া ও মুজাদ্দিদিয়া নামক প্রধান চারটি ত্বরিক্বাসহ প্রায় লক্ষাধিক ত্বরিক্বার আবিষ্কার হয়েছে। মূল আধ্যাত্মিক শিক্ষা হতে বিচ্যুতি হওয়ার ফলে দিশেহারা মানুষ ক্রমে ক্রমে দল-উপদল ও শাখা-প্রশাখায় বা একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য theosophy সর্বকালে সর্বযুগে সারাবিশ্বে একই। এর কোন শাখা প্রশাখার উৎপত্তি আজও হয়নি আর কোনদিন হবেও না। কারণ আধ্যাত্মিক বিশ্ববিদ্যালয় মাত্র একটি তা হলো ‘মানবদেহ’। সৃষ্টি জগতে মানবের ঊর্ধ্বে আর কিছু নেই। ফলে একমাত্র মানবদেহ খুঁজলেই পরম সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার সন্ধান পাওয়া যায়। বাঙালী হয়েও বাংলা সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পরিভাষার জ্ঞান অর্জন না করে কেউ কেউ কেবল সংস্কৃত পরিভাষায় সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক জ্ঞান বুঝেন ও বুঝান (গোঁসাইরা), আবার কেউ কেউ কেবল আরবি পরিভাষায় সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক জ্ঞান বুঝেন ও বুঝান (পিরেরা)। ফলে মূল বিষয় দাঁড়ায় এরূপ গোঁসাই ও পিরেরা নিজেও কিছু বুঝেন না এবং শিষ্যদেরও কিছুই বুঝাতে সক্ষম হন না। তারা নিজেরাও যেমন বিপথগামী তদ্রূপ তাদের শিষ্যরাও চরম বিপথগামী। বুদ্ধিমান গোঁসাই, পির, শিষ্য ও পাঠকদের উচিৎ সর্ব প্রথমে যার যার মাতৃভাষায় যার যার সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পরিভাষা গুলো ভালোভাবে জেনে ও বুঝে নেওয়া। অতঃপর সাধন-ভজন কিংবা সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক প্রচার প্রসারে আত্মনিয়োগ করা। নিজের মাতৃভাষায় কোন কিছু ভালোভাবে বুঝে না নিলে তা কোনদিন তার কোন উপকারে আসবে না। আপন মাতৃভাষায় কোন কিছু একবার বুঝে নেয়া অন্য ভাষায় সহস্র বার বুঝে নেয়ার চেয়েও উত্তম।
সংক্ষিপ্ত
আধ্যাত্মিকবিদ্যা পরিচিতি
লেখক, বলন কাঁইজি।

আধ্যাত্মিকবিদ্যার বিষয়বস্তু

আধ্যাত্মিকবিদ্যার বিষয়বস্তু: (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, স্বরূপদর্শন, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন টীকা)
আত্মদর্শন- ২
আধ্যাত্মিক বিদ্যার বিষয়বস্তু
আধ্যাত্মিক বিদ্যার বিষয়বস্তু হলো আত্মদর্শন জানা, অটল হওয়া, দীর্ঘায়ুলাভ করা ও সুখী পরিবার গঠন করা। এছাড়া মূলকসত্তা, মূলকসংখ্যা ও পঞ্চরসের আলোচনাও অধিক অধিক করা হয়ে থাকে। আধ্যাত্মিক বিদ্যার বিষয়বস্তু দুই প্রকার। যথা- ১.উৎপত্তিমূল ও ২.উপকারিতা।
১. উৎপত্তিমূল
উৎপত্তিমূল পাঁচ প্রকার। যথা- ১.অঙ্গাদি ২.দ্রব্যাদি ৩.বিষয়াদি ৪.শক্তিগুলো ও ৫. সদস্যাদি ।
১. অঙ্গাদি
মানবদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মধ্যে বাহ্য ১.চক্ষু, ২.কর্ণ, ৩.নাসিকা, ৪.মুখ, ৫.শিশ্ন ও ৬.কবন্ধ- এ ৬টি অঙ্গের আলোচনা এ শাস্ত্রে অধিক পরিমাণে করা হয়ে থাকে।
২. দ্রব্যাদি
মানবদেহের দ্রব্যাদির মধ্যে ১. লালা, ২. দুগ্ধ, ৩. শুক্র, ৪. সুধা ও ৫. মধু- এ পঞ্চরসের অলোচনা অধিক পরিমাণে করা হয়ে থাকে।
৩. বিষয়াদি
মানবের বয়স, কর্ম, পরিবার ও বৃত্তি ইত্যাদির আলোচনা অধিক পরিমাণে করা হয়ে থাকে। আধ্যাত্মিক বিদ্যায় নাভিকে মানব দেহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ধরা হয়। নাভিকে কেন্দ্র ধরে যেভাবে বৈক্তিক সদস্যগুলোর দ্বারা উপমা নির্মাণ করা হয়।
১. আত্মাকে সব সময় নরচরিত্রে রাখা হয়।
২. কাঁইকে সূর্য ধরা হয়।
৩. গর্ভাশয়কে পাতাল, আকাশ বা স্বর্গ ধরা হয়।
৪. জ্ঞানকে গুরু ধরা হয়।
৫. দেহের অসুস্থতাকে (রজকাল) রাত, অমঙ্গল, ভাটা বা ভাটি ধরা হয়।
৬. দেহের সুস্থতাকে (পবিত্রতা) দিন, মঙ্গল, জোয়ার বা উজান ধরা হয়।
৭. নরদেহকে বৃন্দাবন বা কৈলাস ইত্যাদি ধরা হয়।
৮. নর-নারির একত্র দাম্পত্য জীবনকে পরিপূর্ণ মানবজীবন বা মানুষ ধরা হয়।
৯. নাভির ওপরের অংশকে আকাশ ঊর্ধ্বাঙ্গ, উচ্চাঙ্গ, আগধড় বা পশ্চিম ধরা হয়।
১০. নাভির নিচের অংশকে ভূমি, নিম্নাঙ্গ, পাতাল, পাছধড় বা পূর্ব ধরা হয়।
১১. নারিদেহকে নিধুবন ও লীলাভূমি ইত্যাদি ধরা হয়।
১২. নাসিকাকে বাঁশি ধরা হয়।
১৩. শুক্রকে সব সময় নারি চরিত্রে রাখা হয়। যেমন- কমলা, বেহুলা, লক্ষ্মী, জুলেখা, ফাতিমা।
১৪. মনকে শিষ্য ধরা হয়।
১৫. মানবদেহের হৃদপিণ্ডের অবস্থানের পার্শ্বকে বামপার্শ্ব বা উত্তর ধরা হয়।
১৬. মানবদেহের হৃদপিণ্ডের অবস্থানের বিপরীত পার্শ্বকে ডানপার্শ্ব বা দক্ষিণ ধরা হয়।
১৭. শুধু নর বা পুরুষকে অর্ধাঙ্গ বা অর্ধমানুষ ধরা হয়।
১৮. শুধু নারী বা মহিলাকে অর্ধাঙ্গিনী বা অর্ধমানুষ ধরা হয়।
৪. শক্তিগুলো
শক্তি গুলোর মধ্যে ১. আত্মা ২. মন ৩. জ্ঞান ৪. বিচার ৫. বুদ্ধি ও ৬. কামশক্তির আলোচনা অত্যাধিক করা হয়ে থাকে।
৫. সদস্যাদি
বৈক্তিক সদস্যগুলো পাঁচ প্রকার। যথা- ১. মূলকসদস্য ২. রূপকসদস্য ৩. উপমানসদস্য ৪. চারিত্রিকসদস্য ও ৫. ছদ্মনামসদস্য। এছাড়া মূলকসংখ্যাকেও রূপকসাহিত্যে ৫. মূলকসংখ্যা সদস্য বলা হয়।
১. মূলকসদস্য
রূপক সাহিত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট শক্তি, বিষয়-বস্তু ইত্যাদির মূল সত্তাকেই মূলক বলে। যেমন- হাতের মূলক শিশ্ন।
মূলকরূপে ব্যবহৃত শক্তি, বিষয়-বস্তু ইত্যাদি সত্তাকে মূলকসদস্য বলে। যেমন- শিশ্ন ও কবন্ধ ইত্যাদি।
রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাতা সুমহান মনীষিদের মতে ব্যক্তিসত্তা বা মূলকসদস্য প্রায় ১০০টি। এ সদস্যগুলোর রূপক, ব্যাপক ও প্রপকগুলো দ্বারা spiritualogy বা ‘Fabulous literature’ নির্মাণ করা হয়। নিচে ১০০টি মূলকসদস্য তুলে ধরা হলো।
মূলকসদস্য
১. অজ্ঞতা, ২. অতীতকাহিনি, ৩. অন্যায়, ৪. অবিশ্বাসী, ৫. অভিশাপ, ৬. অর্ধদ্বার, ৭. অশান্তি, ৮. আগধড়, ৯. আয়ু, ১০. আশীর্বাদ, ১১. আশ্রম, ১২. ইঙ্গিত, ১৩. উপমা, ১৪. উপস্থ, ১৫. উপহার, ১৬. উপাসক, ১৭. কানাই, ১৮. কাম, ১৯. কামরস, ২০. কিশোরী, ২১. কৈশোরকাল, ২২. গবেষণা, ২৩. গর্ভাবস্থান, ২৪. চক্ষু, ২৫. চন্দ্রচেতনা, ২৬. চিন্তা, ২৭. জন্ম, ২৮. জরায়ু, ২৯. জিগীষা, ৩০. জীবনিশক্তি, ৩১. জ্ঞান, ৩২. ডান, ৩৩. দুগ্ধ, ৩৪. দেহ, ৩৫. দৈবিকা, ৩৬. নর, ৩৭. নরদেহ, ৩৮. নারিদেহ, ৩৯. নারী, ৪০. নাসিকা, ৪১. ন্যায়, ৪২. পঞ্চবায়ু, ৪৩. পঞ্চরস, ৪৪. পবিত্রতা, ৪৫. পরকিনী, ৪৬. পরম্পরা, ৪৭. পাঁচশতবছর, ৪৮. পাছধড়, ৪৯. পালনকর্তা, ৫০. পুরুষ, ৫১. পুরুষত্ব, ৫২. প্রথমপ্রহর, ৫৩. প্রয়াণ, ৫৪. প্রসাদ, ৫৫. প্রেমিক, ৫৬. বন্ধু, ৫৭. বর্তমানজনম, ৫৮. বলাই, ৫৯. বসন, ৬০. বাম, ৬১. বার্ধক্য, ৬২. বিদ্যুৎ, ৬৩. বিনয়, ৬৪. বিনোদন, ৬৫. বিশ্বাসী, ৬৬. বৃদ্ধা, ৬৭. বৈতরণী, ৬৮. ব্যর্থতা, ৬৯. ভগ, ৭০. ভালোবাসা, ৭১. ভৃগু, ৭২. মন, ৭৩. মনোযোগ, ৭৪. মানুষ, ৭৫. মুমুর্ষুতা, ৭৬. মুষ্ক, ৭৭. মূত্র, ৭৮. মূলনীতি, ৭৯. মোটাশিরা, ৮০. যৌবন, ৮১. যৌবনকাল, ৮২. রজ, ৮৪. রজকাল, ৮৪. রজপট্টি, ৮৫. রজস্বলা, ৮৬. শত্রু, ৮৭. শান্তি, ৮৮. শুক্র, ৮৯. শুক্রধর, ৯০. শুক্রপাত, ৯১. শুক্রপাতকারী, ৯২. শেষপ্রহর, ৯৩. শ্বাস, ৯৪. সন্তান, ৯৫. সন্তানপালন, ৯৬. সপ্তকর্ম, ৯৭. সহস্রবছর, ৯৮. সৃষ্টিকর্তা, ৯৯. স্তন ও ১০০. স্বভাব।
২. রূপকসদস্য
রূপকসাহিত্যের/ ‘Fabulous literature’ মূলকসদস্যের রূপক, ব্যাপক, চারিত্রিক ও ছদ্মনামগুলোকে রূপকসদস্য বলে।
রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাতা সুমহান মনীষিদের মতে রূপকসদস্যও প্রায় ১০০টি। এ সদস্যগুলোর ব্যাপক ও প্রপকগুলো দ্বারা ‘Fabulous literature’ বা রূপকসাহিত্য নির্মাণ করা হয়। নিচে ১০০টি রূপকসদস্য তুলে ধরা হলো।
রূপকসদস্য
১. senility, ২.steady ৩. অমাবস্যা, ৪. অরজা, ৫. অর্যমা, ৬. অসু, ৭. অহিত, ৮. আগুন, ৯. আচোট, ১০. আত্মা, ১১. আস্তিক, ১২. ইতিহাস, ১৩. ইহকাল, ১৪. উত্তর, ১৫. উপাসনা, ১৬. ঊষা, ১৭. কণ্ডনি, ১৮. কল্প, ১৯. কাঁই, ২০. কাপুরুষ, ২১. ক্ষীর, ২২. গরল, ২৩. গাছ, ২৪. গুরু, ২৫. গোপী, ২৬. ঘুম, ২৭. ঘোষক, ২৮. চমৎকার, ২৯. জনক, ৩০. জৈব্যতা, ৩১. জোয়ার, ৩২. ডালিম, ৩৩. তপোবন, ৩৪. তিরোধান, ৩৫. ত্রিবেণী, ৩৬. থলি, ৩৭. দক্ষিণ, ৩৮. দক্ষিণা, ৩৯. দ্বীপান্তর, ৪০. দ্রষ্টা, ৪১. ধন, ৪২. ধর্ম, ৪৩. নদ/নদী, ৪৪. নদিয়া, ৪৫. নরক, ৪৬. নাগর, ৪৭. নাস্তিক, ৪৮. নিদান, ৪৯. নিধুবন, ৫০. নিধুয়া, ৫১. নিরীক্ষ, ৫২. নিষ্কামিতা, ৫৩. নেংটি, ৫৪. পদ, ৫৫. পরাজয়তা, ৫৬. পর্যটন, ৫৭. পশ্চিম, ৫৮. পাণ্ডব, ৫৯. পাপ, ৬০.পাশাখেলা, ৬১. পিড়ি, ৬২. পুণ্য, ৬৩. পুনরুত্থান, ৬৪. পূর্ণিমা, ৬৫. পূর্ব, ৬৬. পৌরুষ, ৬৭. প্রতীতি, ৬৮. প্রত্যাদেশ, ৬৯. প্রেম, ৭০. বণিক, ৭১. বনবাস, ৭২. বর, ৭৩. বাঁশি, ৭৪. বাতাস, ৭৫. বিম্বল, ৭৬. বৃন্দাবন, ৭৭. বেলা, ৭৮. ব্রজ, ৭৯. ভক্তি, ৮০. ভোগ, ৮১. মধ্যমা, ৮২. মিত্র, ৮৩. মূর্তি, ৮৪. মূর্তিপূজা, ৮৫. মৃত্যু, ৮৬. যোগ, ৮৭. রজকিনী, ৮৮. রথ, ৮৯. রিপু, ৯০. শিষ্য, ৯১. শোষী, ৯২. সপ্তর্ষি, ৯৩. সম্পদ, ৯৪. সাঁই, ৯৫. সাধক, ৯৬. সুড়ঙ্গ, ৯৭. সেতু, ৯৮. সৈস্বরা, ৯৯. স্বর্গ ও ১০০. স্বল্প।
৩. উপমানসদস্য
ব্যক্তি সত্তার মূলক গুলোর তুলনা মূলক পরিভাষা গুলোকে উপমান সদস্য বলে। রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাতা সুমহান মনীষীদের মতে উপমান সদস্য প্রায় ৫৮টি। এসব রূপক, ব্যাপক ও প্রপক গুলো দ্বারা রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাণ করা হয়। personifies মূলকগুলোর রূপক ও ব্যাপকপরিভাষা ব্যতীত কখনই ‘Fabulous literature’ নির্মিত হয় না। নিচে কয়েকটি উপমানসদস্য তুলে ধরা হল-
উপমানসদস্য
১.অচেতন, ২.অবতার, ৩.অর্ধবেলা, ৪.অষ্ঠি, ৫.আকাশ, ৬.আগুন, ৭.আত্মহত্যা, ৮.আলো, ৯.উল্কা, ১০.কাপুরুষ, ১১.খুঁটি, ১২.গাড়ি, ১৩.গোপী, ১৪.গ্রন্থ, ১৫.ঘাট, ১৬.ঘানি, ১৭.চাতক, ১৮.জনম, ১৯.ঢেমনা, ২০.দস্যু, ২১.দিন, ২২.ধার্মিক, ২৩.ধ্যান, ২৪.নির্বাণ, ২৫.নিহার, ২৬.পথ, ২৭.পরকাল, ২৮.পরপার, ২৯.পূজা, ৩০.ফুঁৎকার, ৩১.বিগ্রহ, ৩২.বিদেশ, ৩৩.বিষ, ৩৪.বীর, ৩৫.ভাড়া, ৩৬.ভ্রমণ, ৩৭.ময়না, ৩৮.মরাগাছ, ৩৯.মরুভূমি, ৪০.মর্ত্য, ৪১.মায়া, ৪২.যন্ত্রণা, ৪৩.যবন, ৪৪.রাত, ৪৫.লাউ, ৪৬.লালন, ৪৭.লোকান্তর, ৪৮.লৌকিকা, ৪৯.সকাল, ৫০.সন্ধ্যা, ৫১.সম্প্রদান, ৫২.সরন্দ্বীপ, ৫৩.সুখ, ৫৪.সুড়ঙ্গ, ৫৫.সুশোভিতবৃক্ষ, ৫৬.স্বর্গীয়ান্ন, ৫৭.স্বর্গ ও ৫৮.স্বর্গদ্বার।
৪. চারিত্রিকসদস্য
চরিত্ররূপে ব্যবহৃত বৈক্তিক সদস্যের রূপকনাম গুলোকে চারিত্রিক সদস্য বলে।
রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ নির্মাতা সুমহান মনীষিদের মতে চরিত্ররূপে ব্যবহৃত বৈক্তিকসদস্যের অনেক ছদ্মনাম রয়েছে। বৈক্তিক সদস্যগুলোর রূপক, ব্যাপক ও উপমান পরিভাষগুলোর দ্বারা নির্মাণ করা হয় প্রপক এবং প্রপকগুলোর দ্বারা নির্মাণ করা হয় রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ । কিন্তু শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক পণ্ডিত ও বক্তারা বিষয়টি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতে বা বুঝতে পারেন না। চরম অন্ধ-বিশ্বাসের ভিত্তিতে তারা রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ এর চরিত্রগুলোকে ঐশীদূত বা ঐশী মহামানব রূপেই বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। ফলে সমাজের সাধারণমানুষ চিরদিনের জন্যই রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ মূলশিক্ষা হতে চিরবঞ্চিত হয়ে থাকে। রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির কয়েকটি চারিত্রিকসদস্য তুলে ধরা হলো।
চারিত্রিকসদস্য
১.অণ্ডাল, ২.অপত্য, ৩.অবাচী, ৪.অর্জুন, ৫.ইন্দ্র, ৬.উদীচী, ৭.ঋভু, ৮.কণ্ডনি, ৯.কানীন, ১০.গাছ, ১১.গাণ্ডিব, ১২.চরণ, ১৩.জিষ্ণু, ১৪.দৈন্য, ১৫.ধন্বন্তরী, ১৬.পবন, ১৭.প্রতিপদ, ১৮.প্রভু, ১৯.বংকিম, ২০.বলাই, ২১.বলন, ২২.বসিধ, ২৩.বৈয়াম্বু, ২৪.বর্থ্য, ২৫.ব্রজ, ২৬.মানুষগুরু, ২৭.যম, ২৮.রতী, ২৯.শুভ্রাংশ, ৩০.সেতু ও হিল্লোল।
এছাড়াও নিচের এ কয়টি সদস্য সম্পর্কে একবার ভালোভাবে জেনে নিলে পুরো শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক বিশ্বকে অতি সহজেই জানা ও বুঝা যায়।
অগ্নিশিখা, অচেতন, অণ্ডাল, অধঃপতন, অন্ধকুপ, অপত্য, অবতার, অবাচী, অবীচি, অমৃতসুধা, অর্জুন, অর্ঘ্য, অর্ধবেলা, অলৌকিক কার্য, অষ্ঠি, অসুর, আকাশ, আত্মহত্যা, আদিপিতা, আদিমাতা, আদিত্য, আশিস, আশীব, আলো, ইড়া, ইতিবৃত্ত, ইন্দ্র, উদীচী, উবুদগাছ, উল্কা, উষ্ণজল, ঋভু, ঐশী দূত, ঐশী বাণী, ঔপমিক, কমলা, কল্পতরু, কানীন, কাহিনি, কিরীটী, কুকুর, কুঞ্জ, কৃষ্ণপক্ষ, খুঁটি, গাছ, গাড়ি, গাণ্ডিব, গুপ্তপথ, গ্রন্থ, ঘাট, ঘানি, চন্দ্রশ্বাস, চরণ, চাঁদ, চাতক, চৈনন, চোর, জনম, জগৎগুরু, জগাই, জিষ্ণু, জ্যোতিকা, টল, তপোলোক, দস্যু, দিন, দেশান্তর, দৈন্য, ধনুক, ধন্বন্তরী, ধার্মিক, ধ্যান, নদিয়া, ননি, নবদ্বীপ, নাগর, নির্বাণ, নিহার, নৈবেদ্য, নৌকা, পণ, পদ, পরকাল, পাঁচভাই, পাখি, পাতাল, পিঙ্গলা, পূজা, পৈথান, পৈবত্র, পৈয়র, প্রকৃতপথ, প্রকৃতি, প্রতিপদ, প্রতিমা, প্রতীচী, প্রভু, প্রেমাগুন, ফল, ফুঁৎকার, বংকিম, বরুণ, বলন, বসিধ, বসিধের বাহন, বালিশ, বিগ্রহ, বিদেশিনী, বিরজা, বিষ, বীরত্ব, বৃন্দাবন, বৈকুণ্ঠ, বৈয়াম্বু, বর্থ্য, ভজনালয়, ভালোকর্ম, ভ্রমণ, মমতা, ময়না, মরণ-উন্নুখ, মরা, মরাগাছ, মরুভূমি, মর্ত্য, মাধাই, মানুষ গুরু, মায়া, মিথিলা, মিনতি, মৈত্রিকেয়, মোহ, মোহমায়া, যজ্ঞ, যন্ত্রণা, যবন, যম, যমুনা, রক্ষিত, রক্ষিতা, রতী, রাত, রুটি, রৌরব, লাউ, লালন, লোকান্তর, লৌকিকা, শিঙ্গা, শিতান, শিয়র, শুভ্রাংশ, শুক্লপক্ষ, সকাল, সন্ধ্যা, সব্য, সময়, সম্প্রদান, সম্রাট, সরন্দ্বীপ, সরস্বতী, সহস্র মাস, সাধন সঙ্গিনী , সাধনা, সুখ, সুড়ঙ্গ, সুবোল, সুর, সুশোভিত বৃক্ষ, সুষুম্না সূর্যশ্বাস স্রষ্টা স্বায়ম্ভু স্বর্গ স্বর্গদ্বার স্বর্গীয়ান্ন স্বর্গীয়নদী হিবাচী ও হিল্লোল।
৫. মূলকসংখ্যা
আত্মদর্শনে মোট চল্লিশটি মূলক সংখ্যা পাওয়া যায়। নিচে তা উল্লেখ করা হলো।
প্রকৃত মূলকসংখ্যা
১.এক নিরীক্ষ, ২.দুই ফল, ৩.তিন তার, ৪.চার চন্দ্র, ৫.পঞ্চ বাণ, ৬.ছয় রিপু, ৭.সাত কর্ম, ৮.অষ্ট অঙ্গ, ৯.নয় দ্বার, ১০.দশ ইন্দ্র, ১১.এগার রুদ্র, ১২.বারো নেতা, ১৩.তের নদী, ১৪.চৌদ্দ পোয়া, ১৫.পনের চল, ১৬.ষোলকলা, ১৭.আঠারো ধাম, ১৮.ঊনিশ রক্ষী, ১৯.বিশ আঙুল, ২০.একুশ দিন, ২১.তেইশ জোড়া, ২২.চব্বিশ পক্ষ, ২৩.পঁচিশ গুণ, ২৪.সাতাশ নক্ষত্র, ২৫.ত্রিশ বছর, ২৬.বত্রিশ দাঁত, ২৭.ছত্রিশ রবি, ২৮.বাহান্ন হাট, ২৯.চুয়ান্ন মাথা, ৩০.বাহাত্তর কম্প, ৩১.আশি কর, ৩২.চুরাশি ফের, ৩৩.দুইশত ছয় হাড়, ৩৪.তিনশতদশ গর্ভবাস ৩৫.তিনশতষাট মূর্তি, ৩৬.পাঁচশত শ্বাস, ৩৭.ছয়শতছিষট্টি সূপারি, ৩৮.সহস্র মাস, ৩৯.ছয়সহস্র ছয়শত ছিষট্টি সূপারিচ ও ৪০.কোটি ঊর্ণ।
এছাড়াও রূপকসাহিত্য/ ‘Fabulous literature’ এর বিশ্ববরেণ্য মনীষিরা নিচের ১২টি রূপকসংখ্যাকেও প্রায় মূলকের মতো সমমান বলেই গণ্য করে থাকেন।
১.তেত্রিশ প্রতীতি (স্থাপক), ২.চল্লিশ তলা (যোজক), ৩.তিপ্পান্ন গলি (যোজক), ৪.পঞ্চান্ন ধারা (যোজক), ৫.ষাট হাত (শূন্যক), ৬.তিষট্টি বাই (স্থাপক), ৭.ছিষট্টি তল (স্থাপক), ৮.সত্তর জন (শূন্যক), ৯.সাতাত্তর পালা (স্থাপক), ১০.নব্বই ভাগ (শূন্যক), ১১.নিরানব্বই নাম (স্থাপক) ও ১২.শতদল (শূন্যক)।
২. উপকারিতা
১.সুস্বাস্থ্য ২.দীর্ঘায়ু ৩.সুখী পরিবার গঠন ৪.শুক্র নিয়ন্ত্রণ ৫.জন্ম নিয়ন্ত্রণ ৬.অনন্ত প্রশান্তিময় জীবন।
১. সুস্বাস্থ্য
শরীর মোটা বা ক্ষীণ যা-ই হোক না কেন রোগমুক্ত ও কাম শক্তিশালী সুস্বাস্থ্য উপহার দেয় আধ্যাত্মিক শাস্ত্র।
২. দীর্ঘায়ু
সুস্থ শরীরে/ নিরোগ শরীরে দীর্ঘদিন স্ব সম্মানে বেঁচে থাকার শিক্ষা আধ্যাত্মিক শাস্ত্র হতে পাওয়া যায়।
৩. সুখীপরিবার গঠন
সাধু শাস্ত্রে সর্বকালে সর্বযুগেই পুনর্জনম বা পুনরুত্থান নিষিদ্ধ। তবে গুরু বাক্যের ওপর পুত্র হোক বা কন্যা হোক একবার জন্ম নেওয়া কোন কোন ক্ষেত্রে সিদ্ধ রাখা হয়েছে। পুনর্জন্ম নিষিদ্ধ পরিবার মানেই সুখী পরিবার। একমাত্র spiritualogy ই সুখী পরিবারের নিশ্চয়তা প্রদান করে।
৪. শুক্র নিয়ন্ত্রণ
অবৈজ্ঞানিক যুগে মৈথুন ক্রিয়ায় কিভাবে মহা মূল্যবান শুক্র বন্ধ রাখা যায় তার সঠিক ও সুন্দর সমাধান প্রদান করেছিল আধ্যাত্মিক শাস্ত্র। আজও তা অবিকল তাই আছে। আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণকারিদের মৈথুন ক্রিয়ায় কোন ভয় নেই। আধুনিক কোন জন্ম নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থারও প্রয়োজন নেই। আধ্যাত্মিক শিক্ষা গ্রহণকারী পুরুষরা ইচ্ছা করলে মৈথুন ক্রিয়ায় শুক্রপাত করতেই পারে বা দীর্ঘ সময় শুক্র বন্ধও রাখতে পারে। বৈজ্ঞানিক কোন প্রকার প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া দীর্ঘ স্থায়ী মৈথুন ক্রিয়া এবং শুক্র নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা প্রদান করেছে আধ্যাত্মিক শাস্ত্র।
৫. জন্মনিয়ন্ত্রণ
কয়েক সহস্র বছর পূর্বেই আধ্যাত্মিক শাস্ত্রে ঘোষণা করা হয়েছে পুনর্জন্ম সংসারে অশান্তির একমাত্র কারণ। অতএব কেউই পরকাল বা পুনর্জনমে যেও না। আগে শুক্র নিয়ন্ত্রণ করা শিখলে, পরে আপনার জন্ম আপনি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কয়েক সহস্র বছর পূর্বেও আধ্যাত্মিক জ্ঞান অন্বেষিদের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোন প্রকার বিকল্প ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়নি। বর্তমানেও কোন প্রকার বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না।
৬. অনন্ত প্রশান্তিময় জীবন
আধ্যাত্মিক শাস্ত্রই একমাত্র অনন্ত প্রশান্তিময় জীবনের নিশ্চিত সন্ধান প্রদান করতে পারে। সাধুরাই বিশ্বের একমাত্র সুখী মানুষ। তাদের কোন প্রকার ভয় নেই এবং কোন প্রকার চিন্তাও নেই। যে লোকের কোন প্রকার ভয় এবং কোন প্রকার চিন্তা নেই তিনিই একমাত্র সুখী মানুষ। একমাত্র আধ্যাত্মিক শিক্ষার মাধ্যমেই এ ভয়হীন ও চিন্তাহীন জীবন অর্জন করা যায়। spiritualogy অর্জন করার দ্বারা ভয় ও চিন্তা দূর হওয়ার অন্যতম কারণ হলো- এ বিদ্যা অর্জনকারিরা জানেন যে, অর্থ সম্পদ কেউ অনন্ত কাল ধরে রাখতে পারেন না বিধায় তাদের মধ্যে অর্থ লিপ্সা থাকে না।
আত্মতাত্ত্বিক মনীষীরা বলেন যে, অর্থ সম্পদের প্রভু বা প্রতিভুরা প্রকৃত পক্ষে ঐ অর্থ সম্পদের প্রভু নয় বরং তার প্রহরী। সম্পদের প্রতিভুরা কেবল তার উত্তরাধিকারিদের সম্পদের পাহারা দিয়ে থাকেন। কারণ পিতা সম্পদ অর্জন করলে সন্তান তার প্রতিভু, কিংবা এক ভাই সম্পদ অর্জন করলে অন্যভাই তার প্রতিভু। সেজন্য তারা কেউ কেউ বলে থাকেন- “মানুষ আপন টাকা পর, টাকা ছেড়ে মানুষ ধর।” অনেক সময় অর্থই অনর্থের মূল হয়ে দাঁড়ায়।
অপরদিকে এ বিদ্যা অর্জনকারিরা অত্যন্ত অল্প আহারে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে পারেন। এ বিদ্যার ধারক-বাহকরা কেউ প্রকৃতিবাদী ও কেউ বস্তুবাদী। এদের মধ্যে কেউ নিরামিষ ভোজী আবার কেউ তৃণভোজী বিধায় তাদের একবেলা খেয়ে অন্যবেলার খাদ্যের কোন চিন্তা নেই। এ শ্রেণির মনীষীরা নগরের মধ্যে যেমন বিলাস বসনে জীবনযাপন করতে পারেন তদ্রূপ নদিতীর বা গভীর অরণ্যে তৃণভোজন করেও জীবনযাপন করতে পারেন। তাই তাঁদের চোর দস্যুর যেমন ভয় নেই তেমন পেটের খাদ্যের জন্যও কোন চিন্তা নেই। আর ভয় ও চিন্তা যাদের নেই তাঁরাই প্রকৃত সোনারমানুষ। আর সোনার মানুষ যারা তাঁরাই মানব জনমের প্রকৃতস্বাদ উপলব্ধি করতে পারেন। সোনার মানুষ হওয়ার চেষ্টা সাধনা করা প্রত্যেক মানুষের একান্ত কর্তব্য।
_______________________________
সংক্ষিপ্ত
সূত্রতথ্য
আধ্যাত্মিকবিদ্যা পরিচিতি,
লেখক, বলন কাঁইজি।
আধ্যাত্মিক বিদ্যার বিষয়বস্তু: (আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, স্বরূপদর্শন, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন নোট)

বঙ্গাব্দের সাতদিনের উৎপত্তিঃ

প্রথম পর্ব
পত্র-পত্রিকার পাতায় দৃষ্টিপাত করলেই প্রথম পাতার মাথায় ছোট অক্ষরে “শুক্রবার, বর্ষ ০০, সংখ্যা ০০০, মূল্য ০.০০ টাকা” লেখাটি প্রায় সব পাঠকেরই দৃষ্টিগোচর হয়। শুক্রবার, শনিবার, রবিবার, সোমবার, মঙ্গলবার, বুধবার ও বৃহস্পতিবার- কেউ কী কখনো চিন্তা করে দেখেছেন যে, বাংলা সাতবারের এসব নাম কখন কিভাবে উৎপত্তি হয়েছে? বাংলা সাতবারের নামগুলোর অনুসান্ধান করার চেষ্টা করব এ মাত্রিকায়। তার আগে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি সাতবারের নামগুলো জেনে নিই।
১. শুক্রবার / Friday (ফ্রাইডে)
‘الجمعة’ (আলজুম’য়া)/ ‘يومالجمعة’ (ইয়াওমা আলজুম’য়া) (কৈশোরকাল)
২. শনিবার / Saturday (স্যাটার্ডে)
‘السبت’ (আসসিবাত)/ ‘يومالسبت’ (ইয়াওমা আসসিবাত) (রজকাল)
৩. রবিবার / Sunday (সান্ডে) (Sabbath, first day, Lord’s day)
‘الأحد’ (আলয়াহাদ)/ ‘يومالأحد’ (ইয়াওমা আলয়াহাদ) (অর্যমা)
৪. সোমবার / Monday (মনডে)
‘الاثنين’ (আলইসনাইনি)/ ‘يومالاثنين’ (ইয়াওমা আলইসনাইন) (ঊষা)
৫. মঙ্গবার / Tuesday (টুইজডে)
‘الثلاثاء’ (আসসুলাসা)/ ‘يومالثلاثاء’ (ইয়াওমা আসসুলাসা) (পবিত্রতা)
৬. বুধবার / Wednesday (ওয়েডনেসডে)
‘الأربعاء’ (আলয়ারবা’য়া)/ ‘يومالأربعاء’ (ইয়াওমা আলয়াবা’য়া) (জ্ঞান)
৭. বৃহস্পতিবার / Thursday (থ্রাসডে)
‘الخميس’ (আলখামিস)/ ‘يومالخميس’ (ইয়াওমা আলখামিস)
প্রথমে দিন গণনার কথায় ধরি। কোন্ সূত্র ধরে কারা কিভাবে দিনের নামাদি নির্মাণ করেছেন? বর্তমানকালে সপ্তাহের সাতবারের ব্যবহার ও গবেষণাদি হতে যত সম্ভব জানা যায় এ নামগুলো সৌরজগৎ হতেই উদ্ভব হয়েছে। তবে কী সৌরজগতে এ নামাদির কোন অস্তিত্ব বা উপাদান রয়েছে? সৌরজগতেই যদি দিনের নামাদির উপাদানাদি থাকত তবে দিনের নাম আরো অনেক অধিক হলো না কেন? সৌরজগতে কী উপাদানের ঘাটতি ছিল? সৌরবছর ৩৬৫ দিনে তবে দিনের নাম ৩৬৫টি হলো না কেন? আবার ৩০ দিনে মাস তবে দিনের নাম ৩০টি হলো না কেন? আবার প্রতি ১৫ দিনে পক্ষ তবে দিনের নাম ১৫টিও হলো না কেন?
দিনের বর্ণ সাদা এবং রাতের বর্ণ কালো। তাহলে দিনের নামাদি সাদা কেন্দ্রিক হলো না কেন? দিনের মধ্যে কোন পার্থক্য না থাকলে দিনের নাম অন্তত ৩৬৫টি কিংবা ৩০টি কিংবা ১৫টি হলে কী ক্ষতি হতো? দিনের নাম সাতটি হলো কেন? দিনের নাম সাতের অধিক হলে অথবা সাতের ন্যূন হলে কী ক্ষতি হতো? আরো প্রশ্ন করা যায় সৌরদিন এবং সৌররাত সবই তো এক। একদিন ও অন্য দিনের মধ্যে কিংবা একরাত অন্য রাতের মধ্যে স্বাভাবিক কোন পার্থক্য নেই। অথচ দিনের নাম ৭টি রাখা হলো কিন্তু রাতের একাধিক নাম রাখা হলো না কেন? তবে কী সৌরজগতে নামের উপাদানের কোন ঘাটতি দেখা দিয়েছিল? ওপরোক্ত অসংখ্য প্রশ্নের সমাধান হলো আমাদের বঙ্গাব্দের দিনাদির নামের উপাদানাদি একটিও সৌরজগতের নয় বরং সবই দেহজগতের। দেহবিশ্বে সাত (৭) প্রকার দিন পাওয়া গেলেও রাত একটির অধিক পাওয়া যায় না। এ জন্যই দিনের নাম সাত (৭)টি এবং রাতের নাম এক (১)টি। এবার বলা যায় বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক মনীষিগণের মতে দেহবিশ্বের রাত হলো ‘রজকাল’। এর কোন পরিবর্তন নেই। এটি সারা বিশ্বে কেবল একটিই। বিশ্বের সব রমণির রজকাল গড়ে সমান। তবে আমাদের বাংভারতীয় আত্মতাত্ত্বিক মনীষিগণের মতে রজকালরূপ রাতের দৈর্ঘ্য ‘সাড়েতিন দিন’। কিন্তু পারস্য মনীষিগণের মতে রজকালরূপ রাতের দৈর্ঘ্য ‘তিনদিন’। দেহজগতের রাত মাত্র একটি । এ জন্য রাতের ভিন্নভিন্ন নাম করণের প্রয়োজন হয়নি। কিন্তু দেহজগতের দিনাদি ভিন্নভিন্ন তাই দিনের ভিন্নভিন্ন নাম করণের প্রয়োজন হয়েছে।
আদিমযুগের সুমহান মনীষিগণ দিন গণনাপদ্ধতি নির্মাণ বা আবিষ্কার করতে গিয়ে সৌরজগতের প্রতি গভীরভাবে লক্ষ্য করেও সৌরম-লের দিন হতে দিন এবং রাত হতে রাতের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য খুঁজে পাননি। তবে চন্দ্রের দিন হতে দিনের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না পেলেও রাতের মধ্যে আলো ও অন্ধকারের একটা পার্থক্য দেখতে পান।মনীষিগণ দেখেন যে অন্ধকারের পরে নবোদিত চন্দ্র ক্রমেক্রমে অধিক আলো দিতে থাকে এবং চৌদ্দতম রাতে তার পূর্ণতালাভ হয় আবার চন্দ্রের আলো ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে এবং পরবর্তী দৌদ্দতম রাতে চন্দ্র পরিপূর্ণ অদৃশ্যতালাভ করে। ফলে তারা চন্দ্রের পূর্ণতালাভকে “পূর্ণিমা”, চন্দ্রের অদৃশ্যতালাভকে “অমাবস্যা”, চন্দ্রের ক্রমো আলো বৃদ্ধিপ্রাপ্তির রজনিগুলোকে “শুক্লপক্ষীয় তিথি” এবং চন্দ্রের ক্রমো আলো হ্রাসপ্রাপ্তির রজনিগুলোকে “কৃষ্ণপক্ষীয় তিথি” ইত্যাদিরূপে নামকরণ করেন। এটা হতেই “পূর্ণিমা” “অমাবস্যা” “শুক্লপক্ষ” “কৃষ্ণপক্ষ” ও “তিথি” ইত্যাদির উৎপত্তি হয়।
পূর্ণিমা
পূর্ণিমা (রূপ)বি পূর্ণশশী, তিথিবিশেষ, চন্দ্রের সম্পূর্ণ অংশ দৃশ্যময়তা।
পূর্ণিমার সংজ্ঞা
চন্দ্রের সম্পূর্ণ অংশ দৃশ্যময়তাকে চন্দ্রের পূর্ণিমা বলে।
অমাবস্যা
অমা (রূপ)বি আঠাশা (কৃষ্ণপক্ষের শেষ তিথি)।
অমাবস্যা (মবা.রূপ)বি অমা, অমাবৈস্যা, কৃষ্ণপক্ষের সর্বশেষ তিথি, চন্দ্রকলার অদৃশ্যকাল (আবি) সিনানী, অন্ধকার, অপবিত্রতা, messenger period.
অমাবস্যার সংজ্ঞা
কৃষ্ণপক্ষের সর্বশেষ তিথিতে চন্দ্রের সম্পূর্ণ অদৃশ্যতাকে চন্দ্রের অমাবস্যা বলে।
শুক্লপক্ষ
শুক্ল (রূপ)বি শ্বেতবর্ণ, শুভ্রবর্ণ, সাদা, রৌপ্য, নবনীত, ননি, বিশুদ্ধ, চক্ষুপীড়া বিণ শুদ্ধ, পবিত্র, ধবল, সিত, অকলংক, শ্বেতবর্ণযুক্ত স্ত্রী শুক্লা।
পক্ষ (রূপ)বি চন্দ্রের হ্রাস-বৃদ্ধিজনিত কাল, মাসার্ধ, প্রতিপদ থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত পঞ্চদশ তিথি।
শুক্লপক্ষ (রূপ)বি চন্দ্রোদয়ের প্রথম ১৪ দিন, পূর্ণিমা তিথিতে যে পক্ষের অবসান হয় (আবি) বিশুদ্ধতা, নির্মলতা, পিউরিটি (purity), শরীরের সুস্থ্যতা পবিত্রতার ২৭ দিন, ঋতুস্রাব হতে পবিত্র হওয়ার পর আবার ঋতু আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়, শরীরের সুস্থতার সময়, শরীর সুস্থ থাকাকালীন সময় (আভা)বি পৌর্ণমাসী (আপ)বি ইদ্দত
(আ.ﻋﺩﺖ), চাহারশম্বা (ফা.ﭼﻬﺎﺮ ﺸﻧﺒﻪ), ত্বহুর (আ.ﻄﻬﺭﺓ), পাক (ফা.ﭙﺎﮎ), মি’রাজ (আ.ﻤﻌﺭﺍﺝ) (সংজ্ঞা) রজস্বলাদের একস্রাবের প্রস্থান হতে অন্য স্রাব সূচনার মধ্যবর্তী সাতাশ (২৭) দিনকে পবিত্রতা বা রূপকার্থে শুক্লপক্ষ বলা হয় (দেপ্র) পবিত্রতা পরিবারের রূপকনামসদস্য ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (ছনা)বি শুক্লপক্ষ,
যোগেশ্বরী (চরি)বি পৈবত্র (উপ)বি দিন (রূ)বি পূর্ণিমা (দেত)বি পবিত্রতা {বাং.শুক্ল+বাং.পক্ষ}
শুক্লপক্ষের সংজ্ঞা
চন্দ্র উদয়ের পর হতে প্রথম ১৪টি তিথিকে একত্রে শুক্লপক্ষ বলে।
কৃষ্ণপক্ষ
কৃষ্ণ বিণ কালো, কৃষ্ণবর্ণ, অসিত, নীলবর্ণ, অন্ধকারময় (প্র) পুরাণিদেবতা বিষ্ণুর অবতারবিশেষ (আবি) অগ্নি, ঈশ্বর, কাঁই, কাজলা, কালা, কালিয়া, কালো, কেলে, বিরিঞ্চি,
ব্রহ্মা, শ্যাম, শ্যামল, শ্যামলা, Lord, আল্লাহ (ﺍﻟﻟﻪ) স্ত্রী কৃষ্ণা।
কৃষ্ণপক্ষের সংজ্ঞা
পূর্ণিমার পরবর্তী ১৪টি তিথিকে একত্রে চন্দ্রের কৃষ্ণপক্ষ বলে।
তিথি
তিথি (রূপ)বি দিন, কাল, ক্ষণ, পল, দণ্ড, চন্দ্রমাস অনুসারে একদিন, চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধির দ্বারা নির্দিষ্ট সময়-প্রতিপদ দ্বিতীয়া ইত্যাদি, পূর্ণিমা হতে অমাবস্যা এবং অমাবস্যা হতে পূর্ণিমা পর্যন্ত চন্দ্রকলার ভাগ।
তিথির সংজ্ঞা
পূর্ণিমা হতে অমাবস্যা এবং অমাবস্যা হতে পূর্ণিমা পর্যন্ত চন্দ্রকলার প্রতিভাগকে তিথি বলে।
আদিকালের মনীষিগণ তাদের আবিষ্কৃত তিথিগুলোকে নিম্নোক্তরূপে নামকরণ করেন।
শুক্লপক্ষের তিথিগুলো
১. প্রতিপদ ২. শুক্লা দ্বিতীয়া ৩. শুক্লা তৃতীয়া ৪. শুক্লা চতুর্থী৫. শুক্লা পঞ্চমী ৬. শুক্লা ষষ্ঠী ৭. শুক্লা সপ্তমী ৮. শুক্লা অষ্টমী ৯. শুক্লা নবমী ১০. শুক্লা দশমী ১১. শুক্লা একাদশী ১২. শুক্লা দ্বাদশী ১৩. শুক্লা ত্রয়োদশী ১৪. শুক্লা চতুর্দশী ১৫. পূর্ণিমা।
কৃষ্ণপক্ষের তিথিগুলো
১. প্রতিপদ ২. কৃষ্ণা দ্বিতীয়া ৩. কৃষ্ণা তৃতীয়া ৪. কৃষ্ণা চতুর্থী৫. কৃষ্ণা পঞ্চমী ৬. কৃষ্ণা ষষ্ঠী ৭. কৃষ্ণা সপ্তমী ৮. কৃষ্ণা অষ্টমী ৯. কৃষ্ণা নবমী ১০. কৃষ্ণা দশমী ১১. কৃষ্ণা একাদশী ১২. কৃষ্ণা দ্বাদশী ১৩. কৃষ্ণা ত্রয়োদশী ১৪. কৃষ্ণা চতুর্দশী ১৫. অমাবস্যা।
আদিমযুগের মনীষিগণের দিন গণনার পদ্ধতি এরূপই ছিল। এটা ছিল তাদের নিতান্ত চান্দ্রদিন গণনা পদ্ধতি। চান্দ্রদিন গণনা পদ্ধতি ব্যবহার করেই বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আদিমমানুষ আদিমযুগের সর্বশেষ পর্যায়ে এসে উপনীত হন। বাংলাদেশের ইতিহাস অনুযায়ী গত একাদশ (১১০০) শতাব্দি হতে মধ্যযুগের সূচনা হয় এবং গত সপ্তদশ (১৭০০) শতাব্দি পর্যন্ত এ সাতশত (৭০০) বছর মধ্যযুগ স্থায়ী হয়।
ওপরোক্ত পরিসংখ্যানটি হতে আমরা নিশ্চিন্তে বলতে পারি যে, আজ হতে প্রায় ছয়সহস্র (৬,০০০) বছর পূর্বেই ভারতবর্ষীয় সুবিজ্ঞ মনীষিগণ দ্রাবিড় ও আর্যভাষা হতে বেরিয়ে এসে সংস্কৃতভাষার ভিত্তিস্থাপন করেন। সংস্কৃতভাষার অধিকাংশ মনীষিই আত্মদর্শন ও আধ্যাত্মিকবিদ্যায় বিশেষ ব্যুৎপত্তিলাভ করেছিলেন। সে সময়ই বিশেষ বিশেষ সংস্কৃত মনীষি দেখতে পান যে, চান্দ্রবর্ষের তিথিগুলো গণনায় প্রায় হ্রাস-বৃদ্ধি হয়ে থাকে। একই অঞ্চলের একগ্রামে শুক্লা তৃতীয়া তিথি চলে এবং অন্যগ্রামে শুক্লা দ্বিতীয়া তিথি চলে। এর কারণ হলো- অমাবস্যার পর সবাই একই দিনে নবোদিত চন্দ্র দেখতে পান না (বর্তমানে কুরানিদের ইদুলফিতর নিয়ে যে সমস্যা দেখা যায়)। সে জন্য তিথি গণনার সূচনাকাল ভিন্নভিন্ন পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়।
এ সমস্যাটি সমাধান করার জন্য একদল সংস্কৃত মনীষী সমস্যাটি নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে আরম্ভ করেন। তাঁরা এও চিন্তা করেন যে, যে কোন মাধ্যমে সৌরদিন গণনা পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারলে চান্দ্রতিথি গণনার হ্রাস-বৃদ্ধির সমস্যাটিও সমাধান করা যাবে। সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর শেষ পর্যন্ত সুমহান ও সুবিজ্ঞ আত্মতাত্ত্বিক সাধু সন্ন্যাসিগই উক্ত সমাস্যার সঠিক ও চমৎকার সমাধান জাতিকে উপহার দেন। তাঁরা দেখেন যে একমাত্র দেহজগতের উপকরণাদি ব্যতীত সৌরজগতের কোন উপকরণাদি দ্বারা সৌরদিনের নামকরণ করা যায় না। সে জন্য তাঁরা আত্মদর্শনের বিভিন্ন সদস্যাদির দ্বারা সৌরদিনের নামকরণের অধ্যবসায় ও সাধনা আরম্ভ করেন। অবশেষে তাঁরা মানবদেহের মধ্যে ‘রজকাল’ ও ‘পবিত্রকাল’ রূপ ২টি ভিন্ন সত্তার অস্তিত্ব বিবেচনায় নিয়ে আসেন। অতঃপর তাঁরা ‘রজকাল’কে উপমিত রেখে এর উপমান নাম দেন ‘রাত’ এবং ‘পবিত্রকাল’কে উপমিত রেখে এর উপমান নাম দেন ‘দিন’। তখন হতেই উপমানপদের অধীনে উপমিতপদের আলোচনার যুগান্তরকারী সংস্কার আরম্ভ হয়। এটি ছিল সে যুগের সোনালী সংস্কার।
অতঃপর পূর্বকালের আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক, সাধু ও সন্ন্যাসিরা একের পর এক বৈক্তিকমূলক সদস্য আবিষ্কার করতে থাকেন এবং রূপকসাহিত্য নির্মাণ করতে থাকেন। তবে এসব নির্ধারণী ছিল একেবারেই অগোছাল। আজ পর্যন্ত ঠিক সেভাবেই চলে আসছে।
দিন (রূপ)বি দিবা, দিবস, চব্বিশ ঘণ্টাকাল, অহোরাত্র, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়, একত্রে এক দিবস ও এক রাত্র, সময়কাল (সুদিন), আয়ু (দিন ফুরিয়েছে) (জ্যোশা) তিথি, চন্দ্রমাসের ত্রিশভাগের একভাগ (আবি) জ্ঞান, গুরু, সুস্থ্যতা, উন্নতি, যৌবনকাল, একজনম, একনিঃশ্বাস, সাতাশদিন, রজস্বলাদের পবিত্রতার ২য়, ৩য়, ৪র্থ, ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম- এ ছয় প্রহর, রজস্বলাদের পবিত্রতার সূচনা হতে অন্য স্রাব আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়।
পরবর্তিকালের নীতিনির্ধারকগণ উক্ত সপ্তপর্যায় হতে “পর্যায়” সহগ পরিভাষাটিকে তিরোহিত করে শুধু মূল পরিভাষাটিকে দিনরূপে গ্রহণ করেন। যেমন- ১.শুক্ল ২.শনি ৩.মঙ্গল ৪.সোম ৫.রবি ৬.বৃহৎপতি ও ৭.বুধ। আরো অনেক পরে সপ্তাহের এ সপ্তদিনকে নীতিনির্ধারকগণ ১.শুক্লদিন ২.শনিদিন ৩.রবিদিন ৪.সোমদিন ৫.মঙ্গলদিন ৬.বুধদিন ও ৭.বৃহৎপতিদিনরূপে গণ্য করেন।
ওপরোক্ত আলোচ্য সাতটি দিবসের সমন্বয়ে গঠিত হয় সপ্তাহ। আদিমযুগে এ সপ্তাহই ভারতবর্ষীয় মনীষিগণের সৌরদিন গণনার স্থায়ী পদ্ধতিতে পরিণত হয়। একসময় সৌরদিন গণনার এ স্থায়ী পদ্ধতিটি ক্রমেক্রমে সারা বাংভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে চান্দ্রতিথি গণনাপদ্ধতির তিথির হ্রাস-বৃদ্ধি সমস্যাটিরও সঠিক সমাধান হয়। দিনের পর দিন সৌরদিন গণনা পদ্ধতিটির ব্যবহার ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে থাকে এবং চান্দ্রতিথি গণনা পদ্ধতিটির ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে। অতঃপর গত মধ্যযুগে ফার্সি ভাষাভাষী মোঘলরা বাংভারতীয় উপমহাদেশে আধিপত্য স্থাপন করলে আমাদের সাতদিনের শেষে সংযুক্ত “দিন” নামক সহগ শব্দটিকে তিরোহিত করে তাদের ফার্সি ভাষার বার (ﺒﺎﺭ) শব্দটিকে সংযুক্ত করেন। ফলে উক্ত সাতদিনের নতুন নাম হয় “সাতবার”। যা আজও অবিকল তাই রয়েছে। যেমন- ১.শুক্লবার ২.শনিবার ৩.রবিবার ৪.সোমবার ৫.মঙ্গলবার ৬.বুধবার ও ৭.বৃহৎপতিবার।
বার [ﺒﺎﺭ] (রূপ)বি পর্যায়, পালা, ধারা, ব্যাপিয়া, ফার্সি সপ্তাহের দিবস বিশেষ {ফা}
বঙ্গবর্ষের সপ্তদিবসের নামকরণের ব্যাপারে অবশ্য আরো অনেক মতবাদ কিংবা গল্পকাহিনি আমাদের বঙ্গদেশে প্রচলিত রয়েছে। বঙ্গাব্দের দিন, সপ্তাহ, পক্ষ, মাস ও বছর সম্পর্কে এদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিকট বিভিন্ন প্রকার গল্পকাহিনি প্রচলিত রয়েছে। সাথে সাথে সৌরজগতের চন্দ্র, সূর্য ও তারকাদির ব্যাপারেও রয়েছে এদেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিকট ভিন্নভিন্ন গল্পকাহিনি। নিচে পৌরাণিক একটি মতবাদ তুলে ধরা হলো।
সপ্তদিবসের নামকণের পৌরাণিক মতবাদ
আমাদের দেশে মাসগুলোর মত দিনগুলোর নামের সঙ্গেও জ্যোতিষ শাস্ত্রের বিশেষ যোগ আছে। ভারতের প্রাচীন ঋষিগণ যেমন নক্ষত্রের নামে মাসের নামকরণ করেছিলেন, সপ্তাহের দিনগুলোর নামকরণের বেলাতেও তেমনি গ্রহ-উপগ্রহের প্রতি দৃষ্টিপাত করেছিলেন। যেমন আমাদের সপ্তাহের দিনগুলোর নাম যথাক্রমে রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র ও শনি। মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনির মত সূর্য এবং চন্দ্রকেও (রবি ও সোম) তারা গ্রহ বলে মনে করেন এবং তাদের নামেই আমাদের সপ্তাহের দিনগুলোর নামকরণ করেন (সূত্র: জয়নাল আবেদিনের লেখা হতে গৃহীত)।
রূপকসাহিত্যের দিন ও রাত নির্মাণের সূত্রাদি
১. সবলকে দিন ধরলে অবশ্যই দুর্বলকে রাত ধরতে হবে।
২. জ্ঞানকে দিন ধরলে অবশ্যই মনকে রাত ধরতে হবে।
৩. পবিত্রতাকে দিন ধরলে অবশ্যই অপবিত্রতাকে রাত ধরতে হবে।
৪. সুস্থতাকে দিন ধরলে অবশ্যই অসুস্থতাকে রাত ধরতে হবে।
৫. পিতাকে দিন ধরলে অবশ্যই মাতাকে রাত ধরতে হবে।
৬. গুরুকে দিন ধরলে অবশ্যই শিষ্যকে রাত ধরতে হবে।
৭. যৌবনকালকে দিন ধরলে অবশ্যই বার্ধক্যকে রাত ধরতে হবে।
৮. জ্ঞানিকে দিন ধরলে অবশ্যই অজ্ঞানিকে রাত ধরতে হবে।
অনুসিদ্ধান্ত
১. সৌর সপ্তদিবস একমাত্র আত্মতত্ত্ব বা আত্মদর্শন হতে উৎপত্তি।
২. এটা সর্বপ্রথম সপ্তপর্যায়রূপে ছিল। যেমনÑ ১.শুক্লপর্যায় ২.শনিপর্যায় ৩.মঙ্গলপর্যায় ৪.সোমপর্যায় ৫.রবিপর্যায় ৬.বৃহৎপতিপর্যায় ও ৭.বুধপর্যায়।
৩. অতঃপর এটা সপ্তমূলক রূপলাভ করে। যেমন- ১.শুক্ল ২.শনি ৩.মঙ্গল ৪.সোম ৫.রবি ৬.বৃহৎপতি ও ৭.বুধ।
৪. অতঃপর এটা সপ্তদিন রূপলাভ করে। যেমন- ১.শুক্লদিন ২.শনিদিন ৩.রবিদিন ৪.সোমদিন ৫.মঙ্গলদিন ৬.বুধদিন ও ৭.বৃহৎপতিদিন।
৫. অতঃপর বাংভারতীয় উপমহাদেশ মোঘলদের শাসনকালে এটা সপ্তবার রূপলাভ করে। যেমন- ১.শুক্লবার ২.শনিবার ৩.রবিবার ৪.সোমবার ৫.মঙ্গলবার ৬. বুধবার ও ৭.বৃহৎপতিবার।
পরিশেষ বলা যায় জ্ঞান পবিত্রতা সুস্থতা পিতা গুরু যৌবনকাল ও জ্ঞানী সবই পারিভাষিকদিন এবং মন অপবিত্রতা অসুস্থতা মাতা শিষ্য বার্ধক্য ও অজ্ঞানী সবই পারিভাষিক রাত হলেও নির্ধারিত পরিভাষাদির মধ্যে অবশ্যই সুসামঞ্জস্য বা সুসঙ্গতি রেখে উপমা ও উপাখ্যাদি রচনা বা নির্মাণ করতে হবে। কোন প্রকার অসঙ্গত পরিভাষাদি দ্বারা উপমা বা উপাখ্যানাদি নির্মাণ করা যাবে না। যেমন- একই উপমার মধ্যে জ্ঞানকে দিন ধরলে মাতাকে রাত ধরা যাবে না। কারণ মাতারূপ রাতের সাথে জ্ঞানরূপ দিনের কোন সম্পর্ক নেই বিধায় জ্ঞানকে দিন নির্ধারণ করলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই মনকে রাত নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় পাঠককুল কোনক্রমেই মূলক উদ্ঘাটন করতে পারবেন না। আধ্যাত্মিকবিদ্যা জানা বিজ্ঞপাঠক হওয়া সত্ত্বেও মূলক উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হলে এরূপ রূপকসাহিত্য রচনার কোন্ই মূল্য নেই বিধায় রূপকারগণের রূপকসাহিত্য এরূপভাবে নির্মাণ করা উচিৎ যাতে বৈক্তিকসদস্য ও সংখ্যাসূত্রাদি জানা যে কোন পাঠক অতি সহজেই নির্মিত উপমা বা উপাখ্যানটির মূল উপাদানাদি বের করতে পারেন। রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য (Personality traits) এর মূলক বা মূল উপাদান বের করতে ব্যর্থ হলে সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার রূপকসাহিত্য পাঠ ও অধ্যায়ন করাই ব্যর্থ হবে। যেমন প্রবাদ আছে “সপ্তখ- রামায়ণ পড়ে বলে কিনা সীতা রামের মাসী।” সাথেসাথে পাঠককুল অতিসহজে মূলক উদ্ঘাটন করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে রূপকারদের রূপকসাহিত্য নির্মাণ করা একান্ত প্রয়োজন।
বড় হাস্যোপহাসের বিষয় হলো বর্তমানকালের অধিকাংশ জ্যোতির্বিদ মনে করেন যে, সর্বাগ্রে আমাদের মাথার ওপরে অবস্থিত আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রাদির নাম শুক্র, শনি, বুুধ, সোম ও মঙ্গল ইত্যাদি ছিল। আকাশের ঐ তারকাদির নামানুসারে আমাদের বঙ্গাব্দের সপ্তাহের দিনের নামাদির নামকরণ করা হয়েছে। বর্তমান বাংভারতের জ্যোতির্বিদদের এরূপ হাস্যকর অলীক ধারণার সঠিক ও যথোচিৎ উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব আমরা পাঠককুলের ওপরই ছেড়ে দিলাম। সারাপৃথিবীর সর্ব শ্রেণির গবেষকরা একমত যে পৃথিবীর আদিমদর্শন বা আদিমশাস্ত্রই হলো ‘আত্মতত্ত্ব’। পরবর্তিকালে জ্যোতির্বিদ্যা, আয়ুর্বেদ, সনাতনী চিকিৎসা, তন্ত্রচিকিৎসা, ভেষজচিকিৎসা, সর্পবিষচিকিৎসা, শাস্ত্রীয় মতবাদ, পারম্পরিক মতবাদ, মরমিবাদ, ভাষাবিজ্ঞান, নৌবিদ্যা, সমরবিদ্যা, ভাষাজ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যচর্চাসহ জ্ঞানের সর্ব প্রকার শাখা প্রশাখা সব কিছুই কেবল আত্মতত্ত্ববিদ্যা বা আত্মদর্শন হতে উৎপত্তি হয়েছে। কেবল আত্মতত্ত্বদর্শনের বৈক্তিকসদস্যাদি ও সংখ্যাসূত্রাদি ব্যবহার করেই পৃথিবীর সর্ব প্রাচীন ও আদিমহাগ্রন্থ বেদ নির্মাণ করা হয়েছে। অতঃপর ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ চর্চা ও অনুশীলন করতে গিয়েই নির্মিত হয়েছে ত্রিপিটক, রামায়ণ, মহাভারত, তৌরাত, যাবুর, ইঞ্জিল, জেন্দাবেস্তা, কুরান, হাদিস ও কুরাননির্ভর কাহিনি (ইসলামী ইতিহাস)। কিন্তু বর্তমানকালের অন্ধসাম্প্রদায়িকতার নির্মম কশাঘাতে সে-ই আত্মদর্শন ও আত্মতত্ত্ববিদ্যা আজ চরম কোন্ঠাসা হয়ে পড়েছে। পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিতে বসেছে সেই আত্মতত্ত্ব। চরমভাবে লাঞ্ছিত ও হেয়প্রতিপন্ন হয়ে একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসেছে উপনীত হয়েছে সে-ই আত্মতত্ত্ব ভেদ।
‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ বা আত্মদর্শন হতে বর্তমানকালের ছিন্নমূল শাস্ত্রীয় দর্শনের উদ্ভব হলেও শাস্ত্রীয় মতানুুসারিদের চরম ধর্মান্ধতা ও খুষ্কমূষ্কতার দাপটে সে-ই আত্মতত্ত্বই বর্তমানে চরম-পরম কোন্ঠাসা হয়ে পড়েছে। জীবনের প্রায় ক্ষেত্রেই কেবল শাস্ত্রীয় গ্রন্থগ্রন্থিকার অযুহাত-উদ্ধৃতি ব্যবহার করেই শাস্ত্রীয় প-িত-বক্তারা যাবতীয় অপকর্ম ও অপতৎপরতা চারিয়েই যাচ্ছেন। বর্তমানেও ছিন্নমূল সাম্প্রদায়িকরা যত্রতত্র বড় গলায় প্রচার করছেন যে মরমিবাদ ও আত্মতত্ত্ববিদ্যা বলতে কিছুই নেই। এসব জেনে বুঝে কোন লাভ নেই। নব্যসভ্যতার ধ্বজাধারী, খুষ্কমূষ্ক প্রগতিবিদ, ধর্মান্ধ শাস্ত্রীয় মতানুসারী ও পরগাছা জ্যোতির্বিদদের জানাতে চাই যে মরমী ও আত্মতাত্ত্বিকদের বিরুদ্ধে সমালোচনা কিংবা গালাগালি করার আগে মাত্র একবার ভেবে দেখুন যেসব দর্শনে কেবল সামাজিকতা বা সামান্য কিছু সমবেত উপাসনা ব্যতীত ব্যক্তিগত উত্তরণের জন্য আত্মশুদ্ধিকরণ, সুখীপরিবারগঠন, শুক্রনিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘায়ুলাভ, অমৃতাহরণ, সৃষ্টিকর্তাদর্শন, পালককর্তাদর্শন ও নিজনিজ প্রয়াণ-তিরোধান দিবস সম্পর্কে অবগতি ইত্যাদি জ্ঞান নেই সেটি শাস্ত্রীয় দর্শন হলেই কী কিংবা জ্যোতির্বিদ্যা হলেইবা কী?
আসুন সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় গোঁড়ামি পরিহার করে আত্মতত্ত্ববিদ্যা বা আত্মদর্শনকে সবাই নিজনিজ দর্শনরূপে গ্রহণ করি। সাথেসাথে আত্মদর্শন অন্য কোন বিদ্যার অংশ নয় বরং অন্যান্য সর্ব প্রকার বিদ্যা কেবল আত্মদর্শনেরই অংশ এ কথা মনেচিত্তে স্বীকার করি। আরো স্বীকার করি সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্রাদির নামানুসারে সপ্তাহের দিবসের নামকরণ করা হয়নি বরং সপ্তাহের দিবসাদির নামানুসারেই সৌরজগতের গ্রন্থ-নক্ষত্রাদির নামকরণ করা হয়েছে।
সংক্ষিপ্ত
তথ্যসূত্র
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৩য় খণ্ড)
লেখক, বলন কাঁইজি।

বঙ্গাব্দের সাতদিনের উৎপত্তিঃ

দ্বিতীয় পর্ব
১. শুক্লপর্যায়
রূপকসাহিত্যে দেহবিশ্বের জন্ম হতে রজস্বলা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে শুক্রপর্যায় বা শুক্রবার বলা হয়। পূর্বযুগের সাধুগণ শুক্ল ধাতু গ্রহণ করেছিলেন। উক্ত শুক্ল পরিভাষা হতে পরে শুক্র (শুক্ল>শুক্র) পরিভাষাটির উৎপত্তি হয়। শুক্লপর্যায়ের সময়সীমা হলো অরজার রজস্রাব উদয়ের পূর্ব পর্যন্ত বা বসিধ প্রতীতির আগমনকাল পর্যন্ত। কারণ রজস্রাব অবতরণের পূর্ব পর্যন্ত নারিদেহ থাকে নিষ্কলংক, পবিত্র, সাদা, নিখুঁত। সে জন্য জন্ম হতে ‘বসিধ’ প্রতীতির অবতরণ পর্যন্ত সময়কে শুক্লপর্যায় বলা হায়। এ শুক্ল অবস্থা হতে সর্বপ্রথম শুক্রপর্যায়ের উৎপত্তি হয়। উল্লেখ্য আত্মদর্শনে শুক্লপর্যায়ের দৈর্ঘ্য গড়ে প্রায় ১ হতে ১২ বছর। দীর্ঘ প্রায় ১২টি বছর পুরোটায় আত্মতাত্ত্বিক মনীষিদের মতে শুক্লপর্যায়। অর্থাৎ শুক্লপর্যায় বা শুক্রবারের দৈর্ঘ্য ১২ বছর।
শুক্ল (রূপ)বি শ্বেতবর্ণ, শুভ্রবর্ণ, সাদা, রৌপ্য, নবনীত, ননি, বিশুদ্ধ, চক্ষুপীড়া শুক্রগ্রহ, শুকতারা, পর্যায়-ক্রম, অনুক্রম, আনুপূর্ব্য বিণ শুদ্ধ, পবিত্র, ধবল, সিত, অকলংক, শ্বেতবর্ণযুক্ত স্ত্রী শুক্লা।
শুক্র (রূপ)বি শুক্রগ্রহ, শুকতারা, চক্ষুপীড়াবিশেষ (পরি) বীর্য, রেত, রতী, ধাতু, বিন্দু, জ্যোতি (প্র) দৈত্যগুরু ভার্গব (আবি)বিস্ত্রী কালী, দুর্গা, বুড়ী, বেশ্যা, রতী, সীতা, সুন্দরী। শুক্লপর্যায় (রূপ)বি শুক্রবার, পবিত্র সময়, ভালো সময়, নিখুঁত ও নিষ্কলংক সময় (প্র) ১.মানবসন্তানের কৈশোরকালরূপ পবিত্রতার প্রথম ১০ বছর সময় বিশেষ ২. আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫.রবি ৬.বুধ ৭.বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় {বাং.শুক্ল+ বাং.পর্যায়}
পর্যায় (রূপ)বি পালা, ধারা, অনুক্রম, আনুপুর্ব্য, স্তর, অবস্থা, ক্রম, বংশ পরস্পরাগত সংখ্যা, সমান অর্থবাচক শব্দ (জ্যো) গ্রহাদির আবর্তনকাল।
শুক্লপর্যায়ের সংজ্ঞা
১. অরজার রজস্বলা হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কে শুক্লপর্যায় বলে।
২. জন্ম হতে বসিধাদেবির আগমনের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে শুক্লপর্যায় বলে।
শুক্রবার (রূপ)বি পবিত্রদিসব, সুখময় দিবস (প্র) ১. এটি বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ ২. আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক মনীষিদের মতে, গড়ে বারো বছর পর্যন্ত সময় ৩.জন্মের পর হতে ছেলেদের মুচ ও দাড়ি উদ্গত হওয়া এবং মেয়েদের রজ আগমন করার পূর্ব পর্যন্ত সময় (আবি)বিণ গোডিম, কৈশোরকাল, কৈশোরাবস্থা, adolescence period (এ্যাডোলিসেন্স পিরিওড), ‘فترة المراهقة’ (ফাতরাতাল মুরাহাক্বা) (আপ)বিণ নাবালগ (ফা.ﻨﺎﺑﺎﻟﻎ) (আঞ্চ)বি চেংড়াবয়স (দেপ্র) ১. এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘কৈশোরকাল’ পরিবার প্রধান ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিষাভা বিশেষ ২. আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় (সংজ্ঞা) ১. বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিনকে শুক্রবার বলা হয় ২. সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর হতে চন্দ্রচেতনার উদয় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বয়সকালকে কৈশোরকাল বা রূপকার্থে শুক্রবার বলা হয় (উপ)বি মৃতবৃক্ষ (রূ)বি বনবাস (দেত)বি কৈশোরকাল {বাং.শুক্র+ ফা.বার. ﺑﺎﺮ}
বার ১ [ﺒﺎﺭ] (রূপ)বি ১. পর্যায়, পালা, ধারা, ব্যাপিয়া, নির্দিষ্টদিন, সপ্তাহের দিবস বিশেষ, সপ্তাহের বিভিন্ন দিন ২.বোঝা, দুঃখ, বিলম্ব, ফল, গর্ভ, দ্বার, প্রবেশপথ {ফা}
বার ২ [bar] (রূপ)বি শুঁড়িঘর, শুঁড়িগৃহ {ই}
বার ৩ [bar] (রূপ)বি প্রতিভূ সম্প্রদায়, বিধানজীবী সম্প্রদায়, প্রতিভূ সমষ্টি {ই}
বার ৪ [bar] (রূপ)বি ১. অর্গল, হুড়কা, খিল, গোঁজ, প্রতিবন্ধক ২.লোহা তামা বা খাঠের টুকরা {ই}
২. শনিপর্যায়
রূপকসাহিত্যে দেহবিশ্বের রজকালের সাড়েতিন দিন সময়কে শনিপর্যায় বা শনিবার বলা হয়। অরজা বা কিশোরিদের শুক্লপর্যায় চলতে চলতে হটাৎ কোন এক সময় বসিধ প্রতীতির অবতরণ ঘটে। বসিধ প্রতীতির অবতরণ করলে মানবদেহের শুক্লপর্যায় বা শুক্ল প্রতীতি চিরতরে প্রয়াণ ঘটে। মানবদেহে বসিধ প্রতীতির অবস্থানকালীন সাড়েতিন দিন সময়কে আত্মদর্শনে দেহের শনিপর্যায় বলে। বসিধ প্রতীতি আগমন করে সুস্থ্য দেহকে অসুস্থ্য ও বিপদসম্মুখীন করেন কিংবা পবিত্র দেহকে অপবিত্র করেন বলে উক্ত পর্যায়কে শনিপর্যায় বলা হয়। শনিপর্যায়ের দৈর্ঘ্য গড়ে ভারতবর্ষীয় আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক সাধুগণের মতে ‘সাড়েতিন দিন’ এবং পারস্য রূপকার মনীষিদের মতে ‘তিনদিন’। অর্থাৎ শনিপর্যায় বা শনিবারের দৈর্ঘ্য সাড়েতিন দিন বা তিনদিন।
শনি (রূপ)বি সপ্তাহের দিনবিশেষ, বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিন বিশেষ, সৌরম-লের অন্যতম গ্রহ, saturn (জ্যোশা) অশুভ গ্রহ (আল) শত্রু, বৈরী, অরি, রিপু, প্রবৃত্তি, মন্দ, অকল্যাণ, অমঙ্গল, ঘাতক, নাশক, সর্বনাশকারী, ক্ষতিকর (আবি) অন্ধকার, অপত্রিতা, অমাবস্যা, ঋতুকাল, সিনানী, রজস্বলাদের রজস্রাব (ব্য্য) রজস্বলাদের রজস্রাব আরম্ভ হওয়ার পর হতে রজস্রাব শেষ হওয়া পর্যন্ত গড়ে সাড়ে তিনদিন সময় (প্র) পুরাণিদের প্রাচীন বিশ্বাসে সূর্যপুত্র (আবি)বি অবতার, ঘোষক, জোয়ার, বন্যা, রক্তবন্যা, লালজল, লালবাতি (ভাঅ)বি ১. ধূলি, রেণু, পরাগ, পুষ্পরেণু ২. আর্তব, স্রাব, ডাস্ট (dust), মিন্সট্রুয়াল (menstrual), আদাত (আ.ﻋﺎﺪﺓ), কুরউ (আ.ﻘﺮﺃ), মাহিজ (আ.ﻤﺤﻴﺾ) (আঞ্চ)বি ঋতু, মাসিক (আদৈ)বি নবি (আ.ﻧﺒﺉ), পয়গাম্বর (ফা.ﭙﻴﮕﻤﺒﺭ), হাওয়া (আ.ﺤﻮﺍﺀ) (আপ)বি ইঞ্জিল (আ.ﺍﻧﺠﻴﻝ), যাবুর (আ.ﺯﺒﻮﺭ) (ইদৈ)বি ম্যাসেঞ্জার (messenger) (দেপ্র) এটি ‘রজ’ পরিবারের ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১. সাধারণত বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবসকে শনি বলা হয় ২. রজস্বলা রমণিদের জরায়ু হতে প্রকৃতির নিয়মে প্রতি মাসে প্রবাহিত রক্তধারাকে রজ বা রূপকার্থে শনি বলা হয় (ছনা)বি আদিমাতা, ঘোষক, নক্ষত্র, বসিধ ও সরস্বতী (চরি)বি অরুণ, মহল্লাল, রংলাল ও লালিমা (উপ)বি গরল, তিক্তজল, বন্যা, লালবাতি, সংবাদপত্র ও হলাহল (রূ)বি জোয়ার (দেত)বি রজ।
শনিপর্যায় (রূপ)বি শনিবার, মন্দ সময়, অপবিত্র সময়, অমঙ্গল সময়, বিপদ মুহূর্ত (প্র) ১. এটি বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ ২. রজস্বলাদের রজস্রাব আগমন হতে তা পুনরায় ঊর্ধ্বগমন পর্যন্ত সময় ৩. আত্মদর্শনে আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় বিশেষ (ছনা)বি কৃষ্ণপক্ষ (চরি)বি অমাবতী, সিনানী (উপ)বি রাত (রূ)বি অমাবস্যা (দেত)বি রজকাল {বাং.শনি+ বাং.পর্যায়} পর্যায়- শুক্লপর্যায় দেখুন।
শনিপর্যায়ের সংজ্ঞা
১. রজস্রাব আগমন হতে তা পুনরায় ঊর্ধ্বগমন পর্যন্ত সময়কে শনিপর্যায় বলে।
২. মানবদেহে বসিধাদেবির অবস্থানকালীন অপবিত্র সাড়েতিন দিন সময়কে শনিপর্যায় বলে।
শনিবার (রূপ)বি শনিদিবস, শনিদিন, মন্দদিবস, মন্দদিন (প্র) ১. এটি বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ ২. রজস্বলাদের রজস্রাব আগমন হতে তা পুনরায় ঊর্ধ্বগমন পর্যন্ত সময় ৩. আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় বিশেষ (আবি)বি অন্ধকার, আঁধার, শনিবার, সিনানী (ভাঅ)বি ঋতুকাল, আর্তবা রমণিদের আর্তবকাল, রজস্বলা রমণিদের রজ চলাকালীন সময়, দি পিরিওড ওফ মিন্সট্রুয়েল ডিসচার্জ (the period of menstrual discharge), মুদ্দাতুল হায়িজ (আ.ﻤﺪﺓ ﺍﻟﺤﻴﺾ) (আপ)বি আইয়ামিবিজ (আ.ﺍﻴﺎﻡ ﺒﻌﺾ), নবুয়াত (আ.ﻧﺒﻮﺖ), লাইল (আ.ﻟﻴﻞ), শব (ফা.ﺸﺐ) (ইপ)বি নাইট (night), ডাস্ট পিরিওড (dust period) (দেপ্র) এটি ‘রজকাল’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১. সাধারণত বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবসকে শনিবার বলা হয় ২. রূপকসাহিত্যে রজস্বলাদের রজকালকে শনিবার বলা হয় (ছনা)বি কৃষ্ণপক্ষ ও শনিবার (চরি)বি অমাবতী ও সিনানী (উপ)বি রাত (রূ)বি অমাবস্যা (দেত)বি রজকাল {বাং.শনি+ ফা.বার. ﺑﺎﺮ} বার- বার১ [ﺒﺎﺭ], বার২ [bar], বার৩ [bar] ও বার৪ [bar] দেখুন।
৩. মঙ্গলপর্যায়
রূপকসাহিত্যে দেহবিশ্বের পবিত্রকালের ২৭ দিন সময়কে মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবার বলা হয়। শনি প্রতীতি বা বসিধ প্রতীতির বিদায়ের পর মানবদেহে মঙ্গল প্রতীতির আবির্ভাব হয়। অতঃপর এ প্রতীতিও ২৭ দিন অবস্থান করেন। তারপর আবার তিনিও অজানা উদ্দেশ্যে ঊর্ধ্বগমন করেন। আবার শনি প্রতীতি আগমন করেন। কন্যা সন্তানের রজস্বলা হওয়ার পর হতে এভাবে বসিধ ও মঙ্গল প্রতীতির আগমন ও ঊর্ধ্বগমনের পালা চলতে থাকে। তবে শুক্ল প্রতীতি আর কোন্দিন আগমন করেন না। এক স্রাব প্রস্থান হতে অন্য স্রাবের পুনরাগমনের পূর্ব পর্যন্ত পুরো ২৭দিন সময়েকই মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবার বলা হয়। শনিপর্যায়ের দৈর্ঘ্য গড়ে ভারতবর্ষীয় আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক সাধুগণের মতে ‘সাড়েতিন দিন’ এবং পারস্য রূপকার মনীষিদের মতে ‘তিনদিন’। শনিপর্যায় ‘সাড়েতিন দিন’ বা ‘তিনদিন’ যা-ই হোক না কেন এর প্রস্থানের পরপর আগমন ঘটে মঙ্গলপর্যায়ের। অতঃপর পবিত্রকাল আরম্ভ হয়। রূপকসাহিত্যে এ পবিত্রকালকেই মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবার বলা হয়। আর পবিত্রকালের স্থায়িত্ব সাতাশদিন বলে মঙ্গলবারের স্থায়িত্বকালও সাতাশদিন গণনা করা হয়। মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবারের দৈর্ঘ্য সর্ব সম্মতিক্রমে প্রতিপদের আট প্রহর। এক প্রহর সমান সাড়েতিন দিন। অর্থাৎ মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবারের দৈর্ঘ্য সাতাশ দিন।
উল্লেখ্য দেহবিশ্ব মোট ৯টি প্রহরে প্রবাহমান। প্রহরগুলো হলো ১. স্রাবণ্য ২. ঊষা ৩. নিশা ৪. ঊর্ধ্বা ৫. শংকা ৬. বিপদ ৭. নীরব ৮. নিরাপদ ও ৯. অর্যমা। এর একেক প্রহর সমান সাড়েতিন দিন। সাড়ে তিরিশদিনে মাস হলে এবং রাবণ্যের সাড়েতিন ত্যাগ করলে ২. ঊষা ৩. নিশা ৪. ঊর্ধ্বা ৫. শংকা ৬. বিপদ ৭. নীরব ৮. নিরাপদ ও ৯. অর্যমা এ আট প্রহর সমান সাতাশ দিন হয়। এ আট প্রহর বা সাতাশ দিনকেই রূপকসাহিত্যে মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবার বলা হয়। রূপকসাহিত্যে অবশ্য মঙ্গলপর্যায় বা মঙ্গলবারের ২টি বিভাগ রয়েছে। একটিকে বলা হয় সোমপর্যায় বা সোমবার এবং অপরটিকে বলা হয় রবিপর্যায় বা রবিবার। নিচে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রিকায় এদের আলোচনা করা হয়েছে।
মঙ্গল (রূপ)বি শুভ, লাভ, ভালো, হিত, কল্যাণ, উপকার, শান্তি, সুখ, আনন্দ (আল) মধু, মউ, মদ, সুরা বিণ হিতকর, শুভদায়ক, মঙ্গলজনক (প্র) বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ, সৌরজগতের একটি গ্রহ, Mars, কুজ নামক গ্রহ, দেবিগণের মাহাত্ম্য বিষয়ক কাব্য বা পালাগান (চণ্ডীমঙ্গল, মনসামঙ্গল) (আবি) আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায়।
মঙ্গলপর্যায় (রূপ)বি মঙ্গলবার, কল্যাণময় সময়, উন্নতির সময়, উপযুক্ত সময়, যথাযথ সময় (প্র) ১. এটি বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ ২.রজস্বলাদের রজস্রাব ঊর্ধ্বগমন হতে তা পুনরায় আগমন পর্যন্ত দীর্ঘ ২৭ দিন সময় ৩. আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় (ছনা)বি মঙ্গলবার ও শুক্লপক্ষ (উপ)বি দিন (রূ)বি পূর্ণিমা (দেত)বি পবিত্রতা {বাং.মঙ্গল+ বাং.পর্যায়} পর্যায়- শুক্লপর্যায় দেখুন।
মঙ্গলপর্যায়ের সংজ্ঞা
১. রজস্রাব ঊর্ধ্বগমন হতে তা পুনরায় আগমন পর্যন্ত সময়কে মঙ্গলপর্যায় বলে।
২. মানবদেহে মঙ্গল প্রতীতির অবস্থানকালীন ২৭দিন পবিত্র সময়কে মঙ্গলপর্যায় বলে।
মঙ্গলবার (রূপ)বি মঙ্গলদিবস, মঙ্গলদিন, উত্তমদিবস, উত্তমদিন (প্র) ১. এটি বঙ্গাব্দের সপ্তাহের একটি দিবস বিশেষ ২. প্রতিপদের আট প্রহর সময় বিশেষ ৩. আত্মদর্শনের আদি ১. শুক্ল ২. শনি ৩. মঙ্গল ৪. সোম ৫. রবি ৬. বুধ ৭. বৃহৎপতি- এ সপ্তপর্যায়ের একটি পর্যায় (আবি)বি পবিত্রতা, বিশুদ্ধতা, নির্মলতা, moon-full (মুনফুল), ‘كامل القمر’ (কামাল আলক্বামার) (আভা)বি পৌর্ণমাসী, শুক্লপক্ষ, শরীরের সুস্থ্যতা (আপ)বি ইদ্দত (আ.ﻋﺩﺖ), চাহারশম্বা (ফা.ﭼﻬﺎﺮ ﺸﻧﺒﻪ), ত্বহুর (আ.ﻄﻬﺭﺓ), পাক (ফা.ﭙﺎﮎ), মি’রাজ (আ.ﻤﻌﺭﺍﺝ) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পবিত্রতা’ পরিবারের ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১. বঙ্গাব্দের একটি দিবসকে মঙ্গলবার বলা হয় ২. রজস্বলাদের একস্রাবের প্রস্থান হতে অন্য স্রাব সূচনার মধ্যবর্তী সাতাশদিনকে পবিত্রতা বা রূপকার্থে মঙ্গলবার বলা হয় (ছনা)বি মঙ্গলবার ও শুক্লপক্ষ (উপ)বি দিন (রূ)বি পূর্ণিমা (দেত)বি পবিত্রতা {বাং.মঙ্গল+ ফা.বার. ﺑﺎﺮ} বার- বার১ [ﺒﺎﺭ], বার২ [bar], বার৩ [bar] ও বার৪ [bar] দেখুন।
সংক্ষিপ্ত
তথ্যসূত্র : আত্মতত্ত্ব ভেদ (৩য় খণ্ড)
লেখক, বলন কাঁইজি।