শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৪

মন্দা- দ্বিতীয় পর্ব

একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান। দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকারধারি মানব দেহকে, মনের রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
দ্বিতীয় পর্ব…
২. হিংসা
হিংসা (রূপ)বি ঈর্ষা, দ্বেষ, বিদ্বেষ, মাৎসর্য্য, বধ, হনন, অনিষ্ট, ক্ষতি, অপকার, পরশ্রীকাতরতা, পরের ক্ষতি সাধন করার বাসনা।
হিংসার সংজ্ঞা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে মনের মাঝে অসহ্যভাবের উৎপত্তি হওয়াকে হিংসা বলে।
হিংসা উৎপত্তির কারণ
মানব মনে হিংসা উৎপত্তির কারণ অনেক তবে নিচে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হলো-
১. শত্রুতা হতে ক্রমেক্রমে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়।
২. কোন লোককে সমশ্রেণিতে উন্নীত হতে দেখলে মনে হিংসার সৃষ্টি হয়।
৩. হেয় ও ঘৃণিত লোকের উন্নতি দেখলে মনে হিংসার উদ্রেক হয়।
৪. যার উন্নতির প্রতি অভিশাপ করা ছিল হঠাৎ তার উন্নতি দেখলে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়।
৫. আকাঙ্ক্ষার অন্তরায় হয়ে দাঁড়ালে তার প্রতি মনে হিংসার সৃষ্টি হয়।
৬. নেতৃত্ব গ্রহণের আগ্রহ অত্যধিক হোলে উক্ত পদপ্রার্থির মনে অন্যান্য প্রার্থিদের প্রতি হিংসার উৎপত্তি হয়।
৭. জন্মগতভাবে নিকৃষ্ট মনোভাবের লোকেরা বাহ্যিক কোন কারণ না থাকলেও মানুষের সাথে অযথাই হিংসা করে থাকে। কারো উন্নতিই তারা সহ্য করতে পারে না। মানুষের বিপদাদির কথা শুনলে তারা মনেমনে আনন্দ অনুভব করে। এরা কৃপণ লোকের চেয়েও আরো নিকৃষ্ট।
হিংসার লক্ষণাদি
ঝগড়া, দ্বন্দ্ব, কলহ, দলাদলি ও পক্ষপাতিতা ইত্যাদিই হিংসার লক্ষণ।
হিংসার প্রকারভেদ
হিংসা দু প্রকার- ১.মৌন হিংসা ও ২.কর্মগত হিংসা।
১. মৌন হিংসা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে মনেমনে তার ধ্বংস কামনা করাকে মনগত হিংসা বলে। যেমন- অভিশম্পাত করা।
২. কর্মগত হিংসা
কারো সচ্ছলতা ও উন্নতি দেখে তা ধ্বংস করার জন্য নাশকতামূলক বিভিন্ন কাজকর্ম করাকে কর্মগত হিংসা বলে। যেমন- ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগ করা।
হিংসা তাড়ানোর উপায়
হিংসা তাড়ানোর উপায় দু’টি। যথা- ১.জ্ঞান দ্বারা হিংসা তাড়ানো ও ২.কর্ম দ্বারা হিংসা তাড়ানো।
১. জ্ঞান দ্বারা হিংসা তাড়ানো
উন্নতি দেখে যার সম্পর্কে মনে হিংসার উৎপত্তি হয়েছে- তার ব্যাপারে সর্ব সময় এরূপ ধারণা করা যে এ ব্যক্তি ভালো কর্ম করেছে বলেই তার উন্নতি হয়েছে আমিও তার মতো ভালো কাজকর্মাদি করলে আমারও এরূপ উন্নতি হতো। পিছনে যত সময় অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু এখন থেকে আর বৃথা সময় নষ্ট করব না এখন থেকে আমিও ব্যবসা-বৃত্তিতে গভীর মনোযোগ দিলাম। মনকে জ্ঞান দ্বারা এরূপভাবে বুঝাতে থাকলে মন হতে ক্রমেক্রমে হিংসা বিদায় হতে থাকে।
২. কর্ম দ্বারা হিংসা তাড়ানো
যার প্রতি হিংসার সৃষ্টি হয়েছে, তার সাথে সর্বদা উত্তম ব্যবহার করা। সর্বত্র তার প্রশংসা অধিক অধিক করা। হিংসা করা সম্পূর্ণই নিষিদ্ধ ও মানবিক নীতিবিরুদ্ধ কাজ। তবে হিংসার বৈধরূপ হলো- প্রতিযোগিতা। হিংসা করা অবৈধ কিন্তু প্রতিযোগিতা করা বৈধ।
প্রতিযোগিতা
প্রতিযোগিতা (রূপ)বি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিরুদ্ধতা।
প্রতিযোগিতার সংজ্ঞা
১. বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
২. উন্নতিলাভকারির মতো উন্নতিলাভ করার জন্য বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
প্রতিযোগিতার প্রকারভেদ
প্রতিযোগিতা দু প্রকার- ১.জ্ঞান দ্বারা প্রতিযোগিতা ও ২.কর্ম দ্বারা প্রতিযোগিতা।
১. জ্ঞানগত প্রতিযোগিতা
কোন ব্যক্তি যে বিষয়ে যে জ্ঞান দ্বারা উন্নতিলাভ করেছে সে বিষয়ে তার চেয়ে অধিক জ্ঞানার্জন করলে অবশ্যই তার চেয়েও অধিক উন্নতিলাভ করা যাবে। এরূপ ভেবে উক্ত জ্ঞানার্জনে মনোনিবেশ করাকে জ্ঞানগত প্রতিযোগিতা বলে। এটা সর্বযুগেই সম্পূর্ণ সিদ্ধ।
২. কর্মগত প্রতিযোগিতা
উন্নতি লাভকারী ব্যক্তি যে যে কাজ যেরূপভাবে করে উন্নতিলাভ করেছে সে সে কাজ তার চেয়ে আরো ভালোভাবে করলে অবশ্যই তার চেয়েও অধিক উন্নতিলাভ করা যাবে। এরূপ ভেবে উক্ত কার্যাদি সুসম্পাদন করায় মনোনিবেশ করাকে কর্মগত প্রতিযোগিতা বলে। এটা সর্বকালে সর্ব সম্মতিক্রমেই সিদ্ধ বা বৈধ।
প্রতিযোগিতার উপকার
১. প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করলে যে কোন কাজ দ্রুত শেষ করা যায়।
২. প্রতিযোগিতার দ্বারা যে কোন কাজের দ্রুত সফলতালাভ করা যায়।
প্রতিযোগিতার অপকার
১. প্রতিযোগিতা মূলক কাজকর্মাদি অনেক ক্ষেত্রেই সুষ্ঠ ও সুন্দর হয় না কিন্তু স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা অটুট রেখে ধীর ও স্থিরভাবে কার্যাদি সম্পাদন করলে সর্বক্ষেত্রেই তা সুষ্ঠ ও সুন্দর হয়।
২. প্রাতিযোগীতার দ্বারা প্রাপ্ত সফলতা প্রায় ক্ষেত্রে অধিককাল স্থায়ী হয় না কিন্তু প্রতিযোগিতা ব্যতিরেখে ধীর ও স্থিরভাবে কার্যাদি সম্পাদন করলে সর্বক্ষেত্রেই তার ফল অধিককাল স্থায়ী হয়।
হিংসা ও প্রতিযোগিতার মধ্যে পার্থক্য
১. কারো সচ্ছল অবস্থা ও উন্নতি দেখে মনের মাঝে অসহ্য-ভাবের উৎপত্তি হওয়াকে হিংসা বলে।
২. বৈধ উপায়ে কোন সমকক্ষতা অর্জনের চেষ্টা ও সাধনাকে প্রতিযোগিতা বলে।
১. হিংসা দুই প্রকার- ১.জ্ঞানগত সিংসা ও ২.কর্মগত হিংসা।
২. প্রতিযোগিতা দুই প্রকার- ১.জ্ঞান দ্বারা প্রতিযোগিতা ও ২.কর্ম দ্বারা প্রতিযোগিতা।
১. হিংসা করা সম্পূর্ণ অবৈধ
২. প্রতিযোগিতা করা সম্পূর্ণ বৈধ
১. হিংসার পরিণাম ধ্বংস
২. প্রতিযোগিতার পরিণাম সাফল্য।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন