শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৪

কাঁই প্রসঙ্গঃ পর্ব- ২

পর্ব- ২
কাঁইয়ের পরিচয়
মরমিগণ বলেন স্রষ্টা পরিভাষাটির অভিধা হলো জীবকুলের প্রাণশক্তি বহনকারী একপ্রকার জীবজল। জীবকুল বয়সপ্রাপ্ত হোলে একটি নির্দিষ্ট সময়ে জীবদেহে এ রসের উৎপত্তি হয়। জীবদেহে এ রসের উৎপত্তি না হোলে জীবকোষাদি প্রাণশক্তি উৎপাদন করার ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় না। যেমন- শিশুদের শুক্র বা শিশুকোষ কোনটিতেই ডিম্বকের সক্সেগ যুক্ত হয়ে বিদ্যুৎ ধারণ করা বা বিদ্যুৎ উৎপাদন করার ক্ষমতা নেই। আবার কিশোরিদের ক্ষেত্রেও তাই দেখা যায়। কোন কিশোরী রজস্বলা হওয়ার পূর্বে যত শুক্রই ধারণ করুক না কেন কোন প্রকার ভ্রূণ সৃষ্টি করে গর্ভধারণ করতে পারে না।
জীবকুল যৌবনকালে বিদ্যুৎধারণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে ক্ষমতালাভ করে তাকে জীবের সৃষ্টিশক্তি বলে। এ সৃষ্টিশক্তি বা জীবনিশক্তি যে রসের মধ্যে সঞ্চিত থাকে মরমিকবি বা আত্মতাত্ত্বিকগণ তাকেই স্রষ্টা বলেন। কিশোরের মুচ উদ্গত হোলে, কিশোরী রজস্বলা হোলে, ধান সোনালিবর্ণ ধারণ করলে, ফল পাকলে তাদের মধ্যে সৃষ্টিশক্তি প্রবেশ করে। কিশোরের মুচ উঠার পূর্বে, কিশোরী রজস্বলা হওয়ার পূর্বে, সবুজধানে ও কাঁচাফলে সৃষ্টিশক্তি থাকে না বিধায় কিশোরের বীর্যে, কিশোরির গর্ভে সন্তান জন্ম হয় না এবং সবুজ ধান বা কাঁচা ফল বপন করলে তা ভ্রূণও সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে অংকুরিতও হয় না।
আবার যথাযথশক্তি বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে জীবের এ স্বায়ম্ভুশক্তি বা সৃষ্টিশক্তিকে হত্যাও করা যায়। যেমন- ডিম ও ধান সিদ্ধ করলে ডিম ও ধানের ভিতরে ব্যাপ্ত সৃষ্টিশক্তি মারা যায়। ফলে সিদ্ধ ডিমের ছানা ফুটে না এবং সিদ্ধ ধান বপন করলে অংকুরিত হয় না। ডিম বা ধান সিদ্ধ করার পূর্বে যে শক্তি ছিল কিন্তু সিদ্ধ করার পর তা লোপ পেয়েছে সে শক্তিকেই সৃষ্টিশক্তি বা স্বায়ম্ভুশক্তি বলে। এ সৃষ্টিশক্তি যে রসের মধ্যে সঞ্চিত থাকে তাকেই মরমিগণ স্রষ্টা বলে থাকেন। অর্থাৎ জীবদেহে সৃষ্টিশক্তি বা স্বায়ম্ভুশক্তি বহনকারী রসকেই আধ্যাত্মিকবিজ্ঞানে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলে।
আত্মতাত্ত্বিকগণের মতে মানবদেহে কালোবর্ণের এক প্রকার রস এ সৃষ্টিশক্তি বহন করে। একে ধরা যায়, দেখা যায়, ভজন ও ভোজন করা যায় বিধায় মরমিগণ এ জীবজল বা জীবাম্বুকে রূপকভাবে কাঁই, ব্র‏হ্মা, কৃষ্ণ, কাজলা, কালা, কালাচাঁদ, কালাচাঁন, কালিয়া, কালোভ্রমর, কালোমানিক, কালোশশী, কেলে, কেলেমানিক, কেলে সোনা, চিকনকালা, বিরিঞ্চি, শ্যাম, শ্যামল, শ্যামলা, শ্যামকালিয়া ইত্যাদি নামে নামকরণ করেছেন। এসব নামেই আবহমানকাল হতে আমাদের বাংলাভাষায় রচিত হয়ে আসছে অসংখ্য গীতিকাব্য। যেমন-
১. “চাতক প্রায় অহর্নিশি, চেয়ে থাকে কালোশশী, হব বলে চরণদাসী, তা হয় না কপাল গুণে” (পবিত্র লালন- ৭৯১/২)।
২. “অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণ নিধি, তার কী আছে কভু গোষ্ঠখেলা, ব্র‏হ্মরূপে সে অটলে বসে, লীলাকারী তার অংশকলা। পূর্ণচন্দ্র কৃষ্ণ রসিক শিখরে, শক্তির উদয় যার শরীরে, শক্তিতে সৃজন মহাসংকর্ষণ, বেদ আগমে যারে কৃষ্ণ বলে। সত্য স্মরণ বেদ আগমে কয়, চিদানন্দরূপ পূর্ণব্রহ্ম হয়, জন্মমৃত্যু যার নাই ভবের পর, তবু তো নয় স্বয়ং নন্দলালা। যে দরবেশের দিলদরিয়া অথাই, অজান খবর সে জানে ভাই, ভজ দরবেশ পাবি উপদেশ, লালন কয় হয় উজ্জ্বল হৃদকমলা” (পবিত্র লালন- ৫৯৩)।
৩. “কাজলাকালো বন্ধু আমার, আসবি কবে বলরে কাজলা আসবি কবে বল। অনেকদিন গেছিস রে কাজলা আসবি কবে বল, দিবানিশি তোর জন্য মন করে টলমল” (অজ্ঞাত গীতিকার)।
৪. “কালা আমায় পাগল করেছেরে, ঘরে রই কেমনে” (অজ্ঞাত গীতিকার)।
৫. “আজ পাশাখেলব রে শ্যাম, ও শ্যাম রে তোমার সনে, একেলা পেয়েছিরে শ্যাম, এ নিধুবনে”(মরমিগীতিকার রাধারমণ)
৬. “তোমার লাগিয়ারে সদায়, মন আমার কান্দে বন্ধুরে, প্রাণবন্ধু কালিয়ারে। হৃদয় নিষ্ঠুর রে বন্ধু, তুই তো কুলনাশা, আসি বলে ফাঁকি দিলিরে বন্ধু, না মিটালি আশা” (কানাইলাল শীল)।
৭. “রজনী হোসনে অবসান, আজ নিশিতে আসতে পারে, বন্ধু কালাচাঁন” (অজ্ঞাত গীতিকার)।
৮. “এমন শ্যামল সুন্দর মুখ ওরে, আমি যেদিন হতে হেরি, আমার মনে লয় না, ঘর আর বাড়ি” (অজ্ঞাত গীতিকার)।
৯. শ্যাম কালিয়ারে কৃষ্ণ কালিয়া, কী সুখে রয়েছে রাধা, দেখে যাও আসিয়া (বলন কাঁইজি)।
১০. কোথায় রইলারে শ্যাম কালিয়া, পাগল বানাইয়া আমায় উদাসী করিয়া (বলন কাঁইজি)।
সমীক্ষা
আমাদের বাংভারতীয় উপমহাদেশ ফর্সা বা সাদাপ্রিয় দেশ। বাংভারতীয় উপমহাদেশের শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ সবাই ফর্সা বা সাদা ভালোবাসে। বিশ্বের মধ্যে মাত্র দুয়েকটি কালো প্রিয় দেশ আছে। সে সব দেশের শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ সবাই কালো ভালোবাসে। কিন্তু এ উপমহাদেশের গীতিকার বা মরমিকবিগণ কালো নিয়ে গীতি রচনা করে থাকেন। যদি কালো শব্দটির সত্যসত্যই কোন গোপন অভিধা না থাকত তবে কালোবর্ণ নিয়ে সবাই লেখত না। যেহেতু এ উপমহাদেশ ফর্সাপ্রিয়। অতএব সব গীতিকাব্যাদি ফর্সা নিয়েই রচিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে কেউই ফর্সা নিয়ে কোন আধ্যাত্মিকগীতি রচনা করেননি । সবাই কালো, কৃষ্ণ, শ্যাম অর্থাৎ কালোবর্ণ নিয়েই গীতি রচনা করেছেন, বর্তমানেও করতেছেন এবং ভবিষ্যতেও রচনা করবেন। এ কালো, কালা, কৃষ্ণ বা শ্যাম দ্বারা আধ্যাত্মিকসাহিত্য বা রূপকসাহিত্যে কাঁই বা ব্র‏হ্মাকে বুঝায় এবং কাঁই বা ব্র‏হ্মা রূপক পরিভাষাটির প্রকৃত আভিধানিক শব্দই হলো স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা।
আমাদের আভিধানিক স্রষ্টাই রূপকসাহিত্যে ব্র‏হ্মা বা কাঁই বা কৃষ্ণ। মরমিসাধকগণ মানবদেহ হতে নিয়মিত সাধন ও অনুশীলনের দ্বারা এ কাঁইয়ের দর্শনলাভ করেই কাঁইজি ও ব্র‏হ্মার দর্শনলাভ করেই ব্রাহ্মণ বা ব্র‏হ্মচারী উপাধিলাভ করেন। মরমিগণের মতে স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তার প্রত্যক্ষ সাক্ষাৎলাভ করাই সাধনরাজ্যের সর্বশেষ স্তর। তদ্রূপ আরবীয় আধ্যাত্মিকবিদ্যা (রুহানিয়্যাত. ﺮﻭﺤﺎﻨﻴﺔ) বা রূপকসাহিত্যে আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) এর সাথে প্রত্যক্ষ দর্শনলাভ করাই আব্দালগণের সর্বশেষ স্তর। আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) এর সাথে সাক্ষাৎলাভ করলেই আব্দালগণের উপাধি অলিউল্লাহ (ﻭﻟﻰﺍﻠﻠﻪ) বা সংক্ষেপে অলি (ﻭﻟﻰ) হয়ে যায়। আরবি এ অলি (ﻭﻟﻰ) পরিভাষাটির বহুবচন হলো আউলিয়া (ﺍﻭﻟﻴﺎﺀ)। সাধকের ব্রাহ্মণ বা অলি (ﻭﻟﻰ) হওয়ার পর আর কোন সাধন ভজন অবশিষ্ট থাকে না। তখন তাঁরা কেউবা গ্রন্থ লিখে কেউবা নিরব থেকে আবার কেউবা গুরুরূপে অবশিষ্ট জীবনকাল অতিবাহিত করে পরপারে যাত্রা করেন।
১.“যেখানে সাঁইর বারামখানা, শুনলে মন চমকে উঠে, দেখতে যেমন ভুজঙ্গগনা।
যা ছুঁলে প্রাণে মরি, এ জগতে তাইতে তরি, বুঝে তা বুঝতে নারি, কী করি তার নাই ঠিকানা।
আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে, কুবৃক্ষে সুফল পেয়েছে, আমার মনের ঘোর গেল না।
যে ধনে উৎপত্তি প্রাণধন, সে ধনের হলো না যতন, অকালে ফল পাকায় লালন, দেখেশুনে জ্ঞান হলো না” (পবিত্র লালন- ৮২৮)।
২. “يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ” “ইয়া আইয়্যুহাল্লাজিনা আমানু লা তাখুনুল্লাহ ওয়ার রাসুল ওয়া তাখুনু আমানাতিকুম ওয়া আনতুম তা’লামুন” অর্থ- “হে বিশ্বাসীগণ তোমরা কাঁই ও সাঁই এর অপচয় করো না এবং তোমরা সঞ্চিত সম্পদের অপচয় করো না, তোমরা জ্ঞাত থাকা অবস্থায়”। O you who believe! Betray not Lord and God, nor betray knowingly your things entrusted to you, if you know (কুরান, আনফাল- ২৭)।
ওপরোক্ত উদ্ধৃতি দু’টি মরমিগণের স্রষ্টা মানবদেহের সংকর, সাঁই ও কাঁই প্রমাণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
পরিশেষ
কাঁই, ব্র‏হ্মা ও আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) যাই বলি না কেন, এসবের ধ্রূব বাস্তবতা রয়েছে এবং আত্মদর্শনে এ শব্দাদির বাস্তবসত্তাও রয়েছে। এসব অত্যন্ত গুরুত্ববহনকারী ও রহস্যময় শব্দ। কাঁই, ব্র‏হ্মা, আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) ও লর্ড (Lord) এসব শব্দকে শুধুই গালগল্প, অর্থহীন, ভিত্তিহীন, বাস্তবতাহীন, সত্তাহীন ও অভিধাহীন বলে উপহাস করা বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের আধ্যাত্মিকদৈন্যতা বৈ নয়। আবার সাম্প্রদায়িক মতানুসারিগণ কাঁই, ব্র‏হ্মা ও আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) ইত্যাদি শব্দের অভিধা যে নিরাকার মহাশক্তি বলে নির্ধারণ করেছেন- তাও একেবারে ভিত্তিহীন। কোন নিরাকারসত্তা নিয়ে এতো কিছু লেখা বা বলার কোন অবকাশ নেই। যাকে ধরা যায় না, অনুভব করা যায় না, ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, ভোজন, ভজন বা পূঁজন করা যায় না তা নিয়ে রূপকসাহিত্য বা আধ্যাত্মিকসাহিত্য বা মহাবিজ্ঞানে আলোচনা করা একেবারে অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। কাঁই, ব্র‏হ্মা ও আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) ইত্যাদির যদি কোন বাস্তবতা না থাকত তবে মহাবিজ্ঞানী মরমিগণ এতো কালি ব্যয় করে এতো কাগজ নষ্ট করে এতো গ্রন্থাদি রচনা করতেন না।
সর্বশেষে বলতে হয় ব্যবধানে অবস্থান করে কোন কিছুই জানা বা বুঝা যায় না। ওপরোক্ত ত্রি-ত্ব মত পরিত্যাগ করে একনিষ্ঠভাবে কাঁই, ব্র‏হ্মা ও আল্লাহ (ﺍﻠﻠﻪ) ইত্যাদি শব্দের প্রকৃতসত্তা উদ্ঘাটন করতে হোলে আধ্যাত্মিকবিদ্যা বা মহাবিজ্ঞান ভালোভাবে পড়ে দেখুন। মরমী মহাবিজ্ঞানিগণের নিকট শব্দাদির গভীর তত্ত্বভেদ ও রহস্যময়তা একান্তভাবে জানা ও বুঝার চেষ্টা করুণ। তা না হোলে শুধু বিজ্ঞান ও দর্শন দ্বারা মহাবিজ্ঞান জানা ও বুঝা সম্ভব নয়। যেহেতু আদিস্রষ্টাকে ধরা ছোঁয়া যায় না সেহেতু স্রষ্টাকে নিয়ে কোন কিছু আলোচনাও পরাবিদ্যা বা আধ্যাত্মিকবিদ্যা বা রূপকসাহিত্যের বিষয়বস্তুও নয়। বিশ্বের সব রূপকসাহিত্যে যার আলোচনা করা হয়েছে বর্তমানেও করা হচ্ছে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত করা হবে তিনি হোলেন স্বয়ম্ভুসদস্য স্বায়ম্ভুব। বাংলাভাষায় আধ্যাত্মিকনাম “কাঁই” সংস্কৃতভাষায় ‘ব্রহ্মা’ আরবি ভাষায় ‘আল্লাহ’ (‘ﺍﻠﻠﻪ’) এবং ইংরেজি ভাষায় ‘লর্ড’ (Lord)।
জীবের বর্তমান অবস্থা স্রষ্টা সৃষ্টি করে না। স্রষ্টা হলেন আদিসৃষ্টিকর্তা। স্রষ্টার প্রতিনিধি স্বায়ম্ভু তিনি সৃষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন মাত্র কিন্তু তিনিও নিজে সৃষ্টি করতে পারেন না। বর্তমানে স্রষ্টা নিজে কোন কিছু সৃষ্টি করেন না। তিনি সব কিছু আদিপর্বে সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তাঁর প্রতিনিধি স্বায়ম্ভু তার সদস্যদের নিয়ে সৃষ্টিকার্য পরিচালনা করে থাকেন কিন্তু তিনিও কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জীবের সৃষ্টিকর্তা বলতে একমাত্র জনককেই বুঝায়। একমাত্র পিতার ইচ্ছেতেই জীব সৃষ্টি হয়। রূপকসাহিত্যে পিতা বলতে পিতামাতা উভয়ই বুঝায়। পিতা ইচ্ছে করলে সন্তান সৃষ্টি করতে পারেন আবার নাও পারেন। প্রসঙ্গক্রমে আবারও বলতে হয় স্রষ্টা বর্তমান জীব সৃষ্টি ক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন না এবং তার জীব সৃষ্টিক্রিয়ার অনুঘটক প্রতিনিধি স্বায়ম্ভুও নিজে কোন জীব সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জীবের সৃষ্টিকর্তাকে চিনার অর্থ যার যার আপন পিতাকে চিনা এবং উপাস্য চিনা অর্থ স্বায়ম্ভুর জীব সৃষ্টির অনুঘটক সদস্য সাঁই ও কাঁইকে চিনা। উপাস্যরূপে পিতা নয় স্রষ্টাও নয় বরং সাঁই ও কাঁই। স্থূলজ্ঞানী ও সাম্প্রদায়িক সংস্কারের নীতিমালার ধ্বজাধারিগণ নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে প্রত্যক্ষ বোকামি করে সাধারণ মানুষকে বিপথগামী করে চিরান্ধকারের পথে ঠেলে দিয়ে আসছে বরাবরই।
বিশ্বের কোন মহাগ্রন্থে নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে অযথা অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে বলা হয়নি। ক্ষুদ্র পরিসর জীবনে যাকে ধরা যায় এবং যাকে সাধনভজনে পাওয়া যায় এরূপ উপাস্য সাঁই ও কাঁইয়ের উপাসনা করেই তো শেষ করা যায় না। আর যাকে ধরা যায় না ও যাকে ছোঁয়া যায় না এরূপ নিরাকার উপাস্যের উপাসনা মানুষ করবে কোন্ সময়ে। পরিশেষে বলা যায় জীবের সৃষ্টিকর্তা বা সৃজক বলতে জীবের স্বয়ম্ভুসদস্য স্বায়ম্ভুবকে বুঝায়। স্বায়ম্ভুর বাংলা রূপকনামসদস্য হলো সাঁই। জীবের সৃষ্টিকর্তা স্বায়ম্ভুকেই বাংলাভাষায় রূপকভাবে কাঁই ইংরেজি ভাষায় রূপকভাবে লর্ড (Lord) এবং আরবি ভাষায় রূপকভাবে ‘আল্লাহ’ (‘ﺍﻠﻠﻪ’) বলা হয়। নিচে কাঁই পরিভাষাটির গঠন ও তাৎপর্য তুলে ধরা হলো।
কাঁই পরিভাষাটির উৎপত্তি বিশ্লেষণ
কালো (রূপ)বি কৃষ্ণবর্ণ, শ্যামবর্ণ বিণ কৃষ্ণবর্ণযুক্ত, শ্যামবর্ণবিশিষ্ট (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা। কালো + ঈশ্বর = কাঈ (উভয় শব্দের প্রথম বর্ণ গ্রহণ করে)। ‘কাঈ’ শব্দটির দীর্ঘই (ঈ) বর্ণটির দীর্ঘস্বর পড়তে কষ্ট হয় বিধায় পড়ার সুবিধার্থে দীর্ঘই (ঈ) বর্ণটিকে হ্রস্বই (ই) বর্ণ দ্বারা পরিবর্তন করে এবং সে পরিবর্তনের চিহ্নস্বরূপ একটি চন্দ্রবিন্দু “ ঁ ” গ্রহণ করে ‘কাঈ’ শব্দটি “কাঁই” পরিভাষারূপে সৃষ্টি করা হয়েছে। বাংলা এ ‘কাঁই’ পরিভাষাটি হতেই ‘কাঁইজি’ পরিভাষাটির উৎপত্তি। নিচে ‘কাঁইজি’ পরিভাষাটির উৎপত্তি বিশ্লেষণ করা হলো।
কাঁই (রূপ)বি ব্র‏হ্মা, বিরিঞ্চি, কালা, কেলে, কালিয়া, কৃষ্ণ, কাজলা, শ্যাম, শ্যামল, শ্যামলা (সাঅ)বি সৃষ্টিকর্তা, জগৎস্রষ্টা, বিধাতা, কমলাসন, চতুরানন, প্রজাপতি, হিরণ্যগর্ভ, স্বায়ম্ভু, ব্রহ্মশক্তি (পরি) বীজের অংকুরোদ্গম ক্ষমতা, যে শক্তির দ্বারা বীজ বা জীবের বংশবৃদ্ধি হয়, মানবদেহে প্রাপ্ত কালোবর্ণের জীবজল বা মধুবৎ মিষ্ট অমৃতসুধা (ব্য্য) কাঁইশক্তি বা জীবনিশক্তি ভিন্ন জীব সৃষ্টি হয় না এবং জীবকুল পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে না বলে কাঁইকে সৃষ্টিকর্তা বলা হয় (আদৈ)বি আল্লাহ (ﺍﻟﻟﻪ) (ইদৈ)বি লর্ড (Lord) (রূনা)বি চোর, স্রষ্টা (চরি)বি অনাথ, কানীন, স্বায়ম্ভু (উপ)বি ঘি, ননি (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা {বাং. (কালো+ঈশ্বর)> কা+ঈ> কাঈ>}
জি [ﺠﻰ] অব্য নামের পরে ব্যবহৃত সম্বোধনসূচক শব্দ (নানাজি) {তু}
আবার বাংলা ‘কাঁই’ এবং তুর্কি ‘জি (ﺠﻰ)’ শব্দদ্বয় একত্রিত হয়ে (কাঁই+জি) এ “কাঁইজি” পরিভাষাটির উৎপত্তি হয়েছে।
কাঁইজি বিণ কাঁইচারী, কাঁইবিহারী, ব্রাহ্মণ, ব্র‏হ্মচারী, বৈরিঞ্চি (প্র) কাঁই বা সৃষ্টিকর্তার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দর্শনলাভকারী (পরি) জ্ঞানের নৈরাকারস্তর এবং রসাশ্রয় ও রূপাশ্রয় হতে এ “কাঁইজি” সম্প্রদায়ের উৎপত্তি {বাং.কাঁই+ তু.জি.ﺟﻰ}
সংক্ষিপ্ত
তথ্যসূত্র
আত্মতত্ত্ব ভেদ (ষষ্ঠ খণ্ড)- লেখক, বলন কাঁইজি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন