শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৪

৯৮/১. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গ- ‘সৃষ্টিকর্তf’- ২

৯৮/১. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘সৃষ্টিকর্তা’ (১৬ পর্বের ১ম পর্ব) (দ্বিতীয় অংশ) (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পরম্পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, নরত্বারোপ, স্বরূপদর্শন ও বলনদর্শন টীকা)
——————————————————————————
‘সৃষ্টিকর্তা’
Creator (ক্রিয়েটর)/ ‘ﺨﺎﻟﻖ’ (খালিক্ব)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলকপরিবারের একটি অন্যতম ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবার প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘কাঁই’, উপমানপরিভাষা ‘ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য’, চারিত্রিকপরিভাষা ‘অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ’ এবং ছদ্মনামপরিভাষা ‘আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর’। এটি একটি ‘রূপকপ্রধানসত্তা’ বিশেষ।
সৃষ্টিকর্তা বি নির্মাতা, পিতা, জনক, ক্রিয়েটর (creator), খালিক্ব (.ﺨﺎﻟﻖ), melanin (মিলেনিন), ‘ميلانين’ (মিলেনিন) (আবি)বি ঈশ্বর, অনন্ত, বিধাতা, স্বায়ম্ভু (বাদৈ)বি কালা, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, ব্রহ্মা, শ্যাম (আদৈ)বি আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি লর্ড (Lord), মেকার (maker), ডিজাইনার (designer) (পরি) মানবদেহে প্রাপ্ত কালোবর্ণের মধুবৎ মিষ্ট অমৃতসুধা (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবার প্রধান ও রূপকসাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে সৃষ্টিকর্তা বলা হয় ২.সৃষ্টিক্রিয়ার সরাসরি অংশ গ্রহণকারিকে সৃষ্টিকর্তা বা রূপকার্থে কাঁই বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
————————————————————————–
চমৎকার ১ (Marvelous- 1)
একবার কথার ছলে মুসা বলেছিলেন- “আমি অতিথি ভিন্ন একবেলাও আহার করব না।” এ প্রতীজ্ঞার পর হতে প্রতি সন্ধ্যায় অতিথিসহ আহার করা আরম্ভ করলেন। দৈবাৎ একদিন দুপুরে আহার করার জন্য তিনি একজন অতিথি অন্বেষণ করতে লাগলেন। বেলা অদৃশ্য হওয়ার উপক্রম হলেও কোন অতিথির সন্ধান পেলেন না তিনি। নিরুপায় হয়েই তিনি সন্ধ্যালগ্নে মধ্যা‎হ্ন ভোজন শেষ করলেন। আহার করতে বসে তিনি একটি কুকুর দেখতে পেলেন। কিন্তু কুকুরটিকে কোন প্রকার খাবার দিলেন না। অতঃপর রাত্রে আবার আল্লাহর সাথে আলোচনায় বসলেন। আল্লাহ বললেন- “মুসা তুমি তোমার অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছ।” মুসা বললেন- “না আমি কখনই আঙ্গীকার ভঙ্গ করিনি বরং দুপুরের আহারের জন্য আমি সন্ধ্যা পর্যন্ত অতিথির অধীর অপেক্ষা করেছি। অবশেষে অতিথির কোন সন্ধান না পেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় আমি অন্ন গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।” মুসার এরূপ বর্ণনা শ্রবণে আল্লাহ বললেন- “হে মুসা তুমি যখন আহার গ্রহণ করো তখন তোমার সম্মুখে একটি কুকুর দেখতে পাওনি কী?” উত্তরে মুসা বললেন- “হ্যাঁ” তখন আল্লাহ বললেন- “হে মুসা আমি কুকুররূপেই তোমার নিকটে অতিথিরূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলাম।”
চমৎকার- ২ (Marvelous- 2)
কুরানী মনীষিদের রূপকবর্ণনা মতে- দূতরূপে জিব্রাইল সব নবি ও রাসুলদের নিকট ওহি নিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। একবার জিব্রাইল রাসুলের নিকট ওহি নিয়ে উপস্থিত হলেন। রাসুল বললেন- “ভাই জিব্রাইল! তুমি যার নিকট হতে ওহি আনয়ন করো, তাঁকে কী তুমি দেখেছ?” তিনি বললেন- “না।” তখন রাসুল বললেন- “এবার গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করে সত্যতা যাচাই করেই বাণী নিয়ে এসো!” জিব্রাইল গিয়ে আল্লাহর স্বরূপদর্শন কামনা করলেন। এদত শ্রবণে আল্লাহ বললেন- “আজ গোধুলি লগ্নে জীবননদীর তীরে হাঁটতে থাকবে বিপরীত দিক হতে যাকে আসতে দেখবে তিনিই তোমার আল্লাহ। জিব্রাইল তাঁর কথা মতো জীবননদীর তীর ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলেন। ঠিক গোধুলিলগ্নে দেখতে পেলেন দূর হতে একজন লোক তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি গভীর আগ্রহের সাথে অপলক নয়নে সামনের দিকে হাঁটতে থাকলেন। নিকটে গিয়ে দেখলেন তিনি রাসুল। সম্বোধন ও করমর্দন শেষে তিনি আরো সামনের দিকে হাঁটতে থাকলেন। আর কারো দেখা না পেয়ে তিনি মনেমনে ভাবতে লাগলেন জীবননদীর তীরে যাঁকে দেখলাম তিনি তো রাসুল, আল্লাহর দেখা তো পেলাম না। তিনি দেখা করবেন বললেন কিন্তু দেখা করলেন না। তিনি তো মিথ্যাও বলেন না! তবে ব্যাপারটা কী? অবশেষে রাত্রির অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত হেঁটেও আর কারো দেখা না পেয়ে তিনি পৃথিবীতে রাসুলের নিকট আগমন করলেন।
সম্বোধন ও করমর্দন শেষে রাসুল জিব্রাইলকে জিজ্ঞেস করলেন- “দাদা তুমি আল্লাহকে দেখে এসেছ?” জিব্রাইল অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন। তিনি মনেমনে ভাবতে লাগলেন। আমরা প্রতীতি চোখের পলকে সত্তরসহস্র ক্রোশ পথ অতিক্রম করতে পারি কিন্তু মানুষ তো তা পারেন না। আমি তাঁকে স্বর্গের জীবননদীর তীরে হাঁটতে দেখে এলাম অথচ এত তাড়াতাড়ি এবং আমার পূর্বেই রাসুল পৃথিবীতে এলেন কিভাবে? বলনের চোখে মুখে আশ্চর্যের চি‎হ্ন দেখে রাসুল বললেন- “ঘাবড়িও না দাদা তুমি যা দেখেছ তা ঠিক দেখেছ।” শাস্ত্রীয় গল্পকাহিনি, শাস্ত্রীয় ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় উপন্যাসাদির মধ্যে এরূপ অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। কোন ঘটনায় শাস্ত্রীয় স্রষ্টাকে মাছ আকারে, কোথাও কুকুর আকারে, কোথাও গাছ আকারে, কোথাও পাখি আকারে, কোথাও নারী আকারে, কোথাও শিশু আকারে, কোথাও পুরুষ আকারে, কোথাও ডিম্ব আকারে ও কোথাও আগুন আকারে উপস্থাপনার করতে দেখা যায়।
শাস্ত্রীয় গল্পকাহিনির রূপকারগণ কেউ কেউ স্রষ্টার মুখ, চোখ, হাত, পা, আসন, বসন, আহার, বিহার, নারীকণ্ঠ বা নরকণ্ঠের বর্ণনা করতে পর্যন্ত ছাড় দেননি বিধায় বলা যায়- রূপকারগণ বোধ হয় স্রষ্টার পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন সদস্য। হয়ত তারা দীর্ঘদিন স্রষ্টার সাথে উঠাবসা, চলাফিরা, খাওয়াদাওয়া ও তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা করতেও পর্যন্ত ব্যর্থ হননি। তা না হলে তাঁরা স্রষ্টা সম্পর্কে এতো নিখুঁত বর্ণনাদি উপস্থাপন করতে সক্ষম হলেন কিভাবে? পুরাণিদের স্রষ্টা ব্র‏হ্মা ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে যে, একবার মহাদেব রাগান্বিত হয়ে ব্র‏হ্মাকে মেরে, তাঁর একটি মস্তক পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। পূর্বে ব্র‏হ্মার পাঁচটি মাথা ছিল। মহাদেব কর্তৃক ব্র‏হ্মার একটি মাথা ধ্বংস হওয়ার পর বর্তমানে তিনি চারটি মাথা নিয়ে বেঁচে রয়েছেন। সেজন্য আগে ব্র‏হ্মাকে পঞ্চানন বলা হতো কিন্তু বর্তমানে তাঁকে চতুরানন বলা হয়। অন্যদিকে মহাদেবের পাঁচটি মাথা পূর্বেও ছিল এবং এখনো রয়েছে। তাই মহাদেবকে পঞ্চানন বলা হয়। বর্তমানে ব্র‏হ্মার চেয়ে মহাদেবের একটি মাথা অধিক রয়েছে।
কুরানোক্ত নবি ঊর্ধ্বগমনে গেলে স্বয়ং কুরানোক্ত স্রষ্টা আল্লাহ সত্তরসহস্র পর্দার আড়ালে অবস্থান গ্রহণ করেন। হয়ত ভয়, নয়ত লজ্জা, নয়ত নিগূঢ় কোন কারণেই তিনি অত্যন্ত আপনজনকে কাছে পেয়েও তাঁর সঙ্গে পর্দাহীনভাবে দেখা করতে পারেননি। কুরানোক্ত মুসাও তাঁর সঙ্গে দেখা করতে উষ্মপর্বতে গেলে সেখানেও কুরানোক্ত স্রষ্টা তাঁর সঙ্গে সরাসরি দেখা করতে পারেননি।
এসব আলোচনা হতে পরিস্কারভাবে বুঝা যায়, শাস্ত্রীয় স্রষ্টার পুরো বর্ণনাটিই রূপকার বা গ্রন্থকারগণের মনের মাধুরিতে আঁকা নিছুক কাব্যিক চরিত্র মাত্র। যেভাবে ঔপন্যাসিকগণ উপন্যাস নির্মাণ করেন, ঠিক তদ্রূপই রূপকারগণও স্রষ্টা পালক, যম, আদিমানব, আদিমানবী, বসিধ, সাংবাদিক, প্রতীতি, স্বর্গ ও নরক এসব নির্মাণ করেছেন বিধায় বলা যায় শাস্ত্রীয়স্রষ্টা কখনই জাগতিক স্রষ্টা হতে পারে না। কারণ একেক শাস্ত্রীয় মতবাদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টার বর্ণনা একেক প্রকার। অন্যদিকে জাগতিক স্রষ্টা বা প্রকৃত স্রষ্টার বর্ণনা অনেকেই জানেনও না বিধায় তাঁর বর্ণনা তাঁরা করতেও এগিয়ে আসেননি। মোটকথা শাস্ত্রীয়স্রষ্টা অন্ধবিশ্বাসের অন্ধকার চাদরে চিরদিনের জন্যই চিরাবৃত। মৃত্যুর পূর্বে কোন শাস্ত্রীয় মতানুসারিই তাঁর সন্ধান পান না। যা মনেমনে নির্মাণ করা হয় তা তো মনেই থাকে। যার কোন বাস্তবতা নেই তা পাওয়া যাবেইবা কিভাবে? বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদের শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদি নির্মাণের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কারণ সব রূপকারের চিন্তাভাবনা এক নয়। যে রূপকার যেভাবে চিন্তাভাবনা করেন, তাঁর সৃষ্টিকর্তাও ঠিক সেভাবেই গড়ে উঠে। কোন রূপকার শক্তিকে সৃষ্টিকর্তা ধরে নিয়ে তাঁর রূপকবর্ণনা করেন, আবার কোন রূপকার প্রকৃতিকে সৃষ্টিকর্তা ধরে নিয়ে তাঁর রূপকবর্ণনা করেন, আবার কোন রূপকার মনগড়া নিরাকারসত্তাকে সৃষ্টিকর্তা ধরে নিয়ে তাঁর রূপকবর্ণনা করেন বিধায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক সৃষ্টিকর্তার বর্ণনা ভিন্নভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। ইঞ্জিলী রূপকার পণ্ডিতদের নির্মিত রূপক লর্ডের রূপক বর্ণনা ও ক্রিয়েটরের মধ্যে অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নিচে লর্ড ও ক্রিয়েটরের পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
লর্ড ও ক্রিয়েটর এর পার্থক্য
(Difference between Lord and creator)
লর্ড (Lord)
ক্রিয়েটর (creator)
১. ইঞ্জিলীদের শাস্ত্রীয় স্রষ্টাকে ইংরেজি ভাষায় লর্ড (Lord) বলে।
১. জাগতিক স্রষ্টাকে ইংরেজি ভাষায় ক্রিয়েটর (creator) বলে।
২. কেবল জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে লর্ড (Lord) বলা হয়।
২. বিশ্বজগতের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তাকে ক্রিয়েটর (creator) বলা হয়।
৩. লর্ড (Lord) কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. ক্রিয়েটর (creator) সারা সৃষ্টিকুলের সর্বত্র বিরাজিত।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা লর্ডের (Lord) দর্শনলাভ করে Lordship, Mastership, ‘مسترشيب’ (মুস্তারাশিব) ইত্যাদি উপাধি লাভ করা যায়।
৪. সাধন-ভজনের দ্বারা ক্রিয়েটরের দর্শনলাভ করা যায় না বিধায় ক্রিয়েটর সম্পর্কের কোন উপাধিও লাভ করা যায় না।
৫. জীবের প্রজনন ও উদ্ভিদের অংকুর উদ্গম শক্তি বহনকারী মধু, শুক্র ও সুধা রসকে রূপকসাহিত্যে লর্ড (Lord) বলা হয়।
৫. সর্ব সৃষ্টির স্থিতি ও রূপান্তরকারী শক্তিকে ইংরেজি ভাষায় ক্রিয়েটর (creator) বলা হয়।
৬. লর্ড (Lord) নামক সত্তাটি ক্রিয়েটরের (creator) সৃষ্টি।
৬. ক্রিয়েটর (creator) বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা।
৭. লর্ড (Lord) জীবের আগধড় ও পাছধড় নামক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকারী।
৭. ক্রিয়েটর আমাদের মাথার ওপরে অবস্থিত আকাশ ও পায়ের নিচে অবস্থিত পৃথিবী এবং বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকারী।
৮. মানবদেহে প্রাপ্ত লর্ড (Lord) নামক জীবজলটি দেখতে কালো বিধায় একে কাঁই, কালা, কেলে, শ্যাম, কালিয়া ও কৃষ্ণ ইত্যাদি বলা হয়।
৮. ক্রিয়েটরের (creator) দর্শন পাওয়া যায় না বলে এর কোন আকার, প্রকার ও রূপের বর্ণনা করা যায় না।
পুরাণী ও কুরানী শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি ও রূপকইতিহাস নির্মাণকারী সুমহান রূপকারগণ কর্তৃক নির্মিত শাস্ত্রীয় রূপকইতিহাস অধ্যায়ন করলে এবং শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিতদের আলোচনাদি শ্রবণ করলে জাগতিকস্রষ্টা ও পারম্পরিক স্রষ্টার মধ্যেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। স্রষ্টার সত্তা নিয়ে এরূপ বহুবিধও সমস্যার কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্রমেক্রমে সৃষ্টি হচ্ছে দলাদলি ও স্ব-ভাগাভাগি। সাথেসাথেই সৃষ্টি হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও আতংবাদসহ জাতিগত সহিংসতা। নিচে জাগতিকস্রষ্টা ও পারম্পরিক স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্যাদি তুলে ধরা হলো।
জাগতিকস্রষ্টা ও পারম্পরিক স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between mundane creator and sequential creator)
জাগতিক স্রষ্টা
পারম্পরিক স্রষ্টা
১. সারা জগতের সৃষ্টিকর্তাকে জাগতিকস্রষ্টা বলে। যেমন- শক্তি।
১. শুধু জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলে। যেমন- শুক্র।
২. জাগতিকস্রষ্টা সৃষ্টিজতের সর্বত্র বিরাজিত।
২. পারম্পরিক স্রষ্টা কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. একে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা যায় না।
৩. একে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা যায়। যেমন- ধান ও ডিম সিদ্ধ করে ভ্রূণ শক্তি বিনষ্ট করা যায়।
৪. এর আকার, আকৃতি, রূপ ও বর্ণ কিছুই নেই।
৪. এর আকার, আকৃতি, রূপ ও বর্ণ সবই আছে।
৫. দর্শনশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, বিজ্ঞান, মরমী ও আধ্যাত্মিকগ্রন্থ গ্রন্থিকায় এর কোন বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায় না।
৫. বিজ্ঞান, দার্শনিক, মরমী ও আধ্যাত্মিকগ্রন্থ গ্রন্থিকায় এর ব্যাপক বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায়।
৬. কেবল অন্ধবিশ্বাস ব্যতীত এর সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও সাধনভজন কিছুই নেই।
৬. এর সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও সাধন-ভজন সব কিছুই আছে।
৭. বৈষয়িক সাহিত্যে একে শক্তি, জ্ঞান ও প্রকৃতি ইত্যাদি বলা হয়।
৭. রূপকসাহিত্যে একে- কাঁই, ঈশ্বর, ব্র‏হ্মা, লর্ড ও আল্লাহ বলা হয়।
৮. এর ইংরেজি অনুবাদ ক্রিয়েটর (creator) ও আরবি অনুবাদ খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ)।
৮. এর ইংরেজি অনুবাদ লর্ড (Lord) ও আরবি অনুবাদ আল্লাহ (اللَّهُ)।
৩. পারম্পরিক স্রষ্টা (Sequential creator)
পরম্পর বিণ পরপর, ধারানুযায়ী, ক্রমান্বয়ে, অনুক্রমাগত, একের পর অন্য।
পরম্পরা (রূপ)বি ১.গ্রন্থনা, আনুপূর্ব, যথাক্রম, ক্রমান্বয়, অনুক্রম, ধারা, পরম্পর ধারাবাহিকতা ২.series, sequence, catena, string, concatenation, chain, category, spectrum ৩.‘سلسلة’ (সিলসিলা), ‘السلسلة’ (আসসিলসিলা), ‘تسلسل’ (তুসালসিলু), ‘مسلسل’ (মুসালসাল), ‘مسلسلات’ (মুসালসিলাত), ‘سلاسل’ (সালালাল) (প্র) আদিকাল হতে গুরু ও শিষ্যের মাধ্যমে যে আধ্যাত্মিকজ্ঞান চলে আসছে।
পারম্পরিক বিণ ১.পরবর্তী, অনুবর্তী, অনুক্রমিক, প্রথাসিদ্ধ, প্রয়োগসিদ্ধ ২.sequent, sequential, traditional, classical ৩.‘متتابع’ (মুতাতাবা), ‘متسلسل’ (মুতাসালসাল), ‘تسلسلي’ (তাসালসুলি), ‘متتابعة’ (মুতাতাবায়া), ‘متسلسلة’ (মুতাসালসালা), ‘تقليدي’ (তাক্বলিদি) (প্র) পরম্পরা জ্ঞানধারী, পরম্পরা বিদ্যায় পারদর্শী, পরম্পরা জ্ঞানের ধারক-বাহক সাধু-মহৎ।
পারম্পরিক স্রষ্টার সংজ্ঞা (Definition of sequential creator)
রূপকসাহিত্যে কাঁইকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলে।
পারম্পরিক স্রষ্টার পরিচয় (Identity of sequential creator)
যে স্রষ্টা সারাজগৎ সৃষ্টি করেছেন আজ পর্যন্ত তার কোন পরিচয় কেউই আবিষ্কার করতে পারেননি। কী দার্শনিক কী বৈজ্ঞানিক বা কী জ্যোতির্বিদ কেউই জাগতিক স্রষ্টার সুনির্দিষ্ট কোন বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি বিধায় তার কোন বর্ণনাও পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদে যার যার শাস্ত্রীয়স্রষ্টার ব্যাপক বর্ণনা পাওয়া যায়। শাস্ত্রীয় লোকজন তাদের স্বস্ব শাস্ত্রীয়স্রষ্টার কিছু না কিছু পরিচয় অবশ্যই জানেন। বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টার বর্ণনাদি হতে দেখা যায় এক শাস্ত্রীয় মতবাদের স্রষ্টার সাথে অন্য শাস্ত্রীয় মতবাদের স্রষ্টার কোন মিল নেই। এ হতেই বুঝা যায় শাস্ত্রীয় স্রষ্টার সৃষ্টি ও নির্মাণ নিতান্তই শাস্ত্রীয় মতানুসারী রূপকারদের মনগড়া। শাস্ত্রীয় মতানুসারিরাই তাদের প্রয়োজনে স্রষ্টা নির্মাণ করে তার পূজা অর্চনা করার নিয়মাবলী নির্মাণ করেছেন। অন্যদিকে পারম্পরিক মনীষিগণ জাগতিক স্রষ্টা ও শাস্ত্রীয়স্রষ্টা নামক ‘bogus boo’ (বোগাস বো) পরিত্যাগ করে সত্য, সঠিক ও চরম বাস্তবতার নিরীক্ষে স্রষ্টা সমস্যার চিরন্তন সমাধান প্রদান করেছেন। পারম্পরিকদের নির্মিত মতবাদটি সবার আগে সৃষ্টি এবং এখনো স্বভূমিকা ও স্বকীয়তা নিয়ে সারাবিশ্বের আত্মতাত্ত্বিক বৈষ্ণব, সহজিয়া, মরমিয়া ও বাউলদের মধ্যে দিব্যমানভাবে আজো টিকে রয়েছে।
মরমিকবি ও আত্মতাত্ত্বিকগণ স্রষ্টা পরিভাষাটির ওপরোক্ত তিনটি অভিধার কোনটিই গ্রহণ করেননি এবং এসব অভিধা দ্বারা রূপকসাহিত্য কিংবা আধ্যাত্মিকসাহিত্যও রচনা করেননি। তারা মনে করেন যে তাদের স্রষ্টা চরম বাস্তব এবং তার অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে। অস্তিত্বহীন কোন নিরাকার বিষয় বস্তুকে স্রষ্টা বলা ও মেনে নেওয়া বোকামির সর্ব নিম্নস্তর বৈ নয়। যেহেতু স্রষ্টাকে ধরা ও ছোঁয়া যায় না। সেহেতু স্রষ্টাকে নিয়ে কোন কিছু আলোচনাও পরাবিদ্যা বা আধ্যাত্মিকবিদ্যা বা রূপকসাহিত্যের বিষয়বস্তুও নয়। বিশ্বের সব রূপকসাহিত্যে যার আলোচনা করা হয়েছে বর্তমানেও করা হচ্ছে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত করা হবে তিনি হলেন স্বায়ম্ভু। যার আধ্যাত্মিকনাম বাংলাভাষায় কাঁই, সংস্কৃতভাষায় ব্রহ্মা, আরবি ভাষায় আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ) এবং ইংরেজি ভাষায় লর্ড (Lord)।
রূপকার ও গ্রন্থকারগণ স্বস্ব শাস্ত্রীয়স্রষ্টার যতরূপ বর্ণনাই করুণ না কেন সবাই তাঁর আবাস্থল মানবদেহ বলেই উল্লেখ করেছেন। এ হতে আরো বুঝা যায়- রূপকার ও গ্রন্থকারগণ মানবদেহের এরূপ একটি সত্তাকে স্রষ্টারূপে বুঝাতে চান যে, যাকে সাধনবলে ধরা যায় ও যার সাধন ও ভজন করা যায়। পারম্পরিক স্রষ্টাকে দেখা না গেলে ও ধরা না গেলে- রূপকার ও গ্রন্থকারগণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কেনইবা এতসব বর্ণনা বা আলোচনা করতে প্রয়াস করবেন? বিশ্বের প্রায় সব পরম্পরামতবাদে পারম্পরিক স্রষ্টার বসতবাড়ির একটা রূপকবর্ণনাও পাওয়া যায়। যেমন- পবিত্র লালনে বলা হয়েছে- “যেখানে সাঁইয়ের বারামখানা, শুনলে মন চমকে উঠে, দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা” (পবিত্র লালন- ৮২৮/১)
তদ্রূপ পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে-
“اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونِةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ ”
উচ্চারণঃ “আল্লাহ নূরুছ সামাওয়াতি ওয়াল আরদি, মাসালু নূরিহি কা মিসকাতি ফিহা মিসবাহুন, আল মিসবাহু ফি ঝুজাজাতি, আঝঝুজাজাতু কায়ান্নাহা কাউকাবুন। দুররিউয়্যু ইউক্বাদু মিন শাজারাতিম মুবারাকাতিন ঝাইতুনা। লা শারকিয়াতিউ ওয়া লা গারবিয়া। ইয়াকাদু ঝাইতুহা ইউদিউয়্যু ওয়া লাউ লাম তামসাসহু নার, নূরুন আলা নূর। ইয়াদি আল্লাহু লিনূরিহি মাই ইশাউ ওয়া ইয়াদরিবুল্লাহুল আমসালা লিন্নাছি, ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন আলিম”
অর্থ- “কাঁই আকাশ ও পৃথিবীর জ্যোতি। সে জ্যোতির উদাহরণ যেমন একটি বাতিদানের মধ্যে আলোক বর্তিকা। সে আলোক-বর্তিকাটি একটি চিমনির মধ্যে রয়েছে। চিমনিটি দেখতে ঠিক তারকার মতো। যা কল্যাণময় জলপাই গাছের তেল দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হয়। তা পূর্বেও নয় আবার পশ্চিমেও নয়। অগ্নিস্পর্শ হওয়া ছাড়াই তা জ্বলে উঠার চেষ্টা করে। তা যেন জ্যোতির ওপর জ্যোতি। কাঁই তাঁর জ্যোতির দ্বারা যাকে ইচ্ছে পথ প্রদর্শন করেন। কাঁই মানুষের জন্য উপমাদি নির্মাণ করেন। কাঁই সর্ববিষয়ে সুবিজ্ঞ” (কুরান, নূর- ৩৫)
এসব আলোচনা হতে রূপকপরিভাষাদির মূলক উদ্ঘাটন করে দেখা যায় কাঁই, ব্র‏হ্মা, লর্ড (Lord) ও আল্লাহ (اللَّهُ) মাবদেহের মূলাধার চক্রেই অবতরণ করেন এবং সেখানেই অবস্থান করেন। বিশিষ্ট সাধকগণ সাধনবলে তাঁর দর্শনলাভ করে কাঁইজি, ব্রা‏হ্মণ, ব্র‏‏হ্মচারী, Lordship, Mastership, ‘مسترشيب’ (মুস্তারাশিব) বা ওলিউল্লাহ (ﻮﻟﻰ ﺍﻟﻟﻪ) উপাধিলাভ করেন। পক্ষান্তরে জাগতিক স্রষ্টা ও শাস্ত্রীয়স্রষ্টার কোন রূপরেখা নেই। তাই তার অবস্থানও পাওয়া যায় না বিধায় তাঁর বর্ণনাও কেউ করতে পারেন না। যাকে দেখা যায় না, যাকে ধরা যায় না, তার বর্ণনাও পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে পারম্পরিক স্রষ্টাকে ধরা যায়, তাকে দেখা যায় বিধায় তাঁর বর্ণনাও পাওয়া যায়। পারম্পরিক স্রষ্টাকে ধরা যায় বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন পারম্পরিক গ্রন্থ গ্রন্থিকার মধ্যে তাঁকে ধরার জন্য বিভিন্ন প্রকার সাধন পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে। স্রষ্টাকে সাধনবলে ধরাই না গেলে- শাস্ত্রীয় গোত্রে গোত্রে এতসব সাধন পদ্ধতির আবিষ্কার করারইবা কী প্রয়োজন ছিল?
তুলনামূলক আলোচনায় এসে বলা যায়- জাগতিক স্রষ্টা বিশ্বব্র‏হ্মাণ্ডের সর্বত্র বিরাজিত এবং তাকে সাধনবলে ধরা ও ছোঁয়া যায় না। এ জন্য কেউ তার বর্ণনাও করেননি। এমনকি বিশ্বের কোন গ্রন্থেই তার বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে জাগতিক স্রষ্টা সম্পর্কে কোন কোন দার্শনিক শুধু এতটুকু বলেছেন যে- বিশ্বজগতের স্রষ্টা বলে যদি কিছু থেকেই থাকেন তবে তা অবশ্যই হবে ‘জ্ঞান’। অর্থাৎ জ্ঞানকেই দার্শনিকগণ স্রষ্টা বলে থাকেন। যেহেতু জ্ঞান ব্যতীত কিছুই সৃষ্টি করা যায় না বিধায় তাঁরা জ্ঞানকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। অন্যপক্ষে বিজ্ঞানিগণ বলেন যে শক্তিই স্রষ্টা। যেহেতু সব কিছুরই সর্বশেষরূপ হলো শক্তি। শক্তিই ক্রমান্বয়ে শীতল হয়ে বায়বীয় বা নিরাকাররূপ প্রাপ্ত হয়। অতঃপর আরো শীতল হয়ে তরল বা সাকাররূপ প্রাপ্ত হয় এবং সর্বশেষে কঠিনরূপলাভ করে। শক্তির ঊর্ধ্বে কিছুই নেই। এ জন্য বিজ্ঞানিগণ শক্তিকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। বস্তুবাদী গবেষকগণ একমাত্র প্রকৃতিকেই স্রষ্টারূপে জানেন ও বুঝেন। তাদের ধারণা হলো প্রকৃতিই জগতের স্রষ্টা এবং প্রকৃতিই জগতের পালনকর্তা। প্রকৃতি নিজেই সব কিছু সৃষ্টি করে ও লালনপালন করে থাকে। এছাড়াও বস্তুবাদী বিজ্ঞানিগণ ‘প্রমজ্ঞাশচুচাতা’ অর্থাৎ- ১.প্রকৃতি, ২.মন, ৩.জ্ঞান, ৪.শক্তি, ৫.চুম্বক, ৬.চাপ ও ৭.তাপ বা ‘NMKEMPT’ (নমকিমপিটি) অর্থাৎ ১.Nature, ২.Mind, ৩.Knowledge, ৪.Energy, ৫.Magnet, ৬.Power ও ৭.Temperature- এ সপ্ত ভৌতিক স্রষ্টার কথাও স্বীকার করে থাকেন।
জাগতিক স্রষ্টা যেহেতু ইদ্রিয়গ্রাহ্য কোন কিছু নয়। এ জন্য তার ব্যাপারে এর অধিক কিছু বলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে পারম্পরিক স্রষ্টা একমাত্র জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত। যদিও শাস্ত্রীয়স্রষ্টা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় কুলের মধ্যেই বিরাজিত বলে, শাস্ত্রীয় মতানুসারী পণ্ডিতরা বড় গলায় প্রচার করে থাকেন। একমাত্র তাঁর সাধন ও ভজন করার জন্যই তাঁকে পুনঃপুন পরিচিত করানো হয়। তবে বিভিন্ন শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও মরমী সঙ্গীতাদির মধ্যে যে স্রষ্টার পরিচয় পাওয়া যায় তা একমাত্র মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যেই তাঁকে পাওয়া যায় বলে পারম্পরিক স্রষ্টা একমাত্র মানুষের মধ্যেই যথাযথভাবে বিরাজিত এ কথাও বলা যায়। সুবিজ্ঞ সাধকগণ তাঁকে সাধনবলে উদ্ঘাটন বা আহরণ করতে পারেন। এবার পরিচয় স্বরূপ এও বলা যায় যে- জীবের জীবনিশক্তি হতে উদ্ভত ও জীবের প্রজননশক্তি বহনকারী এক প্রকার মানবজলকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলা হয়। পুত্র সন্তানের দাড়ি ও মুচ উদ্গমনের পর তার দেহে প্রজননশক্তি প্রবেশ করে থাকে। কন্যা সন্তানের রজ আগমনের পর তার দেহেও এ প্রজননশক্তির উৎপত্তি হয়ে থাকে।
ছেলেদের ক্ষেত্রে দাড়ি ও মুচ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে রজ আগমনের পূর্বে এ প্রজননশক্তির উৎপত্তি হয় না বিধায় দাড়ি ও মুচ উদ্গমনের পূর্বে ছেলেদের সঙ্গমের দ্বারা গর্ভে কোন সন্তান বা ভ্রূণ সৃষ্টি হয় না। তদ্রূপ রজ আগমনের পূর্বে কিশোরিরা সঙ্গম করলেও গর্ভে কোন সন্তান সৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ দাড়ি ও মুচ উঠার পূর্বে ছেলেদের ও রজ আগমনের পূর্বে মেয়েদের মধ্যে প্রজননশক্তি সৃষ্টি হয় না। এ প্রজননশক্তি না থাকলে কখনই সন্তান সৃষ্টি হয় না বিধায় বলা যায় প্রাণিকুলের মধ্যে প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদকুলের মধ্যে অংকুরোদ্গমশক্তির আধাররূপ রসকেই পারম্পরিক স্রষ্টা বলা যায়।
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে সবুজবর্ণ তিরোহিত হয়ে সোনালিবর্ণ ধারণের পর তার অংকুরোদ্গমনশক্তির উৎপত্তি হয়। অর্থাৎ উদ্ভিদের অংকুরোদ্গম শক্তিকেই উদ্ভিদের স্রষ্টা বলা হয় বিধায় অধিকাংশ উদ্ভিদের সোনালিবর্ণ ধারণের পূর্বে বা ফল পাকার পূর্বে কাচা বীজ বা সবুজবীজ ধারণ করে পরবর্তিকালে তা রোপণ করলে সে বীজে অংকুর গজায় না। অর্থাৎ বীজের সোনালিবর্ণ ধারণের পূর্বে উদ্ভিদের মধ্যে অংকুরোদ্গম বা পুনরুত্থান বা পুনরুদ্গমশক্তি সৃষ্টি হয় না। এ পুনরুদ্গমশক্তি ভিন্ন উদ্ভিদের সৃষ্টি ও বংশবৃদ্ধি হয় না। পারম্পরিকরা উদ্ধিদের এ শক্তিকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। কিন্তু গোঁড়া ও অন্ধবিশ্বাসী শাস্ত্রীয় মতানুসারিরা তাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, যম, স্বর্গ ও নরক কিছুই চিনেন না। এ জন্য তারা অল্পতেই রেগে যান এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এ না বুঝা হতেই শাস্ত্রীয় সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদের উৎপত্তি। উদ্ভিদকুলের অংকুরোদ্গমশক্তি বহণ করে এক প্রকার সুপেয়রস। মৌমাছি এ রস সংগ্রহ করে চাকে সঞ্চয় করলে তাকে মধু বলা হয়। এ মধুর মধ্যেই উদ্ভিদের প্রাণশক্তি বা অংকুরোদ্গমশক্তি নিহিত থাকে বিধায় সব চিকিৎসক বলে থাকেন যে মধুর চেয়ে পুষ্টিকর ও উপাদেয় খাদ্য পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। স্বয়ং স্রষ্টা যার মধ্যে দ্রবিভূত থাকে তার চেয়ে উত্তম আর কিবা হতে পারে?
তদ্রূপ প্রাপ্তবয়স্ক নরগণের শুক্রের মধ্যে দ্রবিভূত থাকে স্বয়ং স্রষ্টা। এ জন্য এর চেয়ে পুষ্টিকর ও উপাদেয় খাদ্য পৃথিবীতে আর থাকতে পারে না। তাদৃশ রজস্বলা নারীদের স্বাধিষ্ঠানচক্রে প্রতি মাসে মাসেই নির্দিষ্ট সময়ে শ্বেত ও কৃষ্ণ বর্ণের দুই প্রকার জল অবতরণ করে থাকে- যার মধ্যে স্বয়ং স্রষ্টাশক্তি আকারে দ্রবিভূত থাকেন। এ দু’টি অমৃতধারাকেই প্রকৃত অমৃতসুধা বা মানবজল বা জীবজল বলা হয়। এছাড়াও প্রসবোত্তর রমণিদের মধ্যে দুগ্ধ নামক অন্য একটি অমৃতসুধাও অবতরণ করে থাকে। রমণিদের স্তন নিঃসৃত দুগ্ধকেও জীবজল বা মানবজল বলা হয়। মধু, শুক্র ও সুধার মধ্যে স্বয়ং স্রষ্টা শক্তিরূপে দ্রবিভূত থাকেন বলে রূপকসাহিত্যে এসব জলকে স্রষ্টা বলা হয়। এছাড়া অধিকাংশ গবেষকদের ধারণা একমাত্র জল হতেই সবকিছু সৃষ্টি বিধায় জলই জীবের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। অবিশ্বাস্য হলেও চিরন্তন সত্য যে, এ ত্রি-জলকে ধারণ, গ্রহণ, সাধন ও ভজনের রূপকবর্ণনাই হলো- বিশ্বের সব শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও মরমী গ্রন্থগ্রন্থিকা।
প্রসঙ্গক্রমে আবারও বলতে হয় স্রষ্টা বর্তমান জীব সৃষ্টি ক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না এবং তার জীব সৃষ্টিক্রিয়ার অনুঘটক প্রতিনিধি স্বায়ম্ভু ও নিজে কোন জীব সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জীবের সৃষ্টিকর্তাকে চেনার অর্থ যার যার আপন পিতাকে চেনা এবং উপাস্য চেনা অর্থ স্বায়ম্ভুর জীব সৃষ্টির অনুঘটক সদস্য সাঁই ও কাঁইকে চেনা। উপাস্যরূপে পিতা নয়, স্রষ্টাও নয় বরং সাঁই ও কাঁই। স্থূলজ্ঞানী ও শাস্ত্রীয় সংস্কারের নীতিমালার ধ্বজাধারিগণ নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে প্রত্যক্ষ বোকামি করে সাধারণ মানুষকে বিপথগামী করে চিরান্ধকারের পথে ঠেলে দিয়ে আসছে বরাবরই। বিশ্বের কোন মহাগ্রন্থে নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে অযথা অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে বলা হয়নি। আমাদের এ ক্ষুদ্র পরিসর জীবনে যাকে ধরা যায় ও সাধন ভজন দ্বারা যাকে অর্জন করা যায় এরূপ উপাস্য সাঁই ও কাঁইয়ের উপাসনা করেই তো শেষ করা যায় না। আর যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না ও সাধন-ভজন করেও পাওয়া যায় না এরূপ নিরাকার উপাস্যের উপাসনা মানুষ করবে কোন্ সময়ে?
৪. সৃষ্টিকর্তার মরমী মতবাদ (Mysticism of creator. মিস্টিসিজম অফ ক্রিয়েটর)
মরমিগণের মতে স্রষ্টা তিন প্রকার। যথা- ১.আদি, ২.জনক ও ৩.স্বায়ম্ভু।
আদির সংজ্ঞা (Definition of embryonic)
জগতের দৃশ্য, অদৃশ্য ও স্পর্শ শক্তিগুলো ও প্রতিটি বস্তুর আদিরূপ সৃষ্টিকারিকে আদি (আদিস্রষ্টা) বলা হয়। যেমন- প্রথমমানুষ, প্রথমহাতি, প্রথমবটগাছ ও প্রথমইলিশ ইত্যাদি সৃষ্টিকারী।
দ্বিপস্থ জীব মানুষ, গরু, হাতি ও ইলিশ ইত্যাদি দ্বারা আধ্যাত্মিকবিদ্যায় নর ও নারী একজোড়া বুঝায়। যেহেতু আধ্যাত্মিকবিদ্যায় অর্ধাঙ্গনর ও অর্ধাঙ্গনারী মিলে একটি জীব ধরা হয়। শুধু নর অর্ধজীব এবং শুধুনারী অর্ধজীব। দ্বিপস্থ জীবের প্রতিটি প্রজাতির নর ও নারী মিলেই জীব হয়। সর্বপ্রথম জীব-জড়, আকাশ-বাতাস, নদী ও সাগরসহ জীবের মন, জ্ঞান, আত্মা, ইন্দ্র, রিপু, রুদ্র, দশা, প্রতীতি, দেব ও দেবতা ইত্যাদির সৃষ্টিকারিই হলেন আদিস্রষ্টা। যাকে আরবিভাষায় খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) ও ইংরেজি ভাষায় ক্রিয়েটর (Creator) বলে। আধ্যাত্মিকবিদ্যায় এর তেমন কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না। ফলে এর অধিক কোন বর্ণনা বিশ্লেষণ কিম্বা অযথা বর্ণনা দীর্ঘায়িত করাও আমাদের কাম্য নয়। আদিস্রষ্টা হলেন জীব ও জড় ইত্যাদির আদিসৃষ্টিকর্তা এটা জানাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
জনকের সংজ্ঞা (Definition of Gen)
জীবের প্রকৃত স্রষ্টা বা সরাসরি সৃষ্টিকর্তাকে জনক বলে। যেমন- সন্তানের প্রকৃত পিতা (পালক পিতা বা শিক্ষাদীক্ষা দাতা নয়)।
জনকের উপকার (Benefit of Gen)
১. জনক সৃষ্টি না করলে সৃষ্টিজগৎ প্রসারিত হয় না।
২. অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান জনকের দ্বারা লালিতপালিত হয়ে আবার পিতা হন।
জীবের পিতাকেই জনক বলে। রূপকসাহিত্যে মানুষের পিতাকে চেনার জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। কারণ সাধন ও ভজনের দ্বারা যখনই কোন মানুষ আপন পিতাকে চিনে নিতে সক্ষম হয়। তখন হতেই তার জন্মান্তর বন্ধ হয়ে যায়। পরাবিদ্যা বা রূপকসাহিত্য অনুযায়ী গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, আমিই আমার পিতা, আমিই আমার দাদা ও আমিই আমার তালুই। এ আমিই পূর্বজনমে দাদারূপে আমাকে হত্যা করে দাদীর গর্ভে গিয়ে বাবা হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। আবার বাবারূপে আমাকে হত্যা করে মায়ের গর্ভে গিয়ে বর্তমান আমিরূপে জন্মগ্রহণ করেছি। গড়ে প্রতি ৩০৯ দিন অন্তর্বাস বা অজ্ঞাতবাস পর পর আমার দেহ বা ধড় পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। প্রতিজনমেই আমিই আমাকে শুক্রপাতরূপ অস্ত্র দ্বারা হত্যা করছি এবং গড়ে ৩০৯ দিন অন্তর্বাস বা অজ্ঞাতবাস থেকে চামড়া পরিবর্তন করে এসে আবারো একই কর্মে লিপ্ত হচ্ছি। আমিই আমাকে পুনঃপুন হত্যা করে জীবিত করছি। এ জীবনচক্রে একমাত্র আমি ব্যতীত আর কোনই সঙ্গী নেই।
বর্তমান বিজ্ঞানিগণ সাধুগণের এ সত্য সমীক্ষাকে আরো বলিষ্ঠ করে প্রমাণ করেছেন। তারা বলেছেন রক্তের মধ্যে এমন একটি চিহ্ন আছে যে, সেটাই প্রমাণ করে সন্তানটি কার? রক্তের বিভাজন করে তারা প্রমাণ করেছেন যে, পিতা ও পুত্রের রক্তের ঐ চিহ্নটির গঠন এক ও অভিন্ন এবং আমরাও বলে থাকি “শিশুই শিশুর পিতা”। এরূপ প্রবাদও রয়েছে- “শিশুর পিতা ঘুমিয়ে আছে সব শিশুর অন্তরে”। পরিশেষে বলা যায় যেহেতু জনকের ইচ্ছে ব্যতীত সন্তানের সৃষ্টি হতে পারে না তাই জনককেও সৃষ্টিকর্তা বলা যায়। যদিও বিশ্বের আদিস্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা একজন। বাংলা রূপকসাহিত্যাদির বর্ণনা ও বৈষয়িক সাহিত্যাদির বর্ণানা হতে কাঁই ও স্রষ্টার মধ্যে অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
৫. সৃষ্টিকর্তার আত্মতাত্ত্বিক মতবাদ (Theosophical doctrine of creator. থিওসোফিক্যাল ডকট্রিন অফ ক্রিয়েটর)
বাংলাভাষায় সৃষ্টিকর্তার নাম ছিল না। অর্থাৎ বাঙালিদের সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার মতো কোন নাম ছিল না। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার সৃষ্টিকর্তার বাংলা অনুবাদ করার জন্য এরূপ একটি নামের একান্ত প্রয়োজন ছিল। সে জন্যই আমরা সর্ব প্রথম বাঙালিস্রষ্টার নামকরণ করেছি ‘কাঁই’। কিন্তু বিগতদিনে দেখা গেছে অনুবাদকরা প্রায় মনগড়া শব্দাদি দ্বারাই অনুবাদ করেছেন। কেউ আবার সাঁইকেউ সৃষ্টিকর্তা বলতেন। যেমন- লালন সাঁইজি বলেছেন- “অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই, মানবের চেয়ে উত্তম কিছু নাই, দেব-দেবতাগণ করে আরাধন, জনম নিতে এ মানবে” (পবিত্র লালন- ২২৭/২)। আরো মর্মান্তিক কথা হলো- আমাদের বাংলাভাষায় সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা ও নগরকর্তা কোন কিছুই এখনো সৃষ্টি করা হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো- বিগতদিনে বাংলাভাষায় কোন রূপকসাহিত্য নির্মিত হয়নি এবং এখন পর্যন্ত হচ্ছে না। পৃথিবীর যে কোন ভাষায় যতদিন পর্যন্ত রূপকসাহিত্য নির্মিত না হয় ততদিন পর্যন্ত- সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা ও নগরকর্তা- এসব সত্তার নাম নির্ধারণ করা হয় না। কেবল রূপকসাহিত্য নির্মাণের জন্যই এসব সত্তার নাম একান্তভাবে প্রয়োজন হয়ে থাকে। ইতিপূর্বে যেসব ভাষায় রূপকসাহিত্য নির্মিত হয়েছে সেসব ভাষায় এসব সত্তার নামও নির্মিত হয়েছে। নিচে কাঁই ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
কাঁই ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between Lord and creator)
কাঁই
স্রষ্টা

১. বলনীদের শাস্ত্রীয় স্রষ্টাকে রূপক সাহিত্যে কাঁই বলে।
১. জাগতিক সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলে।
২. কেবল জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে কাঁই বলা হয়।
২. বিশ্বজগতের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলা হয়।
৩. কাঁই কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. স্রষ্টা সারা সৃষ্টিকুলের সর্বত্র বিরাজিত।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা কাঁইয়ের দর্শনলাভ করে কাঁইজি বা কাঁইচারী উপাধিলাভ করা যায়।
৪. সাধন-ভজনের দ্বারা স্রষ্টার দর্শনলাভ করা যায় না বিধায় স্রষ্টা সম্পর্কের কোন উপাধিও লাভ করা যায় না।
৫. জীবের প্রজনন ও অংকুরোদ্গমশক্তি বহনকারী মধু ও শুক্রকে রূপকসাহিত্য কাঁই বলা হয়। ৫. সর্ব সৃষ্টির স্থিতি ও রূপান্তরকারী শক্তিকে স্রষ্টা বলা হয়।
৬. কাঁই নামক সত্তাটি স্রষ্টার সৃষ্টি।
৬. স্রষ্টা বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা।
৭. কাঁই জীবের আগধড় ও পাছধড়রূপ আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকারী।
৭. স্রষ্টা বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকারী।
৮. মানবদেহে প্রাপ্ত কাঁই নামক জীবজলটি দেখতে কালো বিধায় একে কালা, কেলে, শ্যাম, কালিয়া ও কৃষ্ণ ইত্যাদি বলা হয়।
৮. স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায় না বলে এর কোন আকার, প্রকার ও রূপের বর্ণনা করা যায় না।
৩. স্বায়ম্ভু- Autogenous (অটোজেনাস)/ ‘ذاتي التولد’ (জাতিত তাওয়ালুদ)
বিশ্বের বুকে সততই উৎপন্ন হয় এরূপ সত্তাদিকে স্বায়ম্ভু বলা হয়। এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘দৈবিকা’ পরিবারের একটি অন্যতম ‘ছদ্মনামপরিভাষা’। এর মূলকসত্তা ‘সৃষ্টিকর্তা’ এবং এর রূপকপরিভাষা ‘কাঁই’। সব সৃষ্টির কাজে অংশগ্রহণের জন্য আপনাপনিই সৃষ্টি হয় এরূপ বিষয় বস্তুকে স্বায়ম্ভু বলা হয়। যেমন- সুধা, শুক্র, রজ ও কামোত্তেজনা ইত্যাদি।
স্বায়ম্ভু (রূপ)বি স্বয়ংসৃষ্ট, স্বয়ং অস্তিত্বশীল বিণ স্বেচ্ছায় শরীরধারী (তাপ, চুম্বক, কাঁই ও সাঁই)। তবে আধ্যাত্মিক বিজ্ঞানে স্বায়ম্ভু শব্দটির প্রকৃত সত্তারূপে কাঁইকেই বুঝানো হয় (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারে ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সৃষ্টির কাজে অংশগ্রহণের জন্য আপনাপনিই সৃষ্টি হয় এরূপ বিষয় বস্তু ও শক্তিগুলোকে স্বায়ম্ভু বলা হয় (সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রতী, রজ ও চন্দ্রচেতনা) ২.রূপকসাহিত্যে কেবল কাঁই, সাঁই ও বসিধকে স্বায়ম্ভু বলা হয়। (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
স্বায়ম্ভুর সংজ্ঞা (Definition of autogenous)
সৃষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য আপনাপনিই সৃষ্টি হয় এরূপ সত্তাদিকে স্বায়ম্ভু বলে। যেমন- তাপ, চুম্বক, কাঁই ও সাঁই ইত্যাদি।
স্বায়ম্ভুর প্রকারভেদ (Classification of autogenous)
স্বায়ম্ভু দুই প্রকার। যথা- ১.ভৌতিকস্বায়ম্ভু ও ২.জৈবিকস্বায়ম্ভু।
১. ভৌতিকস্বায়ম্ভু (Elementary autogenous)
আপনাপনি সৃষ্টি ভৌতসত্তাদিকে ভৌতিকস্বায়ম্ভু বলে। যেমন- শক্তি।
দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, ভাববাদী ও বস্তুবাদিরা সৃষ্টিকর্তার যে যেমন রূপকবর্ণনাই প্রদান করন না কেন সবাই যার যার দৃষ্টিকোণ হতে কেবল ভৌতিকস্বায়ম্ভু সত্তাদিকেই যে স্রষ্টা বলে বুঝিয়ে থাকেন তা শক্ত করেই বলা যায়। কারণ বিশ্বের সব সৃষ্টির আদিস্রষ্টাই হলো এসব ভৌতিকস্বায়ম্ভু। এসব ভৌতিক স্বায়ম্ভুরাই সর্বাগ্রে স্বয়ং সৃষ্টি হয়ে সবাই যার যার কার্যাদি পরিচালনা করতে আরম্ভ করে থাকেন। এদের মধ্যে ‘শূশপ্র’ উল্লেখযোগ্য। ‘শূশপ্র’ হলো- ১.শূন্য, ২.শক্তি ও ৩.প্রকৃতি- এ ৩টি ভৌতিকস্বায়ম্ভুসত্তার বাংলা নামের প্রথমবর্ণের সমষ্টিবিশেষ। ইংরেজিভাষায় একে ‘ইএন’ ‘EEN’ বলা হয়। ‘EEN’ (ইএন) হলো- ১.Ether, ২.Energy ও ৩.Nature- এ ৩টি মহান ভৌতিক স্বায়ম্ভুসত্তার ইংরেজি নামের প্রথমবর্ণের সমষ্টি বিশেষ।
ভৌতিক স্বায়ম্ভুর পরিচয় (Identity of elementary autogenous)
১. শূন্য (Ether)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত শক্তি, পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণির যাবতীয় সংকেত বহন করে চিরকাল।
২. শক্তি (Energy)
শক্তিই প্রতিনিয়ত নতুননতুন পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণী সৃষ্টি ও ধ্বংস করছে।
(ক). চুম্বক (Magnet)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত নতুননতুন পদার্থ ও জ্যোতিষ্ক সৃষ্টি-ধ্বংস করছে।
(খ). চাপ (Presser)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত নতুননতুন পদার্থ ও জ্যোতিষ্ক সংকোচন-প্রসারণ ও সৃষ্টি-ধ্বংস করছে।
(গ). তাপ (Temperature)
এটি প্রতিনিয়ত পদার্থকে বিগলনের মাধ্যমে নতুননতুন পদার্থ সৃষ্টি করে চলেছে। এ শক্তিটিই অন্যান্য শক্তি, পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণির কঠিন, তরল ও বায়বীয় অবস্থা পরিবর্তন করছে।
এছাড়াও আরো অনেক প্রকার শক্তি রয়েছে।
৩. প্রকৃতি (Nature)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত নতুননতুন পদার্থ, উদ্ভিদ ও প্রাণী সৃষ্টি করছে।
২. জৈবিক স্বায়ম্ভু (Organic autogenous)
জীবদেহে আপনাপনি যে সব স্বায়ম্ভুর অভ্যুদয় ঘটে তাকে জৈবিক স্বায়ম্ভু বলে। যেমন- শুক্র।
শাস্ত্রীয় যাজক, শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিত ও মরমিরা সৃষ্টিকর্তার যে যেমন রূপক বর্ণনাই প্রদান করন না কেন সবাই যার যার দৃষ্টিকোণ হতে কেবল জৈবিক স্বায়ম্ভু সত্তাদিকেই যে স্রষ্টা বলে বুঝিয়ে থাকেন তা শক্ত করেই বলা যায়। কারণ বিশ্বের সব জীব সৃষ্টির আদি স্রষ্টাই হলো এসব জৈবিক স্বায়ম্ভু। জৈবিক স্বায়ম্ভুরাই সর্বাগ্রে স্বয়ং সৃষ্টি হয়ে সবাই যার যার জীবকোষ ও জীবসৃষ্টি কার্যাদি পরিচালনা করতে আরম্ভ করে থাকেন।
জৈবিক স্বায়ম্ভুর পরিচয় (Identity of organic autogenous)
জীবদেহে আপনাপনি যে সব স্বায়ম্ভুর অভ্যুদয় ঘটে তাদেরকে জৈবিক স্বায়ম্ভু বলা হয়। অসংখ্য প্রকার জৈবিক স্বায়ম্ভু হতে পারে। যেমন- মন, জ্ঞান, শুক্র, কাঁই, রজ, সাঁই ও দুগ্ধ। নিচে এদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো।
১. মন (Psyche)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত পদার্থের রূপান্তর, উদ্ভিদ ও প্রাণির ধ্বংস ও নির্মাণের মনোকল্প সৃষ্টি করছে।
২. জ্ঞান (Knowledge)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত পদার্থের রূপান্তর, উদ্ভিদ ও প্রাণির ধ্বংস ও নির্মাণের মনোকল্প সৃষ্টি করছে।
৩. শুক্র (Semen)
এটিই প্রতিনিয়ত ডিম্বক নিষিক্ত করে নতুননতুন প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করে।
৪. কাঁই (Lord)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত শুক্র ও ডিম্বক সৃষ্টি করে।
৫. রজ (Menses)
এটিই প্রতিনিয়ত কিশোরিকে যুবতিতে পরিণত করার ঘোষণা প্রদান করে।
৬. সাঁই (God)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত উদ্ভিদ ও প্রাণির গর্ভাশয়ে বসে ভ্রূণ লালনপালনের দায়িত্ব পালন করে।
৭. দুগ্ধ (Milk)
এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত স্তন্যপায়ী প্রাণী শাবকের প্রাণ রক্ষা করে। এ সত্তাটিই প্রতিনিয়ত পদার্থের রূপান্তর, উদ্ভিদ ও প্রাণীর ধ্বংস ও নির্মাণের মহাপরিকল্পনা করছে। এদের মধ্যে ‘মজ্ঞাশুসৃরপাদু’ উল্লেখযোগ্য। ‘মজ্ঞাশুসৃরপাদু’ হলো- ১.মন, ২.জ্ঞান, ৩.শুক্র, ৪.সৃষ্টিকর্তা, ৫.রজ, ৬.পালনকর্তা ও ৭.দুগ্ধ- এ ৭টি জৈবিক স্বায়ম্ভুসত্তার বাংলা নামের প্রথমবর্ণের সমষ্টিবিশেষ। তবে আরো ৪টি জৈবিক স্বায়ম্ভুসত্তা রয়েছে। তা হলো- ১.দাঁত, ২.মুচ, ৩.দাড়ি ও ৪.স্তন। রূপকসাহিত্যে এদের ব্যবহার অতি নগণ্য। সে জন্য এসব স্বায়ম্ভুর তেমন আলোচনা করার কোন প্রয়োজন নেই। সর্বমোট ১১টি বাহ্যিক জৈবিক স্বায়ম্ভুসত্তা দেখা যায়। যথা- ১.মন, ২.জ্ঞান, ৩.দাঁত, ৪.মুচ, ৫.দাড়ি, ৬.শুক্র, ৭.স্তন, ৮.সৃষ্টিকর্তা, ৯.রজ, ১০.পালনকর্তা ও ১১.দুগ্ধ। ‘মজ্ঞাশুসৃরপাদু’ সদস্যদেরকে ইংরেজিতে ১.Psyche ২.Knowledge ৩.Semen, ৪.Creator, ৫.Menses, ৬.Guardian ও ৭.Milk বলা হয়। এ ছাড়া জীবদেহে আরো কয়েক সহস্র স্বায়ম্ভু রয়েছে। যেমন- রক্ত ও রস ইত্যাদি। যে সূক্ষ্মশক্তি জীবের বংশবৃদ্ধির বা বীজের ভ্রূণ-অংকুর উৎপাদনের জন্য অদৃশ্যভাবে আপনাপনি সৃষ্টি হয় তাকেই আমরা জৈবিক স্বায়ম্ভু নামে চিনি ও জানি। এদেরকেই বাংলাভাষায় কাঁই, সংস্কৃতভাষায় ব্রহ্মা, আরবিভাষায় আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ) এবং ইংরেজিভাষায় লর্ড (Lord) বলে অভিহিত করা হয়। রূপকসাহিত্য বা পরাবিদ্যায় এর বর্ণনা বিশ্লেষণ অপেক্ষাকৃত অধিক।
জৈবিক স্বায়ম্ভুরা শুধু জীবজগতের সৃষ্টিকর্তা। জড় পদার্থের বংশ বৃদ্ধির প্রয়োজন হয় না বলে জড় পদার্থ বিভাগে জৈবিক স্বায়ম্ভুর কোন প্রয়োজন হয় না। সাধনজগতে স্বায়ম্ভুর সাক্ষাত প্রাপ্তিই হলো সাধকগণের সর্বশেষ বা সর্বোচ্চ শ্রেণি। একেক জীবের বেলায় আত্মা বহনকারী জৈবিক স্বায়ম্ভুর বর্ণ একেক প্রকার লক্ষ্য করা যায়। যেমন- হাঁস ও কুক্কটের ক্ষেত্রে ডিমের কুসুম অংশে এর বর্ণ হলদে দেখা যায়। মানুষের ক্ষেত্রে স্বায়ম্ভুর বর্ণ কালো দেখা যায়। সাধনবলে এর সন্ধানলাভ করা যায়। এটা সুস্বাদু, সুপেয় কালোবর্ণের সুমিষ্ট জীবজল বা জীবাম্বু বিশেষ। এ রস একবার পান করলে মানুষের কাম পিপাসা অনেকাংশে হ্রাস পায় এবং জন্ম-মরণের হাত হতে মুক্তি পাওয়া যায়। এ রসের সন্ধানলাভকারী সাধুকগণকে বাংলাভাষায় কাঁইজি, সংস্কৃত ভাষায় ব্রাহ্মণ বা ব্রহ্মচারী, আরবি ভাষায় ‘مسترشيب’ (মুস্তারাশিব), ‘ﻮﻟﻰﺍﻠﻟﻪ’ (অলিউল্লাহ) এবং ইংরেজি ভাষায় Lordship, Mastership বলা হয়। জৈবিক স্বায়ম্ভু জীবদেহে অবতরণ না করা পর্যন্ত জীবের পুনর্জন্ম শক্তির উদয় হয় না। আবার জৈবিক স্বায়ম্ভু শক্তির অবতরণের পর অন্য কোন কৃত্রিমশক্তি দ্বারা তাকে আঘাত করলে বা হত্যা করলে বীজের অংকুরোদ্গম হয় না। যেমন ধান বা ডিম আগুনে সিদ্ধ করলে বা জল দ্বারা পচন করলে তা আর অংকুরিত হয় না। প্রাণাধার বা ভ্রূণকোষ সিদ্ধ করলে বা পচন করলে যে শক্তি মারা যায় তা-ই জীবের জৈবিক স্বায়ম্ভুশক্তি। জৈবিক স্বায়ম্ভুশক্তি মারা গেলে জীবের স্বায়ম্ভুরসও অদৃশ্য হয়ে যায়। এ শক্তি জীবদেহে চৈতন্যপ্রাপ্ত হয়ে জীবের জীবন্তকোষ সৃষ্টি করে বলে রূপকসাহিত্যে একেই সৃষ্টিকর্তা বলা হয়।
জৈবিক স্বায়ম্ভু ব্যতীত জীব হতে জীব সৃষ্টির কোন উপায় নেই। এ স্বায়ম্ভুর ১.সৃষ্টিকর্তা, ২.পালনকর্তা, ৩.শুক্র, ৪.রজ, ৫.দুগ্ধ ও ৬.কামোত্তেজনা ইত্যাদি সদস্য ব্যতীত কখনই সৃষ্টিকার্যাদি সম্ভব নয়। জীব হতে জীব সৃষ্টিকার্যের সাথে জৈবিক স্বায়ম্ভুর আলোচ্য সদস্যাদি কোন না কোনভাবে জড়িত। এ সদস্যাদি দেখা যায়, ধরা যায় ও ছোঁয়া যায়। মানবের উপাস্য হলে জৈবিকস্বায়ম্ভুর (এ স্তরের) সদস্যাদির মধ্যে হতে কোন কোনটি হতে পারে কিন্তু ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না ও সাধনবলে পাওয়া যায় না, এমনকি সাধনের প্রক্রিয়া পর্যন্ত জানা যায় না। এরূপ অধরা ও অদৃশ্য কোন কিছুই মানবের উপাস্য হতে পারে না। অর্থাৎ ভৌতিক স্বায়ম্ভু আমাদের উপাস্য বা ভজন পূজনের বস্তু নয় বরং জৈবিক স্বায়ম্ভু বা এর কোন কোন সদস্যই মানবের প্রকৃত উপাস্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে। স্বায়ম্ভুর সদস্যাদির মধ্যে কোনটি প্রত্যক্ষ এবং কোনটি পরোক্ষভাবে আমাদের উপাস্য। তার মধ্যে সাঁই ও কাঁই আমাদের প্রত্যক্ষ উপাস্য এবং শুক্র ও দুগ্ধ আমাদের পরোক্ষ উপাস্য। স্বায়ম্ভুরস একবার পান করলে মানুষের কাম পিপাসা হ্রাস পায় এবং সন্তানরূপ জন্ম এবং শুক্রপাতরূপ মরণের হাত হতে মুক্তি পাওয়া যায়।
মূলক - সৃষ্টিকর্তা
রূপক - কাঁই
উপমান - ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য
চারিত্রিক- অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ
ছদ্মনাম- আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর
আলোচ্য মূলকের রূপক ও ব্যাপক পরিভাষাদি পরবর্তী পর্বগুলোতে আলোচনা করা হয়েছে।
——————————————————————————————————–
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন