সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৪

বাঙালী মহামানব লালন সাঁইজি- ২

















১. শুদ্ধ শব্দের শুদ্ধ পঠন ব্যতীত লালনাদির প্রকৃত ভাব উদ্ধার করা সম্ভব নয়। সেজন্য পবিত্র লালন পঠন অধ্যায়ন মুখস্ত ও গবেষণার জন্য যথাসম্ভব পরিশুদ্ধভাবে সম্পাদিত বা সংকলিত লালন গ্রন্থ সংগ্রহ করা একান্ত প্রয়োজন।
২. কোন লালন অধ্যায়ন বা মুখস্ত করার প্রয়োজন হলে, উক্ত লালনের প্রতিটি শব্দের অর্থ, ভাবার্থ ও আত্মদর্শনের মূলক ভালোভাবে জেনে ও বুঝে লালন অধ্যায়ন বা মুখস্ত করা একান্ত আবশ্যক।
৩. কঠিন ও ব্যাখ্যামূলক লালনাদির ভাব উদ্ধার নিয়ে কোনক্রমেই কূটতর্কে জড়িয়ে পড়া ঠিক নয় বরং নিজেরা না পারলে কোন সুবিজ্ঞ গুরু গোঁসাইয়ের নিকট হতে জেনে নেওয়াই উত্তম।
৪. সঠিক বিজ্ঞানসম্মত ও যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা ব্যতীত লালনাদির মনগড়া ব্যাখ্যা করা নয়।
৫. অর্থ জেনে ও বুঝে লালন অধ্যায়ন করলে, অতিদ্রুত দিব্যজ্ঞান উদয় হয়। পক্ষান্তরে অর্থ না জেনে ও না বুঝে লালন অধ্যায়ন করলে তা কোন উপকারেই আসে না।
৬. লালনাদির কঠিন ও দুষ্প্রবেশ্য তত্ত্ব ও ভাব উদ্ধার করার জন্য অবশ্যই পাকা গুরু ও গোঁসাইয়ের সাহায্য গ্রহণ করা প্রয়োজন। নিজে নিজে মনগড়া ব্যাখ্যা করতে গেলে ভুলব্যাখ্যায় কবলিত হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক।
৭. পাকা গুরু গোঁসাইয়ের সাহায্য ব্যতীত একাকী লালন গবেষণা ও তত্ত্বাদি উদ্ঘাটনের মতো, হেন কাজ করা কারো পক্ষেই কখনো উচিৎ নয়।
৮. পঠন ও অধ্যায়নের পর গ্রন্থটি যত্রতত্র ফেলে না রেখে যতেœর সাথে নিরাপদ স্থানে তুলে রাখা উচিৎ। তা না হলে শিশু বা কুকুর বিড়ালের দ্বারা গ্রন্থটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
৯. পবিত্র লালন গ্রন্থট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কালোবর্ণের বসন বা কালোবর্ণের চামড়ার মোড়ক দ্বারা আচ্ছাদিত করে রাখা উত্তম। কারণ এ গ্রন্থটি সাধারণ কোন গ্রন্থ নয় বরং এটি বাংলা ভাষাভাষি মরমীবাউল বৈষ্ণব সহজিয়া মানববাদী, মানবতাবাদী, আত্মতত্ত্ববাদী, অধ্যাত্মবাদী ও লালনপন্থিসহ সব পারম্পরিকগণের একমাত্র ও সর্ব প্রথম বাংলা শাস্ত্রীয় গ্রন্থ।
১০. পবিত্র লালন গ্রন্থটি পবিত্র মনে অধ্যয়ন ব্যতীত, কোন উপকারে আসবে না।
১১. নির্দিষ্ট বৈঠক ব্যতীত সর্ব বৈঠকে সর্ব সময় লালন অধ্যয়ন ও পাঠদানের উপযোগী নয়। কারণ এর ভাব ও ভাষা অনেক উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত।
১২. পরম্পরা জ্ঞানধারিদের বৈঠক ভিন্ন, শাস্ত্রীয় মতানুসারিদের বৈঠকে লালন পাঠদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

ঐশিবাণী লালনাদি
বাঙালী মরমীসাধক মহাত্মা লালন সাঁইজির ওপর অবতীর্ণ সব লালনই ঐশিবাণী। কারণ যে সাধক জ্ঞানস্তরের ১.অন্ধকার ২.ধন্ধকার ও ৩.কুয়াকার- এ তৃতীয়স্তর অতিক্রম করে, জ্ঞানের নৈরাকার স্তরে পদার্পণ করেন, তখন তিনি আর লোককুলে থাকেন না বরং তিনি ঈশ্বরকুল বা প্রতীতিকুলে উন্নীত হন। ফলে তিনি যে কোন একটি দৈবিকাকে ছদ্মনামরূপে গ্রহণ করে, বিশ্বের সর্ব জীবের মধ্যে বিরাজ করেন। প্রতীতিকুল বা ঈশ্বরকুলে উন্নীত হলে, সাধকের বৈক্তিক-সত্তাটি দৈবিকা বা প্রতীতিতে রূপান্তরিত হয়।
উল্লেখ্য লোককুল হতে প্রতীতিকুলে বা ঈশ্বরকুলে উন্নীত না হয়ে বা পদার্পণ না করে, কোন সাধক দৈবিকারূপ ছদ্মনাম গ্রহণ করতে পারেন না। দৈবিকারূপ ছদ্মনাম গ্রহণ করার পর সাধকগণ বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য, রূপকার্থে যেসব অমীয় ও অমূলবাণী প্রকাশ করেন, তা সবই দৈববাণী বা ঐশিবাণী। দৈববাণী বা ঐশিবাণীকে আকাশবাণীও বলা হয়। আরবি ভাষায় দৈববাণী বা ঐশিবাণীকে অহি (ﻭﺤﻰ) বা ইলহাম (ﺍﻟﻬﺎﻢ) বলে।
ওহি [ﻭﺤﻰ] (রূপ)বি ইঙ্গিত, ছাপ, চিহ্ন, সংকেত, প্রত্যাদেশ, ঐশিবাণী, শব্দ অনুভব, লিখিত সংবাদ, গোপন প্রদত্তবাণী (প্র) কুরানী মনীষীদের রূপকবর্ণনা মতে মহামান্য ঐশিমহামানবগণের নিকট দৈবদূত কর্তৃক প্রেরিত ঈশ্বরের ঐশিবাণী বিশেষ (পরি) মনের মধ্যে উদিত সুভাব, মুখ দ্বারা প্রকাশ করা বা লেখনির সাহায্যে লেখা সুভাব (উপ)বিণ সুবোল (ছনা)বি অবতার (রূ)বি প্রত্যাদেশ (দেত)বি ইঙ্গিত {}
ইলহাম [ﺍﻟﻬﺎﻢ] (রূপ)বি ইঙ্গিত, চিহ্ন, ছাপ, সংকেত প্রত্যাদেশ, ঐশি প্রেরণা, স্বর্গ হতে প্রেরিতবাণী (প্র) কুরানী মনীষীদের রূপকবর্ণনা মতে বিশিষ্ট মহামানবগণ যে ঐশিবাণী বা স্বর্গীয়বাণী বিধাতা হতে লাভ করে থাকেন (উপ)বিণ সুবোল (ছনা)বি অবতার (রূ)বি প্রত্যাদেশ (দেত)বি ইঙ্গিত {}
বাঙালী মরমীকবি লালন সাঁইজি কর্তৃক প্রকাশিত জীবন্ত লালনাদির মধ্যে, যে মহামূল্যবান আত্মতত্ত্ব, কামতত্ত্ব ও পরমতত্ত্বের শিক্ষার সন্ধান পাওয়া যায়, তা কখনই সাধারণ মানুষ রচিত কাব্য ও গীতিকাব্যের মধ্যে পাওয়া যায় না। সাধারণ মানব রচিত কোন বাণী, সাধারণত দু’চার বছরের অধিককাল জীবন্ত থাকে না কিন্তু ঐশ্বরিকবাণী কিংবা দৈববাণীগুলো অনন্তকাল পর্যন্ত জীবন্ত থাকে। সাঁইজির প্রয়াণের পর হতে এ যাবৎ, একটির পর একটি লালন ক্রমান্বয়ে জীবন্ত হয়ে উঠতে আরম্ভ করেছে। সাঁইজির অমূল্যবাণীগুলোর মধ্যে এযাবৎ প্রায় শতাধিক লালন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পদার্পণ করতে সক্ষম হয়েছে। সেদিন হয়ত অধিক ব্যবধানে নয়, যখন সব লালনাদির সূর ও স্বরলিপি হবে। সুর ও স্বরলিপি হলেই লালনাদি অনন্তজীবন প্রাপ্ত হবে বলে আমরা আশা করি। প্রশ্ন হতে পারে- “গীতি কিভাবে ঐশিবাণী হতে পারে? গীতি তো মানুষকে অশ্লীল পথে নিয়ে যায়।” আমরা বলব- বিশ্বের সব ঐশিবাণী বা দৈববাণীগুলোই প্রাথমিক পর্যায়ে গীতিকাব্যরূপেই অবতীর্ণ হয়। পরবর্তিতে সংকলকগণ বা বিভাগকর্তাগণ গদ্যরীতিতে বা সারি সারি আকারে গ্রন্থে সংস্থাপন করেন। উপমাস্বরূপ বলা যায় বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ত্রিপিটক, জেন্দাবেস্তা, তৌরাত, যাবুর, ইঞ্জিল, কুরান ও লালন মহাগ্রন্থাদি প্রথমে পদ্যরীতিতে বা ছন্দবদ্ধভাবে বা গীতি ছন্দাকারে অবতীর্ণ হয়েছিল। যেমন-
বেদ
“দ্বাদশ প্রধয়শ্চক্রমেকং ত্রীণি নভ্যানি ক উ তচ্চিকেত
তম্মিন্তসাকং ত্রিশতা ন শংকবোহর্পিতাঃ ষষ্টির্ন চলাচলাসঃ”
(ঋবেসপ্রখপ্রম সূ-১৬৪, ঋ-৪৮)
ত্রিপিটক
“এতমত্থবসং ঞত্বা পণ্ডিতো সীল সংবুতো
নিব্বান গমনং মগ্গং খিপ্পমেব বিসোধয়ে” (ধম্মপদ-গাথা- ২৮৯)
যাবুর
“ভদ্র সে লোক, যে দুষ্টদের পরামর্শ মত চলে না
পাপীদের পথে থাকে না, ঠাট্টা বিদ্রূপকারীদের আড্ডায় বসে না” (যাবুর- ১/১)
কুরান
“إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ”
ইন্না আ’ত্বাইনাকাল কাউসার
ফা সল্লি লিরব্বিকা ওয়ানহার
ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার। (কুরান- ১০৯, সুরাঃ- কাউসার)
লালন (গীতিছন্দ)
“চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে,
আমরা ভেবে করব কী,
ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম,
তাকে তোমরা বলো কী।
ছয়মাসের এককন্যা ছিল,
নয়মাসে তার গর্ভ হলো,
এগার মাসে তিন সন্তান হলো,
কোন্টা করবে ফকিরি।
ঘর আছে দুয়ার নাই,
মানুষ আছে তার কথা নাই,
কেবা তার আহার জোগায়,
কে দেয় সন্ধ্যাবাতি।
লালন সাঁইজি ভেবে বলে,
মাকে ছুঁলে মরে ছেলে,
এ তিন কথার অর্থ নইলে,
তার হয় না ফকিরি” (পবিত্র লালন- ৪৪০)
কিন্তু পরবর্তিকালে সংকলকগণ সারি সারি আকারে বা গদ্যাকারে সম্পাদন করেছেন। যেমন-
বেদ- “দ্বাদশ প্রধয়শ্চক্রমেকং ত্রীণি নভ্যানি ক উ তচ্চিকেত, তম্মিন্তসাকং ত্রিশতা ন শংকবোহর্পিতাঃ ষষ্টির্ন চলাচলাসঃ” (ঋবেসপ্রখপ্রম সূ-১৬৪, ঋ-৪৮)
ত্রিপিটক “এতমত্থবসং ঞত্বা প-িতো সীল সংবুতো, নিব্বান গমনং মগ্গং খিপ্পমেব বিসোধয়ে” (ধম্মপদ-গাথা- ২৮৯)
যাবুর “ভদ্র সে লোক, যে দুষ্টদের পরামর্শ মত চলে না, পাপীদের পথে থাকে না, ঠাট্টা বিদ্রƒপকারীদের আড্ডায় বসে না” (যাবুর- ১/১)।
কুরান- (“إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الْأَبْتَرُ) “ইন্না আ’ত্বাইনাকাল কাউসার, ফা সল্লি লিরব্বিকা ওয়ানহার, ইন্না শানিয়াকা হুয়াল আবতার” (কুরান- ১০৯, সুরা- কাউসার)
লালন- “১চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে, আমরা ভেবে করব কী, ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম, তাকে তোমরা বলো কী। ২ছয়মাসের এককন্যা ছিল, নয়মাসে তার বিয়ে হলো, এগার মাসে তিন সন্তান হলো, কোন্টা করবে ফকিরি। ৩ঘর আছে দুয়ার নাই, মানুষ আছে তার কথা নাই, কেবা তার আহার জোগায়, কে দেয় সন্ধ্যাবাতি। ৪লালন সাঁইজি ভেবে বলে, মাকে ছুঁলে মরে ছেলে, এ তিন কথার অর্থ নইলে, তার হয় না ফকিরি- লালন।”
ঐশিবাণীর গুণ
বিশ্বের সব ঐশিবাণী বা দৈববাণীর চারটি গুণ লক্ষ্য করা যায়। যেমন-
১. ঐশিবাণী অবশ্যই রূপকভাবে নির্মিত হয়।
২. ঐশিবাণী অবশ্যই আত্মতত্ত্বভিত্তিক হতে হয়।
৩. ঐশিবাণী বিশ্ববাসীর কল্যাণমূলক হতে হয়।
৪. ঐশিবাণী সার্বজনীন ও সার্বকালীন হতে হয়।
ওপরোক্ত চার (৪)টি গুণ বা বৈশিষ্ট্য সম্বলিত সব বাণীকেই ঐশিবাণী বা দৈববাণী বলা হয়। বাঙালী মরমীসাধক লালন সাঁইজি রচিত, প্রতিটি লালনের মধ্যেই ঐশিবাণী হওয়ার চারটি গুণাগুণ পরিপূর্ণরূপেই বিদ্যমান। এ জন্য আমরা অনায়াসে লালনাদিকে ঐশিবাণী স্বর্গীয়বাণী বা দৈববাণী বলতে পারি। যেমন-
“কৈ হলো মোর মাছ ধরা (ও মন),
সারাজনম ধাপ ঠেলে,
হলাম কেবল বল হারা।
বিলে তো ধাপগুলি,
তাতে মোর ঠেলাজালি,
শুধু উঠেরে শামুক চাড়া,
শুভযোগ না পেয়ে মোর,
হলো কেবল জাল ছিঁড়া।
কতজন সে গল্প করে,
মাছ ধরতে যায় প্রেমসাগরে,
চিনে নদীর তিন ধারা,
মরতে এলাম সে নদীতে,
হলো না জাল ধরা।
যেজন ডুবুরী ভালো,
মাছের ঝিম সে চিনিল,
তার শুভ হলো যাত্রা,
সে নদীর মাছ ধরে,
সে খ্যাতি পেল বিশ্বজোড়া।
কানাই বলাই ছিল ভালো,
মাছের ধারা তারা পেল,
মাছ ধরে যায় তারা,
আমি লালন ভাবছি বসে,
সার হলো লালপড়া” (পবিত্র লালন- ৩৪৯)
কৈ হলো মোর মাছ ধরা, সারাজনম ধাপ ঠেলে, হলাম কেবল বল হারা। কানাই বলাই ছিল ভালো, মাছের ধারা তারাই পেল, মাছ ধরে যায় তারা, আমি লালন ভাবছি বসে, সার হলো মোর লাল পড়া।”
আলোচ্য অন্তরাটি নির্মাণের মূল উপাদান- “কানাই বলাই মাছ লালন লাল ও ধাপ” এ পরিভাষাদির প্রত্যেকটিই পুরোপুরি রূপক। মূলোকাদি নিম্নরূপ-
পর্যবেক্ষণ
উপমা ন- চবিত্র- নারী- চরিত্র- রূপক- মূলক
১. কালনাগিনী- ধন্বন্তরী- রজকিনী- কানাই- কবন্ধ
২. খুঁটি- বিম্বল- বলাই- শিশ্ন
৩. মাছ - স্বামী - সাঁই- পালনকর্তা
৪. গৌরাঙ্গ- লালন- সাঁই- পালনকর্তা
৫. উল্কা- লাল- কামরস
৬. বেলা- ধাপ- আয়ু
“কানাই বলাই মাছ লালন লাল ও ধাপ”- এ শব্দাদির প্রত্যেকটিই পুরোপুরি রূপক। অতএব আমাদের আলোচ্য লালনের মধ্যে ঐশিবাণীর প্রথম গুণটি পাওয়া গেল। আবার “কানাই বলাই মাছ লালন লাল ও ধাপ” ইত্যাদির প্রত্যেকটিই আত্মতত্ত্বভিত্তিক দৈবিকা।
রূপক- মূলক
১. কানাই- কবন্ধ
২. বলাই- শিশ্ন
৩. মাছ- পালনকর্তা
৪. লালন- পালনকর্তা
৫. লাল- কামরস
৬. ধাপ- আয়ু
অতএব আমাদের আলোচ্য লালনের মধ্যে ঐশিবাণীর দ্বিতীয় গুণটিও পাওয়া গেল। আলোচ্য অন্তবাটির মধ্যে মানবমনের পশুত্বভাব তিরোহিত করে, মনসত্বভাব অর্জন করে, সারাজগতের প্রতিপালক সাঁইয়ের সাথে দেখা করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এটা নিশ্চয় বিশ্ববাসীর আধ্যাত্মিককল্যাণমূলক অমূল্যবাণী। অতএব আমাদের আলোচ্য লালনের মধ্যে ঐশিবাণীর তৃতীয় গুণটিও পাওয়া গেল।
“কৈ হলো মোর মাছ ধরা,
সারাজনম ধাপ ঠেলে,
হলাম কেবল বল হারা।
কানাই বলাই ছিল ভালো,
মাছের ধারা তারাই পেল,
মাছ ধরে যায় তারা,
আমি লালন ভাবছি বসে,
সার হলো মোর লাল পড়া।”
আলোচ্য অন্তরাটি স্থান, কাল, পাত্র, জাতি ও বর্ণ কোন কিছুর সাথেই সম্পৃক্ত নয়। এ জন্য নিশ্চয় এটা বিশ্বজনীন বা সর্বজনীন। অতএব আমাদের আলোচ্য লালনের মধ্যে ঐশিবাণীর চতুর্থ গুণটিও পাওয়া গেল। পরিশেষে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, মহাত্মা লালন সাঁইজি বিরচিত প্রত্যেকটি লালন ঐশিবাণী বা স্বর্গীয়বাণী। এটা আমাদের বাঙালী জাতির সর্বকালের ও সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য স্বর্গীয়বাণী রূপ সাহিত্য সম্পদ। তদ্রূপ প্রতিটি লালন বিশ্বের সর্বশ্রেণির মানুষের জন্য অত্যন্ত পুজনীয় ও অত্যন্ত পবিত্র রূপক সাহিত্য সম্পদ।
স্বর্গীয়াবতার লালন সাঁইজি
বাঙালীজাতি, বাংলাভাষাভাষী তথা বিশ্বাবাসীর জন্য, বাঙালী এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যে, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী অবতার ছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের বাংলাভাষায় হেন মহাপুরুষের আগমন না হলে, বাঙালীজাতি বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সংস্কারের গভীর অন্ধকারে ঘুরপাক খেতো, আরো কতদিন তা কল্পনাতীত। তিনি সুতীক্ষè আধ্যাত্মিক ও আত্মতত্ত্বভিত্তিক জ্ঞানের মাধ্যমে, লালনাদির দ্বারা রূপক ও মূলকের মধ্যে পার্থক্য বা সনাতন ও সংস্কারের মধ্যে পার্থক্য, চমৎকারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। মূলক ও রূপককে আরবি ভাষায় হাক্বিক্বি (ﺤﻘﻴﻘﻰ) ও মাজাযি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) বলে। যেমন তাঁর বাণী-
“কী কালাম পাঠালেন আমার সাঁই দয়াময়,
একেক দেশে একেক বাণী কয় খোদা পাঠায়।
এক যুগে যা পাঠায় কালাম,
অন্যযুগে হয় কেন হারাম,
দেশে দেশে উপমা তামাম,
ভিন্ন দেখা যায়।
যদি এক খোদার হয় বর্ণনা,
তাতে তো ভিন্ন থাকে না,
মনুষের সব রচনা,
তাইত ভিন্ন হয়।
একেক দেশে একেক বাণী,
পাঠান কী সাঁই গুণমনি,
মানুষের রচিত জানি,
লালন ফকির কয়।” (পবিত্র লালন- ৩০৫)
পুরাণীরা যেরূপ গীতাকে সরাসরি শ্রীকৃষ্ণের মুখ নিঃসৃতবাণী বলে বিশ্বাস করেন, তদ্রূপ কুরানীরা কুরান ও হাদিসে কুদসিকে সরাসরি কাঁইয়ের বাণী বলে বিশ্বাস করেন। পুরাণীরা আরো বলেন- বিশ্বের সব গ্রন্থাদির চেয়ে শ্রীমদ্ভগবত গীতার মান অনেক ঊর্ধ্বে। বিশ্ববাসীর সুখশান্তি ও সুপথ প্রদানের জন্য, গীতার মতো একটি গ্রন্থই যথেষ্ট। তারা নাগরী বর্ণ ও নাগরী ভাষাকে স্বর্গীয়ভাষা বলে বিশ্বাস করে থাকেন। তারা শ্রী গোবিন্দকে আদিপিতা বা আদিমানব এবং শ্রীমতি সরস্বতিকে আদিমাতা বা আদিমানবী বলে বিশ্বাস করে থাকেন।
অপরপক্ষে কুরানীরা পবিত্র কুরান ও হাদিসে কুদসিকে সরাসরি কাঁইয়েই বাণী বলে বিশ্বাস করে থাকেন। তারা আরো বলেন- বিশ্বের অন্যান্য মহাগন্থাদির চেয়ে পবিত্র কুরানের মান অনেক উর্ধ্বে। তারা বিশ্ববাসীর সুখ সাচ্ছন্দ ও সাধন ভজনের জন্য, এ একটি গ্রন্থকেই যথেষ্ট মনে করে থাকেন। তারা আরবি বর্ণ ও আরবি ভাষাকে স্বর্গীয়ভাষা বলে বিশ্বাস করে থাকেন। তারা হযরত আদমকে (ﺍﺩﻢ) আদিমানব বা আদিপিতা ও হযরত হাওয়াকে (ﺤﻮﺍﺀ) আদিমানবী বা আদিমাতা বলে বিশ্বাস করে থাকেন। এরূপে বিশ্বের সর্ব দেশের সর্বভাষার সর্বজাতিই, যার যার শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, যার যার ভাষা, যার যার শাস্ত্রীয়সংস্কার ও যার যার শাস্ত্রীয় মহামানব বা ঐশিদূতকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করে থাকেন।
লালন ও বলন ব্যতীত কোন ঐশিবাণী এখনো বাংলাভাষায় অবতীর্ণ হয়নি। এমনকি এখন পর্যন্ত আমাদের বাংলা ভাষায় কোন শাস্ত্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন করা বা আবিষ্কার করা হয়নি। “যদি একই খোদার হয় বর্ণনা, তাতে তো ভিন্ন থাকে না, মানুষের সকল রচনা, তাইত ভিন্ন হয়।” মহাপুরুষ লালন সাঁইজি উদাত্ত কণ্ঠে বর্ণনা করেছেন- শাস্ত্রীয় মতবাদ ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থ, শাস্ত্রীয় সংস্কার এগুুলো একান্ত মানুষের সৃষ্টি, এগুুলো বিধাতার সৃষ্টি নয়। বিশ্ব বিধাতার সৃষ্টি হলে সব শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি ও শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি এক ও অভিন্ন হতো। তাতে কোন প্রকার ভিন্নতা থাকত না। তিনি আরো বলেছেন- “একেক দেশে একেক বাণী, পাঠান কী সাঁই গুণমনি, মানুষের রচিত জানি, লালন ফকির কয়।” বিশ্বব্যাপী এ শাস্ত্রীয় মতবাদ ও শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি, সব কিছুই মানুষ মানুষের প্রয়োজনে নির্মাণ করেছে। মানুষ মানুষের প্রয়োজনে রূপকার্থে শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি সৃষ্টি করেছে। রূপকার্থে নির্মিত এরূপ সাহিত্যকে আরবি ভাষায় মাজাাঝি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) বলে। মানুষের নির্মিত শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি দ্বারা সংসার সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছুটা হলেও উপকার পাওয়া যায়।
মাজাযি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) বা শাস্ত্রীয় রূপকসংস্কারাদি স্থান, কাল ও পাত্রভেদে ভিন্নভিন্ন। যে দেশের যেরূপ জলবায়ু ও পরিবেশ সে দেশে সেরূপেই গড়ে উঠে শাস্ত্রীয়সংস্কার। মানুষ সামাজিকভাবে বসবাসের জন্য, যুগেযুগে শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি নির্মাণ করেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত সাধন ভজনের জন্য শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি বা রূপকসংস্কারাদির পরিবর্তে আত্মদর্শনের কোন বিকল্প নেই। মানুষের ব্যক্তিগত সাধন ভজন ও মানসিক উন্নয়নের জন্য হাক্বিক্বি (ﺤﻘﻴﻘﻰ) বা মিনহাজ (ﻤﻨﻬﺎﺝ) বা সনাতনী সাধন পথ। পবিত্র কুরানে এ ব্যাপারে পবিষ্কার বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকের জন্য দু’টি পথ রয়েছে, একটি হলো রূপকসংস্কার এবং অপরটি হলো প্রকৃতপথ বা সনাতনী পথ। যেমন- (لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنْكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا) অর্থ- তোমাদের প্রত্যেকের জন্য সংস্কার ও সনাতন পথ রয়েছে (কুরান- মায়িদা- ৪৮)। আরবি ভাষায় একে মাজাাঝি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) ও হাক্বিক্বি (ﺤﻘﻴﻘﻰ) বলে। মানবদেহের প্রকৃতমূলক গোপন রেখে রূপকসদস্যের মাধ্যমে শাস্ত্রীয়শিল্প আবিষ্কারের বয়স তিন হাজার (৩,০০০) বছর অতিক্রম করলেও, বর্তমান সময় পর্যন্ত রূপক বা মাজাাঝি (ﻤﺟﺎﺯﻯ) metaphor, allegory এর বর্ণনাই সর্বত্র শুধু শোনানো হচ্ছে। বাস্তব শিক্ষা বা ভেদবিদ্যা বা এরফান (ﻋﺮﻔﺎﻦ) কোথাও শোনানো হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের চরিত্রের মধ্যেও, তেমন কোন পরিবর্তন হয় না, এমনকি শাস্ত্রীয় শিক্ষা মানুষের জীবনে, বাস্তবে তেমন কোন উপকারে আসে না। কারণ কোন বিষয়ের মূলভাব ভালোভাবে বুঝতে না পারলে তা মানবীয় চিত্তপটে স্থায়ীত্বলাভ করে না।
শাস্ত্রীয় মহাগ্রন্থাদির মধ্যে নির্মিত রূপকগল্প ও উপাখ্যানাদি দিন দিন যতই প্রচার ও প্রসার হচ্ছে, আতংবাদ ও উগ্রবাদের পরিমাণ ততই বাড়ছে। হেন সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদির মধ্যে বর্ণিত রূপকউপমাদির আত্মদর্শনের প্রকৃত মূলকাদি উদ্ঘাটন করে তা প্রচার ও প্রসার করতে থাকলে আতংবাদ, উগ্রবাদ ও সাম্প্রাদায়িকতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে আমরা মনে করি।
যুগকে ৭.আধুনিকযুগ ৬.মধ্যযুগ ৫.আদিমযুগ ৪.ধাতুরযুগ ৩.প্রস্তরযুগ ২.পদার্থযুগ ১.শক্তিযুগ- এ সাতভাগে ভাগ করা হয়। প্রস্তর যুগকেই মানব সভ্যতার প্রথমযুগ বলা হয়। প্রস্তর ব্যতীত অন্য কোন কিছুর ব্যবহার মানুষ জানত না বলে, তখন সর্ব কাজে একমাত্র পাথর ব্যবহার করত তারা। কারণ তখন ছিল না সহজলভ্য মারণাস্ত্র, ছিল না কারাগার, ছিল না ভাষা, ছিল না দুষ্টদের শাসন ও দমনের কোনে ব্যবস্থা। এছাড়াও অভিযুক্তকে শাস্তিদানকারী বিচারকের জন্য ছিল না দেহরক্ষী ও ছিল না বিচারকদের জন্য পৃথক কোন আবাস নিবাস। তখন অভিযুক্ত, অভিযোগকারী, প্রতিভূ, সাক্ষী এবং বিচারক সবাইকে একত্রে বসবাসসহ, একত্রে চলাফিরা করতে হতো, এমনকি একত্রে আহার বিহার ও নিশিযাপন পর্যন্ত তাদের করতে হতো। এমন সময় যাযাবর দলের দুষ্ট, দুষ্কৃতিকারী, কুচক্রী ও লম্পটদের নিয়ন্ত্রণ করা, দলপতিদের নিকট অত্যন্ত কঠিন ছিল। দুষ্টদের দমন ও শিষ্টদের পালন করার পর, নিজের প্রাণ রক্ষা করাও ছিল তাদের নৈমিত্তিক সমস্যাদির মধ্যে অন্যতম।
এরূপ সংকটাপন্ন মুহূর্তে দুষ্ট দমন ও শিষ্ট পালনের জন্য শাস্ত্রীয় মতবাদ নামক এ অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটি মানুষই মানুষের প্রয়োজনে আবিষ্কার করেন। মানব সভ্যতার প্রথমযুগ বা প্রস্তরযুগেই অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটির উদ্ভাবন হয়েছিল বলে গবেষকগণ মনে করেন। একমাত্র দুর্বলচিত্ত দুষ্টদের শাসন ও দমনের জন্যই এ পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করা হয়। “গোত্রীয় প-িত ও দলপ্রধানগণ ১.সৃষ্টিকর্তা ২.পালনকর্তা ৩.সংহারকর্তা ৪.আদিমানব/ আদিমানবী ৫.বর্থ্য ৬.স্বর্গ ও ৭.নরক নামক শাস্ত্রীয়মূল পরিভাষাদি রূপকার্থে নির্মাণ করেন। তারা ব্যাখ্যা দেন যে, স্রষ্টা এ বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, তিনি প্রয়াণোত্তর কালে পাপ-পুণ্যের বিচার করেন, পাপীদের নরকে নিক্ষেপ করেন, নরক অত্যন্ত যন্ত্রণাময় স্থান এবং পুণ্যবানদের স্বর্গে প্রেরণ করেন, স্বর্গ অত্যন্ত সুখময় স্থান। পালনকর্তা বিশ্বের সবকিছু প্রতিপালন করেন। সংহারকর্তা (যম) বিশ্বের সব জীবের প্রাণনাশ করেন ——– ইত্যাদি ইত্যাদি।” এটিই ছিল অন্ধবিশ্বাসের বীজ। এরূপেই মানবীয় সভ্যতার প্রথমযুগে বা পাথরের যুগে দুষ্ট দমন ও শিষ্ট পালনের জন্য নামক অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটি নির্মিত হয়।
অতঃপর এ অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটি প্রস্তরযুগ ও ধাতুরযুগ পেরিয়ে আদিমযুগে পদার্পণ করলে আদিমযুগের মানুষ এর সর্ব প্রথম আবিষ্কৃত মূলক ঠিক রেখে রূপক পরিভাষার আবিষ্কারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ‘রূপক সাহিত্য’ উদ্ভাবন করেন- যা আজো রূপক সাহিত্য নামেই বিশ্ববাসীর নিকট সুপরিচিত। আদিমযুগ হতে এ রূপক সাহিত্যটির কাঁধে পা রেখে না জেনে ও না বুঝে স্বার্থান্বেষী শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়ীরা একের পর এক শাস্ত্রীয় মতবাদ আবিষ্কার করে সাধারণ মানুষকে শাস্ত্রীয় মতবাদ নামের বিভেদ-বৈষম্যের বেড়াজালে বা আত্মঘাতী মরণপাশে আবদ্ধ করতে আরম্ভ করেন। ফলে সৃষ্টি হতে থাকে অসংখ্য শাস্ত্রীয়দল ও উপদল। গত মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে দুষ্ট দমন ও শিষ্ট পালনের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে অভিনব স্বয়ংক্রীয় অস্ত্রাদি ও কারাগার এবং আধুনিককালে আরো উন্নত সব মারণাস্ত্র আবিষ্কারের ফলে- সে-ই প্রস্তরযুগে উদ্ভাবিত অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটির চিরপরিসমাপ্তি ঘটেছে। কারণ বর্তমানে দুষ্ট দমন ও শিষ্ট পালনের জন্য নীতিকথা, শাস্ত্রীয়ছড়া, শাস্ত্রীয়কথা, শাস্ত্রীয় গল্পকাহিনী বা সৃজক পালক নাশক স্বর্গ ও নরকের ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রয়োজন হয় না। এখন বাদী বিবাদী প্রতিভূ সাক্ষী ও বিচারক একত্রে বাস করেন না। এ জন্য বিচারক ও সাক্ষীর প্রাণনাশের সম্ভাবনাও নেই। এ জন্য সে প্রস্তর যুগে উদ্ভাবিত শাস্ত্রীয় মতবাদ নামক অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটির ব্যবহার বিলুপ্ত প্রায়।
অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় হলো- আধুনিককালে আবিষ্কৃত অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের সাহায্য নিয়ে, এক শ্রেণির শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়ী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সে-ই অন্ধশ্বিাস অস্ত্রটিকে ব্যবহার করে মানবঘাতি মহামারী সৃষ্টি করেছে। স্বার্থান্বেষী শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়িরা অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রটি ব্যবহার করে, কোমলমতি কিশোর ও কিশোরীদের প্রয়াণোত্তর রূপকস্বর্গ লাভের লোভ দেখিয়ে, আগে মন হরণ করে, পরে হাতে তুলে দিচ্ছে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রীয় মারণাস্ত্র। ‘বাঁচলে বীর মরলে স্বর্গ, প্রাণের চেয়ে শাস্ত্রীয় মতবাদ বড়’ ইত্যাদি নাদধ্বনি কিশোর কিশোরীদের শিক্ষা দিচ্ছে তারা। স্বার্থান্বেষী শাস্ত্রীয় মতবাদ ব্যবসায়ীদের অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রের মরণপাশে আজ অনেক বিজ্ঞজনকেও আটকে পড়তে দেখা যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞাননির্ভর ও প্রমাণনির্ভর হতে না পারলে বা প্রস্তর যুগে উদ্ভাবিত অন্ধবিশ্বাস অস্ত্রের মরণপাশ হতে বের হয়ে আসতে না পারলে এবং শাস্ত্রীয় অন্ধবিশ্বাসীদের মরণকবল হতে বের হয়ে আসতে না পারলে প্রয়াণোত্তর রূপকস্বর্গের লোভে কিশোর কিশোরীদের আত্মঘাতি বোমা বহনের হাত হতে রক্ষা করার কোন পথই আমাদের সম্মুখে উম্মুক্ত নেই।
রূপকস্বর্গের লোভ রূপকনরক ও রূপকস্রষ্টার ভয় প্রদর্শন করে দুষ্টদমন ও শিষ্টপালন- এটা ছিল প্রস্তরযুগের কিংবদন্তিমূলক অদ্ভূতসংস্কার। এটা ছিল সেযুগের সোনালী অধ্যায়। কিন্তু সেটি আজকের জন্য অবশ্যই শাস্ত্রীয় মহামারী। সৃজক, পালক, নাশক, স্বর্গ ও নরক এসব মানুষের সৃষ্টি। বর্তমানে এগুলোকে বলা হয় রূপক সাহিত্য। অথচ এসব রূপক সাহিত্যের খপ্পরে পড়ে আত্মঘাতন বা আত্মহনন কোন বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না। এ মুহূর্তে শাস্ত্রীয় অন্ধবিশ্বাস ও জ্ঞানবিজ্ঞানের তুলনামূলক আলোচনা ও পর্যালোচনা করে কোমলমতি কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের রূপকস্বর্গের লোভে আত্মঘাতী বোমা বহনের মতো লোমহর্ষক পথ ও মত হতে সরিয়ে আনা আমাদের প্রতিটি মানুষের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য বলে আমরা মনে করি।
হাক্বিক্বি [ﺤﻗﻴﻗﻰ] (রূপ)বিণ মূল, যথার্থ, মর্মার্থ বি মূলক, বাস্তব {আ}
মাজাযি [ﻤﺟﺎﺯﻯ] (রূপ)বি রূপক, ছদ্ম, কলা, কৃত্রিম, অপ্রকৃত (ব্য্য) যে অর্থালংকারে উপমান ও উপমেয়ের অভেদ কল্পনা করা হয়। যথা- মুখচন্দ্র। যেসব কাব্য বা নাটকে কোন তত্ত্বকে রূপ দেওয়া হয় (পরি) সত্তার ছদ্মনাম, সত্তার উপমান নাম, বৈক্তিকসদস্যাদির সামাঞ্জস্যপূর্ণ ছদ্মনাম ব্যবহার করে মানব কল্যাণমূলক কল্পিত বর্ণনা (সংজ্ঞা) ১.আত্মদর্শনের উপমিত বিষয় বস্তুকে প্রকৃতির উপমান বিষয় বস্তুর সাথে সার্থক তুলনা করে রচিত গল্পকাহিনীকে রূপক বলে ২.যে অর্থালংকারে উপমান ও উপমিত পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয়, তাকে রূপক বলে- যেমন- শুক্ররণ কামনদী ইত্যাদি।
মিনহাজ [ﻤﻨﻬﺎﺝ] (রূপ)বি প্রকৃত, পথ, গলি, সড়ক, সরণি, মার্গ, বর্ত্ম্য, উপায়, পন্থা, ব্যবস্থা, কৌশল, রন্ধ্র, ছিদ্র, দ্বার, অভিমুখ, দিক, গোচর, গমনের দিক, যার দ্বারা গমনাগমন করা যায় (আবি) প্রকাশ্যপথ, প্রকৃত পথ, প্রকৃত ব্যবস্থা, উম্মুক্ত সাধনপথ {}
এরফান [ﻋﺮﻔﺎﻦ] (রূপ)বি সূক্ষ্মজ্ঞান, আদ্যজ্ঞান, ভেদজ্ঞান, পরাজ্ঞান, আধ্যাত্মিকজ্ঞান, আত্মদর্শনের জ্ঞান {.আরফুন.ﻋﺮﻒ>}
পরাবিদ্যা (রূপ)বি আধ্যাত্মিকবিদ্যা, ভেদবিদ্যা, আত্মদর্শন, ব্রহ্মাবিদ্যা, যে বিদ্যার সাহায্যে মানবের পরম উপাস্যের সন্ধানলাভ করা যায়।
প্রায় পনেরশত (১,৫০০) বছর পূর্বে আরবি ভাষায় আগমন করেছিলেন হযরত মুহাম্মদ। তখন তিনি একই বাণী দ্বারা বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেছিলেন যে, তোমরা তোমাদের মানব রচিত বা মনগড়া শাস্ত্রীয় মতবাদ ও দেবদেবির পূজা পরিত্যাগ করে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার উপাসনা করো। যেসব শাস্ত্রীয় মতবাদ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে, ধনী দরিদ্রের মধ্যে বিভেদ বৈষম্য সৃষ্টি করে, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে, তা বিধাতার বিধান নয়। ভেদাভেদ সৃষ্টিকারী এরূপ সংস্কারাদি মানুষের রচনা। তোমরা সেগুুলো পরিত্যাগ করে, একমাত্র অমীয় ঐশিবাণী বা সনাতনীপদ্ধতি অনুসরণ করে, তোমাদের মুক্তির সন্ধান করো। অনুরূপভাবে প্রায় বারোশত (১,২০০) বছর পর অর্থাৎ গত (১৭৭৪-১৮৯০) খ্রিস্টাব্দে বাংলাভাষার মহামানবরূপে মহাত্মা লালন সাঁইজি আগমন করেন। তিনি বলেন-
“সহজমানুষ ভজে দেখনারে মন দিব্যজ্ঞানে,
পাবিরে অমূল্যনিধি পাবি বর্তমানে।
ভজো মানুষের চরণ দু’টি,
নিত্যবস্তু হবে খাঁটি,
মরলে হবে সব মাটি,
ত্বরায় এভেদ লও জেনে।
মরলে পাবো বেহেস্তখানা,
তা শুনে তো মন মানে না,
বাক্বির লোভে নগদ পাওনা,
কে ছাড়ে এ ভুবনে।
আসসালাতুল মি’রাজুল মু’মেনিনা,
জানতে হয় নামাজের বেনা,
বিশ্বাসীদের দেখাশুনা,
লালন কয় এ জীবনে” (পবিত্র লালন- ৯২৮)
এরূপ আরো অসংখ্যবাণী রয়েছে- যা সাধারণ মানুষের পক্ষে, কোনক্রমেই নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এ জন্য নিঃসন্দেহে বলা যায়, মহাত্মা লালন সাঁইজি আমাদের বাংলাভাষায় বাঙালীদের মধ্যে, বিশ্ববাসীর জন্য একজন বিশিষ্ট স্বর্গীয়প্রতীতি। যেমন পবিত্র কুরানেও বলা হয়েছে- সর্বকালে সর্বযুগেই প্রত্যেক জাতি বা ব্যক্তির নিকটই সাংবাদিক প্রেরিত হয়। (وَلِكُلِّ أُمَّةٍ رَسُولٌ فَإِذَا جَاءَ رَسُولُهُمْ قُضِيَ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ) অর্থ- “প্রত্যেকের জন্যই সাংবাদিক, যখন তাদের নিকট সাংবাদিক আসে, ন্যায় সঙ্গতরূপে বিচার করেন, তারা অত্যাচারিত হয় না” (ইউনুস-৪৭)
সমীক্ষা
একবিংশ শতাব্দির প্রথম দশকে সারা পৃথিবিতে প্রায় আড়াই হাজার (২,৫০০) টির অধিক শাস্ত্রীয় মতের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠালাভ করেছে মাত্র ঊনিশ (১৯)টি শাস্ত্রীয় মতবাদ। বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় আটশত (৮০০) কোটি মানুষ রয়েছে। বর্তমানে প্রায় আড়াই হাজার (২,৫০০) টির অধিক ভাষা রয়েছে। ওপরোক্ত তথ্যাদির ভিত্তিতে বলা যায় যে, গড়ে প্রায় (৮০০,০০,০০,০০০ ÷ ২,৫০০ = ৩২,০০,০০০) অর্থাৎ প্রতি বত্রিশলাখ (২৩,০০,০০০) লোকের জন্য একটি শাস্ত্রীয় মতবাদ। আরো বলা যায় গড়ে প্রায়- (৮০০,০০,০০,০০০ ÷ ২,০০০ = ৪০,০০,০০০) অর্থাৎ প্রতি চল্লিশলাখ (৪০,০০,০০০) লোকের জন্য একটি ভাষা।
অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়- এপার বাংলা ও ওপার বাংলা মিলে প্রায় পঞ্চাশ কোটি (৫০,০০,০০,০০০) বাঙালী থাকা সত্ত্বেও, অদ্যাবধি আমাদের বাংলাভাষায় একটিও শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই। মনীষীগণের মতে আমাদের বাংলাভাষা সৃষ্টির বয়স যদিও বারোশত (১,২০০) বছর পেরিয়ে গেছে (শাস্ত্রীয় মতবাদ বলতে গেলে সার্থক শাস্ত্রীয় সংস্কার)। সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে অবশ্যই একটি শাস্ত্রীয়সংস্কার প্রয়োজন। এ জন্য দুধ পানের তৃপ্তি, হলো পানের দ্বারা অর্জন করার মতো, দিশেহারা মানুষ অগত্য সংস্কৃত পালি ফার্সি তুর্কি আরবি হিব্রু ও সুরিয়ানি ইত্যাদি ভাষা হতে, শাস্ত্রীয় রূপকসংস্কারাদি বাংলাভাষায় অনুবাদ করে তা গ্রহণ করতে থাকেন। কারণ সৃষ্টি ও স্রষ্টার করণ কারণ সাধন ভজন ইত্যাদি জানা ও পালন করা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।
সমীক্ষাটি হতে আমরা দেখতে পাই- সারাবিশ্বে যদি মাত্র ষোল (১৬)টি শাস্ত্রীয় মতবাদ হতো তবুও আমরা বাঙালীজাতি একটি শাস্ত্রীয় সংস্কার পেয়ে থাকি। যদি সারাবিশ্বে মাত্র আট (৮)টি ভাষা হতো তবুও আমরা বাঙালীরা একটি শাস্ত্রীয় মতবাদ পেয়ে থাকি। অনেক মনীষী ইতোমধ্যেই এরূপ মন্তব্য করেছেন যে, ভাষা ও লোকসংখ্যা গড়ে- আমাদের বাংলাভাষা পৃথিবির ষষ্ঠতম স্থানে রয়েছে। তবে সারাবিশ্বে যদি মাত্র ছয় (৬)টি শাস্ত্রীয় মতবাদও থাকত তবুও আমরা বাঙালীজাতি একটি শাস্ত্রীয় মতবাদ বা শাস্ত্রীয় সংস্কার পেয়ে থাকি। ওপরোক্ত তথ্যাদি হতে আরো বলা যায়- বর্তমান বিশ্বে গড়ে প্রতি চল্লিশ লাখ (৪০,০০,০০০) লোকের জন্য একটি শাস্ত্রীয়সংস্কার রয়েছে। যেমন- হিন্দুসংস্কার সংস্কৃত ঋষিদের, বৌদ্ধসংস্কার পালি সাধুদের, শান্তিসংস্কার পার্সিয়ান পণ্ডিতদের, কনফুসী সংস্কার চৈনিক কনফুসিয়াসের (শাস্ত্রীয় গ্রন্থ-‘আইচিং’), জৈনসংস্কার পার্সিয়ান জুরথুস্তের (শাস্ত্রীয় গ্রন্থ- জেন্দাবেস্তা) ও শিখসংস্কার গুরুনানকের।
তবে আমাদের পঞ্চাশকোটি (৫০,০০,০০,০০০) হতভাগা বাঙালীদের শাস্ত্রীয়সংস্কার বা শাস্ত্রীয় মতবাদ কোন্টি? আমাদের বাংলাভাষার বয়স প্রায় বারোশত (১,২০০) বছর পেরিয়ে গেলেও, কেন বাংলাভাষায় কোন শাস্ত্রীয়সংস্কার নির্মাণ করা হলো না? কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে আমাদের বাংলাদেশের মতো ছোট একটি দেশেও প্রায় পঞ্চাশ (৫০)টি শাস্ত্রীয়সংস্কার প্রচলিত রয়েছে বলে, গবেষক ও মনীষীগণের ধারণা। তবে কী বাঙালীদের কোন শাস্ত্রীয় মতবাদ নেই? নাকি বাঙালীদের শাস্ত্রীয় মতবাদের প্রয়োজন নেই?। নাকি আমাদের হতভাগ্য বাঙালীদের বঙ্গভূমিতে কোন মহামানবের পদার্পণ হয়নি?
সমীক্ষা হতে দেখা যায়, গড়ে প্রায় বত্রিশলাখ (৩২,০০,০০০) জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের মধ্য হতেই মহামানব ঢুঁড়ে বের করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তারা স্বস্ব ভাষায় রচিত যে কোন একটি মহাগ্রন্থের দর্শনের ছত্রছায়ায় সুসংগঠিত হয়ে, উক্ত গ্রন্থের নির্মাতাকে শাস্ত্রীয়গুরুরূপে গ্রহণ করেছেন। অতঃপর উক্ত গ্রন্থের অনুকূলে শাস্ত্রীয়সংস্কার নির্মাণ করে, তার ব্যাপক প্রচার করে, তারা বিশ্বের বুকে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন কিন্তু আমরা প্রায় পঞ্চাশকোটি (৫০,০০,০০,০০০) বাঙালীর মধ্যেও এখন পর্যন্ত একজন মহামানব ঢুঁড়ে বের করতে পারিনি। পারিনি বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে, বাংলা ভাষার মাধুরী মিশিয়ে সার্থক ও যুগোপযোগী একটি শাস্ত্রীয়সংস্কার নির্মাণ করতে! বিধি কী আমাদের ওপর বৈমুখ!! আমাদের বাঙালীদের ভাগ্য কী এতই মন্দ!! নাকি যুগেযুগে বাংলার নিভৃত কোণে কোণে অনেক মহামানব আগমন করেছিলেন এবং এখনো করছেন কিন্তু আমরা অহংকার ও অবহেলাবশতঃ তাঁদের গ্রহণ করতে পারিনি?
বাস্তবতা বলে আমাদের বঙ্গভূমিতে যুগেযুগে অসংখ্য মহামানব আগমন করেছিলেন এবং এখনো অনেক মহামানব আগমন করছেন, আমাদের অহংকার দ্বিধা দ্বন্দ্ব ও দৈন্যতার কারণে, আমরাই তাঁদের গ্রহণ করতে পারছি না। আমরা ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখতে পাই, আমাদের বঙ্গভূমি ও বাঙালীজাতি দীর্ঘদিন ধরে পরাধীনতার লৌহশৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ত্রিশলাখ বাঙালীর রক্ত দিয়ে আমাদের বঙ্গভূমি বা আমাদের মায়ের ভূমি বা আমাদের পিতৃপুরুষগণের পবিত্র ভূমি আমরা স্বাধীন করেছি। তবুও শাস্ত্রীয় পরাধীনতার সীসক শৃঙ্খলের বাঁধন কেটে, বের হয়ে আসতে পারিনি আজো! শাস্ত্রীয়দিক দিয়ে বাঙালীজাতি আজো পরগাছা ও পরাধীন পড়ে আছে। কিছু বাঙালী হিন্দু নামে হিন্দুস্থানীদের অধীন এবং কিছু বাঙালী মুসলাম নামে পারস্যদের অধীন। এ জন্য আজো আমরা আধ্যাত্মিকগবেষণা, কী আধ্যাত্মিক উপসনা, কী আধ্যাত্মিকসাধনা ইত্যাদির মুক্তাঙ্গনে বিচরণ করতে পারি না। পারিনা স্বাধীন মনের শাস্ত্রীয় অভিব্যক্তিটুকু প্রকাশ করতে।
যারা নিজস্ব ভাষায় নিজেদের মহামানব অন্বেষণ করে, তাঁর মতাদর্শের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ও প্রয়োজনীয় শাস্ত্রীয়সংস্কার নির্মাণ করে, নিজেদের স্বাধীনতা ও সকীয়তা বজায় রেখে, বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, তাদের মহামানবগণ কী আমাদের মহামানবগণের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন? তাদের ভাষা কী আমাদের বাংলাভাষার চেয়ে উত্তম ছিল? না কখনই তা ছিল না। কারণ আমাদের বাংলাভাষার চেয়ে সংস্কৃত ভাষা বা পালিভাষা ঊর্ধ্বে হলে, তাদের ভাষাটি পৃথিবির বুক হতে চিরনিশ্চিহ্ন হয়ে যেত না বরং দিনের পর দিন আরো বৃদ্ধি পেতে থাকত।
কার্যত দেখা যায় সংস্কৃত ভাষায় পৃথিবির আদিমহাগ্রন্থ বেদ ও পালিভাষায় পৃথিবির দ্বিতীয় প্রাচীনতম মহাগ্রন্থ ত্রিপিটক রচিত হয়েছিল। যা আজো আমাদের নিকট বিশ্ববিখ্যাত হয়ে আছে। তাদের ভাষা পৃথিবির বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও, তাদের শাস্ত্রীয় সংস্কারের ব্যবহার দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। আবার আরবি ভাষার মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরান, আরবি ভাষাকে এবং আরবি জাতিকে আজ বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল, এমনকি প্রত্যেক নিভৃত কোণ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। সৃষ্টি স্রষ্টা ভজন পূজন ইত্যাদি ব্যাপারে গবেষণামূলক এবং চিরন্তন সত্য কোন মতামত প্রকাশ করতে গেলেও, বর্তমানে বিদেশী শাস্ত্রীয় মতবাদাদির নব্য ধ্বজাধারী প-িতরা কণ্ঠরুদ্ধ করে ধরে পুনঃপুন।
এ জন্য অধিকাংশ গবেষক স্বস্ব গবেষণালব্ধজ্ঞান শুধু নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখে ঝঞ্ঝাটমুক্ত জীবনযাপন করতে চান। আসুন আমরা শাস্ত্রীয় পরাধীনতার অন্ধত্বের ছাইয়ের রশিটি কর্তন করে মাতৃভাষার স্বার্থে, বাংলাভাষার স্বার্থে ও বাঙালীজাতির স্বার্থে ‘মানবান’ দর্শনের সুশীতল ছায়াতলে একত্র হই। অতঃপর সর্বসম্মতি ক্রমে বর্তমানে প্রচলিত অন্যান্য শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি যাচাইবাছাই করে, প্রায় পঞ্চাশকোটি বাঙালীর উপকারার্থে সুন্দর, সাবলীল এবং সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন একটি শাস্ত্রীয়সংস্কার নির্মাণ করি। যা হবে আমাদের বাঙালীর সম্পদ, যা হবে আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ। বঙ্গভূমির শাকপাতা খেয়ে পরিপুষ্ট, বাংলার আকাশে উদিত জ্ঞানপ্রদীপ, স্মরণকালের ক্ষণজন্মা বাঙালীমরমী মহাসাধক, পদ্মাবতী নন্দন মহাত্মা লালন সাঁইজি বঙ্গভূমির এক অনন্য সিদ্ধপুরুষ ও ঐশিমহাপুরুষ। তাঁর অমীয় ও মহামূল্যবান ঐশিবাণী লালনাদিই আমাদের অনন্য স্বর্গীয়বাণী বা ঐশিবাণী। এ ঐশিবাণী লালনাদিকে কেন্দ্র করেই আমরা সুসংগঠিত হই, লালনাদির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণাদি দ্বারা, আমরা নির্মাণ করি বাঙালী শাস্ত্রীয়সংস্কার। বর্তমানে আমরা আমাদের চেষ্টাসাধনা করে যাই। অবশিষ্ট কাজটুকু আমাদের ভাবি প্রজন্মের বাঙালী দামাল সন্তানদের ওপর ন্যস্ত করে যাই।
বাঙালী শাস্ত্রীয় মতবাদের মূলভিত্তি
১. মহাত্মা লালনসাঁইজি ঊনবিংশ শতাব্দির বাঙালী অবতার।
২. মহাত্মা লালনসাঁইজি বিরচিত লালনাদিই আমাদের ঐশিবাণী।
৩. আমাদের শাস্ত্রীয় সংস্কার ‘মানবধর্ম’
৪. ‘মানবধর্ম’ সংস্কারটি সম্পূর্ণ বাংলাভাষায়।
৫. আমাদের শাস্ত্রীয় গ্রন্থ ‘পবিত্র লালন’
ঐশিবাণীর লালন নামকরণের সার্থকতা
বাংলাভাষার একমাত্র ঐশিমহাগন্থটি যেহেতু মহাত্মা লালন সাঁইজি বিরচিত। এ জন্য তাঁর মহানবাণীগুুলো লালনগীতি নামে পরিচিত, সেহেতু মহাগ্রন্থটির নাম লালন হওয়াই যুক্তিযুক্ত। তবে লেখার সময়ে ‘পবিত্র লালন’ লেখতে হবে এবং বলার সময় ‘পবিত্র লালন’ বলতে হবে। বাংলা লালন শব্দটির অর্থ লালন দৈবিকা এবং লালন কাব্য উভয়ই বুঝাবে। রূপক সাহিত্যে একটি প্রবাদ আছে- ‘যেসব শব্দ দ্বারা অন্তত একাধিক অর্থ প্রকাশ করে না, তবে তা দৈবিকা বলেও গ্রহণযোগ্য হয় না।’ এছাড়াও যেহেতু প্রতিটি লালনের মধ্যে অন্তত একবার ভনিতারূপে ‘লালন’ শব্দটির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। এ জন্য বঙ্গীয় ঐশিবাণীটির ‘লালন’ নাম গ্রহণ সার্থক ও যথার্থ হয়েছে। মহাত্মা লালন সাঁইজি বিরচিত ও তাঁর স্মৃতি বিজড়িত গ্রন্থের নাম লালন হওয়া অযথার্থ নয়। যেমন- হানিফার মাজহাব হানাফি, আশরাফের গ্রন্থ আশরাফিয়া ইত্যাদি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন