বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

‘পূর্ণিমা’ প্রসঙ্গ (৪৪/২)

৪৪/২.‘পূর্ণিমা’ (পবিত্রতা ৫ম পর্বের ২য় পর্ব বিশেষ)। এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ৪৪ নং ‘পবিত্রতা’ মূলকের অধীন ‘রূপকপরিভাষা’ বিশেষ। বলন কাঁইজির নির্মিত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ (৫ম খণ্ড) গ্রন্থে এ পরিভাষাটি সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
—————————————————————————————-
পূর্ণিমা
Moonfull (মুনফুল)/ ‘كامل القمر’ (কামাল আলক্বামার)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পবিত্রতা’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপকপরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘পবিত্রতা’, উপমানপরিভাষা ‘দিন’, চারিত্রিকপরিভাষা ‘পূর্ণেন্দু’ এবং ছদ্মনামপরিভাষা ‘মঙ্গলবার ও শুক্লপক্ষ’
পূর্ণিমা (রূপ)বি পূর্ণেন্দু, পূর্ণশশী, তিথি বিশেষ, চন্দ্রের সম্পূর্ণ অংশ দৃশ্যময়তা (আবি)বি পবিত্রতা, বিশুদ্ধতা, নির্মলতা, Moonfull (মুনফুল), ‘كامل القمر’ (কামাল আলক্বামার) (আভা)বি পৌর্ণমাসী, শুক্লপক্ষ, শরীরের সুস্থ্যতা (আপ)বি ইদ্দত (.ﻋﺩﺖ), চাহারশম্বা (ফা.ﭼﻬﺎﺮ ﺸﻧﺒﻪ), ত্বহুর (.ﻄﻬﺭﺓ), পাক (ফা.ﭙﺎﮎ), মি’রাজ (.ﻤﻌﺭﺍﺝ) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পবিত্রতা’ পরিবারের ‘রূপকপরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.চন্দ্রকলার চতুর্দশতম তিথির পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাময়তাকে পূর্ণিমা বলা হয় ২.রজস্বলাদের একস্রাবের প্রস্থান হতে অন্য স্রাব সূচনার মধ্যবর্তী সাতাশ দিনকে পবিত্রতা বা রূপকার্থে পূর্ণিমা বলা হয় (ছনা)বি মঙ্গলবার ও শুক্লপক্ষ (চরি)বি পূর্ণেন্দু (উপ)বি দিন (রূ)বি পূর্ণিমা (দেত)বি পবিত্রতা।
পূর্ণিমার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of moonfull)
১. “অমাবস্যা পূর্ণিমা হয়, মহাযোগ সে দিনে উদয়, লালন কয় সময় নির্ণয়, করে করো সাধনা” (পবিত্র লালন- ৯২১/৪)
২. “পূর্ণিমাশশী বিলিন হইলে তমসা নেমে আসে, মনেরমানুষ ছাড়িয়া গেলে নয়নজলে ভাসে, ডুবিয়া গেলে রবি শশীরে, ঐ আলো জ্বলে কী কিরণে” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২৭)
৩. “স্রাবস্তি ভজনালয়, পূর্ণিমায় সাঁই আসে যায়, মহাযোগ হলে উদয়, সহস্রবছর সে সাধনে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩)
পূর্ণিমার কয়েকটি সাধারণ উদ্ধৃতি
(Some ordinary quotations of moonfull)
১. “অমাবস্যা পূর্ণিমার যোগ, আজব অসম্ভব সম্ভোগ, জানলে খণ্ডে ভবরোগ, গতি হয় অখণ্ড-দেশে” (পবিত্র লালন- ৯৫৭/২)
২. “অমাবশ্যা পূর্ণিমালীলা, জোয়ার চিনে ভাঁসা ভেলা, দ্বিদলে অটলখেলা, বলন কয় প্রেমনদীতে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩৪)
৩. “অমাবস্যার পর পূর্ণিমাতে, উদয় হয় সে নদীয়াতে, বলন কয় ভাব বুঝিতে, জীবের কী সে সাধ্য তাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১৭)
৪. “আকাশে সাঁই ঠাঁই নিয়েছে, পাহাড়ের চুড়ায়, নয়া বিজয়ের ডাক এসেছে, প্রতিপদে পূর্ণিমায়” (বলন তত্ত্বাবলী- ৮)
৫. “আত্মতত্ত্বে পূর্ণিমা হয়, প্রথমা হতে সপ্তবিংশময়, করিয়া সে যোগ নির্ণয়, ধীরেধীরে চালাও তরণী” (বলন তত্ত্বাবলী- ৩৯)
৬. “আহার নয় সে উপবাসী, নিত্য করে একাদশী, প্রভাতে উদয় পূর্ণশশী, পূর্ণিমার চাঁদ অন্ধকারে” (পবিত্র লালন- ৩৯২/৩)
৭. “ঐ অমাবস্যা পূর্ণিমাতে, দ্বিতীয়া যোগ প্রথমেতে, ভাগ্যবানরা পায় দেখিতে, ত্রিবেণীর কোণে নিঠাঁই” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৭৬)
৮. “ওরে পূর্ণিমারজনী গণে, আত্মা আসে ধরাধামে, তিন দিনের মরম জেনে, সাধুরা তার মুক্তি দেয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ১২)
৯. “কোমলকোঠা গোলকধামে, রক্তিমা রঙ বৃষ্টি নামে, পূর্ণিমার প্রথমে আনাগোনা, বলন কয় বিশ্ব ঘুরে, বসে থাকে নিতাইপুরে, অটল বিনে পায় না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১৩)
১০. “জাগ জাগ ও প্রাণনাথ দেখ পূর্ণিমানিশে, মধুরনিশি যায় বইয়া যায় ঘুমে আলসে” (বলন তত্ত্বাবলী- ৫১)
১১. “পূর্ণিমার যোগাযোগ হলে, শুকনানদী উজান চলে, ত্রিবেণীর পিছলঘাটে, নিঃশব্দে বন্যা ছোটে, চাঁদ-চকোরে ভাটার চোটে, বাঁধ ভেঙ্গে যায় তৎক্ষণা” (পবিত্র লালন- ৬৩৬/৩)
১২. “পূর্ণিমার যোগে সে মীন ভাসে, কারুণ্য তারুণ্য এসে, স্রাবণ্যে যখন মিশে, সাধক মীন ধরতে পারে সে দিনে” (পবিত্র লালন- ৬৪৫/৪)
১৩. “মন চোরারে ধরবি যদি মন, ফাঁদ পেতে বস ত্রিবেণে, অমাবস্যার পর পূর্ণিমাতে, বারাম দেয় সেখানে” (পবিত্র লালন- ৭৩৯/১)
১৪. “ষোলকলা হলে শশী, তবে তো হয় পূর্ণমাসী, পনেরই পূর্ণিমা কিসি, পণ্ডিতেরা কয় সংসারে” (পবিত্র লালন- ৬০/৩)
১৫. “সিয়াম অটলসাধন, পূর্ণিমাতে দয়াল দর্শন” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৯৭)
১৬. “সে কথা কী কবার কথা, জানতে হয় নিরলে বসে, অমাবস্যার পর উদয় শশী, পূর্ণিমার পর রয় কোন্ দেশে” (পবিত্র লালন- ৯৫৭/১)
১৭. “হায় পূর্ণিমারজনী এলে, সাত আকাশের দুয়ার খোলে, সত্তরসহস্র পর্দা খোলে, দেখা দিবে দয়াল সাঁই, পঞ্চাশসহস্র বছর, নিরীক্ষ ধরে থাকা চাই” (বলন তত্ত্বাবলী- ৭)
পূর্ণিমার সংজ্ঞা (Definition of moonfull)
চন্দ্রকলার চতুর্দশতম তিথির পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাময়তাকে পূর্ণিমা বলে।
পূর্ণিমার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of moonfull)
রজস্বলাদের একস্রাবের প্রস্থান হতে অন্য স্রাব সূচনার মধ্যবর্তী সাতাশ দিনকে পবিত্রতা বা পূর্ণিমা বলে।
পূর্ণিমার প্রকারভেদ (Classification of moonfull)
পূর্ণিমা প্রথমত দুই প্রকার। যথা- ১.চান্দ্রপূর্ণিমা ও ২.দৈহিকপূর্ণিমা।
১. চান্দ্রপূর্ণিমা (Lunar moonfull)
চন্দ্রকলার চতুর্দশতম তিথির পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাময়তাকে চান্দ্রপূর্ণিমা বলে।
২. দৈহিকপূর্ণিমা (Fleshly moonfull)
রজস্বলাদের একস্রাবের প্রস্থান হতে অন্য স্রাব সূচনার মধ্যবর্তী সাতাশ দিনকে পবিত্রতা বা দৈহিকপূর্ণিমা বলে।
আবার রূপকসাহিত্যে পূর্ণিমা দুই প্রকার। যথা- ১.উপমানপূর্ণিমা ও ২.উপমিতপূর্ণিমা।
১. উপমানপূর্ণিমা (Analogical moonfull)
চন্দ্রকলার চতুর্দশতম তিথির জ্যোৎস্নাময়তাকে উপমানপূর্ণিমা বলে।
২. উপমিতপূর্ণিমা (Compared moonfull)
রূপকসাহিত্যে রজস্বলাদের পবিত্রকালকে উপমিতপূর্ণিমা বলে।
পূর্ণিমার পরিচয় (Identity of moonfull)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পবিত্রতা’ পরিবারের অধীন একটি ‘রূপকপরিভাষা’ বিশেষ। সাধারণত চন্দ্রকলার চতুর্দশতম তিথির পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নাময়তাকে পূর্ণিমা বলা হয়। চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী বছরে পূর্ণিমা ১২টি। পূর্ণিমাদি হলো- চৈত্রাবলী, বৈশাখী, জ্যৈষ্ঠী, আষাঢ়ী, শ্রাবণী, ভাদ্রপদা, আশ্বিন্যা, কার্তিকী, অগ্রহায়ণী, পৌষালি, মাঘী ও দোল। কিন্তু সৌরবর্ষ অনুযায়ী বছরে পূর্ণিমা মোট ১৩টি। রূপকসাহিত্যে যে পূর্ণিমার কথা বলা হয় তা আদৌ ওপরোক্ত চান্দ্র বা চান্দ্রিক পূর্ণিমা নয়। বরং তা হলো রজস্বলাদের দৈহিক পবিত্রতা। অর্থাৎ রজস্বলা রমণীদের পবিত্রতা পর্ব। এখানে স্মরণীয় রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলকাদিকে উপমিতপদ ধরে তা দ্বারা প্রকৃতির বিভিন্ন উপমানপদ নির্মাণ করে রূপকসাহিত্য নির্মাণ করা হয়। সে জন্য বলা যায় যে, যে ব্যক্তি উপমিতি জানেন না সে শাস্ত্রীয় মতবাদের কিছুই জানে না।
অন্যদিকে বড় আশ্চর্য হবার বিষয় হলো সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয়, সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরা রূপকসাহিত্যে বর্ণিত পূর্ণিমা পরিভাষাটির দ্বারা কেবল চান্দ্রিক পূর্ণিমাকেই বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। তাই শাস্ত্রীয় ও সাম্প্রদায়িকরা চিরদিনের জন্য আধ্যাত্মিক বা আত্মতত্ত্বের জ্ঞানে চিরান্ধ। আলো স্মরণীয় যে, উপমিতপদের আলোচনা প্রধান রূপকসাহিত্যাদির উপমানপদের আলোচনা, ব্যাখ্যা ও টীকার চাপে রূপকসাহিত্যের মূলশিক্ষা বা বাস্তবশিক্ষা একেবারেই ভূলুণ্ঠিত ও পদ্দোলিত হয়ে পড়েছে। যেমন- “সবে মাত্র একটি খুঁটি, খুঁটির গোড়ায় নাইকো মাটি।” এখানে উপমিতপদরূপে ছিল শিশ্ন। এবং শিশ্নের আলোচনাই ছিল মুখ্য। কিন্তু উপমানবাদীরা শিশ্নের আলোচনা পরিত্যাগ করে উক্ত খুঁটি পরিভাষাটির দ্বারা ঘরের অবলম্বন গ্রহণ করেছে। তারা যদি যার যার ঘরের খুঁটি শতবার করে পরিবর্তন করে কিংবা খুঁটির গোড়ায় অনেক উঁচু করে মাটি দেয় তবুও বাণিটির মূলশিক্ষা বা উপকার পাওয়া সম্ভব নয়। ঠিক তেমনই “স্রাবস্তি ভজনালয়, পূর্ণিমায় সাঁই আসে যায়, মহাযোগ হলে উদয়, সহস্রবছর সে সাধনে।”- এরূপ বাণির ক্ষেত্রে শতবছর চান্দ্রিক পূর্ণিমা অনুযায়ী সাধন করলেও জগতের প্রতিপালক সাঁইয়ের দর্শনলাভ করা সম্ভব নয়।
দেহতত্ত্বকেন্দ্রিক রূপকসাহিত্যের মূলশিক্ষা উদ্ঘাটন করতে হলে বা এর দ্বারা উপকার গ্রহণ করতে হলে সাধককে অবশ্যই সৈরিক বা চান্দ্রিক পঞ্জিকার গণনা পরিত্যাগ করে দৈহিক পঞ্জিকার গণনা গ্রহণ করতে হবে। পরিশেষে বলতে চাই পবিত্র বেদ, রামায়ণ, মহাভারত, ত্রিপিটক, তৌরাত, যাবুর, জ্ঞানসাহেব, কুরান, হাদিস ও তাপসির এরূপ মহাগ্রন্থাদির মধ্যে ব্যবহৃত প্রায় সব পরিভাষার মূলক উপমিতরূপে কেবল মানবদেহে অবস্থিত। কী ব্রহ্মা বলি, কী কারাতারা বলি বা খামিসামা, কাঁই, ঈশ্বর, স্রষ্টা, আল্লাহ, খোদা, মাবুদ, মারাংবুরু সব পরিভাষারই মূলসত্তা উপমিতরূপে মানবদেহে বিদ্যমান। তাই শাস্ত্রীয় ও সাম্প্রদায়িক রূপকসাহিত্যের পরিভাষাদির অভিধাদি বাইরে না ঢুঁড়ে দেহের ভিতরে ঢুঁড়াই উত্তম। তাদৃশ সৈরিক বা চান্দ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী সর্ব প্রকার সাধনকর্ম পরিত্যাগ করে কেবল দৈহিক পঞ্জিকা অনুযায়ী সাধনকর্ম বা শাস্ত্রীয় কর্মাদি করা সবার একান্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন