বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

ইহকাল কী? (‘বর্তমানজনম’) (৫৭/২)

৫৭/২. ‘ইহকাল’ (‘বর্তমানজনম’ ৪র্থ পর্বের ২য় পর্ব বিশেষ)। এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ৫৭ নং ‘বর্তমানজনম’ মূলকের অধীন একটি ‘রূপকপরিভাষা’ বিশেষ। এর অন্যান্য সদস্যগুলো হচ্ছে- ১.বর্তমানজনম, ২.ইহকাল, ৩.ইহধাম ও ৪.ইহলোক। বলন কাঁইজির নির্মিত ‘আত্মতত্ত্ব ভেদ’ (৫ম খণ্ড) গ্রন্থে এ মূলকের অধীন অন্যান্য সদস্যগুলো সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
—————————————————————————————
ইহকাল
Armageddon life (আর্মাগেডান লাইফ)/ ‘ﺤﻴﺎﺓ ﺍﻠﻓﺎﻨﻴﺔ’ (হায়াতুল ফানিয়া)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির রূপকপরিবারের অন্যতম একটি ‘রূপকপরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘বর্তমানজনম’, উপমানপরিভাষা ‘ইহধাম’ এবং ছদ্মনামপরিভাষা ‘ইহলোক’
ইহকাল (রূপ)বি জীবিতকাল, এজন্ম, জন্ম হতে প্রয়াণকাল পর্যন্ত সময় (আবি)বি বর্তমানজনম, জীবিতকাল, Armageddon life (আর্মাগেডান লাইফ), ‘ﺤﻴﺎﺓ ﺍﻠﻓﺎﻨﻴﺔ’ (হায়াতুল ফানিয়া) বিপ পরকাল, ‘ﺍﺨﺮﺓ’ (আখিরাত) (আভা)বি এপার, ইহজনম (ব্য্য) পিতা-মাতার সন্তানরূপে বর্তমান জন্মগ্রহণ (আপ)বি হাশর (.ﺤﺸﺭ) (ইপ)বি regeneration (রিজেনারেশন) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘বর্তমানজনম’ পরিবারের ‘রূপকপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) বর্তমান জীবনকালকে ইহকাল বলা হয় (ছনা)বি ইহলোক (উপ)বি ইহধাম (রূ)বি ইহকাল (দেত)বি বর্তমানজনম {বাং.ইহ+ বাং.কাল}
‘ﻋﺎﺠﻠﺔ’ [আজিল্লা] বি ইহকাল, তাড়াতাড়ি, তাৎক্ষণাৎ, তাৎক্ষণিক {}
‘ﺍﺨﺮﺓ’ [আখিরাত] বি পরকাল, প্রয়াণোত্তরকাল {}
ইহকালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Armageddon life)
১. “ইহকালে ভোগ করে সুখ, পরে যদি হলো অসুখ, লালন বলে মনরে, মতবাদের জন্য অসুখ ভালো” (পবিত্র লালন- ২৪০/৪)
২. “ইহকালের পরে পরকাল, আছে সেথা হাজার আল, বলন কয় কাটরে বাঁধাল, বায়ু হাজারী সাধু সেজে” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৭৩)
৩. “থেকে সাধুর চরণতলে, স্থুলজ্ঞান সূক্ষ্ম হলে, পরকাল পাবি ইহকালে, বলন কয় ভেদখানা” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৩)
৪. “মান করো না ওগো রাধে, তোমায় করি মানা, মান করলে ইহকালে, তোমার কাছে কেউ যাবে না” (পবিত্র লালন- ৭৭৭/১)
৫. “মান ছেড়ে দাও ওগো রাধে, কৃষ্ণ কেঁদে কেঁদে কয়, কৃষ্ণ গেলে ইহকালে, তোমার কোন গতি নাই” (পবিত্র লালন- ৭৭৮/১)
৬. “মন সত্য সূক্ষ্মজগৎ বিনে পরকাল পাবি না, স্থুলজগৎ ইহকাল বলে অভিধানে রচনা” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৪৩)
ইহকালের সংজ্ঞা (Definition of Armageddon life)
বর্তমান জীবনকালকে ইহকাল বলে।
ইহকালের পরিচয় (Identity of Armageddon life)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘বর্তমানজনম’ পরিবারের অধীন একটি ‘রূপকপরিভাষা’ বিশেষ। বর্তমান জীবনকালকে ইহকাল বলা হয় বা প্রত্যেক মানবজনমকেই ইহকাল বলা হয়। মানবসন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করে জ্ঞানপ্রাপ্ত ও বয়োঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর আবার সন্তানরূপে জন্মগ্রহণ করাকে পরকাল বলা হয়। যেমন পিতা-পুত্রের ক্ষেত্রে পিতা ইহকাল এবং পুত্র পরকাল তদ্রূপ মাতা-কন্যার ক্ষেত্রেও মাতা ইহকাল ও কন্যা পরকাল।
শাস্ত্রীয় মতানুসারী পরা কেবল আত্মতত্ত্ব না জানা ও না বুঝার কারণেই বর্তমানকালকে ইহকাল বলে স্বীকার করলেও পরকাল বলতে যার যার সন্তানকে না বুঝিয়ে বরং যার যার প্রয়াণোত্তর অনন্তকালকে বুঝিয়ে থাকেন। এ কারণেই ইহকাল ও পরকাল নির্ণয় করা নিয়ে তাদের প্রায় গোলমেলে ও লেজে গোবরে বর্ণনা বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়।
অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এ যে বাংভারতের শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অনেক খুষ্ক পণ্ডিতই পার্থিবতার অর্থ ইহকাল বা সংসারজীবন বলে মনে করে থাকেন। তারা প্রায় বলেন যে- “পার্থিবতা পরিত্যাগ করতে না পারলে প্রভুর দর্শনলাভ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।” পার্থিবতা দ্বারা কী কী বুঝায়, সংসারজীবনের কতটুকুইবা বুঝায় তা তারা পরিষ্কার করে বলেন না। আবার কেউ কেউ পার্থিবতা বলতে সারাবিশ্বকেই বুঝে থাকেন। পার্থিবতা বলতে যারা বিশ্ব বুঝে থাকেন তারা পার্থিবতা ত্যাগ করবেন কিভাবে? পরিষ্কার কথা হলো পার্থিবতা বলতে কেবল উক্ত ১০টি বিষয়বস্তুই বুঝায়। উক্ত বিষয়াদি পরিত্যাগ করতে পারলেই প্রভুর দর্শনলাভ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠে। কিন্তু পার্থিবতা পরিভাষাটির অর্থ বা অভিধা গ্রহণ করতে ভুল করলে প্রভুর দর্শনলাভ করা কোনকালেই সম্ভব নয়।
শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা কেবল আত্মতত্ত্ব না জানা ও না বুঝার কারণেই বর্তমানকালকে ইহধাম বা ইহকাল বলে স্বীকার করলেও- পরকাল বলতে যার যার সন্তানকে না বুঝিয়ে বরং যার যার প্রয়াণোত্তরকালকে বুঝিয়ে থাকেন। এ কারণেই ইহধাম বা ইহকাল ও পরধাম বা পরকাল নির্ণয় করা নিয়ে তাদের প্রায় গোলমেলে ও লেজে গোবরে বর্ণনা-বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। আরবি ভাষায় ইহধাম বা ইহকালকে আলমে দুনিয়া (‘ﺪﻨﻴﺎ ﻋﺎﻟﻢ’) বলা হয়। এবং পরকালকে আলমে আখিরাত বলা হয়। যেমন পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে। “ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً” (রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনইয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানা)। হে প্রভু! আমাদেরকে ইহকালেও কল্যাণ দান কর এবং পরকালেও কল্যাণ দান কর” (কুরান, সুরা বাক্বারা- ২০১)
দুনিয়া [ﺪﻨﻴﺎ] (রূপ)বি পার্থিবতা, সংসার, ইহকাল, বিশ্ব, জগৎ, ব্রহ্মা-, ভূমণ্ডল, বিশ্বজগৎ, সৃষ্টিজগৎ, বর্তমানজীবন (প্র) ১.খাদ্য ২.পানীয় ৩.বসন ৪.সুগন্ধি ৫.বাহন ৬.নারী ৭.স্নান ৮.ঘুম ৯.আড্ডা ও ১০.অলসতা- এ দশটি বিষয়স্তুর সাথে অধিক সংশ্লিষ্ঠ থাকাকে আলমে দুনিয়া (‘ﺪﻨﻴﺎ ﻋﺎﻟﻢ’) বলে থাকেন {}
অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এ যে বাংভারতের শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক অনেক খুষ্ক পণ্ডিতই পার্থিবতার অর্থ ইহকাল বা সংসারজীবন বলে মনে করে থাকেন। তারা প্রায় বলেন যে- “পার্থিবতা পরিত্যাগ করতে না পারলে প্রভুর দর্শনলাভ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়।” পার্থিবতা দ্বারা কী কী বুঝায়, সংসার জীবনের কতটুকুইবা বুঝায় তা তারা পরিষ্কার করে বলে না। আবার কেউ কেউ পার্থিবতা বলতে সারা বিশ্বকেই বুঝেন বা বুঝিয়ে থাকেন। পার্থিবতা বলতে যারা সারা বিশ্ব বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন তারা পার্থিবতা ত্যাগ করবেন কিভাবে? পরিষ্কার কথা হলো পার্থিবতা বলতে ১.খাদ্য ২.পানীয় ৩.বসন ৪.সুগন্ধি ৫.বাহন ৬.নারী ৭.স্নান ৮.ঘুম ৯.আড্ডা ও ১০.অলসতা- মপ ১০টি বিষয় বস্তুর সাথে অধিক সংশ্লিষ্টতা বুঝায়। উক্ত বিষয়াদি পরিত্যাগ করতে পারলেই প্রভুর দর্শনলাভ করা অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠে। কিন্তু পার্থিবতা পরিভাষাটির অর্থ বা অভিধা গ্রহণ করতে ভুল করলে প্রভুর দর্শনলাভ করা কোন কালেই সম্ভব নয়।
যেমন একটি হাদিসের মধ্যে আছে, “ﺍَﻟﺪُّﻨْﻴَﺎ ﺤَﺮَﺍﻢُ ﻋَﻟٰﻰ ﺍَﻫْﻞِ ﺍﻻَﺨِﺮَﺓِ ﻮَ ﺍﻻَﺨِﺮَﺓُ ﺤَﺮَﺍﻢُ ﻋَﻟٰﻰ ﺍَﻫْﻞِ ﺍﻟﺪُّﻨْﻴَﺎ ﻮَ ﻫُﻤَﺎ ﺤَﺮَﺍﻤَﺎﻦِ ﻋَﻟٰﻰ ﺍَﻫْﻞِ ﺍﻟﻟَّﻪِ” উচ্চারণঃ “আদ্দুনিয়া হারামুন আলা আহলিল আখিরাতি, ওয়াল আখিরাতু হারামুন আলা আহালিদ দুনিয়া, ওয়া হুমা হারামানি আলা আহালিল্লাহ” অর্থ- “পরকার প্রত্যাশীদের জন্য ইহকাল নিষিদ্ধ, ইহকাল প্রত্যাশীদের জন্য পরকাল নিষিদ্ধ এবং কাঁই প্রেমিকদের (কাঁইজি) জন্য উভয় নিষিদ্ধ” (আলহাদিস)
অথচ বড় হাস্যকর বিষয় এই যে, আরবি এই দুনিয়া (ﺪﻨﻴﺎ) পরিভাষাটি দ্বারা বাংভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় কুরানীরা- কেউ বিশ্ব বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ সংসার বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ ইহকাল বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ কর্ম ব্যবসা রাজনীতি বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ সম্পদ ও নারী বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ শাস্ত্রীয় মতবাদ অমান্য করাকে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ অমুসলিমদের বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন, কেউ অকুরানিক কাজকর্মকে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন।
অথচ কুরানে “الْحَيَاةِ الدُّنْيَا” এরূপ কথা শতশত স্থানে রয়েছে। তবে ওপরোক্ত শাস্ত্রীয়রা কে কী বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন তা-ই পাঠকদের ভাববার বিষয়! আবার হিন্দি ভাষায় একটি গান শোনা যায়। যেটি হলো “দুনিয়াকা মজা লেলো দুনিয়া তুমহারি হ্যায়।” এখানে দুনিয়া বলতে কী বুঝানো হয়েছে এবং কতটুকু বুঝানো হয়েছে? আবার বাংলা ভাষায় একটি গান শোনা যায়। আর সেটি হলো-
“এই যে দুনিয়া কিসের লাগিয়া
এত যত্নে গড়াইয়াছেন সাঁই।
ছায়া বাজি পুতুলরূপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি পুতুলের কী দোষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি
তুমি খাওয়াইলে আমি খাই।
তুমি বেহেস্ত, তুমি দোজখ তুমি ভালো-মন্দ
তুমি ফুল তুমি ফল তুমি তাতে গন্ধ
আমার মনে এই আনন্দ,
কেবল আমি, তোমায় চাই।
হাকিম হইয়া হুকুম কর পুলিশ হইয়া ধর
সর্প হইয়া দংশন কর ওঝা হইয়া ঝাড়ো
তুমি বাঁচাও তুমি মার,
তুমি বিনে কেহ নাই।”
শিল্পী- আব্দুল আলীম
এই গানটির মধ্যে দুনিয়া অর্থইবা কী গ্রহন করা হয়েছে। দুনিয়া বলতে যদি সারা বিশ্ব বা বিশ্ব ব্রহ্মা- বুঝায় তবে দুনিয়া হতে বাঁচার উপায়ইবা কী? এরূপ জটিল সমস্যার উত্তর হলো- দুনিয়া নিয়ে কুরান, হাদিস, মরমীগীতি বা সাহিত্য যাই লেখা হোক না কেন, দুনিয়া পরিভাষাটির দ্বারা কখনোই সারাবিশ্ব বা বিশ্ব ব্রহ্মা- বুঝায় না। বরং দুনিয়া দ্বারা নির্দিষ্ট কিছু বিষয় বুঝায়- যা হতে আত্মরক্ষা করা যায়। আর সেই নির্দিষ্ট বিষয়াদি হচ্ছে- ১.খাদ্য ২.পানীয় ৩.বসন ৪.সুগন্ধি ৫.বাহন ৬.নারী ৭.স্নান ৮.ঘুম ৯.আড্ডা ও ১০.অলসতা- এই ১০টি বিষয়।
শাস্ত্রীয় পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকদের এরূপ মনগড়া ব্যাখ্যা-টীকা হতেই বর্তমানকালে সারা বিশ্বে সৃষ্টি হয়েছে শাস্ত্রীয় সন্ত্রাসবৃত্তি, শাস্ত্রীয় উগ্রবাদ ও শাস্ত্রীয় আতংবাদ। শাস্ত্রীয়দের এরূপ মানবতা বিধ্বংসী ব্যাখ্যা-টীকা হতে আত্মরক্ষা করতে হলে সমাজের সুশীল ও বুদ্ধিমানদের এখনি এগিয়ে আসা উচিৎ। আত্মদর্শন বা আত্মতত্ত্ব ভেদ ব্যাপক ভাবে প্রচার-প্রসার করতে স্বেচ্ছা আত্মনিয়োগ করা উচিৎ।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৫ম খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন