বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

৯৮/১৪. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘স্রষ্টা’

৯৮/১৪. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘স্রষ্টা’ (১৬ পর্বের ১৪তম পর্ব বিশেষ) (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মতত্ত্ব, আত্মদর্শন, দেহতত্ত্ব, পরম্পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, স্বরূপদর্শন, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন টীকা)
____________________________
স্রষ্টা
Maker (মেকার)/ ‘صانع’ (সনাউ)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ব্যাপকপরিবারের অন্যতম একটি ‘ছদ্মনামপরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘সৃষ্টিকর্তা’, রূপকপরিভাষা ‘কাঁই’, উপমানপরিভাষা ‘ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য’, চারিত্রিকপরিভাষা ‘অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ’ এবং অন্যান্য ছদ্মনামপরিভাষা ‘আদি, স্বায়ম্ভু ও হর’। এ পরিভাষাটি রূপকসাহিত্যের ‘মন’, ‘শত্রু’, ‘পালনকর্তা’ ও ‘সৃষ্টিকর্তা’ এ ৪টি বৈক্তিক সদস্যেরই ব্যাপক পরিভাষারূপে ব্যবহার হয়ে থাকে। এ জন্য বর্ণনার ক্ষেত্র অনুযায়ী এর সঠিকমূলক উদ্ঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন।
স্রষ্টা (রূপ)বি ১.বিধাতা, সর্বেসর্বা, সৃষ্টিকর্তা বিণ ধাতৃ, সর্বময়, সৃজক, আবিষ্কারক, উৎপাদক, উৎপাদনকারী, নির্মাণকারী, নির্মাতা, রচয়িতা, সৃষ্টিকারী, সর্বব্যাপী, বিশ্বব্যাপী, সর্বাত্মক, সর্বাধার, author (অথর) maker (মেকার), ‘صانع’ (সনাউ) ২.পিতা, জনক (আবি)বি অগ্নি, অনন্ত, অনাদি, অন্তর্যামী, আদিত্য, ঈশ্বর, কাঁই, কাজলা, কালা, কালাচাঁদ, কালিয়া, কালো, কালোভ্রমর, কালোমানিক, কালোশশী, কৃষ্ণ, কেলে, কেলেমানিক, কেলেসোনা, কেশব, কেষ্ট, ঘনশ্যাম, চিকনকালা, জগৎস্রষ্টা, দিবাকর, দ্যুমণি, পরমপুরুষ, পরমেশ্বর, প্রজাপতি, বিবস্বান, বিরিঞ্চি, বৈবস্বত, বৈশ্বানর, ব্রজকিশোর, ব্রজদুলাল, ব্রজমোহন, ব্রজসুন্দর, ব্রহ্মা, মহাপ্রভু, মুরারী, শ্যাম, শ্যামল, শ্যামলা, সূর্য, সৌরি, স্বায়ম্ভু, হিরন্ময় (ইদৈ)বি Lord (লর্ড), maker (মেকার), designer (ডিজাইনার), creator (ক্রিয়েটর), architect (আর্কিটেক্ট) (আদৈ)বি খালিক্ব (.ﺨﺎﻟﻖ), আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সাধারণত সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে স্রষ্টা বলা হয় ২.রূপকসাহিত্যে জীব সৃষ্টির অনুঘটককে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
স্রষ্টার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of maker)
১. “আউলদের স্রষ্টা ধনী, বাউলদের সাঁই শুনি, লালন কয় সাঁই গুণমণি, তারে পাব কোন্ সাধনে” (পবিত্র লালন- ৪৫১/৪)
২. “কুরানীদের দর্শনবিধি, আত্মা স্রষ্টার প্রতিনিধি, আত্মা হয় পাপী যদি, সৃষ্টিকর্তাই পাপী হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৩)
স্রষ্টার সংজ্ঞা (Definition of maker)
সাধারণত সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে স্রষ্টা বলে।
স্রষ্টার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of maker)
রূপকসাহিত্যে জীব সৃষ্টির অনুঘটককে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলে।
স্রষ্টার প্রকারভেদ (Classification of maker)
স্রষ্টা প্রথমত দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান স্রষ্টা ও ২.উপমিত স্রষ্টা।
১. উপমান স্রষ্টা (Analogical maker)
সাধারণত সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে উপমান স্রষ্টা বলে।
২. উপমিত স্রষ্টা (Compared maker)
রূপকসাহিত্যে জীব সৃষ্টির অনুঘটককে উপমিত স্রষ্টা বলে।
স্রষ্টা আবার দুই প্রকার। ১.প্রকৃত স্রষ্টা ও ২.নির্মিত স্রষ্টা।
১. প্রকৃত স্রষ্টা (Real/ Genuine maker)
কোন কিছু আবিষ্কার বা সৃষ্টিকর্তাকে প্রকৃত স্রষ্টা বলে। যেমন- কম্প্রিউটার স্রষ্টা ব্যাবেজ, রেডিও স্রষ্টা মার্কোনি ও টেলিস্কোপ স্রষ্টা গ্যালিলিও।
২. নির্মিত স্রষ্টা (Artificial/ personified maker)
শাস্ত্রীয় বা সাম্প্রদায়িক সৃষ্টিকর্তাগুলোকে নির্মিত স্রষ্টা বলে। যেমন- ঈশ্বর, কাঁই, কারাতারা, খামিসামা, ব্রহ্মা, মারাংবুরু, Lord (লর্ড) ও আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ)।
এছাড়া আবার স্রষ্টা দুই প্রকার। যথা- ১.জাগতিকস্রষ্টা ও ২.পারম্পরিকস্রষ্টা। নিচে এদের পার্থক্যাদি তুলে ধরা হলো।
জাগতিকস্রষ্টা ও পারম্পরিক স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between mundane creator and sequential creator)
জাগতিক স্রষ্টা
পারম্পরিক স্রষ্টা
১. সারা জগতের সৃষ্টিকর্তাকে জাগতিকস্রষ্টা বলে। যেমন- শক্তি।
১. শুধু জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলে। যেমন- শুক্র।
২. জাগতিকস্রষ্টা সৃষ্টিজতের সর্বত্র বিরাজিত।
২. পারম্পরিক স্রষ্টা কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. একে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা যায় না।
৩. একে সৃষ্টি ও ধ্বংস করা যায়। যেমন- ধান ও ডিম সিদ্ধ করে ভ্রূণ শক্তি বিনষ্ট করা যায়।
৪. এর আকার, আকৃতি, রূপ ও বর্ণ কিছুই নেই।
৪. এর আকার, আকৃতি, রূপ ও বর্ণ সবই আছে।
৫. দর্শনশাস্ত্র, জ্যোতিষশাস্ত্র, বিজ্ঞান, মরমী ও আধ্যাত্মিকগ্রন্থ গ্রন্থিকায় এর কোন বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায় না।
৫. বিজ্ঞান, দার্শনিক, মরমী ও আধ্যাত্মিকগ্রন্থ গ্রন্থিকায় এর ব্যাপক বর্ণনা ও বিবরণ পাওয়া যায়।
৬. কেবল অন্ধবিশ্বাস ব্যতীত এর সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও সাধনভজন কিছুই নেই।
৬. এর সুনির্দিষ্ট পরিচয় ও সাধন-ভজন সব কিছুই আছে।
৭. বৈষয়িক সাহিত্যে একে শক্তি, জ্ঞান ও প্রকৃতি ইত্যাদি বলা হয়।
৭. রূপকসাহিত্যে একে- কাঁই, ঈশ্বর, ব্র‏হ্মা, লর্ড ও আল্লাহ বলা হয়।
৮. এর ইংরেজি অনুবাদ ক্রিয়েটর (creator) ও আরবি অনুবাদ খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ)।
৮. এর ইংরেজি অনুবাদ লর্ড (Lord) ও আরবি অনুবাদ আল্লাহ (اللَّهُ)।
৩. পারম্পরিক স্রষ্টা (Sequential creator)
পরম্পর বিণ পরপর, ধারানুযায়ী, ক্রমান্বয়ে, অনুক্রমাগত, একের পর অন্য।
পরম্পরা (রূপ)বি ১.গ্রন্থনা, আনুপূর্ব, যথাক্রম, ক্রমান্বয়, অনুক্রম, ধারা, পরম্পর ধারাবাহিকতা ২.series, sequence, catena, string, concatenation, chain, category, spectrum ৩.‘سلسلة’ (সিলসিলা), ‘السلسلة’ (আসসিলসিলা), ‘تسلسل’ (তুসালসিলু), ‘مسلسل’ (মুসালসাল), ‘مسلسلات’ (মুসালসিলাত), ‘سلاسل’ (সালালাল) (প্র) আদিকাল হতে গুরু ও শিষ্যের মাধ্যমে যে আধ্যাত্মিকজ্ঞান চলে আসছে।
পারম্পরিক বিণ ১.পরবর্তী, অনুবর্তী, অনুক্রমিক, প্রথাসিদ্ধ, প্রয়োগসিদ্ধ ২.sequent, sequential, traditional, classical ৩.‘متتابع’ (মুতাতাবা), ‘متسلسل’ (মুতাসালসাল), ‘تسلسلي’ (তাসালসুলি), ‘متتابعة’ (মুতাতাবায়া), ‘متسلسلة’ (মুতাসালসালা), ‘تقليدي’ (তাক্বলিদি) (প্র) পরম্পরা জ্ঞানধারী, পরম্পরা বিদ্যায় পারদর্শী, পরম্পরা জ্ঞানের ধারক-বাহক সাধু-মহৎ।
পারম্পরিক স্রষ্টার সংজ্ঞা (Definition of sequential creator)
রূপকসাহিত্যে কাঁইকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলে।
পারম্পরিক স্রষ্টার পরিচয় (Identity of sequential creator)
যে স্রষ্টা সারাজগৎ সৃষ্টি করেছেন আজ পর্যন্ত তার কোন পরিচয় কেউই আবিষ্কার করতে পারেননি। কী দার্শনিক কী বৈজ্ঞানিক বা কী জ্যোতির্বিদ কেউই জাগতিক স্রষ্টার সুনির্দিষ্ট কোন বর্ণনা প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি বিধায় তার কোন বর্ণনাও পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদে যার যার শাস্ত্রীয়স্রষ্টার ব্যাপক বর্ণনা পাওয়া যায়। শাস্ত্রীয় লোকজন তাদের স্বস্ব শাস্ত্রীয়স্রষ্টার কিছু না কিছু পরিচয় অবশ্যই জানেন। বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টার বর্ণনাদি হতে দেখা যায় এক শাস্ত্রীয় মতবাদের স্রষ্টার সাথে অন্য শাস্ত্রীয় মতবাদের স্রষ্টার কোন মিল নেই। এ হতেই বুঝা যায় শাস্ত্রীয় স্রষ্টার সৃষ্টি ও নির্মাণ নিতান্তই শাস্ত্রীয় মতানুসারী রূপকারদের মনগড়া। শাস্ত্রীয় মতানুসারিরাই তাদের প্রয়োজনে স্রষ্টা নির্মাণ করে তার পূজা অর্চনা করার নিয়মাবলী নির্মাণ করেছেন। অন্যদিকে পারম্পরিক মনীষিগণ জাগতিক স্রষ্টা ও শাস্ত্রীয়স্রষ্টা নামক ‘bogus boo’ (বোগাস বো) পরিত্যাগ করে সত্য, সঠিক ও চরম বাস্তবতার নিরীক্ষে স্রষ্টা সমস্যার চিরন্তন সমাধান প্রদান করেছেন। পারম্পরিকদের নির্মিত মতবাদটি সবার আগে সৃষ্টি এবং এখনো স্বভূমিকা ও স্বকীয়তা নিয়ে সারাবিশ্বের আত্মতাত্ত্বিক বৈষ্ণব, সহজিয়া, মরমিয়া ও বাউলদের মধ্যে দিব্যমানভাবে আজো টিকে রয়েছে।
মরমিকবি ও আত্মতাত্ত্বিকগণ স্রষ্টা পরিভাষাটির ওপরোক্ত তিনটি অভিধার কোনটিই গ্রহণ করেননি এবং এসব অভিধা দ্বারা রূপকসাহিত্য কিংবা আধ্যাত্মিকসাহিত্যও রচনা করেননি। তারা মনে করেন যে তাদের স্রষ্টা চরম বাস্তব এবং তার অস্তিত্ব অবশ্যই রয়েছে। অস্তিত্বহীন কোন নিরাকার বিষয় বস্তুকে স্রষ্টা বলা ও মেনে নেওয়া বোকামির সর্ব নিম্নস্তর বৈ নয়। যেহেতু স্রষ্টাকে ধরা ও ছোঁয়া যায় না। সেহেতু স্রষ্টাকে নিয়ে কোন কিছু আলোচনাও পরাবিদ্যা বা আধ্যাত্মিকবিদ্যা বা রূপকসাহিত্যের বিষয়বস্তুও নয়। বিশ্বের সব রূপকসাহিত্যে যার আলোচনা করা হয়েছে বর্তমানেও করা হচ্ছে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত করা হবে তিনি হলেন স্বায়ম্ভু। যার আধ্যাত্মিকনাম বাংলাভাষায় কাঁই, সংস্কৃতভাষায় ব্রহ্মা, আরবি ভাষায় আল্লাহ (আ.ﺍﻠﻠﻪ) এবং ইংরেজি ভাষায় লর্ড (Lord)।
রূপকার ও গ্রন্থকারগণ স্বস্ব শাস্ত্রীয়স্রষ্টার যতরূপ বর্ণনাই করুণ না কেন সবাই তাঁর আবাস্থল মানবদেহ বলেই উল্লেখ করেছেন। এ হতে আরো বুঝা যায়- রূপকার ও গ্রন্থকারগণ মানবদেহের এরূপ একটি সত্তাকে স্রষ্টারূপে বুঝাতে চান যে, যাকে সাধনবলে ধরা যায় ও যার সাধন ও ভজন করা যায়। পারম্পরিক স্রষ্টাকে দেখা না গেলে ও ধরা না গেলে- রূপকার ও গ্রন্থকারগণ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কেনইবা এতসব বর্ণনা বা আলোচনা করতে প্রয়াস করবেন? বিশ্বের প্রায় সব পরম্পরামতবাদে পারম্পরিক স্রষ্টার বসতবাড়ির একটা রূপকবর্ণনাও পাওয়া যায়। যেমন- পবিত্র লালনে বলা হয়েছে- “যেখানে সাঁইয়ের বারামখানা, শুনলে মন চমকে উঠে, দেখতে যেমন ভুজঙ্গনা” (পবিত্র লালন- ৮২৮/১)।তদ্রূপ পবিত্র কুরানে বলা হয়েছে-
“اللَّهُ نُورُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ مَثَلُ نُورِهِ كَمِشْكَاةٍ فِيهَا مِصْبَاحٌ الْمِصْبَاحُ فِي زُجَاجَةٍ الزُّجَاجَةُ كَأَنَّهَا كَوْكَبٌ دُرِّيٌّ يُوقَدُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ زَيْتُونِةٍ لَا شَرْقِيَّةٍ وَلَا غَرْبِيَّةٍ يَكَادُ زَيْتُهَا يُضِيءُ وَلَوْ لَمْ تَمْسَسْهُ نَارٌ نُورٌ عَلَى نُورٍ يَهْدِي اللَّهُ لِنُورِهِ مَنْ يَشَاءُ وَيَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ لِلنَّاسِ وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ”
উচ্চারণঃ “আল্লাহ নূরুছ সামাওয়াতি ওয়াল আরদি, মাসালু নূরিহি কা মিসকাতি ফিহা মিসবাহুন, আল মিসবাহু ফি ঝুজাজাতি, আঝঝুজাজাতু কায়ান্নাহা কাউকাবুন। দুররিউয়্যু ইউক্বাদু মিন শাজারাতিম মুবারাকাতিন ঝাইতুনা। লা শারকিয়াতিউ ওয়া লা গারবিয়া। ইয়াকাদু ঝাইতুহা ইউদিউয়্যু ওয়া লাউ লাম তামসাসহু নার, নূরুন আলা নূর। ইয়াদি আল্লাহু লিনূরিহি মাই ইশাউ ওয়া ইয়াদরিবুল্লাহুল আমসালা লিন্নাছি, ওয়াল্লাহু বিকুল্লি শাইয়িন আলিম” অর্থ- “কাঁই আকাশ ও পৃথিবীর জ্যোতি। সে জ্যোতির উদাহরণ যেমন একটি বাতিদানের মধ্যে আলোক বর্তিকা। সে আলোক-বর্তিকাটি একটি চিমনির মধ্যে রয়েছে। চিমনিটি দেখতে ঠিক তারকার মতো। যা কল্যাণময় জলপাই গাছের তেল দ্বারা প্রজ্জ্বলিত হয়। তা পূর্বেও নয় আবার পশ্চিমেও নয়। অগ্নিস্পর্শ হওয়া ছাড়াই তা জ্বলে উঠার চেষ্টা করে। তা যেন জ্যোতির ওপর জ্যোতি। কাঁই তাঁর জ্যোতির দ্বারা যাকে ইচ্ছে পথ প্রদর্শন করেন। কাঁই মানুষের জন্য উপমাদি নির্মাণ করেন। কাঁই সর্ববিষয়ে সুবিজ্ঞ” (কুরান, নূর- ৩৫)
এসব আলোচনা হতে রূপকপরিভাষাদির মূলক উদ্ঘাটন করে দেখা যায় কাঁই, ব্র‏হ্মা, লর্ড (Lord) ও আল্লাহ (اللَّهُ) মাবদেহের মূলাধার চক্রেই অবতরণ করেন এবং সেখানেই অবস্থান করেন। বিশিষ্ট সাধকগণ সাধনবলে তাঁর দর্শনলাভ করে কাঁইজি, ব্রা‏হ্মণ, ব্র‏‏হ্মচারী, Lordship, Mastership, ‘مسترشيب’ (মুস্তারাশিব) বা ওলিউল্লাহ (ﻮﻟﻰ ﺍﻟﻟﻪ) উপাধিলাভ করেন। পক্ষান্তরে জাগতিক স্রষ্টা ও শাস্ত্রীয়স্রষ্টার কোন রূপরেখা নেই। তাই তার অবস্থানও পাওয়া যায় না বিধায় তাঁর বর্ণনাও কেউ করতে পারেন না। যাকে দেখা যায় না, যাকে ধরা যায় না, তার বর্ণনাও পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে পারম্পরিক স্রষ্টাকে ধরা যায়, তাকে দেখা যায় বিধায় তাঁর বর্ণনাও পাওয়া যায়। পারম্পরিক স্রষ্টাকে ধরা যায় বিধায় বিশ্বের বিভিন্ন পারম্পরিক গ্রন্থ গ্রন্থিকার মধ্যে তাঁকে ধরার জন্য বিভিন্ন প্রকার সাধন পদ্ধতির বর্ণনা করা হয়েছে। স্রষ্টাকে সাধনবলে ধরাই না গেলে- শাস্ত্রীয় গোত্রে গোত্রে এতসব সাধন পদ্ধতির আবিষ্কার করারইবা কী প্রয়োজন ছিল?
তুলনামূলক আলোচনায় এসে বলা যায়- জাগতিক স্রষ্টা বিশ্বব্র‏হ্মাণ্ডের সর্বত্র বিরাজিত এবং তাকে সাধনবলে ধরা ও ছোঁয়া যায় না। এ জন্য কেউ তার বর্ণনাও করেননি। এমনকি বিশ্বের কোন গ্রন্থেই তার বর্ণনা পাওয়া যায় না। তবে জাগতিক স্রষ্টা সম্পর্কে কোন কোন দার্শনিক শুধু এতটুকু বলেছেন যে- বিশ্বজগতের স্রষ্টা বলে যদি কিছু থেকেই থাকেন তবে তা অবশ্যই হবে ‘জ্ঞান’। অর্থাৎ জ্ঞানকেই দার্শনিকগণ স্রষ্টা বলে থাকেন। যেহেতু জ্ঞান ব্যতীত কিছুই সৃষ্টি করা যায় না বিধায় তাঁরা জ্ঞানকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। অন্যপক্ষে বিজ্ঞানিগণ বলেন যে শক্তিই স্রষ্টা। যেহেতু সব কিছুরই সর্বশেষরূপ হলো শক্তি। শক্তিই ক্রমান্বয়ে শীতল হয়ে বায়বীয় বা নিরাকাররূপ প্রাপ্ত হয়। অতঃপর আরো শীতল হয়ে তরল বা সাকাররূপ প্রাপ্ত হয় এবং সর্বশেষে কঠিনরূপলাভ করে। শক্তির ঊর্ধ্বে কিছুই নেই। এ জন্য বিজ্ঞানিগণ শক্তিকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। বস্তুবাদী গবেষকগণ একমাত্র প্রকৃতিকেই স্রষ্টারূপে জানেন ও বুঝেন। তাদের ধারণা হলো প্রকৃতিই জগতের স্রষ্টা এবং প্রকৃতিই জগতের পালনকর্তা। প্রকৃতি নিজেই সব কিছু সৃষ্টি করে ও লালনপালন করে থাকে। এছাড়াও বস্তুবাদী বিজ্ঞানিগণ ‘প্রমজ্ঞাশচুচাতা’ অর্থাৎ- ১. প্রকৃতি, ২. মন, ৩. জ্ঞান, ৪. শক্তি, ৫. চুম্বক, ৬. চাপ ও ৭. তাপ বা ‘NMKEMPT’ (নমকিমপিটি) অর্থাৎ ১. Nature, ২. Mind, ৩. Knowledge, ৪. Energy, ৫. Magnet, ৬. Power ও ৭. Temperature- এ সপ্ত ভৌতিক স্রষ্টার কথাও স্বীকার করে থাকেন।
জাগতিক স্রষ্টা যেহেতু ইদ্রিয়গ্রাহ্য কোন কিছু নয়। এ জন্য তার ব্যাপারে এর অধিক কিছু বলা সম্ভব নয়। অন্যদিকে পারম্পরিক স্রষ্টা একমাত্র জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত। যদিও শাস্ত্রীয়স্রষ্টা উদ্ভিদ ও প্রাণী উভয় কুলের মধ্যেই বিরাজিত বলে, শাস্ত্রীয় মতানুসারী পণ্ডিতরা বড় গলায় প্রচার করে থাকেন। একমাত্র তাঁর সাধন ও ভজন করার জন্যই তাঁকে পুনঃপুন পরিচিত করানো হয়। তবে বিভিন্ন শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও মরমী সঙ্গীতাদির মধ্যে যে স্রষ্টার পরিচয় পাওয়া যায় তা একমাত্র মানুষের মধ্যে যথাযথভাবে পাওয়া যায়। মানুষের মধ্যেই তাঁকে পাওয়া যায় বলে পারম্পরিক স্রষ্টা একমাত্র মানুষের মধ্যেই যথাযথভাবে বিরাজিত এ কথাও বলা যায়। সুবিজ্ঞ সাধকগণ তাঁকে সাধনবলে উদ্ঘাটন বা আহরণ করতে পারেন। এবার পরিচয় স্বরূপ এও বলা যায় যে- জীবের জীবনিশক্তি হতে উদ্ভত ও জীবের প্রজননশক্তি বহনকারী এক প্রকার মানবজলকে পারম্পরিক স্রষ্টা বলা হয়। পুত্র সন্তানের দাড়ি ও মুচ উদ্গমনের পর তার দেহে প্রজননশক্তি প্রবেশ করে থাকে। কন্যা সন্তানের রজ আগমনের পর তার দেহেও এ প্রজননশক্তির উৎপত্তি হয়ে থাকে।
ছেলেদের ক্ষেত্রে দাড়ি ও মুচ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে রজ আগমনের পূর্বে এ প্রজননশক্তির উৎপত্তি হয় না বিধায় দাড়ি ও মুচ উদ্গমনের পূর্বে ছেলেদের সঙ্গমের দ্বারা গর্ভে কোন সন্তান বা ভ্রূণ সৃষ্টি হয় না। তদ্রূপ রজ আগমনের পূর্বে কিশোরিরা সঙ্গম করলেও গর্ভে কোন সন্তান সৃষ্টি হয় না। অর্থাৎ দাড়ি ও মুচ উঠার পূর্বে ছেলেদের ও রজ আগমনের পূর্বে মেয়েদের মধ্যে প্রজননশক্তি সৃষ্টি হয় না। এ প্রজননশক্তি না থাকলে কখনই সন্তান সৃষ্টি হয় না বিধায় বলা যায় প্রাণিকুলের মধ্যে প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদকুলের মধ্যে অংকুরোদ্গমশক্তির আধাররূপ রসকেই পারম্পরিক স্রষ্টা বলা যায়।
উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রায় সব প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে সবুজবর্ণ তিরোহিত হয়ে সোনালিবর্ণ ধারণের পর তার অংকুরোদ্গমনশক্তির উৎপত্তি হয়। অর্থাৎ উদ্ভিদের অংকুরোদ্গম শক্তিকেই উদ্ভিদের স্রষ্টা বলা হয় বিধায় অধিকাংশ উদ্ভিদের সোনালিবর্ণ ধারণের পূর্বে বা ফল পাকার পূর্বে কাচা বীজ বা সবুজবীজ ধারণ করে পরবর্তিকালে তা রোপণ করলে সে বীজে অংকুর গজায় না। অর্থাৎ বীজের সোনালিবর্ণ ধারণের পূর্বে উদ্ভিদের মধ্যে অংকুরোদ্গম বা পুনরুত্থান বা পুনরুদ্গমশক্তি সৃষ্টি হয় না। এ পুনরুদ্গমশক্তি ভিন্ন উদ্ভিদের সৃষ্টি ও বংশবৃদ্ধি হয় না। পারম্পরিকরা উদ্ধিদের এ শক্তিকেই স্রষ্টা বলে থাকেন। কিন্তু গোঁড়া ও অন্ধবিশ্বাসী শাস্ত্রীয় মতানুসারিরা তাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, যম, স্বর্গ ও নরক কিছুই চিনেন না। এ জন্য তারা অল্পতেই রেগে যান এবং ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমে ব্যতিব্যস্ত থাকেন। এ না বুঝা হতেই শাস্ত্রীয় সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্র মৌলবাদের উৎপত্তি। উদ্ভিদকুলের অংকুরোদ্গমশক্তি বহণ করে এক প্রকার সুপেয়রস। মৌমাছি এ রস সংগ্রহ করে চাকে সঞ্চয় করলে তাকে মধু বলা হয়। এ মধুর মধ্যেই উদ্ভিদের প্রাণশক্তি বা অংকুরোদ্গমশক্তি নিহিত থাকে বিধায় সব চিকিৎসক বলে থাকেন যে মধুর চেয়ে পুষ্টিকর ও উপাদেয় খাদ্য পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। স্বয়ং স্রষ্টা যার মধ্যে দ্রবিভূত থাকে তার চেয়ে উত্তম আর কিবা হতে পারে?
তদ্রূপ প্রাপ্তবয়স্ক নরগণের শুক্রের মধ্যে দ্রবিভূত থাকে স্বয়ং স্রষ্টা। এ জন্য এর চেয়ে পুষ্টিকর ও উপাদেয় খাদ্য পৃথিবীতে আর থাকতে পারে না। তাদৃশ রজস্বলা নারীদের স্বাধিষ্ঠানচক্রে প্রতি মাসে মাসেই নির্দিষ্ট সময়ে শ্বেত ও কৃষ্ণ বর্ণের দুই প্রকার জল অবতরণ করে থাকে- যার মধ্যে স্বয়ং স্রষ্টাশক্তি আকারে দ্রবিভূত থাকেন। এ দু’টি অমৃতধারাকেই প্রকৃত অমৃতসুধা বা মানবজল বা জীবজল বলা হয়। এছাড়াও প্রসবোত্তর রমণিদের মধ্যে দুগ্ধ নামক অন্য একটি অমৃতসুধাও অবতরণ করে থাকে। রমণিদের স্তন নিঃসৃত দুগ্ধকেও জীবজল বা মানবজল বলা হয়। মধু, শুক্র ও সুধার মধ্যে স্বয়ং স্রষ্টা শক্তিরূপে দ্রবিভূত থাকেন বলে রূপকসাহিত্যে এসব জলকে স্রষ্টা বলা হয়। এছাড়া অধিকাংশ গবেষকদের ধারণা একমাত্র জল হতেই সবকিছু সৃষ্টি বিধায় জলই জীবের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা। অবিশ্বাস্য হলেও চিরন্তন সত্য যে, এ ত্রি-জলকে ধারণ, গ্রহণ, সাধন ও ভজনের রূপকবর্ণনাই হলো- বিশ্বের সব শাস্ত্রীয়গ্রন্থ ও মরমী গ্রন্থগ্রন্থিকা।
প্রসঙ্গক্রমে আবারও বলতে হয় স্রষ্টা বর্তমান জীব সৃষ্টি ক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন না এবং তার জীব সৃষ্টিক্রিয়ার অনুঘটক প্রতিনিধি স্বায়ম্ভু ও নিজে কোন জীব সৃষ্টি করতে পারেন না। ফলে জীবের সৃষ্টিকর্তাকে চেনার অর্থ যার যার আপন পিতাকে চেনা এবং উপাস্য চেনা অর্থ স্বায়ম্ভুর জীব সৃষ্টির অনুঘটক সদস্য সাঁই ও কাঁইকে চেনা। উপাস্যরূপে পিতা নয়, স্রষ্টাও নয় বরং সাঁই ও কাঁই। স্থূলজ্ঞানী ও শাস্ত্রীয় সংস্কারের নীতিমালার ধ্বজাধারিগণ নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে প্রত্যক্ষ বোকামি করে সাধারণ মানুষকে বিপথগামী করে চিরান্ধকারের পথে ঠেলে দিয়ে আসছে বরাবরই। বিশ্বের কোন মহাগ্রন্থে নিরাকার স্রষ্টার উপাসনার ধুয়া দিয়ে অযথা অন্ধকারে ঢিল ছুড়তে বলা হয়নি। আমাদের এ ক্ষুদ্র পরিসর জীবনে যাকে ধরা যায় ও সাধন ভজন দ্বারা যাকে অর্জন করা যায় এরূপ উপাস্য সাঁই ও কাঁইয়ের উপাসনা করেই তো শেষ করা যায় না। আর যাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না ও সাধন-ভজন করেও পাওয়া যায় না এরূপ নিরাকার উপাস্যের উপাসনা মানুষ করবে কোন্ সময়ে?
স্রষ্টার পরিচয় (Identity of maker)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের অধীন একটি ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ বিশেষ। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকায় এর ন্যূনাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এ পরিভাষাটি একেক গ্রন্থে একেক ভাষায় ব্যবহার হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠক- শ্রোতাদের তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। স্রষ্টা সমস্যাই এক বিরাট সমস্যা। এ সমস্যাটি যার সমাধান হয়েছে তার সর্ব সমস্যার সমাধান হয়েছে। অন্যদিকে স্রষ্টা সমস্যার সমাধান যার হয়নি তার কোন সমস্যারই সমাধান হয়নি।
সৃষ্টিকর্তার আলোচনার সন্ধিক্ষণে এসে আমরা শক্ত করে বলতে পারি অন্যান্য শিল্পের মতো রূপকসাহিত্যও একটি শিল্প। এ সাহিত্যের সুনিপুণ শিল্পীরাই যুগে যুগে সৃষ্টি করেছেন শাস্ত্রীয় স্রষ্টা। যুগ, শতাব্দ ও সহস্রাব্দ পেরিয়ে কিংবদন্তির পর কিংবদন্তি দ্বারা সুশোভিত হয়ে শাস্ত্রীয়দের নির্মিত স্রষ্টাই আজ গণমানুষের নিকট বাস্তব স্রষ্টায় পরিণত হয়েছে। যেমন শতাব্দ ও সহস্রাব্দের সোপানে চড়ে উপন্যাস হয়ে উঠে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ (ধর্মগ্রন্থ), নদী হয়ে উঠে লোকালয়, সাগরও গড়ে উঠে বনভূমিরূপে, ধুধু প্রান্তরও গড়ে উঠে সুরম্য নগররূপে।
ভাত, রুটি ও আলু কিভাবে চোখের পুত্তলি, চুল, নখ, ত্বক, রক্ত, রস, মাংস ও হাড় রূপে রূপান্তর হয়। তারপর স্থূল এসব বস্তু হতে আবার কিভাবে নিরাকার মন ও জ্ঞানের উদ্ভব হয়? এসব দিশেই যাদের নেই তারা আবার স্রষ্টার সন্ধান করতে চান! এসব কারণেই মহাত্মা লালন সাঁইজি বলেছেন, “আত্মতত্ত্ব যে জেনেছে, দিব্যজ্ঞানী সে হয়েছে।” আর আমাদের কথা হলো- “আত্মতত্ত্ব যিনি না জেনেছেন, তিনি মায়ের গর্ভে আছেন।” বিদায়ক্ষণে এতটুকু বলে শেষ করতে চাই যে, আত্মতত্ত্ব না জানলে কখনই স্রষ্টার সন্ধানলাভ করা যায় না।
শাস্ত্রীয় সৃষ্টা নির্মাণ পদ্ধতি
(Schismatical creator construction method)
রূপকসাহিত্য নির্মাণ এবং রূপকপরিভাষাদির জন্ম-পরিচয় ও জীবনী নির্মাণ একটি যুগান্তরকারী শিল্প। এ শিল্পের নাম রূপকসাহিত্য শিল্প। বর্তমান বিশ্বে যত প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতবাদ রয়েছে এবং এসবের অনুকূলে যতগুলো গল্পকাহিনি রয়েছে তা সবই এ শিল্পের মাধ্যমেই নির্মিত হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২,৫০০টিরও অধিক স্বয়ং সম্পূর্ণ শাস্ত্রীয় মতবাদ রয়েছে। আবার এসব শাস্ত্রীয় মতবাদের অনুকূলে প্রায় পাঁচলক্ষাধিক (৫,০০,০০০) পারম্পরিক মতবাদ রয়েছে। সব মতবাদেরই একটি করে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, নগরকর্তা, সংহারকর্তা, আদিমানব, আদিমানবী ও বর্থ্য রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে পাপ, পুণ্য, স্বর্গ ও নরক।
অত্যন্ত মজার ব্যাপার হলো এক শাস্ত্রীয় মতবাদের সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, নগরকর্তা, সংহারকর্তা, আদিমানব, আদিমানবী ও বর্থ্য এবং পাপ, পুণ্য, স্বর্গ ও নরক ইত্যাদির সাথে অন্য মতবাদের এসব উপাদানের অবিকল মিল নেই। এর কারণ একেক রূপকার একেকভাবে নিজস্ব মনের রঙতুলি দ্বারা এসব নির্মাণ করেছেন। যেমন পুরাণীদের নির্মিত স্রষ্টা ‘ব্র‏হ্মা’ ও কুরানীদের নির্মিত স্রষ্টা ‘আল্লাহ’। ব্র‏হ্মার ঔরসজাত সন্তানাদি নির্মাণ করা না হলেও তাঁর মানসপুত্র ও মানসীকন্যা অনেক নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু কুরানীদের আল্লাহর ঔরসজাত কিংবা মানসসন্তান কিছুই নির্মাণ করা হয়নি। ব্র‏হ্মার ব্যাপারে নির্মাণ করা হয়েছে তিনি বিশ্বজগতের সব কিছুই কেবল মন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আল্লাহর ব্যাপারে নির্মাণ করা হয়েছে তিনি প্রেমাসক্ত হয়ে নিজের জ্যোতি হতে আংশিক জ্যোতি সর্ব প্রথমে ভিন্ন করেছেন। সে ভিন্ন জ্যোতি হতেই জ্যোতি পৃথকীকরণ প্রযুক্তি দ্বারা এ বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন। এমনিভাবে একেক শাস্ত্রীয় মতবাদের সৃষ্টিকর্তার একেক প্রকার বিশ্ব নির্মাণপদ্ধতি ও একেক প্রকার তাদের চরিত্র পাওয়া যায়।
যৌক্তিক কারণে বলতে হয় কোন রূপকার তো সৃষ্টিকর্তার বাড়ির নিমন্ত্রিত অতিথিও নন কিংবা সৃষ্টিকর্তাও কোন রূপকারের বাড়ির চা-চক্রের নিমন্ত্রিত অতিথিও নন। তবে রূপকাররা সৃষ্টিকর্তাগণের সৃষ্টিকার্যাদি হতে আরম্ভ করে তাদের গঠনগাঠন, আসন-বসন, আহার-বিহার, সন্তান-সন্ততি ও প্রেম-রাগ সবকিছুই অবিকল বলে দিলেন কিভাবে? যদি দৈববাণী বা ঐশিবাণী যোগেই এসব বলা হতো তবে সারাবিশ্বের সব বর্ণনা একই হতো। এরূপ প্রশ্নের উত্তর হলো এসব কেবলই রূপকসাহিত্যের সূত্রাদি দ্বারা এবং রূপকসাহিত্য শিল্প দ্বারাই নির্মিত।
এবার আমরা নতুন একটি স্রষ্টা নির্মাণকার্য আরম্ভ করব। সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখব যাতে করে আমাদের নয়া স্রষ্টা বিশ্বের অন্যান্য মতবাদের স্রষ্টার সাথে অবিকল মিলে না যায়। আমাদের স্রষ্টার নাম ‘কাঁই’। তিনি সর্ব প্রথম রূপকারগণের দ্বারা সৃষ্টি হয়ে মানুষের দ্বারা পূজিত হতে আরম্ভ করেন। দিব্যদৃষ্টিহীন শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিতদের দ্বারা জাগতিক উপাস্যের স্তরে উন্নীত হওয়ার পর তিনি ঊর্ধ্বলোকে গমন করেন। সেখান থেকেই তিনি বিশ্বজগৎ প্রসারণ করতে আরম্ভ করেন। ২১ দিনে সারাবিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেন। যাবতীয় কার্যাদি কেবল ইঙ্গিতের দ্বারাই তিনি পরিচালনা করে থাকেন। কোন কিছু সৃষ্টি করতে চাইলে তিনি কেবল একটি ইঙ্গিত করেন সঙ্গেসঙ্গেই তা হয়ে যায়। কাঁইয়ের আহার, নিদ্রা, ভয়, চিন্তা, লোভ ও লালসা সবই আছে। কিন্তু তাঁর কোন জন্ম-মৃত্যু নেই। তিনি অনাদি কিন্তু অনন্ত। তিনি প্রতিমাসে মাত্র একবার আমাদের পৃথিবী নামক গ্রহটি পরিভ্রমণে আসেন। ঐ দিনক্ষণ জেনে ও বুঝে আত্মতত্ত্বপন্থী সাধক-সাধিকাগণ কাঁইয়ের দর্শনলাভ করে মানবকর্ম সারা করে থাকেন। কাঁইয়ের তিন প্রকার বাহিনি রয়েছে। যথা- ————————————————————- ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন ক্রমে ক্রমে যত অধিক কিংবদন্তি গড়ে তোলা হতে থাকবে সারা বিশ্বে কাঁইয়ের ব্যাপ্তিও তত অধিক হতে থাকবে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন