একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান।
দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকার ধারি মানব দেহকে, মনের
রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে
মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যাধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১. অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪. রাগ ৫. কুৎসা ৬. লিপ্সা ৭. মিথ্যা ৮. কৃপণতা ৯. কলা ও ১০. আমিত্ব।
চতুর্থ পর্ব…
৪. রাগ
রাগ (রূপ)বি ক্রোধ, রোষ, কোপ, ক্ষোভ, রক্তবর্ণ, রক্তি, অনুরাগ, প্রেম, প্রণয়, আসক্তি, মমতা, সুরের বিন্যাসের পদ্ধতি বিভাগ, ১. ভৈরব, ২. কৌশিক ৩. হিন্দোল ৪. দীপক ৫. শ্রী ৬. মেঘ- এ ছয়টি মূল রাগ।
রাগের সংজ্ঞা
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
রাগ উৎপত্তির কারণ
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণহেতু মনে ক্রোধ বা রাগের উৎপত্তি হয়। রাগ সর্বসময় দোষণীয়। মনের মাঝে প্রজ্জ্বলিত রাগ প্রশমন করাই সাধুত্ব।
রাগের উপস্থিতি
মন অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হওয়ার সাথেসাথে বদনও অগ্নিমূর্তি ধারণ করাই ক্রোধ বা রাগের উপস্থিতির চিহ্ন।
রাগ প্রশমনের উপায়
মনের মাঝে ক্রোধ বা রাগ সৃষ্টি হোলে জ্ঞান দ্বারা মনকে এরূপভাবে বুঝাতে হবে যে কাজ করতে গেলে লাভ-ক্ষতি বা ভালো-মন্দ উভয়ই তো হতে পারে বিধায় ক্ষতি হলে কোন প্রকার উদ্বিগ্ন না হয়ে আগে চিন্তা করতে হবে ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু? আরো চিন্তা করতে হবে সংঘটিত ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠা যাবে কিভাবে? ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে তা কাটিয়ে উঠার প্রতি মনোনিবেশ করলে ক্রমেক্রমে ক্রোধ বা রাগ প্রশমন হতে থাকে। যেমন- ধরি তোমার ছোট ছেলের হাত হতে পড়ে গিয়ে একটি বাতি ভেঙ্গে গেছে শুনে তোমার মনে ক্রোধের উৎপত্তি হয়েছে। তুমি আগে চিন্তা করো বাতিটির মূল্য কত? তা আবার ক্রয় করা যাবে কী না? আরো চিন্তা করো বাতিটির মূল্য অধিক না ছেলেটির মূল্য অধিক? আরো চিন্তা করো সামান্য অর্থ দ্বারা তো বাতিটি ক্রয় করা যাবে কিন্তু ছেলেকে মারধর করলেও তো ভাঙ্গা বাতিটি আর জোড়া লাগবে না এবং বাতিটি আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এসব চিন্তা করতে করতেই ক্রোধ বা রাগ অনেকটাই প্রশমন হয়ে যায়।
সমাজের কিছু অজ্ঞলোক বা জ্ঞানহীন শিষ্যরা মনে করে গুরু ও গোঁসাইগণের কোন প্রকার রাগই থাকতে পারে না। এরূপ কথা সঠিক নয়। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণির আত্মরক্ষামূলক রাগ অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। তবে ক্ষতিকারক রাগ দমন করে রাখা প্রত্যেকেরই উচিৎ।
রূপক উদাহরণ
উপদেশ প্রদানের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো-
একটি সর্প মানুষের ক্ষতি না করার অঙ্গীকার করে এক সাধু বাবার নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। ইঁচড়েপাকা ছেলেরা সাপটির সন্ধান পাওয়ার পর তার লেজ ধরে পথে পথে টেনেহেঁচড়ে অনেক আমোদ-প্রমোদ করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেল। অতঃপর সাধুবাবা এসে সর্পটির এ অবস্থা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার এরূপ অবস্থা কেন”! সে বলল- “আপনি আমাকে রাগ দমনের যে উপদেশ দিয়েছিলেন সে উপদেশ মান্য করতে গিয়েই আমার এরূপ অবস্থা”! সাধুবাবা বললেন- “বোকা সর্প! আমি মানুষের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছি বটে- রাগ প্রদর্শন করে আত্মরক্ষা করতেও কী তোকে নিষেধ করেছি!” পরের দিন দুষ্ট ছেলেরা আবার সর্পটির সন্ধান পেয়ে তার লেজ ধরতে গেল তখন সর্পটি ভীষণভাবে গর্জন করে তাদের আক্রমণের কলা ধরল তখন ভয়ে দুষ্ট ছেলেরা সব পালিয়ে গেল এবং সর্পটির আত্মরক্ষা হলো। তাই রাগ দমনের যে মাত্রা রয়েছে তা সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে আমাদের অবস্থা সে সর্পের মতোই হবে। অবসম্ভাবী ক্ষতি হতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও দেশ রক্ষা করতে যে পরিমাণ রাগের প্রয়োজন তা করা অবশ্যই আবশ্যক। কার্যত দেখা যায় সমাজের লোকের নিকট ভালো সাধুবাবা রূপে মর্যাদা পাওয়ার জন্য আধ্যজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিরা সে সর্পের মতো কলা ধরে বকধার্মিক সেজে বসে রয়েছে। শিষ্যদের সামনে তারা কোন প্রকার রাগই করতে চান না। জ্ঞানহীন এ পাপিষ্ঠরাই সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিসাধন করে। পরিশেষে বলা যায় রাগ যে একেবারে করাই যাবে না এরূপ কিছু নয় তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমাণ মতো রাগ করা সম্পূর্ণ সিদ্ধও রয়েছে।
অনুরাগ
অনুরাগ (রূপ)বি ১.রাগতুল্য, রাগসদৃশ, রাগ অপেক্ষা ক্ষুদ্র ক্রোধ (এতো অনুরাগ ভালো নয়)
২.প্রেম, প্রীতি, সোহাগ, আদর, স্নেহ, যত্ন, প্রবৃত্তি, আসক্তি (সনৃ) রাগের সহচর, দোষ, ফল ক্রিবিণ যদৃচ্ছা, যেমন ইচ্ছা।
অনুরাগের সংজ্ঞা
সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কুটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
মানুষের মনের মধ্যে উৎপন্ন রাগ মুখের ভাষা দ্বারা কিংবা অক্সগপ্রত্যক্সগ দ্বারা প্রকাশ না করে ধৈর্য ধারণ করতে করতে এক পর্যায়ে রাগের মাত্রা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না বরং তা মনের মাঝে সুপ্ত বা সাময়িক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে। মনের মাঝে সঞ্চিত অকার্যকর ও নিষ্ক্রিয় এ রাগাদিই পরবর্তীতে অনুরাগে পরিণত হয়। ফলে রাগের অবশিষ্ট কিছু অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ রাগের যে অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায় তাই অনুরাগ। আরো বলা যায় মনের মাঝে সুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সঞ্চিত থাকা ছোটখাট রাগাদিই অনুরাগ।
অনুরাগের লক্ষণ
অনুরাগ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় সময় নিরব থাকার চেষ্টা করে। সে সহজে কারো সাথে কথা বলতে বা সৌজন্যমূলক কোন আলাপ করতে চায় না। সে স্বেচ্ছাচারীর মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ কর্মটুকুই করতে থাকে। এ সময় সে কারো সাথে সহজে মিশতেও চায় না। সর্বসময় তাকে উদাসী উদাসী বলে মনে হয়। তাদের প্রত্যাহিক স্বাভাবিক কাজকর্মও তারা যথা সময়ে যথা নিয়মে করতে চায় না। যেমন- স্নান ও পানাহার। অনুরাগী বা মলিনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিবারের অন্যান্যদের সাথে স্নান ও পানাহার করতে চায় না বরং সামান্য আগে ও পরেই তারা করে থাকে। পানাহার, স্নান বা ঘুমের জন্য পুনঃপুন তাদের সাধতে হয়।
অনুরাগের উপকার
১. সরাসরি রাগ করা দ্বারা যা অর্জন করা সম্ভব নয় অনুরাগ দ্বারা তা অর্জন করা যায়।
২. অনুরাগ দ্বারা যে কোন সমস্যার শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যায়।
৩. রাগের দ্বারা অবসম্ভাবী যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় অনুরাগ দ্বারা তা হতে হয় না।
রাগ ও অনুরাগের পার্থক্য
১. কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
১. সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
২. রাগের দ্বারা প্রেম-প্রীতি ধ্বংস হয়।
২. অনুরাগ দ্বারা প্রেমে ও প্রীতি আরো প্রগাঢ় হয়।
১. রাগের দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয় না।
২. অনুরাগ দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয়।
১. রাগের পরিণতি ধ্বংস ও বিচ্ছেদ।
২. অনুরাগের পরিণতি মিলন ও মিমাংসা।
১. বড়বড় ক্ষতিকারক বিষয় হতে রাগের উৎপত্তি।
২. ছোটখাট বিষয়াদি হতে অনুরাগের উৎপত্তি।
১. রাগ সবার সাথে করা যায়।
২. অনুরাগ একান্ত প্রিয়জন ব্যতীত করা যায় না।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্র – আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যাধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১. অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪. রাগ ৫. কুৎসা ৬. লিপ্সা ৭. মিথ্যা ৮. কৃপণতা ৯. কলা ও ১০. আমিত্ব।
চতুর্থ পর্ব…
৪. রাগ
রাগ (রূপ)বি ক্রোধ, রোষ, কোপ, ক্ষোভ, রক্তবর্ণ, রক্তি, অনুরাগ, প্রেম, প্রণয়, আসক্তি, মমতা, সুরের বিন্যাসের পদ্ধতি বিভাগ, ১. ভৈরব, ২. কৌশিক ৩. হিন্দোল ৪. দীপক ৫. শ্রী ৬. মেঘ- এ ছয়টি মূল রাগ।
রাগের সংজ্ঞা
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
রাগ উৎপত্তির কারণ
কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণহেতু মনে ক্রোধ বা রাগের উৎপত্তি হয়। রাগ সর্বসময় দোষণীয়। মনের মাঝে প্রজ্জ্বলিত রাগ প্রশমন করাই সাধুত্ব।
রাগের উপস্থিতি
মন অগ্নিবৎ উত্তপ্ত হওয়ার সাথেসাথে বদনও অগ্নিমূর্তি ধারণ করাই ক্রোধ বা রাগের উপস্থিতির চিহ্ন।
রাগ প্রশমনের উপায়
মনের মাঝে ক্রোধ বা রাগ সৃষ্টি হোলে জ্ঞান দ্বারা মনকে এরূপভাবে বুঝাতে হবে যে কাজ করতে গেলে লাভ-ক্ষতি বা ভালো-মন্দ উভয়ই তো হতে পারে বিধায় ক্ষতি হলে কোন প্রকার উদ্বিগ্ন না হয়ে আগে চিন্তা করতে হবে ক্ষতির পরিমাণ কতটুকু? আরো চিন্তা করতে হবে সংঘটিত ক্ষতিটা কাটিয়ে উঠা যাবে কিভাবে? ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে তা কাটিয়ে উঠার প্রতি মনোনিবেশ করলে ক্রমেক্রমে ক্রোধ বা রাগ প্রশমন হতে থাকে। যেমন- ধরি তোমার ছোট ছেলের হাত হতে পড়ে গিয়ে একটি বাতি ভেঙ্গে গেছে শুনে তোমার মনে ক্রোধের উৎপত্তি হয়েছে। তুমি আগে চিন্তা করো বাতিটির মূল্য কত? তা আবার ক্রয় করা যাবে কী না? আরো চিন্তা করো বাতিটির মূল্য অধিক না ছেলেটির মূল্য অধিক? আরো চিন্তা করো সামান্য অর্থ দ্বারা তো বাতিটি ক্রয় করা যাবে কিন্তু ছেলেকে মারধর করলেও তো ভাঙ্গা বাতিটি আর জোড়া লাগবে না এবং বাতিটি আর ফিরে পাওয়া যাবে না। এসব চিন্তা করতে করতেই ক্রোধ বা রাগ অনেকটাই প্রশমন হয়ে যায়।
সমাজের কিছু অজ্ঞলোক বা জ্ঞানহীন শিষ্যরা মনে করে গুরু ও গোঁসাইগণের কোন প্রকার রাগই থাকতে পারে না। এরূপ কথা সঠিক নয়। বিশ্বের প্রতিটি প্রাণির আত্মরক্ষামূলক রাগ অবশ্যই থাকা প্রয়োজন। তবে ক্ষতিকারক রাগ দমন করে রাখা প্রত্যেকেরই উচিৎ।
রূপক উদাহরণ
উপদেশ প্রদানের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো-
একটি সর্প মানুষের ক্ষতি না করার অঙ্গীকার করে এক সাধু বাবার নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিল। ইঁচড়েপাকা ছেলেরা সাপটির সন্ধান পাওয়ার পর তার লেজ ধরে পথে পথে টেনেহেঁচড়ে অনেক আমোদ-প্রমোদ করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রেখে চলে গেল। অতঃপর সাধুবাবা এসে সর্পটির এ অবস্থা দেখে তাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমার এরূপ অবস্থা কেন”! সে বলল- “আপনি আমাকে রাগ দমনের যে উপদেশ দিয়েছিলেন সে উপদেশ মান্য করতে গিয়েই আমার এরূপ অবস্থা”! সাধুবাবা বললেন- “বোকা সর্প! আমি মানুষের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছি বটে- রাগ প্রদর্শন করে আত্মরক্ষা করতেও কী তোকে নিষেধ করেছি!” পরের দিন দুষ্ট ছেলেরা আবার সর্পটির সন্ধান পেয়ে তার লেজ ধরতে গেল তখন সর্পটি ভীষণভাবে গর্জন করে তাদের আক্রমণের কলা ধরল তখন ভয়ে দুষ্ট ছেলেরা সব পালিয়ে গেল এবং সর্পটির আত্মরক্ষা হলো। তাই রাগ দমনের যে মাত্রা রয়েছে তা সঠিকভাবে বুঝতে না পারলে আমাদের অবস্থা সে সর্পের মতোই হবে। অবসম্ভাবী ক্ষতি হতে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও দেশ রক্ষা করতে যে পরিমাণ রাগের প্রয়োজন তা করা অবশ্যই আবশ্যক। কার্যত দেখা যায় সমাজের লোকের নিকট ভালো সাধুবাবা রূপে মর্যাদা পাওয়ার জন্য আধ্যজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিরা সে সর্পের মতো কলা ধরে বকধার্মিক সেজে বসে রয়েছে। শিষ্যদের সামনে তারা কোন প্রকার রাগই করতে চান না। জ্ঞানহীন এ পাপিষ্ঠরাই সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতিসাধন করে। পরিশেষে বলা যায় রাগ যে একেবারে করাই যাবে না এরূপ কিছু নয় তবে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিমাণ মতো রাগ করা সম্পূর্ণ সিদ্ধও রয়েছে।
অনুরাগ
অনুরাগ (রূপ)বি ১.রাগতুল্য, রাগসদৃশ, রাগ অপেক্ষা ক্ষুদ্র ক্রোধ (এতো অনুরাগ ভালো নয়)
২.প্রেম, প্রীতি, সোহাগ, আদর, স্নেহ, যত্ন, প্রবৃত্তি, আসক্তি (সনৃ) রাগের সহচর, দোষ, ফল ক্রিবিণ যদৃচ্ছা, যেমন ইচ্ছা।
অনুরাগের সংজ্ঞা
সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কুটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
মানুষের মনের মধ্যে উৎপন্ন রাগ মুখের ভাষা দ্বারা কিংবা অক্সগপ্রত্যক্সগ দ্বারা প্রকাশ না করে ধৈর্য ধারণ করতে করতে এক পর্যায়ে রাগের মাত্রা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পেতে থাকে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নির্মূল হয় না বরং তা মনের মাঝে সুপ্ত বা সাময়িক নিষ্ক্রিয় অবস্থায় অবস্থান করতে থাকে। মনের মাঝে সঞ্চিত অকার্যকর ও নিষ্ক্রিয় এ রাগাদিই পরবর্তীতে অনুরাগে পরিণত হয়। ফলে রাগের অবশিষ্ট কিছু অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায়। অর্থাৎ রাগের যে অংশ আচরণ দ্বারা প্রকাশ পায় তাই অনুরাগ। আরো বলা যায় মনের মাঝে সুপ্ত বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় সঞ্চিত থাকা ছোটখাট রাগাদিই অনুরাগ।
অনুরাগের লক্ষণ
অনুরাগ দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় সময় নিরব থাকার চেষ্টা করে। সে সহজে কারো সাথে কথা বলতে বা সৌজন্যমূলক কোন আলাপ করতে চায় না। সে স্বেচ্ছাচারীর মতো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ কর্মটুকুই করতে থাকে। এ সময় সে কারো সাথে সহজে মিশতেও চায় না। সর্বসময় তাকে উদাসী উদাসী বলে মনে হয়। তাদের প্রত্যাহিক স্বাভাবিক কাজকর্মও তারা যথা সময়ে যথা নিয়মে করতে চায় না। যেমন- স্নান ও পানাহার। অনুরাগী বা মলিনতায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা পরিবারের অন্যান্যদের সাথে স্নান ও পানাহার করতে চায় না বরং সামান্য আগে ও পরেই তারা করে থাকে। পানাহার, স্নান বা ঘুমের জন্য পুনঃপুন তাদের সাধতে হয়।
অনুরাগের উপকার
১. সরাসরি রাগ করা দ্বারা যা অর্জন করা সম্ভব নয় অনুরাগ দ্বারা তা অর্জন করা যায়।
২. অনুরাগ দ্বারা যে কোন সমস্যার শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যায়।
৩. রাগের দ্বারা অবসম্ভাবী যে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় অনুরাগ দ্বারা তা হতে হয় না।
রাগ ও অনুরাগের পার্থক্য
১. কোন প্রকার ক্ষতি দর্শন বা শ্রবণের দ্বারা মন অগ্নিবৎ জ্বলে উঠাকে রাগ বলে।
১. সরাসরি রাগ না করে কোন সমস্যা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের জন্য কূটনৈতিক পথ গ্রহণের অভিমানকে অনুরাগ বলে।
২. রাগের দ্বারা প্রেম-প্রীতি ধ্বংস হয়।
২. অনুরাগ দ্বারা প্রেমে ও প্রীতি আরো প্রগাঢ় হয়।
১. রাগের দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয় না।
২. অনুরাগ দ্বারা অধিকার অর্জন করা বা উদ্ধার করা সম্পূর্ণ সম্ভব হয়।
১. রাগের পরিণতি ধ্বংস ও বিচ্ছেদ।
২. অনুরাগের পরিণতি মিলন ও মিমাংসা।
১. বড়বড় ক্ষতিকারক বিষয় হতে রাগের উৎপত্তি।
২. ছোটখাট বিষয়াদি হতে অনুরাগের উৎপত্তি।
১. রাগ সবার সাথে করা যায়।
২. অনুরাগ একান্ত প্রিয়জন ব্যতীত করা যায় না।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্র – আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন