বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

বহুঈশ্বরবাদ নাকি রূপকসাহিত্য ভুল বোঝাবুঝি?

বহুঈশ্বরবাদ নাকি রূপকসাহিত্য ভুল বোঝাবুঝি?
(Polytheism or Fabulous literature misunderstanding?)
সাম্প্রতিককালে রূপকসাহিত্যে বর্ণিত দেব-দেবতা, দৈবিকা-প্রতীতি, স্রষ্টা-সৃষ্টি, দুর্বল-সবল, পুরুষ-নারী, মানব-দানব কিংবা সুর-অসুরের কাহিনিগুলোকে বর্তমানকালের অনেক গবেষক প্রচলিত বহুঈশ্বরবাদের উৎসমূল নির্ধারণ করার চেষ্টা করছেন। প্রকৃতপক্ষে এরূপ ধারণা কখনোই সঠিক নয়। কারণ এসব দেব-দেবী, মানব-দানব কিংবা সুরাসুরের কাহিনি এখনো রূপকসাহিত্য দ্বারা নির্মাণ করা যায়।
রূপকসাহিত্য ভুল বোঝাবুঝি হতে বহুঈশ্বরবাদের উদ্ভব নাকি বহুঈশ্বরবাদ হতে রূপকসাহিত্যের উদ্ভব? এরূপ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে- রূপকসাহিত্য ভুল বোঝাবুঝি হতে বহুঈশ্বরবাদের উদ্ভব। কারণ সারা বিশ্বের একেক ভাষায় একেকভাবে রূপকসাহিত্য নির্মিত হয়েছে। Indian mythology অনুযায়ী এর কেন্দ্রিয় চরিত্রটি কখনো ছিল রাম, কখনো ছিল কৃষ্ণ, আবার কখনো ছিল ব্রহ্মা। অন্যদিকে Arabian mythology অনুযায়ী কখনো ছিল মুহাম্মদ, আবার কখনো ছিল আল্লাহ।
এবার এসব কেন্দ্রিয় চরিত্রাদির সমতা করলে একদিকে পড়ে রাম ও মুহাম্মদ এবং অন্যদিকে পড়ে কৃষ্ণ, ব্রহ্মা ও আল্লাহ। রাম ও মুহাম্মদ বর্তমানকালে পালনকর্তা নামে অভিহিত এবং কৃষ্ণ, ব্রহ্মা ও আল্লাহ সৃষ্টিকর্তা নামে পরিচিত। এবার কেউ যদি ভিন্ন ভিন্ন রূপকসাহিত্যের এসব কেন্দ্রিয় চরিত্রকে ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর কল্পনা করে। তবে তার ঈশ্বরের সংখ্যা হবে পাঁচটি। ১.রাম ২.কৃষ্ণ ৩.ব্রহ্মা ৪.মুহাম্মদ ও ৫.আল্লাহ। আর যদি এসবের মূলসত্তা উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হন তবে তার ঈশ্বর হবে দু’টি। যথা- ১.পালনকর্তা ও ২.সৃষ্টিকর্তা। সারা বিশ্বের পালনকর্তাপদ একটি। যেমন প্রধানমন্ত্রী পদ একটি। তবে অসংখ্য ব্যক্তি এ পদে আসীন হতে পারেন। তেমন সৃষ্টিকর্তাপদও মাত্র একটি। তবে অসংখ্য ভাষায় এর অসংখ্য নাম হতে পারে। তেমন সারাবিশ্বের পালনকর্তাপদ মাত্র একটি। তবে অসংখ্য ভাষায় এর অসংখ্য নাম হতে পারে। এবার আমরা গ্রিক পুরাণের একটি কাহিনি তুলে ধরছি।
“এথিনী একজন দেবী। সে ছিল গ্রীসের নগর রাষ্ট্রসমুহের তথা এথেন্সের প্রধান রক্ষক।এথিনী ছিল গ্রিক পুরাণের জ্ঞান-বিজ্ঞান, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও চারুশিল্পের দেবী। দেবরাজ জিউস ও তার প্রথম স্ত্রী মেটিসের কন্যা। জন্ম মুহূর্তেই সে ছিল পূর্ণযৌবনা। দেবীদের মধ্যে একমাত্র এথিনীই কঠোরভাবে সতীত্ব রক্ষা করে চলতো। রোমান পুরাণে এথিনীর নাম মিনার্ভা।
[কথিত আছে যে, এ এথিনী (Athena) এর নামানুসারেই প্রাচীন গ্রীসের নগর রাষ্ট্র এথেন্সের (বর্তমান গ্রীসের রাজধানি) নামকরণ করা হয়।]
মানব-দানব, সুরাসুর, স্রষ্টা-সৃষ্টি এসবের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়েই নির্মিত হয়েছে Mythology (মিথোলজি)। বিভিন্ন বিষয়ে দেব-দেবীদের মধ্যে সমঝোতা-সহযোগিতা থাকলেও প্রায় সকল ঘটনায় তাদের নিজেদের মধ্যে বিরোধিতা, কলহ ছিল নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতাও ছিল।শ্রেষ্ঠা সুন্দরীর প্রাপ্য স্বর্ণ আপেল প্রতিযোগিতায় এথিনীর প্রতিদ্বন্দী ছিল তারই বৈমাত্রেয় বোন আফ্রোদিতি এবং বিমাতা হেরা।স্বর্ণ আপেলটি প্যারিস এথিনীর হাতে না দেওয়ায় ট্রয়ের যুদ্ধে এথিনী গ্রিক পক্ষ অবলম্বন করেন।”
পৌরাণিক এসব উপকথার ওপর নির্ভর করে একেকজন একেক প্রকার সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। যেমন একজন বলেছেন- “প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ সকল বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রমণের উপায় খুঁজে চলেছে-দুটো উপায়ে! একদল প্রগতীর মাধ্যমে, অন্যদল আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় একদল আবিষ্কার করেছে প্রস্তর থেকে অস্ত্র এবং ব্যাবহার্য জিনিসপত্র, অন্যদল মুক্তির উপায় খুজেছে সুর্য কিংবা অগ্নিপুঁজার মাধ্যমে। প্রাচীন মানুষেরা যেখানেই, যা কিছু দ্বারাই বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছে তাদেরকেই শক্তিমান মনে করে তাদের কাছে মাথা নত করেছে। কালে এটাই বহুঈশ্বরবাদের দিকে মানুষকে ধাবিত করেছে। প্রাচীন সকল ধর্মই ছিল বহুঈশ্বরবাদী। বহুঈশ্বরবাদের ধারণা থেকে একেশ্বরবাদে উত্তরণের অন্যতম কারণ হলো বহুঈশ্বরবাদের দেব-দেবীদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ। স্বাভাবিকভাবেই মানুষ সেই সকল দেব-দেবীদের প্রতি আস্থাহীন হয়ে পড়ে যারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দী (একেশ্বরবাদের বর্ণনায় বহুঈশ্বরবাদের ধারণা নাকচের ক্ষেত্রে এই উদাহরণটি বিশেষ করে দেওয়া হয়)। যার ফলে একেশ্বরবাদ আস্তে আস্তে প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। সেই প্রাধান্য আজও বিদ্যমান। তবে আশার কথা মানুষ ধীরে ধীরে প্রগতীর দিকেই ধাবিত হচেছ।মানুষ এখন পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহে বসতি গড়ার চিন্তা করছে যদিও কিছু মানুষ আজও আমাজন নয়, আমাদের সুন্দরবনে কাঠ কিংবা মধু সংগ্রহে যাওয়ার পূর্বে বাঘমামাকে পূঁজা করে-বাঘের থাবা থেকে বাচার জন্য!!” (বাঁধ ভাঙার আওয়াজ)
আমাদের কথা হলো দর্শন শাস্ত্রের কথিত বহুঈশ্বরবাদ এটি আগেও ছিল না এবং এখনও নেই। আছে কেবল কাগজের পাতায় পাতায়। আর বহু দেব-দেবীর বা বহুঈশ্বর হতে বহুঈশ্বরবাদের সৃষ্টি হয়নি। এ মতবাদটির সৃষ্টি হয়েছে রূপকসাহিত্য না জানা ও না বুঝা হতে। যেমন লালন সাঁইজি বলেছেন-
“আল্রাহ হরি ভজন পুজন,
এ সকল মানুষের সৃজন।”
যারা এখনো রূপকসাহিত্য বুঝে না তারা এখনো ভুল করে। যেমন একজন তার সন্তানের নাম রেখেছে খিঞ্জির। এ পরিভাষাটি কুরানে আছে তাই। কারণ সে তো জানে না যে, খিঞ্জির অর্থ শূকোর বা বরাহ। কিশোরগঞ্জের একটি থানার নাম হচ্ছে মদন। যারা নামকরণ করেছে তারা কেউ হয়ত জানত না যে, মদন অর্থ শিশ্ন। ঠিক তেমনি অজ্ঞরা কালে কালে রূপকসাহিত্যের গল্প-কাহিনির মধ্যে প্রাপ্ত চরিত্রাদিকে ঈশ্বর মনে করে হয়ত তার পূজা করেছে।
আমরা দীর্ঘকাল হতে বহুঈশ্বর বহুঈশ্বরবাদ বহুঈশ্বরবাদী পরিভাষাগুলো শুনে ও লেখেই আসছি। আজো কোথাও পেলাম না, ৫০ বা ১০০টি ঈশ্বরের নাম বা অস্তিত্ব। তেমনি আজো পেলাম না বহুঈশ্বরবাদী জাতি। ব্রহ্মা, বিরিঞ্চি, কৃষ্ণ, কাঁই, কারাতারা, খামিসামা ও মারাংবুরু এসবের পূজা অনেকেই করে থাকেন। তাই বলে এসব ভিন্ন ভিন্ন সত্তা নয়। বরং এসবের সত্তা এক ও অভিন্ন। যেমন ঝাড়ু, মুড়া, পিছা, বাড়ুন, মার্জনি, সম্মার্জনি এসব পরিভাষার সত্তা এক ও অভিন্ন। যেমন- খাদা, ডুহি, মালশা, ঢোকশা, পানিটাওয়া ও আউত্তা এসব পরিভাষার অভিধা এক ও অভিন্ন। যেমন মহাত্মা লালন সাঁইজি বলেছেন-
“আরবি ভাষায় বলে আল্রাহ
ফারসিতে কয় খোদা তায়ালা
গড বলেছেন যিশুর চেলা
ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভাবে।”
কেউ ব্রহ্মাপূজা, কেউ বিরিঞ্চিযজ্ঞ, কেউ কৃষ্ণদর্শন, কেউ হরিভক্তি, কেউ কাঁইসাধন, কেউ কারাতারা উপাসনা, কেউ খামিসামা আরাধনা ও কেউবা মারাংবুরু হোম যে যাই করুক সবাই ঐ এক ঈশ্বরেরই উপাসনা করে। বহুঈশ্বর পূজা হয় কিভাবে? হ্যাঁ কেউ যদি মৎস্যপূজা, বৃক্ষপূজা, আকাশপূজা, বাতাসপূজা, সূর্যপূজা, চন্দ্রপূজা, নদীপূজা ও সাগরপূজা করে থাকে। তবে তা কখনোই ঈশ্বরের পূজা নয় বরং ঐসব ছিল তাদের সামাজিক সংস্কৃতি। যেমন বর্তমানকালেও অনেক মানুষ আছে পির ধরতে হবে তাই ধরে, গোঁসাই-গুরু ধরতে হবে তাই ধরে। তারা কোনদিন পির, গুরু ও গোঁসাইয়ের বাড়িতেও যাই না, তার কোন ছবকও আদায় করে না। তেমন ঐসব পূজাগুলো তারা ঈশ্বর মনে করে করে না। বরং সবাই করে তাই করে। সবাই নামাজ পড়ে তাই পড়ে। পরিশেষে এরূপ বলা যায় যে, সারা বিশ্বে কিছু কিছু পরিভাষা আছে কিন্তু এদের কোন সত্তা নেই। যেমন- অশ্বডিম্ব, আকাশকুসুম ও পরশপাথর ইত্যাদি। তেমন বহুঈশ্বরবাদী ও ওয়াবী। এ পরিভাষাদ্বয় দ্বারা যা বুঝায় তা পৃথিবীর কোথাও পাওয়া যাবে না।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন