রবিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০১৪

তীর্থবারি

তীর্থবারি
(তীর্থযাত্রা ও পশুবলির আত্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ- ৫ম পর্ব)
(The theosophical analysis of Pilgrimage or Immolation- 5th chapter) “التحليل لاهوتيا من الحج أو الذبح- الفصل الخامس” (আত্তাহলিল লাহুতিয়ান মিন আলহাজ্‌ব আও আজ্জাবহা- আলফাসলু আলখামিস)
আবহমানকাল হতেই বাংভারতীয় উপমহাদেশে তীর্থযাত্রা ও পশুবলি এবং এর প্রাসঙ্গিকতায় নিষ্কামিতা, তীর্থস্নান ও তীর্থবারি পরিভাষাগুলো শাস্ত্রীয়, পারম্পরিক ও মরমী অঙ্গনে দেখতে-শুনতে পাওয়া যায়। কিন্তু এসবের তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা জানতে ও বুঝতে চাইলে সঠিকভাবে জানা ও বুঝার মাধ্যম একেবারেই নেই বললেও ভুল হবে না। কী শাস্ত্রিক, কী পারম্পরিক, কী মরমী, কী পাঠাগার, কী সাধনগৃহ (মন্দির ও মঠ) এবং কিবা গ্রন্থ-গ্রন্থিকা। কোথাও সঠিক সমাধান মিলে না। তবে ইদানিং Internet search করে যতটুকু পাওয়া যায় browser-রা দেখে নিতে পারেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ ইচ্ছে করলেও এসবের বর্ণনা-বিবরণ সহজে জানতে ও বুঝতে পারে না। তাই আমাদের এ ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। ওপরোক্ত বিষয়গুলোকে ১.তীর্থযাত্রা ২.পশুবলি ৩.নিষ্কামিতা ৪.পুণ্যস্নান ও ৫.তীর্থবারি- এ ৫টি পৃথক পৃথক পর্বে বিভক্ত করে আলোচনা তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।
————————————————————————————————————————
তীর্থবারি
Kickshaw (কিকশো)/ ‘لذيذ’ (লাজিয)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পালনকর্তা’ পরিবারের অন্যতম একটি ‘উপমান পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘পালনকর্তা’, রূপক পরিভাষা ‘সাঁই’, অন্যান্য উপমান পরিভাষা ‘অমৃতসুধা, গ্রন্থ, চন্দ্র, জল, ননি, পক্ষি, ফল, ফুল, মানিক ও সুধা’, চারিত্রিক পরিভাষা ‘বিষ্ণু, রাম ও লালন’ এবং ছদ্মনাম পরিভাষা ‘ঈশ্বর, উপাস্য, চোর, পতিতপাবন, পরমগুরু, প্রভু, মনেরমানুষ, রাজা, স্বরূপ ও হরি’
তীর্থবারি (রূপ)বি তীর্থোদক, তীর্থজল, Kickshaw (কিকশো), ‘لذيذ’ (লাজিয), Ambrosia, ‘الشهي’ (আশশাহি) (প্র) শাস্ত্রীয় পুরাণী মনীষীদের মতে তীর্থধামের পুণ্যময় ও মহাপবিত্র জল বিশেষ (আবি)বি ১.জীবজল, জীবোদক, জীবাম্বু, জীবনজল ২.উপাস্য, নারায়ণ, নিধি, নিমাই, নিরঞ্জন, সাঁই ও স্বরূপ (ভাঅ)বি পালনকর্তা, ঈশ্বর, বুদ্ধ, পতি, স্বামী, ‘رب’ (রাব্বা) (আদৈ)বি খোদা (ফা.ﺨﺪﺍ), মা’বুদ (.ﻤﻌﺑﻭﺪ), মুহাম্মদ (.ﻤﺤﻤﺪ), রাসুল (.رَسُول) (আপ)বি কাওসার (আ.ﻜﻭﺛﺮ), ফুরাত (.ﻔﺭﺍﺖ) (ইপ)বি God, nectar, elixir (পরি) এরূপ তরলমানুষ যে এখনো মূর্ত আকার ধারণ করেনি (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘পালনকর্তা’ পরিবারের ‘উপমান পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সাধারণত তীর্থধামের সুপেয় জলকে তীর্থবারি বলা হয় ২.রূপক সাহিত্যে অমৃত মানবজলকে তীর্থবারি বলা হয় (ছনা)বি ঈশ্বর, উপাস্য, চোর, পতিতপাবন, পরমগুরু, প্রভু, মনেরমানুষ, রাজা, স্বরূপ ও হরি (চরি)বি বিষ্ণু, রাম ও লালন (উপ)বি অমৃতসুধা, গ্রন্থ, চন্দ্র, জল, ননি, পক্ষি, ফল, ফুল, মানিক ও সুধা (রূ)বি সাঁই (দেত)বি পালনকর্তা {বাং.তীর্থ+ বাং.বারি}
তীর্থবারির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of Kickshaw)
১. অমৃতসাগরের সুধা, পান করলে জীবের ক্ষুধা তৃষ্ণা, রয় না, লালন মরল জল পিপাসায়রে, কাছে থাকতে নদী মেঘনা।” (পবিত্র লালন- ২৫৭/৫)। (মুখঃ- “ও যার আপন খবর আপনার হয় না, একবার আপনারে চিনতে পারলেরে, যায় অচেনারে চেনা”)
২. “আমার সাড়েতিন টন- অমৃতসুধা রসরতন, আর মাল্লা বারোজনা- মণিপুর ত্রিবেণে গিয়া- ধনীকে নিঃস্ব বানাইয়া, ডাকাতরা চক্ষু করে কানা।” (বলন তত্ত্বাবলী- ১০৯)(মুখঃ- “ছয় ডাকাতে দিয়াছে হানা, নৌকাখানা”)
৩. “চাতক স্বভাব না হলে, অমৃতমেঘের সে বারি, কথায় কী মিলে।” (পবিত্র লালন- ৪৪২/১)
৪. “মাওলার মহিমা এমনি, সে নদীতে বয় অমৃতপানি, তার একরতি পরশে অমনি, অমর হয় সে জনে।” (পবিত্র লালন- ১২০/৩)(মুখঃ- “আবহায়াতের নদী কোনখানে, যাও জিন্দাপিরের খান্দানে, দেখিয়ে দিবে সন্ধানে”)
৫. “সকাল বিকাল জোয়ার ভাটা ত্রিধারা-সাগরে, রক্তিম সাদা পাড়ি দিয়া যাইও কালা ধারে, অমৃতসুধা দুগ্ধ মধু যত পারো খাইতে যাদু, বলন কয় সাবধানে সাধু প্রাণ ভরিয়া খাও।” (বলন তত্ত্বাবলী- ৫২)(মুখঃ- “এবার সাজাইয়া লও আপন দেশের নাও, রে মনমাঝি ধীরে ধীরে বাইয়া যাও”)
৬. “সেই পঞ্চরস অমৃতসুধার বাণিজ্য মেলায়, দুগ্ধ রতী সুধা মধু কত যে ভেঁসে বেড়ায়, বলন কাঁইজি ভেবে বলে, ত্রিবেণীর দরজা খুলে, পঞ্চরস নিও গো তুলে জনমভরি (ও ভোলা মন)” (বলন তত্ত্বাবলী- ৪১)
তীর্থবারির সংজ্ঞা (Definition of Kickshaw)
সাধারণত তীর্থধামের সুপেয় জলকে তীর্থবারি বলে।
তীর্থবারির আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of Kickshaw)
রূপক সাহিত্যে অমৃত মানবজলকে তীর্থবারি বলে।
তীর্থবারির প্রকারভেদ (Classification of Kickshaw)
তীর্থবারি দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান তীর্থবারি ও ২.উপমিত তীর্থবারি।
১. উপমান তীর্থবারি (Analogical Kickshaw)
শাস্ত্রীয় কর্মের অংশরূপে অতীত পাপমোচন করার উদ্দেশ্যে তীর্থধামের পবিত্র জল দ্বারা স্নান করাকে উপমান তীর্থস্নান বলে।
২. উপমিত তীর্থবারি (Compared Kickshaw)
রূপক সাহিত্যে পুরুষ-নারীর সঙ্গমকে উপমিত তীর্থস্নান বলে।
তীর্থবারির পরিচয় (Identity of Kickshaw)
তীর্থবারি সম্পর্কে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর মিলন কবিতায় বলেছেন-
“নিবি তোরা তীর্থবারি সে অনাদি উৎসের প্রবাহে
অনন্তকালের বক্ষ নিমগ্ন করিতে যাহা চাহে
বর্ণে গন্ধে রূপে রসে, তরঙ্গিত সংগীত উৎসাহে
জাগায় প্রাণের মত্ত হাওয়া।”
তিনি চণ্ডালিকা নাটকে আরো বলেছেন-
“সেই বারি তীর্থবারি
যাহা তৃপ্ত করে তৃষিতেরে,
যাহা তাপিত শ্রান্তেরে স্নিগ্ধ করে
সেই তো পবিত্র বারি।”
সাধারণত তীর্থধামের সর্ব প্রকার সুপেয় জলকেই তীর্থবারি বলা হয়। তবে রূপক সাহিত্যে কেবল অমৃত মানবজলকেই তীর্থবারি বলা হয়। এর কারণ হচ্ছে রূপক সাহিত্যে দেহকে তীর্থ বলা হয়। রূপক সাহিত্যে এরূপ বলা হয় যে, “বৈতরণীর ওপর কোন তীর্থ নেই, বৈকুণ্ঠের ওপর ধাম নেই।” বৈতরণী ও বৈকুণ্ঠ এই মানবদেহে অবস্থিত। তাই বলা যায় দেহের চেয়ে উত্তম কোন তীর্থস্থান নেই। অতএব মানবদেহে প্রাপ্ত সুপেয় পবিত্র জলের চেয়ে উত্তম কোন জল নেই। অর্থাৎ দেহ নামক তীর্থে যে পবিত্র জল পাওয়া যায় তার চেয়ে উত্তম জল সারা পৃথিবীর কোথাও নেই। এ কারণে রূপক সাহিত্যে তীর্থবারি বলতে কেবল পবিত্র মানবজলকে বুঝায়। পবিত্র মানবজলগুলো হচ্ছে ১.দুগ্ধ ২.শুক্র ৩.সুধা ও ৪.মধু।
অন্যদিকে বড় আশ্চর্য হবার বিষয় হলো সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয়, সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরা রূপক সাহিত্যে বর্ণিত ‘তীর্থবারি’ পরিভাষাটির দ্বারা কেবল স্বস্ব তীর্থধামের কূপ, কুয়া, নদী, বিল, খাল, হাওড়, বাওড় ও টিপকলের জলকেই বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। তাই শাস্ত্রীয় ও সাম্প্রদায়িকরা চিরদিনের জন্য আধ্যাত্মিক-জ্ঞান বা আত্মতত্ত্বের জ্ঞানে চির অন্ধ। এই জন্য শাস্ত্রীয়রা যার যার তীর্থে গিয়ে তীর্থধামের জল নিজে পান করে এবং বোতলে ও ড্রামে ভরে নিজ নিজ বাড়িতে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনসহ তৃপ্তি সহকারে পান করে। উদাহরণত কুরানীদের কথা বলা যায়। কুরানীরা মক্কায় যায় তীর্থকর্ম শেষ করে জমজমের (কূপ) জল পান করে ও ড্রাম ভরে নিয়ে বাড়ির সবাইকে পান করিয়ে থাকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন