গুরু গ্রহণ প্রয়োজনীয়তাঃ (দ্বিতীয় পর্ব)
গোঁসাই বা গুরুপদ রহিত হওয়ার কারণাদিঃ
সাধারণত সাঁইসাধন বা কুম্ভসাধনে কৃতকার্য হওয়ার পরই কেবল
গোঁসাই বা গুরুপদ প্রাপ্ত হওয়া যায়। গোঁসাই বা গুরুপদ প্রাপ্ত হওয়ার পর
নিম্নোক্ত অবস্থায় নিপতিত ব্যক্তিকে গোঁসাই বা গুরু বলে গ্রহণ করা ও মান্য
করা কোন লোকেরই উচিৎ নয়। গুরু গ্রহণ করা যেমন প্রয়োজন নিম্নোক্ত কারণে
গুরু বর্জন করাও তেমন প্রয়োজন। যারা বলেন যে, “গুরু যদি হয় বেশ্যানন্দন
তবুও পূজিও তারে পুষ্পচন্দন।” এসব মানুষ একদিকে যেমন হস্তিমূর্খ অন্যদিকে
তেমন আত্মঘাতি। জগতে কী গুরুজনের অভাব? উল্লেখ্য গুরু মোট চার প্রকার। ১.
মানুষগুরু, ২. জগৎগুরু, ৩. কামগুরু ও ৪. পরমগুরু। পরবর্তী তিনগুরু
পরিবর্তনশীল নয়। কিন্তু ‘মানুষগুরু’ সর্ব দাপরিবর্তনশীল। চারগুরু বিস্তারিত
বর্ণনা পড়ার জন্য মূলগ্রন্থটি পাঠ করা পরামর্শ রইল। যেমন ছিদ্দিক কাঁইজি
বলেন,
“গুরু ধরি শতশত,
শিখি কত তন্ত্রমন্ত্র,
যার কাছে জ্ঞানের আলো পাবো,
তার নামের দোহাই দিবো।”
শিখি কত তন্ত্রমন্ত্র,
যার কাছে জ্ঞানের আলো পাবো,
তার নামের দোহাই দিবো।”
উল্লেখ্য আধ্যাত্মিকবিদ্যায় রক্তমাংসে গড়া মানুষকে কখনোই গুরু বলা হয়
না। গুরু বলা হয় কেবল মানুষের জ্ঞানকে। তাই মাটির মানুষকে গুরু ভেবে বসে
থাকা কোন বুদ্ধিমান লোকের কার্য, হতে পারে না। গুরু ভাবতে হবে ঐ ব্যক্তির
জ্ঞানকে। গুরুব্যক্তির জ্ঞান যতক্ষণ আত্মদর্শন ও সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে
ততক্ষণ সে গুরু। যখনি সে আত্মদর্শন ও সত্য হতে বিচ্যুতি হবে তখন সে
আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে এটাই স্বাভাবিক।
বর্তমানে আমাদের বাংভারত হলো নাতিগুরু, পুতিগুরু, ভারপ্রাপ্ত গুরু,
গদিনশীন গুরু, ভাইগুরু, মামাগুরু, চাচাগুরু ও ছেলেগুরু এবং স্বঘোষিত গুরুর
অঞ্চল। এসব অঞ্চলে সাধকগুরু, পাকাগুরু, সিদ্ধগুরু ও চেতনগুরুর বড়ই অভাব।
সেজন্য কাকে গুরু ধরেছি!! তার কী ধরেছি? কেন ধরেছি? কিভাবে ধরেছি? কেন তাকে
ত্যাগ করতে পারছি না? এসব বিষয় ভাবার সময় এসেছে এখন। কেবল লোকের ঢল নামলেই
ব্যক্তি সিদ্ধ গুরু হয় না। টঙ্গির ইস্তেমাতেও লোকের ঢল নামে। এছাড়া আটরশি,
চরমোনাই, মাইজভাণ্ডার, আজমির, মক্কা, নবদ্বীপ, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীদের
জনসভা ইত্যাদিতেও লোকের ঢল নামে। তাই গোঁড়ামি না করে গুরুবাদীদের দেখা
প্রয়োজন প্রকৃত আত্মতত্ত্ববিদ্যা শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া হয় কোন আশ্রমে।
যে আশ্রমে আত্মতত্ত্ববিদ্যা শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়া হয়, সাথে সাথে সেটি
সত্যের ওপরও প্রতিষ্ঠিত। সে আশ্রমটি ছোট হোক, লোকের ঢল না নামুক তবুও সেটি
গ্রহণযোগ্য।
গোঁসাই বা গুরুপদ পাওয়ার পর যদি এ পদের মর্যাদা রক্ষা করা না হয়। তবে
অবশ্যই গোঁসাই বা গুরুপদ রহিত হয়ে যায়। উল্লেখ্য গোঁসাই বা গুরুপদ
রহিতকারী উপসর্গ অনেক। তবে তার মধ্যে অর্থ ও নারী এ দু’টিই প্রধান। গোঁসাই
বা গুরুপদ গ্রহণ করার পর তা রহিত হওয়ার কারণাদি নিচে তুলে ধরা হলো।
১. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু শিষ্যদের সম্মুখে প্রদত্ত
বিশেষ কোন অঙ্গীকার ভঙ্গ করে এবং মিথ্যা কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে
অবশ্যই তাঁর গোঁসাই বা গুরুপদ রহিত হয়ে যায়।
২. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু অর্থ আত্মসাত করে এবং তা
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয় দ্বারা প্রমাণিত হয়। তবে অবশ্যই তাঁর গোঁসাই
বা গুরুপদ রহিত হয়ে যায়।
৩. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু নারীঘটিত অপকর্মে লিপ্ত হয়
এবং তা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিচারালয় দ্বারা প্রমাণিত হয়। তবে অবশ্যই তাঁর
গোঁসাই বা গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
৪. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু চৌর্য, দস্যুতা, অপহরণ ও
মিথ্যা ইত্যাদি এবং যে কোন হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত হয় ও তা সামাজিক ও
রাষ্ট্রীয় বিচারালয় দ্বারা প্রমাণিত হয়। তবে অবশ্যই তাঁর গোঁসাই বা গুরুপদ
চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
৫. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু মাদকাসক্ত হয়ে পড়ে। তবে অবশ্যই তাঁর গোঁসাই বা গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
৬. অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর যদি কোন গোঁসাই বা গুরু
সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কোন প্রকার দণ্ডপ্রাপ্ত হয়। তবে অবশ্যই তাঁর গোঁসাই
বা গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
৭. যদি কোন গোঁসাই বা গুরু অধিক অর্থলিপ্সা ও নারিলিপ্সায় জড়িত হয়ে পড়ে। তবে অবশ্যই তাঁর গোঁসাই বা গুরুপদ চিরতরে রহিত হয়ে যায়।
সংক্ষিপ্ত
সূত্রতথ্যঃ লালন ঘরানা পরিচিতি
লেখক, বলন কাঁইজি।
সূত্রতথ্যঃ লালন ঘরানা পরিচিতি
লেখক, বলন কাঁইজি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন