বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

৯৮/১৬. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘হর’

৯৮/১৬. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘হর’ (১৬ পর্বের ১৬তম পর্ব বিশেষ) (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মতত্ত্ব, আত্মদর্শন, দেহতত্ত্ব, পরম্পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, স্বরূপদর্শন, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন টীকা)
___________________________________
হর
Kidnapper (কিডনাপার)/ ‘مختطف’ (মুক্তাত্বাফ)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ব্যাপকপরিবারের অন্যতম একটি ‘ছদ্মনামপরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘সৃষ্টিকর্তা’, রূপকপরিভাষা ‘কাঁই’, উপমানপরিভাষা ‘ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য, সূর্য’, ছদ্মনামপরিভাষা ‘অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ’ এবং অন্যান্য ছদ্মনামপরিভাষা ‘আদি, স্রষ্টা ও স্বায়ম্ভু’। এ পরিভাষাটি রূপক সাহিত্যের ‘মন’, ‘শত্রু’, ‘পালনকর্তা’ ও ‘সৃষ্টিকর্তা’ এ ৪টি বৈক্তিক সদস্যেরই ব্যাপক পরিভাষারূপে ব্যবহার হয়ে থাকে বিধায় বর্ণনার ক্ষেত্র অনুযায়ী এর সঠিকমূলক উদ্ঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন।
হর (রূপ)বি চোর, হর, তস্কর, দস্যু, thief (থিপ) kidnapper (কিডনাপার), ‘مختطف’ (মুক্তাত্বাফ) (আবি)বি সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, পিতা, জনক, creator (ক্রিয়েটর), খালিক্ব (.ﺨﺎﻟﻖ) (আভা)বি ঈশ্বর, অনন্ত, বিধাতা, স্বায়ম্ভু (বাদৈ)বি কালা, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, ব্রহ্মা, শ্যাম (আদৈ)বি আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি Lord (লর্ড), maker (মেকার), designer (ডিজাইনার) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.না বলে বা না জানিয়ে অপরের দ্রব্য আত্মসাতকারিকে হর বলা হয় ২.রূপকসাহিত্যে সৃষ্টিকর্তাকে হর বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বি অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
হরের উদাহরণ (Example of kidnapper)
“হরে কৃষ্ণ হরে রাম, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, রাম রাম হরে হরে”।
হরের সংজ্ঞা (Definition of kidnapper)
না বলে বা না জানিয়ে অপরের দ্রব্য আত্মসাতকারিকে হর বলে।
হরের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of kidnapper)
রূপকসাহিত্যে সৃষ্টিকর্তাকে হর বলে।
হরের প্রকারভেদ (Classification of kidnapper)
হর দুই প্রকার। যথা- ১.পার্থিব হর ও ২.স্বর্গীয় হর।
১. পার্থিব হর (Mundane/ tellurian kidnapper)
পার্থিবদ্রব্যাদি গোপনে আত্মসাৎকারিকে পার্থিব হর বলে। যেমন- টাকা হর ও গরু হর ইত্যাদি।
২. স্বর্গীয় হর (Heavenly/ celestial kidnapper)
মানবদেহে গোপনে অবস্থানকারী সত্তাদের স্বর্গীয় হর বলে। যেমন- সাঁই।
স্বর্গীয় হর আবার দুই প্রকার। যথা- ১.রিপু হর ও ২.উপাস্য হর।
১. রিপু হর (Foe kidnapper)
মনের মধ্যে আত্মগোপন করে অবস্থানকারী শত্রুদের রিপু হর বলে। যেমন- কাম ও ক্রোধ ইত্যাদি।
২. উপাস্য হর (Adored kidnapper)
বৈকুণ্ঠে আত্মগোপন করে অবস্থানকারী পালনকর্তা ও সৃষ্টিকর্তাকে মানবের উপাস্য হর বলে।
আবার হর দুই প্রকার। যথা- ১.উপমান হর ও ২.উপমিত হর।
১. উপমান হর (Analogical kidnapper)
না বলে বা না জানিয়ে অপরের দ্রব্য আত্মসাতকারিকে উপমান হর বলে।
২. উপমিত হর (Compared kidnapper)
রূপকসাহিত্যে সৃষ্টিকর্তাকে উপমিত হর বলে।
হরের পরিচয় (Identity of kidnapper)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের অধীন একটি ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ বিশেষ। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকায় এর ন্যূনাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এ পরিভাষাটি একেক গ্রন্থে একেক ভাষায় ব্যবহার হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠক-পাঠিকা ও শ্রোতাদের তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। সাধারণত পরদ্রব্য হরণকারী বা আত্মসাৎকারীকে হর বলা হয় কিন্তু রূপক সাহিত্যে কেবল মন, রিপু, সাঁই ও কাঁইকে হর বলা হয়। তবে এখানে কেবল কাঁইকে হর বলা হয়েছে। সাঁই ও কাঁই মানবদেহে চোরের মতো আত্মগোপন করে অবস্থান করেন বলেই এ উপাস্যদ্বয়কে হর বলা হয়।
উল্লেখ্য এ হর হতেই পুরাণীদের বিজমন্ত্র “হরে কৃষ্ণ হরে রাম।” এর উদ্ভব হয়েছে। এ মন্ত্রটির বাংলা অর্থ হলো- “কৃষ্ণ চোর রাম চোর।” কৃষ্ণ ও রাম আমাদের দেহের মধ্যে চোরের মতো অবস্থান করে বলেই রূপকসাহিত্যে এদেরকে চোর বলা হয়েছে। যেমন লালন সাঁইজি লিখেছেন- “ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে, সে কিরে সামান্য চোরা ধরবি কোনাকাঞ্ছিতে।”
কন্তিু বড় অনুতাপের বিষয় হলো সারা বিশ্বের শাস্ত্রীয় হিন্দুরা এ মন্ত্রের ইঙ্গিত অনুসরণ না করে, এমন কী ঐ দুই চোরের সন্ধানলাভ না করে, তার পরিবর্তে ঐ মন্ত্রটি জপনা করার প্রথা আবিষ্কার করেছেন। এ মন্ত্রটি দ্বারা বর্তমানে তারা ‘একনাম’ নামে বিশাল এক উৎসবেরও আয়োজন করে থাকেন। তারা একবারও চিন্তা করেন না যে, নীতি নির্ধারকরা কেন তাদের প্রধান দু’টি উপাস্যকে চোর বলে আখ্যায়িত করেছেন। এভাবেই শতাব্দ ও সহস্রাব্দের কালপিষ্টে এবং আত্মতত্ত্ব জ্ঞানহীন পুণ্যবাজ, স্বর্গবাজ, পুণ্যব্যবসায়ী ও স্বর্গব্যবসায়ী নরাধমদের বাতাবরণে পুনঃপুন পদপিষ্ট হয়েছে শাস্ত্রীয় মহাগ্রন্থাদির আত্মদর্শন ও মানবকল্যাণ। এ ভাবেই বিশ্ববিখ্যাত আত্মতাত্ত্বিক গ্রন্থাদি সুশীল সমাজ, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের নিকট পুনঃপুন হাস্য-উপহাসের পাত্রে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে।
======================================
এর সাথে সাথেই আপাতত শেষ হলো রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ৯৮ নং ‘সৃষ্টিকর্তা’ মূলকের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। অসাবধানতা ও অসতর্কতামূলক ভুল, অশালীনতা, লজ্জাস্করতা সাহিত্যের শৈল্পিক ভুলসহ সর্ব প্রকার ভুলের জন্য আমি অধম ও পুরো বলন পরিবার বিনীত ক্ষমাপ্রার্থী।
=====================================
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
সূত্রতথ্যঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন