একজন মানুষের চারটি মূল সত্ত্বা- দেহ, আত্মা, মন ও জ্ঞান।
দেহ নামক নগরের নগরকর্তা হল মন, মন চালিত করে আকারধারি মানব দেহকে, মনের
রিপু, রুদ্র, মন্দা ও দশা সব মিলিয়ে এরকম ৩৭ টা সদস্য আছে। আমরা ধীরে ধীরে
মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই স্বত্বাটির সদস্য গুলোকে জানবো।
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
প্রথম পর্ব…
১. অহংকার
অহংকার (রূপ)বি অহমিকা, গর্ব, গৌরব, বড়াই, আমিত্ব, ব্যক্তিত্ব, আত্মচেতনা, অহংজ্ঞান।
অহংকারের সংজ্ঞা
নিজকে অপরের চেয়ে মর্যাদায় বড় ধারণা করে সস্তুষ্টিলাভ করাকে অহংকার বলে।
অহংকার অত্যন্ত কঠিন অন্যায়। গর্বকারী সবার নিকট চিরঘৃণিত।
কবি যথার্থই বলেছেন-
“আপনাকে যে বড় বলে বড় সে নয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সে হয়।”
অহংকার উৎপত্তির কারণাদি
মানব মনে অহংকার উৎপত্তির অনেক কারণ থাকলেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিচে তুলে ধরব। যথা- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার।
১. জ্ঞান
দিব্যজ্ঞান ব্যতীত শুধু বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করার দ্বারা মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়। কেবল বৈষয়িকজ্ঞান অর্জনকারী দিব্যজ্ঞানহীন লোকেরা সুমধুরসুরে বক্তব্য দিতে গিয়ে মনেমনে ভাবেন তার মত সুন্দর করে অন্য কেউ বক্তব্য দিতে পারবেন না। আধ্যজ্ঞানহীন নির্বোধরাই এরূপ কল্পনা করে থাকে। তারা বড়াই করে যত ওপরে উঠতে চায় অবশেষে তারা ততই নিচে পতিত হয়।
২. কর্ম
আধ্যাত্মিকজ্ঞান না থাকার কারণে সাধারণ সাধক বা উপাসকরা যত্রতত্র যখন তখন প্রকাশ করতে থাকে যে আজ এ এভাবে উপাসনা বা সাধন করে এ এ শক্তি অর্জন করেছি বা এ এ দেখেছি। এগুলোই তাদের আত্ম অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। আবার এমনও কিছু অজ্ঞ-সাধক বা অজ্ঞ-উপাসক রয়েছে, যারা মানবদেহের অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কম্পন বা স্পন্দন সর্বদা লক্ষ্য করতে থাকে। অতঃপর অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কোন একটির সামান্য কম্পনাদি বা সামান্য ব্যতিক্রম অনুভব করলেই তারা যত্রতত্র প্রকাশ করে বেড়াতে থাকে যে আমার এ গ্রন্তির মধ্যে এ এ হচ্ছে। এগুলোই তাদের আত্ম অহমিকার প্রমাণ বা ইঙ্গিত। এসবের দ্বারা তারা সাধারণ্যের নিকট ক্রমেক্রমে মর্যাদাহানী হতে থাকে। দিব্যজ্ঞানী সুবিজ্ঞ সাধু সন্ন্যাসিগণ কখনো এরূপ করেন না।
৩. বংশ
বংশ বা গোত্রের কারণেও মনের মধ্যে আত্ম অহমিকার সৃষ্টি হয়। দিব্যজ্ঞান না থাকার কারণেই তারা যেখানে সেখানে বলে বসে আমি অমুক উচ্চবংশের সন্তান, আমার বাবার এ এ ছিল, আমাদের সাতপুরুষ ছিলেন গুরু বা গোঁসাই ইত্যাদি। আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন অজ্ঞরাই সর্বদা বংশ গৌরবে মত্ত থাকে। জ্ঞানহীন লোক যে পশুতুল্য তারা তা একবারও ভেবে দেখে না।
৪. সৌন্দর্য
বিদ্যাহীনরা প্রায় সময়ই স্ব-স্ব রূপ ও যৌবনের গৌরব করে। দৈহিক গঠন ও রূপলাবণ্যের গৌরব যারা করে তারা একবারও ভেবে দেখে না যে মাত্র কয়েক বছর পরই এ রূপলাবণ্যে এমন ভাটা পড়বে যে কেউ তার প্রতি ফিরেও দেখবে না। একমাত্র মূর্খদের মুখেই এরূপ রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোভা পায়। আবার অনেক সময় মূর্খ শিষ্যদের মুখেও তাদের গুরু-গোঁসাই-গণের রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোনা যায়। জ্ঞান ও সাধনহীন রূপ-লাবণ্য পূজারী গুরু-গোঁসাইয়ের লাবণ্য ও মাধুরির বর্ণনা করতে গিয়ে মূর্খ শিষ্যরা যে লোক সমাজে ক্রমেক্রমে হাসি ও ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হচ্ছে তাতে তাদের কোন দৃষ্টি নেই। নিজের ও প্রিয়জনের রূপ-লাবণ্যের বর্ণনা করাও আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
৫. শক্তি
বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সমিতি বা সংসদের বড়বড় পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তারা প্রায় সময় তাদের ক্ষমতার দ্বারা গর্ববোধ প্রকাশ করে বা বড়াই করে কথা বলে থাকেন। এ পদশক্তি ব্যবহার করে তার অধীনস্থ অঞ্চলের সর্বত্র শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তাই তাকে এরূপ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে এরূপ জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা পদশক্তির অপব্যবহার বা পদশক্তির গর্ববোধ প্রকাশ করতে থাকে। তারা একবার ভেবে দেখে না যে এ পদশক্তি মাত্র কয়েক বছরের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে যদি শক্তির সৎব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং যদি শক্তির অসৎ ব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদ হতে অনেক নিচে নিক্ষেপ করা হবে।
৬. সম্পদ
সম্পদশালী ও বিত্তবানরা প্রায়ই তাদের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে থাকে। সম্পদশালিরা তাদের সম্পদের বড়াই করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। আবার অনেক মূর্খ শিষ্যরাও তাদের বিত্তবান গুরু-গোঁসাইয়ের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে। তারা বলেÑ “আমাদের বাবাজানের এ আছে! সে আছে” ইত্যাদি। এগুলো বলা তাদের আত্মগর্ব বৈ কিছু নয়। সম্পদের অধিকারিরা কখনো এরূপ চিন্তা করে না যে তার সম্পদের ওপর কোন কোন অধীনস্থের কী কী স্বত্ব রয়েছে। প্রাপকদের স্বত্বাদি আদৌ সঠিকরূপে প্রদান করা হয়েছে কী না? তারা প্রায়ই অপরের স্বত্বাদি হরণ করে সম্পদের গর্বে মত্ত থাকে। সম্পদের গর্ব করা নিঃসন্দেহে আত্ম অহংকার।
৭. জনবল
যে ব্যক্তির জনবল অধিক সে ব্যক্তি প্রায়ই গর্ব বা দম্ভ প্রকাশ করে কথা বলে বেড়ায় সর্বত্র। আবার আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু-গোঁসাইরাও প্রায় তাদের শিষ্য সংখ্যাধিক্যের দাম্ভিক্য প্রকাশ করে থাকে যত্রতত্র। যাদের শিষ্যসংখ্যা স্বল্প তাদের তারা গণনায় রাখে না। জনবল থাকা সত্ত্বেও যে গর্ব করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। যে কোন ব্যক্তির জনবলের গর্ব করা প্রকাশ্য অহংকারের বহিঃপ্রকাশ।
৮. অলংকার
উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করেও পুনঃপুন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে পথ চলে এবং যত্রতত্র উত্তম বসন বা অলংকারাদির গর্ব প্রকাশ করে। এ অলংকারটির মূল্য এতো, এটি বিদেশী, এ বসন অমুক দেশ হতে আনিয়েছি ইত্যাদি। উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করে এরূপ কথা বলাও আত্ম অহমিকা বা আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ বৈ নয়।
অহংকারের লক্ষণাদি
আত্ম অহংকার বা আত্ম অহমিকার অনেক প্রকার লক্ষণ বা চিহ্ন রয়েছে নিচে কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১. সত্য বিষয় মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
২. সত্যপথের গুরু গোঁসাইয়ের নিয়মনীতি মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৩. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে লজ্জাবোধ করা।
৪. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে না চাওয়া। যেমন- নিজের পাদুকাটাও পরিষ্কার করতে মনে না চাওয়া।
৫. সত্য বিচার মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৬. নিজের অন্যায় প্রমাণীত হওয়ার পরও স্বীকার করতে মনে না চাওয়া।
৭. প্রতিবেশীদের সাথে মিলেমিশে চলতে মনে না চাওয়া।
৮. যার যার প্রাপ্যাদি যথাযথ প্রদান করতে মনে না চাওয়া।
৯. কেউ তিরস্কার করলে বা কষ্ট দিলে তা সহ্য করতে না পারা।
১০. সমাজের নিচু শ্রেণির নিঃস্ব ও অসহায় লোকদের নিকটে বসতে না দেওয়া।
১১. কেউ কোন উপদেশ দিলে তা ভ্র-কুঞ্চিত করে অবহেলা করা।
১২. আত্মীয় স্বজন বা সাক্ষাত প্রার্থিদের সাথে দেখা করতে না যাওয়া।
১৩. কাহাকেও সাক্ষাত সম্বোধন না করা।
১৪. অন্যান্যদের অবজ্ঞার চক্ষে দেখা।
১৫. সাধারণ লোকদের সাথে ইতরপ্রাণিরূপ আচরণ করা।
বর্তমান সমাজে এমনও লোক দেখা যায় যে সামান্য একটি বৃত্তি করে বা সামান্য একটু লেখাপড়া করে নিজের পরিবারের জন্যও হাটের পণ্যাদি ক্রয় করে ঝুলিতে ভরে হাতে বহন করতে চায় না। এটা স্পষ্ট আত্মঅহমিকার চিহ্ন। সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে এরূপ অহংকার রোগ সবচেয়ে অধিক। আবার কিছু কিছু মূর্খ গুরু-গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিদের মধ্যেও এ আত্ম অহমিকা রোগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মধ্য প্রাচ্যের শাস্ত্রাদির মধ্যে কথিত আছে- “হযরত মুহাম্মদ নিজে উঠ ও ছাগল ইত্যাদি চরাতেন, এসব পশুদের খাদ্যপানীয় দিতেন, উট ও ছাগলের দুগ্ধ দোহন করে তা হাটে বিক্রি করে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে তা নিজের হাতে বহন করে আনতেন। তিনি নিজের ঘর নিজেই ঝাড়– দিতেন। স্ত্রী ও দাস দাসীদের প্রায় সর্ব কাজেই অংশগ্রহণ করতেন। অতিথিদের নিজ হাতে পানাহার করাতেন। তিনি নিজের হাতে কাপড়-চোপড় ধৌত করতেন। অথচ তিনি ছিলেন- পৃথিবীর সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান ব্যক্তিত্ব। আমাদের বর্তমান সমাজের কথিত গুরু গোঁসাই, সাধু সাঁইজি ও সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতরা, যারা তাঁরই কথিত মহানবাণিগুলো প্রচার ও প্রসার করেন তারাই কী এরূপ কার্যাদি করে থাকেন? কখনো করেন না। এসব কার্যাদি তারা তাদের অনুসারিদের দিয়ে করিয়ে নেন। তারা এসব কাজকর্মাদি করলে লজ্জায় বা ব্রীড়ায় মূর্ছিত হয়ে যাবেন। আবার আমাদের সমাজে কিছু গুরু-গোঁসাই দেখা যায় তারাও নিজে হাতে সামান্য জলটুকুও ঢেলে পান করতে চান না। এসবই তাদের দিব্যজ্ঞানের অজ্ঞতা এবং আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক অহংকারী সাঁইজির ঘটনা
একজন ভণ্ড সাঁইজি এক থাম্বারের (স্টেশন. station) উচ্চ শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করছিলেন। তার সাতে কয়েকজন পরিচারক ছিল। কয়েকজন পরিচারক তার একার সেবা করেও কেউ সামান্য অবকাশও পাচ্ছিল না। একজন পাখা দ্বারা বাতাস করছে একজন পান প্রস্তুত করছে একজন তার বিছানার পার্শ্বে তার আদেশাদি পালনের জন্য করজোড়ে সদা প্রস্তুত রয়েছে এবং আরো একজন তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার জন্য বিপণিতে গেছে। সাধারণ লোকজন এসব দৃশ্য দেখে তাকে দেখার জন্য সবাই ভীড় করতে লাগল। মনে হয় যেন সাইজি কোন উচ্চবংশের লাটনন্দন হবেন। ৪০ নিচের বয়সের লালবর্ণের সাইজি একটার পর একটা পান খেয়ে ঠোঁট দু’টি লাল করে রেখেছেন। উক্ত স্থানে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলেও তার মুখে কোন জ্ঞানের কথা নেই। কোন লোক জনকে বসার জন্যও বললেন না। কোন লোকের সাথে একটি কথাও বললেন না। বর্ণিত সবই জ্ঞানহীন সাইজির আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক পণ্ডিতের ঘটনা
একজন নামধারী সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত হাটে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন বটে কিন্তু একজন শিষ্যের অভাবে এক খিলি পান এনে খেতে পারলেন না। বারুইয়ের নিকট হতে পানের খিলি চেয়ে নিলে তিনি লজ্জায় মূর্ছা যেতে পারেন। অজ্ঞ ও খুষ্কমূষ্ক নামধারী ও ভেকধারী সাধু ও পণ্ডিতদের মধ্যে কী পরিমাণ আত্ম অহমিকা রয়েছে এসবই তার প্রমাণ।
অহংকারী পণ্ডিতের ঘটনা
সাম্প্রদায়িক একজন ভণ্ডপণ্ডিত তার এক ভৃত্য না থাকায় প্রায় ঘণ্টাকাল অবধি বর্চ্যরে প্রবল বেগসহ বর্চ্যরে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরিচারক এলে তাকে বললেন- “তুই আমার কাপড়টা নষ্ট করার উপক্রম করেছিস!” ভৃত্য বলল- “পণ্ডিতজি ঠেকাবশতঃ বদনাটা নিজ হাতে তুলে নিলে আপনার মান সম্মানের কী কোন দোষ হতো!” পণ্ডিত বললেন- “গর্ধবটা! তুই কয়েক বছর ধরে আমার কাছে আছিস! কোন সময় নিজ হাতে বদনা নিতে দেখেছিস! নিজ হাতে বদনা নিয়ে বর্চ্যে যাওয়া কী আমার পক্ষে শোভা পায়!”
এক ভেকধারী সাঁইজির ঘটনা
একদিন এক ভণ্ড সাঁইজি আমাদের বাসায় অতিথিরূপে আগমন করলেন। আমার ভাতিজাসহ তার আসার কথা ছিল তাই তাকে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তা না হলে তাকে আমাদের বাসায় নিমন্ত্রণের প্রশ্নই আসে না। তার আগমনের কথা শুনে কয়েকজন পাঠক শিষ্য এসে উপস্থিত হলো। অজ্ঞ সাঁইজি আমাদের জ্ঞানগত দর্শনগত ও পারম্পরিক অবস্থাদি না জেনে ও না শুনেই অশুদ্ধ ও গোজামিল দ্বারা লালনবাণী শোনাতে আরম্ভ করলেন। কেউ দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাইলে বা কেউ দুয়েকটা ভুল ধরে বসলেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং প্রশ্নকারিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন। ভীতি প্রদর্শন করার জন্য তিনি বলেন যে- “অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক অধ্যাপক আমার সামনে কথা বলতে সাহস পান না। অমুক বিশ্বাবিদ্যালয়ের অমুক অমুক শিক্ষক আমার বাড়িতে গিয়ে বসে বসে আমার কথা শ্রবণ করে দিশে পান না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাশ নিই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত ছাত্রদের সক্সেগ বসে বসে আমার লেকসার শুনেন ইত্যাদি।” কিছুক্ষণ পরে চা পরিবেশন করা হলো তিনি আমাদের পরিবেশিত কাপে চা পান করলেন না। তিনি তার ঝুলির মধ্যে হতে কাপ বের করে তাতে করে চা পান করলেন। তিনি একা একা প্রলাপ করে রাত একটা বাজিয়ে দিলেন। তবুও কেউ কিছু জানতে চাইলেই তিনি বলতেন এখানে হোটেল থাকলে হোটেলে গিয়ে উঠতাম। এগুলো পুরটাই ভণ্ড ও অজ্ঞ সাঁইজিদের আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ। ওপরোক্ত দৃষ্টান্তাদি সবই আত্ম অহমিকা বা দম্ভ বা গর্ববোধের লক্ষণ ও প্রমাণ।
অহংকার তাড়ানোর উপায়
দু প্রকারে অহংকার তাড়ানো যায়। যথা- ১.জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো ও ২.কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো।
১. জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো
যে ব্যক্তির মনে আমিত্বের উৎপত্তি হয় তার চিন্তা করা উচিৎ কোন্ কারণে তার মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়েছে? যদি জ্ঞানের কারণে অহমিকার উৎপত্তি হয়ে থাকে তবে তাকে তার চেয়ে উচ্চজ্ঞানিদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে এবং মনকে বলতে হবে আমার চেয়েও অধিকজ্ঞানী লোক পৃথিবীতে রয়েছেন তবে তারা তো এরূপ অহমিকা দেখায় না। তবেই মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে।
২. কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো
মনের মধ্যে যদি উত্তম কর্ম দ্বারা অহমিকার উৎপত্তি হয় তবে মনকে বলতে হবে আমার কর্মের চেয়েও অনেক অনেক অধিক ভালো কর্মী মহান ব্যক্তিও পৃথিবীতে রয়েছেন। তাদের দ্বারা তো এরূপ অহমিকা প্রকাশ পায় না। তবে ক্রমেক্রমে মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে। এছাড়াও- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার ইত্যাদি দ্বারা মনে অহমিকার উৎপত্তি হলে এগুলো কেন দেওয়া হয়েছে! এগুলো কী কী কাজে ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি একটু ভালোভাবে চিন্তা করলেও মনের মাঝে উদিত অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। যাকে দেখলে অহংকার সৃষ্টি হয় তাকে সম্মান প্রদর্শন করলে আত্ম অহমিকা হ্রাস পায়। যে বিষয়ে মনে অহংকারের উৎপত্তি হয় সে বিষয়ে আরো বিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাথে আলোচনা করলে অহংকার অনেকাংশে হ্রাস পেতে থাকে। এছাড়াও একজন দিব্যজ্ঞানী পাকা গুরুদেবের নিকট হতে মানসপট অপবিত্রকারী বা নষ্টকারী রিপু রুদ্র মন্দা ও দশা সম্পর্কে একবার ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করলে মনের অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
যেসব প্রয়োজনীয় কাজকর্মাদি করতে লজ্জাবোধ হয় সেসব কার্যাদি নিজ হাতে অধিক অধিকরূপে করা। যেমন- গুরু, গোঁসাই ও পণ্ডিতদের মাঝে মাঝে পরিবারের গরু, ছাগল, কুকুর বিড়ালকে খাদ্যপানীয় দেওয়া, তাদের স্নান করানো ও দুগ্ধ দোহন করা। নিজেদের ঘর দুয়ার ঝাড়– দেওয়া, নিজের কাপড় চোপড় নিজ হাতে ধৌত করা, নিজের গায়ে নিজে পাখা দ্বারা বাতাস করা, স্ত্রীদের সাথে মাঝে মাঝে ঘরের বিভিন্ন কাজকর্মে অংশগ্রহণ করা, অতিথিদেরকে নিজ হাতে খাদ্যাদি পরিবেশন করা, হাট হতে মাঝেমাঝে নিজ হাতে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে আনা ইত্যাদি। এরূপে কিছুদিন সংসারের ছোটখাট কাজকর্মাদি করতে থাকলে আত্ম অহমিকার মাত্রা ক্রমেক্রমে অন্তর হতে হ্রাস পেতে থাকবে।
প্রত্যেক ব্যক্তির জেনে রাখা উচিৎ যে ওপরে উল্লিখিত কার্যাদি সঠিকভাবে নিজে নিজে করা বড়ই কঠিন এজন্য একজন দিব্যজ্ঞানী পাকাগুরু বা গোঁসাইয়ের সহচার্য গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। বিজ্ঞ দিব্যজ্ঞানী গুরু ব্যতীত মনের এসব রোগ ব্যাধি প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থাৎ সব সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে থেকে একজন পাকা গুরুদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে একজন রোগী যেভাবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধপথ্য গ্রহণ করে শারীরিক রোগব্যাধি উপশম করে তদ্রপ তুমিও পাকা গুরুদেবের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের মনের রোগ ব্যাধি উপশম করো। আরো উল্লেখ করা যায় যে একজন পণ্ডিতব্যক্তি সাধারণ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমি জ্ঞানী এবং এ ব্যক্তি নিরক্ষর তবুও আমরা উভয় বিভিন্ন প্রকার পাপাদি কর্মে লিপ্ত আছি তবে নিরক্ষরব্যক্তি পাপাদি করে না জেনে এবং আমি পাপাদি করি জেনে বুঝে বিধায় নিরক্ষরব্যক্তি আমার চেয়ে অনেক উত্তম।
আবার নিরক্ষর উপাসকব্যক্তি কোন পণ্ডিতব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি পণ্ডিত এবং আমি নিরক্ষর তিনি উপাসনা করেন জেনে ও বুঝে কিন্তু আমি উপাসনা করি না জেনে ও না বুঝে কাজেই আমি যতই উপাসনা করি না কেন আমার মর্যাদা পণ্ডিতব্যক্তি উপাসনা না করলেও তার মর্যাদা হতে অনেক নিচে। আবার অধিক বয়সিব্যক্তি কোন অল্প বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমার বয়স অধিক এবং এ ব্যক্তির বয়স স্বল্প আমি যতদিন ধরে পাপাদি করছি এ ব্যক্তি ততদিন ধরে পাপ কার্যাদি করে না। কাজেই আমার বয়স অধিক হোলেও আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। আবার অল্প বয়সিব্যক্তি কোন অধিক বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি বয়সে আমার চেয়ে অনেক অধিক এ ব্যক্তি যতদিন ধরে উপাসনা করছে আমি ততদিন উপাসনা করার সময় পাইনি। কাজেই আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। জ্ঞান দ্বারা নিজের মনকে এরূপ প্রশিক্ষণ না দিলে মনের গভীর তলদেশ হতে নিজের আমিত্ব বা অহংকার কখনই বিতাড়িত করা যায় না। যারা শুধু মুখে বলে আমি নগন্যব্যক্তি, আমি জঘন্যব্যক্তি, আমি পাপিব্যক্তি, আমি অধমব্যক্তি ইত্যাদি তারা প্রকাশ্য কপটব্যক্তি। তাদের মনের মধ্যেই অহংকার নামক রোগটি অত্যধিক।
যেমন একজন সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত বক্তা বক্তব্য আরম্ভ করার পূর্বে প্রায় বলে থাকে “আমিপাপী ও অধমব্যক্তি, আমি অনুপযুক্ত ব্যক্তি, আমি আর আপনাদের কী বক্তব্য শোনাব! তখন একজন শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে যদি বলেন যে আপনি আপনি দয়া করে বসুন। আপনি যখন পাপী, অধম ও অনুপযুক্ত তখন আপনার বক্তব্য না শুনে আমরা একজন উপযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শুনব। তবেই উক্ত বক্তার ভিতরের প্রকৃত রূপটা জানা যাবে বক্তার চোখেমুখে রক্ত আসে কী না? আর যদি তিনি গুরু হয়ে থাকেন তবে তার ভক্তদের দাপটে টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে যাবে। এরূপ বক্তা ও গুরু-গোঁসাইরা বাহ্যিকভাবে নম্রতা প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই অধিক অহংকারী তাতে কোন সন্দেহ নেই।
উল্লেখ্য পণ্ডিত, বক্তা, গুরু ও গোঁসাই দুই প্রকার। যথা- ১.ভণ্ড ও ২.দিব্যজ্ঞানী। যারা অজ্ঞ ও ভণ্ড তারাই মূলত আত্ম অহমিকার বেড়াজালে আবদ্ধ কিন্তু যাঁরা বিজ্ঞ ও দিব্যজ্ঞানী তাঁরা মনের সর্ব প্রকার অহমিকা হতে চিরমুক্ত। মনের অহংকাররূপ কঠিন ব্যাধি হতে পরিত্রাণ লাভের জন্য প্রথমে আত্মতত্ত্ব ও পরে আপনার লালনকে অবশ্যই চিনতে হবে। মনকে বুঝাতে হবে আমি কিভাবে শূন্য হতে সৃষ্টি হয়েছি প্রয়াণের পর আমার দেহটি পড়ে গলে পোকা মাকড়ের খাদ্যে পরিণত হবে। আবার আমার সমস্ত দেহই মূল্যহীন কেননা সারাপেট অত্যন্ত দুর্গন্ধময় মল ও জলে পরিপূর্ণ। ফলে আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষের পক্ষে কখনই আত্ম অহমিকা বা অহংকার করা উচিৎ নয়।যেমন কোন কবি বলেছেন-
“ধন জন যৌবন মিছে অহংকার
নয়ন মুদলে পরে কেউ নয় কার”।
অন্য কবি বলেছেন-
“কে বলে মানুষ বড় বুদ্ধিমান
বুদ্ধি থাকলে কী হয়
মরলে কে করে তার সন্ধান।
জন্ম নিলে মরণ আছে
বরং দুইদিন আগে পাছে
চিরদিন কেউ না বাঁচে
কেউ না করে তার বিধান।
তবু যারা মানুষ মরে
তার স্বভাব এ সংসারে
লভ্য বিদ্যাবুদ্ধির জোরে
শেল বন্দুক কলের কামান।
সত্য বিদ্যাবুদ্ধির ফলে
আকাশে উড়ে কৌশলে
থাকতে পারে জলে-স্থলে
আজব এ বিজ্ঞান।
বেশি নয় দিন দু’চারি
জাকজমকের বাহাদুরি
তারাও মরে আমরাও মরি
শেষকালে ফল এক সমান।”
মানব মনের মরণব্যাধি আত্ম অহমিকা বা অহংকার হতে বেঁচে থাকা সবার অবশ্যই প্রয়োজন।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি
মনের মন্দ স্বভাবগুলোকে মন্দা বলা হয়, রুপক সাহিত্যে মন্দার গুরুত্ব অত্যধিক, এই মন্দা স্বভাবগুলো মন থেকে দূর করা প্রতিটি মানুষের জন্য আবশ্যক। মন্দ স্বভাবগুলো দূর না করলে ক্রমান্বয়ে এগুলো মানুষকে পশুত্বের দুয়ারে উপনীত করে, নিচে মন্দাদির সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হল…
মন্দা
মন্দা (রূপ)বি মন্দ, হ্রাস, অবনতি, পন্য দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (মবা) দুষ্টলোক, মন্দলোক বিণ পণ্যদ্রব্যের মূল্যের অবনতি।
মন্দার সংজ্ঞা
ক্রম নিম্নগমনে বাধ্যকারী বিষয়-বস্তুকেই মন্দা বলে। যেমন- হিংসা।
মন্দার প্রকারভেদ
মন্দা ১০ প্রকার। যথা- ১.অহংকার ২.হিংসা ৩. শত্রুতা ৪.রাগ ৫.কুৎসা ৬.লিপ্সা ৭.মিথ্যা ৮.কৃপণতা ৯.কলা ও ১০.আমিত্ব।
প্রথম পর্ব…
১. অহংকার
অহংকার (রূপ)বি অহমিকা, গর্ব, গৌরব, বড়াই, আমিত্ব, ব্যক্তিত্ব, আত্মচেতনা, অহংজ্ঞান।
অহংকারের সংজ্ঞা
নিজকে অপরের চেয়ে মর্যাদায় বড় ধারণা করে সস্তুষ্টিলাভ করাকে অহংকার বলে।
অহংকার অত্যন্ত কঠিন অন্যায়। গর্বকারী সবার নিকট চিরঘৃণিত।
কবি যথার্থই বলেছেন-
“আপনাকে যে বড় বলে বড় সে নয়
লোকে যারে বড় বলে বড় সে হয়।”
অহংকার উৎপত্তির কারণাদি
মানব মনে অহংকার উৎপত্তির অনেক কারণ থাকলেও আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু কারণ নিচে তুলে ধরব। যথা- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার।
১. জ্ঞান
দিব্যজ্ঞান ব্যতীত শুধু বৈষয়িকজ্ঞান অর্জন করার দ্বারা মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়। কেবল বৈষয়িকজ্ঞান অর্জনকারী দিব্যজ্ঞানহীন লোকেরা সুমধুরসুরে বক্তব্য দিতে গিয়ে মনেমনে ভাবেন তার মত সুন্দর করে অন্য কেউ বক্তব্য দিতে পারবেন না। আধ্যজ্ঞানহীন নির্বোধরাই এরূপ কল্পনা করে থাকে। তারা বড়াই করে যত ওপরে উঠতে চায় অবশেষে তারা ততই নিচে পতিত হয়।
২. কর্ম
আধ্যাত্মিকজ্ঞান না থাকার কারণে সাধারণ সাধক বা উপাসকরা যত্রতত্র যখন তখন প্রকাশ করতে থাকে যে আজ এ এভাবে উপাসনা বা সাধন করে এ এ শক্তি অর্জন করেছি বা এ এ দেখেছি। এগুলোই তাদের আত্ম অহংকারের বহিঃপ্রকাশ। আবার এমনও কিছু অজ্ঞ-সাধক বা অজ্ঞ-উপাসক রয়েছে, যারা মানবদেহের অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কম্পন বা স্পন্দন সর্বদা লক্ষ্য করতে থাকে। অতঃপর অনালগ্রন্থিগুলোর (লতিফা. ﻟﻄﻴﻔﺎ) কোন একটির সামান্য কম্পনাদি বা সামান্য ব্যতিক্রম অনুভব করলেই তারা যত্রতত্র প্রকাশ করে বেড়াতে থাকে যে আমার এ গ্রন্তির মধ্যে এ এ হচ্ছে। এগুলোই তাদের আত্ম অহমিকার প্রমাণ বা ইঙ্গিত। এসবের দ্বারা তারা সাধারণ্যের নিকট ক্রমেক্রমে মর্যাদাহানী হতে থাকে। দিব্যজ্ঞানী সুবিজ্ঞ সাধু সন্ন্যাসিগণ কখনো এরূপ করেন না।
৩. বংশ
বংশ বা গোত্রের কারণেও মনের মধ্যে আত্ম অহমিকার সৃষ্টি হয়। দিব্যজ্ঞান না থাকার কারণেই তারা যেখানে সেখানে বলে বসে আমি অমুক উচ্চবংশের সন্তান, আমার বাবার এ এ ছিল, আমাদের সাতপুরুষ ছিলেন গুরু বা গোঁসাই ইত্যাদি। আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন অজ্ঞরাই সর্বদা বংশ গৌরবে মত্ত থাকে। জ্ঞানহীন লোক যে পশুতুল্য তারা তা একবারও ভেবে দেখে না।
৪. সৌন্দর্য
বিদ্যাহীনরা প্রায় সময়ই স্ব-স্ব রূপ ও যৌবনের গৌরব করে। দৈহিক গঠন ও রূপলাবণ্যের গৌরব যারা করে তারা একবারও ভেবে দেখে না যে মাত্র কয়েক বছর পরই এ রূপলাবণ্যে এমন ভাটা পড়বে যে কেউ তার প্রতি ফিরেও দেখবে না। একমাত্র মূর্খদের মুখেই এরূপ রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোভা পায়। আবার অনেক সময় মূর্খ শিষ্যদের মুখেও তাদের গুরু-গোঁসাই-গণের রূপলাবণ্যের গৌরবগাথা শোনা যায়। জ্ঞান ও সাধনহীন রূপ-লাবণ্য পূজারী গুরু-গোঁসাইয়ের লাবণ্য ও মাধুরির বর্ণনা করতে গিয়ে মূর্খ শিষ্যরা যে লোক সমাজে ক্রমেক্রমে হাসি ও ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হচ্ছে তাতে তাদের কোন দৃষ্টি নেই। নিজের ও প্রিয়জনের রূপ-লাবণ্যের বর্ণনা করাও আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
৫. শক্তি
বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সমিতি বা সংসদের বড়বড় পদে অধিষ্ঠিত কর্মকর্তারা প্রায় সময় তাদের ক্ষমতার দ্বারা গর্ববোধ প্রকাশ করে বা বড়াই করে কথা বলে থাকেন। এ পদশক্তি ব্যবহার করে তার অধীনস্থ অঞ্চলের সর্বত্র শান্তি ও শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে তাই তাকে এরূপ পদে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে এরূপ জ্ঞান না থাকার কারণেই তারা পদশক্তির অপব্যবহার বা পদশক্তির গর্ববোধ প্রকাশ করতে থাকে। তারা একবার ভেবে দেখে না যে এ পদশক্তি মাত্র কয়েক বছরের জন্য তাকে দেওয়া হয়েছে যদি শক্তির সৎব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করা হবে এবং যদি শক্তির অসৎ ব্যবহার করা হয় তবে তাকে উক্ত পদ হতে অনেক নিচে নিক্ষেপ করা হবে।
৬. সম্পদ
সম্পদশালী ও বিত্তবানরা প্রায়ই তাদের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে থাকে। সম্পদশালিরা তাদের সম্পদের বড়াই করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। আবার অনেক মূর্খ শিষ্যরাও তাদের বিত্তবান গুরু-গোঁসাইয়ের সম্পদের বড়াই করে কথা বলে। তারা বলেÑ “আমাদের বাবাজানের এ আছে! সে আছে” ইত্যাদি। এগুলো বলা তাদের আত্মগর্ব বৈ কিছু নয়। সম্পদের অধিকারিরা কখনো এরূপ চিন্তা করে না যে তার সম্পদের ওপর কোন কোন অধীনস্থের কী কী স্বত্ব রয়েছে। প্রাপকদের স্বত্বাদি আদৌ সঠিকরূপে প্রদান করা হয়েছে কী না? তারা প্রায়ই অপরের স্বত্বাদি হরণ করে সম্পদের গর্বে মত্ত থাকে। সম্পদের গর্ব করা নিঃসন্দেহে আত্ম অহংকার।
৭. জনবল
যে ব্যক্তির জনবল অধিক সে ব্যক্তি প্রায়ই গর্ব বা দম্ভ প্রকাশ করে কথা বলে বেড়ায় সর্বত্র। আবার আধ্যাত্মিকজ্ঞানহীন একদল ভণ্ড গুরু-গোঁসাইরাও প্রায় তাদের শিষ্য সংখ্যাধিক্যের দাম্ভিক্য প্রকাশ করে থাকে যত্রতত্র। যাদের শিষ্যসংখ্যা স্বল্প তাদের তারা গণনায় রাখে না। জনবল থাকা সত্ত্বেও যে গর্ব করে না এরূপ লোকের সংখ্যা অতি নগন্য। যে কোন ব্যক্তির জনবলের গর্ব করা প্রকাশ্য অহংকারের বহিঃপ্রকাশ।
৮. অলংকার
উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করেও পুনঃপুন তার প্রতি দৃষ্টিপাত করে পথ চলে এবং যত্রতত্র উত্তম বসন বা অলংকারাদির গর্ব প্রকাশ করে। এ অলংকারটির মূল্য এতো, এটি বিদেশী, এ বসন অমুক দেশ হতে আনিয়েছি ইত্যাদি। উত্তম বসন বা অলংকারাদি পরিধান করে এরূপ কথা বলাও আত্ম অহমিকা বা আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ বৈ নয়।
অহংকারের লক্ষণাদি
আত্ম অহংকার বা আত্ম অহমিকার অনেক প্রকার লক্ষণ বা চিহ্ন রয়েছে নিচে কয়েকটি তুলে ধরা হলো-
১. সত্য বিষয় মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
২. সত্যপথের গুরু গোঁসাইয়ের নিয়মনীতি মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৩. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে লজ্জাবোধ করা।
৪. ছোটখাট কাজকর্ম করতে মনে না চাওয়া। যেমন- নিজের পাদুকাটাও পরিষ্কার করতে মনে না চাওয়া।
৫. সত্য বিচার মেনে নিতে মনে না চাওয়া।
৬. নিজের অন্যায় প্রমাণীত হওয়ার পরও স্বীকার করতে মনে না চাওয়া।
৭. প্রতিবেশীদের সাথে মিলেমিশে চলতে মনে না চাওয়া।
৮. যার যার প্রাপ্যাদি যথাযথ প্রদান করতে মনে না চাওয়া।
৯. কেউ তিরস্কার করলে বা কষ্ট দিলে তা সহ্য করতে না পারা।
১০. সমাজের নিচু শ্রেণির নিঃস্ব ও অসহায় লোকদের নিকটে বসতে না দেওয়া।
১১. কেউ কোন উপদেশ দিলে তা ভ্র-কুঞ্চিত করে অবহেলা করা।
১২. আত্মীয় স্বজন বা সাক্ষাত প্রার্থিদের সাথে দেখা করতে না যাওয়া।
১৩. কাহাকেও সাক্ষাত সম্বোধন না করা।
১৪. অন্যান্যদের অবজ্ঞার চক্ষে দেখা।
১৫. সাধারণ লোকদের সাথে ইতরপ্রাণিরূপ আচরণ করা।
বর্তমান সমাজে এমনও লোক দেখা যায় যে সামান্য একটি বৃত্তি করে বা সামান্য একটু লেখাপড়া করে নিজের পরিবারের জন্যও হাটের পণ্যাদি ক্রয় করে ঝুলিতে ভরে হাতে বহন করতে চায় না। এটা স্পষ্ট আত্মঅহমিকার চিহ্ন। সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের মধ্যে এরূপ অহংকার রোগ সবচেয়ে অধিক। আবার কিছু কিছু মূর্খ গুরু-গোঁসাই ও সাধু সাঁইজিদের মধ্যেও এ আত্ম অহমিকা রোগের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মধ্য প্রাচ্যের শাস্ত্রাদির মধ্যে কথিত আছে- “হযরত মুহাম্মদ নিজে উঠ ও ছাগল ইত্যাদি চরাতেন, এসব পশুদের খাদ্যপানীয় দিতেন, উট ও ছাগলের দুগ্ধ দোহন করে তা হাটে বিক্রি করে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে তা নিজের হাতে বহন করে আনতেন। তিনি নিজের ঘর নিজেই ঝাড়– দিতেন। স্ত্রী ও দাস দাসীদের প্রায় সর্ব কাজেই অংশগ্রহণ করতেন। অতিথিদের নিজ হাতে পানাহার করাতেন। তিনি নিজের হাতে কাপড়-চোপড় ধৌত করতেন। অথচ তিনি ছিলেন- পৃথিবীর সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান ব্যক্তিত্ব। আমাদের বর্তমান সমাজের কথিত গুরু গোঁসাই, সাধু সাঁইজি ও সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতরা, যারা তাঁরই কথিত মহানবাণিগুলো প্রচার ও প্রসার করেন তারাই কী এরূপ কার্যাদি করে থাকেন? কখনো করেন না। এসব কার্যাদি তারা তাদের অনুসারিদের দিয়ে করিয়ে নেন। তারা এসব কাজকর্মাদি করলে লজ্জায় বা ব্রীড়ায় মূর্ছিত হয়ে যাবেন। আবার আমাদের সমাজে কিছু গুরু-গোঁসাই দেখা যায় তারাও নিজে হাতে সামান্য জলটুকুও ঢেলে পান করতে চান না। এসবই তাদের দিব্যজ্ঞানের অজ্ঞতা এবং আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক অহংকারী সাঁইজির ঘটনা
একজন ভণ্ড সাঁইজি এক থাম্বারের (স্টেশন. station) উচ্চ শ্রেণিকক্ষে অবস্থান করছিলেন। তার সাতে কয়েকজন পরিচারক ছিল। কয়েকজন পরিচারক তার একার সেবা করেও কেউ সামান্য অবকাশও পাচ্ছিল না। একজন পাখা দ্বারা বাতাস করছে একজন পান প্রস্তুত করছে একজন তার বিছানার পার্শ্বে তার আদেশাদি পালনের জন্য করজোড়ে সদা প্রস্তুত রয়েছে এবং আরো একজন তার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ক্রয় করার জন্য বিপণিতে গেছে। সাধারণ লোকজন এসব দৃশ্য দেখে তাকে দেখার জন্য সবাই ভীড় করতে লাগল। মনে হয় যেন সাইজি কোন উচ্চবংশের লাটনন্দন হবেন। ৪০ নিচের বয়সের লালবর্ণের সাইজি একটার পর একটা পান খেয়ে ঠোঁট দু’টি লাল করে রেখেছেন। উক্ত স্থানে দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করলেও তার মুখে কোন জ্ঞানের কথা নেই। কোন লোক জনকে বসার জন্যও বললেন না। কোন লোকের সাথে একটি কথাও বললেন না। বর্ণিত সবই জ্ঞানহীন সাইজির আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ।
এক পণ্ডিতের ঘটনা
একজন নামধারী সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত হাটে গিয়ে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করলেন বটে কিন্তু একজন শিষ্যের অভাবে এক খিলি পান এনে খেতে পারলেন না। বারুইয়ের নিকট হতে পানের খিলি চেয়ে নিলে তিনি লজ্জায় মূর্ছা যেতে পারেন। অজ্ঞ ও খুষ্কমূষ্ক নামধারী ও ভেকধারী সাধু ও পণ্ডিতদের মধ্যে কী পরিমাণ আত্ম অহমিকা রয়েছে এসবই তার প্রমাণ।
অহংকারী পণ্ডিতের ঘটনা
সাম্প্রদায়িক একজন ভণ্ডপণ্ডিত তার এক ভৃত্য না থাকায় প্রায় ঘণ্টাকাল অবধি বর্চ্যরে প্রবল বেগসহ বর্চ্যরে সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পরিচারক এলে তাকে বললেন- “তুই আমার কাপড়টা নষ্ট করার উপক্রম করেছিস!” ভৃত্য বলল- “পণ্ডিতজি ঠেকাবশতঃ বদনাটা নিজ হাতে তুলে নিলে আপনার মান সম্মানের কী কোন দোষ হতো!” পণ্ডিত বললেন- “গর্ধবটা! তুই কয়েক বছর ধরে আমার কাছে আছিস! কোন সময় নিজ হাতে বদনা নিতে দেখেছিস! নিজ হাতে বদনা নিয়ে বর্চ্যে যাওয়া কী আমার পক্ষে শোভা পায়!”
এক ভেকধারী সাঁইজির ঘটনা
একদিন এক ভণ্ড সাঁইজি আমাদের বাসায় অতিথিরূপে আগমন করলেন। আমার ভাতিজাসহ তার আসার কথা ছিল তাই তাকে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তা না হলে তাকে আমাদের বাসায় নিমন্ত্রণের প্রশ্নই আসে না। তার আগমনের কথা শুনে কয়েকজন পাঠক শিষ্য এসে উপস্থিত হলো। অজ্ঞ সাঁইজি আমাদের জ্ঞানগত দর্শনগত ও পারম্পরিক অবস্থাদি না জেনে ও না শুনেই অশুদ্ধ ও গোজামিল দ্বারা লালনবাণী শোনাতে আরম্ভ করলেন। কেউ দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাইলে বা কেউ দুয়েকটা ভুল ধরে বসলেই তিনি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেন এবং প্রশ্নকারিকে ধমক দিয়ে বসিয়ে রাখেন। ভীতি প্রদর্শন করার জন্য তিনি বলেন যে- “অমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক অধ্যাপক আমার সামনে কথা বলতে সাহস পান না। অমুক বিশ্বাবিদ্যালয়ের অমুক অমুক শিক্ষক আমার বাড়িতে গিয়ে বসে বসে আমার কথা শ্রবণ করে দিশে পান না। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ক্লাশ নিই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত ছাত্রদের সক্সেগ বসে বসে আমার লেকসার শুনেন ইত্যাদি।” কিছুক্ষণ পরে চা পরিবেশন করা হলো তিনি আমাদের পরিবেশিত কাপে চা পান করলেন না। তিনি তার ঝুলির মধ্যে হতে কাপ বের করে তাতে করে চা পান করলেন। তিনি একা একা প্রলাপ করে রাত একটা বাজিয়ে দিলেন। তবুও কেউ কিছু জানতে চাইলেই তিনি বলতেন এখানে হোটেল থাকলে হোটেলে গিয়ে উঠতাম। এগুলো পুরটাই ভণ্ড ও অজ্ঞ সাঁইজিদের আত্ম অহমিকার বহিঃপ্রকাশ। ওপরোক্ত দৃষ্টান্তাদি সবই আত্ম অহমিকা বা দম্ভ বা গর্ববোধের লক্ষণ ও প্রমাণ।
অহংকার তাড়ানোর উপায়
দু প্রকারে অহংকার তাড়ানো যায়। যথা- ১.জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো ও ২.কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো।
১. জ্ঞান দ্বারা অহংকার তাড়ানো
যে ব্যক্তির মনে আমিত্বের উৎপত্তি হয় তার চিন্তা করা উচিৎ কোন্ কারণে তার মনে অহংকারের উৎপত্তি হয়েছে? যদি জ্ঞানের কারণে অহমিকার উৎপত্তি হয়ে থাকে তবে তাকে তার চেয়ে উচ্চজ্ঞানিদের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে হবে এবং মনকে বলতে হবে আমার চেয়েও অধিকজ্ঞানী লোক পৃথিবীতে রয়েছেন তবে তারা তো এরূপ অহমিকা দেখায় না। তবেই মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে।
২. কর্ম দ্বারা অহংকার তাড়ানো
মনের মধ্যে যদি উত্তম কর্ম দ্বারা অহমিকার উৎপত্তি হয় তবে মনকে বলতে হবে আমার কর্মের চেয়েও অনেক অনেক অধিক ভালো কর্মী মহান ব্যক্তিও পৃথিবীতে রয়েছেন। তাদের দ্বারা তো এরূপ অহমিকা প্রকাশ পায় না। তবে ক্রমেক্রমে মনের অহমিকা হ্রাস পেতে থাকবে। এছাড়াও- ১.জ্ঞান ২.কর্ম ৩.বংশ ৪.সৌন্দর্য ৫.শক্তি ৬.সম্পদ ৭.জনবল ও ৮.অলংকার ইত্যাদি দ্বারা মনে অহমিকার উৎপত্তি হলে এগুলো কেন দেওয়া হয়েছে! এগুলো কী কী কাজে ব্যবহার করতে হবে ইত্যাদি একটু ভালোভাবে চিন্তা করলেও মনের মাঝে উদিত অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে। যাকে দেখলে অহংকার সৃষ্টি হয় তাকে সম্মান প্রদর্শন করলে আত্ম অহমিকা হ্রাস পায়। যে বিষয়ে মনে অহংকারের উৎপত্তি হয় সে বিষয়ে আরো বিজ্ঞ কোন ব্যক্তির সাথে আলোচনা করলে অহংকার অনেকাংশে হ্রাস পেতে থাকে। এছাড়াও একজন দিব্যজ্ঞানী পাকা গুরুদেবের নিকট হতে মানসপট অপবিত্রকারী বা নষ্টকারী রিপু রুদ্র মন্দা ও দশা সম্পর্কে একবার ভালোভাবে জ্ঞানার্জন করলে মনের অহংকার ক্রমেক্রমে হ্রাস পেতে থাকে।
যেসব প্রয়োজনীয় কাজকর্মাদি করতে লজ্জাবোধ হয় সেসব কার্যাদি নিজ হাতে অধিক অধিকরূপে করা। যেমন- গুরু, গোঁসাই ও পণ্ডিতদের মাঝে মাঝে পরিবারের গরু, ছাগল, কুকুর বিড়ালকে খাদ্যপানীয় দেওয়া, তাদের স্নান করানো ও দুগ্ধ দোহন করা। নিজেদের ঘর দুয়ার ঝাড়– দেওয়া, নিজের কাপড় চোপড় নিজ হাতে ধৌত করা, নিজের গায়ে নিজে পাখা দ্বারা বাতাস করা, স্ত্রীদের সাথে মাঝে মাঝে ঘরের বিভিন্ন কাজকর্মে অংশগ্রহণ করা, অতিথিদেরকে নিজ হাতে খাদ্যাদি পরিবেশন করা, হাট হতে মাঝেমাঝে নিজ হাতে প্রয়োজনীয় পণ্যাদি ক্রয় করে আনা ইত্যাদি। এরূপে কিছুদিন সংসারের ছোটখাট কাজকর্মাদি করতে থাকলে আত্ম অহমিকার মাত্রা ক্রমেক্রমে অন্তর হতে হ্রাস পেতে থাকবে।
প্রত্যেক ব্যক্তির জেনে রাখা উচিৎ যে ওপরে উল্লিখিত কার্যাদি সঠিকভাবে নিজে নিজে করা বড়ই কঠিন এজন্য একজন দিব্যজ্ঞানী পাকাগুরু বা গোঁসাইয়ের সহচার্য গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। বিজ্ঞ দিব্যজ্ঞানী গুরু ব্যতীত মনের এসব রোগ ব্যাধি প্রতিহত করা অত্যন্ত কঠিন। অর্থাৎ সব সন্দেহ ও সংশয়ের ঊর্ধ্বে থেকে একজন পাকা গুরুদেবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে একজন রোগী যেভাবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধপথ্য গ্রহণ করে শারীরিক রোগব্যাধি উপশম করে তদ্রপ তুমিও পাকা গুরুদেবের পরামর্শ অনুযায়ী নিজের মনের রোগ ব্যাধি উপশম করো। আরো উল্লেখ করা যায় যে একজন পণ্ডিতব্যক্তি সাধারণ লোকের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমি জ্ঞানী এবং এ ব্যক্তি নিরক্ষর তবুও আমরা উভয় বিভিন্ন প্রকার পাপাদি কর্মে লিপ্ত আছি তবে নিরক্ষরব্যক্তি পাপাদি করে না জেনে এবং আমি পাপাদি করি জেনে বুঝে বিধায় নিরক্ষরব্যক্তি আমার চেয়ে অনেক উত্তম।
আবার নিরক্ষর উপাসকব্যক্তি কোন পণ্ডিতব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি পণ্ডিত এবং আমি নিরক্ষর তিনি উপাসনা করেন জেনে ও বুঝে কিন্তু আমি উপাসনা করি না জেনে ও না বুঝে কাজেই আমি যতই উপাসনা করি না কেন আমার মর্যাদা পণ্ডিতব্যক্তি উপাসনা না করলেও তার মর্যাদা হতে অনেক নিচে। আবার অধিক বয়সিব্যক্তি কোন অল্প বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে আমার বয়স অধিক এবং এ ব্যক্তির বয়স স্বল্প আমি যতদিন ধরে পাপাদি করছি এ ব্যক্তি ততদিন ধরে পাপ কার্যাদি করে না। কাজেই আমার বয়স অধিক হোলেও আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। আবার অল্প বয়সিব্যক্তি কোন অধিক বয়সিব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ করার সময় মনে করতে হবে যে এ ব্যক্তি বয়সে আমার চেয়ে অনেক অধিক এ ব্যক্তি যতদিন ধরে উপাসনা করছে আমি ততদিন উপাসনা করার সময় পাইনি। কাজেই আমার মর্যাদা এ ব্যক্তির চেয়ে অনেক ন্যূন। জ্ঞান দ্বারা নিজের মনকে এরূপ প্রশিক্ষণ না দিলে মনের গভীর তলদেশ হতে নিজের আমিত্ব বা অহংকার কখনই বিতাড়িত করা যায় না। যারা শুধু মুখে বলে আমি নগন্যব্যক্তি, আমি জঘন্যব্যক্তি, আমি পাপিব্যক্তি, আমি অধমব্যক্তি ইত্যাদি তারা প্রকাশ্য কপটব্যক্তি। তাদের মনের মধ্যেই অহংকার নামক রোগটি অত্যধিক।
যেমন একজন সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত বক্তা বক্তব্য আরম্ভ করার পূর্বে প্রায় বলে থাকে “আমিপাপী ও অধমব্যক্তি, আমি অনুপযুক্ত ব্যক্তি, আমি আর আপনাদের কী বক্তব্য শোনাব! তখন একজন শ্রোতা উঠে দাঁড়িয়ে যদি বলেন যে আপনি আপনি দয়া করে বসুন। আপনি যখন পাপী, অধম ও অনুপযুক্ত তখন আপনার বক্তব্য না শুনে আমরা একজন উপযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য শুনব। তবেই উক্ত বক্তার ভিতরের প্রকৃত রূপটা জানা যাবে বক্তার চোখেমুখে রক্ত আসে কী না? আর যদি তিনি গুরু হয়ে থাকেন তবে তার ভক্তদের দাপটে টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে যাবে। এরূপ বক্তা ও গুরু-গোঁসাইরা বাহ্যিকভাবে নম্রতা প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে তারাই অধিক অহংকারী তাতে কোন সন্দেহ নেই।
উল্লেখ্য পণ্ডিত, বক্তা, গুরু ও গোঁসাই দুই প্রকার। যথা- ১.ভণ্ড ও ২.দিব্যজ্ঞানী। যারা অজ্ঞ ও ভণ্ড তারাই মূলত আত্ম অহমিকার বেড়াজালে আবদ্ধ কিন্তু যাঁরা বিজ্ঞ ও দিব্যজ্ঞানী তাঁরা মনের সর্ব প্রকার অহমিকা হতে চিরমুক্ত। মনের অহংকাররূপ কঠিন ব্যাধি হতে পরিত্রাণ লাভের জন্য প্রথমে আত্মতত্ত্ব ও পরে আপনার লালনকে অবশ্যই চিনতে হবে। মনকে বুঝাতে হবে আমি কিভাবে শূন্য হতে সৃষ্টি হয়েছি প্রয়াণের পর আমার দেহটি পড়ে গলে পোকা মাকড়ের খাদ্যে পরিণত হবে। আবার আমার সমস্ত দেহই মূল্যহীন কেননা সারাপেট অত্যন্ত দুর্গন্ধময় মল ও জলে পরিপূর্ণ। ফলে আমার মতো ক্ষুদ্র একজন মানুষের পক্ষে কখনই আত্ম অহমিকা বা অহংকার করা উচিৎ নয়।যেমন কোন কবি বলেছেন-
“ধন জন যৌবন মিছে অহংকার
নয়ন মুদলে পরে কেউ নয় কার”।
অন্য কবি বলেছেন-
“কে বলে মানুষ বড় বুদ্ধিমান
বুদ্ধি থাকলে কী হয়
মরলে কে করে তার সন্ধান।
জন্ম নিলে মরণ আছে
বরং দুইদিন আগে পাছে
চিরদিন কেউ না বাঁচে
কেউ না করে তার বিধান।
তবু যারা মানুষ মরে
তার স্বভাব এ সংসারে
লভ্য বিদ্যাবুদ্ধির জোরে
শেল বন্দুক কলের কামান।
সত্য বিদ্যাবুদ্ধির ফলে
আকাশে উড়ে কৌশলে
থাকতে পারে জলে-স্থলে
আজব এ বিজ্ঞান।
বেশি নয় দিন দু’চারি
জাকজমকের বাহাদুরি
তারাও মরে আমরাও মরি
শেষকালে ফল এক সমান।”
মানব মনের মরণব্যাধি আত্ম অহমিকা বা অহংকার হতে বেঁচে থাকা সবার অবশ্যই প্রয়োজন।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র- আত্মতত্ত্ব ভেদ- তৃতীয় খণ্ড (মন- জ্ঞান- আত্মা) – বলন কাঁইজি
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন