বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

বাইচালি কী ঘরের চাল নাকি কামযজ্ঞ?

বাইচালি কী ঘরের চাল নাকি কামযজ্ঞ?
What is Dancers trick; roof of the house or lust?
—————————————————————————————
বাইচালি
Dancers trick (ড্যান্সেজ ট্রিক্)/ ‘راقصات خدعة’ (রাক্বিসা খিদয়া)
ভাবার্থঃ Fuck (ফাক)/ ‘جماع’ (জিমায়া)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘কাম’ পরিবারের অধীন অন্যতম একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’। এর প্রকৃতমূলক ‘সঙ্গম’, রূপান্তরিতমূলক ‘কাম’, রূপক পরিভাষা ‘উপাসনা’, উপমান পরিভাষা ‘পূজা ও যজ্ঞ’ এবং অন্যান্য ছদ্মনাম পরিভাষা ‘তাপন ও পাশাখেলা’
বাই১ (রূপ)বি পাদ, অপান, অপানবায়ু, পিছনবায়ু, পায়ুপথ দিয়ে নিঃসৃত বায়ু, বাতকর্ম।
বাই২ (রূপ)বি বায়ুরোগ, রোগ বিশেষ বিণ বাতিক, ছিট, পাগলামি, প্রবল শখ, প্রচ- ঝোঁক, প্রবল আসক্তি।
বাই৩ (রূপ)বি বাঈ, বাইজি, নর্তকী, বৃত্তিধারী গায়িকা, সম্ভ্রান্ত মহিলাদের নামের শেষে সম্মানসূচক শব্দ-মহারাষ্ট্র, গুজরাট ও রাজপুতনা প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যবহৃত (লক্ষ্মি বাই)।
বাইচ বি বাইছ, প্রতিযোগিতা মূলক নৌকা চালনা।
বাইচালা (রূপ)বি ছোট চাল, ছৈ, টাপ্পর, টঙ্গ মঞ্চ নৌকা ও গাড়ির ওপরে নির্মিত অস্থায়ী ক্ষুদ্র চাল {বাং.চাল˃ (ছোট বুঝাতে)}
বাইচালি (মবা. রূপ) বি কৌতুকজনক খেলা বিশেষ, Dancers trick (ড্যান্সেজ ট্রিক্), ‘راقصات خدعة’ (রাক্বিসা খিদয়া) (প্র) আত্মতাত্ত্বিক মনীষীদের মতে এটি কাম বা সঙ্গমের ছদ্মনাম পরিভাষা বিশেষ। পূর্বকালে ভূপতি রাজা সম্রাট ও সম্ভ্রান্ত লোকদের বাইদের (নর্তকী) সাথে চাল (খেলা; এর উপমিতপদ সঙ্গম) করা হতেই এরূপ পরিভাষার সৃষ্টি হয়েছে (বাইচালি খেল তাড়াতাড়ি, ডুবপাড়া তোর দৌড়াদৌড়ি (লালন)) (আবি)বি অক্ষক্রীড়া, কাম, কামকেলি, কেলি, নিত্যকর্ম, ভ্রমণ, পর্যটন, পাশাখেলা, বপ্রক্রীড়া, বপ্রকেলি, বপ্রক্রিয়া, journey (জার্নি) (ভাঅ)বি মৈথুন, সঙ্গম, sexual intercourse (সেক্সুয়াল ইন্টারকর্স), ‘.ﻭﻄﻰ’ (ওয়াত্বিউ), ‘.ﺠﻤﺎﻉ’ (জিমাউ), ‘.ﻟﻮﺍﻄﺔ’ (লাওয়াত্বাত) (অশি)বি চুদ, চুদন, চুদা (আঞ্চ)ক্রি করা, লাগানো, গুয়ানো (আপ)বি.ﻋﺑﺎﺪﺖ’ (ইবাদত), ‘.ﺻﻠﻮﺓ’ (সালাত), ‘ফা.ﺒﻧﺪﮔﻰ’ (বন্দেগি) (ইপ)বি prayer (প্রেয়ার), rape (র‌্যাপ), copulation (কোপুলেশন) (দেপ্র) এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘কাম’ পরিবারের ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সাধারণত বাইদের (নর্তকী) সাথে চালকে (খেলা) বাইচালি বলা হয় ২.রূপক সাহিত্যে পুরুষ ও নারীর যৌনমিলনকে সঙ্গম বা রূপকার্থে বাইচালি বলা হয় (ছনা)বি তাপন, পাশাখেলা ও বাইচালি (উপ)বি পূজা ও যজ্ঞ (রূ)বি উপাসনা (দেত)বি কাম {বাং.বাই (নর্তকী)+ বাং.চাল (খেলা; এর উপমিতপদ = সঙ্গম)+ ই˃}
চাল১ বি চাউল, চাইল, তণ্ডুল, ধানের শাস, এক প্রকার শস্যশাস- যা রান্না করলে ভাত হয়।
চাল২ বি ঢাকনি, ঘরের ছাউনি, ঘরের আচ্ছাদন, গৃহাদির কাঁচা ছাদ, বাঁশ কাঠ শণ কাশ ইত্যাদি দ্বারা আচ্ছাদিত ঘরের ছাদ, প্রতিমার পিছনের দৃশ্যপট (চালচিত্র)।
চাল৩ বি কৌশল, ছলা, কলা, খেল, ছিলে, ষড়যন্ত্র, কুটকৌশল।
চাল৪ বি চলন, ধারা, রীতি, জীবনযাত্রা পদ্ধতি, আচার ব্যবহার, ধরণ, ঢঙ, মিথ্যা বড়াই বা অহংকার প্রকাশ, অভিজাত বা আড়ম্বরপূর্ণ, পাদা খেলা বা পাশা খেলার দান, কার্যোদ্ধার বা বাজিমাত করার মতো ঘুঁটি চালা।
Dancers [ড্যান্সেজ] বি বাই, নর্তকী, Dancer, Ballerina, ‘راقص’ (রাক্বাসা), ‘راقصات’ (রাক্বিসাত), ‘راقصة باليه’ (রাক্বিসাত বালিয়া) {}
Trick [ট্রিক্] বি ১.খেল, ছল, চাল, চালাকি, কুচাল, বাহানা, চাতুরী, চলচাতুরী, কৌশল, প্রতারণা, sport, game, trickery, deceit, chicane, chicanery, dissemblance, ‘خدعة’ (খিদায়া), ‘مكر’ (মাকারা), ‘مكيدة’ (মাকিদা), ‘مزحة’ (মাঝহা), ‘لعبة’ (লায়াবা), ‘رياضة’ (রিয়াদা) ২.দুষ্টামি, নষ্টামি, ইতরামী, বাঁদরামী {}
Dancers trick [ড্যান্সেজ ট্রিক্] বি নর্তকীচাল, নর্তকী খেল, ‘راقصات خدعة’ (রাক্বিসা খিদয়া) (রূপ)বি বাইচালি, পাশাখেলা {}
‘راقصات خدعة’ [রাক্বিসা খিদয়া] বি নর্তকীচাল, নর্তকী খেল, Dancers trick (ড্যান্সেজ ট্রিক্) (রূপ)বি বাইচালি, পাশাখেলা {}
বাইচালির ১টি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(A highly important quotations of Dancers trick)
“বাইচালি খেলো তড়িঘড়ি, ডুবপাড়া তোর দৌড়াদৌড়ি, টুটবেরে তোর কোপের নাড়ি, হানা দিবে জীবনমূলে।” (পবিত্র লালন- ৪১৬/২)। (মুখঃ- “গেঁড়ে গাঙেতে খেয়া, হাপুর হুপুর ডুব পাড়লে, এবার মজা যাবে বুঝা, কার্তিকের ওলানিকালে”)
বাইচালির সংজ্ঞা (Definition of Dancers trick)
সাধারণত বাইদের (নর্তকী) সাথে চালকে (খেলা) বাইচালি বলে।
বাইচালির আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা
(Theosophical definition of Dancers trick)
রূপক সাহিত্যে পুরুষ ও নারীর যৌনমিলনকে সঙ্গম বা রূপকার্থে বাইচালি বলে।
বাইচালির প্রকারভেদ (Classification of Dancers trick)
বাইচালি দুই প্রকার। ১.উপমান বাইচালি ও ২.উপমিত বাইচালি।
১. উপমান বাইচালি (Analogical Dancers trick)
সাধারণত বাইদের (নর্তকী) সাথে চালকে (খেলা) উপমান বাইচালি বলে।
২. উপমিত বাইচালি (Compared Dancers trick)
রূপক সাহিত্যে পুরুষ ও নারীর যৌনমিলনকে সঙ্গম বা উপমিত বাইচালি বলে।
বাইচালির পরিচয় (Identity of Dancers trick)
এটি রূপক সাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘কাম’ পরিবারের অধীন একটি ‘ছদ্মনাম পরিভাষা’ বিশেষ। এটি রূপক সাহিত্যের বহুল ব্যবহৃত একটি পরিভাষা। কিন্তু এর প্রকৃত অর্থ ও ভাবার্থ জানা না থাকার কারণে সাধারণভাবে এটি পাঠক-পাঠিকাদের দৃষ্টিগোচর হয় না।
বাংলা ভাষায় ‘বাই’ পরিভাষাটির অনেক প্রকার অভিধা রয়েছে। অর্থাৎ ‘বাই’ দ্বারা ‘পাদ, বাতিক ও নর্তকী’ ইত্যাদি অভিধা বুঝায়। এখানে নর্তকী অর্থে ‘বাই’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ আমাদের আলোচ্য ‘বাই’ অর্থ নর্তকী। অন্যদিকে বাংলা ভাষায় ‘চাল’ পরিভাষাটিরও অনেক অভিধা রয়েছে। অর্থাৎ ‘চাল’ দ্বারা ‘চাউল, ঢাকনি, খেল ও রীতি’ ইত্যাদি অভিধা বুঝায়। তবে এখানে ‘খেল’ অর্থে চাল পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে। এবার নর্তর্কীকে বাই দ্বারা এবং খেলকে চাল দ্বারা পরিবর্তন করলে নর্তকীখেল = বাইচাল পাওয়া যায়। এ বাইচাল এর সঙ্গে ই প্রত্যয় যোগ করে বাইচালি পরিভাষাটির সৃষ্টি করা হয়েছে।
পূর্বকালে প্রায় রাজা সম্রাট ভূপতি বা অমাত্যরা রমণীদের সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করত। বলতে গেলে রাজা-সম্রাটদের প্রত্যেকেরই বাইজিশালা নাচঘর বা নাট্যমঞ্চ ছিল। সেখানে তাদের স্বস্ব পছন্দের সুন্দরী রমণীদের সেখানে নাচ-গান শেখানো হতো। নিয়মিত সেখানে তারা নাচ-গানের আসর করত। উক্ত আসরে যেসব রমণী থাকত বা যাওয়া-আসা করত তাদেরকে বাইজি বলা হতো। এই বাইজিদের সাথে মৈথুন খেলাকে পূর্বকালে বা সেই সময়ে চাল বলা হতো। আর্থাৎ বাইজি মৈথুনকে তখন বাইচাল বলা হতো। বাইচাল এর সঙ্গে ই প্রত্যয় যুক্ত করে বাইচালি পরিভাষাটির সৃষ্টি করা হয়।
রাজকীয় বা সম্রাটীয় যুগের বিলুপ্তি হওয়ার ফলে তাদের ব্যবহৃত অনেক পরিভাষায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ কারণে বর্তমানকালে নির্মিত বাংলা অভিধানগুলোর মধ্যে বাইচালি, পাশাখেলা ও নাগরালী ইত্যাদি পরিভাষা কোন অভিধানবেত্তাই সংকলন করেননি। তাই এখন পর্যন্ত এসব পরিভাষার সঠিক অভিধা এদেশের সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা অধিকাংশ শিক্ষিত ব্যক্তিরাও জানে না। এসব কারণেই এ উপমহাদেশে রূপক সাহিত্যের এমন করুণ দশা।
আমাদের ‘বাইচালি’ পরিভাষাটির ব্যবহার এ উপমহাদেশে কেবল মহাত্মা লালন সাঁইজির লেখার মধ্যে পাওয়া যায়। এছাড়া অন্যান্য লেখক গবেষক গীতিকার উপন্যাসিক ছড়াকার ও পালাকারের লেখায় দেখা যায় না। যাই হোক আমাদের আলোচ্য বাইচালি পরিভাষাটির প্রকৃত অভিধা যে মৈথুন বা কাম এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। তবে যেহেতু এটি রূপক পরিভাষা তাই একে রূপক অর্থেই ব্যবহার করতে হবে। এ পরিভাষাটির সাধারণ ইংরেজি অনুবাদ হচ্ছে- Dancers trick (ড্যান্সেজ ট্রিক্) এবং আরবি অনুবাদ হচ্ছে- ‘راقصات خدعة’ (রাক্বিসা খিদয়া)। অন্যদিকে এ পরিভাষাটির বাংলা ভাবার্থ হচ্ছে মৈথুন বা সঙ্গম। তাই এর ইংরেজি ভাবানুবাদ হচ্ছে- ঋঁপশ (ফাক) এবং আরবি ভাবানুবাদ হচ্ছে- ‘جماع’ (জিমায়া)।
সমস্যাটা হচ্ছে এ সাহিত্যটি উপমিত প্রধান। অথচ কেবল পাঠক-পাঠিকাই নয় বরং শাস্ত্রীয় পণ্ডিত, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরাও পর্যন্ত এ সাহিত্যের উপমানপদ গ্রহণ করে থাকেন। তাই এ সাহিত্য এখনো সারা বিশ্বের বিস্ময়। এক কথায় বলা যায় কী Indian Mythology (ইন্ডিয়ান মিথোলজি) কী Greek Mythology (গ্রিক মিথোলজি) কী Roman Mythology (রোমান মিথোলজি) কী Persian Mythology (পার্সিয়ন মিথোলজি) ও কী Arabian Mythology (অ্যারাবিয়ান মিথোলজি) কোনটিরই Theology (থিওলোজি) এখন আর নেই। অন্ধ শাস্ত্রীয়রা বর্তমানে Mythology (মিথোলজি) আরো শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে আরম্ভ করেছে। দর্শন, বিজ্ঞান ও চিকিৎসার উন্নয়ন যতই হচ্ছে শাস্ত্রীয়দের অবনতিও তত হচ্ছে। অর্থাৎ গঙ্গাস্নান, তীর্থদর্শন, হজ, ইস্তেমা ও উরস ইত্যাদি তত বাড়ছে।
এবার মহাত্মা লালন সাঁইজির একটি বাণী তুলে ধরা হলো যাতে ‘বাইচালি’ পরিভাষাটি ব্যবহার করা হয়েছে।
১গেঁড়ে গাঙেতে খেয়া,
হাপুরহুপুর ডুব পাড়লে,
এবার মজা যাবে বুঝা,
কার্তিকের ওলানিকালে।
২বাইচালি খেল তড়িঘড়ি,
ডুবপাড়া তোর দৌড়াদৌড়ি,
টুটবেরে তোর কোপের নাড়ি,
হানা দিবে জীবনমূলে।
৩উঠলি ঠেলে কোপের জ্বালায়,
তাগা তাবিজ বাঁধলি গলায়,
তাতে কী হবে ভালায়,
মস্তকের জল শুষ্ক হলে।
৪শান্ত হওরে ও মনভোলা,
ক্ষান্ত দেরে ঝাঁপই খেলা,
লালন বলে ডুবল বেলা,
দেখ না এবার চক্ষু মেলে।” (পবিত্র লালন- ৪১৬)
অভিধা না জানা ও না বুঝার কারণে মহাত্মা লালন সাঁইজি নির্মিত ওপরোক্ত ঐশিবাণীটির মধ্যে ব্যবহৃত ‘বাইচালি’ পরিভাষাটি একেক শিল্পী একেক ভাবে গেয়ে থাকেন। কেউ বলেন ‘বাইচালা দাও’ বা কেউ বলেন ‘বাইচালি দেও’ ইত্যাদি। এরূপ অভিধা বিভ্রাট হতে উত্তরণ করা এবং সমাজে রূপক সাহিত্য ও রূপক পরিভাষার প্রকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করাই আমাদের একান্ত উদ্দেশ্য। কারো ভুল ধরা নয়! কারো সমালোচনা করা নয়!! কাউকে ছোট করা নয়!!!
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৪র্থ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন