বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৪

৯৮/৫. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘পীযূষ’

৯৮/৫. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গঃ ‘পীযূষ’ (১৬ পর্বের ৫ম পর্ব বিশেষ) (আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মতত্ত্ব, আত্মদর্শন, দেহতত্ত্ব, পরম্পরাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান, স্বরূপদর্শন, নরত্বারোপ ও বলনদর্শন টীকা)
পীযূষ
Elixir (ইলিক্সার)/ ‘ ﻜﻭﺛﺭ’ (কাউসার)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ব্যাপকপরিবারের অন্যতম একটি ‘উপমান পরিভাষা’। এর মূলকসদস্য ‘সৃষ্টিকর্তা’, রূপকপরিভাষা ‘কাঁই’, অন্যান্য উপমানপরিভাষা ‘ঘি, নীর, মধু, শস্য ও সূর্য’, চারিত্রিকপরিভাষা ‘অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ’ এবং ছদ্মনামপরিভাষা ‘আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর’। এ পরিভাষাটি রূপক সাহিত্যের ‘দুগ্ধ’, ‘শুক্র’, ‘সুধা’ ও ‘মধু’ এ ৪টি বৈক্তিক সদস্যেরই ব্যাপক পরিভাষারূপে ব্যবহার হয়ে থাকে। এ জন্য বর্ণনার ক্ষেত্র অনুযায়ী এর সঠিকমূলক উদ্ঘাটন করা একান্ত প্রয়োজন।
পীযূষ (রূপ)বি অমির, সুরস, সুধা, অমৃতসুধা, মিষ্টিজল, মজাজল, আকাশবারি, সুপেয়জল, শুভ্রজল, মার্গফল, যা পান করলে অমর হওয়া যায়, অতিশয় সুস্বাদু খাদ্য, elixir (ইলিক্সার), ‘ ﻜﻭﺛﺭ’ (কাউসার), nectar (নেক্টার) (ব্য্য) রূপকসাহিত্যে এ পরিভাষাটি দ্বারা সর্বদা সুধা বুঝানো হয়ে থাকে (প্র) দৈবিকা ও প্রতীতিরা যে জল পান করে অমরত্বলাভ করেন (আবি)বি সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, creator (ক্রিয়েটর), খালিক্ব (.ﺨﺎﻟﻖ), melanin (মিলেনিন), ‘ميلانين’ (মিলেনিন) (আভা)বি অনন্ত, ঈশ্বর, বিধাতা, স্বায়ম্ভু (বাদৈ)বি কালা, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, ব্রহ্মা, শ্যাম (আদৈ)বি আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি Lord (লর্ড), maker (মেকার), designer (ডিজাইনার) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘উপমান পরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.যে কোন প্রকার সুপেয় পানীয়কে পীযূষ বলে ২.রূপকসাহিত্যে কৃষ্ণবর্ণের সুপেয় মানবজলকে পীযূষ বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
পীযূষের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি
(Some highly important quotations of elixir)
১. “ফুলে মধু প্রফুল্লতা, ফলে তার অমৃতসুধা, এমন ফুল দিন দুনিয়ায় পয়দা, জানলে দুর্গতি যায়” (পবিত্র লালন- ২৬০/২)
২. “সাধুরচরণ পরশিলে, অমৃতসুধার গুদাম মিলে, একবিন্দু পান করিলে, জন্মমরণ রহে না” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৫৭)
পীযূষের সংজ্ঞা (Definition of elixir)
যে কোন প্রকার সুপেয় পানীয়কে পীযূষ বলে।
পীযূষের আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of elixir)
১. রূপকসাহিত্যে কৃষ্ণবর্ণের সুপেয় মানবজলকে পীযূষ বলে।
২. দুগ্ধ, শুক্র, সুধা ও মধু এ চার প্রকার মানবজলকে পীযূষ বলে।
পীযূষের প্রকারভেদ (Classification of elixir)
পীযূষ দুই প্রকার। ১.উপমান পীযূষ ও ২.উপমিত পীযূষ।
১. উপমান পীযূষ (Analogical elixir)
যে কোন প্রকার সুপেয় পানীয়কে উপমান পীযূষ বলে।
২. উপমিত পীযূষ (Compared elixir)
দুগ্ধ, শুক্র, সুধা ও মধু এ চার প্রকার মানবজলকে উপমিত পীযূষ বলে।
পীযূষের পরিচয় (Identity of elixir)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের অধীন একটি ‘উপমানপরিভাষা’ বিশেষ। সারাবিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক গ্রন্থ-গ্রন্থিকায় এর ন্যূনাধিক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে এ পরিভাষাটি একেক গ্রন্থে একেক ভাষায় ব্যবহার হওয়ার কারণে সাধারণ পাঠক-পাঠিকা ও শ্রোতাদের তেমন দৃষ্টিগোচর হয় না। মধুরসের বর্ণনা ও বিবরণ প্রায় সুধারসের মতই। তবে কিছুকিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন- মধুরস আহরণ করতে হয় অর্যমা প্রহরে। এটি আহরণ করতে প্রায় ১৫০০ শ্বাস বা ৬৩ মিনিট সময়ের প্রয়োজন হয়। এটি দেখতে কালো ও স্বাদে মধুবৎ মিষ্ট হয়ে থাকে। নিচে সুধা ও মধুর ব্যবহারিক পার্থক্যাদি তুলে ধরা হলো।
সুধা ও পীযূষের পার্থক্য
(Difference between nectar and elixir)
১. মানবদেহ হতে আহরণকৃত, কচি ডাবের জলবৎ, সাদা ও সামান্য মিষ্ট মানবজলকে সুধারস বলে।
১. মানবদেহ হতে আহরণকৃত, কালো বর্ণের ও মধুবৎ মিষ্ট মানবজলকে পীযূষ বলে।
২. সুধারসকে রূপকসাহিত্যে রূপকভাবে সাঁই বা পালনকর্তা বলা হয়।
২. পীযূষকে রূপকসাহিত্যে রূপকভাবে কাঁই বা সৃষ্টিকর্তা বলা হয়।
৩. সুধারস আহরণ করতে হয় ঊষা প্রহরে।
৩. পীযূষ আহরণ করতে হয় অর্যমা প্রহরে।
৪. সুধারস আহরণ করতে সময় লাগে ১০০০ শ্বাস বা ৪২ মিনিট।
৪. পীযূষ আহরণ করতে সময় লাগে ১৫০০ শ্বাস বা ৬৩ মিনিট।
৫. সুধারসের পরিমাণ হয় এক পোয়া হতে প্রায় এক সের পর্যন্ত।
৫. পীযূষের পরিমাণ হয় আধা পোয়া হতে এক পোয়া পর্যন্ত।
৬. সুধারসের বর্ণ কচি ডাবের জলবৎ সাদা।
৬. পীযূষের বর্ণ পাকাজামের রজবৎ কালো।
৭. সুধারস দর্শনের দ্বারা সাধক- সাঁইজি ও বৈষ্ণব উপাধিতে ভূষিত হন।
৭. পীযূষ দর্শনের দ্বারা সাধক- কাঁইজি ও ব্র‏হ্মচারী উপাধিতে ভূষিত হন।
৮. এরস প্রায় রমণী হতেই আহরণ করা যায়।
৮. এরস একমাত্র পদ্মিনিরমণী ব্যতীত আহরণ করা যায় না।
৯. এ শুভ্ররসের অবতরণকাল পুরাণীদের কোজাগর ও কুরানীদের শবেবরাত (ﺸﺑﻰ ﺑﺭﺍﺀﺓ) নামে পরিচিত।
৯. এ কৃষ্ণরসের অবতরণকাল পুরাণীদের ব্র‏হ্মনিশি ও কুরানীদের শবেক্বদর (ﺸﺑﻰ ﻘﺪﺭ) নামে পরিচিত।
এ পার্থক্যাদি না জেনে ও না বুঝে অনেক খুষ্কমুষ্কজ্ঞানী গুরু-গোঁসাই সুধা ও মধুকে প্রায় একই অর্থে ব্যবহার করে থাকেন। এছাড়া আত্মদর্শন বা আত্মদর্শনের চর্চা, অনুশীলন ও অধ্যয়ন বন্ধ হয়ে যাওয়াই এ শিল্পে ইতোমধ্যেই অনেক ভাটা পড়েছে। কোটি কোটি সাধু মহতের মধ্যেও দুয়েকজন আত্মতাত্ত্বিক সাধক বের করা অত্যন্ত দুষ্কর। তারপরও বাংভারতের মতবাদপ্রাণ বাঙালিরা বিজ্ঞ মনে করে এখনো অনেক গুরু গোঁসাইয়ের নিকট দীক্ষা নিয়েই যাচ্ছেন। এ সুযোগে রীতিমত ব্যবসা করে যাচ্ছেন অসৎ মতবাদ ব্যবসায়ীরা।
পরিশেষে আরো বলতে হয় যে শাস্ত্রীয় পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরা রূপকসাহিত্যে বর্ণিত ‘পীযূষ’ পরিভাষাটি দ্বারা কেবল মৌমাছি কর্তৃক সঞ্চিত মধুকে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। তারা কখন চিন্তাও করেন না যে, রূপকসাহিত্যে বর্ণিত ‘পীযূষ’ পরিভাষা দ্বারা এক প্রকার মানবজলও বুঝায়। এরূপ ক্ষেত্রে রূপকসাহিত্যে বর্ণিত ‘পীযূষ’ হলো উপমান এবং মানবজল হলো উপমিত। শাস্ত্রীয়, সাম্প্রদায়িক ও মতবাদীদের গোঁড়ামি, মতবাদান্ধতা ও নির্বুদ্ধতার কারণে তারা চিরদিনের জন্যই প্রকৃত ‘পীযূষ’ হতে বঞ্চিত। এ কারণেই তারা রূপকসাহিত্যে বর্ণিত মানবজলরূপ পীযূষের অভিধা, আহরণ, গুণাগুণ ও সংরক্ষণ কিছুই জানেন না। অন্যদিকে মরমী সাধক ও মরমী গীতিকাররা কেবল মধুবৎ মানবজলকে পীযূষ ধরেই গীতি, বাণী, গান, কবিতা ও রূপকসাহিত্য নির্মাণ করেই চলেছেন। এসব কারণে বর্তমানে সাধারণ মানুষ দুভাগে বিভক্ত। একদল শাস্ত্রীয় ও অন্যদল তাত্ত্বিক। তাত্ত্বিকরা রূপকসাহিত্যে ব্যবহৃত ‘পীযূষ’ পরিভাষাটির দ্বারা মধুবৎ মানবজলকে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন কিন্তু শাস্ত্রীয় পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরা ঐ একই পরিভাষা দ্বারা মৌমাছির চাকের মধুকে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। সমাধান রূপে বলা যায় সারা বিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় গ্রন্থ-গ্রন্থিকার মধ্যে যে ‘পীযূষ’ পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয়েছে, হচ্ছে ও হবে, তা দ্বারা কেবল মধুবৎ মিষ্ট মানবজলকেই বুঝানো হয়েছে, হচ্ছে এবং হবে।
(সংক্ষিপ্ত)
সূত্রতথ্যঃ আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন