গুরু গ্রহণ প্রয়োজনীয়তা- ১ আধ্যাত্মিকবিদ্যা, আত্মদর্শন, স্বরূপদর্শন, আত্মতত্ত্ব, দেহতত্ত্ব, পরম্পরম্পাতত্ত্ব, দিব্যজ্ঞান ও নরত্বারোপ টীকা
গুরু গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা- প্রথম পর্ব
বর্তমানে আমাদের বঙ্গদেশে গুরুবাদিশিক্ষা গ্রহণ করা এক প্রকার সামাজিক
রীতি নীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে গুরুবাদিশিক্ষা কী? কেন এ শিক্ষা
গ্রহণ করতে হয়? এ শিক্ষা গ্রহণ করলে কী কী লাভ হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর
জানার আগ্রহ অনেকেরই নেই। এদেশের বড়বড় আশ্রমাদিতে দেশের প্রতিমন্ত্রী,
মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বসে আছেন। কিন্তু তারা
একটিবারও জানার চেষ্টা করছেন না যে, কেনইবা আমরা গুরুবাদিশিক্ষা গ্রহণ
করছি? আবার অনেকে আছেন গুরু গ্রহণ করতে হবে তাই গুরু গ্রহণ করছেন। বছরে
মাত্র একবার গুরুর আশ্রমে একটি গুরু বা একটি মহিষ পাঠিয়ে দেন। আবার অনেক
ব্যবসায়ী আছেন বছরে এক’বার বা দু’বার কিছু টাকা পাঠিয়ে দিয়ে বাৎরিক
অনুষ্ঠানে আর্থিকভাবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। এ দেশের গুরু গোঁসাইগণও স্ব-স্ব
সাম্প্রদায়িক কিছু নীতিকথা ও পরকালের ভয় দেখিয়ে শিষ্যদের আয়ত্বে রাখার
প্রাণপণ চেষ্টা করে থাকেন।
সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতরাও যেসব সাম্প্রদায়িকবাণী আলোচনা করে থাকেন-
পারম্পরিক নামধারী গুরু গোঁসাইরাও ঠিক সেরূপই সাম্প্রদায়িকবাণী আলোচনা করে
থাকেন। তবে সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিত, গুরু ও গোঁসাইগণের মধ্যে
পার্থক্যটি কোথায়? সাম্প্রদায়িক পণ্ডিতের আলোচনা ও পারম্পরিক গুরু
গোঁসাইয়ের আলোচনা যদি একই প্রকার বা অনুরূপই হয় তবে কী কারণে আমাদের
সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের ত্যাগ করে পারম্পরিক গুরু গোঁসাইয়ের নিকটে
গিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হবে? তবে সাম্প্রদায়িকশিক্ষা ও পারম্পরিকশিক্ষা
কী একই না ভিন্নভিন্ন? সাম্প্রদায়িকশিক্ষা ও পারম্পরিক শিক্ষা যদি একই হয়
তবে তো গুরুবাদিশিক্ষা গ্রহণের কোনই প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ তবে
সাম্প্রদায়িকশিক্ষা হতে যদি গুরুবাদী পারম্পরিক শিক্ষা ভিন্ন ও উন্নত হয়
তবেই কেবল গুরু গোঁসাইয়ের নিকটে গিয়ে শিষ্যত্ব গ্রহণ করে গুরুবাদিশিক্ষা
গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এসব আলোচনা উপস্থাপনের কারণ হলো- বর্তমানে আমাদের দেশে অনেক বড়বড়
আশ্রমের অনেক বড়বড় গুরুদেবকে- শিষ্যদের কোন প্রকার শিক্ষা দীক্ষা না দিয়ে,
বছরে একবার বা দু’বার বড় করে শিষ্য সম্মেলন করে, শিষ্যদের নিকট হতে দর্শনী
বা বার্ষিকী নিতে দেখা যায়। কোন কোন গুরুদেব বার্ষিক শিষ্যদের (যারা বছরে
একবার গুরুর বাড়ি আসে তারাই বার্ষিক শিষ্য) উদ্দেশ্যে কোন উপদেশবাণী তো
আলোচনাই করেন না কেবল দর্শনী ও বার্ষিকী নিয়েই বিদায় করে দেন। আর কিছুকিছু
গুরু গোঁসাই সাম্প্রদায়িক কিছু নীতি কথা শিষ্যদের উদ্দেশ্যে আলোচনা করে বড়
করে শেষ প্রার্থনা করে দেন। এমনভাবে শেষ প্রার্থনাটি করেন যেন- সব
শিষ্যবর্গ সন্তুষ্ট হয়ে যান। সব সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের শেষ
প্রার্থনার বিষয় বস্তু হলো- স্রষ্টা যেন স্ব- সাম্প্রদায়িক মতবাদের সব
প্রয়াতব্যক্তিকে স্বর্গে প্রবেশ করিয়ে দেন, সারাবিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা
করে দেন, সব শিষ্যদের ও তাদের ছেলে মেয়েদের সুখে শান্তিতে রাখেন, শিষ্যদের
ব্যবসায় বাণিজ্যে আরো অধিক আয় উন্নতি দান করেন ইত্যাদি। সাম্প্রদায়িকমতবাদী
পণ্ডিতদের শেষ প্রার্থনা ও পারম্পরিক গুরু গোঁসাইদের শেষ প্রার্থনা যদি
একই হয়, তবে সাম্প্রদায়িকমত ও সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের ছেড়ে কেন
পরম্পরা গ্রহণ করতে হবে? এরূপ প্রশ্ন আজ অনেকেরই।
আবার গুরুবাদিশিক্ষা বা আত্মদর্শনের বিষয় বস্তুইবা কী? কিভাবে বা কোন
সাধনে মানুষের মুক্তি? সাম্প্রদায়িকমতবাদী পণ্ডিতদের কথা হলো-মরার পর
পুনরুত্থান করে ব্যক্তির কৃতকর্মের বিচার করা হয় কিন্তু গুরুবাদিরা বলে
থাকেন জীবদ্দশায় মানুষের বিচার করা হচ্ছে। কার বিচার কোথায় বিচার কিভাবে
বিচার করা হয় ইত্যাদি সঠিক সমাধানইবা কী? ওপরোক্ত প্রশ্নাদির সঠিক সমাধান
পাওয়ার জন্যই সর্বাগ্রে পারম্পরিকদের আত্মদর্শনের প্রকৃতরূপরেখা জানা
প্রয়োজন। আত্মদর্শনের সঠিক রূপরেখা না জানলে গুরুবাদিশিক্ষা গ্রহণ করার
জন্য গুরুধরার কোন প্রয়োজন নেই। গুরু গোঁসাই গ্রহণ করে শুধুশুধু প্রতি বছর
গরু মহিষ ও ছাগল ভেঁড়া বা বার্ষিকী ও দর্শনী দিয়ে কোন লাভ নেই। আবার এমনও
অনেক শিক্ষানুরাগী ও জ্ঞানপিপাসী অনুরাগী ও অনুসারিও রয়েছেন- যারা গুরুবাদী
আত্মদর্শন জানা ও বুঝার চেষ্টা প্রয়াস করে থাকেন কিন্তু আমাদের বঙ্গদেশে
ভাষায় প্রণীত আত্মদর্শনের তেমন কোন গ্রন্থ গ্রন্থিকা না থাকায় তারা তা
জানতে ও বুঝতে পারেন না। আমাদের এ গ্রন্থে জপনাসার পরম্পরা ও
আত্মতত্ত্বভিত্তিক পরম্পরার তুলনামূলক আলোচনা করা হলো- যাতে জ্ঞানপিপাসী
পাঠককুল উভয় পরম্পরার বিষয় বস্তু অবগত হতে পারেন। যে কোন বিষয়ে কোন কিছু
করার পূর্বেই তার রূপরেখা ও শাখাপ্রশাখা জানা ও বুঝা একান্ত প্রয়োজন।
মহাত্মা লালন সাঁইজি এ বিষয়ে যথার্থই বলেছেন- “আগে সন্ধি বুঝো, পরে প্রেমে মজো” (পবিত্র লালন- ৬৫৯/২)।
গুরু গোঁসাই গ্রহণ করার পূর্বে বা পরে যদি গুরুবাদী আত্মদর্শন অর্জন
করা না হয় তবে গুরু গোঁসাই গ্রহণ করাই বৃথা। কারণ গুরু গোঁসাই গ্রহণ করার
মূল উদ্দেশ্যই হলো- আত্মদর্শন অর্জন করা। আত্মদর্শন অর্জন করাই যদি না হয়
তাহলে কেন গুরু গোঁসাই গ্রহণ করবে? আমাদের বিশ্বাস গুরু গোঁসাই গ্রহণকারী
শিষ্য ও ভক্তরা বা পরম্পরাজ্ঞান অর্জন করতে আগ্রহী অশিষ্য বা অভক্তরা সবাই
এ গ্রন্থটির মাধ্যমে জপনাসার পরম্পরাদির সঠিক রূপরেখা জানতে পারবে। তার
আরো জানার জন্য আমাদের প্রণীত অন্যান্য গ্রন্থ গ্রন্থিকা পাঠ করতে থাকলে এক
পর্যায়ে দিব্যজ্ঞানের স্তরে উন্নীত হতে পারবে। সর্বাগ্রে জানতে হবে
পরম্পরা কয়েক প্রকার- তবে এ গ্রন্থে মাত্র জপনাসার পরম্পরাদিই বর্ণিত
হয়েছে। জপনাসার পরম্পরাদির অধিকাংশই আরবি ও ফার্সি মাত্রিকায় বর্ণিত। আমরা এ
গ্রন্থে জপনাসার পরম্পরাদির প্রায় সব বিষয় বস্তুই বাংলা মাত্রিকায় বর্ণনা
করেছি। এছাড়া আসন ও সাধনের ইচ্ছা ও মন্ত্রাদি প্রায় বাংলা ভাষায় বর্ণনা
করেছি। সব সাধকের জপনার মূল হলো- যার যার উপাস্যের নামাদি। আমরা এ গ্রন্থে
জপনার জন্য উপাস্যের মূল আখ্যাটিও বাংলা ভাষায় উল্লেখ করে দিয়েছি। এত কিছু
করার মূল উদ্দেশ্যই হলো- আমরা বাঙালী বাংলা আমাদের মাতৃভাষা বিধায় সব পাঠকই
যাতে বাংলা ভাষায় গুরুবাদী আত্মদর্শন হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হন। সাধন ভজনের
সব বিষয় বস্তু বাংলা মাত্রিকায় বর্ণনা করায় কোন কোন পাঠক হয়ত প্রথমে কঠিন
মনে করতে পারেন। মূলত ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়। কারণ আমরা বাঙালী বিধায় যে
কোন মাত্রিকায় হোক না কেন একবার ভালোভাবে জেনে নিলে পরে আর অসুবিধা হয় না।
তবে আরবি ও ফার্সি শিরোনামাদির মনগড়া অভিধা যারা একবার গ্রহণ করেছেন তাদের
নিকট আমাদের বাংলা মাত্রিকাদি গ্রহণ করতে অনেক কঠিন হবে এটা বলা যায়। গুরু
গোঁসাই গ্রহণ করার দ্বারা আত্মদর্শনের আরবি ও ফার্সি মাত্রিকার অনুকূলে
বর্ণিত কঠিন কঠিন ও দুর্বোধ্য বিষয় বস্তু অতি সহজে জানা যায়।
আত্মতত্ত্বভিত্তিক রূপকপরিভাষাদির সঠিক অর্থ, অভিধা ও মূলক না জানলে সাধন
ভজনে মনোনিবেশ করা যায় না। বাঙালিদের বাংলা মাত্রিকা ও বাংলা রূপকপরিভাষা
যেরূপ সহজে বোধগম্য হয় আরবি ও ফার্সি শিরোনাম ও মাঝাজি পরিভাষা তেমন
বোধগম্য হয় না। অর্থাৎ কোন বিষয়ের মাত্রিকা বা শিরোনাম (ফা.ﺴﺮﻨﺎﻤﻪ) যদি আগে
না বুঝা হয় তবে সে মাত্রিকার অধীনে যত আলোচনা করাই হোক না কেন তা কখনই
বুঝে আসে না।
বাংলাদেশে প্রচলিত সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদাদির সব মাত্রিকায়
হলো- সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফার্সি অথবা সুরিয়ানি ভাষার বিধায় বিদেশী ভাষার
মাত্রিকাদি সাধারণ জনগণ বুঝতে না পারার সুযোগ গ্রহণ করে এদেশের অজ্ঞ ও
মূর্খ গুরু গোঁসাই নামধারী কর্ণধার বা দিশারিরা যার যার অধীনস্ত শিষ্য ও
ভক্তদের মনগড়াভাবে যা ইচ্ছে তাই বুঝিয়ে অর্থকড়ি হাতিয়ে নিচ্ছে যেমন-
নিরীক্ষ, গোবিন্দ, সরস্বতী, সরস্বতী নদী, বজরখ, আদম, হাওয়া, দজলা নদী ও
ফুরাত নদী ইত্যাদি। নিচে মাত্রিকাদির প্রকৃত অভিধা তুলে ধরা হলো:
গুরুদীক্ষা
পাপ ক্ষয় করে যে শিক্ষা দিব্যজ্ঞান প্রকাশ করে তাকেই গুরুদীক্ষা বলে।
প্রকৃতপক্ষে দীক্ষার অর্থ বর্ণ বা শব্দ বিশেষ পাঠন ও শ্রবণ করা নয়।
গুরুদেবের নিকট হতে যেসব কর্মকৌশল গ্রহণ করা হয় তা-ই দীক্ষা। যিনি কর্ম
কৌশল গ্রহণ করেছেন তিনিই দীক্ষিত। দীক্ষিত হওয়ার পর অভীষ্ট সৃষ্টিকর্তা,
পালনকর্তা, সংহারকর্তা, স্বর্গ ও নরকের সঠিক সন্ধান যদি না পাওয়া যায়, তবে
দীক্ষিত হওয়া বা দীক্ষামন্ত্র গ্রহণ না করাই উত্তম।
গুরুদীক্ষা গ্রহণের আবশ্যকতা
অদীক্ষিত ব্যক্তির অন্ন বিষ্ঠার তুল্য, জল মূত্রতুল্য। তার শ্রাদ্ধাদি
কার্য যা কিছু করে তা সবই বৃথা। অদীক্ষিত ব্যক্তির সর্ব কাজই ভুল বিধায়
কিশোর কিশোরী যৌবনে পদার্পণ করার পূর্বেই, প্রত্যেক পিতামাতার উচিৎ, তাদের
প্রাণপ্রিয় সন্তানাদি একজন পাকা গুরুদেবের আশ্রমে প্রেরণ করা। পিতামাতা
স্বয়ং উপস্থিত থেকে তাদের শিষ্যত্বপদ প্রদান করা। তবেই তো কিশোররা স্বল্প
বয়সে বিবাহ না করা অর্থাৎ বাল্যবিবাহ না করা, শুক্রসম্পদের অপব্যবহার না
করা, সন্তানরূপ পুনর্জন্মগ্রহণ না করা, ছোট ও সুখী পরিবার গঠন, পরকিয়া,
জন্মনিয়ন্ত্রণসহ আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি ইত্যাদি বিষয় শিক্ষতে পারবে। তদ্রপ
কিশোরিরা অবৈধ প্রেম, পরকীয়া, বাল্য বিবাহের কুফল, একাধিক সন্তান ধারণের
কুফল জানতে পারবে। এছাড়াও নিজের পরিবার হতে গিয়ে গুরুদেবের পরিবারের সাথে
মিলামিশার দ্বারা অপর পরিবারের সাথে মিলামিশার অভিজ্ঞতা গড়ে উঠবে। ফলে
সহজেই স্বামী, শ্বশুর ও শাশুড়িসহ স্বামির পরিবারের লোকজনের সাথে উঠা বসার
অভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
গুরু গোঁসাইয়ের করণীয়
শিষ্যদের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকজ্ঞান শিক্ষা দেওয়ার সময় সব গুরু
গোঁসাইদের নিম্নলিখিত বিষয়াদি মেনে চলা একান্ত আবশ্যক। তা না হলে শিষ্যগণ
পূর্ণজ্ঞানী হয়ে গড়ে উঠতে পারবে না।
১. অপ্রচলিত ও বিদেশীশব্দাদির অর্থ বুঝা ও হৃদয়ঙ্গম করা শিষ্যদের পক্ষে
অসম্ভব বিধায় অপ্রলিত ও বিদেশী পরিভাষাদির আভিধানিক, পারিভাষিক ও ব্যবহারিক
অর্থ শিষ্যদের অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।২. বাংলাশব্দাদি বাংলা ব্যাকরণ
আনুযায়ী, আরবিশব্দাদি আরবি নাহু ছরফ অনুযায়ী এবং ইংরেজিশব্দাদি ইংরেজি
গ্রামার অনুযায়ী, অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
৩. গ্রন্থে উল্লিখিত শব্দের বিষয়ের ও সংখ্যার সূত্রাদি ভিন্নভিন্নভাবে উদাহরণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৪. মূল গ্রন্থের কঠিন কঠিন বাক্যাদির জন্য সহজসহজ বাক্য গঠন করে বুঝিয়ে দিতে হবে।
৫. কোন বিষয়ের প্রকারাদি বুঝানোর সময় তার সব প্রকার উল্লেখ করে তার কারণসহ বুঝিয়ে দিতে হবে।
৬. একটি বিষয় বুঝানোর সময় যথা সম্ভব সর্ব মতবাদ ও সর্ব পরম্পরার
প্রাথমিক ধারণা, অবশ্যই শিষ্যদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করতে হবে।
প্রয়োজনে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক মতবাদাদির তুলনামূলক আলোচনা
করতে হবে।
৭. রূপকসাহিত্য ও আত্মতত্ত্ব ভালোভাবে জানেন না এরূপ কোন গুরু
গোঁসাইয়ের কখনো সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক অনুষ্ঠানে বক্তব্য বা ভাষণ দেওয়া
উচিৎ নয়।
৮. জন সাধারণের বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞান পরিধির সীমাবহির্ভূত, উচ্চস্তরের
কোন বর্ণনা সাধারণ জনসভায় করা যাবে না। “তোমরা লোকজনের জ্ঞানের পরিধি বুঝে
কথা বলো, যেন তারা সহজে বুঝতে পারে”- হযরত আলি।
৯. গুরু গোঁসাইগণ তাদের বক্তৃতার দ্বারা কোন সাম্প্রদায়িক ও পারম্পরিক
মতবাদ, দল ও ব্যক্তি বিশেষের নাম উল্লেখ করে বিরোধিতা করতে পারবেন না। তবে
বিশৃঙ্খলার সম্মুখীন হতে হবে।
১০. বক্তৃতার সময় গুরু ও গোঁসাইগণের হাসিঠাট্টা করা উচিৎ নয়। কারণ তাতে শ্রোতাদের একাগ্রতা নষ্ট হয়ে যায়।
১১. বক্তৃতার সময়ে গুরু গোঁসাইদের মনগড়া কথা বলা উচিৎ নয়। কারণ তাতে
অনেক ভুর কথা ও ভুল সিদ্ধান্ত সৃষ্টি হতে পারে। প্রমাণহীন মনগড়া গল্পকাহিনি
দ্বারা শ্রোতাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
১২. বক্তৃতার মধ্যে আসা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি দুবার বা তিনবার পর্যন্ত
পুনঃপুন বর্ণনা করে, শ্রোতাদের হৃদয়ঙ্গম করাতে প্রচেষ্টা করতে হবে।
গুরুপাঠ
শিষ্যত্ব গ্রহণের পর গুরুদেবের পক্ষ হতে, যে পাঠ প্রদান করা হয়, তাকেই
গুরুপাঠ বা গুরুমন্ত্র বলে। সাধারণ লোকজন মনে করেন, গুরুপাঠ হয়তবা কোন
সাম্প্রদায়িকশাস্ত্রের বিশিষ্ট বিশিষ্ট মন্ত্রাদি হবে। তা না পারার ভয়ে,
অনেকে শিষ্যত্ব গ্রহণ বা গুরুপাঠ গ্রহণ করতে চান না। অনেকেই বলেন যে, “এখনো
আমাদের বয়স হয়নি”, কেউ বলেন যে, “আমি পিতা মাতার অনুমতি পাইনি”, কেউ বলেন
যে, “এখনো আমি গুরুপাঠ পালন করতে পারব না”, কেউ বলেন যে, “এখনো মিথ্যা কথা
বলা ও মন্দ কর্ম করা ত্যাগ করতে পারিনি বিধায় গুরুর কথা রক্ষা করতে পারব
না।” ইত্যাদি।
এরূপ অনেক ছলনাময়ী কথা বলে ও ভেবে অনেক জ্ঞানিও বসে রয়েছেন। এগুলো তাদের
চরম দৈন্যতা। যারা গুরুপাঠ সম্পর্কে কিছুই জানেন না, কেবল তারাই এরূপ
অজ্ঞতা ও মূর্খতাপূর্ণ কথা বলতে পানেন। বাস্তবে গুরুপাঠ কোন
সাম্প্রদায়িকশাস্ত্রের মন্ত্রাদিও নয় এবং কোন তন্দ্র মন্ত্রও নয়। গুরুপাঠ
গ্রহণ করতে বা শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে, পিতার অনুমতিও প্রয়োজন হয় না। আবার
অধিক বয়সের প্রয়োজনও হয় না। প্রাপ্তবয়স্ক সবাই গুরুপাঠ গ্রহণ করতে পারেন।
বাস্তবে গুরুপাঠ হলো- যার যার নাসিকা যোগে চলাচলকারী সূর্যশ্বাস ও
চন্দ্রশ্বাস মেনে চলা, যার যার শুক্রনিয়ন্ত্রণ করা, যার যার পুনঃ জন্মগ্রহণ
না করা, অল্প আহার করা এবং অল্প কথা বলা ইত্যাদি।
প্রাতঃকর্ম
১. গুরুদীক্ষা গ্রহণকারীদের প্রত্যহ প্রাতে করণীয় কর্মাদিকে প্রাতঃকর্ম বলে।
২. গুরুদেবের পক্ষ হতে প্রদত্ত প্রত্যহ প্রাতে জপনীয় ও করণীয় কার্যাদিকে প্রাতঃকর্ম বলে।
২. গুরুদেবের পক্ষ হতে প্রদত্ত প্রত্যহ প্রাতে জপনীয় ও করণীয় কার্যাদিকে প্রাতঃকর্ম বলে।
সান্ধকর্ম
১.গুরুদীক্ষা গ্রহণকারীদের প্রত্যহ সন্ধ্যায় করণীয় কর্মাদিকে সান্ধকর্ম বলে।
২.গুরুদেবের পক্ষ হতে প্রদত্ত প্রত্যহ সন্ধ্যায় জপনীয় ও করণীয় কার্যাদিকে সান্ধকর্ম বলে।
২.গুরুদেবের পক্ষ হতে প্রদত্ত প্রত্যহ সন্ধ্যায় জপনীয় ও করণীয় কার্যাদিকে সান্ধকর্ম বলে।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসুত্র
ত্বরিক্বত দর্শন- বলন কাঁইজি।
তথ্যসুত্র
ত্বরিক্বত দর্শন- বলন কাঁইজি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন