শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৪

৯৮/১. সৃষ্টিকর্তা প্রসঙ্গ- ‘সৃষ্টিকর্তা’

সৃষ্টিকর্তা
Creator (ক্রিয়েটর)/ ‘ﺨﺎﻟﻖ’ (খালিক্ব)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির মূলকপরিবারের একটি অন্যতম ‘মূলকসদস্য’ এবং ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবার প্রধান বিশেষ। এর রূপক পরিভাষা ‘কাঁই’, উপমানপরিভাষা ‘ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য’, চারিত্রিকপরিভাষা ‘অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ’ এবং ছদ্মনামপরিভাষা ‘আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর’। এটি একটি ‘রূপকপ্রধানসত্তা’ বিশেষ।
সৃষ্টিকর্তা বি নির্মাতা, পিতা, জনক, ক্রিয়েটর (creator), খালিক্ব (আ.ﺨﺎﻟﻖ), melanin (মিলেনিন), ‘ميلانين’ (মিলেনিন) (আবি)বি ঈশ্বর, অনন্ত, বিধাতা, স্বায়ম্ভু (বাদৈ)বি কালা, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, ব্রহ্মা, শ্যাম (আদৈ)বি আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (আ.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি লর্ড (Lord), মেকার (maker), ডিজাইনার (designer) (পরি) মানবদেহে প্রাপ্ত কালোবর্ণের মধুবৎ মিষ্ট অমৃতসুধা (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবার প্রধান ও রূপকসাহিত্যের একটি দৈবিকা বা প্রতীতি বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে সৃষ্টিকর্তা বলা হয় ২.সৃষ্টিক্রিয়ার সরাসরি অংশ গ্রহণকারিকে সৃষ্টিকর্তা বা রূপকার্থে কাঁই বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা।
সৃষ্টিকর্তার উদাহরণ (Example of creator)
১. “আরবিরা যারে আল্লাহ কয়, সংস্কৃতিতে সে ব্রহ্মা হয়, সবাই কাঁই- ডাকি বাংলায়, বলন কয় সৃষ্টিকর্তা ভুলে” (বলন তত্ত্বাবলী- ২৫)
২. “কুরানিদের দর্শনবিধি, আত্মা স্রষ্টার প্রতিনিধি, আত্মা হয় পাপী যদি, সৃষ্টিকর্তাই পাপী হয়” (বলন তত্ত্বাবলী- ১৮৩)
৩. “জাত বলে সবাই মুচি, একজলে সবার সুচি, বিজাতি বলে কেন অরুচি, সৃষ্টিকর্তা একজনা” (বলন তত্ত্বাবলী- ১১৯)
৪. “নগরকর্তা হলে শাসন, পালনকর্তার হয় দর্শন, পেরিয়ে সে জন্মমরণ, সৃষ্টিকর্তা দেখে নিবি” (বলন তত্ত্বাবলী- ৬১)
৫. “সব সৃষ্টি করল যেজন, বলো তার সৃষ্টি কে করেছে, সৃষ্টি ছাড়াই কী সৃষ্টিকর্তা নাম ধরেছে” (পবিত্র লালন- ৯১৪/১)
৬. “সৃষ্টিকর্তা বলছ যারে, সে অংশীহীন হয় কেমন করে, ভেবে দেখ পূর্বাপরে, সৃষ্টি করলেই তার অংশী আছে” (পবিত্র লালন- ৯১৪/২)
৭. “সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করলেন সবারি, যুগেযুগে মাতা হয় যোগেশ্বরী, সুযোগ না বুঝে- কুযোগে মজে, মারা গেল জীব ঘোর তুফানে” (পবিত্র লালন- ৭০৮/২)
*. “الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ(১)”
উচ্চারণঃ ‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বি আলয়ালামিন’
অর্থঃ প্রশংসা কাঁইয়ের জন্য যিনি সারা জগতের পালনকর্তা।” (কুরআন- ফাতিহা- ১)
*. “ إِنَّ رَبَّكُمْ اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ذَلِكُمْ اللَّهُ رَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ” (কুরআন- ইউনুছ- ৩)
উচ্চারণঃ ‘ইন্না রাব্বিকুম আল্লাহু আল্লাজি খালাক্বা আসসামাওয়াতি ওয়ালয়ারদি ফি সিত্তাতা আইয়ামি। সুম্মা আসতাওয়া আলা আলয়ারসি। ইউদাব্বিরু আলয়ামরা মা মিন শাফিয়ি ইল্লা মিন বাদি ইজনাহু যালিকুম আল্লাহু রাব্বিকুম। ফাবুদুহু আফালা তাজাক্কারুন’ (কুরআন- ইউনুছ- ৩)
অর্থঃ “সত্যই তোমাদের প্রতিপালক সেই কাঁই, যিনি ছয় দিনে আকাশ ও ভূমি সৃজন করেছেন তদন্তর কার্য নির্বাহ করতে সিংহাসনের ওপর স্থিতি করেছেন, তার আদেশ ব্যতীত কোন অনুরোধকারীই নাই। ইনিই তোমাদের প্রতিপালক কাঁই। অতএব তোমরা তাঁকেই আর্চনা কর। তোমরা কী উপদেশ গ্রহণ করছ না” (কুরআন- ইউনুছ- ৩)
*. “ وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَكَانَ عَرْشُهُ عَلَى الْمَاءِ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَلَئِنْ قُلْتَ إِنَّكُمْ مَبْعُوثُونَ مِنْ بَعْدِ الْمَوْتِ لَيَقُولَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ” (কুরআন, সুরা হুদ- ৭)
উচ্চারণঃ ওয়া হুয়া আল্লাজি খালাক্বা আসসামাওয়াতি ওয়ালয়ারদি ফি সিত্তাতা আইয়ামি। ওয়া কানা আরশুহু আলা আলমায়ি। লিইয়াবলুওয়াকুম আইয়াকুম আহসানু আমালা, ওয়ালায়িন কুলতা ইন্নাকুম মাবউসুনা মিন বাদি আলমাওতি। লাইয়াকুলান্না আল্লাজিনা কাফারু ইন হাজা ইল্লা সিহরু মুবিন” (কুরআন, সুরা হুদ- ৭)
অর্থঃ “তিনিই যিনি আকাশ ও ভূমি ছয়দিনে সৃষ্টি করেছেন। তখন তার সিংহাসন ছিল জলের ওপর। কার্যত তোমাদের মধ্যে কে অত্যুত্তম এটা পরীক্ষা করার জন্য। যদি তুমি বল যে, “নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে। তবে অবশ্যই বলবে যারা ধর্মদ্রোহী, এটা স্পষ্ট যাদু ভিন্ন কিছুই নহে” (কুরআন, সুরা হুদ- ৭)
সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞা (Definition of creator)
সারাজগতের সৃষ্টিকারিকে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলে।
সৃষ্টিকর্তার আধ্যাত্মিক সংজ্ঞা (Theosophical definition of creator)
সৃষ্টিক্রিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণকারিসত্তাকে সৃষ্টিকর্তা বা স্রষ্টা বলে।
সৃষ্টিকর্তার পরিচয় (Identity of creator)
এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘মূলকসদস্য’ বিশেষ। জীব সৃষ্টিক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণকারিকে সৃষ্টিকর্তা বলা হয়। বর্তমানে সৃষ্টিকর্তার অনেক নাম শুনতে পাওয়া যায়। যথা- ১.কাঁই, ২.ঈশ্বর, ৩.ব্রহ্মা, ৪.আল্লাহ, ৫.কারাতারা, ৬.খোদা, ৭.মারাংবুরু, ৮.খামিসামা ও ৯.লর্ড ইত্যাদি। এগুলো শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক সৃষ্টিকর্তা। এদের নির্মাণশৈলী সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন। এগুলো রূপকসাহিত্য শিল্প দ্বারা প্রস্তুত সৃষ্টিকর্তা। অর্থাৎ এগুলোকে বলা যায় কল্পিত সৃষ্টিকর্তা/ Mythological creator (মিথোলোজিক্যাল ক্রিয়েটর) বা সৃষ্টিকর্তার কল্পিত চরিত্র/ Mythological character of creator (মিথোলোজিক্যাল ক্যারেক্টর অপ ক্রিয়েটর)। কল্পিত সৃষ্টিকর্তা ও বাস্তব সৃষ্টিকর্তা কখনো এক নয়।
অথচ বড় অবাক হবার বিষয় হলো সারা বিশ্বের সর্ব প্রকার শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক পণ্ডিত, বক্তা, বৈখ্যিক, টৈকিক, অভিধানবেত্তা ও অনুবাদকরা রূপকসাহিত্যের কল্পিত সৃষ্টিকর্তাকেই বাস্তব সৃষ্টিকর্তা বলে বুঝেন ও বুঝিয়ে থাকেন। এ জন্যই শাস্ত্রীয় ও পারম্পরিক মতানুসারিরা কখনই মরমীদের সৃষ্টিকর্তার সন্ধানলাভ করতে পারেন না। উল্লেখ্য আত্মদর্শন দুই প্রকার। যথা- ১.বাস্তব আত্মদর্শন (Real theosophy) ও ২.প্রতীকী আত্মদর্শন (Symbolic theosophy. সিম্বোলিক থিওসোফি)। শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদি বাস্তব আত্মদর্শন কিন্তু শাস্ত্রীয় সংস্কারাদি প্রতীকী আত্মদর্শন। যেমন পুরাণিদের গঙ্গায় স্নান করে পাপ মোচন ও কুরানিদের কালোপাথরে চুমা দিয়ে পাপ মোচন।
একটি বাস্তব গঙ্গাস্নান রয়েছে- যার পবিত্র জল পান করলে সত্যসত্যই পাপ মোচন হয়। তেমন একটি বাস্তব পাথরও রয়েছে, যাতে কৌশল করে চুমা দিলে সত্যসত্যই পাপ মোচন হয়। কিন্তু পুরাণিদের শাস্ত্রীয় গঙ্গা যেমন প্রতীকী তেমন কুরানিদের শাস্ত্রীয় পাথরও প্রতীকী। তেমন শাস্ত্রীয় স্রষ্টা যে প্রকৃত স্রষ্টা নয় এটা শাস্ত্রীয়রা একবারও ভেবে দেখেন না। এ ব্যাপারে মহাত্মা লালন সাঁইজির একটি বাণী উপস্থান করা যায়- “চন্দ্র সূর্য যে গঠেছে, তার খবর কে করেছে, শুনি নীরেতে নিরঞ্জন আছে, তবে নীরের জন্ম কে দিয়েছে” (পবিত্র লালন- ৯১৪/৩)। সাঁইজির এরূপ বাণীর অর্থ হলো, আদি-সৃষ্টিকর্তার সন্ধান অনেকেই জানেন না। যিনি প্রথম বটগাছ, প্রথমমানুষ, প্রথম ইলিশমাছ, প্রথম হাতি ও প্রথম ঘোড়া নির্মাণ করেছেন। যেমন বিজ্ঞানী ও দার্শনিকরা আজ পর্যন্ত সে-ই জাগতীক স্রষ্টার সন্ধান করে চলেছেন। কিন্তু কোন সমাধান করতে পারছেন না।
অথচ একদল বলে থাকে গুরুই আমার স্রষ্টা, আরেকদল বলে থাকে শাস্ত্রীয় গ্রন্থ ঢুঁড়লেই স্রষ্টা পাওয়া যায়। বর্তমানে অনেক নামধারী সুফী, যোগী, ইয়োগী, কুয়ান্টাম ও সিলভা মেথডধারী সাধনহীন সাধক স্রষ্টার সাথে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্য স্রষ্টার পক্ষ থেকে টেন্ডার নিয়ে এসে বসেছেন। তারা ভক্তদের স্রষ্টার সাক্ষাৎ পাইয়ে দিয়ে থাকেন। এসব স্রষ্টাবাজ, স্রষ্টা-ব্যবসায়ী, স্বর্গবাজ, স্বর্গ-ব্যবসায়ী, পুণ্যবাজ, পুণ্য- ব্যবসায়ী প্রতারকদের থেকে ব্যবধানে থাকা সব বুদ্ধিমানদের একান্ত কর্তব্য।
সৃষ্টিকর্তা মতবাদের প্রকারভেদ (Classification of creator doctrine)
স্রষ্টা রূপকসাহিত্যের অতিব গুরুত্বপূর্ণ একটি অনন্য সত্তা। এছাড়াও বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়েও স্রষ্টা উপাদানটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। স্রষ্টা পরিভাষাটি বিশ্বের সব ভাষার ভাষা সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এ যাবৎ বিশ্বে যত ভাষা সৃষ্টি হয়েছে, যত ভাষা সৃষ্টি হচ্ছে এবং যত ভাষা সৃষ্টি হবে, স্রষ্টা পরিভাষাটি প্রায় সব ভাষারই একটি বিশিষ্ট উপাদান। বর্ণ, শব্দ ও প্রবচন যে ভাষা সম্পদ, এতে বিশ্বের সব ভাষাবিজ্ঞানী, লেখক ও সাহিত্যিক একমত। কিন্তু স্রষ্টা পরিভাষাটির অভিধা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব। স্রষ্টা পরিভাষাটির অভিধা নিয়ে এ যাবৎ বিশ্বের পাঁচটি গোষ্ঠির পঞ্চর্মুখী মতবাদ আমরা দেখতে পাই। এটা হতে স্রষ্টা পরিভাষাটির ন্যূনতম ৫টি অভিধা গড়ে উঠেছে আমাদের সমাজে। নিচে স্রষ্টা পরিষাভার বিভিন্ন মতবাদাদি তুলে ধরা হলো। সৃষ্টিকর্তা মতবাদ প্রধানত পাঁচ প্রকার। যথা- ১.সৃষ্টিকর্তার বৈজ্ঞানিক মতবাদ, ২. সৃষ্টিকর্তার দার্শনিক মতবাদ, ৩.সৃষ্টিকর্তার শাস্ত্রীয় মতবাদ, ৪.সৃষ্টিকর্তার মরমী মতবাদ ও ৫.সৃষ্টিকর্তার আত্মতাত্ত্বিক মতবাদ।
১. সৃষ্টিকর্তার বৈজ্ঞানিক মতবাদ (Scientific doctrine of creator)
বিজ্ঞানিগণ বলেন যে ‘স্রষ্টা’ পরিভাষাটি একান্তই মানুষের আবিষ্কার এবং তা অসহায় লোকের শান্তনার নিছুক মাধ্যম মাত্র। স্রষ্টা পরিভাষাটিকে সৃষ্টি করেছে মানুষের প্রয়োজনে মানুষ। মানুষের সমাজ আর সমাজের সংস্কৃতি! প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টার অস্তিত্ব বলে তেমন কিছুই নেই। বিজ্ঞানিদের ধারণা শক্তিই আমাদের সর্বশেষ সত্তা। শক্তির ঊর্ধ্বে আর কিছুই নেই। অদৃশ্যশক্তিই পঞ্জিভূত হয়ে পদার্থ বা দৃশ্যবস্তুর সৃষ্টি হয়। শক্তির দৃশ্যমান রূপকে পদার্থ বলে। বহু পদার্থের সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয় জীব বা প্রাণী। বস্তুবাদী বিজ্ঞানিগণ শক্তির ঊর্ধ্বে আর কিছু পাননি বিধায় এখন পর্যন্ত তাদের স্রষ্টা হলো শক্তি। যেহেতু সৃষ্টির আদিমূল অদৃশ্যশক্তি। অদৃশ্যশক্তি হতে ক্রমান্বয়ে বিশ্বজগৎ সৃষ্টি। তাদের মতে একমাত্র শক্তি ব্যতীত স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা বলে আমাদের মহাবিশ্বে অন্য কোন স্রষ্টা বা সত্তার কোন অস্তিত্ব নেই। আবার কেউ কেউ বলে থাকেন- “ঈশ্বর হলো এ মহাজাগতিক সামগ্রিক শক্তির নাম। মানুষের স্বজ্ঞা ও প্রজ্ঞা এ সত্তাকে চিহ্নিতকরণ ও নামকরণ করেছে মাত্র (দ্বন্দ্বে ও দ্বৈরথে)।
২. সৃষ্টিকর্তার দার্শনিক মতবাদ (Philosophical doctrine of creator)
দার্শনিকগণ মনে করেন যে জ্ঞানই হলো ঈশ্বর বা স্রষ্টা। যেহেতু জ্ঞান ব্যতীত কোন কিছুই সম্পাদন করা যায় না। জ্ঞানিগণ ঈশ্বরতুল্য এবং অজ্ঞানিরা পশুতুল্য। একমাত্র জ্ঞানই জীবের মননশীলতার প্রকাশ ও বিকাশ ঘটায়। জ্ঞান দ্বারাই জীবকুল স্বস্ব আত্মপ্রকাশ করে বিধায় দার্শনিকগণের নিকট জ্ঞানই ঈশ্বর এবং ঈশ্বরই হলেন স্রষ্টা।
৩. সৃষ্টিকর্তার শাস্ত্রীয় মতবাদ (Schismatic doctrine of creator)
বিশ্বের প্রথম মানুষ, প্রথম গরু, প্রথম তেতুল গাছ ও প্রথম ইলিশ ইত্যাদি অর্থাৎ বিশ্বের সব জীবের প্রথমটি এবং সব জড় পদার্থ ও আদিশক্তিগুলো সৃষ্টিকারিই প্রকৃত স্রষ্টা এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু কে এসব সৃষ্টি করলেন? তিনি কোথায় রইলেন? কী সাধনে তারে পাওয়া যাবে? এসব ব্যাপারে এযাবৎকালের সব শাস্ত্রীয় ইতিহাস বা নীতিমালাদির মধ্যে কিছু রূপকসাহিত্য ও কিছু রূপকউপন্যাস বা লোকশ্রুতি ব্যতীত আর কিছুই পাওয়া যায় না। স্রষ্টা আমাদের নিকট এরূপ একটি নাম- যা ধরা, ছোঁয়া বা দেখার কোন উপায় নেই। যেমন- ডুমরের ফুল, সাপের পা ও ঘোড়ার ডিম ইত্যাদির মাত্র শব্দ শোনা যায় ও গ্রন্থের পাতায় পাতায় মাত্র লেখা দেখা যায় কিন্তু তা ধরা, ছোঁয়া বা পাওয়া ও খাওয়ার কোন উপায় নেই। তাদৃশ স্রষ্টারও শুধু নামই পাওয়া যায়। তাঁকে ধরা ও ছোঁয়ার কোন ব্যবস্থা প্রদান করা যায় না। স্রষ্টা বিশ্বের সব কিছুর স্বয়ং সৃষ্টিকারী কিন্তু নিজে কারো দ্বারা সৃষ্টি নয় ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিশ্বের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদের শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিতগণ বলে থাকেন যে, স্রষ্টা নিরাকার। অদৃশ্য বা নিরাকার হয়েও তিনি দেখেন, শোনেন, সব কিছু বোঝেন, তাঁর মহিমাময় হাত, পা, চোখ, কান ও মুখ সবই আছে। তাঁর রাগ আছে, তিনি সন্তুষ্ট ও অসন্তুষ্ট হন। প্রয়াত মানুষ ও দৈত্যদের পুণ্যের পুরস্কার ও পাপের শাস্তি প্রদান করেন। স্রষ্টার কোন আকার নেই, তিনি অদৃশ্য মহাশক্তি। স্রষ্টাই বিশ্ব চরাচর সৃষ্টি করেছেন। মানুষ স্রষ্টার একটি বিশেষ সৃষ্টি ইত্যাদি ইত্যাদি। মোট কথা শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞ বা শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিতদের বড় কথা হলো স্রষ্টা নিরাকার। বিশ্বের সুমহান রূপকারগণের মনের মাধুরিতে নির্মিত ঈশ্বর এবং শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিত বক্তাদের টেনে লম্বাকৃত ঈশ্বর ও জাগতিক স্রষ্টার মধ্যে অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নিচে নির্মিত ঈশ্বর ও স্রষ্টার পার্থক্যাদি তুলে ধরা হলো।
ঈশ্বর ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between God and creator)
ঈশ্বর (God) :
স্রষ্টা (Creator):
১. পুরাণিদের শাস্ত্রীয় স্রষ্টাকে রূপক সাহিত্যে ঈশ্বর বলে।
১. জাগতিক সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলে।
২. কেবল জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে ঈশ্বর বলা হয়।
২. বিশ্বজগতের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলে।
৩. ঈশ্বর কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. স্রষ্টা সারা সৃষ্টিকুলের সর্বত্র বিরাজিত।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা ঈশ্বরের দর্শনলাভ করা যায় বিধায় ঈশ্বর সম্পর্কের অনেক উপাধিও লাভ করা যায়। যেমন- বীরেশ্বর।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা স্রষ্টার দর্শন-লাভ করা যায় না বিধায় স্রষ্টা সম্পর্কের কোন উপাধিও লাভ করা যায় না।
৫. জীবের প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদের অংকুুর উদ্গমশক্তি বহনকারী মধু, শুক্র ও সুধা রসত্রয়কে ঈশ্বর বলা হয়।
৫. সর্ব সৃষ্টির স্থিতি ও রূপান্তরকারী শক্তিকে স্রষ্টা বলা হয়।
৬. ঈশ্বর নামক সত্তাটি স্রষ্টার সৃষ্টি।
৬. স্রষ্টা বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা।
৭. ঈশ্বর জীবের আগধড় ও পাছধড় নামক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকারী।
৭. স্রষ্টা মাথার ওপরে অবস্থিত আকাশ ও পায়ের নিচে অবস্থিত পৃথিবী এবং বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকারী।
৮. মানবদেহে প্রাপ্ত ঈশ্বর নামক জীবজল দুই প্রকার। যথা- ১.শ্বেতবর্ণ ও ২.কৃষ্ণবর্ণ।
৮. স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায় না বলে এর কোন আকার, প্রকার ও রূপের বর্ণনা করা যায় না।
এছাড়াও সৃষ্টিকর্তাকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা- ১.জাগতিক স্রষ্টা, ২.শাস্ত্রীয়স্রষ্টা ও ৩.পারম্পরিক স্রষ্টা।
১. জাগতিক স্রষ্টা (Mundane creator)
জাগতিক স্রষ্টা বি সারা জগতের সৃষ্টিকারী, বিশ্বজগৎ সৃজনকারী।
১. নিরাকার সৃষ্টিকর্তাকে জাগতিক স্রষ্টা বলে।
২. সারাজগতের সৃষ্টিকারিকে রূপকভাবে জাগতিক স্রষ্টা বলে।
জাগতিক স্রষ্টার পরিচয় (Identity of mundane creator)
নিখিল মহাবিশ্বের সৌরজগৎ, সূর্য, চন্দ্র, আকাশ, বাতাশ, সাগর, নদী, পাহাড়, পর্বত, প্রাণী, উদ্ভিদ ও মৎস্য এসব যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই জাগতিক স্রষ্টা। আজ পর্যন্ত তার আকার, আকৃতি, বর্ণ ও লিঙ্গ কেউই বর্ণনা করেননি। জাগতিক স্রষ্টার আকার, আকৃতি ও প্রকৃতি ব্যাপারে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, জ্যোতিষী ও মরমিগণ চিরকালের জন্যই চিরনীরব। তবু যারা জাগতিক স্রষ্টা সম্পর্কে কিছু বলার চেষ্টা করেছেন। তারা সবাই বলেছেন- “জাগতিক স্রষ্টা হয়তবা শক্তিরূপে নয়তবা জ্ঞানরূপে নিরাকার। অথবা প্রকৃতিরূপে চিরবর্তমান।” একদল দার্শনিক বলেন- “জ্ঞানই যেহেতু বিশ্বের সব কিছু সৃষ্টি করে বিধায় কোন সত্তাকে স্রষ্টা বলতে হলে একমাত্র জ্ঞানকেই স্রষ্টা বলে স্বীকার করা যায়।” এ কারণেই জ্ঞান ব্যতীত অন্য কোন সত্তাকে দার্শনিকগণ স্রষ্টা বলে স্বীকার করতে চান না।
বিজ্ঞানিরা তো কোন সত্তাকে স্রষ্টা বলে স্বীকার করতেই চান না। তবে কোন কোন বিজ্ঞানী নিরাকার শক্তিগুলোকে স্রষ্টা বলে স্বীকার করে থাকেন। তারা বলেন- “প্রকৃতি ভিন্ন স্রষ্টা বলে কোন সত্তার অস্তিত্ব এ বিশ্বজগতে নেই। তবুও অগত্য স্রষ্টা বলে যদি কোন সত্তার অস্তিত্ব স্বীকার করতে বা গ্রহণ করতেই হয়- তবে তা অবশ্যই শক্তিকে গ্রহণ করতে হবে।” তাদের সূত্র হলো- পদার্থের তিনটি অবস্থা- ১.কঠিন, ২.তরল ও ৩.বায়বীয়। সব কঠিন পদার্থ তাপ দিলে তরল হয় এবং সব তরল পদার্থ তাপ দিলে বায়বীয়রূপলাভ করে। পদার্থের বায়বীয় রূপটি নিরাকার বিধায় পদার্থের এ নিরাকার রূপকেই শক্তি বলা হয়। সব পদার্থই কখনো কঠিন, কখনো তরল ও কখনো শক্তিরূপে বিরাজ করে। বিজ্ঞানিরা বলে থাকেন- “শক্তি কখনো শীতল হয়ে তরলরূপলাভ করে পরবর্তিকালে আরো শীতল হলে কঠিনরূপলাভ করে।” অর্থাৎ শক্তিই কখনো তরল আবার কখনো কঠিন আকার ধারণ করে। পদার্থ বিজ্ঞানের- বায়বীয়, তরল ও কঠিন- শক্তির এ ত্রি-রূপকে রূপকসাহিত্যে- ‘নিরাকার’, ‘সাকার’ ও ‘আকার’ বলে। পদার্থ নিরাকার শক্তিতে রূপান্তরিত হলে একই সময়ে বিশ্বের সর্বত্রই বিরাজ করতে পারে। যেমন- ইথার (ether)। বিজ্ঞানের এ মতবাদটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় শক্তি শীতল হয়ে বায়বীয়- তরল- কঠিনরূপলাভ করছে। আবার তাপ প্রয়োগের কারণে পদার্থ কঠিন- তরল- বায়বীয়- শক্তি রূপলাভ করছে। পদার্থের এ রূপান্তর ক্রিয়ার মধ্যে অন্য কোন সত্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এ হতেই বিজ্ঞানিগণ বলেন যে- “স্রষ্টা বলে যদি কোন কিছু থেকেই থাকে তবে অবশ্যই তা হলো শক্তি।”
পর্যালোচনা (The discussion)
স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় কিছু শক্তি, কিছু বায়বীয়, কিছু তরল ও কিছু কঠিন পদার্থের সমন্বয়ে জীবদেহ সৃষ্টি হয়। এ জীব বেঁচে থাকার জন্য প্রধানত দু’টি শক্তির প্রয়োজন হয়। যথা- জীবাত্মা ও পরমাত্মা। জীবাত্মা জীবদেহের ভিতরে অবস্থিত কিন্তু পরমাত্মা বিশ্বের সর্বত্র অবস্থিত। কোন কারণে জীবাত্মা নিষ্ক্রিয়করণ করলে জীবের প্রয়াণসাধিত হয়। অর্থাৎ শক্তির এ রূপান্তর সূত্র হতে বলা যায়- শক্তিই বায়বীয়, শক্তিই তরল, শক্তিই কঠিন, শক্তিই আত্মা আবার শক্তিই জীবদেহ। বিস্তারিত আলোচনা ও পর্যালোচনার পরও মহাজগতে একমাত্র শক্তি ভিন্ন অন্য কোন সত্তার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না বলে স্রষ্টারূপে ভিন্ন কোন সত্তার অস্তিত্বের কল্পনা করারও কোন সুযোগ নেই। এবার প্রশ্ন হতে পারে- শক্তিটা সৃষ্টি হলো কিরূপে? শক্তি সৃষ্টি করতে কী স্রষ্টার প্রয়োজন হয় নাই? এ প্রশ্নের উত্তরে এতটুকু বলা যায়- মহাশূন্যের মহাধারে প্রতিনিয়ত অসংখ্য শক্তি, এক শক্তি হতে অন্য শক্তিতে রূপান্তর হচ্ছে। শক্তির রূপান্তর হওয়ার প্রকৃতির অমোঘ লীলা বৈ নয়। প্রকৃতির অমোঘ লীলায় অংশগ্রহণের জন্য শক্তি ভিন্ন অন্য কোন সত্তার অস্তিত্ব নেই। বিজ্ঞানিগণের প্রদত্ত তথ্যাদি গবেষণা করে শক্ত করেই বলা যায়- একমাত্র শক্তি ভিন্ন অন্য কোন স্রষ্টার অস্তিত্ব মহাজগতে নেই। বিজ্ঞানী ও দার্শনিকগণের বর্তমান মতবাদ হতে দেখা যায়- জাগতিক স্রষ্টা শক্তি হোক বা জ্ঞানই হোক- এদের কোন আকৃতি, বর্ণ বা লিঙ্গ নেই।
২. শাস্ত্রীয়স্রষ্টা (Schismatical creator)
শাস্ত্রীয়স্রষ্টা বি শাস্ত্রীয় গ্রন্থাদিতে বর্ণিত স্রষ্টা, সৃষ্টি ক্রিয়াই সরাসরি অংশগ্রহণকারী সত্তা {বাং.শাস্ত্র+ বাং.স্রষ্টা}
শাস্ত্রীয়স্রষ্টার সংজ্ঞা (Definition of schismatic creator)
১. অন্ধবিশ্বাসী শাস্ত্রীয় মতানুসারী পণ্ডিতদের নির্মিত স্রষ্টাকে শাস্ত্রীয়স্রষ্টা বলে।
২. বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গ্রন্থ ও রূপকসাহিত্যাদিতে বর্ণিত স্রষ্টাকে শাস্ত্রীয়-স্রষ্টা বলে। যেমন- কাঁই, ব্র‏হ্মা, লর্ড (Lord) ও আল্লাহ (.ﺍﻟﻟﻪ) ইত্যাদি।
শাস্ত্রীয়স্রষ্টার পরিচয় (Identity of schismatic creator)
বাংভারতীয় উপমহাদেশের বৈদিকসাহিত্য ও পৌরাণিকসাহিত্যের স্রষ্টা ‘ব্র‏হ্মা’। পুরাণিদের রূপকবর্ণনা মতে- সৃষ্টিকর্তা ব্র‏‏হ্মা, পালনকর্তা বিষ্ণু, সংহারকর্তা মহাদেব, আদিমানব মনু বা গোবিন্দ, আদিমানবী সরম্বতী, স্বর্গ ৮টি ও নরক ২৭টি। অন্যদিকে পারস্য উপমহাদেশের কৌরানী সাহিত্যের স্রষ্টা আল্লাহ (ﺍﻟﻟﻪ), পালনকর্তা রব (ﺭﺐ), সংহারকর্তা আযরাইল (ﻋﺫﺭﺍﺌﻴﻞ), আদিমানব আদম (ﺁﺪﻢ), আদিমানবী হাওয়া (ﺤﻮﺍﺀ), স্বর্গ ৮টি এবং নরক ৭টি। এভাবে বিশ্বে যতটি শাস্ত্রীয় মতবাদ রয়েছে ততটি ভিন্নভিন্ন সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, সংহারকর্তা, আদিমানব, আদিমানবী, বর্থ্য, স্বর্গ ও নরক রয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো- এসব না জেনে ও না বুঝে কেবল শাস্ত্রীয়সত্তাদি নিয়েই শাস্ত্রীয় মতানুসারিরা অযথা গণ্ডগোল ও মারামারি করে থাকেন।
ব্র‏হ্মার বিবরণ (Lord description)
ব্রহ্মা (রূপ)বি অগ্নি, অনাদি, অনন্ত, বিধাতা, সৃষ্টিকর্তা, জগৎস্রষ্টা, কমলাসন, চতুরানন, প্রজাপতি, হিরণ্যগর্ভ, বিবস্বান, বিরিঞ্চি, স্বায়ম্ভু (বাপ)বি ঈশ্বর, কাজলা, কালা, কালিয়া, কেলে, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, শ্যাম, শ্যামল, শ্যামলা, লর্ড (Lord) (পরি) মানবদেহে প্রাপ্ত কালোবর্ণের মানবজল বা মধুবৎ মিষ্ট অমৃতসুধা (আবি)বি সৃষ্টিকর্তা, নির্মাতা, ক্রিয়েটর (creator), অথার (auther), খালিক্ব (.ﺨﺎﻟﻖ) (আদৈ)বি আল্লাহ (.ﺍﻠﻠﻪ), ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি লর্ড (Lord), মেকার (maker), ডিজাইনার (designer) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপকসাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.পুরাণিদের শাস্ত্রীয় সৃষ্টিকর্তাকে ব্রহ্মা বলা হয় ২.সৃষ্টিক্রিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণকারী অনুঘটককে সৃষ্টিকর্তা বা রূপকার্থে ব্রহ্মা বলা হয় (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা স্ত্রী ব্রহ্মাণী।
“যখন ছিল বিম্বুমণি, ধরেছিল মা জননী, ডিম্বে উষুম দিলো শুনি, ধরে ব্রহ্মা আকার” (পবিত্র লালন- ৫০৮/৩)
(প্র) মহাপ্রলয়ের শেষে এ জগৎ যখন অন্ধকারময় ছিল তখন এক বিরাট মহাপুরুষ পরমব্রহ্ম নিজের শক্তি সে অন্ধকার দূর করে জলের সৃষ্টি করেন। সে জলে সৃষ্টির বীজ নিক্ষিপ্ত হয়। পরে ঐ বীজ সুবর্ণময় অণ্ডে পরিণত হয়। অণ্ড মধ্যে ঐ বিরাট মহাপুরুষ স্বয়ং ব্রহ্মারূপে অবস্থান করতে থাকেন। তারপর অণ্ডটি দুইভাগে বিভক্ত হলে, একভাগ আকাশে এবং অন্যভাগ ভূমণ্ডলে পরিণত হয়। অতঃপর ব্রহ্মা ১.মরীচি ২.অত্রি ৩.অঙ্গিরা ৪.পুলস্ত্য ৫.পুলহ ৬.ক্রতু ৭.বশিষ্ঠ ৮.ভৃগু ৯.দক্ষ ও ১০.নারদ- এ দশজন প্রজাপতিকে মন হতে উৎপন্ন করেন। এসব প্রজাপতি হতে সব প্রাণী উদ্ভব হয়। ব্রহ্মা নারদকে সব সৃষ্টির ভার নিতে বলেন কিন্তু ব্রহ্ম সাধনায় বিঘ্ন হবে বলে নারদ সৃষ্টির ভার নিতে অসম্মত হন। এ জন্য ব্রহ্মার শাপে তাকে গন্ধর্ব ও মানুষ্যকুলে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছিল। সরস্বতী ব্রহ্মার স্ত্রী। দেবসেনা ও দৈতসেনা ব্রহ্মার দুই কন্যা।
ব্রহ্মা চতুর্ভুজ, চতুরানন ও রক্তবর্ণ। প্রথমে তাঁর পাঁচটি মাথা ছিল কিন্তু একদা শিবের প্রতি অসম্মানজনক বাক্য উচ্চারণ করায় শিবের তৃতীয় নয়নের অগ্নিতে ব্রহ্মার একটি মস্তক দগ্ধ হয়। ব্রহ্মার বাহন হংস। বেদে কিংবা ব্রাহ্মণে ব্রহ্মার নাম পাওয়া যায় না। সেখানে সৃষ্টিকর্তাকে হিরণ্যগর্ভ প্রজাপতি বলা হয়েছে। তাহলে শক্ত করেই বলা যায় এ অনুপম নামটি পৌরাণিক রূপকাররাই নির্মাণ করেছেন। একথা আজ দিবালোকের মত সত্য যে মানুষ মানুষের প্রয়োজনেই বৈষয়িকসাহিত্য ও রূপকসাহিত্য যুগেযুগে সৃষ্টি করেছেন। অন্যান্য শিল্পের মতো সাহিত্য নির্মাণ করাও এক প্রকার শিল্প। এটিকে সাহিত্যশিল্প বলে। এ শিল্পটি অত্যন্ত কঠিন বিধায় অল্পসংখ্যক সাধককেই রূপকসাহিত্য নির্মাণ করতে দেখা যায়। অনেক সময় কয়েক শতাব্দির মধ্যেও একজন বড় রূপকসাহিত্যিক বা রূপকার দেখা যায় না। কয়েক শতাব্দি পরপর দুয়েকজন সাধারণসাহিত্যিক দেখা গেলেও কয়েক সহস্রবছর পরপরও একজন রূপকার দেখা যায় না। অর্থাৎ সাধারণ সাহিত্যিক হওয়া যত কঠিন রূপকসাহিত্যক বা রূপকার হওয়া তার চেয়েও অধিক অধিক কঠিন। পৌরাণিক রূপকার মহামনীষিগণের সুনিপুণ বর্ণনা ও শাস্ত্রীয় মতবাদী পণ্ডিত- বক্তাদের লম্বা লম্বা আলোচনা হতে ব্র‏‏হ্মা ও স্রষ্টার মধ্যে অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
ব্র‏হ্মা ও স্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য
(Difference between Lord and creator)
১. পুরাণিদের শাস্ত্রীয় সৃষ্টিকর্তাকে রূপকসাহিত্যে ব্র‏হ্মা বলে।
১. জাগতিক সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলে।
২. কেবল জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে ব্র‏হ্মা বলা হয়।
২. বিশ্বজগতের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তাকে স্রষ্টা বলে।
৩. ব্র‏হ্মা কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. স্রষ্টা সারা সৃষ্টিকুলের সর্বত্র বিরাজিত।
৪. সাধন ভজনের দ্বারা ব্র‏হ্মার দর্শনলাভ করে ব্রাহ্মণ বা ব্র‏হ্মচারী উপাধিলাভ করা যায়।
৪. সাধন ভজনের দ্বারা স্রষ্টার দর্শনলাভ করা যায় না বিধায় স্রষ্টা সম্পর্কের কোন উপাধিও লাভ করা যায় না।
৫. জীবের প্রজনন ও উদ্ভিদের অংকুরোদ্গম শক্তি বহনকারী মধু, শুক্র ও সুধা রসকে রূপকসাহিত্যে ব্র‏হ্মা বলা হয়।
৫. সর্ব সৃষ্টির স্থিতি ও রূপান্তরকারী শক্তিকে স্রষ্টা বলা হয়।
৬. ব্র‏হ্মা নামক সত্তাটি স্রষ্টার সৃষ্টি।
৬. স্রষ্টা বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা।
৭. ব্র‏হ্মা জীবের আগধড় ও পাছধড় নামক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকারী।
৭. স্রষ্টা আমাদের মাথার ওপরে অবস্থিত আকাশ ও পায়ের নিচে অবস্থিত পৃথিবী এবং বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকারী।
৮. মানবদেহে প্রাপ্ত ব্র‏হ্মা নামক জীবজল দেখতে কালো। তাই একে কাঁই, কালা, শ্যাম, কালিয়া ও কৃষ্ণ ইত্যাদি বলা হয়।
৮. স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায় না বলে এর কোন আকার, প্রকার ও রূপের বর্ণনা করা যায় না।
কুরানে আরবি আল্লাহ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কুরানের ভাষায় আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা বলা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে আল্লাহই সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু আল্লাহ কারো দ্বারা সৃষ্টি নয়। কুরানের কোথাও কোথাও বলা হয়েছে আল্লাহ ও রাসুলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। যেমন-
“ إِنَّ الَّذِينَ يَكْفُرُونَ بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيُرِيدُونَ أَنْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ اللَّهِ وَرُسُلِهِ وَيَقُولُونَ نُؤْمِنُ بِبَعْضٍ وَنَكْفُرُ بِبَعْضٍ وَيُرِيدُونَ أَنْ يَتَّخِذُوا بَيْنَ ذَلِكَ سَبِيلًا(১৫০) أُوْلَئِكَ هُمْ الْكَافِرُونَ حَقًّا وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُهِينًا(১৫১) وَالَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَلَمْ يُفَرِّقُوا بَيْنَ أَحَدٍ مِنْهُمْ أُوْلَئِكَ سَوْفَ يُؤْتِيهِمْ أُجُورَهُمْ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا(১৫২)”
অর্থ-
“যারা কাঁই ও সাঁইয়ের প্রতি অস্বীকারকারী এবং নিশ্চয় যারা কাঁই ও সাঁইয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে পার্থক্য সৃষ্টি করতে চায়- এবং বলে যে আমরা কাউকে বিশ্বাস করি এবং কাউকে অবিশ্বাস করি না এবং এরই মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করতে চায় (১৫০)। প্রকৃতপক্ষে এরাই সত্য অস্বীকারকারী। আর অস্বীকারকারিদের জন্য আমরা নির্মাণ করেছি অপমানজনক শাস্তি (১৫১)। যারা কাঁই ও সাঁইয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং তাদের মধ্যে কাউকে অস্বীকার করেনি। শিঘ্রই তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে। কাঁই ক্ষমাশীল ও দয়ালু” (কুরান, নিসা- ১৫০-১৫২)
আল্লাহর (ﺍﻟﻟﻪ) বিবরণ (Description of the Lord)
আল্লাহ [ﺍﻠﻠﻪ] বি সৃষ্টিকর্তা, ঈশ্বর, অগ্নি, অনাদি, অনন্ত, বিধাতা, বিবস্বান, স্বায়ম্ভু, ক্রিয়েটর (creator), অথার (auther), খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) (আবি)বি কাঁই, কালা, কৃষ্ণ, বিরিঞ্চি, ব্রহ্মা, শ্যাম (আদৈ)বি ইসা (.ﻋﻴﺴﻰٰ), ইসামসিহ্ (.ﻋﻴﺲٰ ﻤﺴﻴﺢ), মসিহ (.ﻤﺴﻴﺢ), শাম (.ﺷﺄﻢ), শামস (.ﺸﻤﺲ), শিশ (.ﺸﻴﺶ) (ইদৈ)বি লর্ড (Lord), মেকার (maker), প্রডিউসার (producer), ডিজাইনার (designer) (দেপ্র) এটি রূপকসাহিত্যের বৈক্তিকসদস্য সারণির ‘সৃষ্টিকর্তা’ পরিবারের ‘ছদ্মনামপরিভাষা’ ও রূপক সাহিত্যের একটি পরিভাষা বিশেষ (সংজ্ঞা) ১.সারা জগতের সৃষ্টিকারিকে সৃষ্টিকর্তা বলে ২.সৃষ্টিক্রিয়াই সরাসরি অংশগ্রহণকারিকে সৃষ্টিকর্তা বলে (ছনা)বি আদি, স্রষ্টা, স্বায়ম্ভু ও হর (চরি)বিণ অসিত, কালা, কালু ও কৃষ্ণ (উপ)বি ঘি, নীর, পীযূষ, মধু, শস্য ও সূর্য (রূ)বি কাঁই (দেত)বি সৃষ্টিকর্তা {}
(প্র) কুরানী মনীষিদের রূপকবর্ণনা মতে সারা জগতের স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা। বাংলা রূপকসাহিত্যে একে কাঁই ও সংস্কৃত রূপকসাহিত্যে একে ব্র‏হ্মা বলা হয়। এর কোন আকার, আকৃতি নেই। তবে তাঁর হাত, পা ও মুখ ইত্যাদি রয়েছে। তিনি আসনে বসেন, রাগান্বিত হন ও জীবকুলের কল্যাণ করেন। তিনি নিজে পৃথিবীতে আসেন না। তবে তার প্রতীতিগণের মাধ্যমে সাংবাদিকগণের নিকট বাণী প্রেরণ করে থাকেন। কুরানী মনীষিদের রূপকবর্ণনা মতে পবিত্র তৌরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও কুরান তাঁরই প্রদত্তবাণী। প্রয়াণোত্তরকালে তিনি পুণ্যবানদের পুরস্কার ও পাপিদের শাস্তি প্রদান করে থাকেন। তিনি কাউকে জন্মও দেননি এবং তিনি কারো নিকট হতে জন্মগ্রহণও করেননি। বর্তমানে তাঁর অবস্থান সপ্ত আকাশের ওপর (মি’রাজের রূপকবর্ণনা মতে)। তথাপিও তিনি সদা সর্বত্র বিরাজমান।
পবিত্র কুরান ও কুরানী রূপকইতিহাস নির্মাতা রূপকারদের বর্ণনা হতে আল্লাহ ও খালিক্বের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তারা বলেন খালিক্ব হলো আল্লাহর গুণবাচক নাম। এটি তাদের একেবারেই স্থূল দৃষ্টিভঙ্গির কথা। প্রকৃত বিষয় হলো- আল্লাহ কুরানিদের শাস্ত্রীয় সৃষ্টিকর্তা এবং খালিক্ব তাদের জাগতিক সৃষ্টিকর্তা। কুরানিদের মধ্যে শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা বলেন যে, আল্লাহুই সৃষ্টিকর্তার মূলনাম এবং অন্যান্য নামাদি আল্লাহুর গুণবাচক নাম। কিন্তু বিষয়টি এভাবে মীমাংসিত হয় না কারণ সৃষ্টিকর্তাকে কেবল সৃষ্টিকর্তাই বলা হয়। অন্যান্য গুণবাচক নামে যাকে ডাকা হয় তিনি আদৌ জাগতিক সৃষ্টিকর্তা নন বরং তিনি হলেন স্বয়ং স্বায়ম্ভু- যিনি বিশ্বের প্রতিটি জীবের মধ্যে আপনাপনিই সৃষ্টি হয়ে জীবের সৃষ্টিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেন। জাগতিক স্রষ্টা এবং রূপকসাহিত্যের স্রষ্টা কখনই এক নন। নিচে আল্লাহ ও খালিক্বের মধ্যে পার্থক্যাদি তুলে ধরা হলো।
আল্লাহ ও খালিক্বের মধ্যে পার্থক্য
(Difference between Lord and creator)
আল্লাহ (اللَّهُ) - খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ)
১. কুরানিদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টাকে আরবি ভাষায় আল্লাহ (اللَّهُ) বলে।
১. জাগতিক স্রষ্টাকে আরবি ভাষায় খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) বলে।
২. কেবল জীবকুলের সৃষ্টিকর্তাকে আল্লাহ (اللَّهُ) বলা হয়।
২. বিশ্বজগতের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তাকে খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) বলা হয়।
৩. আল্লাহ (اللَّهُ) কেবল জীবকুলের মধ্যে বিরাজিত।
৩. খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) সারা সৃষ্টিকুলে সর্বত্র বিরাজিত।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা আল্লাহর (اللَّهُ) দর্শনলাভ করে ওলিউল্লাহ (ﻮﻟﻰ ﺍﻟﻟﻪ) উপাধি-লাভ করা যায়।
৪. সাধন ও ভজনের দ্বারা খালিক্বের (ﺨﺎﻟﻖ) দর্শনলাভ করা যায় না বিধায় খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) সম্পর্কের কোন উপাধিও লাভ করা যায় না।
৫. জীবের প্রজননশক্তি ও উদ্ভিদের অংকুরোদ্গমশক্তি বহনকারী মধু, শুক্র ও সুধা রসকে রূপকসাহিত্যে আল্লাহ (اللَّهُ) বলা হয়।
৫. সর্ব সৃষ্টির স্থিতি ও রূপান্তরকারী শক্তিকে আরবি ভাষায় খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) বলা হয়।
৬. আল্লাহ (اللَّهُ) নামক সত্তাটি খালিক্বের (ﺨﺎﻟﻖ) সৃষ্টি।
৬. খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা।
৭. আল্লাহ (اللَّهُ) জীবের আগধড় ও পাছধড় নামক আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকারী।
৭. খালিক্ব (ﺨﺎﻟﻖ) আমাদের মাথার ওপরে অবস্থিত আকাশ ও পায়ের নিচে অবস্থিত পৃথিবী এবং বিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকারী।
৮. মানবদেহে প্রাপ্ত আল্লাহ নামক জীবজল কালো। তাই একে কালা, শ্যাম ও কৃষ্ণ ইত্যাদি বলা হয়।
৮. খালিক্বের (ﺨﺎﻟﻖ) দর্শন পাওয়া যায় না বলে এর কোন আকার, প্রকার ও রূপের বর্ণনা করা যায় না।
পর্যালোচনা (The discussion)
পুরাণী মনীষিগণ যেভাবে ব্র‏হ্মাকে সৃষ্টি করেছেন- অতঃপর তাদের মন মতো করে ব্র‏হ্মার বিবাহ দিয়েছেন। তাঁর স্ত্রী নির্ধারণ করেছেন এবং তাঁর পুত্র ও কন্যাদি নির্মাণ করেছেন। অতঃপর মহাদেব কর্তৃক তাঁর একটি মাথা দগ্ধ হওয়ার কথাও লিখেছেন। এতদ্দৃষ্টে হতে মনে হয় রূপকারগণ হয়ত ব্র‏হ্মার পরিবারের কোন একজন একান্ত সদস্য হবেন। তা না হলে ব্র‏‏হ্মারূপ সৃষ্টিকর্তার বিবাহ, সন্তান সংখ্যা, মস্তক দগ্ধ হওন, তাঁর রাগ, তাঁর অপারগতা স্বচক্ষে দেখলেন কিভাবে? কেউ উত্তর দিতে পারেন- রূপকারগণ দৈববাণী যোগে বা দিব্যদৃষ্টি দ্বারা এসব এরূপ সংবাদাদিলাভ করার পরই কেবল এসব সংবাদ লিপিবদ্ধ করার প্রয়াস পেয়েছেন।
এসব উত্তরের প্রতিবাদে আমরা বলব, আজ হতে প্রায় চারসহস্র (৪,০০০) বছর পূর্বে রচিত মহাগ্রন্থ বেদ, প্রায় তেত্রিশশত (৩,৩০০) বছর পূর্বে রচিত এবং রামায়ণ প্রায় বত্রিশশত (৩,২০০) বছর পূর্বে রচিত মহাভারত ও পুরাণাদি। তখনকার মনীষিগণের দিব্যদৃষ্টি এতই প্রখর ছিল যে, তাঁরা দেবতাগণের সৃষ্টি বিবাহ, সন্তান-সন্ততি ও কার্যকলাপ সব দেখতে পেতেন, এমনকি দিব্যচক্ষে দেখে দেখেই এরূপ অতি উচ্চ পর্যায়ের মহাগ্রন্থাদি পর্যন্ত লেখতে পারতেন। অথচ সে যুগে ছিল না তেমন কোন উল্লেখযোগ্য দর্শন, ছিল না কোন বিজ্ঞান, ছিল না তেমন উল্লেখযোগ্য জ্যোতির্বিদ্যা ও ছিল না অধুনাকালের মতো কোন প্রযুক্তি। পক্ষান্তরে এখন দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞান ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সব আছে তবুও সেরূপ গ্রন্থ গ্রন্থিকা কেউ নির্মাণ করতে পারছেন না কেন? এবার হয়ত উত্তর দিতে পারেন- সে যুগের পারম্পরিকগণ সাধনবলে দিব্যদৃষ্টি অর্জন করতে পারতেন কিন্তু এ যুগের সাধকরা কোনক্রমেই দিব্যদৃষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হন না। এ জন্য তারা স্বর্গীয় প্রতীতি ও সৃষ্টিকর্তাগণের সৃষ্টিরহস্য দিব্যদৃষ্টি বলে দেখতে পান না। ফলে তারা সেরূপ মহা গ্রন্থ গ্রন্থিকা প্রণয়ন বা নির্মাণ করতে পারেন না।
আমরা বলতে চাই যে, কোন বিষয়ের মূল ঘটনা না জেনে, অনন্ত প্রশ্ন ও উত্তর দ্বারাও সমাধান করা যায় না বিধায় সব সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বাগ্রে আমাদের রূপকপরিভাষা ও রূপকঘটনাদির মূল উদ্ঘাটনের প্রতি মনোনিবেশ করাই সমীচিন হবে। প্রকৃত ব্যাপার হলো- পূর্বযুগের সিদ্ধপুরুষ ও মহাপুরুষগণও যেমন দিব্যদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন, এযুগের সিদ্ধপুরুষ ও মহাপুরুষগণও তেমনই দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন- এতে কোন সন্দেহ নেই। ফলে তখন তাঁরাও যেরূপ দিব্যদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টির সাহায্যে মহাগ্রন্থাদি প্রণয়ন করেননি তদ্রূপ বর্তমান যুগের মহাপুরুষ ও সিদ্ধপুরুষগণও দিব্যদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টির দ্বারা মহাগ্রন্থাদি প্রণয়ন করেন না।
পুর্বযুগের মনীষিগণেরও দির্বদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টি যেমন ছিল বর্তমানযুগের মনীষিগণেরও দিব্যদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টি ঠিক তদ্রূপই রয়েছে। মনীষিগণের দিব্যদৃষ্টি বা অন্তর্দৃষ্টির কোন পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে কেবল রূপকসাহিত্যের চর্চা ও অনুশীলন। পূর্বযুগে দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও বিজ্ঞানের তেমন কোন চর্চা ও অনুশীলন ছিল না বিধায় তখন মানুষ কেবল রূপকসাহিত্যটির অধিক অধিক চর্চা ও অনুশীলন করতেন। কিন্তু বর্তমানে দর্শন, জ্যোতির্বিদ্যা ও বিজ্ঞানের ব্যাপক চর্চা ও অনুশীলনের ফলে রূপকসাহিত্যটির চর্চা ও অনুশীলন একেবারে শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। যতটুকু চর্চা ও অনুশীলন হয় তাও করে একেবারে মূর্খ ও অজ্ঞ লোকেরা। ফলে পূর্বকালের মতো মনীষিগণের উদ্ভবও হচ্ছে না এবং পূর্বকালের মতো মহাগ্রন্থ ও মহা গ্রন্থিকাও আর নির্মিত বা রচিত হচ্ছে না। এবার আমরা বলতে পারি শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদি- মহাগ্রন্থ ও মহাগ্রন্থিকা প্রণয়নকারী মহান মনীষিগণের মনের মাধুরিতে নির্মিত বৈক্তিকসত্তাদির বিশিষ্ট বিশিষ্ট সত্তা। কেউ শ্বাস প্রশ্বাস যোগে চলাচলকারী প্রাণবায়ুকে স্রষ্টা ভেবে, কেউবা জীবের জীবাত্মা বিদ্যুৎশক্তিকে স্রষ্টা ভেবে, কেউবা পুরুষদেহের শুক্রকে স্রষ্টা ধরে, কেউবা শিশ্নকে স্রষ্টা ধরে, কেউবা শ্বেতবর্ণের অমৃতমানবজলকে স্রষ্টা ধরে, আবার কেউবা কৃষ্ণবর্ণের মানবজলকে স্রষ্টা ধরে- বিশাল বিশাল আয়তনের মহাগ্রন্থ নির্মাণ বা প্রণয়ন করেছেন।
শ্বাস, শুক্র, সুধা, মধু, জীবাত্মা ও পরমাত্মা ইত্যাদিই বিভিন্ন শাস্ত্রীয় মতবাদের মহা গ্রন্থ গ্রন্থিকায় স্রষ্টারূপে দেখতে পাওয়া যায়। আত্মতাত্ত্বিক, দার্শনিক ও আত্মতাত্ত্বিকগণ যুক্তি পাল্টা যুক্তি দ্বারা নিরাকার স্রষ্টার মতবাদাদি খণ্ডন করে মহাগ্রন্থাদির মধ্যে বর্ণিত স্রষ্টার অস্তিত্ব একমাত্র মানবদেহের মধ্যেই সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। আত্মদর্শনের বাইরের কোন সত্তাকে আত্মতাত্ত্বিক দার্শনিক ও মরমী মনীষিগণ স্রষ্টা বলে গ্রহণ করেননি কোনদিন। এমনকি আত্মদর্শনের বাইরের কোন সত্তাকে তাঁরা স্রষ্টা বলে গ্রহণ করতে কখনই সম্মত নন। আবার দার্শনিক ও বস্তু বিজ্ঞানিগণ কখনই শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদির অস্তিত্ব স্বীকার করেন না বিধায় আত্মতাত্ত্বিকদার্শনিক ও মরমী বাদিগণের- “আত্মদর্শনের বাইরে কোন স্রষ্টার অস্তিত্ব নেই” এ মতবাদটি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার কোন উপায় নেই।
বাস্তবেও তা-ই দেখা যায়। বিশ্বের সব শাস্ত্রীয় গ্রন্থে শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদির উক্তিতেই বর্ণিত আছে যে- “আমরা তোমাদের মধ্যেই অবস্থান করি,
“ نَحْنُ أَقْرَبُ إِلَيْهِ مِنْ حَبْلِ الْوَرِيدِ”
উচ্চারণঃ “নাহনু আক্বরাবু ইলাইহি মিন হাবলিল ওয়ারিদ”
অর্থ- “আমরা মোটা শিরা হতেও আরো নিকটবর্তী” (কুরান, ক্বাফ- ১৬)। আবার বলা হয়েছে-
“وَفِي أَنفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ”
উচ্চারণঃ “ওয়া ফি আনফুছিকুম আফালা তুবসিরুন”
অর্থ- “তোমাদের মধ্যেই অবস্থিত কিন্তু তোমরা দেখনা”- (কুরান, জারিয়াত- ২১)। আবার ফারর্সি মরমী বাণির মধ্যেও দেখতে পাওয়া যায়-
“মান্না গুঞ্জুম দর জমিন আসমা,
লেকে গুঞ্জুম দর কুলুবি মু’মিনা”

অর্থ- “পৃথিবী ও আকাশের কোথাও আমি থাকি না বরং আমি থাকি বিশ্বাসীদের হৃদয়ে।”
এরূপ শতশত প্রমাণ রয়েছে যে, শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদি আত্মদর্শনের বাইরের কোন সত্তা নয় এবং শাস্ত্রীয় স্রষ্টাদি মানবদেহ ব্যতীত বাইরে কোথাও অবস্থানও করেন না। তবুও শাস্ত্রীয়রা যুগের পর যুগ ও শতাব্দির পর শতাব্দি সাধারণ মানুষকে স্রষ্টা নিরাকার, স্রষ্টা আকাশে থাকেন, স্রষ্টা স্বর্গে থাকেন, স্রষ্টা সাত আকাশের ওপরে অবস্থান করেন, প্রয়াণের পূর্বে স্রষ্টার দর্শনলাভ করা সম্ভব নয় এরূপ বিভ্রান্তিকর মতবাদাদি প্রচার প্রসার করে আসছেন। শাস্ত্রীয়স্রষ্টা যে দেহের বাইরে কোথাও অবস্থান করেন, প্রয়াণের পূর্বে তাদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টার দর্শন পাওয়া যায় না এরূপ কোন প্রমাণ দিতে পারবেন কী তারা? তবুও মানুষকে অন্ধবিশ্বাসীরূপে গড়ে তুলে তাদের শাসন ও শোষণের জন্য তারা তাদের কথা বলেই চলেছেন। এ জন্য সাধারণ মানুষ শাস্ত্রীয়দের শাসন ও শোষণের অন্ধবিশ্বাসের মরণবিতংস হতে বের হয়ে আসতে পারছেন না। পুরাণিদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টা ব্র‏হ্মা- তাদের রূপকবর্ণনা মতে ব্র‏হ্মার স্ত্রী, পুত্র ও কন্যা সবই রয়েছে। অন্যদিকে কুরানিদের শাস্ত্রীয়স্রষ্টা আল্লাহ (ﺍَﻟﻟًّﻪُ) মানুষের বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেয়ে বেড়ান, একবার মুহাম্মদরূপে নিজকে আত্মপ্রকাশ করেন, একবার কুকুররূপে আত্মপ্রকাশ করেন (কুকুররূপে মুসার বাড়িতে গিয়ে বসে ছিলেন)। আবার তাঁর বাড়িতে মানুষকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়ে আলাপ করেন (মি’রাজ)।
(সংক্ষিপ্ত সংকলন)
তথ্যসূত্রঃ
আত্মতত্ত্ব ভেদ (৬ষ্ঠ খণ্ড)
লেখকঃ বলন কাঁইজি
——————————————————————

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন